ধর্ম ও জীবন
দুনিয়ার মোহ থেকে মুক্তির নবী (সা.)-এর দৃষ্টিভঙ্গি
মানুষের জীবনে আরাম-আয়েশের আকাঙ্ক্ষা চিরন্তন। একটু স্বস্তি, একটু নরম বিছানা, কিছু আরামদায়ক উপকরণ; এসবকেই আমরা সুখের মাপকাঠি মনে করি। অথচ যিনি ছিলেন সমগ্র মানবজাতির নেতা, আল্লাহর প্রিয়তম রাসুল, তাঁর জীবন ছিল অবিশ্বাস্য সরলতা, সংযম ও দুনিয়াবিমুখতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তাঁর জীবন আমাদের শেখায়, প্রকৃত মর্যাদা আরামের মধ্যে নয়; বরং আল্লাহমুখী হৃদয়, সংযমী জীবন ও আখিরাতমুখী দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যেই রয়েছে সত্যিকারের সফলতা।
নিচের হাদিসটি দেখুন-
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ، قَالَ نَامَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم عَلَى حَصِيرٍ فَقَامَ وَقَدْ أَثَّرَ فِي جَنْبِهِ فَقُلْنَا يَا رَسُولَ اللَّهِ لَوِ اتَّخَذْنَا لَكَ وِطَاءً . فَقَالَ “ مَا لِي وَمَا لِلدُّنْيَا مَا أَنَا فِي الدُّنْيَا إِلاَّ كَرَاكِبٍ اسْتَظَلَّ تَحْتَ شَجَرَةٍ ثُمَّ رَاحَ وَتَرَكَهَا ” .
আবদুল্লাহ (রা.) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনো একসময় খেজুর পাতার মাদুরে শুয়েছিলেন। তিনি ঘুম হতে জাগ্রত হয়ে দাঁড়ালে দেখা গেল তার গায়ে মাদুরের দাগ পড়ে গেছে। আমরা বললাম, হে আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আমরা আপনার জন্য যদি একটি নরম বিছানার (তোষক) ব্যবস্থা করতাম। তিনি বললেন, দুনিয়ার সঙ্গে আমার কি সম্পর্ক দুনিয়াতে আমি এমন একজন পথচারী মুসাফির ছাড়া তো আর কিছুই নই, যে একটি গাছের ছায়ায় আশ্রয় নিল, তারপর তা ছেড়ে দিয়ে গন্তব্যের দিকে চলে গেল।
(তিরমিজি, হাদিস : ২৩৭৭)
এই হাদিসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুনিয়ার প্রকৃত বাস্তবতা অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী উপমার মাধ্যমে তুলে ধরেছেন। দুনিয়া স্থায়ী আবাস নয়; এটি সাময়িক বিশ্রামস্থল মাত্র। যেমন পথিক দীর্ঘ সফরের মাঝে কিছুক্ষণ ছায়ায় বিশ্রাম নিয়ে আবার যাত্রা শুরু করে, তেমনি মানুষের প্রকৃত গন্তব্য আখিরাত। তাই দুনিয়ার আরাম-আয়েশ, ভোগ-বিলাস ও প্রাচুর্যের প্রতি অতিরিক্ত আসক্ত হওয়া একজন মুমিনের জন্য সমীচীন নয়।
এ হাদিস আমাদের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। প্রথমত, সরল জীবনযাপন মানুষের মর্যাদা কমায় না; বরং তা হৃদয়কে পরিশুদ্ধ ও আল্লাহর নিকটবর্তী করে। দ্বিতীয়ত, দুনিয়ার সাময়িক কষ্ট বা অভাব নিয়ে অতিরিক্ত দুঃখিত হওয়ার কিছু নেই, কারণ এটি চিরস্থায়ী নয়। তৃতীয়ত, জীবনের মূল প্রস্তুতি হওয়া উচিত আখিরাতের জন্য, দুনিয়াকে লক্ষ্য নয়, বরং মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করা।
মোটকথা, একজন মুমিনের দৃষ্টিতে দুনিয়া হলো সফরের পথ, আর আখিরাত হলো স্থায়ী ঠিকানা। যে ব্যক্তি এ সত্য উপলব্ধি করতে পারে, তার জীবন হয়ে ওঠে সংযমী, সচেতন ও উদ্দেশ্যময়; আর সে দুনিয়ার মোহে নয়, বরং চিরস্থায়ী সফলতার পথেই এগিয়ে চলে।
এমএন
ধর্ম ও জীবন
রমজানের শেষ জুমা: বৃষ্টি উপেক্ষা করে বায়তুল মোকাররমে মুসল্লিদের ঢল
বৃষ্টি উপেক্ষা করেই রাজধানীর বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে আজ (শুক্রবার) ঢল নেমেছে ধর্মপ্রাণ মুসল্লিদের। পবিত্র রমজান মাসের শেষ জুমা তথা জুমাতুল বিদা উপলক্ষ্যে এই সমাগম। সিয়াম সাধনার মাস বিদায়ের পথে– তাই জুমার নামাজে আল্লাহর দরবারে ক্ষমা ও রহমত কামনায় ব্যাকুল ছিলেন ইবাদতকারীরা।
শুক্রবার (২০ মার্চ) দুপুর ১২টা থেকেই বায়তুল মোকাররম মসজিদে মুসল্লিদের প্রবেশ শুরু হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে মানুষের আনাগোনা। তাদের অনেকেই দূরদূরান্ত থেকে ছুটে এসেছেন জাতীয় মসজিদে রমজানের শেষ জুমার নামাজ আদায় করতে।
দুপুর ১টার আগেই মসজিদের ভেতরের মূল অংশ মুসল্লিতে পূর্ণ হয়ে যায়। আজানের পর মসজিদের নিচতলার অংশটিও ভরে ওঠে। তবে বৃষ্টির কারণে অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার মুসল্লিদের উপস্থিতি কিছুটা কম লক্ষ করা গেছে। বায়তুল মোকাররম মসজিদের খতিব আল্লামা মুফতি আবদুল মালেকের ইমামতিতে জুমার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়।
নামাজ শেষে বিশেষ মোনাজাতে আখিরাতের মুক্তি এবং দেশ ও মুসলিম জাতির শান্তি কামনা করে মহান আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করা হয়। এসময় অনেককে নিজের পরিবার ও প্রয়াত আত্মীয়স্বজনের আত্মার মাগফিরাত কামনায় দান-খয়রাত করতেও দেখা গেছে।
মুসলিম উম্মাহর কাছে মাহে রমজানের প্রতিটি দিনই পবিত্র ও মহিমামণ্ডিত। জুমার দিনটি সাপ্তাহিক ইবাদতের দিন এবং ‘গরিবের ঈদ’ হিসেবে গণ্য হওয়ায় এর ফজিলত অনেক। আর সেই দিনটি যখন রমজানের শেষ দশকে তথা জুমাতুল বিদা হয়, তখন তা প্রতিটি রোজাদারের কাছে বিশেষভাবে সম্মানিত ও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে।
ধর্ম ও জীবন
শুক্রবার ঈদুল ফিতর উদযাপন করবে যেসব দেশ
শাওয়াল মাসের চাঁদ দেখা না যাওয়ায় মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার বেশ কয়েকটি দেশে ৩০টি রোজা পালিত হবে এবং দেশগুলো শুক্রবার ঈদ উদযাপন করবে। দেশগুলো হলো, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কাতার, কুয়েত, তুরস্ক, লেবানন, ফিলিস্তিন, ইয়েমেন এবং ইরাক।
মধ্যপ্রাচ্যের এই দেশগুলো ছাড়াও আফ্রিকা অঞ্চলের সুদান, জিবুতি, সোমালিয়া, উগান্ডা, নাইজেরিয়া, চাদ, গাম্বিয়া, গিনি, বেনিন, সেনেগাল এবং ক্যামেরুনও শুক্রবার ঈদুল ফিতর উদযাপনের ঘোষণা দিয়েছে। এই দেশগুলো ছাড়াও শুক্রবার ঈদুল ফিতর উদযাপন করবে অস্ট্রেলিয়া এবং মালদ্বীপ।
তুরস্ক এবং অস্ট্রেলিয়া জ্যোতির্বিজ্ঞানের হিসাব ও পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে শুক্রবারকে ঈদের দিন হিসেবে নিশ্চিত করেছে। তবে শাওয়ালের চাঁদ দেখা যাওয়ায় বৃহস্পতিবার (১৯ মার্চ) ঈদুল ফিতর উদযাপন করছে আফগানিস্তান, নাইজার এবং মালি।
এদিকে সিঙ্গাপুর ঘোষণা করেছে যে, বৃহস্পতিবার চাঁদ দেখা অসম্ভব হওয়ায় সেখানে শনিবার ঈদুল ফিতর পালিত হবে। তবে আজ (বৃহস্পতিবার) সন্ধ্যায় শাওয়াল মাসের চাঁদ দেখার চেষ্টা করবে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তানসহ বেশ কিছু দেশ।
চাঁদ দেখার ওপর ভিত্তি করে এসব দেশে শুক্রবার বা শনিবার ঈদ উদযাপিত হবে। এই তালিকায় আরও রয়েছে ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, ব্রুনাই, ইরান, ওমান, জর্ডান, সিরিয়া, মিশর, লিবিয়া, তিউনিসিয়া, আলজেরিয়া, মরক্কো এবং মৌরিতানিয়া।
আন্তর্জাতিক
সবার আগে একটি দেশের ঈদের তারিখ ঘোষণা
অস্ট্রেলিয়ায় পবিত্র ঈদুল ফিতরের তারিখ ঘোষণা করা হয়েছে। দেশটির শীর্ষ ইসলামি সংগঠন অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইমামস কাউন্সিল জানিয়েছে, আগামী শুক্রবার (২০ মার্চ) অস্ট্রেলিয়ায় ঈদুল ফিতর উদযাপিত হবে। দিনটি হবে ১৪৪৭ হিজরি সালের ১ শাওয়াল।
এক বিবৃতিতে সংস্থাটি জানায়, অস্ট্রেলিয়ান ফতোয়া কাউন্সিল জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র এবং চাঁদ দেখার দায়িত্বে থাকা বিশেষায়িত বৈজ্ঞানিক প্রতিষ্ঠানগুলো তথ্য বিশ্লেষণ করে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে।
চাঁদ দেখার ক্ষেত্রে শুধু অস্ট্রেলিয়ার পর্যবেক্ষণই নয়, বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের তথ্য বিশেষ করে প্রতিবেশী দেশগুলোর চাঁদ দেখার সম্ভাবনাও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
ঘোষণা অনুযায়ী, অস্ট্রেলিয়ায় আগামী বৃহস্পতিবার (১৯ মার্চ) পবিত্র রমজান মাসের শেষ দিন হবে। এর পরদিনই অস্ট্রেলিয়ার মুসলিমরা ঈদুল ফিতর উদযাপন করবেন।
অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইমামস কাউন্সিল আরো জানায়, রমজান মাসের শুরু ও শেষ নির্ধারণ, শাওয়াল মাসের সূচনা এবং ঈদুল ফিতরের দিন ঠিক করতে অস্ট্রেলিয়ার গ্র্যান্ড মুফতি ও অস্ট্রেলিয়ান ফতোয়া কাউন্সিল নির্দিষ্ট কিছু বৈজ্ঞানিক মানদণ্ড অনুসরণ করে।
এর মধ্যে রয়েছে সূর্যাস্তের আগে নতুন চাঁদের আবির্ভাব, সূর্যাস্তের পর আকাশে চাঁদ কতক্ষণ দৃশ্যমান থাকতে পারে এবং অস্ট্রেলিয়া ও আশপাশের অঞ্চলে চাঁদ দেখা সম্ভব কিনা এসব বিষয়।
কাউন্সিলের মতে, এই পদ্ধতি কেবল অস্ট্রেলিয়াতেই নয়, বিশ্বের অনেক স্বনামধন্য বৈজ্ঞানিক ও ইসলামি গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং ফিকহভিত্তিক সংগঠনও অনুসরণ করে থাকে। এর মাধ্যমে চাঁদ দেখার বিষয়ে একটি সুসংগঠিত ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয়।
সূত্র : খালিজ টাইমস
জাতীয়
আজ ইমাম-মুয়াজ্জিনদের সম্মানি কার্যক্রম উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী
আজ শনিবার (১৪ মার্চ) ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের সম্মানি প্রদান কার্যক্রমের শুভ উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
সকাল ১০টায় রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে এ অনুষ্ঠাব হবে বলে জানিয়েছে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়।
তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের এক বার্তায় এ তথ্য জানানো হয়।
মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা ইমরানুল হাসানের পাঠানো এক বার্তায় আরও জানানো হয়, একইদিন খাদেম, পুরোহিত, সেবায়েত, বিহার অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষদের সম্মানি প্রদান কার্যক্রমের উদ্বোধন করা হবে।
ধর্ম ও জীবন
রমজানের মাঝপথে আত্মজিজ্ঞাসা
রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের এই রমজান মাসের অর্ধেক সময় আমরা ইতিমধ্যে অতিক্রম করে এসেছি। যেই মাস আমাদের সামনে উপনিত হয়েছিল ফিরে আসার আহ্বান নিয়ে, শুদ্ধ হওয়ার আহ্বান নিয়ে, আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক নবায়নের আহ্বান নিয়ে। প্রথম রোজার দিনে আমাদের অন্তরে যে আবেগ, যে সংকল্প, যে অশ্রুসিক্ত আবেদন ছিল; মধ্য রমজানে দাঁড়িয়ে কি আমরা সেই একই উষ্ণতা অনুভব করছি? নাকি ব্যস্ততা, ক্লান্তি আর প্রাত্যহিক অভ্যাসের চাপে সেই উষ্ণতা কিছুটা ম্লান হয়ে গিয়েছে?
সময় সত্যিই দ্রুত বয়ে যায়। দিনগুলো, সাহরি ও ইফতারের বরকতময় সময়গুলো গড়িয়ে যাচ্ছে, তারাবির রাকাতগুলো শেষ হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, আমাদের হৃদয়ের ভেতর কি কোনো পরিবর্তন ঘটছে? রোজা কি কেবল ক্ষুধা ও তৃষ্ণা সহ্য করার অনুশীলনে সীমাবদ্ধ থাকছে, নাকি তা অন্তরকে নরম করছে, চোখকে সংযত করছে, জিহ্বাকে সত্য ও সৌজন্যের দিকে ফিরাচ্ছে? আমরা কি আগের চেয়ে একটু বেশি ধৈর্যশীল, একটু বেশি বিনয়ী, একটু বেশি দয়ালু হতে পেরেছি? কারণ রমজান তো আত্মার জাগরণের মাস।
এ মাসে আকাশের দরজা খোলা রয়েছে, রহমত নাজিল চ্ছে, গুনাহ মাফের সুবর্ণ সুযোগ তৈরি হয়েছে। কিন্তু সেই সুযোগ কি আমরা পরিপূর্ণভাবে গ্রহণ করছি?
তাই রমজানের মাঝপথে এসে মোজাসাবা জরুরি। নিজেকে জিজ্ঞেস করা প্রয়োজন যে, আমার নামাজে কি একাগ্রতা বেড়েছে, কোরআনের আয়াত কি হৃদয়কে বিগলিত করছে, অন্যায়ের প্রতি আমার অবস্থান কি দৃঢ় হয়েছে?
আসলে এই সময়টা এক নীরব মোড়। সামনে শেষ দশক, যেখানে রয়েছে লাইলাতুল কদরের অনুসন্ধান আর ইতিকাফের নির্জনতা।
এর আগে যদি আমরা নিজের ভেতরে তাকাই, তাহলে বাকি সময়টুকু নতুন উদ্যমে সাজানো সম্ভব। তাই রমজানের মাঝপথে দাঁড়িয়ে সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন হলো; আমরা কি এই মাসের প্রকৃত উদ্দেশ্যের দিকে এগোচ্ছি?
পবিত্র কোরআনে রোজার উদ্দেশ্য সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করা হয়েছে: ‘হে ঈমানদারগণ, তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর, যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো।’ (সুরা বাকারা আয়াত : ১৮৩)
এ আয়াতে রোজার মূল উদ্দেশ্য তাকওয়া অর্জন বলা হয়েছে। যার ব্যাখ্যায় ইমাম ইবনে কাসীর (রহ.) লিখেছেন, রোজা মানুষের প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণে আনতে সাহায্য করে এবং পাপ থেকে বিরত থাকার মানসিক শক্তি তৈরি করে।
তিনি বলেন, রোজা শয়তানের প্রভাব দুর্বল করে, কারণ তা মানুষের কামনা-বাসনাকে সংযত করে। (তাফসিরে ইবনে কাসির ২/১৮৩)
ইমাম কুরতুবী রহ. বলেন, তাকওয়া হলো আল্লাহর ভয়কে অন্তরে ধারণ করে তাঁর অবাধ্যতা থেকে দূরে থাকা। রোজা যেহেতু গোপন ইবাদত, তাই এতে রিয়া বা লোকদেখানো প্রবণতা কম থাকে; ফলে এটি সরাসরি তাকওয়া গঠনে ভূমিকা রাখে। (আল-জামি‘ লি আহকামিল কুরআন, ২/১৮৩)
এখন প্রশ্ন হলো, আমাদের রোজা কি সত্যিই তাকওয়া তৈরি করছে? রাসুলুল্লাহ (সা.) সতর্ক করে বলেছেন: ‘যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা ও মন্দ কাজ পরিত্যাগ করে না, তার পানাহার ত্যাগ করার কোনো প্রয়োজন আল্লাহর নেই।’ (বুখারি, হাদিস : ১৯০৩)
এই হাদিস আমাদের সামনে আয়নার মতো সত্য তুলে ধরে।
রোজা শুধু খাদ্য ত্যাগের নাম নয়; এটি জিহ্বা, চোখ, কান ও অন্তরের সংযমের নাম। যদি রমজানের মাঝপথে এসে আমরা দেখি যে, মিথ্যা, গীবত, হিংসা, দুর্নীতি বা অন্যায় আচরণ আমাদের জীবন থেকে কমেনি, তবে বুঝতে হবে রোজার আত্মিক ফল আমরা পুরোপুরি অর্জন করতে পারিনি।
রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেছেন: ‘কত রোজাদার আছে, যার রোজা থেকে প্রাপ্তি শুধু ক্ষুধা।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ১৬৯০)
এ হাদিস আমাদের ভাবিয়ে তোলে। রোজা যদি চরিত্র গঠন না করে, তাহলে তা কেবল আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়। তাই মাঝপথে এসে আত্মসমালোচনা অতীব জরুরি।
রমজান কোরআনের মাস। মহান আল্লাহ বলেন: ‘রমজান সেই মাস, যাতে কোরআন অবতীর্ণ হয়েছে। (সুরা আল-বাকারা আয়াত : ১৮৫)
ইমাম শাফেয়ী রহ. রমজানে অধিক কোরআন তিলাওয়াতের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিতেন। ইমাম মালিক রহ. রমজান শুরু হলে হাদিস পাঠের আসর কমিয়ে কোরআন পাঠে মনোনিবেশ করতেন। (ইবন রজব, লাতায়িফুল মা‘আরিফ) এসব ঐতিহাসিক তথ্য আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, রমজান শুধু সামাজিক উৎসব নয়; এটি কোরআনের সঙ্গে সম্পর্ক নবায়নের সময়। মধ্য রমজানে আমারে হিসাব মিলানো দরকার আমরা কোরআনের সাথে কতোটুকু সম্পর্ক স্থাপন করতে পেরেছি?
আত্মসমালোচনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হলো আমল ও চরিত্রের ধারাবাহিকতা। আল্লাহ বলেন: নিশ্চয় আল্লাহর কাছে তোমাদের মধ্যে সে-ই অধিক সম্মানিত, যে অধিক তাকওয়াবান। (সুরা হুজুরাত আয়াত : ১৩)
ইমাম নববী রহ. তাকওয়ার ব্যাখ্যায় বলেন, এটি এমন এক অবস্থা, যেখানে বান্দা আল্লাহর সন্তুষ্টিকে অগ্রাধিকার দেয় এবং গোপনে-প্রকাশ্যে তাঁর অবাধ্যতা থেকে বেঁচে থাকে। (শরহু সহিহ মুসলিম, ভূমিকা অংশে তাকওয়ার আলোচনা)
রমজানের মাঝপথে দাঁড়িয়ে তাই আমাদের কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর খোঁজা উচিত; আমার নামাজে কি একাগ্রতা বেড়েছে? কোরআনের সঙ্গে কি নিয়মিত সম্পর্ক তৈরি হয়েছে? গরিব ও অভাবীদের প্রতি সহমর্মিতা কি গভীর হয়েছে? আমার রাগ, অহংকার ও ভাষার কটুতা কি কমেছে?
সুতরাং রমজানের মাঝপথে দাঁড়িয়ে আমাদের হিসাব শুধু অতীত কয়েক দিনের নয়; বরং বাকি দিনগুলোকে কীভাবে অর্থবহ করব, তারও পরিকল্পনার। রোজা যদি তাকওয়া, সংযম, কোরআনপ্রেম ও মানবিকতা বৃদ্ধি না করে, তবে আমাদের নতুন করে শুরু করতে হবে। আর যদি সামান্য হলেও পরিবর্তন এসে থাকে, তবে সেটিকে স্থায়ী রূপ দিতে হবে।
রমজান চলে যায়, কিন্তু তাকওয়ার প্রয়োজন সারা বছর। তাই এই মাঝপথে দাঁড়িয়ে সৎ সাহসে নিজের হৃদয়ের দিকে তাকানোই হতে পারে রমজানের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
আসুন, আমরা এই মাঝপথকে অবহেলা না করি। এখনও সময় আছে। যে গাফলতি হয়েছে, তা স্বীকার করে নেওয়াই তো তাওবার প্রথম ধাপ। আল্লাহর দরজা এখনও খোলা, রহমতের ধারা এখনও প্রবাহমান। আজ রাতে, এই মুহূর্তে আমরা যদি আন্তরিকভাবে বলি; হে আল্লাহ, আমাদের রোজাকে কবুল করুন, আমাদের ত্রুটি মাফ করুন, আমাদের অন্তরকে শুদ্ধ করুন। তবে নিশ্চয়ই তিনি নিরাশ করবেন না।
রমজান চলে যাবে, কিন্তু তার রেখে যাওয়া ছাপ যেন আমাদের জীবনে থেকে যায়। তাই আসুন, আমরা শুধু ক্ষুধার কষ্ট নয়, গুনাহের কষ্টও অনুভব করি; শুধু ইফতারের আনন্দ নয়, ক্ষমা পাওয়ার আনন্দও খুঁজি। বাকি দিনগুলোকে এমনভাবে সাজাই, যেন ঈদের দিন আমরা শুধু নতুন পোশাকে নয়, নতুন হৃদয় নিয়েও দাঁড়াতে পারি। আল্লাহ আমাদের সবাইকে সেই তাওফিক দান করুন।



