ধর্ম ও জীবন
পবিত্র শবে মেরাজ ১৬ জানুয়ারি
বাংলাদেশের আকাশে ১৪৪৭ হিজরি সনের পবিত্র রজব মাসের চাঁদ দেখা গেছে। ফলে সোমবার (২২ ডিসেম্বর) থেকে পবিত্র রজব মাস গণনা শুরু হবে। সেই অনুযায়ী আগামী ১৬ জানুয়ারি (শুক্রবার) দিনগত রাতে সারাদেশে পবিত্র শবে মেরাজ উদযাপিত হবে।
রোববার (২১ ডিসেম্বর) সন্ধ্যায় রাজধানীর বায়তুল মোকাররমে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সভাকক্ষে জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির সভায় এ সিদ্ধান্ত হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন।
শবে মেরাজের দিন বাংলাদেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকে। তবে সরকারি প্রতিষ্ঠানে এদিন ঐচ্ছিক ছুটি। তবে এবার শবে মেরাজ পড়েছে সাপ্তাহিক ছুটির দিন শুক্রবারে।
সভায় উপদেষ্টা জানান, সব জেলা প্রশাসন, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের প্রধান কার্যালয়, বিভাগীয় ও জেলা কার্যালয়, আবহাওয়া অধিদপ্তর, মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্র ও দূর অনুধাবন প্রতিষ্ঠান থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশের আকাশে ১৪৪৭ হিজরির রজব মাসের চাঁদ দেখার সংবাদ পাওয়া গেছে। এজন্য সোমবার থেকে রজব মাস গণনা শুরু হবে। আগামী ১৬ জানুয়ারি পবিত্র শবে মেরাজ পালিত হবে।
সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. কামাল উদ্দিন, অতিরিক্ত সচিব মো. ফজলুর রহমান, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক আ. ছালাম খানসহ কমিটির সদস্যরা।
‘শবে মেরাজ’ অর্থ ঊর্ধ্ব গমনের রাত। মুসলমানদের ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, ২৬ রজব দিবাগত রাতে ঊর্ধ্বাকাশে ভ্রমণ করে মহানবী হযরত মোহাম্মদ (স.) আল্লাহ তা’য়ালার সাক্ষাৎ লাভ করেছিলেন। এবছর সেই রাতটি পড়েছে আগামী ১৬ জানুয়ারি।
শবে মেরাজ মুসলমানদের কাছে বিশেষ মর্যাদার। ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা নফল ইবাদত বন্দেগীর মধ্য দিয়ে এই মূল্যবান রাত কাটান। এই দিন অনেকে নফল রোজাও রাখেন।
এমকে
ধর্ম ও জীবন
শুক্রবার ঈদুল ফিতর উদযাপন করবে যেসব দেশ
শাওয়াল মাসের চাঁদ দেখা না যাওয়ায় মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার বেশ কয়েকটি দেশে ৩০টি রোজা পালিত হবে এবং দেশগুলো শুক্রবার ঈদ উদযাপন করবে। দেশগুলো হলো, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কাতার, কুয়েত, তুরস্ক, লেবানন, ফিলিস্তিন, ইয়েমেন এবং ইরাক।
মধ্যপ্রাচ্যের এই দেশগুলো ছাড়াও আফ্রিকা অঞ্চলের সুদান, জিবুতি, সোমালিয়া, উগান্ডা, নাইজেরিয়া, চাদ, গাম্বিয়া, গিনি, বেনিন, সেনেগাল এবং ক্যামেরুনও শুক্রবার ঈদুল ফিতর উদযাপনের ঘোষণা দিয়েছে। এই দেশগুলো ছাড়াও শুক্রবার ঈদুল ফিতর উদযাপন করবে অস্ট্রেলিয়া এবং মালদ্বীপ।
তুরস্ক এবং অস্ট্রেলিয়া জ্যোতির্বিজ্ঞানের হিসাব ও পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে শুক্রবারকে ঈদের দিন হিসেবে নিশ্চিত করেছে। তবে শাওয়ালের চাঁদ দেখা যাওয়ায় বৃহস্পতিবার (১৯ মার্চ) ঈদুল ফিতর উদযাপন করছে আফগানিস্তান, নাইজার এবং মালি।
এদিকে সিঙ্গাপুর ঘোষণা করেছে যে, বৃহস্পতিবার চাঁদ দেখা অসম্ভব হওয়ায় সেখানে শনিবার ঈদুল ফিতর পালিত হবে। তবে আজ (বৃহস্পতিবার) সন্ধ্যায় শাওয়াল মাসের চাঁদ দেখার চেষ্টা করবে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তানসহ বেশ কিছু দেশ।
চাঁদ দেখার ওপর ভিত্তি করে এসব দেশে শুক্রবার বা শনিবার ঈদ উদযাপিত হবে। এই তালিকায় আরও রয়েছে ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, ব্রুনাই, ইরান, ওমান, জর্ডান, সিরিয়া, মিশর, লিবিয়া, তিউনিসিয়া, আলজেরিয়া, মরক্কো এবং মৌরিতানিয়া।
আন্তর্জাতিক
সবার আগে একটি দেশের ঈদের তারিখ ঘোষণা
অস্ট্রেলিয়ায় পবিত্র ঈদুল ফিতরের তারিখ ঘোষণা করা হয়েছে। দেশটির শীর্ষ ইসলামি সংগঠন অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইমামস কাউন্সিল জানিয়েছে, আগামী শুক্রবার (২০ মার্চ) অস্ট্রেলিয়ায় ঈদুল ফিতর উদযাপিত হবে। দিনটি হবে ১৪৪৭ হিজরি সালের ১ শাওয়াল।
এক বিবৃতিতে সংস্থাটি জানায়, অস্ট্রেলিয়ান ফতোয়া কাউন্সিল জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র এবং চাঁদ দেখার দায়িত্বে থাকা বিশেষায়িত বৈজ্ঞানিক প্রতিষ্ঠানগুলো তথ্য বিশ্লেষণ করে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে।
চাঁদ দেখার ক্ষেত্রে শুধু অস্ট্রেলিয়ার পর্যবেক্ষণই নয়, বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের তথ্য বিশেষ করে প্রতিবেশী দেশগুলোর চাঁদ দেখার সম্ভাবনাও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
ঘোষণা অনুযায়ী, অস্ট্রেলিয়ায় আগামী বৃহস্পতিবার (১৯ মার্চ) পবিত্র রমজান মাসের শেষ দিন হবে। এর পরদিনই অস্ট্রেলিয়ার মুসলিমরা ঈদুল ফিতর উদযাপন করবেন।
অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইমামস কাউন্সিল আরো জানায়, রমজান মাসের শুরু ও শেষ নির্ধারণ, শাওয়াল মাসের সূচনা এবং ঈদুল ফিতরের দিন ঠিক করতে অস্ট্রেলিয়ার গ্র্যান্ড মুফতি ও অস্ট্রেলিয়ান ফতোয়া কাউন্সিল নির্দিষ্ট কিছু বৈজ্ঞানিক মানদণ্ড অনুসরণ করে।
এর মধ্যে রয়েছে সূর্যাস্তের আগে নতুন চাঁদের আবির্ভাব, সূর্যাস্তের পর আকাশে চাঁদ কতক্ষণ দৃশ্যমান থাকতে পারে এবং অস্ট্রেলিয়া ও আশপাশের অঞ্চলে চাঁদ দেখা সম্ভব কিনা এসব বিষয়।
কাউন্সিলের মতে, এই পদ্ধতি কেবল অস্ট্রেলিয়াতেই নয়, বিশ্বের অনেক স্বনামধন্য বৈজ্ঞানিক ও ইসলামি গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং ফিকহভিত্তিক সংগঠনও অনুসরণ করে থাকে। এর মাধ্যমে চাঁদ দেখার বিষয়ে একটি সুসংগঠিত ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয়।
সূত্র : খালিজ টাইমস
জাতীয়
আজ ইমাম-মুয়াজ্জিনদের সম্মানি কার্যক্রম উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী
আজ শনিবার (১৪ মার্চ) ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের সম্মানি প্রদান কার্যক্রমের শুভ উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
সকাল ১০টায় রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে এ অনুষ্ঠাব হবে বলে জানিয়েছে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়।
তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের এক বার্তায় এ তথ্য জানানো হয়।
মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা ইমরানুল হাসানের পাঠানো এক বার্তায় আরও জানানো হয়, একইদিন খাদেম, পুরোহিত, সেবায়েত, বিহার অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষদের সম্মানি প্রদান কার্যক্রমের উদ্বোধন করা হবে।
ধর্ম ও জীবন
রমজানের মাঝপথে আত্মজিজ্ঞাসা
রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের এই রমজান মাসের অর্ধেক সময় আমরা ইতিমধ্যে অতিক্রম করে এসেছি। যেই মাস আমাদের সামনে উপনিত হয়েছিল ফিরে আসার আহ্বান নিয়ে, শুদ্ধ হওয়ার আহ্বান নিয়ে, আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক নবায়নের আহ্বান নিয়ে। প্রথম রোজার দিনে আমাদের অন্তরে যে আবেগ, যে সংকল্প, যে অশ্রুসিক্ত আবেদন ছিল; মধ্য রমজানে দাঁড়িয়ে কি আমরা সেই একই উষ্ণতা অনুভব করছি? নাকি ব্যস্ততা, ক্লান্তি আর প্রাত্যহিক অভ্যাসের চাপে সেই উষ্ণতা কিছুটা ম্লান হয়ে গিয়েছে?
সময় সত্যিই দ্রুত বয়ে যায়। দিনগুলো, সাহরি ও ইফতারের বরকতময় সময়গুলো গড়িয়ে যাচ্ছে, তারাবির রাকাতগুলো শেষ হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, আমাদের হৃদয়ের ভেতর কি কোনো পরিবর্তন ঘটছে? রোজা কি কেবল ক্ষুধা ও তৃষ্ণা সহ্য করার অনুশীলনে সীমাবদ্ধ থাকছে, নাকি তা অন্তরকে নরম করছে, চোখকে সংযত করছে, জিহ্বাকে সত্য ও সৌজন্যের দিকে ফিরাচ্ছে? আমরা কি আগের চেয়ে একটু বেশি ধৈর্যশীল, একটু বেশি বিনয়ী, একটু বেশি দয়ালু হতে পেরেছি? কারণ রমজান তো আত্মার জাগরণের মাস।
এ মাসে আকাশের দরজা খোলা রয়েছে, রহমত নাজিল চ্ছে, গুনাহ মাফের সুবর্ণ সুযোগ তৈরি হয়েছে। কিন্তু সেই সুযোগ কি আমরা পরিপূর্ণভাবে গ্রহণ করছি?
তাই রমজানের মাঝপথে এসে মোজাসাবা জরুরি। নিজেকে জিজ্ঞেস করা প্রয়োজন যে, আমার নামাজে কি একাগ্রতা বেড়েছে, কোরআনের আয়াত কি হৃদয়কে বিগলিত করছে, অন্যায়ের প্রতি আমার অবস্থান কি দৃঢ় হয়েছে?
আসলে এই সময়টা এক নীরব মোড়। সামনে শেষ দশক, যেখানে রয়েছে লাইলাতুল কদরের অনুসন্ধান আর ইতিকাফের নির্জনতা।
এর আগে যদি আমরা নিজের ভেতরে তাকাই, তাহলে বাকি সময়টুকু নতুন উদ্যমে সাজানো সম্ভব। তাই রমজানের মাঝপথে দাঁড়িয়ে সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন হলো; আমরা কি এই মাসের প্রকৃত উদ্দেশ্যের দিকে এগোচ্ছি?
পবিত্র কোরআনে রোজার উদ্দেশ্য সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করা হয়েছে: ‘হে ঈমানদারগণ, তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর, যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো।’ (সুরা বাকারা আয়াত : ১৮৩)
এ আয়াতে রোজার মূল উদ্দেশ্য তাকওয়া অর্জন বলা হয়েছে। যার ব্যাখ্যায় ইমাম ইবনে কাসীর (রহ.) লিখেছেন, রোজা মানুষের প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণে আনতে সাহায্য করে এবং পাপ থেকে বিরত থাকার মানসিক শক্তি তৈরি করে।
তিনি বলেন, রোজা শয়তানের প্রভাব দুর্বল করে, কারণ তা মানুষের কামনা-বাসনাকে সংযত করে। (তাফসিরে ইবনে কাসির ২/১৮৩)
ইমাম কুরতুবী রহ. বলেন, তাকওয়া হলো আল্লাহর ভয়কে অন্তরে ধারণ করে তাঁর অবাধ্যতা থেকে দূরে থাকা। রোজা যেহেতু গোপন ইবাদত, তাই এতে রিয়া বা লোকদেখানো প্রবণতা কম থাকে; ফলে এটি সরাসরি তাকওয়া গঠনে ভূমিকা রাখে। (আল-জামি‘ লি আহকামিল কুরআন, ২/১৮৩)
এখন প্রশ্ন হলো, আমাদের রোজা কি সত্যিই তাকওয়া তৈরি করছে? রাসুলুল্লাহ (সা.) সতর্ক করে বলেছেন: ‘যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা ও মন্দ কাজ পরিত্যাগ করে না, তার পানাহার ত্যাগ করার কোনো প্রয়োজন আল্লাহর নেই।’ (বুখারি, হাদিস : ১৯০৩)
এই হাদিস আমাদের সামনে আয়নার মতো সত্য তুলে ধরে।
রোজা শুধু খাদ্য ত্যাগের নাম নয়; এটি জিহ্বা, চোখ, কান ও অন্তরের সংযমের নাম। যদি রমজানের মাঝপথে এসে আমরা দেখি যে, মিথ্যা, গীবত, হিংসা, দুর্নীতি বা অন্যায় আচরণ আমাদের জীবন থেকে কমেনি, তবে বুঝতে হবে রোজার আত্মিক ফল আমরা পুরোপুরি অর্জন করতে পারিনি।
রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেছেন: ‘কত রোজাদার আছে, যার রোজা থেকে প্রাপ্তি শুধু ক্ষুধা।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ১৬৯০)
এ হাদিস আমাদের ভাবিয়ে তোলে। রোজা যদি চরিত্র গঠন না করে, তাহলে তা কেবল আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়। তাই মাঝপথে এসে আত্মসমালোচনা অতীব জরুরি।
রমজান কোরআনের মাস। মহান আল্লাহ বলেন: ‘রমজান সেই মাস, যাতে কোরআন অবতীর্ণ হয়েছে। (সুরা আল-বাকারা আয়াত : ১৮৫)
ইমাম শাফেয়ী রহ. রমজানে অধিক কোরআন তিলাওয়াতের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিতেন। ইমাম মালিক রহ. রমজান শুরু হলে হাদিস পাঠের আসর কমিয়ে কোরআন পাঠে মনোনিবেশ করতেন। (ইবন রজব, লাতায়িফুল মা‘আরিফ) এসব ঐতিহাসিক তথ্য আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, রমজান শুধু সামাজিক উৎসব নয়; এটি কোরআনের সঙ্গে সম্পর্ক নবায়নের সময়। মধ্য রমজানে আমারে হিসাব মিলানো দরকার আমরা কোরআনের সাথে কতোটুকু সম্পর্ক স্থাপন করতে পেরেছি?
আত্মসমালোচনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হলো আমল ও চরিত্রের ধারাবাহিকতা। আল্লাহ বলেন: নিশ্চয় আল্লাহর কাছে তোমাদের মধ্যে সে-ই অধিক সম্মানিত, যে অধিক তাকওয়াবান। (সুরা হুজুরাত আয়াত : ১৩)
ইমাম নববী রহ. তাকওয়ার ব্যাখ্যায় বলেন, এটি এমন এক অবস্থা, যেখানে বান্দা আল্লাহর সন্তুষ্টিকে অগ্রাধিকার দেয় এবং গোপনে-প্রকাশ্যে তাঁর অবাধ্যতা থেকে বেঁচে থাকে। (শরহু সহিহ মুসলিম, ভূমিকা অংশে তাকওয়ার আলোচনা)
রমজানের মাঝপথে দাঁড়িয়ে তাই আমাদের কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর খোঁজা উচিত; আমার নামাজে কি একাগ্রতা বেড়েছে? কোরআনের সঙ্গে কি নিয়মিত সম্পর্ক তৈরি হয়েছে? গরিব ও অভাবীদের প্রতি সহমর্মিতা কি গভীর হয়েছে? আমার রাগ, অহংকার ও ভাষার কটুতা কি কমেছে?
সুতরাং রমজানের মাঝপথে দাঁড়িয়ে আমাদের হিসাব শুধু অতীত কয়েক দিনের নয়; বরং বাকি দিনগুলোকে কীভাবে অর্থবহ করব, তারও পরিকল্পনার। রোজা যদি তাকওয়া, সংযম, কোরআনপ্রেম ও মানবিকতা বৃদ্ধি না করে, তবে আমাদের নতুন করে শুরু করতে হবে। আর যদি সামান্য হলেও পরিবর্তন এসে থাকে, তবে সেটিকে স্থায়ী রূপ দিতে হবে।
রমজান চলে যায়, কিন্তু তাকওয়ার প্রয়োজন সারা বছর। তাই এই মাঝপথে দাঁড়িয়ে সৎ সাহসে নিজের হৃদয়ের দিকে তাকানোই হতে পারে রমজানের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
আসুন, আমরা এই মাঝপথকে অবহেলা না করি। এখনও সময় আছে। যে গাফলতি হয়েছে, তা স্বীকার করে নেওয়াই তো তাওবার প্রথম ধাপ। আল্লাহর দরজা এখনও খোলা, রহমতের ধারা এখনও প্রবাহমান। আজ রাতে, এই মুহূর্তে আমরা যদি আন্তরিকভাবে বলি; হে আল্লাহ, আমাদের রোজাকে কবুল করুন, আমাদের ত্রুটি মাফ করুন, আমাদের অন্তরকে শুদ্ধ করুন। তবে নিশ্চয়ই তিনি নিরাশ করবেন না।
রমজান চলে যাবে, কিন্তু তার রেখে যাওয়া ছাপ যেন আমাদের জীবনে থেকে যায়। তাই আসুন, আমরা শুধু ক্ষুধার কষ্ট নয়, গুনাহের কষ্টও অনুভব করি; শুধু ইফতারের আনন্দ নয়, ক্ষমা পাওয়ার আনন্দও খুঁজি। বাকি দিনগুলোকে এমনভাবে সাজাই, যেন ঈদের দিন আমরা শুধু নতুন পোশাকে নয়, নতুন হৃদয় নিয়েও দাঁড়াতে পারি। আল্লাহ আমাদের সবাইকে সেই তাওফিক দান করুন।
ধর্ম ও জীবন
বরকতের ছোঁয়া ও ইবাদতের মাঝে আত্মশুদ্ধির মহিমায় মাহে রমাদান
পবিত্র মাহে রমাদান মুসলিম উম্মাহর জন্য রহমত, বরকত ও আত্মশুদ্ধির এক মহাসুযোগ নিয়ে প্রতি বছর ফিরে আসে। সিয়াম সাধনার এ মাস কেবল ক্ষুধা ও তৃষ্ণা থেকে বিরত থাকার নাম নয়; বরং এটি আত্মসংযম, তাকওয়া অর্জন এবং মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভের এক অনন্য প্রশিক্ষণকাল।
রোজা মানুষের ভেতরের শক্তিকে জাগ্রত করে, নফসকে নিয়ন্ত্রণে আনে এবং জীবনের লক্ষ্যকে করে সুস্পষ্ট। রমাদান আত্মশুদ্ধির মাস। বছরের নানা ব্যস্ততা ও দুনিয়াবি মোহে মানুষ অনেক সময় গাফেল হয়ে পড়ে।
কিন্তু এ মাসে সিয়ামের মাধ্যমে সে নিজের ভুল-ত্রুটি, গুনাহ ও অন্যায় থেকে ফিরে আসার সুযোগ পায়। তওবা, ইস্তিগফার ও অধিক ইবাদতের মাধ্যমে অন্তর হয় পরিশুদ্ধ, হৃদয়ে জাগে নতুন আলোর সঞ্চার।মাহে রমাদানে রহমতের দরজা উন্মুক্ত থাকে। চারদিকে যেন নেমে আসে বরকতের ছোঁয়া। অল্প আমলেও মেলে বহুগুণ সওয়াব, সামান্য দানেও পাওয়া যায় অশেষ প্রতিদান।
ঘরে ঘরে কুরআনের তিলাওয়াত, মসজিদে মসজিদে নামাজের সারি-সব মিলিয়ে এক অনন্য আধ্যাত্মিক পরিবেশ সৃষ্টি হয়। সময়ের মধ্যেও থাকে বিশেষ বরকত; কাজের ফাঁকে ফাঁকে মানুষ খুঁজে নেয় ইবাদতের সুযোগ। ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজজীবনে ছড়িয়ে পড়ে শান্তি ও কল্যাণের বার্তা।সেহরি শুধু রোজার প্রস্তুতি নয়। এটি বরকতের বিশেষ সময়।
রাতের শেষ প্রহরে ঘুম ভেঙে সেহরি খাওয়া এবং সেই সঙ্গে দোয়া, ইস্তিগফার ও তাহাজ্জুদ আদায় একজন মুমিনের জীবনে আনে আত্মিক প্রশান্তি। ভোরের নীরবতায় উচ্চারিত দোয়া হয়ে ওঠে আরও হৃদয়গ্রাহী, আরও গ্রহণযোগ্য।সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার ও যাবতীয় অপবিত্র কাজ থেকে বিরত থাকাই রোজার মূল বিধান।
তবে রোজার প্রকৃত শিক্ষা কেবল খাদ্য ত্যাগে সীমাবদ্ধ নয়; বরং চোখ, কান, জিহ্বা ও অন্তরের সংযমও সমান গুরুত্বপূর্ণ। মিথ্যা, পরনিন্দা, গীবত ও অন্যায় থেকে দূরে থাকাই সিয়ামের প্রকৃত তাৎপর্য। এ সংযম মানুষকে ধৈর্যশীল ও আত্মনিয়ন্ত্রিত করে তোলে।
দিনভর সিয়ামের পর ইফতারের মুহূর্তে নেমে আসে বিশেষ রহমত। একটি খেজুর বা এক চুমুক পানিতেই মেলে অপার তৃপ্তি ও প্রশান্তি। এ সময়ের দোয়া আল্লাহ তাআলা কবুল করেন বলে হাদিসে উল্লেখ রয়েছে। তাই ইফতার কেবল আহার গ্রহণ নয়; এটি কৃতজ্ঞতা, প্রার্থনা ও আত্মসমর্পণের এক অনন্য মুহূর্ত। রমাদান ইবাদতের বসন্তকাল।
এ মাসে মুমিনের হৃদয় ইবাদতের মধ্যে মশগুল থাকে। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের পাশাপাশি নফল ইবাদত, কুরআন তিলাওয়াত, জিকির-আজকার, দোয়া ও তওবায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে মন। দুনিয়াবি ব্যস্ততার মাঝেও আল্লাহর স্মরণ হয়ে ওঠে জীবনের প্রধান অনুষঙ্গ। বিশেষ করে সালাতুত তারাবীহ রমাদানের রাতগুলোকে করে তোলে আলোকিত ও সজীব।
শেষ প্রহরের তাহাজ্জুদে চোখের জল আর প্রার্থনার সুরে ভরে ওঠে মুমিনের হৃদয়। সব মিলিয়ে রমাদান হয়ে ওঠে আত্মিক প্রশান্তির এক সোনালি অধ্যায়।রমাদান আমাদের জীবনে পরিবর্তনের বার্তা নিয়ে আসে। বদঅভ্যাস ত্যাগ, অসৎ পথ থেকে ফিরে আসা এবং সৎকর্মে নিজেকে সম্পৃক্ত করার দৃঢ় সংকল্প নেওয়ার সময় এটি।
বরকতের এ ছোঁয়া ও ইবাদতের এ মশগুল পরিবেশ মানুষকে বদলে দেয়, অন্তরকে নরম করে এবং আল্লাহর সান্নিধ্যের অনুভূতিতে ভরিয়ে তোলে জীবন। এক মাসের এই অনুশীলন যেন সারা বছরের জীবনচর্চায় প্রতিফলিত হয়-এটাই হওয়া উচিত প্রতিটি মুমিনের প্রত্যাশা। রমজানের আমেজে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে ভ্রাতৃত্ব, সহমর্মিতা ও দানের মানসিকতা। ধনী-গরিব এক কাতারে দাঁড়িয়ে ইবাদত করেন, ইফতার ভাগাভাগি করেন। যাকাত, ফিতরা ও সদকার মাধ্যমে সমাজের অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো হয়। ফলে সামাজিক বন্ধন আরও সুদৃঢ় হয় এবং মানবিকতার ভিত্তি মজবুত হয়। সব মিলিয়ে মাহে রমাদান হলো আত্মশুদ্ধি, রহমত, বরকত ও পরিবর্তনের মাস। এ মাস আমাদের শেখায় কিভাবে সংযম ও তাকওয়ার মাধ্যমে ব্যক্তি ও সমাজজীবনকে সুন্দর করা যায়।
পবিত্র এ মাসে আমাদের প্রত্যাশা-রমাদানের শিক্ষা যেন শুধু এক মাসে সীমাবদ্ধ না থাকে; বরং সারা জীবনের পথচলায় হয়ে উঠুক আলোর দিশারী।
এমএন




