মত দ্বিমত
দেশ গঠনে সাংবাদিকতার ভূমিকা: সত্য, ক্ষমতা এবং আমাদের আত্মবিনাশের গল্প
সংবাদমাধ্যম যখন সত্য প্রকাশের মৌলিক দায়িত্ব থেকে সরে গিয়ে ক্ষমতার প্রচারযন্ত্রে পরিণত হয়, তখন সমাজ কেবল ফ্যাসিবাদের দিকে অগ্রসর হয় না, বরং ধীরে ধীরে এমন এক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যায়, যেখানে মানবিকতা ও নৈতিকতার ভিত্তি ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ে। এই পরিবর্তন তাৎক্ষণিক নয়, এটি একটি ধীর এবং গভীর প্রক্রিয়া, যেখানে সত্যের জায়গা দখল করে প্রভাব, নিয়ন্ত্রণ এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বয়ান।
এই বাস্তবতাকে বোঝার জন্য হায়েনার রূপকটি বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। হায়েনা কেবল একটি শিকারি প্রাণী নয়, বরং এমন এক আচরণগত প্রতীক, যা সুযোগসন্ধানী সহিংসতার স্বরূপ প্রকাশ করে। এটি সবসময় সক্রিয়ভাবে শিকার করে না, কিন্তু সুযোগ পেলেই জীবিত শিকারের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং নির্মমভাবে তাকে ছিন্নভিন্ন করে। একইভাবে ক্ষমতা কেন্দ্রিক সামাজিক কাঠামোর ভেতরে কিছু গোষ্ঠীও সুযোগ পেলেই মানবিকতা ও নৈতিকতার সীমা অতিক্রম করে নিয়ন্ত্রণ ও দমনের পথে অগ্রসর হয়।
এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে, যখন সংবাদমাধ্যম সত্যের পরিবর্তে ক্ষমতার ভাষা হয়ে ওঠে, তখন একটি সমাজে বাস্তবতা কীভাবে সংজ্ঞায়িত হয়?
আরও গভীর প্রশ্ন হলো, যেখানে তথ্যের উৎসই বিকৃত, সেখানে মানুষ কোন ভিত্তিতে সত্য এবং মিথ্যার মধ্যে পার্থক্য নির্ধারণ করে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর সরল নয়। কারণ এখানে কেবল তথ্যের বিকৃতি ঘটে না, বরং ধীরে ধীরে একটি বিকল্প বাস্তবতা গড়ে ওঠে, যা ক্ষমতা, পুনরাবৃত্তি এবং প্রভাবের মাধ্যমে ক্রমশ স্বাভাবিক সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে শুরু করে।
এর ফলাফল কেবল রাজনৈতিক নয়, বরং গভীরভাবে সামাজিক এবং মনস্তাত্ত্বিক। এই কাঠামোর ভেতরে এমন কিছু শক্তি গড়ে ওঠে, যারা নিজেদের ক্ষমতাবান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে, কিন্তু ধীরে ধীরে মানবিকতা ও নৈতিকতার মূল ভিত্তি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। তারা এক ধরনের নিয়ন্ত্রণনির্ভর বাস্তবতার প্রতিনিধিতে পরিণত হয়, যেখানে সত্য নয়, বরং আধিপত্যই প্রধান মানদণ্ড হয়ে ওঠে। আমাদের সমাজেও আজ সেই প্রবণতা স্পষ্ট। কিছু মানুষ, যারা নিজেদের ক্ষমতাশালী বলে মনে করে, তারা ধীরে ধীরে মানবিকতা হারিয়ে দানবীয় রূপ নিচ্ছে। তারা হয়ে উঠছে গডফাদার, স্বৈরাচার, ফ্যাসিস্ট, অসভ্য ও বিকৃত মানসিকতার এক ধরনের ক্ষমতাকেন্দ্রিক শক্তি, যাদের কাছে সত্যের কোনো মূল্য নেই, নিয়ন্ত্রণই একমাত্র লক্ষ্য।
আমি বিশ্বের নানা দেশের সাংবাদিকদের কাজ দেখেছি, তাদের চর্চা পর্যবেক্ষণ করেছি। সেখানে মতাদর্শের পার্থক্য আছে, কাজের ধরণে ভিন্নতা আছে, কিন্তু একটি মৌলিক জায়গায় স্পষ্ট মিল দেখা যায়, তারা নিজেদের ভূমিকা সম্পর্কে সচেতন। তারা জানে রাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক কী, এবং জনগণের প্রতি তাদের দায় শেষ হয় না, বরং সেখান থেকেই শুরু হয়।
কিন্তু বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে এসে সেই একই সচেতনতা, সেই একই পেশাগত অবস্থান খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এটি কি ব্যক্তিগত সীমাবদ্ধতা, নাকি একটি বৃহত্তর কাঠামোগত বাস্তবতা? এই প্রশ্ন এখনো অমীমাংসিত থেকে যায়।
বিশ্বের উন্নত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোতে সাংবাদিকতা কেবল একটি পেশা নয়, এটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব এবং সামাজিক চুক্তির অংশ। সেখানে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা ক্ষমতার বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলার একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, কোনো ব্যতিক্রমী ঘটনা নয়। The New York Times বা BBC-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলোতে সাংবাদিকতার এই ভূমিকা দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠিত। ইতিহাসে Watergate scandal দেখিয়েছে, কীভাবে একটি শক্তিশালী সংবাদমাধ্যম রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতাকেও জবাবদিহির কাঠামোর মধ্যে আনতে পারে।
এই বাস্তবতার সঙ্গে তুলনা করলে বাংলাদেশের পরিস্থিতি একটি ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে। এখানে সাংবাদিকতার ভূমিকা প্রায়শই প্রশ্ন তোলার জায়গায় না থেকে কাঠামোর সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার একটি প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়। ফলে রাষ্ট্র, ক্ষমতা এবং সংবাদমাধ্যমের মধ্যে যে সমালোচনামূলক দূরত্ব থাকা প্রয়োজন, সেটি ক্রমশ সংকুচিত হয়ে আসে।
এই পার্থক্য কি কেবল দুর্ভাগ্য, নাকি একটি দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক গঠনের ফল, সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
সমস্যাটি কেবল ব্যক্তি সাংবাদিকের নয়, এটি একটি গভীরভাবে প্রোথিত কাঠামোগত বাস্তবতা। সাংবাদিকতা অনেক ক্ষেত্রেই একটি পেশাগত দক্ষতা হিসেবে শেখানো হয়, কিন্তু একটি নৈতিক ও সামাজিক দায়িত্ব হিসেবে গড়ে তোলার প্রক্রিয়া দুর্বল থেকে যায়। ফলে তাত্ত্বিকভাবে নৈতিকতার কথা থাকলেও, বাস্তব প্রয়োগের জায়গায় সেটি ধীরে ধীরে ক্ষয় হতে থাকে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই প্রশ্ন আরও তীব্র হয়ে ওঠে, কেন এই রূপান্তর কার্যকরভাবে ঘটছে না?
এর একটি বড় কারণ হলো শিক্ষা ও পেশাগত বাস্তবতার মধ্যে ব্যবধান। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে সাংবাদিকতা শিক্ষায় নৈতিকতা, গণতান্ত্রিক দায়িত্ব এবং পেশাগত মানদণ্ডের কথা বলা হলেও, বাস্তব কর্মজীবনে প্রবেশের পর সেই কাঠামো খুব কম ক্ষেত্রেই টিকে থাকে। বিশেষ করে প্রাথমিক কর্মপর্ব বা ইন্টার্নশিপ পর্যায়টি অনেক সময় নৈতিকতার চর্চা না হয়ে বেঁচে থাকার প্রশিক্ষণ হিসেবে কাজ করে।
এই পর্যায়ে একজন শিক্ষার্থী বা নবীন সাংবাদিক ধীরে ধীরে বুঝতে শেখে যে বাস্তব কাঠামোর ভেতরে টিকে থাকার শর্ত প্রায়ই নির্ভর করে ক্ষমতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সক্ষমতার ওপর, সত্যের প্রতি অটল থাকার ওপর নয়। এই অভিজ্ঞতা তাকে এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করায়, যেখানে আদর্শগত সাংবাদিকতার চেয়ে প্রাতিষ্ঠানিক চাপ এবং সম্পর্কনির্ভর রাজনীতি অধিক প্রভাবশালী হয়ে ওঠে।
ফলে সময়ের সাথে সাথে একটি বিপরীত শিক্ষা তৈরি হয়, যেখানে বইয়ে শেখা নৈতিকতা এবং কর্মক্ষেত্রের বাস্তবতা একে অপরের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়, এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে বাস্তবতাই জয়ী হয়। এই প্রক্রিয়ায় একজন সম্ভাবনাময় সাংবাদিক ধীরে ধীরে তার আদর্শগত অবস্থান থেকে সরে গিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে বাধ্য হয়।
এটাই সেই বাস্তবতা, যেখানে সাংবাদিকতা তার আদর্শগত সংজ্ঞা থেকে সরে গিয়ে একটি টিকে থাকার দক্ষতায় রূপান্তরিত হয়। এই অবস্থাকে যদি কাঠামোগতভাবে দেখা হয়, তাহলে এটি কেবল ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়, বরং একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্যহীনতার ফল।
শেষ পর্যন্ত সাংবাদিকতা যদি সত্য বলার নৈতিক অবস্থান থেকে সরে গিয়ে কেবল পেশাগত টিকে থাকার কৌশলে পরিণত হয়, তাহলে সমাজের তথ্যভিত্তিক কাঠামোও ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে। তখন প্রশ্নটি অনিবার্য হয়ে ওঠে, আমরা কি সত্য উৎপাদন করছি, নাকি কেবল বাস্তবতার একটি ব্যবস্থাপিত সংস্করণ তৈরি করছি?
এই হারিয়ে যাওয়ার পেছনে সবচেয়ে গভীর কারণ হলো পুরো রাষ্ট্রীয় পরিকাঠামোর কাঠামোগত অবক্ষয়। যখন একটি দেশের রাজনৈতিক, প্রশাসনিক এবং প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো দুর্নীতি, স্বার্থ এবং ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতায় জর্জরিত হয়ে পড়ে, তখন সেখানে নৈতিক সাংবাদিকতার টিকে থাকা প্রায় অসম্ভব হয়ে যায়। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং একটি ধারাবাহিক এবং পরস্পর সংযুক্ত প্রক্রিয়া।
একটি রাষ্ট্রের মেরুদণ্ড হওয়ার কথা তার সংসদ। সেখানে আইন প্রণয়ন, নীতি নির্ধারণ এবং জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটার কথা। কিন্তু বাস্তবতা যখন এই আদর্শ কাঠামো থেকে বিচ্যুত হয়, তখন সেই প্রতিষ্ঠানই তার মূল অর্থ হারাতে শুরু করে।
সংসদে প্রবেশের পথ যদি দুর্নীতি, জালিয়াতি এবং আর্থিক প্রভাবের মাধ্যমে নির্ধারিত হয়, তাহলে সেই প্রতিষ্ঠান থেকে প্রকৃত অর্থে কী প্রত্যাশা করা যায়? এই জায়গায় প্রশ্নটি সরাসরি হয়ে দাঁড়ায়, যে ব্যক্তি বিপুল অর্থ ব্যয় করে সংসদ সদস্য পদ অর্জন করে, সে কি সত্যিই জনসেবা করতে আসে, নাকি একটি বিনিয়োগের রিটার্ন নিশ্চিত করতে আসে?
যখন রাজনীতি ধীরে ধীরে বিনিয়োগ নির্ভর কাঠামোয় রূপ নেয়, তখন নির্বাচন একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া না থেকে একটি ব্যবসায়িক প্রকল্পে পরিণত হয়। সেখানে জনগণ হয়ে ওঠে কেবল একটি মাধ্যম, আর ক্ষমতা রূপ নেয় মুনাফা অর্জনের কাঠামোয়। এর স্বাভাবিক ফলাফল হলো আইন প্রণয়ন জনস্বার্থের পরিবর্তে বিনিয়োগ সুরক্ষার একটি হাতিয়ারে পরিণত হয়।
এই বাস্তবতায় রাষ্ট্রীয় কাঠামোর প্রতিটি স্তর একে একে বিকৃত হয়ে পড়ে। আইন ব্যবহৃত হয় ঢাল হিসেবে, নীতি ব্যবহৃত হয় কেবল সাজসজ্জা হিসেবে, আর জনগণ ব্যবহৃত হয় বৈধতার আবরণ তৈরির উপকরণ হিসেবে।
যারা এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সংসদে প্রবেশ করে, তারা দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি এবং প্রতারণার মতো কাঠামোগত সমস্যার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত হয়ে পড়ে। এবং এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমেই রাষ্ট্রের সামগ্রিক পরিকাঠামো পরিচালিত ও পুনরুৎপাদিত হয়।
এই অবস্থায় সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ তারা যদি এই কাঠামোগত বাস্তবতাকে প্রশ্ন না করে বরং স্বাভাবিক ও গ্রহণযোগ্য হিসেবে উপস্থাপন করে, তাহলে পুরো ব্যবস্থা একটি স্বনিয়ন্ত্রিত দুর্নীতির চক্রে পরিণত হয়।
এখানেই সাংবাদিকতার প্রকৃত পরীক্ষা শুরু হয়, তারা কি এই বিনিয়োগ নির্ভর ক্ষমতা কাঠামোর বিরুদ্ধে দাঁড়াবে, নাকি ধীরে ধীরে তারই অংশে পরিণত হবে?
কারণ যদি সংসদ হয় দুর্নীতির উৎপত্তিস্থল, আর সংবাদমাধ্যম হয় তার সৌন্দর্যবর্ধক ব্যাখ্যাকারী, তাহলে রাষ্ট্রের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলোর পতন কেবল সময়ের অপেক্ষা। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো যদি নিজেরাই নিয়ম ভঙ্গ করে, তাহলে আইনের প্রতি সামাজিক আস্থা ভেঙে পড়ে।
দুর্নীতি দমনের জন্য যে কমিশনগুলো গঠিত হয়, সেই প্রতিষ্ঠানগুলোই যদি দুর্নীতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার অংশ হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে সেটি কেবল প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, বরং একটি কাঠামোগত প্রহসন।
এই বাস্তবতার ব্যাখ্যায় প্রায়ই বাইরের শক্তিকে দায়ী করা হয়। বিশেষ করে ভারতকে ঘিরে নানা ধরনের ষড়যন্ত্র তত্ত্ব প্রচলিত আছে, যেখানে বলা হয় রাজনৈতিক দলগুলোকে ব্যবহার করে একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। কিন্তু এই ব্যাখ্যা একটি সহজ পথ তৈরি করে দেয়, নিজেদের দায় এড়িয়ে যাওয়ার পথ।
বাস্তবতা হলো, একটি দেশের অভ্যন্তরীণ প্রতিষ্ঠানগুলো যখন দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন বাইরের প্রভাব কার্যকর হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। তবে সেই দুর্বল কাঠামোর ভিত্তি প্রথমে তৈরি হয় অভ্যন্তরীণ ব্যর্থতার মধ্য দিয়েই। রাজনৈতিক সংস্কৃতি, প্রশাসনিক কাঠামো, সংসদীয় আচরণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা মিলেই এমন একটি পরিবেশ গড়ে তোলে যেখানে সত্য ধীরে ধীরে প্রান্তিক হয়ে পড়ে। এখানেই সাংবাদিকতার ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
সাংবাদিকদের মৌলিক কাজ হলো বাস্তবতাকে উন্মোচন করা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, সেই বাস্তবতা প্রায়ই ঘষেমেজে, সাজিয়ে এবং পরিশোধিতভাবে উপস্থাপন করা হয়। ফলে সত্যের পরিবর্তে একটি নিয়ন্ত্রিত ও নির্বাচিত বাস্তবতা তৈরি হয়, যা ধীরে ধীরে সমাজে স্বাভাবিক সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে শুরু করে।
এই প্রবণতার মধ্য দিয়েই একটি নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, যেখানে সাংবাদিকতা তার নৈতিক অবস্থান থেকে সরে গিয়ে একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর সঙ্গে অভিযোজিত হয়ে পড়ে, যা বইয়ে লেখা নেই, সিলেবাসে সংজ্ঞায়িত নয়, কিন্তু বাস্তব কর্মক্ষেত্রে দৃশ্যমান।
এই অবস্থার প্রভাব কেবল সংবাদমাধ্যমে সীমাবদ্ধ থাকে না। যখন আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো নিজেরাই নিয়ম ভঙ্গ করে, তখন সমাজে আইনের প্রতি আস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে। একইভাবে দুর্নীতি দমন কমিশনের মতো প্রতিষ্ঠান যদি দুর্নীতি প্রতিরোধের পরিবর্তে সেটিকে কাঠামোগতভাবে সহনীয় করে তোলে, তাহলে সেটি আর নিয়ন্ত্রণের প্রতিষ্ঠান থাকে না, বরং একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার প্রতীকে পরিণত হয়।
এই পরিস্থিতিতে অনেকেই আবার বাইরের শক্তিকে দায়ী করতে চান। বিশেষ করে ভারতকে কেন্দ্র করে নানা ধরনের ব্যাখ্যা সামনে আনা হয়, যেখানে বলা হয় একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। কিন্তু এই ব্যাখ্যাগুলো যতই শক্তিশালী মনে হোক না কেন, এগুলো প্রায়ই একটি সহজ পথ তৈরি করে দেয়, নিজেদের অভ্যন্তরীণ দায় এড়িয়ে যাওয়ার পথ।
বাস্তবতা হলো, একটি দেশের অভ্যন্তরীণ কাঠামো দুর্বল না হলে বাইরের কোনো প্রভাবই দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর হতে পারে না। সেই দুর্বলতার ভিত্তি আমরা নিজেরাই তৈরি করি, রাজনৈতিক সংস্কৃতি, প্রশাসনিক কাঠামো, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা এবং জবাবদিহির অভাবের মাধ্যমে।
এই অবস্থায় রাজনীতি আর আদর্শের জায়গা থাকে না, এটি হয়ে ওঠে বিনিয়োগের ক্ষেত্র। আর এই বিনিয়োগের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্যই গড়ে ওঠে একটি সমন্বিত কাঠামো, সংসদ, প্রশাসন, কমিশন এবং সংবাদমাধ্যম, যেখানে প্রত্যেকে প্রত্যেককে রক্ষা করে, এবং সম্মিলিতভাবে একটি বিকৃত কিন্তু স্থিতিশীল বাস্তবতা বজায় রাখে।
এই বাস্তবতায় সাংবাদিকতার ভূমিকা আর নিরপেক্ষ থাকে না। তারা হয় এই কাঠামোর বিরুদ্ধে দাঁড়াবে, অথবা ধীরে ধীরে তার অংশ হয়ে উঠবে। মাঝামাঝি কোনো অবস্থান এখানে দীর্ঘস্থায়ী হয় না। একটি রাষ্ট্রে যদি সত্যের প্রবাহ বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াও বিকৃত হয়ে পড়ে। মানুষ তখন তথ্যের ভিত্তিতে নয়, বরং প্রভাবিত বয়ানের ভিত্তিতে চিন্তা করে। এর ফলে ভুল সিদ্ধান্তই স্বাভাবিক হয়ে ওঠে, আর সঠিক প্রশ্নগুলো ক্রমশ অদৃশ্য হয়ে যায়।
এই অবস্থায় বাইরের শক্তিকে দায়ী করা সহজ, কিন্তু তা সমস্যার সমাধান নয়। একটি রাষ্ট্র তখনই দুর্বল হয়, যখন তার ভেতরের কাঠামো নিজেই সত্য ধারণ করার সক্ষমতা হারায়। বাইরের প্রভাব সেই দুর্বলতার সুযোগ নেয়, সৃষ্টি করে না। তাই মূল প্রশ্নটি বাইরের নয়, ভেতরের।
আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলো কি এখনো সত্য ধারণ করার মতো শক্তিশালী, নাকি তারা কেবল ক্ষমতার প্রতিধ্বনি হয়ে উঠেছে এবং আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, সাংবাদিকরা কি এখনো জনগণের পক্ষে দাঁড়াতে প্রস্তুত, নাকি তারা ইতিমধ্যেই কাঠামোর অংশ হয়ে গেছে?
কারণ ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, একটি জাতিকে ধ্বংস করার জন্য বাহ্যিক আক্রমণ সবসময় প্রয়োজন হয় না। যখন সত্য বিকৃত হয়, নৈতিকতা আপস করে, এবং প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের উদ্দেশ্য হারিয়ে ফেলে, তখন একটি সমাজ ভেতর থেকেই ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ে। বাংলাদেশ আজ সেই সীমানায় দাঁড়িয়ে আছে।
এখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়, আমরা কি এই কাঠামোগত বিকৃতিকে স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নেব, নাকি এর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে একটি জবাবদিহিমূলক, সত্যভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা পুনর্গঠন করব?
কারণ শেষ পর্যন্ত একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় তার অর্থনীতি বা সামরিক শক্তি দিয়ে নয়, বরং তার সত্য বলার সাহস দিয়ে।
রহমান মৃধা, গবেষক ও লেখক, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন।
মত দ্বিমত
রাষ্ট্রক্ষমতা, ১/১১ থেকে ২০২৪: ক্ষমতার কাঠামো ও ন্যারেটিভের ইতিহাস
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাস একক কোনো ঘটনার ইতিহাস নয়, বরং বহু স্তরের সংকট, ক্ষমতার পুনর্বিন্যাস এবং রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের অদৃশ্য কেন্দ্রগুলোর ধারাবাহিক বিবর্তন। এই ধারার দুটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হলো ১/১১ পরবর্তী সময় এবং ২০২৪ সালের গণআন্দোলন ও রাজনৈতিক পরিবর্তন।
এই দুইটি সময়কালকে আলাদা মনে হলেও, তাদের ভেতরে একটি গভীর কাঠামোগত মিল রয়েছে। সেই মিল হলো, রাষ্ট্রের চূড়ান্ত সংকট মুহূর্তে ক্ষমতার কেন্দ্র কেবল নির্বাচিত রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং নিরাপত্তা কাঠামো, প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান এবং প্রভাবশালী মতাদর্শিক শক্তির মধ্যে পুনর্বিন্যাসিত হয়ে যায়।
১/১১: কোর গ্রুপ, রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ এবং ক্ষমতার পুনর্গঠন
১/১১ সময়কাল বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি জটিল এবং বিতর্কিত অধ্যায়। এই সময় নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক বিশ্লেষণ, সংবাদ প্রতিবেদন এবং পরবর্তী মন্তব্যে একটি ধারণা বারবার উঠে আসে, সেটি হলো রাষ্ট্রের ভেতরে একটি প্রভাবশালী “কোর গ্রুপ” সক্রিয় ছিল।
এই বর্ণনা অনুযায়ী, এই গ্রুপ রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় গভীরভাবে প্রভাব বিস্তার করেছিল। বিশেষ করে গ্রেপ্তার, মামলা, প্রশাসনিক রদবদল এবং রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কাঠামো নির্ধারণে তাদের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ বলে দাবি করা হয়। এই সময়ের সঙ্গে তৎকালীন সেনা নেতৃত্বের নাম বিশেষভাবে যুক্ত হয়, বিশেষ করে জেনারেল মঈন উ আহমেদ। বিভিন্ন বিশ্লেষণে বলা হয়, তার নেতৃত্বে রাষ্ট্র একটি নিয়ন্ত্রিত প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যে পরিচালিত হয়েছিল, যার লক্ষ্য ছিল রাজনৈতিক সংকট নিয়ন্ত্রণ এবং রাষ্ট্রকে সম্ভাব্য সংঘাত থেকে রক্ষা করা।
তবে সমালোচনামূলক ব্যাখ্যায় বলা হয়, এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ধারাকে সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছিল এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ভারসাম্যে সামরিক প্রভাব বৃদ্ধি পেয়েছিল, যা পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতায় দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে।
জেনারেল মতিন: মধ্যস্থতার বিতর্কিত বয়ান
এই সময়কাল নিয়ে আরেকটি বিতর্কিত নাম হলো জেনারেল মতিন। বিভিন্ন বর্ণনায় তাকে এমন একজন ব্যক্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়, যিনি সংকট আরও গভীর না হতে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন এবং বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে যোগাযোগ বা সমন্বয়ের ভূমিকা পালন করেছিলেন।
কিছু বর্ণনায় তাকে “মিডল ম্যান” বা মধ্যস্থতাকারী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, যিনি রাষ্ট্রের ভেতরের সংঘাতকে নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করেছিলেন। তবে তার এই ভূমিকা নিয়ে কোনো নিরপেক্ষ, পূর্ণাঙ্গ এবং ঐতিহাসিকভাবে প্রতিষ্ঠিত তদন্ত এখনো নেই। ফলে এটি এখনো ব্যাখ্যা, ধারণা এবং রাজনৈতিক বয়ানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
গণমাধ্যম এবং ন্যারেটিভ নির্মাণ
এই সময় গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়েও তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়। এক পক্ষের মতে, কিছু প্রভাবশালী গণমাধ্যম এবং সাংবাদিক রাজনৈতিক ন্যারেটিভ নির্মাণে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ভাষ্যকে প্রভাবিত করেছে। অন্য পক্ষের মতে, তারা শুধুমাত্র তথ্য উপস্থাপন করেছে এবং রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন ঘটিয়েছে। এই দ্বন্দ্বের ফলে একই ঘটনা একাধিক ব্যাখ্যায় বিভক্ত হয়ে পড়ে এবং রাষ্ট্রীয় ইতিহাস একটি একক সত্যের বদলে বহু বয়ানের প্রতিযোগিতায় রূপ নেয়।
১/১১ থেকে ২০২৪: একটি কাঠামোগত ধারাবাহিকতা
এই পুরো সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কাঠামো কেবল রাজনৈতিক নেতৃত্বের হাতে সীমাবদ্ধ ছিল না। বরং নিরাপত্তা কাঠামো, প্রশাসনিক বলয় এবং প্রভাবশালী মতাদর্শিক শক্তির পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্য দিয়ে তা পরিচালিত হয়েছে। এই বাস্তবতা ১/১১ কে শুধু একটি রাজনৈতিক পরিবর্তন নয়, বরং রাষ্ট্রক্ষমতার ভেতরের অদৃশ্য কেন্দ্রগুলোর পুনর্গঠনের একটি অধ্যায় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে, যার প্রভাব পরবর্তী বহু বছর ধরে রাজনৈতিক কাঠামোতে প্রতিফলিত হয়েছে।
২০২৪ সালের গণআন্দোলন, রাষ্ট্রীয় সংকট এবং ক্ষমতার পুনর্বিন্যাস
২০২৪ সালের রাজনৈতিক সংকট বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি গভীর এবং নির্ধারণী মোড় হিসেবে বিবেচিত হয়ে আছে। এই সংকটের সূচনা ঘটে কোটা সংস্কার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে, যা শুরুতে একটি নির্দিষ্ট দাবি-ভিত্তিক ছাত্র আন্দোলন হলেও ধীরে ধীরে তা রাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থা, রাজনৈতিক বৈধতা এবং ক্ষমতার কাঠামোর বিরুদ্ধে এক বিস্তৃত গণআন্দোলনে রূপ নেয়।
সময়ের সাথে সাথে আন্দোলনের পরিসর বাড়তে থাকে এবং তা রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় প্রতিক্রিয়াও কঠোর হতে থাকে। বিভিন্ন পর্যায়ে সংঘর্ষ, গ্রেপ্তার, কারফিউ, ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণ এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার ব্যাপক মোতায়েন পরিস্থিতিকে আরও জটিল এবং উত্তেজনাপূর্ণ করে তোলে। এই পর্যায়ে রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতার প্রধান ভার কার্যত নিরাপত্তা কাঠামোর ওপর কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়ে, যার মধ্যে সেনাবাহিনীর ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
সেনাবাহিনীর ভূমিকা: নিয়ন্ত্রণ, সংযম এবং স্থিতিশীলতা
সংকটের চূড়ান্ত পর্যায়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম এবং বিশ্লেষণে দেখা যায়, সেনাবাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তারা একদিকে রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখার চেষ্টা করে, অন্যদিকে আন্দোলন দমনে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ থেকে বিরত থাকার একটি অবস্থানও গ্রহণ করে। এই অবস্থান পরিস্থিতির গতিপথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনে। কারণ এতে সংকট আরও বড় সহিংস সংঘাতে রূপ নেওয়ার ঝুঁকি কিছুটা নিয়ন্ত্রিত হয়। এই সময় সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের নেতৃত্বকে কেন্দ্র করে সেনাবাহিনীর অবস্থান রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখার দিকে অগ্রসর হয় বলে বিভিন্ন বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়।
ক্ষমতার শূন্যতা এবং অন্তর্বর্তী কাঠামোর উত্থান
সংকটের একটি পর্যায়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কাঠামোতে শূন্যতা তৈরি হয়। এই শূন্যতা মোকাবিলায় অন্তর্বর্তী প্রশাসনিক কাঠামো গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়, যেখানে সেনাবাহিনী একটি সহায়ক ও স্থিতিশীলতা রক্ষাকারী ভূমিকা পালন করে বলে বিভিন্ন সূত্রে ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার হস্তান্তর সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতির পরিবর্তে তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রিত এবং কাঠামোবদ্ধ পথে অগ্রসর হয়।
শেখ হাসিনার বিদায়: একাধিক ব্যাখ্যার বাস্তবতা
এই পুরো রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রীয় কাঠামো, নিরাপত্তা বাহিনী এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার সম্পর্ক নিয়ে দেশজুড়ে বিভিন্ন প্রশ্ন, আলোচনা এবং সন্দেহ এখনো চলমান রয়েছে। এই বিষয়গুলো কেবল রাজনৈতিক বিশ্লেষণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং সাধারণ মানুষের আলোচনাতেও গভীরভাবে স্থান করে নিয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি হলো সেনাবাহিনীর ভূমিকা কী ছিল এবং কীভাবে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ কাঠামো বাস্তবে পরিচালিত হয়েছে। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কীভাবে ব্যবস্থাপিত হওয়ার কথা ছিল এবং বাস্তবে কেন সেই প্রক্রিয়ায় ভিন্নতা দেখা গেছে, তা এখনো জনসমক্ষে পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করা হয়নি।
একইভাবে শেখ হাসিনা সহ প্রায় ৭০০ জন রাজনৈতিক নেতা ও কর্মীর দেশত্যাগ নিয়ে দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনা রয়েছে। কীভাবে এই বৃহৎ পরিসরের দেশত্যাগ সংঘটিত হলো, এর পেছনে কোন প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত কাজ করেছে, এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা কাঠামোর ভূমিকা কী ছিল—তা নিয়ে এখনো জনমনে নানা প্রশ্ন রয়ে গেছে।
এই আলোচনার ভেতরে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বহিরাগত প্রভাবের প্রশ্ন। দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক মহল ও সাধারণ মানুষের আলোচনায় ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা “র” (RAW)-এর সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়েও নানা দাবি ও ব্যাখ্যা উঠে এসেছে। এসব দাবি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে যাচাই বা প্রতিষ্ঠিত হয়নি, তবে এটি দেশের রাজনৈতিক আলোচনার একটি বাস্তব অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অন্যদিকে, দীর্ঘ সময় ধরে সেনাবাহিনীর নীরবতা, সংকটকালীন ভূমিকা এবং রাষ্ট্রীয় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তাদের অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কেন দীর্ঘ সময় ধরে একটি স্পষ্ট, দৃশ্যমান এবং ব্যাখ্যাযোগ্য অবস্থান তৈরি হয়নি, সেটিও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।
সেনাপ্রধানের সাংবিধানিক ম্যান্ডেট, তার দায়িত্বের সীমা এবং রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা কীভাবে নির্ধারিত হয়েছে, তা নিয়েও এখনো স্বচ্ছ ব্যাখ্যার ঘাটতি রয়েছে। কেন তাকে এখনো পূর্ণাঙ্গ জবাবদিহিতার আওতায় আনা হয়নি এবং তিনি বর্তমানে কোন দায়িত্ব বা মিশনে নিয়োজিত—এই প্রশ্নগুলোও জনমনে আলোচিত হচ্ছে।
সবশেষে, এই পুরো পরিস্থিতি রাষ্ট্রকে একটি মৌলিক প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়। কীভাবে এমন একটি রাষ্ট্রীয় কাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব, যেখানে নিরাপত্তা বাহিনী, প্রশাসন এবং রাজনৈতিক নেতৃত্ব কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর প্রভাবের অধীনে নয়, বরং সম্পূর্ণভাবে সংবিধান, আইন এবং জনগণের জবাবদিহির মধ্যে পরিচালিত হয়।
একই সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে—এই ধরনের সংকট, ধোঁয়াশা এবং ক্ষমতার কাঠামোগত অমীমাংসিত বিষয়গুলোর মীমাংসা কোন বিধি বা কাঠামোর ভিত্তিতে হবে। বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী, নাকি একটি সম্ভাব্য নতুন রাজনৈতিক চুক্তি বা “জুলাই সনদ”-এর মাধ্যমে, যা বাংলাদেশের স্বাধীনচেতা জনগণের অধিকার, অংশগ্রহণ এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার পুনর্নির্ধারণকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করবে। এই সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনা হলো শেখ হাসিনার ক্ষমতা থেকে বিদায়। তবে এই বিদায়ের ব্যাখ্যা একক নয়।
একটি দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী, এটি ছিল দীর্ঘদিনের জনঅসন্তোষ, আন্দোলনের চাপ এবং রাজনৈতিক বৈধতা সংকটের ফলাফল। অন্য একটি ব্যাখ্যায় এটিকে দেখা হয় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কাঠামোর ভেতরে তৈরি হওয়া ভারসাম্য পরিবর্তন এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার সিদ্ধান্তমূলক অবস্থানের ফল হিসেবে। এই দ্বৈত ব্যাখ্যা আজও এই ঘটনার ঐতিহাসিক বিশ্লেষণকে সম্পূর্ণভাবে একক কাঠামোয় স্থাপন করতে দেয় না।
গণমাধ্যমের ভূমিকা: বহু বয়ানের সংঘর্ষ
২০২৪ সালের পুরো ঘটনাপ্রবাহে গণমাধ্যম একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে একই ঘটনার ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা ও ফ্রেমিং দেখা যায়। কিছু বিশ্লেষণে সেনাবাহিনীর ভূমিকা “স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং দায়িত্বশীল হস্তক্ষেপ” হিসেবে উপস্থাপিত হয়। অন্যদিকে কিছু ব্যাখ্যায় এটিকে “চাপের মধ্যে ক্ষমতা পরিবর্তনের নিয়ন্ত্রিত প্রক্রিয়া” হিসেবে দেখা হয়। ফলে এখানে একটি একক বাস্তবতা নয়, বরং বহু বয়ানের প্রতিযোগিতা তৈরি হয়, যেখানে প্রতিটি পক্ষ নিজস্ব ব্যাখ্যাকে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করে।
সংকটের প্রকৃতি: একক ঘটনা নয়, বহু শক্তির প্রতিক্রিয়া
২০২৪ সালের রাজনৈতিক সংকট কোনো একক ঘটনার ফল নয়। এটি ছিল আন্দোলন, রাষ্ট্রীয় প্রতিক্রিয়া, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, নিরাপত্তা কাঠামোর ভূমিকা এবং জনচাপের সম্মিলিত ফলাফল। এই কারণে এই সময়কালকে শুধুমাত্র একটি “সরকার পতন” হিসেবে দেখা যথেষ্ট নয়, বরং এটি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কাঠামোর পুনর্বিন্যাস এবং রাজনৈতিক বাস্তবতার নতুন সংজ্ঞা হিসেবে বিবেচিত হয়।
রাষ্ট্র, সেনাবাহিনী, রাজনীতি এবং পুনর্গঠনের করণীয়
১/১১ পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং ২০২৪ সালের গণআন্দোলন, এই দুইটি ভিন্ন সময়কাল হলেও তাদের ভেতরে একটি গভীর কাঠামোগত মিল বিদ্যমান। সেই মিল হলো রাষ্ট্রের চূড়ান্ত সংকট মুহূর্তে ক্ষমতার কেন্দ্র কেবল নির্বাচিত রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে নিরাপত্তা কাঠামো, প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান এবং প্রভাবশালী মতাদর্শিক শক্তির মধ্যে পুনর্বিন্যাসিত হয়ে যাওয়া। এই বাস্তবতা রাষ্ট্রকে বারবার একটি মৌলিক প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়। রাষ্ট্রের প্রকৃত ক্ষমতা কোথায় কেন্দ্রীভূত, এবং সংকটের সময় সেই ক্ষমতা আসলে কে নিয়ন্ত্রণ করে।
সেনাবাহিনীর ভূমিকা: প্রয়োজনীয়তা ও বিতর্কের দ্বৈত বাস্তবতা
সেনাবাহিনীর আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব হলো রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষা, বহিরাগত হুমকি মোকাবিলা এবং অভ্যন্তরীণ সংকটে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। কিন্তু বাস্তব রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দেখা যায়, চরম সংকটের মুহূর্তে তারা অনেক সময় একটি স্ট্যাবিলাইজিং ফোর্স হিসেবে আবির্ভূত হয়। এই ভূমিকা একদিকে রাষ্ট্রকে সম্ভাব্য বিশৃঙ্খলা থেকে রক্ষা করে, অন্যদিকে গণতান্ত্রিক ক্ষমতা হস্তান্তরের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করে। ফলে সেনাবাহিনীর অবস্থান সবসময়ই একদিকে প্রয়োজনীয়, অন্যদিকে বিতর্কিত হিসেবে থেকে যায়।
রাজনৈতিক নেতৃত্ব: আস্থা সংকট এবং দায়িত্বহীনতার অভিযোগ
অন্যদিকে রাজনৈতিক নেতৃত্বের ক্ষেত্রে একটি দীর্ঘমেয়াদি আস্থার সংকট স্পষ্ট হয়ে ওঠে। দুর্নীতি, দলীয়করণ, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং জবাবদিহির ঘাটতি রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে জনগণের আস্থা থেকে ক্রমশ দূরে সরিয়ে নেয়। রাজনীতি অনেক ক্ষেত্রে জনসেবা থেকে সরে গিয়ে ক্ষমতা এবং নিয়ন্ত্রণের প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়। এর ফলে রাষ্ট্র ও জনগণের মধ্যে দূরত্ব আরও গভীর হয় এবং গণতান্ত্রিক কাঠামোর প্রতি আস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে।
প্রশাসনিক কাঠামো: কার্যকারিতা সংকট এবং জবাবদিহির অভাব
প্রশাসনিক কাঠামোর অবস্থাও একই ধরনের সংকটে আবদ্ধ। নীতিনির্ধারণে স্বচ্ছতার অভাব, রাজনৈতিক প্রভাব এবং জবাবদিহির দুর্বলতা প্রশাসনকে কার্যকর রাষ্ট্রযন্ত্রের বদলে একটি নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থায় পরিণত করে। এর ফলে রাষ্ট্রীয় সেবা সাধারণ মানুষের কাছে সঠিকভাবে পৌঁছায় না এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আস্থা ক্রমশ কমে যায়।
তরুণ প্রজন্ম: বেকারত্ব এবং ভবিষ্যৎ সংকট
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বাস্তবতা হলো তরুণ প্রজন্মের অবস্থান। বেকারত্ব, অনিশ্চয়তা এবং সীমিত সুযোগ তাদের একটি বড় অংশকে উৎপাদনশীল ভবিষ্যতের পরিবর্তে অস্থিরতা এবং অনিশ্চিত সামাজিক অবস্থার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এটি কেবল অর্থনৈতিক সমস্যা নয়, বরং একটি দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় ঝুঁকি, যা ভবিষ্যতের সামাজিক স্থিতিশীলতাকে প্রভাবিত করতে পারে।
রাষ্ট্র পুনর্গঠনের করণীয়
এই প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্র পুনর্গঠনের জন্য কিছু মৌলিক দিক স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
প্রথমত, রাজনৈতিক ব্যবস্থার অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র শক্তিশালী করতে হবে, যাতে নেতৃত্ব নির্বাচন এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত হয়।
দ্বিতীয়ত, প্রশাসনকে দলীয় প্রভাব থেকে মুক্ত করে প্রকৃত অর্থে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে পুনর্গঠন করতে হবে।
তৃতীয়ত, নিরাপত্তা বাহিনীর ভূমিকা সংবিধান ও আইনি কাঠামোর মধ্যে স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করতে হবে, যাতে সংকটকালেও ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় থাকে।
চতুর্থত, বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা নিশ্চিত করা ছাড়া কোনো রাষ্ট্রীয় সংস্কার স্থায়ী হতে পারে না। ন্যায়বিচারের প্রতি আস্থা ভেঙে গেলে রাষ্ট্রের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে।
পঞ্চমত, গণমাধ্যমকে স্বাধীন, দায়িত্বশীল এবং নীতিনির্ভর কাঠামোর মধ্যে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে, যাতে তথ্য ও সত্যের মধ্যে ভারসাম্য বজায় থাকে।
ষষ্ঠত, তরুণদের জন্য বাস্তব কর্মসংস্থান, দক্ষতা উন্নয়ন এবং সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে, কারণ রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ এই প্রজন্মের ওপর নির্ভরশীল।
সবশেষে, এই পুরো পরিস্থিতি রাষ্ট্রকে একটি মৌলিক প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়। কীভাবে এমন একটি রাষ্ট্রীয় কাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব, যেখানে নিরাপত্তা বাহিনী, প্রশাসন এবং রাজনৈতিক নেতৃত্ব কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর প্রভাবের অধীনে নয়, বরং সম্পূর্ণভাবে সংবিধান, আইন এবং জনগণের জবাবদিহির মধ্যে পরিচালিত হয়।
একই সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে, এই ধরনের সংকট, ধোঁয়াশা এবং ক্ষমতার কাঠামোগত অমীমাংসিত বিষয়গুলোর মীমাংসা কোন বিধি বা কাঠামোর ভিত্তিতে হবে। বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী, নাকি একটি সম্ভাব্য নতুন রাজনৈতিক চুক্তি বা “জুলাই সনদ” এর মতো কোনো সংশোধিত কাঠামোর মাধ্যমে, যা বাংলাদেশের স্বাধীনচেতা জনগণের অধিকার, অংশগ্রহণ এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার পুনর্নির্ধারণকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করবে।
চূড়ান্ত বাস্তবতা
সবশেষে সবচেয়ে মৌলিক প্রশ্ন হলো রাষ্ট্র ও জনগণের সম্পর্ক পুনর্গঠন। রাষ্ট্র তখনই স্থিতিশীল হয়, যখন জনগণের আস্থা তার ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়। এই আস্থা কোনো শক্তি, চাপ বা প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ দিয়ে তৈরি হয় না, বরং ন্যায্যতা, স্বচ্ছতা এবং ধারাবাহিক জবাবদিহির মাধ্যমে গড়ে ওঠে। যতক্ষণ পর্যন্ত এই ভিত্তি শক্তিশালী না হবে, ততক্ষণ ক্ষমতার পরিবর্তন এলেও রাষ্ট্রীয় সংকটের পুনরাবৃত্তি এড়ানো সম্ভব হবে না।
রহমান মৃধা, গবেষক ও লেখক, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন।
মত দ্বিমত
আরেকটি গণঅভ্যুত্থানের প্রয়োজনীয়তা: ব্যক্তিজীবন, ইতিহাস ও রাষ্ট্রচিন্তার আলোকে
একটি গণঅভ্যুত্থানের পর হঠাৎ যদি আরেকটির ডাক পড়ে, তবে জনগণ কি সেটাকে সাড়া দেবে?
এই প্রশ্নের জবাব দেওয়ার আগে, আসুন আমি আমার ব্যক্তিগত কিছু অভিজ্ঞতা শেয়ার করি। যদিও সরাসরি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা দিয়ে কী গণঅভ্যুত্থানের তুলনা ঠিক হবে? হবে, অবশ্যই হবে। তবে প্রথমে জীবনের সহজ সহজ অভিজ্ঞতার কথা বলি।
উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের পর কিন্তু একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ হয় এবং পরে আমরা পরাধীনতার বেড়াজাল ভেঙে স্বাধীন হয়েছিলাম। তবে সেই স্বাধীনতা ঠিকমতো ধরে রাখতে পারিনি। কারণ কী জানেন? আমিও জানি না। তবে আমার কিছু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা আছে, সেগুলো শেয়ার করি।
আমি আগে আমার লেখায় বলেছি, আমি ৭১-এর যুদ্ধের রণক্ষেত্রের খুদে মুক্তিযোদ্ধা। বড় দায়িত্ব এবং কর্তব্য পালন করেছি। না কোনো পদবির কারণে, না নেহায়েত মায়ার কারণে, বরং অনুপ্রেরণার কারণে। আমার ছোটবেলার গ্রাম নহাটা এখনও নহাটাই আছে; নেই শুধু আমি এবং আমার শেষের মধুর স্মৃতিগুলো। তবে সেগুলো মনের মাঝে লুকিয়ে আছে। মাঝে মাঝে মনে পড়ে, তখন স্মৃতিচারণ করি। আজ সেই স্মৃতিচারণের কিছু অংশ শেয়ার করছি, শেয়ার ভ্যালুর কনসেপ্ট থেকে।
আমার পরিবার এবং আত্মীয়-স্বজনের অনেকেই তখন নামকরা রাজনীতিবিদ ছিলেন, এমপি, জেলার মেয়র, উপজেলা চেয়ারম্যান, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন, যুদ্ধ করে শহীদ হয়েছেন এবং মুক্তিযুদ্ধের ভাইস চেয়ারম্যান হয়েছেন, বীর প্রতীক হয়েছেন। নড়াইল নানাবাড়ি, মাগুরা দাদাবাড়ি; মাঝখানে বয়ে গেছে প্রাণপ্রিয় নবগঙ্গা নদী। এপাড়ে সবাই দাদা-দাদি, কাকা-চাচি, চাচাতো ভাই-বোন, মাসি-পিসি, খুড়ো-খুড়ি; ওপাড়ে নান-নানি, মামা-মামি, মামাতো ভাই-বোন, মাসি-পিসি, খুড়ো-খুড়ি, বন্ধু-বান্ধব। মতদ্বিমত থাকলেও দেশের স্বার্থে সবাই ছিল একমত, কিন্তু সেটা এখন আর আগের মতো নেই।
আমি যে খুদে মুক্তিযোদ্ধা ছিলাম, তার জন্য কারও কাছ থেকে সনদপত্র নিতে হয়নি বা সংসদ থেকে পাস করানোর জন্য সুপারিশ করার দরকার হয়নি। তারপর সেই ১৯৮৫ সাল থেকে বিদেশে বসবাস। ওসব কাগজপত্র দিয়ে তো বাকিজীবন কাটিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। তাই সেগুলো এখন কথার কথা। তবে আমার জীবনের প্রথম পাসপোর্টটা কিন্তু এখনও যত্ন করে রেখে দিয়েছি।
গত কয়েক বছর আগে সুইডেনে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসে গিয়েছিলাম পাসপোর্ট নিতে। গিয়ে দেখি ছোটবেলার এক বাল্যবন্ধু সেখানে রাষ্ট্রদূত। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, আমার কোনো পুরোনো পাসপোর্ট আছে কিনা। তিনি সেই ১৯৮৫ সালের পাসপোর্ট দেখে সম্ভবত তাঁর সকল সহকর্মীদের দেখিয়েছিলেন এই মর্মে যে কীভাবে এত সুন্দর, পরিপাটি অবস্থায় এত বছর ধরে একটি কাগজের পাসপোর্ট থাকতে পারে! আমার সহধর্মিণী অনেক যত্ন করে আমার শুধু পাসপোর্ট নয়, আমাকেও পরিপাটি অবস্থায় ধরে রেখেছেন, আলহামদুলিল্লাহ।
এখন আসি মূল কথায়। আমি সুইডেন আসার পর প্রেম-প্রীতি করেছি, বেশ করেছি, ভালোই করেছি। এমনকি একজনের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল গভীর ভালোবাসার। কথা সত্য, তারপরও বিরহের চিঠি তিনি লিখে পাঠালেন; সম্পর্ক শেষ হয়ে গেল। পরিবারের মুরুব্বিরা বললেন, আর বিদেশি নয়, খুব হয়েছে, এবার দেশে গিয়ে বিয়ে-শাদি করতে হবে। বিদেশি মেয়েরা টিকবে না। কেউ বলতে শুরু করল, এত বড় একটি ঘটনার পর নতুন করে কোনো কিছু করা যাবে না বা হুট করে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক হবে না, ইত্যাদি ইত্যাদি।
পরিবারের মধ্যে তখন উপদেশ দেওয়ার জন্য লোকের অভাব ছিল না। যেমনটি ছোটবেলায় দেখেছি, পুকুর ভরা মাছ, গোয়াল ভরা গরু, গোলা ভরা ধান; ঠিক তেমনি উপদেশ দেওয়ার জন্য শুভানুধ্যায়ীদের অভাব ছিল না। কিন্তু ঠেলা সামলানোর সময় কেউ কখনো ছিল না। এটা আমাকেই করতে হয়েছে।
যাই হোক, সবাইকে উপেক্ষা করে আমি আবার নতুন প্রেমে পড়েছি এবং বিয়ে করেছি। এখনও সংসার করছি। আমার এই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলতে চাই, উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের পর স্বাধীনতার সংগ্রাম এবং মুক্তি; আমার ভালোবাসার বিচ্ছেদের পর নতুন জীবন শুরু। আমি কি তাহলে বোঝাতে পেরেছি? ব্যক্তিজীবনের এই অভিজ্ঞতাই আমাকে শিখিয়েছে, একটি ব্যর্থতার পর নতুন সূচনা সম্ভব; আর সেই শিক্ষা থেকেই আমি রাষ্ট্র ও সমাজের পরিবর্তনের প্রশ্নটি বিবেচনা করি।
তা যদি পারি, তবে জুলাই সনদ যদি সত্যিই বাস্তবায়িত করতে হয়, তবে আবারও গণঅভ্যুত্থান ঘটাতে হবে এবং এখনই দেরি করা চলবে না। এই “জুলাই সনদ” কেবল একটি দাবি নয়; এটি ন্যায়, গণতন্ত্র, জবাবদিহিতা এবং জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার এক প্রতীকী অঙ্গীকার, যা জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের পথনির্দেশক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এটি মূলত রাষ্ট্র পরিচালনায় স্বচ্ছতা, আইনের শাসন, সুশাসন এবং জনগণের প্রত্যাশার প্রতিফলন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রস্তাবিত একটি নীতিগত কাঠামো।
একজন মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী জানেন? একজন ভালো জীবনসঙ্গী বা সঙ্গিনী পাওয়া। এর থেকে কঠিন এবং একই সঙ্গে সহজ কাজ পৃথিবীতে আর কিছু নেই। সবাই তো সুখী হতে চায়। কেউ সুখী হয়, কেউ হয় না। তাই বলে কি থেমে গেলে চলবে? না। লেগে থাকতে হবে। শুধু নিতে নয়, দিতেও শিখতে হবে।
ইতিহাস, সংগ্রাম এবং ব্যক্তিজীবনের অভিজ্ঞতা আমাদের একটাই শিক্ষা দেয়, ব্যর্থতা শেষ নয়; অধ্যবসায়ই সাফল্যের পথ দেখায়। ব্যক্তি ও জাতির অগ্রগতি নির্ভর করে সাহস, আত্মত্যাগ এবং পুনর্জাগরণের ওপর।
এই প্রসঙ্গে বিশ্বের দিকে তাকালে আমরা একটি তাৎপর্যপূর্ণ উদাহরণ দেখতে পাই, পুয়ের্তো রিকো। ক্যারিবীয় সাগরের বুকে অবস্থিত এই ছোট্ট ভূখণ্ডটির নিজস্ব কোনো স্বাধীন সামরিক শক্তি নেই। তবুও দেশটি স্থিতিশীল, শান্তিপূর্ণ এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের পথে অগ্রসর হচ্ছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, অবকাঠামো এবং নাগরিক অধিকার রক্ষায় তারা ধারাবাহিকভাবে কাজ করে চলেছে। যুদ্ধ বা সামরিক প্রতিযোগিতার পরিবর্তে তারা উন্নয়ন, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং মানবকল্যাণকে অগ্রাধিকার দিয়েছে।
পুয়ের্তো রিকোর রাজনৈতিক অবস্থান অনন্য। এটি যুক্তরাষ্ট্রের একটি স্বশাসিত অঞ্চল, যেখানে জনগণ তাদের সাংস্কৃতিক পরিচয় ও প্রশাসনিক কাঠামো বজায় রেখে বহির্বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক পরিচালনা করে। সামরিক শক্তির অনুপস্থিতি তাদের দুর্বল করেনি; বরং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান এবং কূটনৈতিক বাস্তবতা তাদের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করেছে। এই বাস্তবতা আমাদের একটি মৌলিক প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়, একটি ছোট ভূখণ্ড যদি সংঘাত ছাড়াই সুন্দরভাবে এগিয়ে যেতে পারে, তবে আমরা কেন পারব না?
আমাদের শক্তি কি কেবল অস্ত্রে, নাকি ঐক্যে? একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত ক্ষমতা তার জনগণের সংহতি, আত্মমর্যাদা এবং স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতায় নিহিত। আমরা ইতিহাসের প্রতিটি বাঁকে তা প্রমাণ করেছি। যদিও কেউ কেউ আবেগের বশে বলেন, আমরা চাইলে তিন দিনেই ভারত জয় করতে পারি, কিন্তু বাস্তব শক্তি যুদ্ধের আহ্বানে নয়, বরং আত্মবিশ্বাস, ন্যায় এবং নৈতিক দৃঢ়তায় প্রতিফলিত হয়। প্রশ্ন হলো, আমরা কী চাই, সংঘাত, না মর্যাদাপূর্ণ সহাবস্থান?
তারা কেন আমাদের ওপর কর্তৃত্ব বা নেতৃত্ব দেবে, যদি আমরা তা না চাই? একটি স্বাধীন জাতির সিদ্ধান্ত তার জনগণের হাতেই থাকা উচিত। আমাদের দেশের মানুষের মধ্যে পারিবারিক মতভেদ থাকতে পারে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই মতভেদের সুযোগে প্রতিবেশী কোনো দেশের নাক গলানোর অবকাশ আমরা কেন দেব? একটি আত্মমর্যাদাসম্পন্ন জাতি নিজের সমস্যার সমাধান নিজেই করে, অন্যের ওপর নির্ভর করে নয়।
ইতিহাস আমাদের শিখিয়েছে, ঐক্য শক্তি দেয়, বিভক্তি দুর্বলতা ডেকে আনে। ব্যক্তিজীবনের মতো রাষ্ট্রজীবনেও সত্য একই: সংকট আসে, বিভ্রান্তি আসে, কিন্তু দৃঢ় সংকল্প থাকলে পথ খুঁজে পাওয়া যায়। যেমন ভালোবাসার বিচ্ছেদের পর নতুন জীবন শুরু করা সম্ভব, তেমনি জাতীয় জীবনের সংকটের পরও পুনর্জাগরণ সম্ভব।
সুতরাং, প্রশ্নটি আবারও ফিরে আসে, আমরা কি পারব না? অবশ্যই পারব, যদি আমরা নিজেদের ওপর আস্থা রাখি, ঐক্য বজায় রাখি এবং স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণে অটল থাকি।
আমরা যে পারবো না, এই কথাটি বলা যাবে না; পারতে আমাদের হবেই। তবে হ্যাঁ, সবাইকে আমরা এই মহৎ কাজে পাশে পাবো না। কারণ যারা দেশের বারোটা বাজিয়ে চলেছে, তারা কিন্তু আমাদের নিজেদের লোক, পরিবারের সদস্য। বিশ্বাস না হয়, খোঁজ নিয়ে দেখুন, দয়া করে। এখন উপায় একটাই – ঐক্য, সাহস এবং সত্যের পথে অবিচল অগ্রযাত্রা। এই পথ চলতে চলতে একটি অনুভূতি হৃদয়ে অনুরণিত হয়।
চোখ বুজে হাত বাড়িয়ে দিলে যদি অনুভব করা যায় একে অপরের হৃদস্পন্দন, যদি বোঝা যায় আমরা একই স্বপ্নে বিশ্বাসী, তবে তা কোনো কল্পনা নয়; এটি এক চিরন্তন অঙ্গীকারের শিখা। ঝড়-বৃষ্টির অন্ধকার ভেদ করে যেমন সূর্যের আলো উঁকি দেয়, তেমনি ঐক্যের শক্তি দূর করে জাতির দীর্ঘদিনের বেদনা। নিঃসঙ্গতার অবসান ঘটে, জন্ম নেয় নতুন আশার আলো। এই অনুভূতি হারাতে চাই না, কারণ এটাই আমাদের বিশ্বাস, আমাদের শক্তি, আমাদের ভবিষ্যৎ।
আসুন, আমরা একসঙ্গে হাত রাখি, হৃদয়ের স্পন্দন শুনি এবং একই স্বপ্নে বিশ্বাস করি। কারণ দেশটা কারো একার নয়, এটা আমাদের সবার।
রহমান মৃধা, গবেষক ও লেখক, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন।
মত দ্বিমত
সংসদীয় গণতন্ত্রে এক নীরব দৃশ্য: নেতৃত্ব নাকি অভিনয়
চাল নেই, ডাল নেই, মাছ নেই—কিছুই নেই। সব পাকিস্তানিরা লুটে নিয়ে গেছে, রেখে গেছে শুধু চোরদের। ওরা যদি চোরগুলোও নিয়ে যেত! সেই একই মধুর বাঁশি বেজে চলেছে বছরের পর বছর, তবে কিছুটা ভিন্নভাবে। আওয়ামী লীগ সব পাচার করেছে। পরে বিএনপির হাওয়া ভবন সব নিয়ে বেগমপাড়া তৈরি করেছে। তারপর জাতীয় পার্টি দেশটাকে ফাঁকা করেছে, পরে আবার বিএনপি সব শেষ করেছে।
গত ১৬ বছর গণভবনে বসে স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থার মাধ্যমে দেশে গুম, খুন, নির্যাতন ও দুর্নীতি সংঘটিত হয়েছে। নতুন করে আবারও সেই মেহনতি মানুষের এক সাগর রক্তের বিনিময়ে জুলাই সনদ সংগঠিত হয়েছে—ভেবেছিলাম দেশ স্বাধীন হবে। কিন্তু নতুন শকুনের উৎপত্তি; সে যেন মহামারীর মতো উড়ে এসে জুড়ে বসেছে, এমনকি দেশের ক্রিকেট বোর্ডেও। হায় আল্লাহ! এ কী তুমি দেখালে? শিলিগুড়ি থেকে এসেছে ভারতের গোলাম, আর লন্ডন থেকে এসেছে বাবা-মার সুবাদে “আই হ্যাভ এ প্লান”।
তার মুখে বুলি নেই, তবুও বলতে শোনা যায় আগের সেই প্যাঁচাল—একই বাজনা, যা বেজে চলেছে দীর্ঘ ৫৫ বছর আগ থেকেই। “আমরা যখন দায়িত্ব নিই, তখন দেশের অবস্থা ছিল অত্যন্ত ভঙ্গুর। অর্থনৈতিক খাত থেকে শুরু করে যোগাযোগব্যবস্থা—সবকিছুই ছিল বিপর্যস্ত। মনে হয়েছিল যেন একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের দায়িত্ব নিয়েছি।” আর কতকাল শুনবে জাতি এই প্যাঁচাল?
আমাদের দুর্ভাগ্য, ইতিহাস যেন বারবার একই অধ্যায়ে ফিরে আসে। ৭১-এর পরে যাকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল, যিনি সংবিধান রচনায় যুক্ত ছিলেন, তিনি মুক্তিযুদ্ধের বিভীষিকা প্রত্যক্ষ করেননি; তিনি ছিলেন দেশের বাইরে, পাকিস্তানে। কাকতালীয়ভাবে আবারও এমন এক নেতৃত্বের আবির্ভাব, যিনি জনগণের ত্যাগ-তিতিক্ষার বাস্তবতা থেকে দূরে অবস্থান করেছেন। ফলে জাতির মনে প্রশ্ন জাগে—ইতিহাস কি আবার নিজেকে পুনরাবৃত্তি করছে?
এই প্রেক্ষাপটে সংসদীয় গণতন্ত্রে এক বিস্ময়কর দৃশ্যের জন্ম হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমান তর্কে নেই, বিতর্কে নেই, আলোচনায় নেই। সংসদে একের পর এক বিল পাস হয়েছে, অথচ তিনি নিজে কোনো বিল উত্থাপন করেননি। তাঁর পরিবর্তে সব বিল উত্থাপন করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ। নেতৃত্বের এই নীরবতা গণতন্ত্রে এক বিরল দৃষ্টান্ত হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।
তিনি যেন সংসদের ভিড়ে এক স্থির প্রতিচ্ছবি—কথাহীন, অভিব্যক্তিহীন; শান্ত নদীর মতো স্থির, শিমুল তুলোর মতো কোমল। তর্ক-বিতর্কে নেই, আলাপেও নেই; গায়ে কাদা নেই, মুখে বুলি নেই। যেন ক্ষমতার আসনে বসে থাকা এক নীরব প্রতীক।
এই নীরবতার কথা মনে করিয়ে দেয় চার্লি চ্যাপলিনের কথা। তিনি কথা না বলেও তাঁর অভিব্যক্তি, অঙ্গভঙ্গি ও অভিনয়ের মাধ্যমে বিশ্ববাসীকে আনন্দ দিয়েছেন, মানবতার গভীর সত্য তুলে ধরেছেন। তাঁর নীরবতা ছিল শিল্প, ছিল প্রতিবাদের ভাষা, ছিল বিনোদনের অনন্য মাধ্যম।
কিন্তু এখানে পার্থক্য স্পষ্ট। চাপ্লিনের নীরবতা মানুষকে হাসিয়েছে, ভাবিয়েছে এবং অনুপ্রাণিত করেছে। আর এই নীরবতা জাতিকে আনন্দ নয়, বরং অস্বস্তি ও জ্বালাতন উপহার দিচ্ছে। সেখানে ছিল সৃজনশীলতা; এখানে দেখা যাচ্ছে দায়িত্বহীনতার প্রতীকী রূপ।
এ যেন সংসদীয় আসনে বসে থাকা এক পুতুল—নিজস্ব আলোহীন, অন্যের আলোয় আলোকিত। চাঁদের মতো, যার নিজস্ব দীপ্তি নেই; সূর্যের আলোয় জ্বলে ওঠে। তেমনি এই নেতৃত্বও অন্যের সিদ্ধান্তের প্রতিফলন মাত্র।
অতএব প্রশ্ন থেকে যায়—এ কি সত্যিকারের নেতৃত্ব, নাকি কেবল এক নীরব অভিনয়?
-জাগো বাংলাদেশ, জাগো।
রহমান মৃধা, গবেষক ও লেখক, প্রাক্তন পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন
মত দ্বিমত
শিক্ষাব্যবস্থায় রাষ্ট্রীয় অনুদান হোক না একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি
শিক্ষা একটি জাতির মূল ভিত্তি এবং অগ্রগতির চালিকাশক্তি। এটি কেবল জ্ঞান অর্জনের মাধ্যম নয়, বরং একটি শক্তি, যা ব্যক্তি, সমাজ এবং জাতির অগ্রগতিকে ত্বরান্বিত করে। কিন্তু বর্তমান দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বে শিক্ষার উদ্দেশ্য, পদ্ধতি এবং কাঠামো নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। প্রযুক্তি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে শিক্ষাব্যবস্থার ভবিষ্যৎ কেমন হওয়া উচিত?
একটি শক্তিশালী শিক্ষাব্যবস্থা কেবল চাকরি প্রদানে সক্ষম হবে না, বরং শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল, মানবিক এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতায় সমৃদ্ধ করে গড়ে তুলবে। তাই আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা হতে হবে এমন একটি কাঠামো, যা শিক্ষার্থীদের বাস্তব জীবনের জন্য প্রস্তুত করে এবং তাদের মননশীল, উদ্ভাবনী ও নৈতিক দক্ষতা বিকাশে সহায়ক হবে।
কর্মমুখী ও প্রযুক্তিমুখী শিক্ষা
আজকের যুগে শিক্ষা কেবল পুঁথিগত বিদ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারবে না। প্রযুক্তি কর্মক্ষেত্রে সম্পূর্ণ নতুন সুযোগ তৈরি করছে—যেমন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মেশিন লার্নিং, রোবটিক্স এবং ডিজিটাল লিটারেসি। তাই শিক্ষাব্যবস্থায় কর্মমুখী এবং প্রযুক্তিমুখী শিক্ষার সমন্বয় অপরিহার্য। শিক্ষার্থীদের কোডিং, রোবটিক্স এবং ডিজিটাল লিটারেসিতে পারদর্শী করে তোলা জরুরি।
ভার্চুয়াল রিয়ালিটি (VR) এবং অগমেন্টেড রিয়ালিটি (AR) ব্যবহার করে পাঠদানের পদ্ধতি আরও কার্যকর ও আকর্ষণীয় করা যায়। কর্মমুখী শিক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা দক্ষ জনশক্তি হিসেবে গড়ে উঠবে। উদাহরণ হিসেবে জার্মানি ও জাপানের কারিগরি শিক্ষাব্যবস্থা অনুসরণ করা যেতে পারে।
শুধু কর্মমুখী নয়, প্রযুক্তি এবং মানবিক শিক্ষার ভারসাম্য নিশ্চিত করা উচিত। শিক্ষার্থীরা যেন চিন্তাশীল, সমস্যা সমাধানকারী এবং নৈতিক দিক থেকে সচেতন নাগরিক হিসেবে তৈরি হয়।
আদর্শ শিক্ষকের ভূমিকা
শিক্ষক শুধু একটি পেশা নয়, এটি মহান দায়িত্ব। একজন আদর্শ শিক্ষক শিক্ষার্থীদের কেবল পরীক্ষা বা ভালো ফলাফলের জন্য প্রস্তুত করেন না, বরং তাদের মনের গভীরে প্রভাব ফেলেন।
আমার বড় ভাই, প্রফেসর ড. মান্নান মৃধা, সুইডেনের কেটিএইচ রয়্যাল ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির বায়োমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক, এমন একজন আদর্শ শিক্ষকের উদাহরণ। তিনি ক্লাসে গল্পের মাধ্যমে জটিল বিষয় সহজে বোঝান। বাস্তব জীবনের উদাহরণ ব্যবহার করে শিক্ষার্থীদের কৌতূহল বাড়ান। পরীক্ষার চাপে হতাশ না করে, সৃজনশীলতাকে উৎসাহিত করেন।
শিক্ষাব্যবস্থার সমস্যাগুলো ও সমাধান
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা এখনও পরীক্ষার ফলাফলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল। এতে সৃজনশীলতা বাধাগ্রস্ত হয়। সমাধানের জন্য প্রজেক্ট-ভিত্তিক লার্নিং এবং ক্লাসরুম-বাইন্ডারী শিক্ষা চালু করা প্রয়োজন। সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে আধুনিক প্রযুক্তি অন্তর্ভুক্ত করা উচিত, যেমন প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের ডিজিটাল শিক্ষার সুযোগ দেওয়া। শিক্ষকদের জন্য এআই ও ইন্টারেক্টিভ টুল ব্যবহারের প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা।
স্টাডি লোন: শিক্ষার্থীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ
উন্নত দেশের মডেল অনুসারে, বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের জন্য স্টাডি লোন চালু করা জরুরি। কম সুদে সহজ শর্তে লোন প্রদান শিক্ষার্থীদের আর্থিক চাপ কমাবে এবং তাদের শিক্ষা গ্রহণে উৎসাহ যোগাবে।
সুইডেন ও ফিনল্যান্ডের মতো ব্যবস্থা শিক্ষার্থীদের আর্থিক স্বাধীনতা এবং সৃজনশীল কাজের সুযোগ বৃদ্ধি করেছে। শিক্ষাজীবন শেষে শিক্ষার্থীরা ধীরে ধীরে লোন পরিশোধ করতে পারবে, যা সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে সহায়ক হবে।
ফিনল্যান্ড ও সুইডেনের শিক্ষার উদাহরণ
- ফিনল্যান্ড: পরীক্ষার চাপ কমিয়ে সৃজনশীলতা ও সহযোগিতার ওপর জোর।
- জাপান: কর্মমুখী কারিগরি শিক্ষার জন্য বিখ্যাত।
- সুইডেন ও ফিনল্যান্ডে নবম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের সব কিছুই বিনামূল্যে, দশম শ্রেণি থেকে মাসিক ভাতা ও ধারের ব্যবস্থা।
দেশের শিক্ষার নতুন কাঠামো ও দায়িত্ব
শিক্ষার মান উন্নত করতে আমাদের দেশেও প্রাথমিক স্কুল থেকে শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে বই বিতরণ করা এবং শিক্ষার ধরণ পরিবর্তন করা দরকার। সৃজনশীল ও কার্যকর শিক্ষার জন্য কাজের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ (on-the-job training) এবং বাস্তব জীবনের উদাহরণ ব্যবহার। মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য স্টাডি লোন ও আর্থিক সহায়তা। দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা এবং মনিটরিং পদ্ধতি চালু করা।
শিক্ষার্থীর সাফল্য মানেই দেশের সাফল্য। একটি সচেতন জাতির নৈতিক মূল্যবোধ ও মানবিক গুণাবলির উন্নয়ন শিক্ষার মাধ্যমেই সম্ভব।
উপসংহার: শিক্ষার ভবিষ্যৎ আমাদের হাতে
যদি আমরা শিক্ষাব্যবস্থাকে আধুনিক, সৃজনশীল এবং মানবিকভাবে শক্তিশালী করতে পারি, তবে আগামী প্রজন্ম শান্তিপূর্ণ, দক্ষ এবং দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠবে। আমাদের উচিত শিক্ষার প্রতি গভীর মনোযোগ। প্রযুক্তি ও মানবিক গুণাবলির সমন্বয়ে একটি টেকসই ভবিষ্যতের পথ তৈরি করা। শিক্ষার্থীদের জন্য আর্থিক ও শিক্ষাগত সমর্থন নিশ্চিত করা।
শুধু বর্তমানের চাহিদা নয়, আগামী দশ বছর পর শিক্ষাব্যবস্থার কার্যকারিতা বিবেচনা করে পরিকল্পনা করা জরুরি। সৃজনশীল শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও মানসম্মত শিক্ষকতা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রের দৃঢ় নীতি এবং দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ অপরিহার্য।
শিক্ষার মাধ্যমে বাংলাদেশ হতে পারে একটি উদ্ভাবনী, সমৃদ্ধ এবং নৈতিক মূল্যবোধে সমৃদ্ধ জাতি। দেশের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা যদি এই দিকনির্দেশনা মেনে গড়ে তোলা হয়, তবে জাতি অর্জন করবে জ্ঞানের আলো, সক্ষম নাগরিক এবং স্থিতিশীল উন্নয়নের পথ।
রহমান মৃধা, গবেষক ও লেখক, প্রাক্তন পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন
মত দ্বিমত
চাকরি বনাম রাজনীতি: জবাবদিহিতার অভাবে গণতন্ত্রের সংকট
আধুনিক বিশ্বে একটি বিষয় স্পষ্ট, কোনো চাকরি আজীবনের নিশ্চয়তা নয়। কর্মদক্ষতা, বাজারের চাহিদা, এবং চুক্তির শর্ত, এই তিনের ওপর নির্ভর করে একজন কর্মীর অবস্থান নির্ধারিত হয়। যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্বে বহুল পরিচিত “নিয়োগ এবং বরখাস্ত” নীতি মূলত এই বাস্তবতার প্রতিফলন। একজন কর্মী যতদিন প্রতিষ্ঠানকে মূল্য দিতে পারে, ততদিনই তার অবস্থান টিকে থাকে।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই বাস্তবতা যদি কর্পোরেট জগতে প্রযোজ্য হয়, তাহলে রাজনীতিতে কেন নয়?
রাজনৈতিক ক্ষমতা: চুক্তি আছে, জবাবদিহিতা নেই
গণতন্ত্রে নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীরা জনগণের কাছে নানা প্রতিশ্রুতি দেয়। এটি মূলত একটি অলিখিত “সামাজিক চুক্তি”- যেখানে জনগণ তাদের ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতা অর্পণ করে, আর নির্বাচিত প্রতিনিধি সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের দায়িত্ব নেয়।
এই চুক্তির মৌলিক ভিত্তি হলো বিশ্বাস এবং জবাবদিহিতা। জনগণ তাদের সার্বভৌম ক্ষমতার একটি অংশ প্রতিনিধির হাতে তুলে দেয় এই প্রত্যাশায় যে সেই ক্ষমতা জনগণের কল্যাণে ব্যবহৃত হবে। কিন্তু যখন সেই বিশ্বাসের প্রতিফলন বাস্তবে দেখা যায় না, তখন এই চুক্তির নৈতিক ভিত্তিই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সংসদের মেয়াদ পাঁচ বছর। এই পাঁচ বছর ধরে একজন নির্বাচিত প্রতিনিধি কার্যত একটি “নিরাপদ চাকরি” ভোগ করেন, তার পারফরম্যান্স যেমনই হোক না কেন। এখানেই মূল সমস্যা:
- প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের কোনো তাৎক্ষণিক শাস্তি নেই।
- পারফরম্যান্স মাপার কোনো নিরপেক্ষ কাঠামো নেই।
- জনগণের সরাসরি জবাবদিহিতা দাবি করার কার্যকর পদ্ধতি নেই।
জনগণের ভোট কি কেবল ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য, নাকি জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার। ফলে গণতন্ত্র একটি “একদিনের নির্বাচন” কেন্দ্রীক ব্যবস্থায় পরিণত হয়, যেখানে বাকি সময়টুকু প্রায় সম্পূর্ণ অনিয়ন্ত্রিত।
কর্পোরেট বনাম রাজনীতি: একটি তুলনামূলক বিশ্লেষণ
রাজনৈতিক ক্ষমতা এবং কর্পোরেট চাকরির মধ্যে মৌলিক পার্থক্য বেশ স্পষ্ট। কর্পোরেট ক্ষেত্রে নিয়োগ মূলত চুক্তিভিত্তিক। একজন কর্মী নিয়মিতভাবে মূল্যায়িত হয়, তার পারফরম্যান্স মাপা হয় এবং যদি সে কাজ করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে চাকরি হারানোর বাস্তব পরিণতি থাকে। ফলোআপ এবং জবাবদিহিতা ধারাবাহিক।
রাজনীতিতে কিন্তু বিষয়টি পুরোপুরি ভিন্ন। নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়োগ ভোটের মাধ্যমে হয়, কিন্তু তাদের পারফরম্যান্স মূল্যায়নের কোনও স্বচ্ছ ও ধারাবাহিক প্রক্রিয়া নেই। ব্যর্থতার ফলও প্রায় নেই, আর জবাবদিহিতা সীমিত। সংসদে উপস্থিতি, আইন প্রণয়নে অবদান, নির্বাচনী এলাকার উন্নয়ন, এসব নিয়ে নিয়মিত কোনো ফলোআপ নেই।
অর্থাৎ, যেখানে কর্পোরেট বিশ্বে কর্মীর দায়িত্ব ও ক্ষমতা স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত, সেখানে রাজনীতিতে সেই স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার কাঠামো অনিয়ন্ত্রিত। ফলে জনগণের ক্ষমতা প্রাপ্ত প্রতিনিধির হাতে অপ্রকাশ্যভাবে চলে যায়, যা গণতন্ত্রের মূল নৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করে।
বাংলাদেশের বাস্তবতা: সমস্যার মূল কোথায়?
- বাংলাদেশে সমস্যাগুলো বহুমাত্রিক:
- দলীয় নিয়ন্ত্রণ সংসদের ওপর প্রভাব বিস্তার করে।
- স্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যকরভাবে কাজ করতে পারে না।
- নাগরিক সমাজ ও মিডিয়ার ওপর চাপ থাকে।
- নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির কোনো বাধ্যতামূলক ট্র্যাকিং নেই।
প্রতিটি নির্বাচনের আগে কর্মসংস্থান, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, এবং সেবার মান উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। কিন্তু নির্বাচনের পরে এই প্রতিশ্রুতিগুলোর অগ্রগতি নিয়ে কি কোনো বাধ্যতামক, প্রকাশ্য মূল্যায়ন হয়। সংসদে উপস্থিতি, বিতর্কে অংশগ্রহণ, বা নিজ নির্বাচনী এলাকার বাস্তব উন্নয়ন, এসব কি কখনো নিয়মিতভাবে জনগণের সামনে উপস্থাপিত হয়। ফলে রাজনৈতিক নেতৃত্ব প্রায়শই “চুক্তির বাইরে” অবস্থান করে।
আন্তর্জাতিক বাস্তবতা: কোথায় কী হচ্ছে?
রিকল ইলেকশন ব্যবস্থার মাধ্যমে নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ হলে জনগণ সরাসরি নির্বাচিত প্রতিনিধিকে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই অপসারণ করতে পারে। তথ্য অধিকার আইনের মাধ্যমে নাগরিকরা সরকারের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারে এবং প্রশ্ন তুলতে পারে। উন্নত গণতন্ত্রে বিভিন্ন স্বাধীন প্রতিষ্ঠান নিয়মিতভাবে সরকারের কার্যক্রম মূল্যায়ন করে এবং রিপোর্ট প্রকাশ করে।
কী করণীয়: একটি কার্যকর রাজনৈতিক রোডম্যাপ
১. নির্বাচনী ইশতেহারকে আইনি বাধ্যবাধকতার আওতায় আনতে হবে।
২. প্রতিটি জনপ্রতিনিধির জন্য পারফরম্যান্স সূচক নির্ধারণ করতে হবে।
৩. জনগণের হাতে সরাসরি অপসারণের ক্ষমতা দিতে হবে।
৪. স্বাধীন মূল্যায়ন কমিশন গঠন করতে হবে।
৫. ডিজিটাল স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।
গণতন্ত্র কেবল নির্বাচন নয়, এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া, যেখানে জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতা এবং কর্মদক্ষতা সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আজকের বাস্তবতায় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, রাজনীতিকে “দায়বদ্ধ পেশা” হিসেবে পুনঃসংজ্ঞায়িত করা। যেখানে প্রতিশ্রুতি হবে চুক্তি, ক্ষমতা হবে দায়িত্ব, এবং জনগণ হবে চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রক।
এখনই সময় সিদ্ধান্ত নেওয়ার, আপনি কি কেবল ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তর করবেন, নাকি সেই ক্ষমতার জবাবদিহিতারও দাবি করবেন? কোনো জবাবদিহিতা ছাড়া গণতন্ত্র কেবল একটি আনুষ্ঠানিক কাঠামো হয়ে থাকবে। জাগো বাংলাদেশ জাগো।
রহমান মৃধা, গবেষক ও লেখক, প্রাক্তন পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন



