রাজনীতি
কাল সংবাদ সম্মেলন ডেকেছে ইনকিলাব মঞ্চ
শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যুর পর দুই দফা দাবি জানালেও তা পূরণ হয়নি বলে জানিয়েছে ইনকিলাব মঞ্চ। সোমবার দুপুর ১২টায় একটি সংবাদ সম্মেলন করে নিজেদের কর্মসূচি ঘোষণা করবে প্লাটফর্মটি। আজ রবিবার এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়েছে তারা।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, দশ লক্ষাধিক মানুষের উপস্থিতি ও উচ্চকিত সম্মতিতে ঘোষিত ইনকিলাব মঞ্চের ২ দফা দাবির ১ দফাও মানা হয় নাই। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা ও সহ-স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত থেকে ব্যাখ্যা দেয় নাই। সিভিল-মিলিটারি গোয়েন্দা সংস্থার ওপর প্রধান উপদেষ্টার পূর্ণ কর্তৃত্ব স্থাপনপূর্বক সেসব সংস্থা থেকে হাসিনার চরদের গ্রেপ্তার করা হয় নাই।
অ্যাডিশনাল আইজিপিকে দিয়ে সংবাদ সম্মেলন করিয়ে শহীদ ওসমান হাদিকে হত্যার ঘটনাকে তুচ্ছ ও অগুরুত্বপূর্ণ দেখানো হয়েছে। এই পরিপ্রেক্ষিতে আগামীর কর্মসূচি ও দাবি নিয়ে ইনকিলাব মঞ্চের সংবাদ সম্মেলন আহ্বান করছি।
এর আগে ২০ ডিসেম্বর (শনিবার) শাহবাগ থেকে দুই দফা কর্মসূচি ঘোষণা দেয় ইনকিলাব মঞ্চ।
তাদের দফাগুলো হলো-
১. ওসমান হাদিকে হত্যাকারী, হত্যার পরিকল্পনাকারী, সহায়তাকারীসহ সবাইকে গ্রেপ্তার করে বিচারের আওতায় নিয়ে আসতে হবে।
২. সিভিল মিলিটারি ইন্ট্যালিজেন্স আওয়ামী দোসরদের অতিদ্রুত গ্রেপ্তার করতে হবে।
একইসঙ্গে রোববার বিকেলের মধ্যে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা এবং সহকারী উপদেষ্টাকে জনগণের সামনে এসে জবাবদিহিতা করতে বলে ইনকিলাব মঞ্চ। তা না হলে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার পদত্যাগের দাবি জানাবে বলে ঘোষণা দেয় প্লাটফর্মটি।
এমকে
রাজনীতি
ঢাকা-৫ আসনকে মানবিক ও নিরাপদ গড়ার প্রত্যয়ে জামায়াত প্রার্থীর ইশতেহার ঘোষণা
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৫ আসনে জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত প্রার্থী মোহাম্মদ কামাল হোসেন, ন্যায় ও ইনসাফ ভিত্তিক নিরাপদ, সমৃদ্ধ, উন্নত ও মানবিক ঢাকা-৫ গড়ার প্রত্যয়ে নিয়ে তার নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছেন।
শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর নূর কমিউনিটি সেন্টারে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি তার নির্বাচনী ইশতেহার তুলে ধরেন।
“সবার জন্য শিক্ষা, কর্মসংস্থান, বাসস্থান ও স্বাস্থ্যসেবা” নিশ্চিত করার অঙ্গিকারে ১২ দফার ভিত্তিতে তিনি তার নির্বাচনী ইশতেহার স্থানীয় জনতার সামনে তুলে ধরেন।
ইশতেহারের ১২টি প্রধান দফা:
১. শিক্ষা: সবার জন্য মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতকরণ এবং নতুন সরকারি স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা। কওমি মাদ্রাসা শিক্ষার মানোন্নয়ন।
২. সুশাসন: স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার মাধ্যমে বৈষম্যহীন ও ইনসাফভিত্তিক সমাজ গঠন।
৩. দারিদ্র্য বিমোচন: কর্মহীন, গৃহহীন ও চিকিৎসা বঞ্চিতদের সংখ্যা শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনা।
৪. জুলাই বিপ্লব: ছাত্র-জনতার বিপ্লবে শহীদ ও আহতদের যথাযথ সম্মান প্রদান এবং পুনর্বাসন নিশ্চিত করা।
৫. অপরাধ নির্মূল: চাঁদাবাজি, দুর্নীতি, মাদক, কিশোর গ্যাং ও ইভটিজিং সম্পূর্ণ নির্মূল করা।
৬. নাগরিক সেবা: জলাবদ্ধতা নিরসন, খাল খনন, আধুনিক পয়ঃনিষ্কাশন ও মশক নিধন।
৭. স্বাস্থ্য: আধুনিক হাসপাতাল নির্মাণ ও ২৪/৭ জরুরি স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা।
৮. ইউটিলিটি: নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, নিরাপদ পানি, গ্যাস ও হাই-স্পিড ইন্টারনেট সুবিধা নিশ্চিত করা।
৯. অর্থনীতি: স্বনির্ভর অর্থনীতি ও পরিবারভিত্তিক কর্মসংস্থান প্রকল্প চালু করা।
১০. নিরাপত্তা: নারী ও শিশুদের জন্য নিরাপদ শহর গড়ে তোলা।
১১. শিল্প ও যোগাযোগ: বন্ধ কলকারখানা পুনরায় চালু এবং এলাকার অভ্যন্তরীণ রাস্তার উন্নয়ন।
১২. অধিকার ও স্বাধীনতা: সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, মানবাধিকার ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা।
ইশতেহার ঘোষণা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরা সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের নায়েবে আমীর আব্দুস সবুর ফকির, মহানগরীর কর্মপরিষদ সদস্য অধ্যাপক মোকাররম হোসাইন খান, মহানগরীর কর্মপরিষদ সদস্য ও বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সভাপতি ঢাকা-৫ আসন কমিটির পরিচালক আব্দুস সালাম, যাত্রাবাড়ী পূর্ব থানা আমীর ও ঢাকা-৫ আসন কমিটির সদস্য সচিব মো. শাহজাহান খান, ডেমরা মধ্য থানা আমীর মোহাম্মদ আলী, নেজামে ইসলাম পার্টির নায়েবে আমীর মোখলেছুর রহমান, এবি পার্টির সমন্বয়ক লুৎফুর রহমান, এনসিপির ঢাকা মহানগরীর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক দ্বীন ইসলাম মিন্টুসহ ১১ দলীয় জোটের স্থানীয় নেতৃবৃন্দ।
ইশতেহার ঘোষণা শেষে মোহাম্মদ কামাল হোসেন স্থানীয় বাসিন্দাদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে বলেন, নির্বাচিত হলেঅগ্রাধিকার ভিত্তিতে সমস্যা সমাধানের কর্মপরিকল্পনা ব্যাখ্যা করেন। তিনি ভোটারদের উদ্দেশ্যে বলেন, একটি মানবিক ও সমৃদ্ধ ঢাকা-৫ গড়তে ইনসাফ কায়েমের বিকল্প নেই।
নাইম
রাজনীতি
ইনকিলাব মঞ্চের জাবের গুলিবিদ্ধ
ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব আব্দুল্লাহ আল জাবের গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে এক বার্তায় এ তথ্য জানিয়েছে ইনকিলাব মঞ্চ। বার্তায় বলা হয়, জাবের ভাই গুলিবিদ্ধ। জুমা -শান্তাকে বুট দিয়ে পাড়ানো হইছে।
তাদের দাবি, সংগঠনের নেত্রী জুমাকে এবং শহীদ ওসমান হাদির স্ত্রীকে আঘাত করা হয়েছে। আরেক পোস্টে ইনকিলাব মঞ্চ জানিয়েছে, আপাতত কোনো জমায়েত করবেন না।
আমরা চিকিৎসা নিয়ে আবার রাজপথে আসব। সেই পর্যন্ত নিরাপদে থাকার আহ্বান জানাই।
শহীদ শরীফ ওসনান হাদি হত্যার বিচারের দাবিতে গতকাল বৃহস্পতিবার থেকে যমুনার সামনে অবস্থান করছে ইনকিলাব মঞ্চের নেতারা।
শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি) বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে রাজধানীর ইন্টারকন্টিনেন্টাল মোড়ে এ সংঘর্ষ হয়।
এদিকে, আব্দুল্লাহ আল জাবেরের ফেসবুক আইডিতে থেকে জানানো হয়, শতাধিক আহত ও জাবের গুলিবিদ্ধ হয়েছেন।
শান্তভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলার আহ্বান জানিয়ে বলা হয়, আপাতত কোনো জমায়েত করবেন না। আমরা চিকিৎসা নিয়ে আবার রাজপথে আসব।
এমএন
অন্যান্য
বিএনপির ইশতেহার ঘোষণা, যা আছে এতে
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি দেশব্যাপী অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এ উপলক্ষে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’— এই স্লোগান নিয়ে নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা করেছে বিএনপি।
শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি) বিকেল ৪টার দিকে রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে মূল ইশতেহার পাঠ করেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
এর আগে, বিকেল পৌনে ৪টার দিকে পবিত্র কোরআন তিলাওয়াতের মধ্য দিয়ে শুরু হয় এ ইশতেহার ঘোষণা অনুষ্ঠান। এতে সভাপতিত্ব করেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং সঞ্চালনার দায়িত্বে ছিলেন নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম খান।
বিএনপিঘোষিত ‘রাষ্ট্র কাঠামো মেরামতের ৩১ দফা’, প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের ‘১৯ দফা’, বেগম খালেদা জিয়ার ‘ভিশন-২০৩০’ এবং ‘জুলাই জাতীয় সনদ’-এর সমন্বয়ে তৈরি করা হয়েছে ইশতেহারটি।
দুর্নীতিবিরোধী কঠোর অবস্থান, মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের নির্ভুল তালিকা প্রণয়ন এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বিচার নিশ্চিত করার মতো বিষয়গুলোকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বিএনপির এই ইশতেহারে।
পাঠকদের সুবিধার্থে পুরো ইশতেহারটি হুবহু তুলে ধরা হলো—
প্রথম অধ্যায়: রাষ্ট্র ব্যবস্থার সংস্কার
গণতন্ত্র
গণতন্ত্রে বিশ্বাসী বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি রাষ্ট্র পরিচালনার মূল দর্শন হবে— ‘সবার আগে বাংলাদেশ’। মহান আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাসের ভিত্তিতে ইনসাফ-ভিত্তিক, মানবিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনে বিএনপি অঙ্গীকারবদ্ধ। মহান স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা, ‘গণতন্ত্রের মাতা’ দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ভিশন-২০৩০, বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের রাষ্ট্র মেরামতের ৩১ দফা এবং ‘জুলাই জাতীয় সনদে’ যে সকল বিষয়ে যে আঙ্গিকে ঐকমত্য ও স্বাক্ষরিত হয়েছে, সেগুলো সেভাবে বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার প্রদান করা হবে।
ভোটকে রাষ্ট্রক্ষমতার একমাত্র বৈধ উৎস হিসেবে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা এবং নির্বাচন ব্যবস্থা ও সংবিধানে প্রয়োজনীয় সংস্কারের মাধ্যমে টেকসই গণতান্ত্রিক কাঠামো গড়ে তোলা হবে। ফ্যাসিবাদ ও বিদেশি তাঁবেদারিত্বের কোনো পুনরাবৃত্তি আর হতে দেওয়া হবে না। সমাজের সব স্তরে বিদ্যমান বৈষম্য দূর করে সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হবে। রাষ্ট্রের প্রত্যেক স্তরে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে একটি প্রকৃত ‘জনকল্যাণমূলক সরকার’ গঠন করা হবে এবং একই সঙ্গে গণমাধ্যম ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংরক্ষণ ও বিকাশে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে।
মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই গণঅভ্যুত্থান
মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব অর্জিত হয়েছিল ১৯৭১ সালে। ১৯৭৫ সালে সিপাহী-জনতার বিপ্লব ও ১৯৯০ সালে ছাত্র গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। রক্তার্জিত সেই স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব এবং বিপ্লব ও অভ্যুত্থানে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত সেই গণতন্ত্র আবার রক্ষা ও সমৃদ্ধ করার ক্ষেত্র প্রস্তুত করা হয়েছে ২০২৪ সালে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে।
রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে নিবিড় জরিপের ভিত্তিতে মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের নির্ভুল তালিকা প্রণয়ন করে মুক্তিযোদ্ধাদের রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ও স্বীকৃতি নিশ্চিত করা হবে। মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস তুলে ধরা ও এর স্মৃতি সংরক্ষণ করা হবে। মুক্তিযোদ্ধা উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগে উৎসাহ দেওয়া হবে। জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে শহীদদের নিজ-নিজ এলাকায় তাদের নামে সরকারি স্থাপনার নামকরণ করা হবে। গণঅভ্যুত্থানে ও ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে যেসব গণতন্ত্রকামী ব্যক্তি পঙ্গু হয়েছেন, চোখ হারিয়েছেন তাদেরকেও স্বীকৃতি, সুচিকিৎসা ও কর্মসংস্থানে সহায়তা প্রদান করা হবে। শহীদ পরিবার ও যোদ্ধাদের সার্বিক সহায়তা প্রদান এবং তাদের কল্যাণে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীন একটি পৃথক বিভাগ প্রতিষ্ঠা করা হবে।
সাংবিধানিক সংস্কার
সংবিধান সংস্কারের বিষয়ে বিগত ১৭ অক্টোবর ২০২৫ইং তারিখে জুলাই জাতীয় সনদ যে আঙ্গিকে ঐকমত্য ও স্বাক্ষরিত হয়েছে, সেগুলো সে মতে বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
আমরা পাহাড়ে সমতলে যারাই আছি, আমাদের একটাই পরিচয় আমরা সবাই বাংলাদেশী। জাতির সকল অংশ তথা ধর্মীয়, আঞ্চলিক ও নৃ-গোষ্ঠীগত পরিচয় এবং নারী পুরুষ নির্বিশেষে সব শ্রেণি ও গোষ্ঠীর মানুষকে নিয়ে একটি সুসংহত জাতি গঠন করাই বিএনপি’র লক্ষ্য। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে রাজনৈতিক ও সামাজিক বিভাজনের অবসান ঘটানো হবে। ৩১ দফা ঘোষিত ‘ন্যাশনাল রিকনসিলিয়েশন কমিশন’ এর আলোকে ভুক্তভোগীকেন্দ্রিক ও পুনর্বাসনমূলক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় একটি ‘ট্রুথ অ্যান্ড হিলিং কমিশন’ গঠনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।
সুশাসন
বিএনপি মনে করে, সুশাসন হলো গণতন্ত্র ও উন্নয়নের মূল ভিত্তি। রাষ্ট্রের সর্বস্তরে আইনের শাসন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হবে। শাসন ও বিচার ব্যবস্থার ভিত্তি হবে ইনসাফ। সকল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে মেধাভিত্তিক, স্বচ্ছ, দক্ষ ও জনবান্ধব জনপ্রশাসন গড়ে তোলা হবে। দুর্নীতি ও অর্থপাচার দমন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি মহান মুক্তিযুদ্ধের মূলমন্ত্র সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার প্রতিষ্ঠা করা বিএনপির সুশাসন দর্শনের মূল। দুর্নীতি দমন এবং আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণই হবে সর্বপ্রথম অগ্রাধিকার।
২০০১ সালে দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশের দায়িত্ব নিয়ে দুর্নীতি দমনে বিএনপি সরকারের কঠোর পদক্ষেপের ফলে বাংলাদেশ সারাবিশ্বে দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার কলঙ্ক থেকে মুক্তি পায়। ২০০৬ সালের অক্টোবর মাসে বিএনপি যখন রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে বিদায় নেয় তার অনেক আগেই বিশ্বে দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়নের অপবাদ থেকে মুক্ত হয়ে বাংলাদেশ ইমার্জিং টাইগার হিসেবে স্বীকৃতি পায়। তারই ধারাবাহিকতায় বিএনপি দুর্নীতির সাথে কোন আপস করবে না। সমাজের সর্বস্তরে দুষ্টক্ষতের মত ছড়িয়ে পড়া দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরার জন্য পদ্ধতিগত ও আইনের সংস্কারের পাশাপাশি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হবে। উন্মুক্ত দরপত্র, রিয়েল-টাইম অডিট, সরকারি ব্যয় ও প্রকল্পের ‘পারফরম্যান্স অডিট’ এবং সিঙ্গেল-উইন্ডো ক্লিয়ারেন্স বাস্তবায়ন করা হবে। অর্থপাচার রোধ ও ফ্যাসিস্ট আমলের পাচারকৃত অর্থ দেশে ফেরত আনতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।
আইনের শাসনের নামে কোনো প্রকার কালা-কানুনের শাসন কিংবা বেআইনি নিপীড়ন গ্রহণযোগ্য হবে না। বিশেষ ক্ষমতা আইন ১৯৭৪ বাতিল করা হবে। জুলাই-আগস্ট-২০২৪ গণ-অভ্যুত্থানসহ ফ্যাসিস্ট আমলের মানবতাবিরোধী অপরাধের সুবিচার নিশ্চিত করা হবে। যে সকল হত্যাকাণ্ডের অনুসন্ধান শুরু হয়নি, সে সকল হত্যাকাণ্ডের অনুসন্ধান শুরু করে দায়ী ব্যক্তিদের দ্রুত বিচারের মুখোমুখি করা হবে। গুম প্রতিরোধে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। মেধাভিত্তিক ‘মেরিটোক্রেসির বাংলাদেশ’ গড়তে স্বচ্ছভাবে সরকারি নিয়োগ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা হবে। প্রশাসনিক সংস্কার কমিশন গঠন ও পিএসসি-কে শক্তিশালীকরণ, জবাবদিহিমূলক ও দলীয়করণমুক্ত জনপ্রশাসন প্রতিষ্ঠা করা হবে। বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হবে। দ্রুত ও হয়রানিমুক্ত বিচার প্রাপ্তি ও বিচারসেবার আধুনিকায়ন করা হবে। বিচারপতি নিয়োগ আইন প্রণয়ন ও জুডিশিয়াল কমিশন গঠন করা হবে। সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের ধারাবাহিকতা রক্ষা করা হবে। একই সঙ্গে পুলিশকে জনবান্ধব ও সেবাবান্ধব হিসেবে গড়ে তোলা হবে। পুলিশের নৈতিক মনোবল পুনর্গঠন, অনলাইন অভিযোগ দায়ের ব্যবস্থা সম্প্রসারণ এবং পুলিশ কমিশন আইন পুনঃনিরীক্ষণ করা হবে।
স্থানীয় সরকার
বিএনপি বিশ্বাস করে, স্থানীয় সরকার হল গণতন্ত্র ও উন্নয়নের প্রাণকেন্দ্র। ক্ষমতা ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন শুধুমাত্র রাজধানী-কেন্দ্রিক না রেখে গ্রাম ও শহরের স্থানীয় নেতৃত্বের হাতে দায়িত্ব প্রদান করা হলে জনমুখী, কার্যকর ও টেকসই উন্নয়ন সম্ভব। উন্নয়ন কার্যক্রম, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা কার্যক্রমসহ জনগণের জন্য পরিষেবা প্রদানে স্থানীয় সরকার প্রশাসনকে ক্ষমতায়িত করে স্থানীয় সমস্যা স্থানীয় পর্যায়েই সমাধান করা এবং জনগণকে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক সেবা প্রদানই বিএনপির লক্ষ্য।
স্থানীয় সমস্যা স্থানীয় পর্যায়েই সমাধানের নীতি অনুসরণ করে শক্তিশালী ও কার্যকর স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে, যেখানে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহিতা বৃদ্ধি করে খবরদারিমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা হবে। পর্যাপ্ত অর্থায়নের মাধ্যমে জনগণের হাতে প্রকৃত ক্ষমতা ন্যস্ত করা হবে এবং বছরে অন্তত একবার উন্নয়ন কার্যক্রম নিয়ে উন্মুক্ত জনসভা আয়োজন করা হবে। পাশাপাশি বিলবোর্ডসহ উন্মুক্ত মাধ্যমে স্থানীয় সেবাসংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ করে স্বচ্ছতা ও জনঅংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হবে।
দ্বিতীয় অধ্যায়: বৈষম্যহীন আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও টেকসই রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা অর্জন
দারিদ্র্য নিরসস ও সামাজিক সুরক্ষা
বিএনপি মানবিক, ন্যায়সঙ্গত ও মর্যাদাভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা কাঠামো গড়ে তোলার অঙ্গীকার করছে, যেখানে রাষ্ট্র প্রতিটি নাগরিকের জীবন ও জীবিকা রক্ষায় দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখবে। বিএনপি পর্যায়ক্রমে দেশের প্রতিটি পরিবারকে দিবে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ এবং কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, মৎস্যচাষী ও প্রাণিসম্পদ খামারীদের ‘কৃষক কার্ড’ প্রদান করবে। দারিদ্র্য নিরসন ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সামাজিক সুরক্ষার আওতা সম্প্রসারণ ও সুশাসন বাস্তবায়ন করা হবে। ভাতার পরিমাণ বৃদ্ধি এবং বেসরকারি খাতে নিয়োজিত ব্যক্তিদের জন্য বার্ধ্যক্যের দুর্দশা লাঘবের জন্য একটি কার্যকর পেনশন ফান্ড গঠন করা হবে। দারিদ্র্য-পীড়িত ও পশ্চাৎপদ অঞ্চলে টেকসই কর্মসংস্থান সৃষ্টি, প্রতিবন্ধী মানুষবান্ধব জাতীয় নাগরিক সেবা প্রতিষ্ঠা, পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইনের কার্যকর বাস্তবায়ন এবং পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। পাশাপাশি হতদরিদ্র এতিম শিশুদের কল্যাণে একটি বিশেষ তহবিল গঠন করা হবে।
নারীর ক্ষমতায়ন
বিএনপি বিশ্বাস করে, দেশের উন্নয়ন নারীর ক্ষমতায়ন ছাড়া অসম্পূর্ণ। নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে পরিবারপ্রধান নারীর নামে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ প্রদান করা হবে। স্নাতকোত্তর পর্যন্ত বিনামূল্যে শিক্ষা এবং নারীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিকাশে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। নীতিনির্ধারণে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি, প্রজনন ও মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা সম্প্রসারণ এবং লিঙ্গভিত্তিক ও অনলাইন সহিংসতা, বিদ্বেষ ও বুলিং প্রতিরোধে কঠোর আইন প্রয়োগ করা হবে। একই সঙ্গে ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হবে। ইউনিয়ন পর্যায়ে বিশেষায়িত ‘নারী কল্যাণ কেন্দ্র’ প্রতিষ্ঠা, নারী উদ্যোক্তাদের আর্থিক ও দক্ষতা উন্নয়ন সহায়তা, আনুষ্ঠানিক খাতে নারী কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, কর্মস্থলে ডে-কেয়ার ও ব্রেস্টফিডিং কর্নার স্থাপন করার ব্যবস্থা নেয়া হবে। স্বাস্থ্য ও হাইজিনের জন্য মাধ্যমিক, মাদ্রাসাসহ সকল সমমানের শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানে ভেন্ডিং মেশিন স্থাপনের মাধ্যমে নারীবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলা হবে।
কৃষক, কৃষি উন্নয়ন ও নিরাপদ খাদ্য
কৃষক ও কৃষি উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিয়ে কৃষক কার্ডের মাধ্যমে সার্বিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা হবে, ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত সুদসহ কৃষি ঋণ মওকুফ ও ক্ষুদ্রঋণের এক বছরের কিস্তি সরকার পরিশোধ করবে। বরেন্দ্র প্রকল্প পুনঃচালু, আম সংরক্ষণে হিমাগার, খাল খনন, কৃষি বীমা, ফসলের ন্যায্যমূল্য ও কৃষিজমি সুরক্ষা, সরকারি ক্রয়কেন্দ্র স্থাপন করে ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা হবে। উত্তরাঞ্চলে কৃষিপণ্য রপ্তানি অঞ্চল গড়ে তোলা হবে। অঞ্চলভিত্তিক উৎপাদন ও গবেষণা, এগ্রোপ্রেনারশীপ স্টার্টআপ চালু করা হবে। সমবায় পুনরুজ্জীবন এবং জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবেলার কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।
প্রাণীসম্পদ উন্নয়নে নিরাপদ ফিড উৎপাদন, ভ্যাক্সিন প্ল্যান্ট স্থাপন, পোল্ট্রি, মাংস ও ডেইরি শিল্পের প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে নীতি সহায়তা ও সরকারি প্রণোদনা করা হবে। প্রতি উপজেলায় পর্যাপ্ত পশু-রোগ প্রতিষেধক ঔষধের যোগান নিশ্চিত করা এবং পশু-রোগ চিকিৎসক নিয়োগ দেয়া হবে। মৎস্য খাত উন্নয়নে জলমহাল, উপকূলীয় খাল ও হাওরের ইজারা প্রথা বিলুপ্ত করে এগুলো ‘জাল যার জলা তার’ এই নীতির ভিত্তিতে স্থানীয় মৎস্যজীবী ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য উন্মুক্ত করা হবে। জেলেদের মৎস্য আহরণের নিষিদ্ধ মৌসুমে বিকল্প কর্মসংস্থান ও খাদ্য সহায়তা জোরদার করা হবে। উন্নত মাছের প্রজাতি উদ্ভাবন, মানসম্মত ফিড উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাত শিল্প সম্প্রসারণে গুরুত্ব দেওয়া হবে। একই সঙ্গে ভেজাল প্রতিরোধ, নিরাপদ ফসল উৎপাদন, মনিটরিং জোরদার করে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা হবে। এই লক্ষ্যে খাদ্য ও ঔষধ নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ গঠন করা হবে। খাদ্য আমদানিতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করা হবে।
দেশব্যাপী কর্মসংস্থান
দেশব্যাপী কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সরকারি এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ চালু করা হবে। বেকারভাতা প্রদান এবং কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়-মাদ্রাসা, হাইস্কুল, সরকারি অফিস, গ্রামীণ ডিজিটাল সেন্টার, হাসপাতাল, রেলস্টেশন ও বিমানবন্দরসহ নির্দিষ্ট জনবহুল স্থানে বিনামূল্যে ইন্টারনেট চালু করা হবে। বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য ভাষা ও দক্ষতা প্রশিক্ষণ, চাহিদাভিত্তিক ও যুগোপযোগী শিক্ষা, উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষণ ও ক্যারিয়ার সেন্টার স্থাপন করা হবে। মেধাভিত্তিক সরকারি নিয়োগ এবং তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর নতুন শিল্প গড়ে তোলা হবে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সহায়তা, স্টার্ট-আপ ও উদ্ভাবন উৎসাহ, উন্নয়ন প্রকল্পে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, রপ্তানি খাতের বৈচিত্র্য, ব্যবসা সহজীকরণ, ট্যাক্স ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও প্রণোদনা, শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ ও আন্তর্জাতিক পেমেন্ট সুবিধা সম্প্রসারণের মাধ্যমে টেকসই কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ও অপ্রাতিষ্ঠানিক অর্থনীতিকে সহায়তা করে সমঅধিকার ও অন্তর্ভুক্তিমূলক কর্মসংস্থান গড়ে তোলা হবে।
যুব উন্নয়ন
যুব উন্নয়নে আইটি পার্কে অফিস স্পেস ও ফ্রি ওয়াইফাই, ফ্রিল্যান্সিং ও আউটসোর্সিং প্রশিক্ষণ, এসএমই ঋণ এবং অ্যামাজন-আলিবাবার সঙ্গে সংযুক্তকরণ প্রদান করা হবে। বিদেশি ভাষা শিক্ষা, স্টার্ট-আপ ফান্ড, যুব দক্ষতা উন্নয়ন অগ্রাধিকার পাবে, মাধ্যমিক পর্যায়ে কারিগরি শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা হবে এবং ডিজিটাল দক্ষতা, ক্যারিয়ার পোর্টাল ও জব ম্যাচিং সেবা চালু করা হবে। জাতীয় ডিজিটাল স্কিলস অথরিটি গঠন করে ডেমোগ্রাফিক ও লংজেভিটি ডিভিডেন্ডের সুবিধা অর্জনে যুবকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
শিক্ষা ও মানব সম্পদ উন্নয়ন
শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়নে জিডিপির পাঁচ শতাংশ বরাদ্দ নিশ্চিত করে প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত সমগ্র শিক্ষাখাতকে উন্নত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করা হবে। শিক্ষার সকল স্তরে জোর প্রদান করা হবে, তবে প্রাথমিক শিক্ষায় জোর দেওয়া হবে বেশি। পুঁথিগত শিক্ষার পাশাপাশি মৌলিক মূল্যবোধ শিক্ষায় গুরুত্বারোপ করা হবে। ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব, মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম, লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস, বাধ্যতামূলক তৃতীয় ভাষা শিক্ষা, সবার জন্য কারিগরি শিক্ষা, ক্রীড়া ও দেশীয় সংস্কৃতি শিক্ষায় গুরুত্বারোপ করা হবে। পাশাপাশি, সবার জন্য পরিচ্ছন্ন ও সুন্দর পরিবেশ নিশ্চিতকরণ, স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট নির্মাণ এবং সারাদেশে পর্যায়ক্রমে প্রান্তিক ও দুর্গম এলাকার শিক্ষার্থীদের জন্য ‘দুপুরের খাবার (মিড-ডে মিল)’ চালুর উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। শিক্ষাখাতে সামাজিক ও ভৌগোলিক বৈষম্য নিরসণের উদ্যোগ নেওয়া হবে। দৈহিক, মানসিক এবং আবেগগতভাবে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের যথোপযুক্ত শিক্ষা অর্জনের জন্য যথাযথ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ, বিশেষ শিক্ষা ব্যবস্থা এবং শিক্ষা উপকরণসহ পর্যাপ্ত সুযোগ নিশ্চিত করা হবে। প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষকদের আকর্ষণীয় বেতন, সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি এবং তাঁদের বিশেষ প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আওতায় আনা হবে। রাষ্ট্রীয় দিবসগুলোতে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্কুল এবং মাদ্রাসা শিক্ষকদের আমন্ত্রণ জানানোর উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।
ফ্রি ওয়াইফাই, বিনামূল্যে স্কুল ড্রেস, শিক্ষা সংস্কার কমিশন গঠন, পৃথক শিক্ষা চ্যানেল চালুকরণ, গ্রীষ্মের ছুটির কার্যমুখী ব্যবহার, ওয়ান চাইল্ড, ওয়ান ট্রি কর্মসূচি, এডু আইডি প্রদান এবং শিক্ষার্থীদের পোষ্য প্রাণী পালন উৎসাহিত করা হবে। মাদ্রাসা শিক্ষাকে আধুনিক ও যুগোপযোগী করা, কওমী সনদ স্বীকৃতি ও হাফেজে কুরআনের সম্মান প্রদান করা হবে। গবেষণায় পর্যাপ্ত বরাদ্দ নিশ্চিতকরণ, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়কে আটটি আঞ্চলিক শাখায় বিভক্তকরণ ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের মান উন্নয়ন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে করমুক্ত রাখা হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আবাসন ও লাইব্রেরি সমস্যা দূরীকরণে জরুরি ভিত্তিতে উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে সম্পূর্ণভাবে সন্ত্রাস ও মাদকমুক্ত করার কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে নারী শিক্ষার্থীদের জন্য পর্যাপ্ত কমনরুম ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা সামগ্রী সংবলিত বিশেষ ‘ভেন্ডিং মেশিন’ স্থাপনের প্রয়াস নেয়া হবে। ইন্টার্নশিপ ও ইন্ড্রাস্ট্রি-একাডেমিয়া সহযোগিতা, সিড ফান্ডিং ও ইনোভেশন গ্রান্ট, বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য স্টুডেন্ট লোন এবং ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি ও এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রামের মাধ্যমে শিক্ষার সর্বাত্মক উন্নয়ন ও সম্ভাব্যতা নিশ্চিত করা হবে।
স্বাস্থ্যসেবা
স্বাস্থ্যসেবায় জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দ নিশ্চিত করা হবে। ই-হেলথ কার্ডের মাধ্যমে প্রতিটি নাগরিককে বিনামূল্যে মানসম্মত প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করা হবে। প্রতিটি জেলায় আধুনিক সেকেন্ডারি স্বাস্থ্যসেবা ইউনিট স্থাপন, এক লক্ষ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ এবং দুর্নীতিমুক্ত সেবা নিশ্চিত করা হবে। মা ও শিশুর পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যসেবা, রোগ প্রতিরোধ, স্বাস্থ্য সচেতনতা, প্রাণঘাতী রোগের চিকিৎসায় পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ তৈরি করা হবে। ঔষধ ও ভ্যাকসিন সরবরাহ নেটওয়ার্ক, মশাবাহিত রোগ নির্মূল, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, স্যানিটেশন ও পুষ্টি সচেতনতা এবং নিরাপদ পানি সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে।
জাতীয় অ্যাম্বুলেন্স পুল ও জরুরি সেবা নেটওয়ার্ক গঠন, স্বাস্থ্যখাতে অটোমেশন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ই-প্রেসক্রিপশন ও প্রেসক্রিপশন অডিট, স্বাস্থ্যখাতে জাতীয় অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল গঠন করা হবে। স্বাস্থ্যকর্মীদের মর্যাদা, নিরাপত্তা ও উন্নয়ন নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি সহিংসতা প্রতিরোধ, মেডিকেল বর্জ্যের নিরাপদ ব্যবস্থাপনা, সমন্বিত আধুনিক পুষ্টি কর্মসূচি এবং তামাকজনিত অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে উদ্যোগ নেওয়া হবে।
শ্রম ও শ্রমিক কল্যাণ
মুদ্রাস্ফীতির আলোকে শ্রমিকদের (প্রাইস-ইনডেক্স বেইজড) ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা হবে। অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের যৌক্তিক মজুরি ও সামাজিক সুরক্ষা, রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পে পেনশন ব্যবস্থা এবং ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার সুরক্ষা নিশ্চিত করা হবে। বন্ধশিল্প পুনরায় চালু, শ্রমিকদের ন্যায্যমূল্যে খাদ্য সরবরাহ এবং সকল শ্রমিকের জন্য একই কাজে সমান মজুরি নিশ্চিত করা হবে। নারী শ্রমিক-কর্মজীবীদের ছয় মাস সবেতন মাতৃত্বকালীন ছুটি, ন্যায়বিচারের স্বার্থে শ্রম আদালতের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং শ্রমিকদের পেশাগত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা হবে। এছাড়া দুর্ঘটনা প্রতিরোধ, শিশু শ্রম ও জবরদস্তিমূলক শ্রম বন্ধ, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের শ্রমিক উন্নয়ন, কর্মজীবী নারীর সুরক্ষা, শ্রমিক-মালিক সম্পর্ক উন্নয়ন, চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা এবং কর্মক্ষেত্রে দূর্ঘটনার শিকার শ্রমিকদের যথাযথ পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণ প্রদানের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও প্রবাসী কল্যাণ
পাঁচ বছরে এক কোটি জনশক্তি বিদেশে প্রেরণ করা হবে। উপজেলায় তালিকাভুক্তদের প্রশিক্ষণ, ভাতা প্রদান ও দরিদ্রদের শূন্য/ ন্যূনতম খরচে প্রবাসে প্রেরণ করা হবে। ১০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত সহজ শর্তে ঋণ প্রদান করা হবে। বিমানবন্দর ও দূতাবাসে ঝামেলামুক্ত সম্মানজনক সেবা নিশ্চিত করা হবে। প্রবাসীদের ‘প্রবাসী কার্ড’ দেয়া হবে, যাতে তথ্য, দক্ষতা ও চাকরির শর্ত সংরক্ষণ থাকবে। ব্যাংক পেমেন্ট গেটওয়েতে যুক্ত থাকবে, থাকবে সহজ রেমিটেন্স প্রেরণের সুবিধা। রেমিটেন্সে বাড়তি প্রণোদনা পাওয়া যাবে এবং দেশে ফেরত প্রবাসীদের সামাজিক সুরক্ষা প্রদান করা হবে। প্রবাসী বাংলাদেশীদের প্রবাসী কল্যাণ ফাউণ্ডেশনের সদস্যপদ দেয়া হবে। মৃত্যু/দুর্ঘটনা/চাকরি হারালে সহায়তা দেয়া হবে। উদ্যোক্তা সহায়তায় এসএমই/ভেঞ্চার ক্যাপিটাল প্রাপ্তির সুযোগ থাকবে। দেশে ফেরত প্রবাসীদের কর্মসংস্থান ও পরিবারের শিক্ষা-স্বাস্থ্য সুরক্ষা দেয়া হবে। পুনরায় বিদেশযাত্রায় সহায়তা দেয়া হবে।
অভিবাসন ব্যয় যুক্তিসংগতকরণ, এয়ারপোর্টগুলোতে দ্রুত ট্রলি সংকট নিরসণ, খাবারের মান উন্নয়নে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। প্রবাসী ভাইবোনদের লাগেজ ফ্যাসিলিটির নিরাপত্তা নিশ্চিতকল্পে কঠোর নজরদারি কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে। প্রাবাসীদের মানবাধিকারসহ সব অধিকার আদায়ে কূটনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। প্রবাসী নারী শ্রমিকদের সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ ও মানবপাচার রোধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। ওভারসিজ স্কিলস ইনভেস্টমেন্ট পার্ক, মাইগ্রেশান মার্কেট রিসার্চ ইনস্টিটিউট ও ফরেন ল্যাঙ্গুয়েজ ই-লার্নিং সেন্টার স্থাপন করা হবে। দক্ষ কর্মীদের ডিজিটাল ডাটাবেজ তৈরি, ওয়েলফেয়ার বোর্ডের অধীনে ‘ওয়ান-স্টপ প্রবাসী সাপোর্ট সেন্টার’ স্থাপন এবং দূতাবাসগুলোতে সাপোর্ট সেন্টার ও লিগ্যাল ডিভিশন চালু করা হবে।
বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন জনগোষ্ঠী
বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন জনগোষ্ঠীর কল্যাণ নিশ্চিত করতে বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবা ইউনিট ও স্কুল প্রতিষ্ঠা, কারিগরি শিক্ষায় স্কলারশিপ প্রদান করা হবে। মোবাইল হেলথ ক্লিনিক এবং সহায়ক উপকরণ তৈরিতে প্রণোদনা প্রদান করা হবে। নিয়োগ প্রদানে ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানকে উৎসাহ দেওয়া, স্বতন্ত্র অধিদপ্তর গঠন করা হবে। প্রশিক্ষণ ও প্যারা অলিম্পিকের সহায়তা সম্প্রসারণ, প্রতিবন্ধী বিষয়ক আইন কার্যকর করা এবং প্রতিবন্ধীবান্ধব নাগরিক সেবা সম্প্রসারণ করা হবে। প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর সাংগঠনিক ও সৃজনশীল কাজে রাষ্ট্রীয় সহায়তা নিশ্চিত করা হবে।
পরিবেশ সংরক্ষণ ও টেকসই উন্নয়ন
পরিবেশ সংরক্ষণ ও টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ ও সবুজ কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা হবে। বিজ্ঞানভিত্তিক বৃক্ষরোপণ এবং বৃক্ষ রক্ষণাবেক্ষণে ‘ট্রি মনিটরিং অ্যাপ’ ব্যবহার করা হবে। দ্বীপ ও চরাঞ্চলে সবুজায়ন, ভবন নির্মাণে ‘সবুজ পরিমাপক’ মানদণ্ড ও ‘গ্রিন বিল্ডিং সার্টিফিকেশন’ প্রচলন করা হবে। ২০৩০ সালের মধ্যে ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন, ধান চাষে পানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তি ব্যবহার নিশ্চিত করা হবে। সবুজ স্বেচ্ছাসেবা, ‘ক্লাইমেট ইয়ুথ ফেলোশিপ’ ও ‘পরিবেশ স্টার্টআপ তহবিল’ গঠন করা হবে। পাশাপাশি কার্বন ক্রেডিট আয় এবং কার্বন ট্রেডিং মার্কেট গঠন করে অর্থনৈতিক টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা হবে।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও দূষণ নিয়ন্ত্রণ
শিল্পদূষণে আক্রান্ত এলাকাগুলির মৃত্তিকা ও জলাশয়গুলির পরিবেশ পুনরুদ্ধারে, ও বায়ুদূষণ হ্রাসে সরকার মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করবে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও দূষণ নিয়ন্ত্রণে ‘সার্কুলার ফিউচার মডেল’ বাস্তবায়ন করা হবে। অঞ্চলভিত্তিক ‘মেটেরিয়াল রিকভারি সেন্টার’ স্থাপন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা খাতে দুই লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা হবে। ‘থ্রি আর’ নীতি (রিডিউস, রিইউজ, রিসাইকেল) বাস্তবায়ন করা হবে, যার মাধ্যমে পাঁচ বছরের মধ্যে প্লাস্টিক বর্জ্য ৩০ শতাংশ কমানো হবে। বর্জ্য থেকে শক্তি উৎপাদন নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি শিল্প ও গৃহস্থালিতে পরিবেশবান্ধব উপকরণ ব্যবহারে উৎসাহ প্রদান করা হবে।
প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ
প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণে বনাঞ্চল, জলাভূমি ও চারণভূমি সংরক্ষণ করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। বনজ সম্পদ ও পাহাড় নিধনকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হবে। বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ও অভ্যয়ারণ্য রক্ষা করা হবে। বারবার সড়ক খোড়াখুড়ি বন্ধ, বেদখলকৃত নৈসর্গিক স্থান উদ্ধার এবং খাল ও নদীপাড়ে পরিকল্পিত ইকো-ট্যুরিজম উন্নয়ন গড়ে তোলা হবে।
পানি সম্পদ পরিকল্পনা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা
পানি সম্পদ পরিকল্পনা ও দূর্যোগ ব্যবস্থাপনায় ওয়াটার কনভেনশন-১৯৯৭ বাস্তবায়ন করা হবে। তিস্তা মহাপরিকল্পনা ও পদ্মা ব্যারেজ নির্মাণ করা হবে। স্বেচ্ছাশ্রম ও সক্রিয় অংশগ্রহণের ভিত্তিতে ২০,০০০ কিলোমিটার নদী ও খাল খনন, পুনঃখনন ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প গ্রহণ করা হবে। কৃষিজমিতে লবনাক্ততা হ্রাস, যৌথ নদী কমিশন শক্তিশালীকরণ এবং পানি সংরক্ষণ নিশ্চিত করা হবে। বন্যা, ভূমিকম্প ও নদীভাঙ্গন রোধে সুরক্ষা প্রদান নিশ্চিত করা হবে। জাতীয় সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ ইউনিট গঠন, ফায়ার-রেসকিউ সেন্টার চালু এবং বিল্ডিং ফায়ার সেফটি কোড কার্যকর করা হবে। ভূমিকম্পজনিত-দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় একটি সর্বাত্মক ও পরিকল্পিত উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। বিদ্যমান সরকারী প্রতিষ্ঠানসমূহকে সহযোগিতা করার জন্য প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গড়ে তোলা হবে। ভূমিকম্পে আত্মরক্ষার করণীয় বিষয়ে সামাজিক সচেতনতামূলক প্রকল্প গ্রহণ করা হবে। ভূমিকম্প-উত্তর পুনরুদ্ধার ও পুনর্বাসনের জন্য যথাযথ প্রস্তুতি গ্রহণ করা হবে। পাশাপাশি, নদীভাঙ্গন রোধ এবং নদীভাঙ্গনে ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারের কর্মসংস্থান ও পুনর্বাসনের জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কর্মকৌশল গ্রহণ করা হবে।
প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা
বিএনপি বিশ্বাস করে-সুশৃঙ্খল, রাজনীতিমুক্ত ও যুগোপযোগী সক্ষমতায় গড়ে ওঠা প্রতিরক্ষা বাহিনীই কেবল দেশকে নিরাপদ রাখতে পারে। সশস্ত্র বাহিনী যেন উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক দায়িত্ব পালনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদারে সুশৃঙ্খল ও আধুনিক সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তুলে চতুর্মাত্রিক সক্ষমতা ও বিশ্বাসযোগ্য প্রতিরোধ ক্ষমতা নিশ্চিত করা হবে। বিএনপি একটি জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল প্রণয়ন করবে। উক্ত কৌশলের ভিত্তিতে সশস্ত্র বাহিনীর উন্নয়নে একটি সর্বাঙ্গীণ পরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে। ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির ভিত্তিতে মাল্টি-ডোমেন যুদ্ধ সক্ষমতা, স্থল, নৌ ও বিমান বাহিনীর শক্তিমত্তা এবং দেশীয় প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধিতে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। বিএনপি বিমান বাহিনীর উন্নয়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধিকে ‘জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ’ বিষয় হিসেবে বিবেচনা করে ফাস্ট ট্র্যাক প্রক্রিয়ায় কার্যকর পদক্ষেপ নেবে। সমুদ্র নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে সক্ষম নৌবাহিনী এবং দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পের উন্নয়ন করা হবে। পাশাপাশি, অবসরপ্রাপ্ত সশস্ত্রবাহিনীর সদস্যদের মধ্যে ন্যায়বিচার ও আর্থিক সমতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ‘ওয়ান র্যাঙ্ক ওয়ান পেনশন (ওআরওপি)’ নীতি প্রণয়ন করা হবে। পাশাপাশি, রেশনসহ অন্যান্য যৌক্তিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা হবে।
পররাষ্ট্রনীতি
বিএনপির পররাষ্ট্রনীতির মূল দর্শন-সবার আগে বাংলাদেশ’। বিএনপি বিশ্বাস করে, বাংলাদেশের সীমান্তের বাইরে বন্ধু আছে, কোনো প্রভু নেই। পররাষ্ট্রনীতির প্রতিটি ক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, জাতীয় স্বার্থ, জাতীয় নিরাপত্তা এবং জনগণের কল্যাণ সর্বাগ্রে প্রাধান্য পাবে। বিএনপি সকল রাষ্ট্রের সঙ্গে সমতা, ন্যায্যতা, বাস্তবধর্মী, পারস্পরিক স্বার্থের স্বীকৃতি ভিত্তিক এবং আন্তর্জাতিক বিধি-বিধান অনুযায়ী দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার ওপর জোর দেবে। বাংলাদেশ অন্য কোনো রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করবে না এবং অন্য কোনো রাষ্ট্রকেও বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে দেবে না। অর্থনৈতিক কূটনীতির ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হবে। গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক শক্তি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য অংশীদার দেশগুলোর সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক জোরদার করার জন্য নিরলসভাবে কাজ করা হবে। রপ্তানি বৈচিত্র্য বৃদ্ধি, নতুন বাজার অনুসন্ধান এবং শুল্ক ও বাণিজ্য সুবিধা রক্ষায় কার্যকর কূটনীতি গ্রহণ করা হবে। আমাদের প্রতিবেশীদের সাথে সমতা, সহযোগিতা ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সেই সম্পর্কের ভিত্তি হবে পারস্পারিক শ্রদ্ধা ও বোঝাপড়া, যা আমাদের সম্মিলিত অগ্রগতি নিশ্চিত করবে। এই বিষয়ে আমাদের উদ্যোগ এবং প্রচেষ্টা সর্বদা অব্যাহত থাকবে।
মুসলিম বিশ্বসহ জিসিসিভুক্ত দেশগুলোর সাথে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক জোরদার করা হবে। ইন্দোপ্যাসিফিক অঞ্চলের শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখা এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনে শক্তিশালী ভূমিকা গ্রহণ করা হবে। সম্পর্ক জোরদার করার জন্য আমরা এই অঞ্চলের অন্যান্য দেশের সাথে একসাথে কাজ করব। আসিয়ানের পূর্ণ সদস্যপদ অর্জন ও সার্ক কার্যকর করার প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে। সার্ক ও আসিয়ান অঞ্চলের পাশাপাশি আমেরিকা, ইউরোপ, প্রাচ্য, দূরপ্রাচ্য, আফ্রিকা ও ওশেনিয়া অঞ্চলের দেশ এবং অর্থনৈতিক জোটগুলোর সাথে দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক সহযোগিতা বৃদ্ধির প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে।
আন্তর্জাতিক অংশীদার এবং প্রতিবেশী দেশসমূহের সঙ্গে যৌথভাবে কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগ নিয়ে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বের পূর্ণ অধিকারসহ মিয়ানমারে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য শক্তিশালী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। পদ্মা, তিস্তা এবং বাংলাদেশের সকল আন্তঃসীমান্ত নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করা হবে। বাংলাদেশের জনগণের ওপর যে কোনো আঘাত স্বাভাবিকভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় বিধায় সীমান্ত হত্যা ও পুশ-ইন বন্ধসহ সকল অন্যায্য কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে জোরালো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। সীমান্তে চোরাচালান, মানব পাচার এবং মাদক পাচার কঠোরভাবে দমন করা হবে। সফট পাওয়ার কূটনীতি এবং ক্রীড়া কূটনীতিতে গুরুত্ব দেওয়া হবে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ও দূতাবাস সমূহে জনবল, ব্যবস্থাপনা, দক্ষতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য বাড়তি নিয়োগ, বিদেশে মিশন কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং বিভিন্ন পর্যায়ে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হবে।
সন্ত্রাসবাদ, জঙ্গিবাদ ও উগ্রবাদ
সন্ত্রাসবাদ, জঙ্গিবাদ ও উগ্রবাদের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতার নীতিতে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করে জাতীয় ঐকমত্য গড়ে তোলা হবে এবং আইনগত ব্যবস্থার পাশাপাশি সামাজিক ও প্রতিরোধমূলক কৌশল বাস্তবায়নের মাধ্যমে এসব হুমকি সম্পূর্ণরূপে দমন করা হবে।
তৃতীয় অধ্যায়: ভঙ্গুর অর্থনীতির পুনর্গঠন ও পুনরুদ্ধার
অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ণ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি
অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ণে অলিগার্কিক কাঠামো ভেঙ্গে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হবে। বিএনপি’র প্রধান উদ্দেশ্য হলো কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। ঋণ-নির্ভর অর্থনীতিকে বিনিয়োগ-নির্ভর অর্থনীতিতে রূপান্তরই হবে আমাদের মূল লক্ষ্য। কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও সম্পদ তৈরিতে বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতি হবে চালিকাশক্তি। ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ে তোলা হবে। দেশে রাজস্ব ও মুদ্রানীতির মধ্যে সমন্বয় সাধন করা হবে এবং ব্যবসা সহায়ক পরিবেশে গড়ে তুলতে কষ্ট অব ডুয়িং বিজনেস এবং ইজ অব ডুয়িং বিজনেস এর উন্নয়নকে সর্বাধিক প্রাধান্য দেওয়া হবে। হয়রানি ও জটিলতা নিরসনে সিঙ্গেল-উইন্ডো ক্লিয়ারেন্স ও ওয়ান স্টপ সার্ভিস বাস্তবায়ন করা হবে।
বিনিয়োগ ও বৈদেশিক প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ
বৈদেশিক প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ জিডিপির ২.৫ শতাংশ পর্যন্ত উন্নীতকরণ করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। নীতির আকস্মিক পরিবর্তন রোধ এবং বিডাতে ‘সিঙ্গেল উইন্ডো’ বাস্তবায়ন করা হবে। এফডিআই ক্যাপ্টেন নিয়োগ, ২৪/৭ সচল হেল্পডেস্ক, ভিসা ও ওয়ার্ক পারমিট সহজীকরণ, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের হয়রানিমুক্ত ও দ্রুত নিজ দেশে মুনাফার প্রত্যাবসান নিশ্চিত করা হবে। ভ্যাট ও কাস্টমস রিফান্ড ডিজিটালাইজেশন এবং অনুমোদন প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ ডিজিটাল করা হবে। বিনিয়োগকারীর সুরক্ষায় ‘ইনভেস্টর প্রোটেকশন রেগুলেশন’ প্রণয়ন এবং বাণিজ্যিক মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক আদালত স্থাপন করা হবে। শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে। ‘নেক্সট ফ্রন্টিয়ার ইকোনমি’ ব্র্যান্ডিংয়ে বৈশ্বিক প্রচারণা এবং অযৌক্তিক কর সংস্কার ও আন্তর্জাতিক পেমেন্ট সিস্টেম সহজীকরণ নিশ্চিত করা হবে।
বেসরকারি খাত উন্নয়ন
বেসরকারি খাতের উন্নয়নে সার্বিক নীতিগত সুবিধা প্রদান ও লাইসেন্স প্রক্রিয়া সহজীকরণ করা হবে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এবং স্টার্টআপের জন্য গ্যারান্টি স্কিম, ক্যাশ-ফ্লো ভিত্তিক ঋণ, ভেঞ্চার ক্যাপিটাল, ক্রাউডফান্ডিং এবং ইনস্যুরেন্স কভারেজ বৃদ্ধি করা হবে। এই খাতে স্বল্প সুদে ঋণের ব্যবস্থা করা হবে। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতের জন্য বিশেষ ব্যাংকিং সেবার আওতা সম্প্রসারিত করা হবে। পরিবহন, লজিস্টিক্স, বিদ্যুৎ- এ সকল ক্ষেত্রে মৌলিক অবকাঠামো উন্নয়ন এবং বিদ্যমান শিল্পপার্কগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি করে যুব সম্প্রদায়ের স্টার্ট-আপগুলোর ছোট ছোট শিল্প ইউনিটকে সুবিধা প্রদান করা হবে। পাশাপাশি সৃজনশীল অর্থনীতি ও রপ্তানিমুখী শিল্পকে প্রণোদনা দিয়ে খাতের দ্রুত ও টেকসই বিকাশ নিশ্চিত করা হবে।
ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানখাত সংস্কার
ব্যাংক খাতের সুশাসন, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, সুদের হার যৌক্তিকীকরণ এবং আস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য কার্যকর নীতি প্রণয়ন করা হবে। জনগণের ঘাড় থেকে বাড়তি ট্যাক্সের বোঝা কমানো হবে। অবসায়িত ইসলামী ব্যাংকের আমানতকারীদের অর্থ ফেরত প্রদান করা হবে। ‘অর্থনৈতিক সংস্কার কমিশন’ গঠন করা হবে। এছাড়া আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহের শৃঙ্খলা, তদারকি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, বাংলাদেশ ব্যাংকের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও ক্ষমতায়ন, ব্যাংকিং ডিভিশন বিলুপ্ত করা হবে। ব্যাংকিং খাতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করা, অর্থলগ্নি প্রতিষ্ঠানগুলোর উচ্চ খেলাপি ঋণ (নন-পারফর্মিং লোন) সমস্যা পর্যালোচনা করে দায়ীদের আইনের আওতায় আনা এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর সমস্যা সমাধানে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বীমা খাতের উন্নয়ন নিশ্চিত করা হবে।
পুঁজিবাজার সংস্কার ও উন্নয়ন
পুঁজিবাজার সংস্কার ও উন্নয়নে সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের স্বাধীনতা ও স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করা হবে। পুঁজিবাজারের সংস্কারকল্পে একটি ‘পুঁজিবাজার সংস্কার কমিশন’ গঠন করা হবে। পাশাপাশি, গত ১৫ বছরে পুঁজিবাজারে সংঘটিত অনিয়ম তদন্তে একটি বিশেষ তদন্ত কমিশন গঠন করা হবে। শেয়ারবাজারে স্বচ্ছতা আনয়ন, কারসাজি বন্ধ, শক্তিশালী বন্ড ও ইক্যুইটি মার্কেট, কর্পোরেট বন্ড ও সুকুক গঠন করা হবে। প্রবাসীদের জন্য ইনভেস্টমেন্ট গেটওয়ে চালু, ব্লকচেইন প্রযুক্তি ব্যবহার ও বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা হবে। বাংলাদেশের সকল জায়গা থেকে মার্কেট প্রবেশাধিকারকে সহজলভ্য করা হবে। স্টার্টআপ ও এসএমই খাতের জন্য ‘ডিজিটাল আইপিও এক্সপ্রেস’ ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হবে। এছাড়া ‘পুঁজিবাজার ট্রাইব্যুনাল’ গঠন ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে পুঁজিবাজার সংক্রান্ত শিক্ষার প্রসার নিশ্চিত করা হবে।
বাণিজ্য সহজীকরণ ও আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণ
বাণিজ্য সহজীকরণ ও আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণে অর্থনীতি উদারীকরণ ও বিনিয়ন্ত্রিতকরণ করা হবে। রপ্তানি সম্প্রসারণ ও বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে দ্বিপাক্ষিক, বহুপাক্ষিক ও মিনিলেটালার পর্যায়ে কৌশলগত ফ্রি ট্রেড এগ্রিমেন্ট (এফটিএ) গঠনে অগ্রাধিকার দেয়া। জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষা নিশ্চিত করে কৃষি, শিল্প ও সেবা খাতের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে পর্যায়ক্রমে শুল্ক হ্রাস, অশুল্ক বাধা কমানো, বাজার প্রবেশাধিকার বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ সহযোগিতা জোরদার করা হবে। নতুন বাজার অনুসন্ধান, বাজার বিস্তৃতিকরণ এবং বাণিজ্য সম্প্রসারণে অর্থনৈতিক কূটনীতিতে গুরুত্বারোপ করা হবে। বাংলাদেশকে বিশ্ববাজারের ই-কমার্স হাবে পরিণত করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। অনলাইনভিত্তিক জায়ান্ট প্রতিষ্ঠান অ্যামাজন ই-বে কিংবা আলীবাবার মতো বিশ্বখ্যাত ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মের চাহিদা অনুযায়ী দেশে ক্ষুদ্র এবং মাঝারি শিল্পের উৎপাদন বৃদ্ধি করা হবে। বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলকে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বাণিজ্যের কৌশলগত কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দরকে কেন্দ্র করে সমন্বিত লজিস্টিক হাব প্রতিষ্ঠা করা হবে।
শিল্পখাত
শিল্প খাতের বিকাশে বিনিয়োগবান্ধব নীতি গ্রহণ করে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা হবে। যেসব বিনিয়োগে বিপুল কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়, সেই ধরনের প্রকল্পকে অগ্রাধিকার দেয়া হবে। শিল্পখাতে বিনিয়োগ সহজ করতে, কোম্পানি রেজিস্ট্রেশন থেকে শুরু করে ব্যাংকিং সাপোর্ট নিশ্চিতের লক্ষ্যে ‘ওয়ান স্টপ সার্ভিস’ বাস্তবায়ন করা হবে। পাটকল, বস্ত্রকল, চিনিকল সহ আওয়ামী দুঃশাসনে বন্ধ হয়ে যাওয়া মাঝারি ও বৃহৎ শিল্পসমূহের তালিকা প্রস্তুত করে সেগুলো পুনরায় চালুর দৃশ্যমান উদ্যোগ নেয়া হবে। এই লক্ষ্যে সরকার, মালিক ও শ্রমিক পক্ষের প্রতিনিধি এবং বিশেষজ্ঞ সমন্বয়ে টাস্কফোর্স গঠন করে দ্রুত সরকারী, পাবলিক-প্রাইভেট যৌথ মালিকানা কিংবা ব্যক্তিমালিকানায় সব বন্ধ শিল্প চালু করা হবে। রপ্তানিখাতে বৈচিত্র্য আনা হবে। বাণিজ্য ঘাটতি হ্রাস, ‘ন্যাশনাল ট্রেড কম্পিটিটিভনেস কাউন্সিল’ ও ‘কৌশলগত টেক্সটাইল ফান্ড’ গঠন, অর্থায়ন ও প্রণোদনা, ‘ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল স্ট্যাবিলাইজেশন ফান্ড’ এবং ‘ন্যাশনাল গ্রীন ইন্ডাস্ট্রিয়াল পলিসি’ কার্যকর করা হবে। পাশাপাশি, বিমসটেক, আসিয়ান এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে নতুন বাজার-সুবিধা ও বিভিন্ন খাতে প্রেফারেনশিয়াল চুক্তি সম্পাদনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।
কারু ও হস্তশিল্প এবং গ্রামীন অর্থনীতির উন্নয়ন
কারু ও হস্তশিল্প এবং গ্রামীণ অর্থনীতি উন্নয়নে ‘এক গ্রাম এক পণ্য’ প্রকল্পের মাধ্যমে হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য পুনরুদ্ধার করা হবে। নারী নেতৃত্বাধীন হস্তশিল্প উদ্যোক্তা অর্থনীতি উন্নয়ন এবং ক্ষুদ্র, কুটির ও মাঝারি শিল্পে লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা প্রদান করা হবে।
সেবাখাত
সেবাখাত উন্নয়নে সমন্বিত কৌশল গ্রহণ করে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা হবে। সেবাখাতকে একটি আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর, উদ্ভাবন এবং রপ্তানিমুখী শক্তিতে রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হবে। স্থাপত্য, ইঞ্জিনিয়ারিং, কনসালটেন্সি, স্বাস্থ্যসেবার মতো পেশাগত প্রতিষ্ঠানকে আন্তর্জাতিক সার্টিফিকেশন ও ব্র্যান্ডিংয়ে সহায়তা করা হবে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত উন্নয়ন
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত উন্নয়নে উৎপাদন ও সঞ্চালন সক্ষমতা বৃদ্ধিকল্পে ২০৩০ সালের মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ৩৫,০০০ মেগাওয়াটে উন্নীত করা এবং সঞ্চালন লাইন ২৫,০০০ সার্কিট কিলোমিটারে সম্প্রসারণ করা হবে। ক্যাপাসিটি চার্জসহ রেন্টাল ও স্বল্পমেয়াদি চুক্তিসমূহ পর্যালোচনা করে অপ্রয়োজনীয় ও অযৌক্তিক ব্যয় হ্রাস এবং স্বচ্ছতা ও দক্ষতা নিশ্চিত করা হবে।লিস্ট কষ্ট জেনারেশন বাস্তবায়ন, এনার্জি অডিট পরিচালনা এবং আমদানি নির্ভরতা হ্রাস করা হবে। জ্বালানি খাতে গোপন চুক্তির অবসান ও ৫০ লক্ষ টন পরিশোধন সক্ষমতাসম্পন্ন নতুন ক্রুড অয়েল রিফাইনারি নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হবে। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও বাপেক্স শক্তিশালীকরণ, স্বচ্ছ ট্যারিফ ব্যবস্থা, গ্যাস বিতরণ ও মূল্যনীতি সংস্কার করা হবে। আন্তঃদেশীয় জ্বালানি সংযোগ এবং জ্বালানি বৈষম্য হ্রাস নিশ্চিত করা হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে সবুজ অর্থায়ন ও কর প্রণোদনা, অংশ বৃদ্ধিসহ পানি-বিদ্যুৎ ও আঞ্চলিক সহযোগিতা, রূপপুর প্রকল্প পর্যালোচনা সহপারমাণবিক শক্তি এবং বর্জ্য থেকে শক্তি উৎপাদন প্রকল্প চালু করা হবে।
তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি
বাংলাদেশকে বৈশ্বিক পর্যায়ে একটি অন্যতম এআই হাব এবং হার্ডওয়্যার উৎপাদন কেন্দ্রে পরিণত করা হবে। এই খাতে ১০ লক্ষ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, সবার জন্য দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট সেবা নিশ্চিত করা হবে। ভবিষ্যতের গ্রাহক ও ব্যবসায়িক চাহিদাকে অগ্রাধিকার দিয়ে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের মাধ্যমে একটি যুগোপযোগী ‘কানেক্টিভিটি মাস্টারপ্ল্যান’ বাস্তবায়ন করা হবে। জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা, সাইবার বুলিং প্রতিরোধ ও নাগরিক তথ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি পে’পালসহ প্রযুক্তিভিত্তিক ক্যাশ-লাইট অর্থনীতি, ক্লাউড-ফার্স্ট প্রযুক্তি আওতায় দেশে প্রথম এআই-চালিত ডেটা সেন্টার ক্যাম্পাস স্থাপন এবং বাংলাদেশকে গুগল, ফেসবুক, অ্যামাজন ও মাইক্রোসফটের মতো প্রতিষ্ঠানের ‘এজ ডেটা সেন্টার হাব’ হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়া হবে। বিনিয়োগবান্ধব নীতি, স্টার্টআপ ও উদ্ভাবন ফান্ড, উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা এবং সাশ্রয়ী সেবা প্রদান নিশ্চিত করা হবে।
যোগাযোগ ও পরিবহন খাত
যোগাযোগ ও পরিবহন খাতে সড়ক পরিবহন ব্যবস্থা উন্নয়নের মাধ্যমে জাতীয় এক্সপ্রেসওয়ে গ্রিড গড়ে তোলা হবে। রুট রেশনালাইজেশন, যানজট নিরসণ, গণপরিবহনের মান উন্নয়ন, অ্যাক্সেল লোড নিয়ন্ত্রণ, ওভারপাস-আন্ডারপাস ও সেতু নির্মাণ করা হবে। গ্রামীণ সড়ক উন্নয়ন, পৃথক লেন ও সড়ক দখলমুক্তকরণ, রাইড শেয়ারিং সাইকেল সেবা চালু করা হবে। সড়ক নিরাপত্তা আইন ও দুর্ঘটনারোধ, যাত্রী নিরাপত্তা, সড়ক পরিবহন বীমা এবং শ্রমিকদের ইউনিফর্ম নিশ্চিত করা হবে। নৌপরিবহন ব্যবস্থায় বৃত্তাকার জলপথ, নদী ও সমুদ্রবন্দর সংযোগ, আধুনিক ওয়াটার হাইওয়ে রূপান্তর করা হবে। উপকূলীয় যোগাযোগ উন্নয়ন এবং নৌপথে শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। রেল যোগাযোগ ব্যবস্থায় অভ্যন্তরীণ ও আঞ্চলিক সম্প্রসারণ, এক্সপ্রেস সার্ভিস বৃদ্ধি, রেলপরিচালনা আধুনিকায়ন করা হবে। এই খাতে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব, মেট্রোরেল ও দূরপাল্লায় বিশেষ ছাড় এবং বুলেট ট্রেন সংযোগ স্থাপন করা হবে। বিমান পরিবহন ব্যবস্থায় এভিয়েশন হাবে রূপান্তর, নিরাপদ কার্গো ও হয়রানিমুক্ত যাত্রী সেবা নিশ্চিত করা হবে। বিমানকে লাভজনক প্রতিষ্ঠান বানানো, বেসরকারি এয়ারলাইনকে নীতিগত সহায়তা এবং এভিয়েশন শিক্ষায় গুরুত্বারোপ করা হবে।
সুনীল অর্থনীতি
সুনীল অর্থনীতিতে খাদ্য, জ্বালানি ও কর্মসংস্থানের গুরুত্ব আরোপ করা হবে। পরিমিত মৎস্য আহরণ ও লুণ্ঠন প্রতিরোধ, সামুদ্রিক খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি এবং তেল ও গ্যাস অনুসন্ধান ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। সুনীল কর্মসংস্থান কর্মসূচি গ্রহণ ও বাস্তবায়ন, ‘জাতীয় সুনীল অর্থনীতি কর্তৃপক্ষ’ প্রতিষ্ঠা করা হবে। নিরাপদ জাহাজ ভাঙা ও জাহাজ নির্মাণ শিল্পের উন্নয়ন, শিক্ষা ও শিল্পখাতে ‘মেরিটাইম ইনোভেশন ফান্ড’ প্রদান করা হবে। শিল্পের কাঁচামাল ও বন্দর উন্নয়ন, সুনীল অর্থনীতিতে জবাবদিহিমূলক শাসন প্রবর্তন করা হবে। ‘জাস্ট ট্রানজিশন ফ্রেমওয়ার্ক’-কে অগ্রাধিকারসহ বাস্তুতন্ত্র ও জীববৈচিত্র্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা হবে।
সৃজনশীল অর্থনীতির উন্নয়ন
সৃজনশীল অর্থনীতির উন্নয়নে জিডিপির ১.৫ শতাংশ অর্জন এবং পাঁচ লক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা হবে। আঞ্চলিক সৃজনশীল হাব গঠন ও প্রণোদনা, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ ও তহবিল গঠন করা হবে। এই খাতে জাতীয় ব্র্যান্ড চালু ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো প্রতিষ্ঠা করা হবে।
রাজস্ব ব্যবস্থাপনা
রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় ১৫ শতাংশ কর-জিডিপি অনুপাত অর্জন করা হবে। এটি স্বল্পমেয়াদে ২ শতাংশ এবং মধ্য-মেয়াদে ১০ শতাংশ পর্যন্ত উন্নীতকরণ করা হবে। রাজস্বের ন্যায্যতা ও রাষ্ট্রীয় বিশ্বাসযোগ্যতা পুনর্গঠন, ব্যয় শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং অর্থনৈতিক পুনরুজ্জীবনের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি নিশ্চিত করা হবে। ট্রিলিয়ন-ডলার সক্ষম অর্থনীতির অর্থায়ন ও প্রজন্মের জন্য ন্যায্যতা ও নিরাপত্তা প্রদান করা হবে। রাজস্ব বৃদ্ধির কৌশলে বিনিয়োগ-উৎপাদন-কর্মসংস্থান-ভোগ-কর চক্র সক্রিয় করা, বিনিয়োগ সম্প্রসারণের মাধ্যমে রাজস্ব বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান ও আয় বৃদ্ধি করে করভিত্তির সম্প্রসারণ, উৎপাদন ও ভোগ বৃদ্ধি করে ভ্যাট ও পরোক্ষ কর বৃদ্ধি, আয়কর ভিত্তি সম্প্রসারণ, কর ছাড় সংস্কারের মাধ্যমে প্রণোদনা থেকে রাজস্ব ক্ষয় বন্ধ, সম্পত্তি ও সম্পদ কর এবং কর প্রশাসন সংস্কার অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
চতুর্থ অধ্যায়: অঞ্চলভিত্তিক সুষম উন্নয়ন
বিএনপি দেশের সব অঞ্চলের সবার জন্য সমতা-ভিত্তিক সুষম উন্নয়ন নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর। দেশের যে অঞ্চল যেই অর্থনৈতিক ও শিল্প উন্নয়নের জন্য উপযুক্ত, বিএনপি সে অঞ্চলে সেই উপযুক্ত অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও শিল্পায়নে অগ্রাধিকার দিবে। উত্তরাঞ্চল, হাওর-বাওড় ও উপকূলীয় অঞ্চলের উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক জোন, ইপিজেড ও বিসিক শিল্পাঞ্চল গঠন করা হবে। চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হবে। নগরায়ণ ও আবাসনে পরিকল্পিত আবাসন, ‘সেকন্ডারি সিটি’ কার্যকরকরণ, সীমিত আয়ের ও বস্তিবাসী মানুষের জন্য আবাসন সুবিধা নিশ্চিত করা হবে। সমন্বিত বর্জ্য ও পানি ব্যবস্থাপনা, ‘ভূমি ব্যাংক’ প্রতিষ্ঠা, ‘ভূমিসেবা মেলা’ আয়োজন, স্থানীয় সরকার ক্ষমতায়ন এবং ‘সিটিজেন্স সার্ভিস কর্ণার’ স্থাপন নিশ্চিত করা হবে।
নিরাপদ ও টেকসই ঢাকার জন্য মনোরেল চালু, নারী নিরাপত্তা ও নারীবান্ধব বাস (পিংক বাস) এবং ইলেকট্রিক ভেহিক্যাল (ইভি) সম্প্রসারণ করা হবে। যানজট নিরসন এবং যাত্রী ও সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিতকল্পে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও শহরজুড়ে সিসিটিভি নেটওয়ার্ক বৃদ্ধি করা হবে। শেয়ারড পার্কিং প্রচলন এবং রিক্সা চলাচলে বাস্তবধর্মী পরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে। বৃত্তাকার নৌ-পথ ও রিং রোড নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ, মেট্রোপলিটন ট্রান্সপোর্ট কর্তৃপক্ষ গঠন এবং ভাসমান ও ছিন্নমূল জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন করা হবে। নগর দারিদ্রদ্র্য বিমোচন, বস্তিবাসীর আবাসন সংকট নিরসণ এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নয়নও নিশ্চিত করা হবে। পর্যটন খাতে পর্যটকদের নিরাপত্তা, পর্যটন-বান্ধব নীতি, ইকো-ট্যুরিজম, ‘কমিউনিটি’, ‘এথনিক’ ও ‘ওয়াটার ট্যুরিজম’ বিকাশ নিশ্চিত করা হবে। ট্যুর গাইডকে মর্যাদাপূর্ণ পেশায় পরিণতকরণ এবং রন্ধনশৈলী পর্যটনের প্রসার ঘটানো হবে।
পঞ্চম অধ্যায়: ধর্ম, সমাজ, ক্রীড়া, সংস্কৃতি ও সংহতি
‘ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার’ এই মূলনীতির ভিত্তিতে প্রত্যেক ধর্মাবলম্বী নিজ নিজ ধর্ম পালনের পূর্ণ অধিকার ভোগ করবেন। কাউকে কোন নাগরিকের ধর্মবিশ্বাসকে আঘাত করতে দেয়া হবে না। দল-মত-ধর্ম যার যার; কিন্তু রাষ্ট্র সবার, নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকার সবার। খতিব, ইমাম-মুয়াজ্জিন সাহেবগণকে সরকারি ব্যবস্থাপনায় মাসিক সম্মানি প্রদান করা হবে। তাদেরকে ধর্মীয় উৎসবে বিশেষ ভাতা প্রদান করা হবে। অন্যান্য ধর্মের (হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ও অন্যান্য) উপাসনালয়ের প্রধানগণকে মাসিক সম্মানি, উৎসব ভাতা প্রদান করা হবে। দক্ষতা-উন্নয়নমূলক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে পার্ট-টাইম বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে তাদের অধিকতর আয়ের পথ সুগম করা হবে। খতিব, ইমাম-মুয়াজ্জিন সাহেব এবং অন্যান্য সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদা বৃদ্ধির উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। প্রত্যেক নাগরিকের ধর্মীয় স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে এবং ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হবে। ইসলামী গবেষণা কার্যক্রম বর্ধিত করা হবে এবং সাশ্রয়ী, সহজলভ্য ও প্রবাসীবান্ধব হজ্ব ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা হবে।
পাহাড় ও সমতলের নৃগোষ্ঠীর নিরাপত্তা ও অধিকার সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ‘নৃ-গোষ্ঠী উন্নয়ন অধিদপ্তর’ প্রতিষ্ঠা করা হবে। পার্বত্য জেলা হাসপাতালের আধুনিকায়ন, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং এক্সক্লুসিভ ট্যুরিজম জোন প্রতিষ্ঠা করা হবে। পাহাড় ও সমতলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী থেকে যোগ্যদের পর্যায়ক্রমে শতভাগ সামাজিক সুরক্ষা বেষ্টনীর আওতায় নিয়ে আসার প্রয়াস নেয়া হবে। ক্রীড়ায় ওয়ার্ড-ভিত্তিক মাঠ তৈরি ও মাঠ দখলমুক্তকরণ, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অবস্থান সুদৃঢ় করার পরিকল্পনা, ‘ট্যালেন্ট হান্ট’ স্কিম, নারী ক্রীড়াবিদদের নিরাপত্তা ও সুযোগ বৃদ্ধি, দলীয় হস্তক্ষেপ বন্ধকরণ, অবকাঠামো উন্নয়ন ও বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধিকরণ, পেশাদার লীগ চালুকরণ, জাতীয় স্পোর্টস রিসার্চ ইনস্টিটিউট গঠন এবং ‘স্পোর্টস ইকোনমি’ ও ‘স্পোর্টস ডিপ্লোম্যাসি’-এর সম্প্রসারণ নিশ্চিত করা হবে। গণমাধ্যম ক্ষেত্রে কর্মীদের কাজের সুরক্ষা ও পেশাগত স্বাধীনতা, আইনি জটিলতা ও হয়রানি দমন এবং রাজনৈতিক পক্ষপাতের অবসান ঘটানো হবে। জবাবদিহিমূলক নিয়ন্ত্রণ কাঠামো প্রতিষ্ঠা ও সাংবাদিক হত্যার বিচার নিশ্চিত করা হবে। সংবাদ মাধ্যম কর্মীদের কল্যাণার্থে জাতীয় সাংবাদিক অবসর কল্যাণ বোর্ড’ গঠন কর হবে। শিল্প ও সংস্কৃতিতে সাংস্কৃতিক আগ্রাসন রোধ, জাতীয় ভাবধারাপন্থী ও গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিকে উৎসাহ, সুস্থ সংস্কৃতি ও বিনোদনের পরিবেশ নিশ্চিতকরণ এবং সংস্কৃতি অঙ্গনে অবদানের স্বীকৃতি সম্প্রসারণ করা হবে। নৈতিকতার শক্তি পুনরুদ্ধারে শিক্ষা কারিকুলামে সংস্কার, গণমাধ্যম ব্যবহার করে সচেতনতা তৈরি, শিক্ষকদের মানবিক, সহিষ্ণু, ন্যায়পরায়ণ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সমতাভিত্তিক সমাজ গঠনে উদ্বুদ্ধকরণ করা হবে। সমাজে নৈতিকতার শক্তি পুনরুদ্ধারে পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় সম্মিলিত প্রচেষ্টা গ্রহণ নিশ্চিত করা হবে।
এমএন
রাজনীতি
৯ প্রতিশ্রুতি ও ৫১ দফা নিয়ে বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা
আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ‘করবো কাজ, গরব দেশ’ গড়ার প্রত্যয়ে নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা করেছে বিএনপি। ইশতেহারের মূল স্লোগান নির্ধারণ করা হয়েছে— ‘সবার আগে বাংলাদেশ’।
শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান এই ইশতেহার তুলে ধরেন।
বিএনপি তাদের এই ইশতেহারকে ৫টি ভাগে বিভক্ত করেছে, যেখানে আগামী পাঁচ বছরের জন্য মোট ৫১টি দফাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৯টি প্রধান প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করেছে দলটি। আসন্ন নির্বাচনে তারেক রহমান দলকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন এবং এটিই তার পক্ষ থেকে ঘোষিত প্রথম নির্বাচনি ইশতেহার।
নির্বাচনি ৯ প্রধান প্রতিশ্রুতি
বিএনপির ইশতেহারে জনকল্যাণ ও অর্থনৈতিক সংস্কারকে প্রাধান্য দিয়ে ৯টি বিশেষ প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে:
১. ফ্যামিলি কার্ড:প্রান্তিক ও নিম্নআয়ের পরিবারগুলোকে সুরক্ষা দিতে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালু করা হবে। এর মাধ্যমে প্রতি মাসে ২৫০০ টাকা অথবা সমমূল্যের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে। এই সহায়তার পরিমাণ পর্যায়ক্রমে বাড়ানো হবে।
২. কৃষক কার্ড: কৃষকদের ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে ‘কৃষক কার্ড’ প্রবর্তন করা হবে। এর আওতায় ভর্তুকি, সহজ শর্তে ঋণ, কৃষি বীমা এবং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় বাজারজাতকরণ ব্যবস্থা জোরদার করা হবে। মৎস্য ও পশুপালন খাতের উদ্যোক্তারাও এই সুবিধা পাবেন।
৩. স্বাস্থ্যসেবা: দুর্নীতিমুক্ত ও মানবিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়তে সারাদেশে এক লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেওয়া হবে। জেলা ও মহানগর পর্যায়ে মানসম্মত চিকিৎসা এবং মা ও শিশুর জন্য পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা হবে।
৪. শিক্ষা: বাস্তব দক্ষতা ও মূল্যবোধভিত্তিক নতুন শিক্ষানীতি প্রণয়ন করা হবে। প্রাথমিক শিক্ষায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তি সহায়তা এবং ‘মিড-ডে মিল’ (দুপুরের খাবার) চালু করা হবে।
৫. তরুণ ও কর্মসংস্থান: তরুণদের কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে কারিগরি ও ভাষা দক্ষতা উন্নয়ন, স্টার্টআপ সহায়তা এবং বৈশ্বিক ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি করা হবে। মেধাভিত্তিক সরকারি নিয়োগ নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
৬. ক্রীড়া: খেলাধুলাকে পেশা ও জীবিকার মাধ্যম হিসেবে গড়ে তুলতে জেলা-উপজেলা পর্যায়ে আধুনিক ক্রীড়া অবকাঠামো ও প্রশিক্ষণ সুবিধা বাড়ানো হবে।
৭. পরিবেশ ও জলবায়ু: আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষ রোপণ এবং জনসম্পৃক্ততার মাধ্যমে ২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল খনন বা পুনঃখনন করা হবে। চালু হবে আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা।
৮. ধর্মীয় সম্প্রীতি: ধর্মীয় ও সামাজিক সম্প্রীতি রক্ষায় সব ধর্মের উপাসনালয়ের ধর্মীয় নেতাদের জন্য সম্মানী ও প্রশিক্ষণভিত্তিক কল্যাণ ব্যবস্থা চালু করা হবে।
৯. ডিজিটাল অর্থনীতি: আন্তর্জাতিক পেমেন্ট গেটওয়ে ‘পেপাল’ চালু করা হবে। এছাড়া ই-কমার্সের আঞ্চলিক হাব স্থাপন এবং ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ পণ্যের রপ্তানি সম্প্রসারণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
ইশতেহার ঘোষণা করে বিএনপি জানিয়েছে, এটি কেবল নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি নয়, বরং একটি ‘নতুন সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় চুক্তি’। দলটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বিএনপি প্রতিশোধের রাজনীতিতে নয়, বরং ন্যায় ও মানবিকতায় বিশ্বাস করে। ক্ষমতার চেয়ে জনগণের অধিকারই তাদের রাজনীতির মূল কেন্দ্রবিন্দু। রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হবে— লুটপাট নয় উৎপাদন; ভয় নয় অধিকার এবং বৈষম্য নয় ন্যায্যতা। জনগণের রায়ে ক্ষমতায় গেলে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং দুর্নীতি ও সন্ত্রাসমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার করেছে দলটি।
বিএনপির এবারের ইশতেহার তিনটি মৌলিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে: শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা রাষ্ট্রদর্শন, বেগম খালেদা জিয়ার ‘ভিশন-২০৩০’ এবং তারেক রহমান ঘোষিত রাষ্ট্র মেরামতের ৩১ দফা। ইশতেহারে বলা হয়েছে, বিএনপি স্লোগান নয় বরং সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনায় বিশ্বাসী। ‘We have a plan’-এর আলোকে একটি মানবিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র বিনির্মাণই তাদের লক্ষ্য।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সভাপতিত্বে এবং নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম খানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ইসমাইল জবিউল্লাহ, ড. মাহদী আমিন, মিডিয়া সেলের সদস্য আতিকুর রহমান রুম্মন, শায়রুল কবির খানসহ উর্ধ্বতন নেতৃবৃন্দ।
উল্লেখ্য, এর আগে পঞ্চম থেকে নবম সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত বিএনপির ইশতেহার ঘোষণা করেছিলেন দলটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। ২০১৮ সালের একাদশ নির্বাচনে ইশতেহার ঘোষণা করেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। দশম ও দ্বাদশ নির্বাচন বিএনপি বয়কট করেছিল। সেই হিসেবে এবারের ইশতেহার ঘোষণা তারেক রহমানের জন্য একটি নতুন রাজনৈতিক মাইলফলক।
রাজনীতি
রবিবারের সমাবেশ বাতিল করল বিএনপি
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে আগামী রবিবার (৮ ফেব্রুয়ারি) নয়াপল্টনে অনুষ্ঠিতব্য বিএনপির নির্বাচনী সমাবেশ বাতিল করা হয়েছে। আজ শুক্রবার রাজধানীর নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানিয়েছেন দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী।
রিজভী বলেন, ‘গতকাল আমরা একটি কর্মসূচি ঘোষণা করেছিলাম। পরবর্তী সময় নেতাদের সভায় আলাপ-আলোচনা করে ৮ তারিখের সমাবেশ বাতিল করেছি।
এসময় দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান উত্তর ও দক্ষিণের বিভিন্ন নির্বাচনী এলাকায় জনসভা করবেন। ঢাকা মহানগরীতে কেন্দ্রীয় যে জনসভা করার কথা ছিল, আপাতত তা বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘৮ ও ৯ ফেব্রুয়ারি ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণের বিভিন্ন প্রান্তে দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান নির্বাচনী বক্তব্য দিতে পারেন।’
এর আগে গতকাল কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে রিজভী বলেছিলেন, আগামী রবিবার (৮ ফেব্রুয়ারি) নির্বাচনের আগে বিএনপির শেষ জনসভা অনুষ্ঠিত হবে।
এমএন



