মত দ্বিমত
স্বৈরাচার, সংকট বা চাঁদাবাজি নয়, চাই দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ
বাংলাদেশ আজ এক গভীর রাজনৈতিক, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক সংকটের মুখোমুখি। শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনকাল দেশের ভবিষ্যৎকে অনিশ্চয়তার অন্ধকারে ঠেলে দিয়েছে। ক্ষমতার অপব্যবহার, দমননীতি, প্রশাসনিক দুর্নীতি এবং মানবাধিকারের অবমাননা রাষ্ট্রের ভিত্তিকে নড়বড়ে করে তুলেছে। ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশটি ধীরে ধীরে একনায়কতান্ত্রিক ব্যবস্থায় পরিণত হয়। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো অকার্যকর হয়ে পড়ে, সংবাদমাধ্যম শৃঙ্খলিত হয় এবং জনগণের কণ্ঠরোধ করা হয় নির্মমভাবে। এই শাসন কেবল বর্তমান নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বাধীনতাকেও বিপন্ন করেছে।
মানুষের মধ্যে ক্ষমতার লালসা একটি প্রাচীন প্রবণতা, কিন্তু যখন তা রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিতে পরিণত হয়, তখন সমাজে নৈতিকতা, ন্যায়বোধ এবং স্থিতিশীলতা ধ্বংস হয়ে যায়। শেখ হাসিনার সরকারের কর্মকাণ্ডে এই প্রবণতা স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। বিচার বিভাগ, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নিয়ন্ত্রণে রেখে তারা জনগণের অধিকারকে দীর্ঘ ষোলো বছর ধরে অবমূল্যায়ন করেছে। গুম, খুন, ভুয়া মামলা ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের দমন রাষ্ট্রনীতির অংশে পরিণত হয়েছিল। ক্ষমতার প্রতি শেখ পরিবারের অন্ধ আসক্তি দেশকে স্বৈরতন্ত্রের অন্ধগলিতে নিয়ে যায়। জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন এই শাসনব্যবস্থা জাতির মূল চেতনার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে। যখন জাতির পিঠ দেওয়ালে ঠেকে যায়, তখন শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে হওয়া গণঅভ্যুত্থান শেখ হাসিনার পতন ঘটায়। সেই মুহূর্ত জাতির আত্মমর্যাদার পুনর্জন্মের প্রতীক হয়ে ওঠে এবং স্পষ্ট করে দেয় যে শেখ পরিবার বাংলাদেশের জন্য এক অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক ঐতিহাসিক হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই সম্পর্ক সন্দেহ ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। তিস্তা চুক্তি ঝুলে থাকা, সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে নিরীহ নাগরিকদের মৃত্যু এবং বাংলাদেশের বাজারে ভারতের একচেটিয়া বাণিজ্যিক আধিপত্য জনগণের মধ্যে অসন্তোষ গভীর করেছে। ভারতের বিজেপি সরকারের সঙ্গে শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এ অঞ্চলের ভারসাম্য নষ্ট করেছে। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভারতের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ হস্তক্ষেপ দেশকে বিভক্ত করেছে এবং সার্বভৌমত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। জনগণ এখন বুঝেছে এই সম্পর্ক পারস্পরিক নয়, বরং একতরফা। জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় ব্যর্থতা ও প্রতিবেশীর প্রতি অন্ধ আনুগত্যের নীতি আর টেকসই নয়। প্রয়োজন সাহসী, কূটনৈতিক ও আত্মসম্মানবোধসম্পন্ন নেতৃত্ব, যা দেশকে আত্মনির্ভর ও স্বাধীন নীতির পথে ফিরিয়ে আনবে।
শেখ হাসিনার আমলে রাজনীতি পরিণত হয়েছিল ব্যক্তিগত ও পারিবারিক স্বার্থরক্ষার যন্ত্রে। সংবিধান বিকৃত করে, নির্বাচন ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে এবং প্রশাসনকে দলীয়করণের মাধ্যমে তিনি একদলীয় স্বৈরাচার প্রতিষ্ঠা করেন। সেনাবাহিনী, পুলিশ ও বিচার বিভাগ সবকিছু ব্যবহার করা হয়েছিল ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার হাতিয়ার হিসেবে। এর ফলে গণতন্ত্র ভেঙে পড়ে, নির্বাচন জনগণের মতপ্রকাশ নয় বরং পূর্বনির্ধারিত নাটকে পরিণত হয়। দুর্নীতি ও কালোটাকার প্রবাহে অর্থনীতি দমবন্ধ হয়ে পড়ে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বিলুপ্ত হয়, ভিন্নমত মানে নিপীড়ন, গুম ও কারাবাস। বিচার বিভাগ ন্যায়ের বদলে ক্ষমতার যন্ত্রে পরিণত হয়। এটি কেবল রাজনৈতিক নয়, নৈতিক ও সাংবিধানিক সংকটও বটে।
এই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের চাবিকাঠি তরুণ প্রজন্মের হাতে। তাদের মধ্যেই রয়েছে পরিবর্তনের শক্তি, উদ্ভাবনের ক্ষমতা ও ন্যায়ের প্রতি অঙ্গীকার। এই শক্তিকে সংগঠিত করতেই গড়ে উঠছে ফিউচার ফাউন্ডেশন অফ বাংলাদেশ—একটি আন্দোলন, একটি স্বপ্ন এবং একটি দায়িত্ববোধ। এই ফাউন্ডেশন তরুণদের মধ্যে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও ইতিহাসের সত্য শিক্ষা ছড়িয়ে দিতে পারে, নতুন নেতৃত্ব গড়ে তুলতে পারে এবং সমাজে ন্যায়বিচার ও মানবিক মূল্যবোধ পুনঃপ্রতিষ্ঠায় ঐক্যবদ্ধ ভূমিকা রাখতে পারে। ফিউচার ফাউন্ডেশন কেবল একটি সংগঠন নয়, এটি বাংলাদেশের নতুন সামাজিক চুক্তির ভিত্তি—একটি প্রজন্মের অঙ্গীকার, যে দেশকে অন্ধকার থেকে আলোয় নিয়ে যাবে।
দীর্ঘ দমনমূলক শাসনের বিরুদ্ধে জনগণের ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধের ফলেই আজ গঠিত হয়েছে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে। এই সরকার বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও নৈতিক পুনর্গঠনের এক ঐতিহাসিক উদ্যোগ। এর লক্ষ্য স্বাধীন ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করা, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা রক্ষা করা, মৌলিক অধিকার ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ফিরিয়ে আনা এবং গণতন্ত্রের টেকসই ভিত্তি গঠন করা। এই সরকার কেবল একটি সংকটের প্রতিক্রিয়া নয়, বরং একটি নতুন জাতীয় দিকনির্দেশনা।
ড. মুহাম্মদ ইউনূস বিশ্বব্যাপী ন্যায়ভিত্তিক অর্থনীতি ও মানবিক উন্নয়নের প্রতীক। এখন তিনি বাংলাদেশের গণতন্ত্র পুনর্গঠনের কেন্দ্রে। তার নেতৃত্ব রাজনৈতিকের চেয়ে বেশি নৈতিক, কারণ তিনি দেশকে মানবিক ও সমতাভিত্তিক পথে ফিরিয়ে আনার জন্য কাজ করছেন। তার নেতৃত্বে বাংলাদেশের মানুষ নতুন করে আস্থা অর্জন করছে, তারা বিশ্বাস করছে যে একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গঠন করা সম্ভব যেখানে মানবিক মূল্যবোধই হবে প্রশাসনের মূলে।
বাংলাদেশ আবারও এক নতুন সূচনার দ্বারপ্রান্তে। দমন ও বিভাজনের অন্ধ অধ্যায় পেরিয়ে দেশ আজ নতুন আলো দেখছে। এই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নেতৃত্বে জাতি প্রমাণ করছে যে সংকট যত গভীরই হোক, ঐক্যবদ্ধ জাতি ও সৎ নেতৃত্বের কাছে তা কখনও অজেয় নয়। গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠার এই যাত্রায় নতুন প্রজন্মই হবে নেতৃত্বের মশালবাহক। বাংলাদেশ প্রমাণ করবে, সংকট কখনও পরাজয় নয়, এটি নতুন সূর্যোদয়ের আগমনী বার্তা।
তবে প্রশ্ন থেকে যায়, বর্তমানে যা ঘটছে, তা কি সত্যিই সেই প্রত্যাশিত পরিবর্তনের প্রতিফলন? ড. ইউনূস ও তার অন্তর্বর্তীকালীন উপদেষ্টারা দেশের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি মোকাবিলায় যে পদক্ষেপ নিয়েছেন, তাতে অনেকের কাছে এই ধারণা জন্মেছে যে, সেখানে এখনো ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত স্বার্থই প্রাধান্য পাচ্ছে। তবে এই আশার পথেও চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। হতে পারে রাজনৈতিক দলগুলো কথা দিয়ে কথা রাখেনি, কিংবা প্রশাসনও তার দায়িত্ব পুরোপুরি পালন করতে পারেনি।
তবে যে আলোয় আমরা নতুন সূচনা খুঁজছি, সেই আলো তখনই স্থায়ী হবে যখন আত্মসমালোচনার সাহস আমাদের থাকবে, কে কোথায় ভুল করেছে, কেন সেই ভুল পুনরাবৃত্তি হচ্ছে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
দেশের জনসংখ্যার বড় অংশ তরুণ, কিন্তু বেকারত্বের হারও উদ্বেগজনকভাবে বেশি। ফলে এই বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীর এক অংশ নানা রাজনৈতিক গোষ্ঠীর প্রভাবে তাদের শক্তি ব্যবহার করছে ভুল পথে, দলীয় স্বার্থে, এমনকি দুর্নীতির হাতিয়ার হিসেবেও। এই প্রবণতা যদি নিয়ন্ত্রণে না আনা যায়, তবে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। একদিকে প্রতিবেশী দেশের প্রভাব ও রাজনৈতিক প্ররোচনা, অন্যদিকে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে বিভ্রান্তিকর নেতৃত্বের আহ্বান, সব মিলিয়ে তরুণ সমাজ এক জটিল দ্বন্দ্বের মধ্যে পড়েছে।
বর্তমান প্রজন্মের হাতেই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ। কিন্তু যদি তাদের মধ্যে গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও মানবিক মূল্যবোধের বোধ গড়ে না ওঠে, তাহলে এই প্রজন্মই হয়ে উঠতে পারে নেতৃত্বের অন্ধকার মশালবাহক, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে নতুন এক ভয়াবহ অধ্যায় রচনা করবে। অথচ তারাই আজ আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি শিক্ষিত, প্রযুক্তিসচেতন ও ন্যায়ের পক্ষে সোচ্চার। তাই কেবল ব্যক্তিগত উন্নয়ন নয়, দেশের প্রতি দায়বদ্ধতার জায়গায় দাঁড়িয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে নৈতিকতা, সততা ও দেশের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে। দুর্নীতিমুক্ত, ন্যায়ের ভিত্তিতে একটি নতুন বাংলাদেশ গড়ে তোলার জন্য নিজেদের শক্তি ও বিবেককে কাজে লাগানোই এখন সময়ের দাবি।
বিশ্বজুড়ে গণতন্ত্র ও সুশাসনের সংগ্রাম অব্যাহত, বাংলাদেশও তার ব্যতিক্রম নয়। দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে নতুন প্রজন্মের জাগরণ ইতিমধ্যেই স্পষ্ট। যদি তরুণরা দেশপ্রেম, সততা ও সাহসিকতার পথে এগিয়ে যায়, তবে একদিন এই দেশও হবে দুর্নীতিমুক্ত ও সমৃদ্ধ।
দায়িত্ববান নাগরিক হওয়ার প্রথম শর্ত নৈতিকতা ও সততা। একজন সত্যিকারের দেশপ্রেমিক তার বিবেক বিক্রি করে না, বরং জাতির মঙ্গলের জন্য সিদ্ধান্ত নেয়। ভোট মানে নেতৃত্ব বেছে নেওয়া, সামান্য অর্থের বিনিময়ে ভোট বিক্রি মানে নিজের ভবিষ্যৎকে বিক্রি করা। সুবিধা পেতে তোষামোদ নয়, সত্যের পাশে দাঁড়াতে হবে। সমাজের উন্নয়ন কেবল সৎ মানুষদের হাতেই সম্ভব।
আমাদের সমাজে অন্যায় ও দুর্নীতি নিত্যদিনের বাস্তবতা, কিন্তু এর বিরুদ্ধে নীরব থাকা মানে অন্যায়কে টিকিয়ে রাখা। প্রত্যেক নাগরিকের দায়িত্ব সত্যের পক্ষে কথা বলা। ভয় নয়, বিবেকের নির্দেশই হোক পথপ্রদর্শক। সৎ নাগরিক কখনও প্রলোভনে পড়ে না, নিজের নৈতিকতা ও দেশের মর্যাদা রক্ষাই তার সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। গণতন্ত্র মানে শুধু ভোট নয়, প্রতিদিনের ন্যায় ও সমতার চর্চা। যেখানে অন্যায় দেখা যাবে, সেখানেই আওয়াজ তুলতে হবে। গণতন্ত্র টিকে থাকে নাগরিকের সাহসের উপর, নীরবতার উপর নয়।
আজকের যুগে সোশ্যাল মিডিয়া এক নতুন গণতান্ত্রিক প্ল্যাটফর্ম। ফেসবুক, টুইটার বা ইউটিউব হয়ে উঠেছে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর মাধ্যম। এই প্রযুক্তিকে ব্যবহার করতে হবে ন্যায়ের প্রতিষ্ঠার জন্য, বিভাজন নয় ঐক্যের জন্য।
দুর্নীতি মানে শুধু অর্থের ক্ষতি নয়, এটি জাতির মর্যাদা ও জনগণের আস্থার ধ্বংস। তাই দরকার দুর্নীতিমুক্ত রাজনীতি, যেখানে নেতৃত্ব আসবে সততা, যোগ্যতা ও দেশপ্রেমের ভিত্তিতে। তরুণদের সক্রিয় অংশগ্রহণই পারে সেই পরিবর্তনের সূচনা ঘটাতে।
আজকের তরুণেরা জানে, প্রকৃত শক্তি সাহস ও বিবেকের সমন্বয়ে। তাদের হাতে যদি থাকে যুক্তি, সততা ও দায়িত্ববোধ, তবে বাংলাদেশ বদলে যাবে। নৈতিকতার ভিত্তিতে পরিবর্তনের জন্য এখনই ঐক্যবদ্ধ হওয়ার সময়।
মানুষের জন্ম হয়েছে স্বাধীন বিবেক ও নৈতিক শক্তি নিয়ে বাঁচার জন্য। সামান্য প্রলোভনের কারণে যেন কেউ নিজের আত্মমর্যাদা বিক্রি না করে। দল বা নেতাকে সমর্থন করা মানে কিন্তু নিজেকে বিক্রি করা না। আমরা যেন ভুলে না যাই, পরিবর্তন শুরু হয় নিজের ভেতর থেকেই। সাহস, সততা ও দেশপ্রেম এই তিনেই গড়ে উঠুক নতুন বাংলাদেশ।
রহমান মৃধা, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন। rahman.mridha@gmail.com
মত দ্বিমত
দাভোস আমাকে আরেকবার মনে করিয়ে দিল, নিজের পায়ে দাঁড়ানোর বিকল্প নেই
প্রশ্ন একটাই। বাংলাদেশ কি দাভোসের বার্তা শুনেছে? বাংলাদেশ মানে কেবল ভৌগোলিক সীমারেখা নয়। বাংলাদেশ মানে সিদ্ধান্তের সার্বভৌম অধিকার। বাংলাদেশের সব সিদ্ধান্ত বাংলাদেশই নেবে। এই রাষ্ট্রের জন্ম কোনো করুণা থেকে নয়, জন্ম হয়েছে এ দেশের মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য। বাংলাদেশ আমার, আপনার, আমাদের সবার।
ভয়, শাস্তি কিংবা শক্তি ইউরোপকে দাবিয়ে রাখতে পারেনি। ইতিহাস তা স্পষ্ট করে দিয়েছে। তাহলে প্রশ্ন ওঠে, বাংলাদেশকে দাবিয়ে রাখার সাহস আসে কোথা থেকে? এই সাহস কি আকাশ থেকে নামে, নাকি আমাদের ভেতর থেকেই কেউ বা কোনো গোষ্ঠী সেই সুযোগ করে দেয়? যদি ভেতরের দুর্বলতা না থাকে, বাইরের শক্তি কখনোই সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে পারে না।
গণভোটের পরই স্পষ্ট হবে, কত বিপুল সংখ্যক না ভোট বাংলাদেশের মানুষের প্রকৃত অবস্থান তুলে ধরছে। যারা সত্যিকারের দেশপ্রেমিক, তারা তখনই বুঝবে রাষ্ট্র আসলে কোথায় দাঁড়িয়ে আছে।
যদি কোনো প্রতিবেশী আমাদের শত্রু হতে চায়, সেটি আমাদের সংকট নয়। বরং সেটিই সিদ্ধান্ত নেওয়ার উপযুক্ত সময়। আমরা কি অসুস্থ প্রতিবেশীর সঙ্গে একই শর্তে সম্পর্ক বজায় রাখব, নাকি নিজেদের স্বার্থ, মর্যাদা ও ভবিষ্যৎকে অগ্রাধিকার দেব?
‘উই ক্যান অনলি উন্ডারস্ট্যান্ড টি ফিলিং অফ ডিভোশন ইফ টি নাইবোর্স শেয়ার আওয়ার প্যাশন’
দাভোসে একটি বিষয় বারবার ফিরে এসেছে। সভাকক্ষ, প্যানেল আলোচনা, করিডোরের আলাপ সবখানেই একই প্রশ্ন। আমরা কতদিন আমেরিকা, রাশিয়া কিংবা যুদ্ধের পেছনে সময় ব্যয় করব? কতদিন অন্যের সংঘাত, অন্যের ক্ষমতার দ্বন্দ্ব আমাদের চিন্তার কেন্দ্রে থাকবে? দাভোস বলছে, এখন সময় নিজেদের দিকে তাকানোর।
কীভাবে আমরা নিজেদের ভাগ্য বদলাতে পারি, সেটিই ছিল আলোচনার মূল সুর। কীভাবে একটি জাতি নিজের শক্তি নিজেই গড়ে তোলে। শিক্ষা, দক্ষতা, প্রযুক্তি, নৈতিকতা এবং প্রতিষ্ঠানকে শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করিয়ে। শক্তি মানে কেবল সামরিক শক্তি নয়। শক্তি মানে আত্মবিশ্বাসী রাষ্ট্র। শক্তি মানে এমন সমাজ, যেখানে সিদ্ধান্ত আসে জনগণ থেকে, ভয় থেকে নয়।
দাভোস মনে করিয়ে দিয়েছে, শ্রেষ্ঠ জাতি কেউ জন্মগতভাবে হয় না। শ্রেষ্ঠ জাতি গড়ে ওঠে সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতায়। ভুল স্বীকার করার সাহসে। নিজেদের দুর্বলতা ঢাকার চেষ্টা না করে, সেগুলো কাটিয়ে ওঠার দৃঢ়তায়।
বাংলাদেশের সামনে প্রশ্ন তাই বাইরের শক্তিকে নিয়ে নয়। প্রশ্ন আমাদের নিজেদের নিয়ে। আমরা কি আমাদের মানুষের ওপর আস্থা রাখব? আমরা কি সিদ্ধান্ত নেবো নিজেদের বাস্তবতা, সক্ষমতা ও ভবিষ্যৎকে সামনে রেখে? নাকি সারাক্ষণ অন্যের যুদ্ধ, অন্যের হুমকি আর অন্যের অনুমতির অপেক্ষায় থাকব?
দাভোস একটি বার্তাই দিয়েছে। কেউ এসে আমাদের ভাগ্য লিখে দেবে না। দাঁড়াতে হবে নিজের পায়ে। শক্ত হতে হবে নিজের ভিত থেকে। রাষ্ট্র গড়তে হবে মানুষের অধিকার, মর্যাদা ও অংশগ্রহণের ওপর। এই পথ সহজ নয়। কিন্তু এটাই একমাত্র পথ। কারণ বাংলাদেশ কোনো দাবার ঘুঁটি নয়। বাংলাদেশ একটি জাতির সিদ্ধান্ত।
রহমান মৃধা, গবেষক ও লেখক, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন
rahman.mridha@gmail.com
মত দ্বিমত
বিশ্বব্যবস্থার রাজনৈতিক অস্থিরতা: নীরব সমাজ, শক্তিধর রাষ্ট্র ও ন্যায়ের রূপান্তর
বর্তমান বিশ্ব এক গভীর রাজনৈতিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই রূপান্তর কোনো একটি দেশের ভেতরে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি একই সঙ্গে ইউরোপ, আমেরিকা, এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার সমাজ ও রাষ্ট্র কাঠামোকে প্রভাবিত করছে। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয় বিশ্ব অস্থির, কিন্তু ভেতরে ভেতরে আরও ভয়াবহ একটি বিষয় ঘটছে। মানুষ ধীরে ধীরে এই অস্থিরতাকে স্বাভাবিক বলে মেনে নিচ্ছে। অন্যায় ক্রমে ন্যায়ে পরিণত হচ্ছে, আর নীরবতা হয়ে উঠছে সামাজিক প্রতিক্রিয়ার প্রধান ভাষা।
ন্যাটো জোট ও পশ্চিমা ঐক্যের ফাটল
দীর্ঘদিন ধরে ন্যাটোকে পশ্চিমা নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক ঐক্যের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই জোটের ভেতরেই মতপার্থক্য, দ্বন্দ্ব ও স্বার্থের সংঘাত প্রকাশ্যে এসেছে। ইউক্রেন যুদ্ধ, প্রতিরক্ষা ব্যয়, অভিবাসন প্রশ্ন এবং যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক নেতৃত্বের ভূমিকা নিয়ে ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে ভিন্নমত ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। অনেক দেশ এখন প্রশ্ন তুলছে, ন্যাটো কি সত্যিই সমান নিরাপত্তা নিশ্চিত করে, নাকি এটি কিছু শক্তিধর রাষ্ট্রের কৌশলগত হাতিয়ার মাত্র।
এই বিভাজন কেবল সামরিক নয়। সাম্প্রতিক গ্রিনল্যান্ড ইস্যু এই ফাটলকে আরও দৃশ্যমান করেছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প ডেনমার্ক ও ইউরোপীয় মিত্রদের আপত্তির জবাবে গ্রিনল্যান্ডের ওপর শুল্ক হুমকি দিয়েছে। এটি ন্যাটো জোটের ভেতরের সম্পর্ককে চাপের মধ্যে ফেলে দিয়েছে—যেখানে মিত্র দেশগুলো নিরাপত্তা চাচ্ছে, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা পদক্ষেপে তাদের কৌশলগত স্বাধীনতা সীমিত হচ্ছে। ফলে দেখা যাচ্ছে, ন্যাটোর ঐক্য এখন শর্তযুক্ত আনুগত্যের ওপর ভিত্তি করে এবং শক্তিধর রাষ্ট্রের স্বার্থ দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে।
জাতিসংঘ: নীতি আছে, কার্যকারিতা নেই
জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে, যাতে ভবিষ্যতে বিশ্ব আর এমন বিপর্যয়ের মুখে না পড়ে। কিন্তু আজ জাতিসংঘ ক্রমেই একটি প্রতীকী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যদের ভেটো ক্ষমতা বাস্তব ন্যায়বিচারকে বারবার আটকে দিচ্ছে।
গাজা, ইউক্রেন, ইয়েমেন, সুদান বা আফ্রিকার বিভিন্ন সংঘাতে জাতিসংঘের সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট। নীতি আছে, প্রস্তাব আছে, কিন্তু কার্যকর প্রয়োগ নেই। এর ফলে সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন জাগছে, আন্তর্জাতিক আইন কার জন্য এবং কাদের বিরুদ্ধে।
গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার রূপান্তর ও সংকট
গণতন্ত্র এখনও শব্দ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, কিন্তু এর চর্চা বদলে গেছে। নির্বাচন হচ্ছে, কিন্তু ভোটারের প্রকৃত ক্ষমতা সংকুচিত। রাজনৈতিক দলগুলো কর্পোরেট অর্থায়নের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। প্রচারণা, মিডিয়া কাভারেজ ও জনমত গঠনে পুঁজির ভূমিকা এতটাই প্রবল যে সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বর প্রায় অদৃশ্য।
অনেক দেশে নির্বাচনী ব্যবস্থাকে আইনগতভাবে ঠিক রাখা হলেও বাস্তবে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হচ্ছে সীমিত কিছু গোষ্ঠীর হাতে। এটি একটি নরম অথচ গভীর কর্তৃত্ববাদ, যেখানে গণতন্ত্রের কাঠামো থাকে, কিন্তু আত্মা থাকে না।
শক্তিধর রাষ্ট্র ও নতুন ক্ষমতার বিন্যাস
বিশ্ব এখন একমুখী নেতৃত্বের যুগে নেই। যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও আঞ্চলিক শক্তিগুলো নিজেদের মতো করে প্রভাব বিস্তার করছে। এই বহুমুখী শক্তি কাঠামো একদিকে ভারসাম্য তৈরি করলেও অন্যদিকে অনিশ্চয়তা বাড়াচ্ছে।
ছোট ও দুর্বল রাষ্ট্রগুলো এই প্রতিযোগিতার মাঝে পড়ে যাচ্ছে। তাদের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা সীমিত হচ্ছে ঋণ, বাণিজ্য, সামরিক চুক্তি ও কূটনৈতিক চাপের মাধ্যমে।
পুঁজিবাদ ও রাজনীতির মেলবন্ধন
বর্তমান পুঁজিবাদ আর শুধু অর্থনীতির বিষয় নয়। এটি সরাসরি রাজনীতির নিয়ন্ত্রক শক্তি। বড় কর্পোরেশনগুলো নীতি নির্ধারণে প্রভাব ফেলছে, কর ব্যবস্থাকে নিজেদের পক্ষে ঘুরিয়ে নিচ্ছে এবং শ্রম, পরিবেশ ও সামাজিক ন্যায়ের প্রশ্নকে গৌণ করে তুলছে।
এর ফল সবচেয়ে বেশি পড়ছে গরিব ও মধ্যবিত্ত মানুষের ওপর। সামাজিক নিরাপত্তা সংকুচিত হচ্ছে, শ্রমের মূল্য কমছে, আর জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ছে।
ইনফ্লেশন ও দৈনন্দিন জীবনের রাজনীতি
ইনফ্লেশন শুধু একটি অর্থনৈতিক শব্দ নয়। এটি মানুষের জীবনের প্রতিটি স্তরে রাজনীতির উপস্থিতি। খাদ্য, বাসস্থান, স্বাস্থ্য ও জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি মানুষকে টিকে থাকার সংগ্রামে আটকে দিচ্ছে। যখন মানুষ প্রতিদিনের বেঁচে থাকার লড়াইয়ে ব্যস্ত থাকে, তখন রাষ্ট্র ও ক্ষমতার জবাবদিহি প্রশ্ন করার শক্তি হারিয়ে ফেলে।
ফ্যাসিস্ট প্রবণতা ও ভয়ের রাজনীতি
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ফ্যাসিস্ট প্রবণতা নতুন রূপে ফিরে আসছে। এটি এখন আর শুধু সামরিক বুটের শব্দ নয়, বরং আইন, ভাষা ও সংস্কৃতির মাধ্যমে ধীরে ধীরে বিস্তার লাভ করছে। ভয়ের রাজনীতি ব্যবহার করে নাগরিক স্বাধীনতা সীমিত করা হচ্ছে।
মহামারী, দুর্নীতি ও নৈতিক অবক্ষয়
মহামারী দেখিয়ে দিয়েছে সংকটের সময় রাষ্ট্র কতটা মানবিক হতে পারে বা পারে না। একই সঙ্গে দুর্নীতি ও বৈষম্যের কাঠামো আরও উন্মোচিত হয়েছে।
তাহলে সমাজ কেন মেনে নিচ্ছে
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, এতকিছুর পরেও সমাজ কেন প্রতিরোধ গড়ে তুলছে না। এর কারণ ক্লান্তি, ভয়, বিভ্রান্তি এবং বিকল্প কল্পনার অভাব। মানুষ ধীরে ধীরে শিখে নিচ্ছে যে ক্ষমতার সিদ্ধান্ত প্রশ্ন করার জায়গা সংকুচিত, আর ব্যক্তিগত টিকে থাকাই প্রধান লক্ষ্য। এই নীরবতা কার্যত শক্তিধর রাষ্ট্র ও কর্পোরেট ক্ষমতার পক্ষে কাজ করে। অন্যায় এখানে হঠাৎ করে ন্যায় হয়ে যায় না, বরং দীর্ঘ সময় ধরে প্রশ্নহীন থাকতে থাকতে ন্যায় বলে মেনে নেওয়া হয়।
গ্রিনল্যান্ড সংকট ও ট্রাম্পের শুল্ক হুমকি
গ্রিনল্যান্ড ইস্যু দেখিয়েছে কিভাবে শক্তিধর রাষ্ট্রের একতরফা পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক জোট ও মিত্র সম্পর্ককে চাপের মধ্যে ফেলে। ডোনাল্ড ট্রাম্প ডেনমার্ক ও ইউরোপীয় মিত্রদের আপত্তির জবাবে গ্রিনল্যান্ডের ওপর শুল্ক হুমকি দিয়েছেন।
• এটি ন্যাটো জোটের ভেতরের ফাটল আরও স্পষ্ট করেছে, যেখানে মিত্র দেশগুলো নিরাপত্তা চাচ্ছে, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা পদক্ষেপে তাদের কৌশলগত স্বাধীনতা সীমিত হচ্ছে।
• শুল্কের প্রভাব শুধুমাত্র রাষ্ট্রের ওপর সীমিত নয়; এটি বাজারে, মূল্যস্ফীতি ও ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতায় প্রভাব ফেলছে। ফলে সাধারণ মানুষ এই রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ বহন করছে, আর রাজনৈতিক প্রতিরোধের শক্তি ক্ষয় পাচ্ছে।
গ্রিনল্যান্ড ইস্যু ও শুল্ক হুমকি আমাদের একটি কঠিন বার্তা দেয়। ভবিষ্যৎ বিশ্ব রাজনীতি হবে আরও ক্ষমতানির্ভর, যেখানে আন্তর্জাতিক আইন ও নৈতিকতার ভাষা থাকবে, কিন্তু প্রয়োগ হবে শক্তির ভাষায়। ছোট ও মাঝারি রাষ্ট্রগুলোর জন্য এটি একটি সতর্ক সংকেত, আর সাধারণ মানুষের জন্য এটি একটি নীরব বিপদ।
প্রশ্ন একটাই থেকে যায়, আমরা কি এই নতুন স্বাভাবিকতাকে মেনে নেব, নাকি একে প্রশ্ন করার নতুন রাজনৈতিক কল্পনা তৈরি করব।
রহমান মৃধা, গবেষক ও লেখক, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন
rahman.mridha@gmail.com
মত দ্বিমত
এআই বিভ্রান্তি বাংলাদেশের দুর্নীতিকে আরও শক্তিশালী করে
বাংলাদেশে দুর্নীতি কোনো বিচ্ছিন্ন ব্যতিক্রম নয়। এটি বহু মানুষের কাছে একটি পরিচিত বাস্তবতা, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে একটি স্বাভাবিক ব্যবস্থা। ঘুষ, প্রভাব, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং তথ্য গোপন করা বহুদিন ধরেই প্রাত্যহিক অভিজ্ঞতার অংশ। কিন্তু সাম্প্রতিক বৈশ্বিক পরিবর্তন এই সমস্যাকে আরও গভীর করছে।
একদিকে যুক্তরাষ্ট্রসহ শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর শুল্কনীতি ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ, অন্যদিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে তথ্য ও ছবির ব্যাপক বিকৃতি। এই দুটি শক্তি একত্রে বাংলাদেশের মতো দুর্বল গণতান্ত্রিক ও উচ্চ দুর্নীতিগ্রস্ত রাষ্ট্রে একটি বিপজ্জনক বাস্তবতা তৈরি করছে।
বিশ্ব অর্থনীতির টানাপোড়েন সরাসরি বাংলাদেশের ওপর প্রভাব ফেলে। রপ্তানি খাত, ডলার সংকট, মূল্যস্ফীতি এবং কর্মসংস্থানের চাপ সাধারণ মানুষের জীবনকে কঠিন করে তুলছে। এই চাপের মুখে রাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা বাড়ে। কিন্তু যখন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোই দুর্নীতিগ্রস্ত হয়, তখন এই চাপ সাধারণ মানুষকে আরও অসহায় করে তোলে।
এই অবস্থায় দুর্নীতি কেবল অর্থনৈতিক সমস্যা থাকে না। এটি ক্ষমতার ভাষা হয়ে ওঠে। মানুষ বুঝে যায় যে নিয়ম মেনে কিছু পাওয়া কঠিন, কিন্তু প্রভাব থাকলে সব সম্ভব। ফলে দুর্নীতি মোকাবিলার নৈতিক শক্তিটাই দুর্বল হয়ে পড়ে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেকটি নতুন বাস্তবতা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দ্বারা তৈরি ছবি, ভিডিও ও তথ্য। বাংলাদেশের মতো দেশে যেখানে স্বাধীন ও শক্তিশালী তথ্য যাচাই ব্যবস্থা দুর্বল, সেখানে এআই দ্বারা তৈরি বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট সহজেই সত্য হিসেবে ছড়িয়ে পড়ে।
রাজনৈতিক বক্তব্য, সামাজিক অস্থিরতা, আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র কিংবা অর্থনৈতিক সংকট, সব কিছুর ক্ষেত্রেই এখন এমন ছবি ও ভিডিও দেখা যায় যেগুলো মানুষের আবেগকে উসকে দেয়, কিন্তু সত্য যাচাই করার সুযোগ বা সক্ষমতা খুব কম মানুষের থাকে।
এখানেই দুর্নীতি ও এআই একে অপরকে শক্তিশালী করে। দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা থাকে না। স্বচ্ছতা না থাকলে সত্য যাচাই করা কঠিন হয়। আর যখন সত্য অস্পষ্ট থাকে, তখন এআই দ্বারা তৈরি মিথ্যা সহজেই জায়গা করে নেয়।
এই পরিস্থিতিতে দুর্নীতিবাজদের জন্য এআই একটি কার্যকর ঢাল। বিভ্রান্তি যত বাড়ে, জবাবদিহি তত কমে। মানুষ যখন নিশ্চিত হতে পারে না কোনটি সত্য আর কোনটি সাজানো, তখন রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতাও ধোঁয়াশার আড়ালে হারিয়ে যায়।
প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কীভাবে এই বাস্তবতাকে মোকাবিলা করবে।
প্রথমত, দুর্নীতিকে কেবল নৈতিক ব্যর্থতা হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি একটি কাঠামোগত সমস্যা। যতদিন রাজনৈতিক ক্ষমতা, অর্থনীতি ও প্রশাসন জবাবদিহির বাইরে থাকবে, ততদিন দুর্নীতি স্বাভাবিক আচরণ হিসেবেই চলতে থাকবে।
দ্বিতীয়ত, এআই ও তথ্য প্রযুক্তিকে আলাদা কোনো বিলাসী বিষয় হিসেবে দেখা যাবে না। এটি এখন জাতীয় নিরাপত্তা ও গণতান্ত্রিক টিকে থাকার প্রশ্ন। রাষ্ট্রকে বাধ্যতামূলকভাবে স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশ, ডিজিটাল ট্রেসেবিলিটি এবং ভুয়া কনটেন্ট শনাক্ত করার সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে।
তৃতীয়ত, সাধারণ মানুষের তথ্য বোঝার ক্ষমতা বাড়ানো ছাড়া কোনো সমাধান টেকসই হবে না। মানুষ যদি না বোঝে কীভাবে ছবি বানানো হয়, কীভাবে ভিডিও বিকৃত করা হয়, তাহলে তারা সব সময় শক্তিশালীদের তৈরি বাস্তবতার শিকার হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রাজনৈতিক সদিচ্ছা। দুর্নীতিকে যদি সত্যিই মোকাবিলা করতে হয়, তাহলে ক্ষমতাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড়ানোর সাহস দেখাতে হবে। এআই বা বৈশ্বিক অর্থনীতিকে অজুহাত বানিয়ে রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা ঢেকে রাখলে সংকট আরও গভীর হবে।
বাংলাদেশ আজ এমন এক মোড়ে দাঁড়িয়ে যেখানে অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও তথ্য একসঙ্গে মানুষের জীবন নির্ধারণ করছে। এই বাস্তবতায় দুর্নীতিকে স্বাভাবিক ধরে নেওয়া মানে ভবিষ্যৎকে পরিকল্পিতভাবে দুর্বল করে দেওয়া।
প্রশ্ন এখন একটাই। বাংলাদেশ কি এই নতুন বাস্তবতাকে চিনে ব্যবস্থা নেবে, নাকি বিভ্রান্তি, দুর্নীতি ও বৈষম্যের মধ্যেই এগিয়ে যেতে থাকবে।
আসন্ন নির্বাচন ও নতুন ঝুঁকির বাস্তবতা
এই প্রেক্ষাপটে আসন্ন নির্বাচন বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দ্বারা তৈরি ছবি, ভিডিও ও তথ্য নির্বাচনী পরিবেশকে সহজেই প্রভাবিত করতে পারে। সহিংসতা, জনসমর্থন কিংবা রাষ্ট্রীয় অবস্থান সংক্রান্ত ভুয়া কনটেন্ট ভোটারদের আবেগকে উসকে দিতে পারে, যার সত্যতা যাচাই করার সক্ষমতা অনেকের নেই।
যখন নির্বাচনী প্রক্রিয়ার ওপর আগে থেকেই আস্থার সংকট থাকে, তখন এই ধরনের বিভ্রান্তি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা দুর্বল থাকায় প্রকৃত অনিয়ম এবং কৃত্রিমভাবে তৈরি বিভ্রান্তির মধ্যে পার্থক্য করা কঠিন হয়ে পড়ে। এর ফল হিসেবে ভোটার আস্থা ক্ষয় হয় এবং গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ কমে যায়।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় কয়েকটি বিষয় জরুরি হয়ে উঠেছে। প্রথমত, নির্বাচনী সময় তথ্য ও ভিজ্যুয়াল কনটেন্ট যাচাইয়ের জন্য স্বাধীন ও কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলা। দ্বিতীয়ত, রাষ্ট্রীয় ও নির্বাচন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের তথ্য প্রকাশে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। তৃতীয়ত, সাধারণ মানুষের মধ্যে এআই ও ডিজিটাল কনটেন্ট সম্পর্কে ন্যূনতম সচেতনতা তৈরি করা, যাতে তারা বিভ্রান্তিকে প্রশ্ন করতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো রাজনৈতিক সদিচ্ছা। যদি নির্বাচনকে সত্যিকার অর্থে বিশ্বাসযোগ্য করতে হয়, তাহলে প্রযুক্তি বা বৈশ্বিক পরিস্থিতিকে অজুহাত না বানিয়ে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। নইলে এআই দ্বারা তৈরি বিভ্রান্তি এবং পুরনো দুর্নীতির সংস্কৃতি একসঙ্গে নির্বাচনকে অর্থহীন করে তুলবে।
রহমান মৃধা, গবেষক ও লেখক, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন
rahman.mridha@gmail.com
মত দ্বিমত
নতুন বিশ্বে বিজ্ঞান, ক্ষমতা-গণতন্ত্র ও আমরা
প্রযুক্তির এই যুগে বিজ্ঞানের অগ্রগতি কি ইউরোপে, আমেরিকায়, না-কি চীনে- এই প্রশ্নের সহজ উত্তর নেই। কারণ বিজ্ঞান এখন আর একক কোনো ভূখণ্ডের সম্পদ নয়। তবে ক্ষমতা, নিয়ন্ত্রণ এবং দিকনির্দেশ এখনো কিছু নির্দিষ্ট কেন্দ্রে কেন্দ্রীভূত। এবং এটাই মূল কারণ, যে আমরা আজ বিজ্ঞানকে কেবল প্রযুক্তির প্রেক্ষাপটে দেখতে পারি না; এটি নৈতিকতা, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত এবং মানুষের দায়িত্বের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
আমেরিকা দীর্ঘদিন ধরে বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবনের নেতৃত্ব দিয়েছে। সিলিকন ভ্যালি, এমআইটি, হার্ভার্ড, নাসা—এই প্রতিষ্ঠানগুলো কেবল প্রযুক্তি নয়, একটি দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বায়োটেকনোলজি, মহাকাশ গবেষণা এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম অর্থনীতিতে আমেরিকার প্রভাব এখনো প্রবল। তবে এই অগ্রগতি মূলত কর্পোরেট মুনাফা এবং সামরিক কৌশলের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ফলে প্রশ্ন ওঠে—এই বিজ্ঞান কি মানবকল্যাণের জন্য, না ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য।
ইউরোপ ভিন্ন পথ বেছে নিয়েছে। তারা তুলনামূলকভাবে ধীর, কিন্তু নৈতিকতা ও নিয়ন্ত্রণে শক্ত। তথ্য সুরক্ষা, মানবাধিকার, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি, টেকসই উন্নয়ন—এই ক্ষেত্রগুলোতে ইউরোপ একটি ভারসাম্যপূর্ণ বিজ্ঞানচিন্তা গড়ে তুলেছে। ইউরোপীয় বিজ্ঞান কম দৃশ্যমান হলেও দীর্ঘমেয়াদে মানব সভ্যতার জন্য হয়তো বেশি নিরাপদ। এখানে প্রশ্ন আসে—গতির চেয়ে দিকনির্দেশ কি বেশি গুরুত্বপূর্ণ নয়।
আর চীন। গত দুই দশকে চীন দেখিয়েছে যে রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা এবং বিপুল বিনিয়োগ দিয়ে বিজ্ঞানকে কীভাবে দ্রুত এগিয়ে নেওয়া যায়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কোয়ান্টাম প্রযুক্তি, ফাইভ জি, মহাকাশ গবেষণায় চীন আজ আর অনুকরণকারী নয়, প্রতিদ্বন্দ্বী। তবে এই অগ্রগতির সঙ্গে আছে নজরদারি, তথ্য নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যক্তিস্বাধীনতার সীমাবদ্ধতা। ফলে বিজ্ঞান এখানে একদিকে বিস্ময়কর, অন্যদিকে উদ্বেগজনক।
এই তিন শক্তির তুলনায় একটি মৌলিক সত্য স্পষ্ট হয়। আজকের বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি শুধু আবিষ্কারের প্রশ্ন নয়। এটি মূলত মূল্যবোধের, নৈতিক দায়িত্বের এবং শক্তির ব্যবহারের প্রশ্ন। কে সিদ্ধান্ত নেবে প্রযুক্তি কীভাবে ব্যবহার হবে। কে এর সুফল পাবে। কে এর ক্ষতির বোঝা বহন করবে। এবং এটিই নির্ধারণ করবে, বিজ্ঞান মানবিক হবে কি না।
মানবজাতির সামনে নতুন পৃথিবীর সন্ধান তখনই সম্ভব, যখন বিজ্ঞান কেবল শক্তির হাতিয়ার থাকবে না, বরং ন্যায়বোধ, সহানুভূতি এবং দায়িত্বশীলতার সঙ্গে যুক্ত হবে। প্রযুক্তি যদি মানুষের কর্মসংস্থান কেড়ে নেয়, গোপনীয়তা ধ্বংস করে, যুদ্ধকে আরও নিখুঁত করে তোলে, তাহলে সেটি অগ্রগতি নয়, তা কেবল উন্নত ধ্বংস।
বর্তমান প্রতিবেদন ও গবেষণা দেখায়, চীনে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে বেশি গবেষক কর্মরত। শুধু সংখ্যাই নয়, প্রভাবের দিক থেকেও চীনা গবেষণা এগিয়ে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক গবেষণায় চীনা প্রকাশনা এখন বেশি উদ্ধৃত হচ্ছে, যা প্রমাণ করে যে এই গবেষণাগুলো বিশ্বজুড়ে জ্ঞান উৎপাদনের মূল স্রোতে যুক্ত হচ্ছে। বিশেষ করে ম্যাটেরিয়াল ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি, ইঞ্জিনিয়ারিং, ডেটা ও কম্পিউটার বিজ্ঞান এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে চীনা গবেষকদের কাজ এখন বৈশ্বিক মানদণ্ড নির্ধারণে ভূমিকা রাখছে।
সদ্য প্রকাশিত সুইডিশ টেলিভিশনের একটি প্রতিবেদনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে, বিষয়ভিত্তিক র্যাঙ্কিংয়ে বিশ্বের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে নয়টি এখন চীনে অবস্থিত। এটি বোঝায় যে চীন কেবল গবেষণাপত্রের পরিমাণ বাড়াচ্ছে না, বরং দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোও গড়ে তুলেছে যেখানে উচ্চমানের গবেষণা ধারাবাহিকভাবে সম্ভব হচ্ছে।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সাইমন মার্জিনসন উল্লেখ করেছেন, বহু চীনা গবেষক যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার প্রশিক্ষণ নিলেও শেষ পর্যন্ত নিজ দেশে ফিরে যাচ্ছেন। কারণ সেখানে তারা পাচ্ছেন গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত অর্থায়ন, আধুনিক অবকাঠামো এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার সহায়তা। এই মেধা প্রত্যাবর্তন চীনের গবেষণা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করছে।
তবে এই অগ্রগতির সঙ্গে উদ্বেগও আছে। ইউরোপের নীতিনির্ধারকরা আশঙ্কা করছেন যে গবেষণা সহযোগিতার মাধ্যমে সংবেদনশীল প্রযুক্তি এমন ব্যবস্থার হাতে যেতে পারে যেখানে স্বচ্ছতা ও স্বাধীনতা সীমিত। এই উদ্বেগ অমূলক নয় এবং ইউরোপের অনেক দেশই এখন এই প্রশ্নে দ্বিধান্বিত। অন্যদিকে, বহু বিশ্ববিদ্যালয় রেক্টর মনে করেন, বৈজ্ঞানিক সহযোগিতা বন্ধ করলে তা শেষ পর্যন্ত ইউরোপের নিজের ক্ষতিই ডেকে আনবে। কারণ বিজ্ঞান কখনোই সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন পরিবেশে বিকশিত হয় না। জ্ঞান আদানপ্রদান বন্ধ হলে গবেষণার গতি কমে যায় এবং বৈশ্বিক সমস্যার সমাধান আরও কঠিন হয়ে ওঠে।
এবার আসি গণতন্ত্র এবং চীনের উদাহরণের দিকে। চীন একটি জনবহুল রাষ্ট্র, যেখানে গণতন্ত্র নেই, রাজনৈতিক স্বাধীনতা সীমিত, মতপ্রকাশ নিয়ন্ত্রিত। তারপরও সেই চীন প্রযুক্তি, বিজ্ঞান এবং ভূরাজনীতিতে প্রতিদিন বিশ্বকে চমকে দিচ্ছে। অন্যদিকে বহু দেশ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নামে সংগ্রাম করেও শেষ পর্যন্ত স্বৈরাচারী শাসনের শিকার হচ্ছে। এই বৈপরীত্যের কারণ বোঝার জন্য আবেগ নয়, রাষ্ট্রের কাঠামো, ক্ষমতার ব্যবহার এবং মানুষের নৈতিক দায়িত্ব ও কার্যকর কর্মকাণ্ড বিবেচনা করতে হবে।
চীনে রাষ্ট্রের লক্ষ্য দীর্ঘমেয়াদি এবং স্পষ্ট। প্রযুক্তি, শিল্প, শিক্ষা ও সামরিক সক্ষমতা রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার। ক্ষমতাসীন দল বদলালেও লক্ষ্য বদলায় না। সেখানে শাসক ব্যক্তির নয়, রাষ্ট্রের ধারাবাহিকতা ও নৈতিক দিকই মুখ্য।
অন্যদিকে বহু গণতন্ত্রপ্রত্যাশী দেশে রাজনীতি ব্যক্তি কেন্দ্রিক। ক্ষমতায় যাওয়াই লক্ষ্য, রাষ্ট্র পরিচালনা নয়। নির্বাচনের পর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান দলীয় সম্পদে পরিণত হয়। ফলে গণতন্ত্র নামের কাঠামো থাকলেও বাস্তবে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয়।
চীন দশকভিত্তিক পরিকল্পনায় কাজ করে। শিক্ষা সংস্কার, গবেষণা বিনিয়োগ, শিল্প নীতি—সবকিছু দীর্ঘ সময় ধরে এগোয়। আজ যে প্রযুক্তিগত সাফল্য দেখা যাচ্ছে, তার ভিত্তি তৈরি হয়েছে বিশ বা ত্রিশ বছর আগে। গণতন্ত্রের নামে পরিচালিত বহু দেশে রাজনীতি চলে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি দিয়ে। পাঁচ বছরের মধ্যে ফল দেখাতে না পারলে পরিকল্পনা বাতিল হয়। রাষ্ট্র এখানে ভবিষ্যৎ গড়ে না, বরং ভোট টিকিয়ে রাখে।
চীনে প্রতিষ্ঠানগুলো ক্ষমতাসীন দলের অধীনে থাকলেও কার্যকর। গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্প খাত রাজনৈতিক অস্থিরতায় ভোগে না। স্বৈরাচারের শিকার গণতন্ত্রগুলোতে প্রতিষ্ঠান দুর্বল। আদালত, প্রশাসন, শিক্ষা ব্যবস্থা দলীয় নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। ফলে গণতন্ত্র নিজেই নিজের বিরোধী শক্তিতে রূপ নেয়।
চীন তার মেধাকে কাজে লাগাচ্ছে। বিদেশে পড়া গবেষকদের দেশে ফেরার পরিবেশ তৈরি করছে। গবেষণার জন্য অর্থ, ল্যাব, সম্মান নিশ্চিত করছে। অন্যদিকে বহু দেশে শিক্ষিত তরুণরা রাষ্ট্রের বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। রাজনৈতিক আনুগত্য ছাড়া সুযোগ নেই। মেধা দেশ ছাড়ে, রাষ্ট্র শূন্য হয়।
সবচেয়ে কঠিন সত্য হলো—গণতন্ত্র কোনো যাদু নয়। এটি একটি ব্যবস্থা। যদি সেই ব্যবস্থার ভেতরে জবাবদিহি, নৈতিকতা এবং শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান না থাকে, তবে গণতন্ত্র স্বৈরাচার উৎপাদন করতে পারে। চীন দেখাচ্ছে উন্নয়ন গণতন্ত্রের পূর্বশর্ত নয়। আবার অনেক দেশ প্রমাণ করছে গণতন্ত্র উন্নয়নের নিশ্চয়তা নয়।
এই বাস্তবতা আমাদের একটি অস্বস্তিকর প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়। আমরা কি সত্যিই গণতন্ত্র চাই, নাকি কেবল ক্ষমতায় যাওয়ার একটি সিঁড়ি হিসেবে একে ব্যবহার করছি।
মানবজাতির সামনে নতুন পৃথিবীর সন্ধান তখনই সম্ভব, যখন বিজ্ঞান কেবল শক্তির হাতিয়ার থাকবে না, বরং মানবিক দিক, নৈতিক দায়িত্ব এবং সচেতন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হবে। প্রযুক্তি যদি মানুষের জীবনকে শোষণ করে, গোপনীয়তা ধ্বংস করে, যুদ্ধকে আরও নিখুঁত করে তোলে, তাহলে সেটি অগ্রগতি নয়।
প্রকৃত সত্য হলো—ভবিষ্যৎ ইউরোপ, আমেরিকা বা চীনের একক মালিকানায় নয়। ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে এই প্রশ্নের উত্তরের ওপর। আমরা কি বিজ্ঞানকে মানুষের জন্য ব্যবহার করব, না মানুষকে বিজ্ঞানের পরীক্ষাগারে পরিণত করব। এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে নতুন পৃথিবী আসলেই মানবিক হবে কি না।
চীনের উদাহরণ আমাদের শেখায় যে রাষ্ট্র গড়তে হলে প্রয়োজন: দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টি, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, মেধার সম্মান এবং পরিকল্পনার ধারাবাহিকতা। আর গণতন্ত্র টিকিয়ে রাখতে হলে প্রয়োজন: নৈতিক নেতৃত্ব, জবাবদিহি এবং ক্ষমতার সীমা নির্ধারণ। এই দুটি একসাথে না চললে গণতন্ত্রও স্বৈরাচার জন্ম দেবে, আর উন্নয়ন মানবিক হবে না। এটাই যদি আজকের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হয়, তবে আমাদের অবস্থান কোথায়?
রহমান মৃধা, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন। rahman.mridha@gmail.com
মত দ্বিমত
দেশ বদলাচ্ছে, নাকি পুরোনো রাজনীতি নতুন ভাষায় ফিরছে?
দেশ বদলাচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমরা কি সত্যিই নতুন কিছু দেখছি, নাকি পুরোনো কাহিনি নতুন মোড়কে আমাদের সামনে ফিরে আসছে?
আগামী দিনগুলোতে লক্ষ্য করলে দেখবেন, সারা দেশের গণমাধ্যমে তারেক রহমানকে ঘিরে এক ধরনের প্রশস্তি আর গুণগানের স্রোত বইতে শুরু করবে। সংবাদ শিরোনাম, টক শো, বিশ্লেষণ, প্রচার সবকিছু এমনভাবে সাজানো হবে যেন সাধারণ মানুষের বিবেক ধীরে ধীরে প্রভাবিত হয়। এই প্রক্রিয়ায় একদিকে যেমন নির্দিষ্ট একটি নেতৃত্বকে অতিরঞ্জিতভাবে তুলে ধরা হবে, অন্যদিকে জামায়াত ও এনসিপির বিরুদ্ধে নানামুখী অপপ্রচার চলবে নীরবে কিন্তু পরিকল্পিতভাবে।
এই বাস্তবতায় ভারতও আলাদা কোনো পথ নেবে না। তারেক রহমানের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়বে। দলের চেয়ারম্যান হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার প্রেক্ষাপটে ঢাকাস্থ হাইকমিশনের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী মোদির শুভেচ্ছা বার্তা পৌঁছে দেওয়া হবে। সাংবাদিকদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ, ব্যক্তিগত মতবিনিময় এবং নরম ভাষায় ভিন্ন সুর তুলে ধরে জাতির সামনে একটি বার্তা দেওয়া হবে। দেখো, অতীতের সাংবাদিক সম্মেলনের সঙ্গে বর্তমানের কত পার্থক্য।
অনেকে ভাবতে পারেন, এসব ছোটখাটো বিষয় নিয়ে এত গুরুত্ব দেওয়ার কারণ কী। কিন্তু এগুলো মোটেও ছোটখাটো নয়। বিশেষ করে যারা দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে, তারা জানে এ দেশের মানুষ কীভাবে ভাবতে ভালোবাসে এবং সেই ভাবনাকে কীভাবে কৌশলে পৌঁছে দেওয়া যায়।
স্বৈরাচার সরকারের সময় একটি নির্দিষ্ট কৌশল অনুসরণ করা হয়েছিল। জনগণকে দেখানো হয়েছিল সরকার কতটা শক্তিশালী, কতটা কঠোর, কতটা ক্ষমতাবান। এবার সেই কৌশলের ভাষা বদলেছে। এবার তুলে ধরা হচ্ছে উদারতা, মানবিকতা, মহানুভবতার ছবি। কৌশল বদলালেও লক্ষ্য বদলায়নি। এর নামই রাজনীতি।
এই জায়গায় এসে একটি প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া যায় না। যদি শেষ পর্যন্ত একই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হয়, তাহলে শেখ হাসিনার সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরানোর প্রয়োজনটাই বা কী ছিল? ঘড়ির কাঁটা কি তবে শুধু বারোটার চারপাশেই ঘুরে গেল?
এই রাজনৈতিক বাস্তবতার মাঝেই আমি আরেকটি দৃশ্য গভীর মনোযোগ দিয়ে লক্ষ করছি। ছাত্রশিবিরের নেতৃত্ব আজ যে মাত্রার শক্তি ও সৃজনশীলতার পরিচয় দিচ্ছে, তা সত্যিই ব্যতিক্রমী। বর্তমান বিশ্ব রাজনীতির দিকে তাকালে দেখা যায় নোংরামি, দুর্নীতি, লুটপাট, সন্ত্রাস, নৈরাজ্য আর বিশৃঙ্খলার এক ভয়াবহ চিত্র। ঠিক এই সময়ে বাংলাদেশের মতো একটি দেশে ছাত্রশিবিরের নবজাগরণ শুধু একটি রাজনৈতিক ঘটনা নয়, এটি নৈতিকতার পুনরুদ্ধার।
রাজনীতি যে কেবল ক্ষমতা দখলের খেলা নয়, বরং নিরাপত্তা, মর্যাদা এবং সহাবস্থানের দায়ও বহন করতে পারে এই বার্তাই তারা দিচ্ছে। মানবজাতির সবচেয়ে বড় পরিচয় তখনই স্পষ্ট হয়, যখন একজন নারী একজন পুরুষের পাশে নিজেকে নিরাপদ মনে করে। তখনই বোঝা যায়, সমাজে মানবিকতার ভিত্তি এখনও অটুট।
গত কয়েক মাসে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে যে মায়াবী, মধুর সম্পর্ক গড়ে উঠতে দেখেছি, তা আমাকে এই বিশ্বাস দিয়েছে, ছাত্রশিবিরের কাছে বাংলাদেশের নারী নিরাপদ। আর নারী যখন নিরাপদ, তখন পুরো বাংলাদেশই নিরাপদ। এই বাস্তবতায় আমাদের সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি দাঁড়িয়ে আছে আসন্ন নির্বাচনকে ঘিরে। নির্বাচন শুধু ভোটের হিসাব নয়, এটি নিরাপত্তা, আস্থা এবং ভবিষ্যতের প্রশ্ন।
জাগো বাংলাদেশ, জাগো। সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ভেবে দেখো, আমরা কেবল দৃশ্যের পরিবর্তন চাই, নাকি সত্যিকারের পরিবর্তন?
রহমান মৃধা, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন। rahman.mridha@gmail.com



