আন্তর্জাতিক
দুই ঘণ্টার ব্যবধানে ভারতের দুই অঞ্চলে জোরাল ভূমিকম্প
মাত্র দুই ঘণ্টার ব্যবধানে ভারতের দুই অঞ্চলে আঘাত হেনেছে জোরালো দুই ভূমিকম্প। এর মধ্যে ভারতের কেন্দ্রশাসিত জম্মু ও কাশ্মীরের বারামুলা জেলায় আঘাত হেনেছে ৪ দশমিক ৬ মাত্রার একটি ভূমিকম্প।
সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) ভোর ৫টা ৩৫ মিনিটে এই কম্পন অনুভূত হয়। ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল ছিল পাত্তান এলাকা। এখন পর্যন্ত এতে কোনো ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন স্থানীয় কর্মকর্তারা।
একইদিনে ভোর আনুমানিক ৩টা ৩০ মিনিটে আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জেও ৪ দশমিক ৬ মাত্রার আরেকটি ভূমিকম্প আঘাত হানে। ভারতের ন্যাশনাল সেন্টার ফর সিসমোলজির (এনসিএস) বিবৃতি অনুযায়ী, ভূমিকম্পটি ভূপৃষ্ঠের ১০ কিলোমিটার গভীরে সংঘটিত হয়।
এনসিএস জানায়, ভূমিকম্পটির অবস্থান ছিল উত্তর অক্ষাংশ ৯ দশমিক ০৩ ডিগ্রি এবং পূর্ব দ্রাঘিমাংশ ৯২ দশমিক ৭৮ ডিগ্রি।
ভারতের ভূমিকম্প ঝুঁকির মানচিত্র অনুযায়ী, আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ ‘সিসমিক জোন–৫’-এর অন্তর্ভুক্ত, যা দেশের সবচেয়ে ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলগুলোর একটি। অতীতে এই এলাকায় বেশ কয়েকটি বড় ধরনের ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে।
২০০৪ সালের ২৬ ডিসেম্বরের ভয়াবহ ভূমিকম্পের ফলে আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে শক্তিশালী সুনামি সৃষ্টি হয়। এতে ব্যাপক প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষতি হয়েছিল বলে জানিয়েছে আন্দামান ও নিকোবর প্রশাসনের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সাধারণত অগভীর ভূমিকম্প গভীর ভূমিকম্পের তুলনায় বেশি ক্ষতিকর হয়ে থাকে। কারণ, অগভীর ভূমিকম্পে উৎপন্ন কম্পন দ্রুত ভূপৃষ্ঠে পৌঁছে যায়, ফলে ভূমি বেশি কাঁপে এবং ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কাও বেড়ে যায়।
এমএন
আন্তর্জাতিক
কাতারের গ্যাসক্ষেত্রে হামলার পর বিশ্বজুড়ে তেল ও গ্যাসের দাম বৃদ্ধি
ইরানের সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্রে হামলার পাল্টা জবাবে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন জ্বালানি অবকাঠামোতে ইরানের হামলার পর বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাসের দাম বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। বৃহস্পতিবার ভোরের দিকে ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচারসের দাম প্রতি ব্যারেল ১১৫ ডলার ছাড়িয়ে গেছে; যা গত এক সপ্তাহেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ। একই সঙ্গে গ্যাসের দামও ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকলে জ্বালানির দাম আরও ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে জানিয়েছেন বাজার বিশ্লেষকরা।
তেল বাজার বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান ভান্দা ইনসাইটসের প্রতিষ্ঠাতা বন্দনা হরি আল জাজিরাকে বলেন, ওমান ও দুবাইয়ের মতো মধ্যপ্রাচ্যের বেঞ্চমার্ক অপরিশোধিত তেলের দাম এরই মধ্যে ১৫০ ডলারের সীমা অতিক্রম করেছে। ফলে ব্রেন্ট এবং ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের ক্ষেত্রে না হলেও, অন্যান্য তেলের দাম ২০০ ডলার হওয়া এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।
তিনি বলেন, অশোধিত তেলের দাম এখান থেকে আর কতটুকু বাড়বে, তা প্রায় সম্পূর্ণ নির্ভর করছে হরমুজ প্রণাণি আর কতদিন বন্ধ থাকে তার ওপর।
মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি অবকাঠামো ও কাতারের প্রধান গ্যাসক্ষেত্রে নতুন করে হামলার ঘটনায় ইউরোপে গ্যাসের দাম ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে ইরানের হামলার পর বৃহস্পতিবার ইউরোপের বাজারে গ্যাসের দামে ওই উল্লম্ফন দেখা গেছে।
ইউরোপীয় বেঞ্চমার্ক হিসেবে বিবেচিত ডাচ টিটিএফ প্রাকৃতিক গ্যাসের চুক্তিমূল্য বৃহস্পতিবার একপর্যায়ে লাফিয়ে ৭৪ ইউরোতে গিয়ে ঠেকেছে। যদিও পরবর্তীতে এই দাম কিছুটা কমেছে।
ইরানের দুই দফা হামলায় বিশ্বের বৃহত্তম তরলিকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ক্ষেত্র কাতারের রাস লাফানের ‘ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি’ হয়েছে। এ ঘটনার ফলে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
সূত্র: এএফপি, আল জাজিরা
এমএন
আন্তর্জাতিক
ইরানি রাষ্ট্রনেতাদের হত্যা এবং বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা অগ্রহণযোগ্য : চীন
ইসরায়েলি বিমান হামলায় ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা প্রধান আলী লারিজানির নিহত হওয়ার ঘটনার নিন্দা জানিয়ে চীন। আজ বৃহস্পতিবার চীন এ ঘটনাকে অগ্রহণযোগ্য বলে আখ্যা দিয়েছে। বেইজিং ইরানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হলেও মার্কিন সামরিক ঘাঁটি থাকা উপসাগরীয় দেশগুলোতে তেহরানের হামলারও সমালোচনা করেছে।
২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলায় সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি এবং অন্যান্য শীর্ষ নেতাদের নিহত হওয়ার পর থেকে লারিজানিই ছিলেন নিহত হওয়া সবচেয়ে হাই প্রোফাইল ইরানি নেতা।
লারিজানির মৃত্যু সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ান এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘আমরা আন্তর্জাতিক সম্পর্কে সবসময় শক্তি প্রয়োগের বিরোধিতা করে এসেছি। ইরানি রাষ্ট্রনেতাদের হত্যা এবং বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা আরো বেশি অগ্রহণযোগ্য।’
লিন বলেন, ‘চীন সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে অবিলম্বে সামরিক অভিযান বন্ধ করতে এবং আঞ্চলিক পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া থেকে বিরত থাকতে আহ্বান জানাচ্ছে।’ বেইজিং এই যুদ্ধে মধ্যস্থতা করার চেষ্টা করেছে এবং মধ্যপ্রাচ্যে নিযুক্ত তাদের বিশেষ দূত ঝাই জুন এই মাসে অঞ্চলটির শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন।
লিন বলেন, ‘ঝাই তার সফরকালে জোর দিয়ে বলেছেন, অসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা করা উচিত নয় এবং নৌপথের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করা উচিত নয়।’ চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মঙ্গলবার জানিয়েছে, বেইজিং ইরান, লেবানন, জর্দান এবং ইরাককে মানবিক সহায়তা প্রদান করবে।
সূত্র : আলঅ্যারাবিয়া।
আন্তর্জাতিক
ইরানকে কড়া সতর্কবার্তা সৌদির
সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদ ইরানকে সতর্ক করেছে। তিনি তার দেশ এবং প্রতিবেশী উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর তাদের হামলা সহ্য করবেন না বলে জানিয়েছেন। তিনি তেহরানকে অবিলম্বে তাদের কৌশল ফের বিবেচনা করার আহ্বান জানিয়েছেন।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বৃহস্পতিবার ভোরে এক সংবাদ সম্মেলনে ইরানকে সতর্ক করে বলেন, সৌদি আরব এবং অন্যান্য উপসাগরীয় দেশগুলোর উল্লেখযোগ্য সক্ষমতা ও সামর্থ্য রয়েছে। তারা ইচ্ছা করলে তা কাজে লাগাতে পারে।
সম্মেলনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আঞ্চলিক প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর হামলার জন্য ইরান তাদের কৌশল আগে থেকেই সতর্কভাবে পরিকল্পনা করেছিল, যদিও তেহরানের কূটনীতিকরা তা অস্বীকার করে আসছেন।
প্রিন্স ফয়সাল বলেন, কিছু লক্ষ্যবস্তুতে আঘাতের নিখুঁততা দেখে বোঝা যায়, এটি আগে থেকেই ভালোভাবে পরিকল্পনা করা ছিল এবং এতে শুধু প্রতিবেশী দেশ নয়, সৌদি আরবও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
তিনি আরো বলেন, ‘সৌদি আরব কিভাবে আত্মরক্ষা করবে, তা আমি এখন বলতে চাই না। কারণ ইরানকে আগাম বার্তা দেওয়া ঠিক হবে না। কিন্তু আমি মনে করি, ইরানিদের এটা বোঝা জরুরি যে সৌদি আরব এবং আক্রান্ত দেশগুলোর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সক্ষমতা ও সামর্থ্য রয়েছে। তারা চাইলে কাজে তা লাগাতে পারে।’
তিনি আরো বলেন, ‘যে ধৈর্য প্রদর্শন করা হচ্ছে তা অসীম নয়। ইরানিদের হাতে এক দিন, দুই দিন, নাকি এক সপ্তাহ সময় আছে? আমি সেই ইঙ্গিত দিতে যাচ্ছি না। আমি আশা করব, তারা আজকের বৈঠকের বার্তাটি বুঝবে এবং দ্রুত নিজেদের অবস্থান পুনর্বিবেচনা করে প্রতিবেশীদের ওপর হামলা বন্ধ করবে। কিন্তু তাদের সেই ইচ্ছা আছে কি না, সে বিষয়ে আমি সন্দিহান।’
সৌদি রাজধানীতে দিনের শুরুতে আরব ও ইসলামী দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের এক বৈঠকের পর যুবরাজ ফয়সাল এই সতর্কবার্তা দেন। এই বৈঠকে অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান যুদ্ধ নিয়ে আলোচনা হয়।
এদিকে বুধবার উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি কেন্দ্রগুলোতে ইরান হামলা চালায়। এর মধ্যে কাতারের রাস লাফান গ্যাস স্থাপনাও রয়েছে। সেখানে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের হাবশান গ্যাস স্থাপনাও রয়েছে।
কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রাস লাফান শিল্প শহরকে লক্ষ্য করে চালানো ইরানি হামলার তীব্র নিন্দা ও ধিক্কার জানিয়েছে। কাতারের রাজধানী দোহা থেকে ৮০ কিলোমিটার (৫০ মাইল) উত্তর-পূর্বে অবস্থিত এই শিল্প শহরটি বিশ্বের বৃহত্তম তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) উৎপাদন কেন্দ্র। বিশ্বের মোট এলএনজি সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ উৎপাদন করে এটি।
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) এর আগে সতর্ক করেছিল, ইরানের সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্রে ইসরায়েলি হামলার প্রতিশোধ হিসেবে কাতার, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের তেল ও গ্যাস স্থাপনাগুলোতে হামলা চালানো হবে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, দেশটির বিশাল অফশোর সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্রের সঙ্গে যুক্ত স্থাপনাগুলো হামলার শিকার হয়েছে। এই গ্যাসক্ষেত্রটি দক্ষিণ ইরানের বুশেহর প্রদেশের উপকূলে অবস্থিত।
সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ও বুধবার জানিয়েছে, তাদের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রিয়াদকে লক্ষ্য করে ছোড়া চারটি ইরানি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং দেশটির পূর্বাঞ্চলের দিকে ছোড়া দুটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে। দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ১৩টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ২৭টি ড্রোন মোকাবেলা করেছে।
সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী সংবাদ সম্মেলনে আরো বলেন, যদিও যুদ্ধ একদিন শেষ হবে তবে, ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক পুনরুদ্ধার করতে আরো অনেক বেশি সময় লাগবে। কারণ তেহরানের প্রতিবেশী দেশগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করার কৌশলের কারণে বিশ্বাস সম্পূর্ণরূপে ভেঙে গেছে।
তিনি বলেন, ‘এটি কোনো হঠাৎ পরিস্থিতির প্রতিক্রিয়া নয়। ইরান আগে থেকেই তাদের যুদ্ধ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে প্রতিবেশী দেশগুলোকে লক্ষ্য করছে, যাতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ওপর চাপ তৈরি করা যায়।’ তিনি আরো বলেন, ‘এই যুদ্ধ শেষ হলেও বিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে অনেক সময় লাগবে। আর যদি ইরান এখনই এসব বন্ধ না করে, তাহলে সেই বিশ্বাস আবার গড়ে তোলা প্রায় অসম্ভব হয়ে যাবে।’
সূত্র : আলজাজিরা।
আন্তর্জাতিক
মার্কিন হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগে আরব আমিরাতের কাছে ক্ষতিপূরণ দাবি ইরানের
ইরানের ওপর মার্কিন হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগে সংযুক্ত আরব আমিরাতের কাছে ক্ষতিপূরণ দাবি করেছে ইরান। এ বিষয়ে জাতিসংঘে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত আমির সাঈদ ইরাভানি, জাতিসংঘের মহাসচিবকে একটি চিঠি লিখে এই ক্ষতিপূরণ চেয়েছেন।
ইরানের নুরনিউজের বরাত দিয়ে আল জাজিরা জানিয়েছে, চিঠিতে ইরাভানি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জন্য নিজেদের ভূখণ্ড ব্যবহার করতে দিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাত ‘একটি আন্তর্জাতিকভাবে অন্যায় কাজ করেছে, যার জন্য তাদের রাষ্ট্র দায়ী’।
তিনি আরও দাবি করেন যে, হামলার ঘটনায় সংঘটিত সকল বস্তুগত ও নৈতিক ক্ষতির ক্ষতিপূরণসহ প্রতিকার প্রদানের আন্তর্জাতিক দায়িত্ব সংযুক্ত আরব আমিরাতের রয়েছে।
২৮ ফেব্রুয়ারি, ইরানে একযোগে হামলা চালায় ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র। এতে ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনিসহ শতাধিক মানুষ নিহত হন।
এরপর থেকে বেশ কয়েকটি উপসাগরীয় রাষ্ট্রে মার্কিন ঘাঁটি ও ইসরাইলের স্থাপনা লক্ষ্য করে তেহরানের প্রতিশোধমূলক হামলা অব্যাহত রয়েছে। এই হামলাগুলোর প্রধান শিকার হয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত।
আন্তর্জাতিক
ইউরোপ ট্রাম্পকে জানিয়ে দিয়েছে, ইরান ‘আমাদের যুদ্ধ নয়’
নিজেকে প্রায়ই ট্রান্সআটলান্টিকপন্থি বলে পরিচয় দিয়ে থাকেন জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিশ ম্যার্ৎস। ট্রান্সআটলান্টিকপন্থি বলতে যিনি ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ন্যাটো-সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রতা ও সমন্বয়কে গুরুত্ব দেন। কিন্তু ইরান যুদ্ধ ইস্যুতে তার বক্তব্য অস্বাভাবিকভাবে স্পষ্ট।
যখন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প দেশগুলিকে ইরানের বিরুদ্ধে যৌথ সামরিক উদ্যোগে যোগ দিতে এবং হরমুজ প্রণালী খোলার জন্য যুদ্ধজাহাজ মোতায়েনের আহ্বান জানালেন, তখন যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি ঘনিষ্ঠ মিত্র তাকে প্রত্যাখ্যান করল। যার মধ্যে জার্মানি অন্যতম।
ম্যার্ৎস গত বুধবার বার্লিনে জার্মান আইনপ্রণেতাদের বলেন, তিনি মনে করেন ইরানকে প্রতিবেশী দেশগুলোর জন্য হুমকি হতে দেয়া যাবে না। কিন্তু পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ইরান যুদ্ধে যুক্ত হওয়ার যৌক্তিকতা নিয়েও তিনি সন্দেহ প্রকাশ করেছেন।
তিনি বলেন, ‘এ পর্যন্ত কোনো সন্তোষজনক পরিকল্পনা নেই যে কিভাবে এই অভিযান সফল হবে। ওয়াশিংটন আমাদের সঙ্গে পরামর্শ করেনি এবং বলেনি যে, ইউরোপের সাহায্য প্রয়োজন।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা এমন পদক্ষেপ নেয়ার পরামর্শ দিতাম না। তাই আমরা ঘোষণা করেছি, যতদিন যুদ্ধ চলবে, আমরা হরমুজ প্রণালীতে কার্গো জাহাজ সুরক্ষার মতো কাজে, যেমন সামরিকভাবে, অংশগ্রহণ করব না।’
শুধু ম্যার্ৎসই নয়, বেশিরভাগ ইউরোপীয় নেতাই সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের সামরিক অভিযানে যুক্ত হওয়ার পরামর্শ প্রত্যাখ্যান করেছেন। তারা এমন এক অনিশ্চিত সংঘর্ষে জড়াতে চান না, যার উদ্দেশ্য পুরোপুরি বোঝা যায় না এবং যা তাদের নাগরিকদের কাছে জনপ্রিয় নয়।
এর মাধ্যমে তারা হিসাব কষছে যে, ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে শুরু করে শুল্ক বিরোধের মতো বিভিন্ন কারণে ইতোমধ্যেই মারাত্মক চাপের মধ্যে থাকা ট্রান্সআটলান্টিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে যে বহুবিধ ঝুঁকি রয়েছে, তার চেয়ে নিষ্ক্রিয় থাকার সুবিধাই বেশি।
ম্যার্ৎসের প্রতিরক্ষামন্ত্রী বরিস পিস্টোরিয়াস গত সোমবার (১৬ মার্চ) তার মতোই সরাসরি মন্তব্য করেছেন: ‘এটি আমাদের যুদ্ধ নয়, আমরা এটা শুরু করিনি।’ জার্মানির সঙ্গে সংহতি জানান ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইম্যানুয়েল ম্যাক্রো। বলেন, ‘আমরা এই সংঘাতের পক্ষ নই।’
ইরান যুদ্ধের বিরুদ্ধে ইউরোপীয়রা
ইউরোপীয়রা দীর্ঘদিন ধরেই শঙ্কিত যে, ট্রাম্পকে ক্ষুব্ধ করলে তিনি ইউক্রেন বিষয়ে তাদের ওপর থেকে নিয়ন্ত্রণ তুলে নিতে পারেন অথবা মস্কোর অনুকূলে কোনো চুক্তি মেনে নিতে কিয়েভকে বাধ্য করার চেষ্টা করতে পারেন।
এছাড়া এরই মধ্যে ন্যাটো জোটের অস্তিত্বই প্রশ্নের মুখে পড়েছে। চলতি বছরের শুরুতে ন্যাটোর সদস্য ডেনমার্কের কাছ থেকে গ্রিনল্যান্ড দখলের ট্রাম্পের পরিকল্পনায় দেশগুলো বিচলিত হয়ে পড়ে।
ইরান যুদ্ধে যোগ না দেয়ায় ন্যাটো মিত্রদের ওপর বেজায় ক্ষেপেছেন ট্রাম্প। শাস্তি দেয়ার কোনো পরিকল্পনার ইঙ্গিত না দিলেও তিনি বলেছেন যে, ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানে যোগ না দিয়ে তারা একটি ‘অত্যন্ত বোকামিপূর্ণ ভুল’ করেছে।
ট্রাম্প বিশেষ করে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের প্রতি তীব্র ঘৃণা প্রকাশ করেছেন, যাকে তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটেনের নেতা উইনস্টন চার্চিলের মতো ‘নন’ বলে মন্তব্য করেছেন। কিন্তু স্টারমার এবং অন্য নেতাদের পক্ষে ইউরোপীয় জনমত রয়েছে। ইউগভ-এর একটি জরিপে দেখা গেছে, ৪৯ শতাংশ ব্রিটিশ নাগরিক ইরান আগ্রাসনের বিরোধী।
এর ফলে নাইজেল ফারাজের জনতুষ্টিবাদী রিফর্ম ইউকে পার্টি এবং বিরোধী কনজারভেটিভরা মার্কিন ও ইসরাইলি হামলার প্রতি তাদের প্রাথমিক সমর্থন সংযত করতে এবং এমনকি কিছুটা সমর্থন জানাতেও বাধ্য হয়েছে।
কনজারভেটিভ নেতা কেমি ব্যাডেনক বলেন, ‘আমি কিয়ার স্টারমারের সবচেয়ে বড় সমালোচক, কিন্তু হোয়াইট হাউস থেকে আসা এই কথার লড়াই ছেলেমানুষি।’ রিফর্ম ইউকে-র রবার্ট জেনরিক বলেন, ‘আমাদের প্রধানমন্ত্রীকে বিদেশি নেতাদের দ্বারা তিরস্কৃত হতে দেখাটা আমার ভালো লাগে না।’
স্পেনে প্রধানমন্ত্রী সানচেজ ইরানের ওপর হামলাকে ‘বেপরোয়া ও অবৈধ’ বলে দ্রুত নিন্দা জানান। এমনকি যুদ্ধের জন্য যৌথভাবে পরিচালিত ঘাঁটিগুলো ব্যবহার করতে না দিলে স্পেনের সাথে বাণিজ্য বন্ধ করে দেয়ার ট্রাম্পের যে হুমকি তাও উড়িয়ে দেন তিনি।
ইরানে ইসরাইল ও আমেরিকার আগ্রাসনের পরই মার্চ মাসের শুরুর দিকেই স্পেনের উপ-প্রধানমন্ত্রী মারিয়া হোসে মন্তেরো বলেন, ‘আমরা অবশ্যই কারোর অনুচর হতে যাচ্ছি না, আমরা কোনো হুমকি সহ্য করব না এবং আমরা আমাদের মূল্যবোধ রক্ষা করব।’
সানচেজ সরকারের এই অবস্থান স্প্যানিশদের মধ্যেও ব্যাপকভাবে সমর্থন পেয়েছে। স্প্যানিশ সংস্থা ৪০ডিবি-র একটি জরিপ মতে, স্পেনের ৬৮ শতাংশ মানুষই ইরান যুদ্ধের বিরোধী।
জার্মানরাও এই যুদ্ধ চান না। এআরডি ডয়েচলান্ডট্রেন্ড-এর এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ৫৮ শতাংশ জার্মান এই যুদ্ধের বিরোধী এবং মাত্র ২৫ শতাংশ যুদ্ধের পক্ষে। এমনকি উগ্র-ডানপন্থি দল অল্টারনেটিভ ফর জার্মানি থেকেও সমালোচনা এসেছে, যে দলটি ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করছে।
দলটির সহ-নেতা টিনো ক্রুপাল্লা বলেছেন, ‘ডনাল্ড ট্রাম্প একজন শান্তিকামী প্রেসিডেন্ট হিসেবে মেয়াদ শুরু করেছিলেন। কিন্তু তিনি একজন যুদ্ধবাজ প্রেসিডেন্ট হিসেবে শেষ করবেন।’
ট্রাম্পের অপ্রত্যাশিত আচরণ সামাল দিতে ইউরোপীয়দের প্রচেষ্টা
ইউরোপীয় সরকারগুলো বলছে, তারা এমন কোনো যুদ্ধে জড়াতে চায় না, যে বিষয়ে তাদের কোনো মতামত দেয়ার সুযোগ দেয়া হয়নি এবং যার পরিণাম তারা দেখতে পাচ্ছে না।
একজন ইউরোপীয় কর্মকর্তা, যিনি সংবেদনশীলতার কারণে নিজের পরিচয় প্রকাশ না করার অনুরোধ করেছেন, তিনি বলেছেন যে আমেরিকার যুদ্ধের উদ্দেশ্য সুনির্দিষ্ট বা স্পষ্ট নয় এবং সম্ভবত তা ইসরাইলের যুদ্ধের উদ্দেশ্য থেকে ভিন্ন, বিশেষ করে ইরানের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের ক্ষেত্রে।
সম্পর্কের টানাপোড়েনের আরেকটি লক্ষণ হিসেবে জার্মান চ্যান্সেলর ম্যার্ৎস এবং অন্যরা বিশ্বব্যাপী তেলের আকাশছোঁয়া দাম কমানোর চেষ্টায় রাশিয়ার ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার জন্য ট্রাম্পের সমালোচনা করেছেন এবং ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্রদের অপ্রস্তুত অবস্থায় ফেলেছে।
ইউরোপীয় শক্তিগুলো ইরানের যুদ্ধের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে, তবে তা তাদের নিজস্ব শর্তে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্টারমার বলেছেন, ব্রিটেন হরমুজ প্রণালী পুনরায় খোলার একটি পরিকল্পনা নিয়ে মিত্রদের সঙ্গে কাজ করছে, যে পথ দিয়ে বিশ্বের ২০ শতাংশ তেল পরিবহন করা হয়।
ফরাসি প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁ বলেছেন, ফ্রান্স যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সামরিক অভিযানে যোগ দিচ্ছে না। নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্থিতিশীল হলে প্রণালীটি সুরক্ষিত করার জন্য ফ্রান্স একটি জোট গঠনের চেষ্টা করবে – এবং এতে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো ভূমিকা থাকবে না।
প্যারিস গত সপ্তাহ ধরে ইউরোপীয়, এশীয় (ভারতসহ) এবং উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর সাথে এমন একটি পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করছে, যার আওতায় যুদ্ধজাহাজগুলো ট্যাংকার ও বাণিজ্যিক জাহাজকে এসকর্ট করবে তথা পাহারা দিয়ে নিয়ে যাবে।
ম্যাক্রোঁ বলেন, এই ধরনের পরিকল্পনার মধ্যে সামুদ্রিক শিল্প, বীমাকারী এবং অন্যান্যদের সাথে রাজনৈতিক ও প্রযুক্তিগত আলোচনা অন্তর্ভুক্ত থাকবে: ‘এই কাজের জন্য ইরানের সাথে আলোচনা এবং উত্তেজনা প্রশমনের প্রয়োজন হবে।’
পরিশেষে ইউরোপীয় নেতারা সর্বোপরি ঐক্য তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন এবং ট্রাম্পের খামখেয়ালী নেতৃত্ব বলে যা তারা মনে করেন, তা সামলাতে শিখেছেন।
ইইউ-এর পররাষ্ট্রনীতি প্রধান কায়া কালাস চলতি সপ্তাহে রয়টার্সকে এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ন্যাটো সামরিক জোট ‘এখন আরও শান্ত, কারণ আমরা… সব সময় অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটার প্রত্যাশা করি এবং সেটিকে সেভাবেই গ্রহণ করি, কিছুটা সতর্ক থাকি এবং শান্ত থেকে মনোযোগী থাকি।’




