মত দ্বিমত
একটি ব্যালান্সড বাংলাদেশের সন্ধানে, রাষ্ট্র কাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে?
বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী নিয়ে প্রশ্ন তোলা মানেই রাষ্ট্রবিরোধিতা নয়। বরং এটি একটি রাষ্ট্রকে আরও দায়িত্বশীল, জবাবদিহিমূলক এবং কার্যকর করার প্রয়োজনীয় আলোচনা। কারণ একটি দরিদ্র, ঘনবসতিপূর্ণ, উন্নয়নশীল দেশের জন্য প্রতিটি টাকার ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ।
প্রশ্ন হলো, এই বিপুল বিনিয়োগ কি শুধু প্রতিরক্ষার জন্য, নাকি এটি জাতীয় উন্নয়নেরও অংশ? আর যদি হয়, তাহলে তার বাস্তব ফলাফল কী?
বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর মূল দায়িত্ব হচ্ছে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা, সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, বহিরাগত সামরিক হুমকি মোকাবিলা করা এবং জাতীয় নিরাপত্তা বজায় রাখা। যুদ্ধক্ষেত্রে প্রতিরক্ষা, সমুদ্রসীমা রক্ষা, আকাশসীমা নিরাপদ রাখা, সন্ত্রাসবাদ দমন, দুর্যোগ মোকাবিলা, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে অংশগ্রহণ, এমনকি অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতেও তারা ভূমিকা পালন করে।
কিন্তু এখানেই একটি গভীর প্রশ্ন উঠে আসে। স্বাধীনতার পর পাঁচ দশকের বেশি সময় পেরিয়েও বাংলাদেশ কি এমন কোনো বাস্তব সামরিক সক্ষমতা অর্জন করতে পেরেছে, যা দেশের সাধারণ মানুষকে নিরাপদ ও আত্মবিশ্বাসী করে? নাকি পুরো ব্যবস্থাটি ধীরে ধীরে এমন এক ব্যয়বহুল কাঠামোতে পরিণত হয়েছে, যেখানে সাধারণ মানুষের করের টাকা মূলত রক্ষণাবেক্ষণেই শেষ হয়ে যাচ্ছে?
বর্তমান বিশ্বে যুদ্ধের ধরন পাল্টে গেছে। এখন যুদ্ধ মানে শুধু ট্যাংক বা যুদ্ধবিমান নয়। এখন সাইবার যুদ্ধ, ড্রোন প্রযুক্তি, স্যাটেলাইট নজরদারি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, তথ্যযুদ্ধ, ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার, অর্থনৈতিক অবরোধ এবং মিডিয়া ন্যারেটিভও যুদ্ধের অংশ। ইউক্রেন যুদ্ধ দেখিয়েছে, ছোট ড্রোনও কোটি ডলারের ট্যাংক ধ্বংস করতে পারে। গাজা যুদ্ধ দেখিয়েছে, প্রযুক্তি ও গোয়েন্দা সক্ষমতা ছাড়া শুধু অস্ত্র দিয়ে যুদ্ধ জেতা যায় না।
প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কি সেই বাস্তবতার জন্য প্রস্তুত?
বাংলাদেশের সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনী নিয়মিত প্রশিক্ষণ পায়। দেশীয় প্রশিক্ষণের পাশাপাশি বিভিন্ন দেশে যৌথ মহড়া ও প্রশিক্ষণেও অংশ নেয়। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ বিশ্বে পরিচিত। বহু বছর ধরে বাংলাদেশ শান্তিরক্ষী পাঠানো দেশের মধ্যে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে। এতে আন্তর্জাতিক মর্যাদা যেমন এসেছে, তেমনি বৈদেশিক মুদ্রাও এসেছে।
কিন্তু আরেকটি বাস্তবতা হলো, শান্তিরক্ষা মিশনের অভিজ্ঞতা আর আধুনিক পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের অভিজ্ঞতা এক নয়। শান্তিরক্ষা বাহিনী সাধারণত সংঘাত নিয়ন্ত্রণ, নিরাপত্তা সহায়তা ও মানবিক সহায়তা দেয়। কিন্তু আধুনিক রাষ্ট্রযুদ্ধে প্রয়োজন প্রযুক্তিগত আধিপত্য, তথ্যযুদ্ধ, সাইবার প্রতিরক্ষা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র ব্যবস্থার সক্ষমতা।
বাংলাদেশ প্রতিবছর প্রতিরক্ষা খাতে বিপুল অর্থ ব্যয় করে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের জন্য প্রায় ৪০ হাজার ৬৯৮ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। এই অর্থের বড় অংশ যায় বেতন, ভাতা, রক্ষণাবেক্ষণ, অবকাঠামো এবং পরিচালন ব্যয়ে। বিশ্বের সামরিক ব্যয়ের তথ্য অনুযায়ী, আধুনিক প্রতিরক্ষা খাতে শুধু অস্ত্র নয়, গবেষণা, প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ ও কৌশলগত সক্ষমতার জন্যও বিশাল বিনিয়োগ প্রয়োজন।
এখন প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের মতো একটি দেশে যেখানে এখনও স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, গবেষণা, পুষ্টি, কৃষি ও কর্মসংস্থানে বিশাল ঘাটতি রয়েছে, সেখানে এত বড় প্রতিরক্ষা ব্যয়ের যৌক্তিকতা কী?
একদিকে, একটি রাষ্ট্রের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে নিরাপত্তা অপরিহার্য। ভৌগোলিক অবস্থান, বঙ্গোপসাগর, আঞ্চলিক শক্তির প্রতিযোগিতা, সীমান্ত সংকট, জলবায়ু দুর্যোগ, সন্ত্রাসবাদ ও ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় প্রতিরক্ষা বাহিনীকে দুর্বল রাখা যায় না।
অন্যদিকে, যদি প্রতিরক্ষা খাতে বিনিয়োগ দেশের প্রযুক্তিগত, শিল্প বা বৈজ্ঞানিক উন্নয়নে রূপান্তরিত না হয়, তাহলে সেটি দীর্ঘমেয়াদে শুধু ব্যয় হিসেবেই থেকে যায়।
বিশ্বের অনেক দেশ প্রতিরক্ষা খাতকে শিল্প উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করেছে। যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল, দক্ষিণ কোরিয়া, তুরস্ক কিংবা চীন সামরিক প্রযুক্তিকে পরে বেসামরিক খাতে ব্যবহার করেছে। ইন্টারনেট, জিপিএস, ড্রোন, স্যাটেলাইট প্রযুক্তি, এমনকি বহু চিকিৎসা প্রযুক্তির উৎস সামরিক গবেষণা।
বাংলাদেশ কি সেই পথে হাঁটতে পেরেছে?
বাংলাদেশ কিছু অস্ত্র, গোলাবারুদ, জাহাজ ও সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদন করতে পারলেও এখনও বড় পরিসরে সামরিক প্রযুক্তি, গবেষণা, সাইবার প্রতিরক্ষা বা উন্নত অস্ত্র শিল্পে স্বনির্ভর হতে পারেনি। ফলে বিপুল অর্থ বিদেশে চলে যায় আমদানিনির্ভর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কারণে। অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, দীর্ঘমেয়াদে স্থানীয় গবেষণা, প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, প্রতিরক্ষা শিল্প ও বেসরকারি উদ্ভাবনকে যুক্ত না করলে এই ব্যয় টেকসই হবে না।
আরেকটি স্পর্শকাতর প্রশ্ন হলো, সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা যে সুযোগ সুবিধা পান, তা কি সাধারণ সিভিল প্রশাসনের তুলনায় বেশি?
বাস্তবতা হলো, সামরিক বাহিনীর সদস্যরা আবাসন, চিকিৎসা, রেশন, নিরাপত্তা, অবসর সুবিধা, পেনশন, ক্যান্টনমেন্ট সুবিধা এবং বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা তুলনামূলকভাবে বেশি পেয়ে থাকেন। কারণ রাষ্ট্র তাদেরকে “উচ্চ ঝুঁকির পেশা” হিসেবে বিবেচনা করে। যুদ্ধ, সীমান্ত দায়িত্ব, দুর্যোগ, সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান কিংবা প্রাণহানির ঝুঁকি এই কাঠামোর যুক্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
যে দেশে একজন কৃষক, শ্রমিক, শিক্ষক বা চিকিৎসকও অনিশ্চয়তার মধ্যে জীবন কাটায়, সেখানে রাষ্ট্র কেন একটি নির্দিষ্ট সেক্টরকে তুলনামূলকভাবে বেশি নিরাপত্তা ও সুবিধা দেয়? এই প্রশ্ন অযৌক্তিক নয়। কারণ রাষ্ট্রের অর্থ জনগণের অর্থ। ফলে জনগণের জবাবদিহিতা দাবি করার অধিকার আছে।
তবে একটি বিপজ্জনক দিকও আছে। যদি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা কাঠামো দুর্বল হয়ে যায়, তাহলে উন্নয়ন, গণতন্ত্র, অর্থনীতি বা সামাজিক স্থিতিশীলতা কোনোটাই টিকবে না। ইতিহাস দেখায়, দুর্বল রাষ্ট্রে বিদেশি প্রভাব, গৃহসংঘাত, সন্ত্রাসবাদ ও রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা দ্রুত বৃদ্ধি পায়।
অর্থাৎ মূল প্রশ্ন “সেনাবাহিনী দরকার কি না” নয়। মূল প্রশ্ন হলো, কেমন সেনাবাহিনী দরকার?
একটি দরিদ্র দেশের জন্য বিলাসী, আমলাতান্ত্রিক, অদক্ষ, অস্বচ্ছ ও প্রযুক্তিগতভাবে পিছিয়ে থাকা বাহিনী দীর্ঘমেয়াদে বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু একটি দক্ষ, প্রযুক্তিনির্ভর, গবেষণামুখী, জাতীয় শিল্প ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় যুক্ত বাহিনী রাষ্ট্রের শক্তি হয়ে উঠতে পারে।
বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ তিনটি:
- প্রতিরক্ষা খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বৃদ্ধি করা।
- সামরিক বিনিয়োগকে প্রযুক্তি, গবেষণা ও শিল্প উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করা।
- জনগণের আস্থা পুনর্গঠন করা, যেন মানুষ মনে করে এই বাহিনী শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য নয়, পুরো জাতির জন্য কাজ করছে।
প্রশ্ন এখন শুধু ব্যয়ের নয়, সেই ব্যয়ের ফলাফল কী জাতিকে শক্তিশালী করছে, নাকি কেবল একটি ব্যয়বহুল কাঠামোকে টিকিয়ে রাখছে। যদি প্রতিরক্ষা খাত কেবল ব্যয় বাড়ায় কিন্তু জাতিকে দক্ষতা, প্রযুক্তি, নিরাপত্তা ও আত্মবিশ্বাস না দেয়, তাহলে মানুষ একসময় এটিকে বোঝা হিসেবেই দেখবে।
কিন্তু যদি সেই বিনিয়োগ থেকে প্রযুক্তি, শিল্প, শৃঙ্খলা, দুর্যোগ মোকাবিলা, আন্তর্জাতিক মর্যাদা, গবেষণা এবং জাতীয় আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়, তাহলে সেটি শুধু প্রতিরক্ষা ব্যয় নয়, জাতীয় বিনিয়োগে পরিণত হবে।
রাষ্ট্রের শক্তি তখনই অর্থবহ হয়, যখন সীমান্তের নিরাপত্তার পাশাপাশি মানুষের জীবনও নিরাপদ হয়। একটি শিশু যদি চিকিৎসাহীনতায় মারা যায়, একজন কৃষক যদি ঋণের চাপে ভেঙে পড়ে, একজন তরুণ যদি ভবিষ্যৎহীনতায় দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়, তাহলে শুধু অস্ত্রের আধুনিকীকরণ একটি জাতিকে শক্তিশালী করে না। একটি সত্যিকারের শক্তিশালী রাষ্ট্র সেই রাষ্ট্র, যেখানে নিরাপত্তা, শিক্ষা, প্রযুক্তি এবং মানবিক মর্যাদা একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং পরিপূরক।
বাংলাদেশ আজ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে দারিদ্র্য, বেকারত্ব, দুর্নীতি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সংকট। অন্যদিকে নিরাপত্তা, ভূরাজনীতি ও আঞ্চলিক প্রতিযোগিতা। এখন সিদ্ধান্ত জাতির।
আমরা কি শুধু অস্ত্র কিনে নিরাপত্তার ভান করব, নাকি এমন একটি রাষ্ট্র গড়ব যেখানে প্রতিরক্ষা, শিক্ষা, গবেষণা, প্রযুক্তি ও মানবিক উন্নয়ন একসঙ্গে এগিয়ে যাবে?
কারণ শেষ পর্যন্ত একটি দেশের সবচেয়ে বড় শক্তি শুধু তার সেনাবাহিনী নয়, তার সচেতন জনগণ, জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র এবং দেশপ্রেমে বিশ্বাসী নাগরিক।
রহমান মৃধা, গবেষক ও লেখক, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন
মত দ্বিমত
নাহিদ ইসলাম: এক নতুন রাজনৈতিক জাগরণের প্রতীক, নাকি ইতিহাসের পরবর্তী অধ্যায়?
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে কিছু নাম মুহূর্তের ভেতরেই প্রতীকে পরিণত হয়। নাহিদ ইসলাম সেই নামগুলোর একটি। কেউ তাকে দেখছেন বিদ্রোহের কণ্ঠস্বর হিসেবে, কেউ নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক বিবেক হিসেবে, আবার কেউ তাকে এখনো দেখছেন এক অসমাপ্ত সম্ভাবনা হিসেবে। কিন্তু একটি বিষয় অস্বীকার করার উপায় নেই, ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক অভিধানে তার নাম স্থায়ীভাবে লেখা হয়ে গেছে।
তিনি জন্ম নিয়েছিলেন কোনো রাজনৈতিক রাজবংশে নয়, বরং সাধারণ এক সামাজিক বাস্তবতায়। ছাত্রজীবনে সমাজ, বৈষম্য, রাষ্ট্র এবং নাগরিক অধিকারের প্রশ্ন তাকে ভাবিয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সময় থেকেই তার রাজনৈতিক চেতনার প্রকাশ শুরু হয়। পরে কোটা সংস্কার আন্দোলন এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মধ্য দিয়ে তিনি জাতীয় পর্যায়ে পরিচিত হয়ে ওঠেন।
ইতিহাসে অনেক নেতার উত্থান যুদ্ধক্ষেত্রে হয়েছে, অনেকের হয়েছে কারাগারে, আবার অনেকের জন্ম হয়েছে জনগণের ক্রোধের ভেতর দিয়ে। নাহিদ ইসলামের উত্থান ঘটেছে রাজপথে, মিছিলে, অস্থির জনতার ভেতর, ইন্টারনেট বন্ধ হয়ে যাওয়া এক উত্তাল সময়ে, যখন বাংলাদেশের তরুণ সমাজ নতুন ভাষায় রাষ্ট্রকে প্রশ্ন করতে শুরু করেছিল। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমও তাকে নতুন প্রজন্মের গণজাগরণের অন্যতম মুখ হিসেবে তুলে ধরেছে।
কিন্তু জুলাই ২০২৪ কেবল একটি আন্দোলনের নাম নয়। এটি ছিল দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভ, বঞ্চনা, রাজনৈতিক অনাস্থা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে তরুণ সমাজের গভীর উদ্বেগের বহিঃপ্রকাশ। বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মের একটি বড় অংশ মনে করতে শুরু করেছিল যে, প্রচলিত রাজনৈতিক কাঠামো তাদের ভাষা, স্বপ্ন এবং বাস্তবতাকে আর ধারণ করতে পারছে না। সেই শূন্যতার ভেতর থেকেই উঠে আসে কিছু নতুন মুখ, কিছু নতুন প্রতীক। নাহিদ ইসলাম সেই প্রতীকের অন্যতম।
আজ দেশের অসংখ্য তরুণ তার ভেতরে কেবল একজন রাজনৈতিক কর্মীকে দেখছে না, বরং দেখছে নিজেদের প্রজন্মের প্রতিফলন। এমন এক প্রজন্ম, যারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বৈশ্বিক বাস্তবতা এবং নতুন রাজনৈতিক চেতনার মধ্যে বেড়ে উঠেছে। তারা পুরোনো স্লোগানের পুনরাবৃত্তি নয়, বরং জবাবদিহিতা, মর্যাদা, ন্যায়বিচার এবং অংশগ্রহণমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা দেখতে চায়। সেই কারণেই নাইদ ইসলামের প্রতি নতুন প্রজন্মের গ্রহণযোগ্যতা শুধুমাত্র রাজনৈতিক নয়, এটি মনস্তাত্ত্বিক এবং প্রজন্মগতও।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, কে এই নাহিদ ইসলাম? তিনি কি কেবল একজন ছাত্রনেতা?
নাকি এমন এক রাজনৈতিক প্রজন্মের প্রতীক, যারা পুরোনো দলীয় কাঠামোর বাইরে নতুন রাষ্ট্রচিন্তা খুঁজছে?
তার রাজনৈতিক পরিচয় এখন যুক্ত হয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টির সঙ্গে, যে দলটি নিজেদের “নতুন বাংলাদেশ” এবং “দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্র” ধারণার ধারক হিসেবে তুলে ধরছে।
তার ভাষণে বারবার ফিরে আসে গণতন্ত্র, বৈষম্যহীনতা, সংস্কার, নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত এবং জনগণের অধিকার। সমর্থকদের চোখে তিনি এমন একজন, যিনি দীর্ঘদিনের ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির বিপরীতে তরুণদের আশা হয়ে উঠেছেন। সমালোচকদের চোখে তিনি এখনো পরীক্ষাধীন, কারণ আন্দোলনের নায়ক হওয়া এবং রাষ্ট্র পরিচালনার সক্ষমতা এক বিষয় নয়।
তবে সাম্প্রতিক সংসদীয় বক্তব্যে নাহিদ ইসলাম এমন কিছু রাজনৈতিক পরিপক্বতার পরিচয় দিয়েছেন, যা তাকে শুধুমাত্র আন্দোলনের মুখ হিসেবে নয়, বরং একজন দূরদর্শী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবেও নতুনভাবে আলোচনায় নিয়ে এসেছে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় সাধারণত প্রতিটি পক্ষই ইতিহাসের মালিকানা নিজেদের হাতে নিতে চায়। কিন্তু নাইদ ইসলাম সংসদে দাঁড়িয়ে ভিন্ন এক অবস্থান তুলে ধরেন। তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান কোনো একক দল বা গোষ্ঠীর আন্দোলন ছিল না, এটি ছিল সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণে গড়ে ওঠা এক গণঅভ্যুত্থান।
তিনি বলেন, “এই অভ্যুত্থানে সাধারণ জনগণ সামনে ছিল, নেতাকর্মীরা পেছনে ছিল।”
এই একটি বাক্যই তার রাজনৈতিক অবস্থানের গভীরতা প্রকাশ করে। কারণ তিনি আন্দোলনের কৃতিত্ব এককভাবে নিজের বা নিজের রাজনৈতিক বলয়ের দিকে টেনে নেননি। বরং তিনি জনগণকেই ইতিহাসের কেন্দ্রস্থলে বসিয়েছেন। ইতিহাসে যেসব নেতা দীর্ঘস্থায়ী প্রতীক হয়ে উঠেছেন, তাদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল জনগণের শক্তিকে নিজেদের ব্যক্তিগত কৃতিত্বে সীমাবদ্ধ না করা।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তিনি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ভূমিকাও অস্বীকার করেননি। বরং তিনি সংসদে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, বিএনপিও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অংশ ছিল এবং সে সময় তাদের কিছু কৌশলগত অবস্থান বাস্তব পরিস্থিতির জন্য প্রয়োজনীয় ছিল। বাংলাদেশের বিভক্ত রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এই ধরনের স্বীকৃতি বিরল। কারণ এখানে সাধারণত প্রতিপক্ষকে অস্বীকার করাই রাজনৈতিক শক্তির পরিচয় হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু নাহিদ ইসলাম সেখানে সংঘাতের চেয়ে ইতিহাসের সত্যকে বড় করে দেখানোর চেষ্টা করেছেন।
তিনি আরও বলেন, আন্দোলনের সময় গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তার কাছ থেকে বারবার একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বয়ান আদায় করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু তিনি সেই সরলীকৃত ব্যাখ্যার ভেতরে আন্দোলনকে সীমাবদ্ধ করেননি। বরং তিনি বারবার বলেছেন, এই আন্দোলনে শিশু থেকে বৃদ্ধ পর্যন্ত সাধারণ মানুষ অংশ নিয়েছিল। এই অবস্থান শুধু রাজনৈতিক সাহসের নয়, বরং ইতিহাসের জটিল বাস্তবতাকে স্বীকার করারও পরিচয় বহন করে।
সংসদের সেই মুহূর্তে শুধু বক্তব্য নয়, পরিবেশও ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। ট্রেজারি বেঞ্চের নীরব মনোযোগ, পুরো সংসদের স্থিরতা, এমনকি ডেপুটি স্পিকারের মনোযোগী উপস্থিতিও যেন একটি বিষয়ই মনে করিয়ে দিচ্ছিল, কখনো কখনো কিছু বক্তৃতা দলীয় সীমারেখা অতিক্রম করে সময়ের দলিলে পরিণত হয়।
আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে সেই মুহূর্ত, যখন নাহিদ ইসলাম তারেক রহমান এবং মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বক্তব্য উদ্ধৃত করেন। তিনি দেখাতে চেয়েছেন, একটি জাতীয় গণঅভ্যুত্থানকে কোনো একক রাজনৈতিক শক্তির সম্পত্তি বানানো যায় না। এই অবস্থান তাকে কেবল একজন জনপ্রিয় তরুণ নেতা নয়, বরং জাতীয় রাজনৈতিক স্মৃতির একজন দায়িত্বশীল ভাষ্যকার হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত করে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে তরুণদের ভূমিকা নতুন নয়। ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান কিংবা স্বাধীনতার সংগ্রাম, প্রতিটি বড় পরিবর্তনের কেন্দ্রে ছিল তরুণ সমাজ। কিন্তু বর্তমান প্রজন্মের বাস্তবতা ভিন্ন। তারা একই সঙ্গে বৈশ্বিক এবং স্থানীয়। তারা তথ্যপ্রবাহের যুগে বেড়ে উঠেছে, ফলে তাদের প্রশ্নও আগের চেয়ে অনেক বেশি সরাসরি এবং নির্ভীক। নাইদ ইসলামের জনপ্রিয়তার পেছনে এই পরিবর্তিত সামাজিক বাস্তবতারও বড় ভূমিকা রয়েছে।
বিশ্বের ইতিহাসে নেলসন ম্যান্ডেলা, ভ্যাকলাভ হাভেল, লেখ ওয়ালেসা কিংবা অং সান সুচির মতো ব্যক্তিত্বদের শুরুতেও মানুষ একই প্রশ্ন করেছিল। তারা কি কেবল আন্দোলনের মুখ, নাকি ভবিষ্যতের রাষ্ট্রনায়ক? ইতিহাস পরে তাদের বিচার করেছে। নাহিদ ইসলামের ক্ষেত্রেও সেই বিচার এখনো শেষ হয়নি।
বাংলাদেশের একাংশ তাকে সাহসের প্রতীক মনে করে, কারণ আন্দোলনের সময় নির্যাতন, আটক এবং দমন সত্ত্বেও তিনি প্রকাশ্যে অবস্থান নিয়েছিলেন। আবার আরেক অংশ সতর্কভাবে দেখছে, এই জনপ্রিয়তা আদর্শভিত্তিক রাজনৈতিক রূপ নেয় কিনা, নাকি সময়ের সঙ্গে তা কেবল আবেগে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।
দেশের বাইরে থেকেও তার প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তাকে নতুন প্রজন্মের গণআন্দোলনের মুখ হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ আজকের পৃথিবীতে তরুণ নেতৃত্ব, ডিজিটাল আন্দোলন এবং রাষ্ট্র সংস্কারের প্রশ্ন একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত।
তবে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখনো সামনে দাঁড়িয়ে আছে। তার শুরু আমরা দেখেছি। কিন্তু তার শেষ কোথায়?
তিনি কি কেবল এক গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি হয়ে থাকবেন?
নাকি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সত্যিকারের নতুন অধ্যায়ের নির্মাতা হবেন?
এই উত্তর আজ কারও কাছে নেই। কারণ ইতিহাস কখনো বক্তৃতা দিয়ে শেষ হয় না। ইতিহাস শেষ পর্যন্ত লেখা হয় মানুষের বিশ্বাস, সময়ের পরীক্ষা এবং ক্ষমতার সামনে নৈতিক অবস্থান ধরে রাখার সক্ষমতা দিয়ে।
যেমন সকালের সূর্য একটি দিনের নতুন আশার আলো নিয়ে উদিত হয়, তেমনি পড়ন্ত বিকেলের সূর্যও কখনো কখনো শেষের প্রতীক নয়, বরং আরেক নতুন ভোরের পূর্বাভাস হয়ে ওঠে। ইতিহাসের প্রতিটি সময়ে কিছু মানুষ আসে, যারা কেবল ব্যক্তি হিসেবে নয়, সময়ের প্রতিচ্ছবি হিসেবেও নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করে। নাহিদ ইসলামকে বাংলাদেশ শেষ পর্যন্ত কীভাবে দেখবে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
তিনি কি ক্ষণিকের আবেগ হয়ে মিলিয়ে যাবেন, নাকি একটি নতুন রাজনৈতিক জাগরণের দীর্ঘস্থায়ী প্রতীক হয়ে উঠবেন?
তিনি কি আরেকজন প্রচলিত নেতা হবেন, নাকি এমন এক কণ্ঠস্বর, যে ক্ষমতার চেয়েও বড় করে মানুষের মর্যাদা, স্বাধীন চিন্তা এবং ন্যায়বিচারের প্রশ্নকে সামনে আনবে?
আজকের বাংলাদেশ তাকে দেখছে আশা, কৌতূহল, সংশয় এবং প্রত্যাশার মিশ্র দৃষ্টিতে। কারণ প্রতিটি গণঅভ্যুত্থান একজন মানুষকে সামনে আনে, কিন্তু ইতিহাস কেবল তাকেই মনে রাখে, যে নিজের সময়কে অতিক্রম করে জাতির আত্মার অংশ হয়ে উঠতে পারে।
সময়ই বলে দেবে, নাহিদ ইসলাম কি কেবল জুলাই ২০২৪ এর একটি নাম, নাকি ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের নতুন জাগরণের এক অভূতপূর্ব ভরসার প্রতীক।
রহমান মৃধা, গবেষক ও লেখক, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন
মত দ্বিমত
রূপপুরের আলো: ১৯৬১ সালের স্বপ্ন থেকে আধুনিক বাংলাদেশের পারমাণবিক বাস্তবতা
আব্দুস সালাম যখন ১৯৭৯ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার অর্জন করেন, তখন বিশ্ব নতুন করে উপলব্ধি করে যে দক্ষিণ এশিয়াও উচ্চতর বৈজ্ঞানিক চিন্তা ও গবেষণার ক্ষেত্রে পিছিয়ে নেই। কিন্তু তারও আগে, ১৯৬০ দশকের শুরুতেই তৎকালীন পাকিস্তান সরকার পারমাণবিক শক্তিকে শান্তিপূর্ণ কাজে ব্যবহারের সম্ভাবনা নিয়ে পরিকল্পনা করেছিল। সেই ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবেই ১৯৬১ সালে পাবনার রূপপুরে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের প্রাথমিক উদ্যোগ নেওয়া হয়। অর্থাৎ এটি হঠাৎ কোনো সিদ্ধান্ত নয়, বরং দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা, গবেষণা এবং রাষ্ট্রীয় ভাবনার একটি বাস্তব প্রতিফলন।
এই প্রসঙ্গে আরেকটি সত্য সামনে আনা জরুরি। আমরা অকৃতজ্ঞ জাতি হিসেবে পরিচিত হতে চাই না। কেউ যদি ভালো কিছু করে, সেটার প্রাপ্য স্বীকৃতি তাকে দিতে হবে, এটাই সভ্যতার নিয়ম। প্রশংসা করার অভ্যাস যেমন গড়ে তুলতে হয়, তেমনি মিথ্যাচার, পরচর্চা এবং ভিত্তিহীন সমালোচনা থেকে বেরিয়ে আসাও জরুরি। একটি দেশের অগ্রগতির জন্য শুধু অবকাঠামো নয়, মানসিকতার পরিবর্তনও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সত্যকে গ্রহণ করা, প্রাপ্যকে স্বীকার করা এবং অন্যায়ের সমালোচনা করা, এই ভারসাম্যই একটি সুস্থ সমাজ গড়ে তোলে। ইসলাম আমাদের এই শিক্ষা দেয়, সত্যকে প্রতিষ্ঠা করতে এবং ন্যায়কে সমর্থন করতে। তাহলে প্রশ্ন থেকেই যায়, আমরা কেন অনেক সময় সেই পথ থেকে সরে যাই?
বাংলাদেশে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ধারণা নতুন নয়। ১৯৬১ সালেই, তখনকার পূর্ব পাকিস্তান সময়, রূপপুর এলাকায় একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের প্রাথমিক উদ্যোগ নেওয়া হয়। জায়গা নির্ধারণও তখনই করা হয়েছিল। কিন্তু রাজনৈতিক পরিবর্তন, ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধ, অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতার অভাবে প্রকল্পটি দীর্ঘ সময় থেমে থাকে।
স্বাধীনতার পরও বিষয়টি পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। বিভিন্ন সময়ে আলোচনা হয়েছে, সম্ভাব্যতা যাচাই হয়েছে, কিন্তু বাস্তবায়নের পথে দৃশ্যমান অগ্রগতি আসে অনেক পরে। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সময়কালে সরকার আবার নতুনভাবে এই প্রকল্পকে গুরুত্ব দেয়। ১৯৯৮ সালে নীতিগতভাবে প্রকল্প বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কিন্তু তখনও অর্থায়ন, প্রযুক্তি এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্বের অভাবে কাজ এগোয়নি।
২০০৯ সালের পর থেকে প্রকল্পটি নতুন গতি পায়। বাংলাদেশ সরকার রাশিয়ার সঙ্গে পারমাণবিক সহযোগিতার বিষয়ে আলোচনা শুরু করে। ২০১০ এবং ২০১১ সালে দুই দেশের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির মাধ্যমে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক সংস্থা রোসাটম প্রকল্পটির প্রধান প্রযুক্তিগত অংশীদার হিসেবে যুক্ত হয়।
এরপর ২০১৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর মূল নির্মাণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির মাধ্যমেই প্রকল্পটি কাগজ থেকে বাস্তবের দিকে এগিয়ে যায়। ২০১৭ সালের ৩০ নভেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে নির্মাণ কাজ শুরু হয়, যখন প্রথম কংক্রিট ঢালার মাধ্যমে রিঅ্যাক্টর ইউনিটের কাজ উদ্বোধন করা হয়। এই ধাপটি আন্তর্জাতিকভাবে একটি বড় মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রকল্পে দুটি ইউনিট রয়েছে, প্রতিটির উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ১২০০ মেগাওয়াট। এখানে ব্যবহৃত হচ্ছে আধুনিক VVER 1200 প্রযুক্তির রিঅ্যাক্টর, যা নিরাপত্তা ব্যবস্থার দিক থেকে অত্যাধুনিক হিসেবে বিবেচিত। একাধিক সুরক্ষা স্তর, স্বয়ংক্রিয় কুলিং সিস্টেম এবং জরুরি পরিস্থিতিতে নিজে নিজে বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো ব্যবস্থা এতে অন্তর্ভুক্ত।
২০২১ এবং ২০২২ সালে রিঅ্যাক্টরের গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি স্থাপন শুরু হয়। ধাপে ধাপে রিঅ্যাক্টর ভেসেল, স্টিম জেনারেটরসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ উপাদান বসানো হয়। এরপর ২০২৩ সালের ৫ অক্টোবর একটি গুরুত্বপূর্ণ আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনী ধাপ সম্পন্ন হয়, যাকে বলা হয় কমিশনিং পর্যায়ের সূচনা। অর্থাৎ প্রকল্পটি চালুর দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
চালু হয়েছে কথাটির আসল অর্থ বোঝার জন্য ২০২৬ সালের ঘটনাটি জানা জরুরি। ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে রিঅ্যাক্টরে ইউরেনিয়াম জ্বালানি ঢোকানো বা ফুয়েল লোডিং শুরু হয়। এই ধাপটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এর মাধ্যমেই পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরু করার প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া কাজ করে, যাকে বলা হয় নিউক্লিয়ার ফিশন। ইউরেনিয়ামের পরমাণু ভেঙে বিপুল পরিমাণ তাপ উৎপন্ন হয়। এই তাপ দিয়ে পানি বাষ্পে রূপান্তরিত হয়, বাষ্প টারবাইন ঘোরায়, আর টারবাইন ঘুরে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। অর্থাৎ এখানে কোনো কয়লা বা তেল পোড়ানো হয় না, তাই ধোঁয়া দেখা যায় না।
এখন প্রশ্ন হলো, এটি কি পুরোপুরি চালু হয়ে গেছে?
সোজা উত্তর হলো, না, এখনও পুরোপুরি বাণিজ্যিকভাবে চালু হয়নি। এখন চলছে পরীক্ষামূলক চালনা, নিরাপত্তা যাচাই এবং ধাপে ধাপে ক্ষমতা বাড়ানোর প্রক্রিয়া। সাধারণত এই ধাপ শেষ হতে কিছুটা সময় লাগে। পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২৬ থেকে ২০২৭ সালের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হওয়ার কথা।
এই প্রকল্প শুধু একটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র নয়, এটি বাংলাদেশের জন্য একটি বড় প্রযুক্তিগত ও কৌশলগত পদক্ষেপ। এটি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা বাড়াবে, কার্বন নির্গমন কমাতে সাহায্য করবে এবং উচ্চপ্রযুক্তি খাতে নতুন দক্ষতা তৈরি করবে।
ধোঁয়া না দেখা নিয়ে যে প্রশ্ন ওঠে, সেটাই আসলে এই প্রযুক্তির স্বাভাবিক চিত্র। এখানে আগুন নেই, ধোঁয়া নেই, কিন্তু ভেতরে চলছে অত্যন্ত শক্তিশালী ও নিয়ন্ত্রিত এক প্রক্রিয়া, যা থেকে তৈরি হবে দেশের জন্য বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ।
সবকিছু মিলিয়ে, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র একটি দীর্ঘ প্রতীক্ষার বাস্তব রূপ, যেখানে ১৯৬১ সালের একটি ধারণা আজ আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে বাস্তবতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
সবকিছুর শেষে রূপপুর শুধু একটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র নয়, এটি বাংলাদেশের দীর্ঘ ইতিহাস, প্রতীক্ষা এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতার এক বাস্তব ঘোষণাপত্র, যেখানে ১৯৬১ সালের একটি ধারণা আজ একটি জাতির ভবিষ্যৎ শক্তির ভিত্তি হয়ে উঠছে।
রহমান মৃধা, গবেষক ও লেখক, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন।
মত দ্বিমত
রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব, প্রভাবমুক্ত প্রশাসন এবং জনগণকেন্দ্রিক পুনর্গঠনের আহ্বান
বাংলাদেশকে বাঁচাতে চাইলে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রতিটি স্তরকে সম্পূর্ণভাবে প্রভাবমুক্ত করতে হবে। এর অর্থ হলো, রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক কাঠামো, নিরাপত্তা ব্যবস্থা, কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত এবং নীতিনির্ধারণ কোনো বহিরাগত প্রভাব দ্বারা নির্ধারিত হবে না। বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক রাখবে একটি স্বাভাবিক, সার্বভৌম এবং কূটনৈতিক রাষ্ট্রীয় সম্পর্ক হিসেবে, যেমন বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে রাখে। তবে এই সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি বিষয় স্পষ্ট থাকা জরুরি, রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের প্রভাব বা হস্তক্ষেপ গ্রহণযোগ্য হবে না। এ বিষয়ে রাষ্ট্রকে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করতে হবে।
রাষ্ট্রের সকল গুরুত্বপূর্ণ সেক্টরের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের নিয়োগ, দায়িত্ব বণ্টন এবং পদায়ন কোনোভাবেই বহির্বিশ্বের প্রভাব বা হস্তক্ষেপ দ্বারা নির্ধারিত হতে পারবে না। রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের মৌলিক শর্ত হলো, কে প্রধানমন্ত্রী হবেন, কে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হবেন, কে সেনাবাহিনীর জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন, কে ডিজিএফআই বা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা সংস্থার দায়িত্বে থাকবেন, এবং কে সচিব বা প্রশাসনের শীর্ষ পদে আসীন হবেন, এসব সিদ্ধান্ত একান্তই বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সাংবিধানিক ও রাষ্ট্রীয় প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই নির্ধারিত হবে। প্রয়োজনে রাষ্ট্রীয় স্বার্থ রক্ষার জন্য সশস্ত্র বাহিনী এবং সিভিল সার্ভিসের প্রশাসনিক কাঠামোকে পুনর্গঠন ও সংস্কারের মাধ্যমে আরও শক্তিশালী, পেশাদার এবং সম্পূর্ণ প্রভাবমুক্ত করা যেতে পারে।
আজকের বাস্তবতা অত্যন্ত জটিল। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ে জনমনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। সচিবালয়, গোয়েন্দা কাঠামো এবং সশস্ত্র বাহিনীর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। এই সংকট হঠাৎ করে সৃষ্টি হয়নি, বরং দীর্ঘদিনের অস্বচ্ছতা, রাজনৈতিক প্রভাব এবং জবাবদিহিতার অভাবে এটি গভীর হয়েছে।
যাদের আমরা রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছি, তাদের একটি অংশ জনগণের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। দুর্নীতি এবং ক্ষমতার অপব্যবহার রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে দুর্বল করেছে। এর ফলে সাধারণ মানুষের আস্থা ক্রমাগত ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে। এই আস্থাহীনতাই আজকের সবচেয়ে বড় সংকট।
এই বাস্তবতা থেকে উত্তরণের জন্য আবেগ নয়, প্রয়োজন কাঠামোগত সংস্কার এবং দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় পুনর্গঠন।
বাংলাদেশকে শক্তিশালী করতে হলে যেসব পদক্ষেপ জরুরি,
- রাষ্ট্রের সব গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানকে সম্পূর্ণভাবে প্রভাবমুক্ত, পেশাদার এবং জবাবদিহিমূলক কাঠামোয় গড়ে তোলা।
- সশস্ত্র বাহিনী এবং নিরাপত্তা সংস্থাগুলোকে আধুনিক, দক্ষ এবং সম্পূর্ণ জাতীয় স্বার্থকেন্দ্রিক কাঠামোতে পুনর্গঠন করা।
- দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর এবং বাস্তব জিরো টলারেন্স নীতি কার্যকর করা।
- পররাষ্ট্রনীতিতে ভারসাম্য রক্ষা করে বহুমুখী সম্পর্ক বজায় রাখা, যাতে কোনো একক দেশের ওপর নির্ভরশীলতা তৈরি না হয়।
- জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে স্বচ্ছতা, তথ্যপ্রবাহ এবং অংশগ্রহণমূলক শাসনব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
বাংলাদেশ কোনো বিচ্ছিন্ন রাষ্ট্র নয়। এটি একটি ভূরাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ দেশ, যেখানে বিভিন্ন শক্তির স্বার্থ এবং উপস্থিতি রয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্রের মৌলিক নীতি হওয়া উচিত একটাই, সিদ্ধান্ত নেবে বাংলাদেশ নিজে, বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থে।
শক্তি কখনো একক নির্ভরতায় নয়, বরং ভারসাম্য এবং আত্মনির্ভরতার মধ্যে নিহিত। তাই কোনো একটি দেশের সঙ্গে সম্পর্ক যেমন থাকবে, তেমনি সেই সম্পর্ক কখনোই রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারবে না।
করণীয়
১. রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা।
২. প্রশাসন, নিরাপত্তা এবং কূটনৈতিক কাঠামোতে মেধাভিত্তিক নিয়োগ নিশ্চিত করা।
৩. দুর্নীতি দমন সংস্থাগুলোকে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দেওয়া।
৪. বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা।
৫. নির্বাচনী ব্যবস্থাকে নিরপেক্ষ ও জনগণের আস্থাভাজন করে পুনর্গঠন করা।
৬. পররাষ্ট্রনীতিতে ভারসাম্য এবং বহুমুখী সম্পর্ক বজায় রাখা।
৭. শিক্ষা, গবেষণা এবং নৈতিক মূল্যবোধে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা।
৮. গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং মতপ্রকাশের নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা।
৯. রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতা এবং জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।
১০. জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে ঐক্যবদ্ধ রাষ্ট্রীয় চেতনা গড়ে তোলা।
বর্জনীয়
১. রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তকে কোনো বহিরাগত প্রভাবের অধীন করা।
২. প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় বা ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহার করা।
৩. দুর্নীতি বা অনিয়মকে কোনোভাবেই প্রশ্রয় দেওয়া।
৪. অস্বচ্ছ এবং গোপন সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া বজায় রাখা।
৫. মতপ্রকাশের স্বাধীনতা দমন করা।
৬. একপাক্ষিক পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করা।
৭. গুজব এবং অপপ্রচারের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া।
৮. রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করে এমন অভ্যন্তরীণ বিভাজন সৃষ্টি করা।
৯. দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থের চেয়ে স্বল্পমেয়াদি রাজনৈতিক লাভকে অগ্রাধিকার দেওয়া।
১০. জনগণের আস্থাকে উপেক্ষা করা।
বাংলাদেশ কি সত্যিকার অর্থে একটি প্রভাবমুক্ত, জবাবদিহিমূলক এবং জনগণকেন্দ্রিক রাষ্ট্র হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে পারবে, নাকি আস্থা সংকট, অস্বচ্ছতা এবং নির্ভরতার পুরোনো চক্রে আটকে থাকবে। এই সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ।
রহমান মৃধা, গবেষক ও লেখক
সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন
মত দ্বিমত
টেকসই খাদ্য নিরাপত্তার জন্য সৌরশক্তির মাধ্যমে গ্রামীণ কৃষক ক্ষমতায়ন
বর্তমান বিশ্ব এক বহুমাত্রিক সংকটের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। জলবায়ু পরিবর্তন, ভূরাজনৈতিক সংঘাত, জ্বালানি অস্থিরতা এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের ভাঙন মানবসভ্যতার ভিত্তিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে। এই সংকটের কেন্দ্রে রয়েছে খাদ্য নিরাপত্তা, যা এখন আর শুধুমাত্র কৃষি উৎপাদনের বিষয় নয়; এটি শক্তি, প্রযুক্তি, পরিবেশ এবং ন্যায়বিচারের সমন্বিত প্রশ্ন।
বাংলাদেশ এই বৈশ্বিক সংকটের একটি অনন্য প্রতিচ্ছবি। এখানে রয়েছে উর্বর মাটি, প্রখর সূর্যালোক, আবার একই সাথে অতিবৃষ্টি, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, লবণাক্ততা এবং বজ্রপাতের মতো চ্যালেঞ্জ। এই ট্রপিকাল বাস্তবতা কৃষিকে যেমন সম্ভাবনাময় করেছে, তেমনি অনিশ্চিতও করে তুলেছে।
এই বাস্তবতার সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য হলো যারা খাদ্য উৎপাদন করেন, সেই গ্রামীণ কৃষকরাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে। ফসিল জ্বালানিনির্ভর সেচ ও উৎপাদন ব্যবস্থার অস্থিরতা তাঁদের ব্যয় বাড়াচ্ছে, উৎপাদন কমাচ্ছে এবং মাটির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে।
যদি এই ধারা অব্যাহত থাকে, তাহলে শুধু কৃষি নয়, আমাদের খাদ্যভিত্তিক নিরাপত্তা এবং পরিবেশগত ভারসাম্য উভয়ই বিপন্ন হয়ে পড়বে। তাই এই প্রস্তাব একটি উন্নয়ন পরিকল্পনা নয়, বরং একটি সমন্বিত রূপান্তরের আহ্বান।
গ্রামীণ কৃষি ও মৎস্যখাতকে ফসিল জ্বালানিনির্ভরতা থেকে মুক্ত করে একটি বিকেন্দ্রীভূত, সৌরশক্তিনির্ভর, পরিবেশ-সহনশীল এবং মাটি-বান্ধব উৎপাদন ব্যবস্থায় রূপান্তর করা, যেখানে শক্তি, পানি এবং মাটির স্বাস্থ্য একত্রে কাজ করে একটি স্থিতিশীল খাদ্যব্যবস্থা গড়ে তোলে।
প্রধান উদ্দেশ্যসমূহ:
- সৌরচালিত, তথ্যনির্ভর সেচ ব্যবস্থার মাধ্যমে পানি ব্যবহারের দক্ষতা বৃদ্ধি করা।
- মৎস্যচাষে টেকসই সৌর প্রযুক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করা।
- কৃষকদের উৎপাদন ব্যয় কমানো এবং আয়ের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা।
- মাটির উর্বরতা সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধারের সাথে শক্তি ব্যবস্থাকে সংযুক্ত করা।
- কার্বন নিঃসরণ হ্রাস করে জলবায়ু সহনশীল কৃষি গড়ে তোলা।
- গ্রামীণ অর্থনীতিকে প্রযুক্তিনির্ভর ও স্থিতিশীল ভিত্তির ওপর দাঁড় করানো।
বাংলাদেশের কৃষি ব্যবস্থায় সৌরশক্তির প্রয়োগ শুধুমাত্র প্রযুক্তি স্থাপন নয়; এটি একটি অভিযোজন প্রক্রিয়া, যেখানে প্রযুক্তিকে দেশের ট্রপিকাল পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে হবে। এই প্রেক্ষাপটে নিম্নলিখিত বিষয়গুলো অপরিহার্য,
- ঝড় ও ঘূর্ণিঝড় সহনশীল সৌর প্যানেল স্থাপন কাঠামো
- বজ্রপাত প্রতিরোধ ব্যবস্থা সংযুক্ত করা
- বন্যাপ্রবণ এলাকায় উঁচু প্ল্যাটফর্মে সৌর স্থাপনা
- উচ্চ তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা সহনশীল উপকরণ ব্যবহার
- সৌরশক্তি, ব্যাটারি এবং প্রয়োজনে গ্রিড সমন্বিত হাইব্রিড ব্যবস্থা
এই অভিযোজন নিশ্চিত না হলে প্রযুক্তি টেকসই হবে না, বরং নতুন ঝুঁকি তৈরি করবে। টেকসই কৃষির মূল ভিত্তি হলো মাটির স্বাস্থ্য। তাই শক্তি ব্যবস্থাকে মাটির উর্বরতার সাথে সরাসরি সংযুক্ত করতে হবে।
সৌরচালিত নির্ভুল সেচ ব্যবস্থার মাধ্যমে অতিরিক্ত পানি ব্যবহার কমানো, ফলে মাটির পুষ্টি ক্ষয় রোধ। জৈব সার উৎপাদন ও প্রক্রিয়াকরণে সৌরশক্তির ব্যবহারে ফসল সংরক্ষণের জন্য সৌরচালিত কোল্ড স্টোরেজ, যা উৎপাদনের ওপর অতিরিক্ত চাপ কমায়। পানি, মাটি ও শক্তিকে একত্রে একটি সমন্বিত কৃষি ব্যবস্থায় রূপান্তর।
এই পদ্ধতি মাটিকে শুধু রক্ষা করে না, বরং দীর্ঘমেয়াদে তার উর্বরতা পুনরুদ্ধার করে।
প্রস্তাবিত কার্যক্রম
১. সৌরচালিত স্মার্ট সেচ পাম্প স্থাপন, সেন্সরভিত্তিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে মাটির আর্দ্রতা অনুযায়ী স্বয়ংক্রিয় সেচ নিশ্চিত করা।
২. মৎস্যখাতে সৌর প্রযুক্তির সম্প্রসারণ, এয়ারেশন, পানি সঞ্চালন এবং খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় সৌরশক্তির ব্যবহার।
৩. প্রশিক্ষণ ও সক্ষমতা বৃদ্ধি, কৃষক ও স্থানীয় প্রযুক্তিবিদদের ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ প্রদান, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে জ্ঞান ছড়িয়ে দেওয়া।
৪. উদ্ভাবনী অর্থায়ন ব্যবস্থা, সহজ শর্তে ঋণ, সমবায় ভিত্তিক বিনিয়োগ এবং ক্ষুদ্র অর্থায়ন মডেল চালু করা, যেখানে Grameen Shakti-এর অভিজ্ঞতা কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা যেতে পারে।
৫. গ্রামীণ এনার্জি হাব গঠন, স্থানীয় পর্যায়ে সৌরশক্তি উৎপাদন, সংরক্ষণ এবং কৃষিতে ব্যবহার সমন্বিতভাবে পরিচালনা।
প্রত্যাশিত ফলাফল
কৃষি ও মৎস্য উৎপাদনে স্থিতিশীল ও টেকসই বৃদ্ধি। ফসিল জ্বালানির ওপর নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস। কৃষকদের আয়ের পূর্বানুমানযোগ্যতা ও স্থিতিশীলতা বৃদ্ধি। মাটির উর্বরতা সংরক্ষণ ও উন্নতি। পরিবেশ দূষণ ও কার্বন নিঃসরণ হ্রাস।
একটি বাস্তবসম্মত, সম্প্রসারণযোগ্য গ্রামীণ উন্নয়ন মডেল প্রতিষ্ঠা
আমাদের কৃষকরা যুদ্ধ করেন না, কিন্তু প্রতিদিন বেঁচে থাকার সংগ্রাম করেন। তাঁরা অস্ত্র তৈরি করেন না, তাঁরা জীবন তৈরি করেন। অথচ আজ তাঁরা এমন এক সংকটের মুখোমুখি, যা তাঁদের সৃষ্টি নয়।
এই বাস্তবতায় সৌরশক্তি শুধু একটি বিকল্প নয়, এটি একটি কৌশলগত মুক্তির পথ। এটি কৃষকদের ব্যয় কমায়, উৎপাদন স্থিতিশীল করে, মাটিকে রক্ষা করে এবং পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখে।
যদি আমরা এখনো এই রূপান্তর শুরু না করি, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে আমাদের জবাবদিহি এড়ানোর কোনো সুযোগ থাকবে না। এখনই সময় প্রযুক্তিকে বাস্তবতার সাথে মিলিয়ে কৃষকদের পাশে দাঁড়ানোর, এবং একটি টেকসই, ন্যায়ভিত্তিক ও নিরাপদ ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার।
রহমান মৃধা, গবেষক ও লেখক, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন।
মত দ্বিমত
রাষ্ট্র, শিক্ষা এবং দৃষ্টিভঙ্গির সংকট: বাংলাদেশের কাঠামোগত ব্যর্থতা ও করণীয়
বাংলাদেশের রাষ্ট্র কাঠামো এবং শিক্ষা ব্যবস্থার সংকটকে আলাদা করে দেখা একটি ভুল। বাংলাদেশের সংবিধান যেভাবে বাস্তব অর্থে জনগণের মৌলিক অধিকারকে কার্যকর করার ভিত্তিতে গড়ে ওঠেনি, ঠিক একইভাবে দেশের শিক্ষাব্যবস্থাও মানুষের বাস্তব প্রয়োজন, সক্ষমতা এবং সামাজিক বাস্তবতার ওপর দাঁড়িয়ে নির্মিত হয়নি। এই দুই ক্ষেত্রেই একটি মৌলিক সমস্যা স্পষ্ট, কাঠামো আছে, কিন্তু তার ভেতরে বাস্তবতার কোনো ভিত্তি নেই।
বাংলাদেশে শিক্ষা কখনোই শিক্ষার্থীর স্বপ্ন, সক্ষমতা বা সমাজের প্রয়োজনকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠেনি। বরং বরাবরই প্রভাবশালী ব্যক্তি, নীতিনির্ধারক বা ক্ষমতাসীনদের ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি এবং স্বপ্নকে শিক্ষার্থীদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। ফলে একটি কৃত্রিম কাঠামো তৈরি হয়েছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা শিখছে, কিন্তু সেই শিক্ষা বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করার মতো দক্ষতা, মানসিকতা বা অবকাঠামো তৈরি হচ্ছে না।
এই ব্যর্থতার সবচেয়ে স্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যায় নীতিনির্ধারণের ভাষায়। একজন নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষামন্ত্রী যখন শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতা, শিক্ষার মান, শিক্ষক প্রশিক্ষণ বা গবেষণার ঘাটতি নিয়ে কথা না বলে নিজের ব্যক্তিগত “স্বপ্ন” তুলে ধরেন, তখন সেটি কেবল একটি বক্তব্য নয়, বরং পুরো ব্যবস্থার দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন। এখানে নীতি নেই, আছে ব্যক্তিকেন্দ্রিক আকাঙ্ক্ষা। এখানে পরিকল্পনা নেই, আছে ঘোষণামূলক উচ্চারণ।
এই প্রবণতা বিচ্ছিন্ন নয়। রাষ্ট্রের পরিকাঠামো থেকে শুরু করে শিক্ষা, প্রশাসন, এমনকি আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়াতেও একই ধারা দেখা যায়। বাস্তবতা, গবেষণা বা জনগণের প্রয়োজনের ভিত্তিতে কিছু গড়ে তোলার বদলে, অনুকরণ, নকল এবং ক্ষমতাবানদের ইচ্ছাকে প্রাধান্য দিয়ে কাঠামো বসানো হয়েছে। ফলে যা দাঁড়িয়েছে তা হলো একটি “দেখতে সিস্টেম”, কিন্তু কার্যকর কোনো সিস্টেম নয়।
সংসদীয় কাঠামোর দিকেও তাকালে একই চিত্র স্পষ্ট। বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ এর সদস্যদের মূল দায়িত্ব আইন প্রণয়ন, নীতির পর্যালোচনা এবং রাষ্ট্রের ভিত্তি শক্তিশালী করা। কিন্তু বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রেই এই জায়গাটি পরিণত হয়েছে আনুগত্য প্রদর্শনের মঞ্চে, যেখানে যুক্তির বদলে টেবিল চাপড়ানো, জবাবদিহিতার বদলে স্বজনপ্রীতি সমর্থন করা হয়। এই বাস্তবতায় একটি শক্তিশালী শিক্ষা কাঠামো গড়ে ওঠার প্রত্যাশা করা অবাস্তব।
ফলে আমরা যে অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছি তা হলো একটি গভীর বৈপরীত্য। কাগজে সংবিধান আছে, শিক্ষাব্যবস্থা আছে, প্রতিষ্ঠান আছে, কিন্তু সেগুলো কার্যকর করার মতো মানসিকতা, দক্ষতা এবং জবাবদিহিতা নেই। এই অবস্থায় শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন কোনো কারিগরি সংস্কারের মাধ্যমে সম্ভব নয়, কারণ সমস্যাটি কারিকুলাম বা পরীক্ষা পদ্ধতিতে সীমাবদ্ধ নয়, এটি একটি দৃষ্টিভঙ্গির সংকট।
যতদিন পর্যন্ত রাষ্ট্র, নীতিনির্ধারক এবং রাজনৈতিক নেতৃত্ব জনগণের প্রয়োজনকে কেন্দ্র করে চিন্তা করা শুরু না করবে, ততদিন পর্যন্ত শিক্ষা ব্যবস্থাও ব্যক্তিকেন্দ্রিক স্বপ্ন আর অনুকরণের মধ্যে আটকে থাকবে। আর সেই অবস্থায় কোনো সংস্কারই টেকসই হবে না।
এই দৃষ্টিভঙ্গিগত সংকটের বাস্তব প্রতিফলন দেখা যায় শিক্ষা ব্যবস্থার বর্তমান কাঠামোর ভেতরে।
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে যদি বাস্তবতার আলোকে বিশ্লেষণ করা হয়, তাহলে প্রথমেই যে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে তা হলো, এটি একটি “সংযুক্ত ব্যবস্থা” নয়, বরং বিচ্ছিন্ন কিছু স্তরের সমষ্টি। প্রাথমিক, মাধ্যমিক এবং উচ্চশিক্ষা একে অপরের সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে যুক্ত থাকার কথা, কিন্তু বাস্তবে প্রতিটি স্তর আলাদা একটি কাঠামোর মতো কাজ করে, যেখানে লক্ষ্য, পদ্ধতি এবং ফলাফলের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে।
এই ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা কারিকুলাম এবং বাস্তবতার মধ্যে গভীর বিচ্ছিন্নতা। শিক্ষার্থীরা যে জ্ঞান অর্জন করছে, তার বড় অংশই পরীক্ষাকেন্দ্রিক এবং তাত্ত্বিক। কিন্তু সেই জ্ঞান বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করার সুযোগ, অনুশীলন বা কাঠামো নেই। ফলে শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য, অর্থাৎ সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা তৈরি করা, সেটি পূরণ হয় না। শিক্ষার্থীরা শিখছে, কিন্তু তারা “কীভাবে ব্যবহার করবে” সেই দক্ষতা তৈরি হচ্ছে না।
মূল্যায়ন পদ্ধতি এই সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলেছে। বর্তমান পরীক্ষানির্ভর কাঠামোতে মুখস্থ করা তথ্যই মূল মাপকাঠি। বিশ্লেষণধর্মী চিন্তা, সৃজনশীলতা বা বাস্তব সমস্যার সমাধান করার ক্ষমতা এখানে প্রায় অনুপস্থিত। ফলে একটি বিপরীতমুখী বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, যেখানে ভালো ফলাফল মানেই ভালো দক্ষতা নয়। একজন শিক্ষার্থী উচ্চ নম্বর পেতে পারে, কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার বা সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে দুর্বল থাকতে পারে।
শিক্ষক প্রস্তুতি এবং গবেষণার ক্ষেত্রেও একই ধরনের সীমাবদ্ধতা দেখা যায়। শিক্ষকতা একটি জ্ঞাননির্ভর এবং দক্ষতাভিত্তিক পেশা হওয়া সত্ত্বেও, অনেক ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ, গবেষণা পরিবেশ এবং প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার অভাব রয়েছে। এর ফলে শিক্ষা একটি গতিশীল প্রক্রিয়া হিসেবে বিকশিত না হয়ে, স্থির এবং পুনরাবৃত্তিমূলক হয়ে পড়ে।
নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রেও একটি মৌলিক সমস্যা কাজ করছে, যা প্রথম অংশে উল্লিখিত দৃষ্টিভঙ্গির সংকটের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। শিক্ষা নীতি দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা, তথ্য এবং বাস্তব প্রয়োজনের ভিত্তিতে তৈরি হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে এটি ব্যক্তিকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি, রাজনৈতিক অগ্রাধিকার এবং স্বল্পমেয়াদি সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। ফলে নীতির ধারাবাহিকতা থাকে না, এবং প্রতিটি পরিবর্তন নতুন একটি অনিশ্চয়তা তৈরি করে।
এই পুরো ব্যবস্থার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, শিক্ষা এবং কর্মসংস্থানের মধ্যে দুর্বল সংযোগ। শিক্ষার্থীরা দীর্ঘ সময় ধরে একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে পড়াশোনা করলেও, সেই জ্ঞান সরাসরি কর্মক্ষেত্রে প্রয়োগ করার সুযোগ বা কাঠামো পায় না। এর ফলে শিক্ষিত বেকারত্ব, দক্ষতার অপব্যবহার এবং হতাশা বৃদ্ধি পায়।
সবশেষে, একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা একটি কাঠামো তৈরি করতে পেরেছে, কিন্তু সেই কাঠামো কার্যকর করার জন্য প্রয়োজনীয় মানসিকতা, দক্ষতা এবং সমন্বয় তৈরি করতে পারেনি। ফলে শিক্ষা একটি রূপ আছে, কিন্তু কার্যকারিতা সীমিত। আর এই সীমাবদ্ধতাই পরবর্তী ধাপে, বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এর মতো প্রতিষ্ঠানের ফলাফলে সরাসরি প্রতিফলিত হয়।
এই কাঠামোগত বাস্তবতা সবচেয়ে স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে উচ্চশিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণে।
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সংকট বোঝার জন্য প্রথমে একটি মৌলিক প্রশ্ন পরিষ্কার করা প্রয়োজন, এই ব্যবস্থা কি দেশের মানুষের বাস্তব প্রয়োজন, অর্থনৈতিক কাঠামো এবং সামাজিক প্রেক্ষাপটকে ভিত্তি করে তৈরি? বাস্তবতা হলো, না। এই ব্যবস্থার ভেতরে একটি কাঠামো আছে, কিন্তু সেই কাঠামোর সঙ্গে বাস্তবতার সংযোগ দুর্বল। ফলে শিক্ষা একটি কার্যকর সক্ষমতা তৈরি করার প্রক্রিয়া না হয়ে, অনেক ক্ষেত্রে একটি আনুষ্ঠানিক সার্টিফিকেট অর্জনের পথে সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে।
এই ব্যবস্থার প্রধান বৈশিষ্ট্য তিনটি স্তরে ধরা যায়।
প্রথমত, কারিকুলাম এবং বাস্তবতার বিচ্ছিন্নতা। শিক্ষার্থীরা যা শিখছে, তার বড় অংশই সরাসরি কর্মক্ষেত্র, গবেষণা বা উদ্ভাবনের সঙ্গে সংযুক্ত নয়।
দ্বিতীয়ত, মূল্যায়ন পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা। মুখস্থনির্ভর পরীক্ষা বিশ্লেষণ, সৃজনশীলতা এবং সমস্যা সমাধানের দক্ষতা যাচাই করতে পারে না।
তৃতীয়ত, নীতিনির্ধারণে ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা। শিক্ষা একটি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় কৌশল হওয়া উচিত, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে এটি ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি এবং ঘোষণাভিত্তিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।
এই প্রেক্ষাপটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কে একটি উদাহরণ হিসেবে দেখলে চিত্রটি আরও স্পষ্ট হয়। দেশের সবচেয়ে পুরোনো এবং মর্যাদাপূর্ণ এই প্রতিষ্ঠানটি তাত্ত্বিকভাবে জ্ঞান উৎপাদন, নেতৃত্ব তৈরি এবং গবেষণার কেন্দ্র হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে এটি এমন একটি ব্যবস্থার ভেতরে কাজ করে, যেখানে কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা তার সক্ষমতাকে বাধাগ্রস্ত করে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রতিবছর যে “ফিনিশড প্রোডাক্ট” বের হয়, অর্থাৎ গ্র্যাজুয়েট শিক্ষার্থীরা, তাদের অবদান চারটি স্তরে দেখা যায়।
ব্যক্তি পর্যায়ে তারা ডিগ্রি, পরিচয় এবং কিছু পরিমাণ জ্ঞান অর্জন করে, যা তাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করে। কিন্তু এখানে একটি মৌলিক পার্থক্য তৈরি হয়, জ্ঞান কি দক্ষতায় রূপান্তরিত হচ্ছে, নাকি শুধুই সার্টিফিকেট হিসেবে থেকে যাচ্ছে।
পরিবারের ক্ষেত্রে এই গ্র্যাজুয়েটরা প্রায়ই আর্থিক এবং সামাজিক পরিবর্তনের চালিকাশক্তি হয়। অনেক পরিবারে প্রথম উচ্চশিক্ষিত সদস্য হিসেবে তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু এই অবদান প্রধানত অর্থনৈতিক, জ্ঞানভিত্তিক বা মূল্যবোধভিত্তিক পরিবর্তন তুলনামূলকভাবে সীমিত থাকে।
সমাজের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা দেখা যায়। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর কাছ থেকে যে সমালোচনামূলক চিন্তা, ন্যায়বোধ এবং নেতৃত্ব প্রত্যাশিত, তা সবসময় প্রতিফলিত হয় না। অনেক ক্ষেত্রে তারা বিদ্যমান কাঠামোর সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেয়, পরিবর্তনের চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারে না।
রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে এই সীমাবদ্ধতা আরও স্পষ্ট। একজন গ্র্যাজুয়েট নীতিনির্ধারক, গবেষক বা উদ্যোক্তা হওয়ার সম্ভাবনা রাখে, কিন্তু বাস্তবতায় দক্ষতার অপব্যবহার, সীমিত সুযোগ এবং অনেক ক্ষেত্রে মেধা পাচারের কারণে এই সম্ভাবনা পূর্ণতা পায় না।
এই পুরো বিশ্লেষণ থেকে একটি সরল কিন্তু কঠিন সত্য সামনে আসে। সমস্যা কেবল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এর না, বরং পুরো শিক্ষা ইকোসিস্টেমের। একটি দুর্বল কাঠামোর ভেতরে থেকে কোনো প্রতিষ্ঠান একা বিশ্বমানের ফলাফল তৈরি করতে পারে না।
ফলে “ফিনিশড প্রোডাক্ট” এর গুণগত মান নির্ভর করছে না শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের উপর, বরং পুরো ব্যবস্থার উপর। যদি সেই ব্যবস্থা বাস্তবতা, দক্ষতা এবং জবাবদিহিতার উপর ভিত্তি করে পুনর্গঠন না করা হয়, তাহলে একই ধরণের গ্র্যাজুয়েট তৈরি হতে থাকবে, যারা ব্যক্তি এবং পরিবার পর্যায়ে সফল হতে পারে, কিন্তু সমাজ এবং রাষ্ট্রের কাঠামোগত পরিবর্তনে সীমিত ভূমিকা রাখবে। এই চিত্রের ভেতর থেকেই মূল সমস্যার গভীর নির্যাস স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
আগের আলোচনাগুলো একত্রে বিবেচনা করলে একটি বিষয় পরিষ্কার হয়ে ওঠে, বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সংকট কোনো একক ত্রুটি বা খাতভিত্তিক ব্যর্থতা নয়। এটি একটি সমন্বিত কাঠামোগত ব্যর্থতা, যার শিকড় রাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গি, নীতিনির্ধারণ এবং বাস্তবায়ন ব্যবস্থার গভীরে প্রোথিত।
প্রথমত, দৃষ্টিভঙ্গির সংকট
শিক্ষাকে কখনোই একটি কৌশলগত জাতীয় বিনিয়োগ হিসেবে দেখা হয়নি। বরং এটি দীর্ঘদিন ধরে সার্টিফিকেট অর্জনের একটি প্রক্রিয়ায় সীমাবদ্ধ থেকেছে। ফলে শিক্ষা ব্যবস্থার উদ্দেশ্য, পদ্ধতি এবং ফলাফলের মধ্যে একটি মৌলিক অসামঞ্জস্য তৈরি হয়েছে। এই সংকটটি সরাসরি প্রতিফলিত হয় বাংলাদেশের সংবিধান এর সেই বাস্তবতার সঙ্গে, যেখানে অধিকার স্বীকৃত, কিন্তু কার্যকর করার কাঠামো দুর্বল।
দ্বিতীয়ত, জবাবদিহিতার অনুপস্থিতি
নীতি প্রণয়ন থেকে শুরু করে বাস্তবায়ন পর্যন্ত কোথাও একটি কার্যকর জবাবদিহিতা কাঠামো গড়ে ওঠেনি। সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, কিন্তু তার ফলাফল মূল্যায়ন করা হয় না। ব্যর্থতার কোনো সুস্পষ্ট দায় নির্ধারণ হয় না। ফলে একই ধরনের সীমাবদ্ধতা বারবার পুনরাবৃত্তি হয়, এবং কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শেখার প্রক্রিয়া তৈরি হয় না।
তৃতীয়ত, কপি-পেস্ট উন্নয়ন মডেল
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় একটি প্রবণতা স্পষ্ট, তা হলো বাইরের কাঠামো অনুকরণ করা, কিন্তু সেই কাঠামো কার্যকর করার জন্য প্রয়োজনীয় প্রেক্ষাপট তৈরি না করা। উন্নত দেশের কারিকুলাম, মূল্যায়ন বা নীতির কিছু অংশ গ্রহণ করা হলেও, সেগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ অবকাঠামো, শিক্ষক প্রস্তুতি বা গবেষণা পরিবেশ তৈরি করা হয়নি। ফলে কাঠামোটি বাহ্যিকভাবে আধুনিক দেখালেও, বাস্তবে তা কার্যকর হয় না।
চতুর্থত, নীতিনির্ধারণে ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা
শিক্ষা নীতি একটি ধারাবাহিক এবং প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে এটি অনেক সময় ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর দৃষ্টিভঙ্গির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এর ফলে নীতির ধারাবাহিকতা নষ্ট হয়, এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার বদলে স্বল্পমেয়াদি সিদ্ধান্ত প্রাধান্য পায়।
এই চারটি সমস্যাকে একত্রে দেখলে একটি স্পষ্ট চিত্র তৈরি হয়। বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার ব্যর্থতা কোনো সম্পদের ঘাটতি বা একক ব্যবস্থাপনার ত্রুটির কারণে নয়, বরং এটি একটি গভীর কাঠামোগত এবং দৃষ্টিভঙ্গিগত সংকট। যতক্ষণ পর্যন্ত এই মূল সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সমাধান করা না হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত কোনো আংশিক সংস্কার বাস্তব পরিবর্তন আনতে পারবে না।
এই অবস্থান থেকেই পরবর্তী প্রশ্নটি আসে, করণীয় কী? এই নির্যাসের ভিত্তিতেই এখন করণীয় নির্ধারণ করা জরুরি হয়ে দাঁড়ায়।
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার বর্তমান সংকট কোনো একক সংস্কার বা প্রশাসনিক পরিবর্তনের মাধ্যমে সমাধানযোগ্য নয়। কারণ সমস্যাটি কাঠামোর ভেতরে সীমাবদ্ধ নয়, এটি দৃষ্টিভঙ্গি, নীতি এবং বাস্তবায়নের সমন্বিত ব্যর্থতার ফল। তাই করণীয় নির্ধারণ করতে হলে প্রথমে সমস্যার প্রকৃতি অনুযায়ী স্তরভিত্তিক সমাধান ভাবতে হবে।
শিক্ষার উদ্দেশ্য পুনঃসংজ্ঞায়ন
শিক্ষাকে কেবল চাকরি পাওয়ার মাধ্যম হিসেবে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বের হয়ে আসতে হবে। শিক্ষা কী তৈরি করবে, এটি রাষ্ট্রীয়ভাবে পরিষ্কার করতে হবে। একজন শিক্ষার্থী শুধু তথ্যভিত্তিক জ্ঞান নয়, বরং সমস্যা বিশ্লেষণ, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং বাস্তব পরিস্থিতি মোকাবেলার সক্ষমতা অর্জন করবে, এই লক্ষ্যকে কেন্দ্র করে পুরো ব্যবস্থাকে পুনর্গঠন করতে হবে।
কারিকুলাম এবং বাস্তবতার সংযোগ
কারিকুলামকে শ্রমবাজার, গবেষণা ক্ষেত্র এবং স্থানীয় সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করতে হবে। তত্ত্বের পাশাপাশি প্রয়োগভিত্তিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করতে হবে। শিক্ষা যেন শুধু শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং বাস্তব সমস্যার সঙ্গে সংযুক্ত থাকে, সেই কাঠামো তৈরি করতে হবে।
মূল্যায়ন ব্যবস্থার মৌলিক পরিবর্তন
মুখস্থনির্ভর পরীক্ষার সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসতে হবে। মূল্যায়নের কেন্দ্রবিন্দু হতে হবে বিশ্লেষণ, সৃজনশীলতা এবং বাস্তব সমস্যা সমাধান। একজন শিক্ষার্থী কীভাবে চিন্তা করে এবং কীভাবে সমস্যার সমাধান করে, সেটাই মূল মানদণ্ড হওয়া উচিত।
শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং গবেষণা পরিবেশ শক্তিশালী করা
শিক্ষককে শুধু পাঠদানকারী হিসেবে নয়, জ্ঞান উৎপাদনের অংশ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। নিয়মিত প্রশিক্ষণ, গবেষণার সুযোগ এবং প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা ছাড়া শিক্ষার মান উন্নয়ন সম্ভব নয়। শিক্ষক উন্নয়ন ছাড়া শিক্ষা উন্নয়ন কল্পনাও করা যায় না।
প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা
নীতি প্রণয়ন থেকে বাস্তবায়ন পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে ফলাফলভিত্তিক জবাবদিহিতা থাকতে হবে। কোন নীতি কী ফল দিচ্ছে, তা নিয়মিত মূল্যায়ন করতে হবে। ব্যর্থতার দায় নির্ধারণ না করলে একই ভুল পুনরাবৃত্তি হতে থাকবে।
বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থার পুনর্গঠন
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সহ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাব থেকে বাস্তবিক অর্থে স্বাধীন এবং গবেষণাভিত্তিক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়কে শুধু ডিগ্রি প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান না রেখে জ্ঞান উৎপাদন ও উদ্ভাবনের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
এই করণীয়গুলো কোনো বিচ্ছিন্ন সংস্কার নয়, বরং একটি সমন্বিত রূপান্তরের অংশ। যতদিন পর্যন্ত শিক্ষা ব্যবস্থাকে একটি জাতীয় সক্ষমতা গঠনের কৌশল হিসেবে দেখা না হবে, ততদিন পর্যন্ত কোনো পরিবর্তনই টেকসই হবে না।
রহমান মৃধা, গবেষক ও লেখক, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন।




