মত দ্বিমত
খালেদা জিয়ার প্রতি আমাদের আকুলতা এবং নীরব শক্তির প্রতিচ্ছবি
উপমহাদেশের সমৃদ্ধ কিন্তু উত্তাল ইতিহাসে খালেদা জিয়ার নাম এক আলাদা অধ্যায়। ব্যক্তিগত বেদনা এবং রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যেই তিনি গড়ে তুলেছিলেন এক অদম্য পরিচয় যা তাকে দেশের সর্বোচ্চ ক্ষমতার কেন্দ্রে নিয়ে যায়। তিনি ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ এবং ২০০১ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং দেশের ইতিহাসে প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অনন্য মর্যাদা অর্জন করেন।
একটি সাধারণ সংসারে বড় হয়ে জীবনের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়া, স্বামীর হত্যার পর আকস্মিকভাবে রাজনীতিতে উঠে আসা এবং দলকে নেতৃত্ব দেওয়া তাকে এক অনন্য উচ্চতায় তুলে ধরে। তাঁর আদর্শ, সিদ্ধান্ত গ্রহণের দৃঢ়তা এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রভাব বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে দীর্ঘস্থায়ী ছাপ রেখে গেছে।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান, শিক্ষা ও অর্থনৈতিক সংস্কারের প্রতি মনোযোগ এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে তাঁর দৃঢ়তা তাকে সমর্থক ও সমালোচকের আলোচনায় রাখে। ২০০৮ সালের মামলায় তোলা বিভ্রান্তিকর অভিযোগ এবং দীর্ঘ আইনি লড়াই তাঁর রাজনৈতিক যাত্রায় গভীর প্রভাব ফেলে। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে শীর্ষ আদালত তাঁকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দিলে তাঁর প্রতি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয়।
গত এক বছরে তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি নিয়ে মানুষের উদ্বেগ বেড়েছে। এই বছরের মে মাসে লন্ডনে চিকিৎসা শেষে দেশে ফেরার পর হঠাৎ অবস্থার আরও অবনতি ঘটে এবং তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন যে অনুকূল নয় এমন শ্বাসনালী সংক্রমণ বা নিউমোনিয়ার কারণে তিনি কোরোনারি কেয়ার ইউনিটে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রয়েছেন। দল মত নির্বিশেষে মানুষ তাঁর সুস্থতার জন্য দোয়া করছেন।
চিকিৎসায় দেশি বিদেশি বিশেষজ্ঞরা সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব ও আন্তরিকতা নিয়ে কাজ করছেন। কয়েকটি বন্ধুত্বপূর্ণ দেশ উন্নত চিকিৎসা সহায়তার আগ্রহও প্রকাশ করেছে। এই মানবিক সহযোগিতা এবং সমন্বিত চিকিৎসা ব্যবস্থা জনগণের উদ্বেগ কিছুটা প্রশমিত করেছে। জিয়া পরিবারের পক্ষ থেকে দেশবাসীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানো হয়েছে এবং দোয়া অব্যাহত রাখার অনুরোধ করা হয়েছে। মাননীয় প্রধান উপদেষ্টাসহ উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তিরা চিকিৎসায় পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন।
তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের ব্যথা এখন একটি জাতির বেদনায় রূপ নিয়েছে। একজন নারী হিসেবে রাজনৈতিক শিখরে ওঠা, পরিবার বিচ্ছিন্নতার অভিজ্ঞতা এবং বর্তমান শারীরিক দুর্বলতা মিলিয়ে তাঁর জীবন একটি গভীর মানবগল্প হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাঁর সংগ্রাম, উত্থান পতন এবং বর্তমান সংগ্রাম মানুষের মনে আন্তরিকতা ও সহমর্মিতা জাগিয়েছে।
দীর্ঘ সময় ধরে প্রতিহিংসাপূর্ণ রাজনীতি বাংলাদেশকে গ্রাস করেছে। সেখানে খালেদা জিয়ার নীরব ধৈর্য, সংযমী আচরণ এবং আধ্যাত্মিক শক্তি অনেকের চোখে অন্যরকম এক প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে উঠেছে। আজ দেশজুড়ে যেভাবে সমবেদনা ছড়িয়ে পড়েছে তা কেবল একজন রাজনৈতিক নেত্রীর প্রতি নয়, বরং একজন মা, একজন বোন এবং একজন রাষ্ট্রনেত্রীর প্রতি মানুষের গভীর মানবিক সাড়া।
এই সময় আমরা যে প্রার্থনায় ঐক্যবদ্ধ হয়েছি তা কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়। এটি এক মানবিক আবেদন জীবনের বহু ঝড় অতিক্রম করা এক নেত্রীর প্রতি শ্রদ্ধা জানানো। জিয়া পরিবারের প্রতি দোয়া অব্যাহত রাখার আহ্বান জানাই এবং চিকিৎসা সেবায় যুক্ত সকলকে ধন্যবাদ জানাই যারা নিরলসভাবে কাজ করছেন।
উপমহাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে কখনো কখনো এমন একটি চরিত্র আসে যার উপস্থিতি সময়কে বদলে দেয়। বাংলাদেশের রাজনীতিতে সেই চরিত্র ছিলেন খালেদা জিয়া। তিনি ছিলেন এমন এক নারী যাঁর দৃঢ়তা অসংখ্য মানুষকে আত্মমর্যাদার শিক্ষা দিয়েছে এবং যাঁর সাহস রাষ্ট্রক্ষমতার অর্থকে নতুনভাবে বুঝিয়েছে। তাঁর পথচলা ছিল সাহসে ভরা দীর্ঘ যাত্রা যেখানে প্রতিটি অগ্রগতি প্রতিহিংসার রাজনীতির বিরুদ্ধে নীরব অথচ শক্তিশালী ঘোষণা ছিল।
তাঁর জীবন ছিল নিরন্তর সংগ্রামের গল্প। ব্যক্তিগত ক্ষতি, অপবাদ, রাষ্ট্রীয় প্রতিহিংসা এবং ষড়যন্ত্রের বহু অধ্যায় তিনি বরণ করেছেন। স্বামী ও সন্তানকে হারানোর বেদনা এবং অন্য সন্তানদের থেকে দূরে থাকার কষ্ট তিনি মর্যাদার সঙ্গে বহন করেছেন। তবুও তিনি ঘৃণার উত্তরে ঘৃণা দেখাননি। তাঁর নীরবতা ছিল তাঁর সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিরোধ।
দুর্নীতি থেকে দূরে থাকার নৈতিক দৃঢ়তা এবং ক্ষমতার কেন্দ্রে থেকেও ব্যক্তিগত স্বার্থকে প্রত্যাখ্যান করার যে উদাহরণ তিনি সৃষ্টি করেছেন তা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিরল। তাঁর দল আজও তাঁর সমতুল নেতৃত্ব তৈরি করতে পারেনি কারণ দলটি দাঁড়িয়ে আছে তাঁর নীতি, বিচক্ষণতা এবং দৃঢ় ব্যক্তিত্বের ভিত্তিতে।
একসময় তাঁকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে দেখার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। তিনি যদি সেই পদে যেতে পারতেন তাহলে বাংলাদেশ রাজনৈতিক শিষ্টাচার এবং দৃঢ় নেতৃত্বের এক নতুন অধ্যায় দেখতে পেত। কিন্তু প্রতিহিংসাপূর্ণ রাজনৈতিক বাস্তবতা সেই সম্ভাবনাকে থামিয়ে দেয়।
আজ তিনি জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময় পার করছেন। গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় নিবিড় পরিচর্যায় থাকা সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জন্য সারা দেশ দোয়া করছে। প্রধান উপদেষ্টাও তাঁর সুস্থতার জন্য প্রার্থনা করেছেন এবং চিকিৎসায় পূর্ণ সহযোগিতার কথা জানিয়েছেন।
দেশ বিদেশের চিকিৎসকরা নিষ্ঠা নিয়ে কাজ করছেন এবং কয়েকটি বন্ধুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র উন্নত চিকিৎসার আগ্রহ জানিয়েছে। জিয়া পরিবারের পক্ষ থেকে দেশবাসীর ভালোবাসা ও দোয়ার জন্য গভীর কৃতজ্ঞতা জানানো হয়েছে এবং সকলকে দোয়া চালিয়ে যাওয়ার অনুরোধ করা হয়েছে।
এই সংকটকালে মায়ের স্নেহ স্পর্শ পাবার আকাঙ্ক্ষা একজন সন্তানের কাছে খুবই স্বাভাবিক তবুও রাজনৈতিক পরিস্থিতির সংবেদনশীলতার কারণে হয়তো সব কিছু সম্ভব হচ্ছে না, তবে বিশ্বাস করি পরিস্থিতি শান্ত হলে বহু দিনের প্রতীক্ষার অবসান ঘটবে এবং স্বদেশে ফিরে মায়ের পাশে দাঁড়ানোর দিন একদিন অবশ্যই আসবে।
তিনি এখনও আমাদের মাঝে আছেন এবং তাঁর উপস্থিতি নিজেই এক দৃঢ়তার উৎস। বর্তমানের তরুণেরা দেখছে যে এই দেশে এক নারী আছেন যিনি প্রতিহিংসাপূর্ণ রাজনীতিকে নীরব সাহস দিয়ে পরাজিত করেছেন। তাঁর জীবন এখনো নক্ষত্রের মতো দীপ্ত এবং যতদিন তিনি আমাদের সঙ্গে থাকবেন ততদিন সেই দীপ্তি প্রজন্মকে পথ দেখাবে। এক দিন তাঁর প্রস্থান যখনই আসবে তা হবে একটি যুগের সমাপ্তি, কিন্তু আজ তিনি জীবনের সঙ্গে লড়াই করা এক অবিনাশী শক্তির প্রতীক।
রহমান মৃধা, গবেষক এবং লেখক, প্রাক্তন পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন
rahman.mridha@gmail.com
মত দ্বিমত
নতুন বিশ্বে বিজ্ঞান, ক্ষমতা-গণতন্ত্র ও আমরা
প্রযুক্তির এই যুগে বিজ্ঞানের অগ্রগতি কি ইউরোপে, আমেরিকায়, না-কি চীনে- এই প্রশ্নের সহজ উত্তর নেই। কারণ বিজ্ঞান এখন আর একক কোনো ভূখণ্ডের সম্পদ নয়। তবে ক্ষমতা, নিয়ন্ত্রণ এবং দিকনির্দেশ এখনো কিছু নির্দিষ্ট কেন্দ্রে কেন্দ্রীভূত। এবং এটাই মূল কারণ, যে আমরা আজ বিজ্ঞানকে কেবল প্রযুক্তির প্রেক্ষাপটে দেখতে পারি না; এটি নৈতিকতা, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত এবং মানুষের দায়িত্বের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
আমেরিকা দীর্ঘদিন ধরে বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবনের নেতৃত্ব দিয়েছে। সিলিকন ভ্যালি, এমআইটি, হার্ভার্ড, নাসা—এই প্রতিষ্ঠানগুলো কেবল প্রযুক্তি নয়, একটি দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বায়োটেকনোলজি, মহাকাশ গবেষণা এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম অর্থনীতিতে আমেরিকার প্রভাব এখনো প্রবল। তবে এই অগ্রগতি মূলত কর্পোরেট মুনাফা এবং সামরিক কৌশলের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ফলে প্রশ্ন ওঠে—এই বিজ্ঞান কি মানবকল্যাণের জন্য, না ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য।
ইউরোপ ভিন্ন পথ বেছে নিয়েছে। তারা তুলনামূলকভাবে ধীর, কিন্তু নৈতিকতা ও নিয়ন্ত্রণে শক্ত। তথ্য সুরক্ষা, মানবাধিকার, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি, টেকসই উন্নয়ন—এই ক্ষেত্রগুলোতে ইউরোপ একটি ভারসাম্যপূর্ণ বিজ্ঞানচিন্তা গড়ে তুলেছে। ইউরোপীয় বিজ্ঞান কম দৃশ্যমান হলেও দীর্ঘমেয়াদে মানব সভ্যতার জন্য হয়তো বেশি নিরাপদ। এখানে প্রশ্ন আসে—গতির চেয়ে দিকনির্দেশ কি বেশি গুরুত্বপূর্ণ নয়।
আর চীন। গত দুই দশকে চীন দেখিয়েছে যে রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা এবং বিপুল বিনিয়োগ দিয়ে বিজ্ঞানকে কীভাবে দ্রুত এগিয়ে নেওয়া যায়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কোয়ান্টাম প্রযুক্তি, ফাইভ জি, মহাকাশ গবেষণায় চীন আজ আর অনুকরণকারী নয়, প্রতিদ্বন্দ্বী। তবে এই অগ্রগতির সঙ্গে আছে নজরদারি, তথ্য নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যক্তিস্বাধীনতার সীমাবদ্ধতা। ফলে বিজ্ঞান এখানে একদিকে বিস্ময়কর, অন্যদিকে উদ্বেগজনক।
এই তিন শক্তির তুলনায় একটি মৌলিক সত্য স্পষ্ট হয়। আজকের বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি শুধু আবিষ্কারের প্রশ্ন নয়। এটি মূলত মূল্যবোধের, নৈতিক দায়িত্বের এবং শক্তির ব্যবহারের প্রশ্ন। কে সিদ্ধান্ত নেবে প্রযুক্তি কীভাবে ব্যবহার হবে। কে এর সুফল পাবে। কে এর ক্ষতির বোঝা বহন করবে। এবং এটিই নির্ধারণ করবে, বিজ্ঞান মানবিক হবে কি না।
মানবজাতির সামনে নতুন পৃথিবীর সন্ধান তখনই সম্ভব, যখন বিজ্ঞান কেবল শক্তির হাতিয়ার থাকবে না, বরং ন্যায়বোধ, সহানুভূতি এবং দায়িত্বশীলতার সঙ্গে যুক্ত হবে। প্রযুক্তি যদি মানুষের কর্মসংস্থান কেড়ে নেয়, গোপনীয়তা ধ্বংস করে, যুদ্ধকে আরও নিখুঁত করে তোলে, তাহলে সেটি অগ্রগতি নয়, তা কেবল উন্নত ধ্বংস।
বর্তমান প্রতিবেদন ও গবেষণা দেখায়, চীনে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে বেশি গবেষক কর্মরত। শুধু সংখ্যাই নয়, প্রভাবের দিক থেকেও চীনা গবেষণা এগিয়ে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক গবেষণায় চীনা প্রকাশনা এখন বেশি উদ্ধৃত হচ্ছে, যা প্রমাণ করে যে এই গবেষণাগুলো বিশ্বজুড়ে জ্ঞান উৎপাদনের মূল স্রোতে যুক্ত হচ্ছে। বিশেষ করে ম্যাটেরিয়াল ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি, ইঞ্জিনিয়ারিং, ডেটা ও কম্পিউটার বিজ্ঞান এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে চীনা গবেষকদের কাজ এখন বৈশ্বিক মানদণ্ড নির্ধারণে ভূমিকা রাখছে।
সদ্য প্রকাশিত সুইডিশ টেলিভিশনের একটি প্রতিবেদনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে, বিষয়ভিত্তিক র্যাঙ্কিংয়ে বিশ্বের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে নয়টি এখন চীনে অবস্থিত। এটি বোঝায় যে চীন কেবল গবেষণাপত্রের পরিমাণ বাড়াচ্ছে না, বরং দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোও গড়ে তুলেছে যেখানে উচ্চমানের গবেষণা ধারাবাহিকভাবে সম্ভব হচ্ছে।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সাইমন মার্জিনসন উল্লেখ করেছেন, বহু চীনা গবেষক যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার প্রশিক্ষণ নিলেও শেষ পর্যন্ত নিজ দেশে ফিরে যাচ্ছেন। কারণ সেখানে তারা পাচ্ছেন গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত অর্থায়ন, আধুনিক অবকাঠামো এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার সহায়তা। এই মেধা প্রত্যাবর্তন চীনের গবেষণা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করছে।
তবে এই অগ্রগতির সঙ্গে উদ্বেগও আছে। ইউরোপের নীতিনির্ধারকরা আশঙ্কা করছেন যে গবেষণা সহযোগিতার মাধ্যমে সংবেদনশীল প্রযুক্তি এমন ব্যবস্থার হাতে যেতে পারে যেখানে স্বচ্ছতা ও স্বাধীনতা সীমিত। এই উদ্বেগ অমূলক নয় এবং ইউরোপের অনেক দেশই এখন এই প্রশ্নে দ্বিধান্বিত। অন্যদিকে, বহু বিশ্ববিদ্যালয় রেক্টর মনে করেন, বৈজ্ঞানিক সহযোগিতা বন্ধ করলে তা শেষ পর্যন্ত ইউরোপের নিজের ক্ষতিই ডেকে আনবে। কারণ বিজ্ঞান কখনোই সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন পরিবেশে বিকশিত হয় না। জ্ঞান আদানপ্রদান বন্ধ হলে গবেষণার গতি কমে যায় এবং বৈশ্বিক সমস্যার সমাধান আরও কঠিন হয়ে ওঠে।
এবার আসি গণতন্ত্র এবং চীনের উদাহরণের দিকে। চীন একটি জনবহুল রাষ্ট্র, যেখানে গণতন্ত্র নেই, রাজনৈতিক স্বাধীনতা সীমিত, মতপ্রকাশ নিয়ন্ত্রিত। তারপরও সেই চীন প্রযুক্তি, বিজ্ঞান এবং ভূরাজনীতিতে প্রতিদিন বিশ্বকে চমকে দিচ্ছে। অন্যদিকে বহু দেশ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নামে সংগ্রাম করেও শেষ পর্যন্ত স্বৈরাচারী শাসনের শিকার হচ্ছে। এই বৈপরীত্যের কারণ বোঝার জন্য আবেগ নয়, রাষ্ট্রের কাঠামো, ক্ষমতার ব্যবহার এবং মানুষের নৈতিক দায়িত্ব ও কার্যকর কর্মকাণ্ড বিবেচনা করতে হবে।
চীনে রাষ্ট্রের লক্ষ্য দীর্ঘমেয়াদি এবং স্পষ্ট। প্রযুক্তি, শিল্প, শিক্ষা ও সামরিক সক্ষমতা রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার। ক্ষমতাসীন দল বদলালেও লক্ষ্য বদলায় না। সেখানে শাসক ব্যক্তির নয়, রাষ্ট্রের ধারাবাহিকতা ও নৈতিক দিকই মুখ্য।
অন্যদিকে বহু গণতন্ত্রপ্রত্যাশী দেশে রাজনীতি ব্যক্তি কেন্দ্রিক। ক্ষমতায় যাওয়াই লক্ষ্য, রাষ্ট্র পরিচালনা নয়। নির্বাচনের পর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান দলীয় সম্পদে পরিণত হয়। ফলে গণতন্ত্র নামের কাঠামো থাকলেও বাস্তবে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয়।
চীন দশকভিত্তিক পরিকল্পনায় কাজ করে। শিক্ষা সংস্কার, গবেষণা বিনিয়োগ, শিল্প নীতি—সবকিছু দীর্ঘ সময় ধরে এগোয়। আজ যে প্রযুক্তিগত সাফল্য দেখা যাচ্ছে, তার ভিত্তি তৈরি হয়েছে বিশ বা ত্রিশ বছর আগে। গণতন্ত্রের নামে পরিচালিত বহু দেশে রাজনীতি চলে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি দিয়ে। পাঁচ বছরের মধ্যে ফল দেখাতে না পারলে পরিকল্পনা বাতিল হয়। রাষ্ট্র এখানে ভবিষ্যৎ গড়ে না, বরং ভোট টিকিয়ে রাখে।
চীনে প্রতিষ্ঠানগুলো ক্ষমতাসীন দলের অধীনে থাকলেও কার্যকর। গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্প খাত রাজনৈতিক অস্থিরতায় ভোগে না। স্বৈরাচারের শিকার গণতন্ত্রগুলোতে প্রতিষ্ঠান দুর্বল। আদালত, প্রশাসন, শিক্ষা ব্যবস্থা দলীয় নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। ফলে গণতন্ত্র নিজেই নিজের বিরোধী শক্তিতে রূপ নেয়।
চীন তার মেধাকে কাজে লাগাচ্ছে। বিদেশে পড়া গবেষকদের দেশে ফেরার পরিবেশ তৈরি করছে। গবেষণার জন্য অর্থ, ল্যাব, সম্মান নিশ্চিত করছে। অন্যদিকে বহু দেশে শিক্ষিত তরুণরা রাষ্ট্রের বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। রাজনৈতিক আনুগত্য ছাড়া সুযোগ নেই। মেধা দেশ ছাড়ে, রাষ্ট্র শূন্য হয়।
সবচেয়ে কঠিন সত্য হলো—গণতন্ত্র কোনো যাদু নয়। এটি একটি ব্যবস্থা। যদি সেই ব্যবস্থার ভেতরে জবাবদিহি, নৈতিকতা এবং শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান না থাকে, তবে গণতন্ত্র স্বৈরাচার উৎপাদন করতে পারে। চীন দেখাচ্ছে উন্নয়ন গণতন্ত্রের পূর্বশর্ত নয়। আবার অনেক দেশ প্রমাণ করছে গণতন্ত্র উন্নয়নের নিশ্চয়তা নয়।
এই বাস্তবতা আমাদের একটি অস্বস্তিকর প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়। আমরা কি সত্যিই গণতন্ত্র চাই, নাকি কেবল ক্ষমতায় যাওয়ার একটি সিঁড়ি হিসেবে একে ব্যবহার করছি।
মানবজাতির সামনে নতুন পৃথিবীর সন্ধান তখনই সম্ভব, যখন বিজ্ঞান কেবল শক্তির হাতিয়ার থাকবে না, বরং মানবিক দিক, নৈতিক দায়িত্ব এবং সচেতন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হবে। প্রযুক্তি যদি মানুষের জীবনকে শোষণ করে, গোপনীয়তা ধ্বংস করে, যুদ্ধকে আরও নিখুঁত করে তোলে, তাহলে সেটি অগ্রগতি নয়।
প্রকৃত সত্য হলো—ভবিষ্যৎ ইউরোপ, আমেরিকা বা চীনের একক মালিকানায় নয়। ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে এই প্রশ্নের উত্তরের ওপর। আমরা কি বিজ্ঞানকে মানুষের জন্য ব্যবহার করব, না মানুষকে বিজ্ঞানের পরীক্ষাগারে পরিণত করব। এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে নতুন পৃথিবী আসলেই মানবিক হবে কি না।
চীনের উদাহরণ আমাদের শেখায় যে রাষ্ট্র গড়তে হলে প্রয়োজন: দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টি, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, মেধার সম্মান এবং পরিকল্পনার ধারাবাহিকতা। আর গণতন্ত্র টিকিয়ে রাখতে হলে প্রয়োজন: নৈতিক নেতৃত্ব, জবাবদিহি এবং ক্ষমতার সীমা নির্ধারণ। এই দুটি একসাথে না চললে গণতন্ত্রও স্বৈরাচার জন্ম দেবে, আর উন্নয়ন মানবিক হবে না। এটাই যদি আজকের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হয়, তবে আমাদের অবস্থান কোথায়?
রহমান মৃধা, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন। rahman.mridha@gmail.com
মত দ্বিমত
দেশ বদলাচ্ছে, নাকি পুরোনো রাজনীতি নতুন ভাষায় ফিরছে?
দেশ বদলাচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমরা কি সত্যিই নতুন কিছু দেখছি, নাকি পুরোনো কাহিনি নতুন মোড়কে আমাদের সামনে ফিরে আসছে?
আগামী দিনগুলোতে লক্ষ্য করলে দেখবেন, সারা দেশের গণমাধ্যমে তারেক রহমানকে ঘিরে এক ধরনের প্রশস্তি আর গুণগানের স্রোত বইতে শুরু করবে। সংবাদ শিরোনাম, টক শো, বিশ্লেষণ, প্রচার সবকিছু এমনভাবে সাজানো হবে যেন সাধারণ মানুষের বিবেক ধীরে ধীরে প্রভাবিত হয়। এই প্রক্রিয়ায় একদিকে যেমন নির্দিষ্ট একটি নেতৃত্বকে অতিরঞ্জিতভাবে তুলে ধরা হবে, অন্যদিকে জামায়াত ও এনসিপির বিরুদ্ধে নানামুখী অপপ্রচার চলবে নীরবে কিন্তু পরিকল্পিতভাবে।
এই বাস্তবতায় ভারতও আলাদা কোনো পথ নেবে না। তারেক রহমানের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়বে। দলের চেয়ারম্যান হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার প্রেক্ষাপটে ঢাকাস্থ হাইকমিশনের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী মোদির শুভেচ্ছা বার্তা পৌঁছে দেওয়া হবে। সাংবাদিকদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ, ব্যক্তিগত মতবিনিময় এবং নরম ভাষায় ভিন্ন সুর তুলে ধরে জাতির সামনে একটি বার্তা দেওয়া হবে। দেখো, অতীতের সাংবাদিক সম্মেলনের সঙ্গে বর্তমানের কত পার্থক্য।
অনেকে ভাবতে পারেন, এসব ছোটখাটো বিষয় নিয়ে এত গুরুত্ব দেওয়ার কারণ কী। কিন্তু এগুলো মোটেও ছোটখাটো নয়। বিশেষ করে যারা দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে, তারা জানে এ দেশের মানুষ কীভাবে ভাবতে ভালোবাসে এবং সেই ভাবনাকে কীভাবে কৌশলে পৌঁছে দেওয়া যায়।
স্বৈরাচার সরকারের সময় একটি নির্দিষ্ট কৌশল অনুসরণ করা হয়েছিল। জনগণকে দেখানো হয়েছিল সরকার কতটা শক্তিশালী, কতটা কঠোর, কতটা ক্ষমতাবান। এবার সেই কৌশলের ভাষা বদলেছে। এবার তুলে ধরা হচ্ছে উদারতা, মানবিকতা, মহানুভবতার ছবি। কৌশল বদলালেও লক্ষ্য বদলায়নি। এর নামই রাজনীতি।
এই জায়গায় এসে একটি প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া যায় না। যদি শেষ পর্যন্ত একই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হয়, তাহলে শেখ হাসিনার সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরানোর প্রয়োজনটাই বা কী ছিল? ঘড়ির কাঁটা কি তবে শুধু বারোটার চারপাশেই ঘুরে গেল?
এই রাজনৈতিক বাস্তবতার মাঝেই আমি আরেকটি দৃশ্য গভীর মনোযোগ দিয়ে লক্ষ করছি। ছাত্রশিবিরের নেতৃত্ব আজ যে মাত্রার শক্তি ও সৃজনশীলতার পরিচয় দিচ্ছে, তা সত্যিই ব্যতিক্রমী। বর্তমান বিশ্ব রাজনীতির দিকে তাকালে দেখা যায় নোংরামি, দুর্নীতি, লুটপাট, সন্ত্রাস, নৈরাজ্য আর বিশৃঙ্খলার এক ভয়াবহ চিত্র। ঠিক এই সময়ে বাংলাদেশের মতো একটি দেশে ছাত্রশিবিরের নবজাগরণ শুধু একটি রাজনৈতিক ঘটনা নয়, এটি নৈতিকতার পুনরুদ্ধার।
রাজনীতি যে কেবল ক্ষমতা দখলের খেলা নয়, বরং নিরাপত্তা, মর্যাদা এবং সহাবস্থানের দায়ও বহন করতে পারে এই বার্তাই তারা দিচ্ছে। মানবজাতির সবচেয়ে বড় পরিচয় তখনই স্পষ্ট হয়, যখন একজন নারী একজন পুরুষের পাশে নিজেকে নিরাপদ মনে করে। তখনই বোঝা যায়, সমাজে মানবিকতার ভিত্তি এখনও অটুট।
গত কয়েক মাসে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে যে মায়াবী, মধুর সম্পর্ক গড়ে উঠতে দেখেছি, তা আমাকে এই বিশ্বাস দিয়েছে, ছাত্রশিবিরের কাছে বাংলাদেশের নারী নিরাপদ। আর নারী যখন নিরাপদ, তখন পুরো বাংলাদেশই নিরাপদ। এই বাস্তবতায় আমাদের সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি দাঁড়িয়ে আছে আসন্ন নির্বাচনকে ঘিরে। নির্বাচন শুধু ভোটের হিসাব নয়, এটি নিরাপত্তা, আস্থা এবং ভবিষ্যতের প্রশ্ন।
জাগো বাংলাদেশ, জাগো। সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ভেবে দেখো, আমরা কেবল দৃশ্যের পরিবর্তন চাই, নাকি সত্যিকারের পরিবর্তন?
রহমান মৃধা, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন। rahman.mridha@gmail.com
মত দ্বিমত
ভেনেজুয়েলা শুধু একটি সংকট নয়, নতুন বৈশ্বিক ব্যবস্থায় একটি কৌশলগত চাবিকাঠি
ভেনেজুয়েলা বসবাসের জন্য একটি অসাধারণ দেশ। দেশটির সৌন্দর্য সেখানে পা রাখা প্রত্যেক মানুষকে আকর্ষণ করে। সুউচ্চ আন্দিজ পর্বতমালা, ঝকঝকে ক্যারিবীয় সাগর, বিস্তীর্ণ রেইনফরেস্ট এবং শক্তিশালী জলপ্রপাত ভেনেজুয়েলাকে এক অনন্য ভূখণ্ডে পরিণত করেছে। প্রাকৃতিক সম্পদের দিক থেকে এটি বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ দেশ, যার সম্ভাবনার সঙ্গে খুব কম দেশই তুলনীয়। তেল, খনিজ সম্পদ এবং এমন একটি জলবায়ু যা সারা বিশ্বের মানুষকে টানে, সব মিলিয়ে ভেনেজুয়েলা বৈশ্বিকভাবে একটি আকর্ষণীয় অবস্থানে রয়েছে।
গত এক দশকে ভেনেজুয়েলা গভীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে গেছে। দুর্নীতি, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং বিশৃঙ্খলা সাধারণ মানুষের জীবনে চরম দুর্ভোগ ডেকে এনেছে। একই সঙ্গে এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়েছে বৈশ্বিক শক্তিগুলো। যুক্তরাষ্ট্র তার নিষেধাজ্ঞা, রাজনৈতিক চাপ এবং আঞ্চলিক প্রভাব খাটিয়ে এমনভাবে আচরণ করেছে যেন ভেনেজুয়েলা কার্যত আগেই দখল হয়ে গেছে। এই বাস্তবতায় অনেকের চোখে ভেনেজুয়েলা যে একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র, সেই সত্যটি ঝাপসা হয়ে গেছে।
কিন্তু ভেনেজুয়েলার গুরুত্ব বুঝতে হলে আমাদের প্রচলিত সংকটকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির বাইরে যেতে হবে। দেশটিকে ঘিরে আন্তর্জাতিক আগ্রহ বহুমাত্রিক ও জটিল। চীন ভেনেজুয়েলাকে শক্তি, বিনিয়োগ এবং অবকাঠামো সহযোগিতার একটি কৌশলগত অংশীদার হিসেবে দেখে। চীন বিপুল অঙ্কের ঋণ দিয়েছে এবং তেল আমদানি করছে। জার্মানি এবং ইউরোপের অন্যান্য দেশও স্থিতিশীল জ্বালানি সরবরাহ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার সুযোগ খুঁজছে, বিশেষ করে এমন সময়ে যখন জ্বালানি নিরাপত্তা ইউরোপীয় ইউনিয়নের জন্য একটি কেন্দ্রীয় ইস্যু। এই অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের ভেনেজুয়েলা নীতির সঙ্গে স্পষ্টভাবে বিপরীত।
বর্তমান ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি
আজ ভেনেজুয়েলা একটি ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েনের কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে। বহু বছরের ওঠানামার পর তেলের দাম আবার স্থিতিশীল হতে শুরু করেছে, যা দেশটির জন্য নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি করছে। স্থিতিশীল মূল্য এবং উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে ভেনেজুয়েলা তার অর্থনীতি শক্তিশালী করতে পারে এবং বাইরের শক্তির চাপ মোকাবিলায় বেশি সক্ষম হতে পারে। তবে একই সঙ্গে রাজনৈতিক শাসনব্যবস্থা এখনও নাজুক এবং দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে নতুন করে গড়ে তুলতে হবে।
স্বল্পমেয়াদে ভেনেজুয়েলা যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করবে বলেই মনে হয়। ইউক্রেন যুদ্ধের মতো আন্তর্জাতিক সংঘাতগুলো বৈশ্বিক শক্তির আচরণকে গভীরভাবে প্রভাবিত করছে। যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার জ্বালানি খাতকে সীমিত করতে এবং রুশ তেলের ওপর নির্ভরতা কমাতে মনোযোগ দিয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে ভেনেজুয়েলার বিশাল তেল উৎপাদন ক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। যদি ভেনেজুয়েলা তার তেল অবকাঠামো আধুনিকীকরণ করে উৎপাদন বাড়াতে সক্ষম হয়, তাহলে তা নতুন জোট এবং ক্ষমতার ভারসাম্যে পরিবর্তন আনতে পারে। এতে রাশিয়াও তার জ্বালানি রপ্তানি নতুনভাবে পুনর্বিন্যাস করার সুযোগ পেতে পারে, যখন পশ্চিমা বিশ্ব রুশ অর্থনীতিকে একঘরে করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
প্রবণতা, ছোট রাষ্ট্রগুলো বড় শক্তির চাপে
আজ আমরা একটি বৈশ্বিক প্রবণতা দেখছি যেখানে ছোট রাষ্ট্রগুলো বড় শক্তির স্বার্থের সংঘাতে জড়িয়ে পড়ছে। যুক্তরাষ্ট্র, চীন, জার্মানি এবং ভারত প্রত্যেকে নিজেদের কৌশলগত লক্ষ্য থেকে কাজ করছে। যুক্তরাষ্ট্র পশ্চিম গোলার্ধে নিজের প্রভাব ধরে রাখতে চায়। চীন আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা ও এশিয়ায় বিনিয়োগের মাধ্যমে উপস্থিতি বাড়াচ্ছে। জার্মানি ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন স্থিতিশীল জ্বালানি এবং শিল্প পুনরুদ্ধারের পথ খুঁজছে। ভারত ভারত মহাসাগর ও আফ্রিকায় তার প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে। এই বাস্তবতায় ভেনেজুয়েলার সার্বভৌমত্ব প্রতিনিয়ত বাইরের চাপের মুখে পড়ছে।
ছোট রাষ্ট্রগুলোর জন্য হুমকি শুধু সামরিক নয়। অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং কূটনৈতিক চাপও সমানভাবে কার্যকর। অনেক সময় নিষেধাজ্ঞা অস্ত্রের চেয়েও বেশি ক্ষতিকর হয়ে ওঠে। আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোও রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নীতিনির্ধারণে প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ভেনেজুয়েলা এই ঝড়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু দেশটিকে কেবল একটি ক্ষতবিক্ষত রাষ্ট্র হিসেবে দেখলে চলবে না। এটিকে নতুন বৈশ্বিক ভারসাম্যের একটি সম্ভাবনাময় কৌশলগত কেন্দ্র হিসেবেও দেখতে হবে।
উন্নয়নের কৌশল হিসেবে আকর্ষণ
আকর্ষণীয় হওয়া ভালো। আকর্ষণ মানে শুধু সৌন্দর্য নয়, বরং গুরুত্ব। ধারাবাহিক উন্নয়নের জন্য ভেনেজুয়েলাকে তার আকর্ষণ ধরে রাখতে হবে। এর অর্থ কার্যকর প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, দেশের ভেতরে ও বাইরে আস্থা সৃষ্টি করা এবং এমন সম্পর্ক তৈরি করা যা রাষ্ট্রের আত্মনিয়ন্ত্রণকে শক্তিশালী করে। এমন এক বিশ্বে যেখানে বড় শক্তিগুলো অংশীদারিত্ব, জ্বালানি ও কৌশলগত অবস্থান খুঁজছে, সেখানে আকর্ষণ একটি বড় প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা।
ভেনেজুয়েলা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে অন্যরা তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায় বলে নয়, বরং তারা তার সঙ্গে সহযোগিতা করতে চায় বলে। আসল চ্যালেঞ্জ হলো এই আকর্ষণকে প্রকৃত স্বাধীনতায় রূপান্তর করা। এই বিতর্ক ভেনেজুয়েলা এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গন উভয় জায়গাতেই গুরুত্বের সঙ্গে হওয়া প্রয়োজন।
এখন যদি আমরা বাংলাদেশকে ঘিরে ভাবি, প্রশ্নটি অস্বস্তিকর হলেও অপরিহার্য। শেখ হাসিনা যখন টানা সতেরো বছর প্রকৃত গণতান্ত্রিক জবাবদিহি ছাড়া ক্ষমতায় থাকতে পেরেছেন, তখন কি বাংলাদেশ সত্যিই একটি আকর্ষণীয় দেশ ছিল। রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে আকর্ষণ মানে শুধু বাহ্যিক স্থিতিশীলতা, প্রবৃদ্ধির সংখ্যা বা কাগুজে উন্নয়ন নয়। আন্তর্জাতিক মহল আগ্রহ দেখায় তখনই, যখন একটি দেশের ভূকৌশলগত অবস্থান, প্রাকৃতিক সম্পদ এবং মানুষের সৃজনশীলতা, শ্রম ও জ্ঞানকে মূল্যবান মনে করা হয়। তখন ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, দুর্বল বিচারব্যবস্থা এবং গণতান্ত্রিক ঘাটতি অনেক সময়ই উপেক্ষিত থাকে, যতক্ষণ পর্যন্ত অর্থনৈতিক ও কৌশলগত প্রবাহ ঠিক থাকে।
এটি আন্তর্জাতিক রাজনীতির একটি বিপজ্জনক কিন্তু পুনরাবৃত্ত সত্য। একটি দেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে সেখানে মানুষ কেমন জীবন যাপন করছে তার জন্য নয়, বরং দেশটি কী সরবরাহ করতে পারে তার জন্য। বাংলাদেশ এই বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছিল। সস্তা শ্রম, এশিয়ায় কৌশলগত অবস্থান এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের একটি গ্রহণযোগ্য বয়ান দেশটিকে ব্যবহারযোগ্য করে তুলেছিল। তাই ক্ষমতা কীভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছিল, সে বিষয়ে আন্তর্জাতিক মহলের আগ্রহ সীমিতই ছিল।
কিন্তু প্রকৃত শিক্ষা বাংলাদেশেই শেষ নয়। মর্যাদাহীন আকর্ষণ টেকসই নয়। যে দেশ কেবল তার সম্পদের জন্য আকর্ষণীয়, সে দেশ শেষ পর্যন্ত একটি বিষয়ে পরিণত হয়, একটি সত্তায় নয়। টেকসই আকর্ষণ গড়ে ওঠে তখনই, যখন প্রাকৃতিক সম্পদের সঙ্গে মানুষের মর্যাদা, সৃজনশীল স্বাধীনতা, জ্ঞান ও অধিকার যুক্ত হয়। তখনই একটি দেশ অন্যদের কাছে শুধু গুরুত্বপূর্ণ নয়, নিজের নাগরিকদের জন্যও বাসযোগ্য হয়ে ওঠে।
সেখানেই ভবিষ্যতের রাষ্ট্রগুলোর ভাগ্য নির্ধারিত হয়। কতদিন একজন নেতা ক্ষমতায় থাকলেন তা দিয়ে নয়, বরং রাষ্ট্র তার মূল্যকে কতটা স্বাধীনতায়, তার সম্ভাবনাকে কতটা ন্যায়বিচারে এবং তার আকর্ষণকে কতটা সম্মিলিত জীবন প্রকল্পে রূপ দিতে পারল, সেটিই শেষ পর্যন্ত ইতিহাসে গুরুত্ব পায়।
বাংলায় একটি প্রচলিত কথা আছে “তেলো মাথায় তেল দেওয়া।” এই প্রবাদটি আজকের বৈশ্বিক রাজনীতির জন্য আশ্চর্য রকমের যথাযথ। আজ বিশ্বের প্রায় সব কন্টিনেন্টেই অস্থিরতা, সংঘাত ও সংকট চলছে। যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, শাসন সংকট এবং মানবিক বিপর্যয় নতুন কিছু নয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো বিশ্বের ধনী ও ক্ষমতাধর দেশগুলোর দৃষ্টি কি সব সমস্যার দিকেই সমানভাবে পড়ে? বাস্তবতা হলো না। তাদের নজর তখনই পড়ে, যখন তারা দেখে এই সংকটে আমার লাভ কী।
বাংলাদেশ একটি দরিদ্র দেশ হতে পারে, কিন্তু একেবারেই গুরুত্বহীন নয়। আমাদের ভৌগোলিক অবস্থান আমাদের একটি বড় শক্তি। দক্ষিণ ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থিত বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, সামুদ্রিক যোগাযোগ এবং আঞ্চলিক রাজনীতিতে একটি কৌশলগত সুবিধা বহন করে। এই বাস্তবতা আমাদের জন্য সুযোগও, আবার ঝুঁকিও। তাই বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো সব সময় নিজের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া, দেশের স্বার্থে। কোনো ব্যক্তির ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার স্বার্থে নয়, শেখ হাসিনার মতো দীর্ঘস্থায়ী শাসন নিশ্চিত করার জন্য নয়।
রাজনীতিবিদদের জন্য এখানে বড় একটি শিক্ষার জায়গা আছে। ভেনেজুয়েলার শক্তিশালী নেতৃত্ব কীভাবে আন্তর্জাতিক চাপে একঘরে হয়ে পড়লো, কীভাবে যুক্তরাষ্ট্র ধীরে ধীরে দেশটির রাজনৈতিক পরিসরকে নিয়ন্ত্রণের দিকে নিয়ে গেল, সেগুলো গভীরভাবে বোঝা প্রয়োজন। একইভাবে প্রশ্ন উঠতেই পারে, কেন শেখ হাসিনাকে ভারত আশ্রয় দিল। এর উত্তর আবেগে নয়, কৌশলে। ভারত এটি করেছে বাংলাদেশের গণতন্ত্র বা মানুষের অধিকারের জন্য নয়, করেছে নিজের জাতীয় স্বার্থের জন্য। ঠিক যেমন যুক্তরাষ্ট্র তার চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও বৈশ্বিক অবস্থান রক্ষায় ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রে করছে।
এই বাস্তবতা নির্মম হলেও অস্বীকার করার উপায় নেই। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বন্ধুত্ব স্থায়ী নয়, স্বার্থই স্থায়ী। যে রাষ্ট্র নিজের স্বার্থ বোঝে না, অন্যের স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে নিজেকে দুর্বল করে ফেলে, শেষ পর্যন্ত সে নিজেই উপেক্ষিত হয়। বাংলাদেশকে সেই ভুল থেকে শিক্ষা নিতে হবে। আমাদের রাজনীতি যদি শিক্ষনীয় হতে চায়, তবে তাকে ব্যক্তিকেন্দ্রিক ক্ষমতা নয়, রাষ্ট্রকেন্দ্রিক কৌশল শিখতে হবে। তবেই আমরা তেলো মাথায় তেল দেওয়া নয়, বরং নিজের মাথা রক্ষা করার রাজনীতি গড়ে তুলতে পারব।
রহমান মৃধা, গবেষক ও লেখক, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন
rahman.mridha@gmail.com
মত দ্বিমত
হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা থেকে এআই অ্যালগরিদম
আমি গোটা বিশ্বে একটি বিষয় লক্ষ্য করেছি। বন্য হিংস্র প্রাণী, বিষাক্ত কেমিক্যাল কিংবা করোনা ভাইরাসের মতো মারাত্মক ভাইরাস থেকে মানুষকে রক্ষা করতে নানান ধরনের সুরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। কারণ এই ধরনের ভয়ংকর ও ধ্বংসাত্মক পরিস্থিতি থেকে মানুষ স্বাভাবিকভাবেই দূরে থাকে এবং বন্য হিংস্র বা বিষাক্ত প্রাণীসহ অন্যান্য বিপজ্জনক উপাদানের আশপাশে চলাফেরা করতে সতর্কতা অবলম্বন করে।
কিন্তু এই প্রথম দেখলাম, বিএনপি নেতা তারেক রহমানের ঢাকা মহানগরে চলাচল এমন কঠোর সুরক্ষার মধ্য দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে যে তা যেন এক ধরনের প্রদর্শনীতে পরিণত হয়েছে। মানুষ যেন এক অদেখা জীবকে দেখার কৌতূহলে জীবন ঝুঁকিতে ফেলে উঁকি দিয়ে তাকাচ্ছে। একবিংশ শতাব্দীতে বাংলাদেশে এমন চিড়িয়াখানার মতো দৃশ্য দেখতে হবে, তা কখনো ভাবিনি। এটাই কি তাহলে স্বৈরাচারীর পতন ঘটানোর ফলাফল। আর এটাই কি নতুন নেতৃত্বের বাংলাদেশ, যেখানে নেতা হবেন হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা আর জনগণ হবে ইঁদুরের মতো নির্বাক ও অনুসারী প্রাণী। কিন্তু এই দৃশ্য তো এযুগে মেনে নেয়া সম্ভব নয়। কিন্তু কি করা! ভাবতে শুরু করি, আমার ভাবনা থেকে বেরিয়ে আসে যে পরিকল্পনা সেটাই এখন শেয়ার করছি।
এতো দিন মানুষ ভয় পেত বন্য প্রাণী, বিষাক্ত গ্যাস কিংবা অদৃশ্য ভাইরাসকে। ভবিষ্যতে মানুষ ভয় পাবে নিজেরই তৈরি প্রতিচ্ছবিকে। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স যখন কেবল যন্ত্র থাকবে না, বরং মানুষের মতো দেখতে হবে, মানুষের মতো কথা বলবে, অনুভূতির অনুকরণ করবে এবং সিদ্ধান্ত নেবে, তখন ক্ষমতার প্রকৃতি আমূল বদলে যাবে।
আগামীর সবচেয়ে বিপজ্জনক অস্ত্র হবে সেই রোবোটিক মানুষ, যার কোনো অতীত নেই, কোনো পরিবার নেই, কোনো ভয় নেই। তাকে ব্ল্যাকমেইল করা যাবে না, তাকে ভয় দেখানো যাবে না, ধরা পড়লেও কোনো তথ্য বের হবে না। কারণ তার স্মৃতি থাকবে এনক্রিপ্টেড, তার আনুগত্য থাকবে অ্যালগরিদমের প্রতি, আর তার কাজ হবে নিঃশব্দে ইতিহাস বদলে দেওয়া।
আজ যেভাবে ভাড়াটে খুনি নিয়োগ করা হয়, ভবিষ্যতে তা হবে অকার্যকর। মানুষ দুর্বল। মানুষ ভয় পায়। মানুষ ধরা পড়ে। কিন্তু রোবোটিক মানবসদৃশ সত্তা ভুল করে না, অনুতপ্ত হয় না, প্রশ্ন তোলে না। সে কেবল নির্দেশ পালন করে। ঠিক যেমন একটি প্রোগ্রাম করা হয়েছে।
এই প্রযুক্তি প্রথমে নিরাপত্তার নামে আসবে। বলা হবে রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার জন্য, সন্ত্রাস দমনের জন্য, অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সুরক্ষার জন্য। কিন্তু খুব দ্রুতই সুরক্ষা ও হুমকির মাঝের সীমারেখা মুছে যাবে। যে প্রযুক্তি পাহারা দেয়, সেই প্রযুক্তিই একদিন বিচার করবে কে বাঁচবে, কে থাকবে না।
সবচেয়ে ভয়ংকর দিকটি হবে এই যে, হত্যাকারীকে আর আলাদা করে চেনা যাবে না। সে হবে ভিড়েরই একজন। মানুষের মুখ, মানুষের কণ্ঠ, মানুষের চলন। পার্থক্য থাকবে কেবল এক জায়গায় সে মানুষ নয়।
এই ভবিষ্যৎ হঠাৎ আসবে না। ধাপে ধাপে আসবে। প্রথমে সহকারী, পরে রক্ষী, তারপর সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী। আর এক সময় এমন এক বাস্তবতা তৈরি হবে যেখানে ক্ষমতাবানরা বুঝতেই পারবে না তাদের চারপাশে কে মানুষ, আর কে নিখুঁতভাবে মানুষের ছদ্মবেশে থাকা যন্ত্র।
এই ভবিষ্যৎ কোনো সাইন্স ফিকশন নয়। এটি একটি সতর্কতা। প্রশ্ন একটাই থাকবে মানুষ কি প্রযুক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করবে, নাকি প্রযুক্তিই মানুষের ভাগ্য লিখবে।
আর সেই প্রশ্নের উত্তর নির্ধারণ করবে আমরা আজ নৈতিকতা, জবাবদিহি এবং সীমারেখা কোথায় টানি।
এই ভয়াবহ পরিস্থিতির পরে কি মানব জাতির অস্তিত্ব টিকে থাকবে নাকি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যাবে? ঠিক তেমন একটি সন্ধিক্ষণে কী মনে হয়? মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব অতএব নতুন করে বাঁচার জন্য সেটাকে প্রমাণ করতে হবে। দুঃখের বিষয় আমরা কেউ সেই সময়টি উপভোগ করতে পারবো না কারণ আমরা সবাই অমানুষ হয়ে গেছি।
রহমান মৃধা, গবেষক ও লেখক, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন
rahman.mridha@gmail.com
মত দ্বিমত
২০২৬ সালের নির্বাচন: বাংলাদেশের নৈতিক পুনর্গঠন ও নাগরিকের চূড়ান্ত দায়িত্ব
বাংলাদেশ এখন এক গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় নির্বাচনের মুখে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু এই নির্বাচন কেবল ক্ষমতার পালাবদলের ঘটনা নয়। এটি রাষ্ট্র, নাগরিক এবং মানবতার পরীক্ষা, যেখানে নাগরিকই চূড়ান্ত নির্দেশক। যে রাষ্ট্র কথার সঙ্গে কাজ মিলিয়ে নাগরিককে সম্মান দেয়, সে রাষ্ট্র টিকে থাকে। যে রাষ্ট্র কথা বলে কিন্তু কাজ নয়, সে সমাজকে বিভ্রান্ত করে। এই পরীক্ষায় তিনটি দেশের পাঠ আমাদের শিক্ষা দেয়, সুইডেন, ভ্রুনাই এবং বাংলাদেশ।
সুইডেনের পাঠ স্পষ্ট। শক্তিশালী রাষ্ট্র মানে নৈতিক ও মানবিক প্রতিষ্ঠান। আইন সবার জন্য সমান, বিচার স্বাধীন, প্রশাসন ব্যক্তি নয়, নীতির অধীনে কাজ করে। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সামাজিক সুরক্ষা, সব নাগরিক অধিকার। কথার সঙ্গে কাজের মিল এত দৃঢ় যে নাগরিক ভয় পায় না, বরং বিশ্বাস পায়। উদাহরণস্বরূপ, সরকারি হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সবার জন্য উন্মুক্ত। দুর্নীতিমূলক ঘটনা ধরা পড়লেই প্রশাসন দ্রুত ব্যবস্থা নেয়। আদালত এবং পুলিশ প্রশাসনের স্বচ্ছ, স্বতন্ত্র ও নিরপেক্ষ ভূমিকা সুইডেনের নাগরিকদের আস্থা তৈরি করে। নাগরিকরা তাদের অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন, যা রাষ্ট্রকে স্থিতিশীল রাখে। গণতন্ত্রের শক্তি ব্যক্তির ওপর নয়, নৈতিক প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক বিশ্বাসের ওপর নির্ভর করে।
ভ্রুনাই দেখায়, গণতন্ত্র সীমিত হলেও নৈতিক দায়িত্ব ও মানবিকতা রাষ্ট্রকে স্থিতিশীল রাখে। সুলতানের শাসনে মৌলিক চাহিদা পূরণ, নিরাপত্তা, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং সংযম বজায় থাকে। মত প্রকাশ সীমিত হলেও নাগরিকের জীবন নিরাপদ থাকে। উদাহরণস্বরূপ, ভ্রুনাইতে সামাজিক নিরাপত্তা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কারণে জনগণ রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা রাখে। এটি শেখায়, স্বাধীনতা না থাকলেও রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা নির্ভর করে দায়িত্ববোধ এবং মানুষের মৌলিক নিরাপত্তার ওপর।
বাংলাদেশ আজ সেই পরীক্ষার মুখে। কথার সঙ্গে কাজের দূরত্ব ক্রমশ বাড়ছে। রাষ্ট্র বলে গণতন্ত্র, আইন ও মানবাধিকার, কিন্তু বাস্তবে আইন প্রয়োগ হয় পরিচয়ভিত্তিক, ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত, ভিন্নমত শাস্তিযোগ্য। নাগরিক প্রায়ই রাষ্ট্রের ভাড়াটে। কথার সঙ্গে কাজের এই অমিল সমাজে বিশ্বাসের সংকট, নৈতিক ও মানবিক অবক্ষয় বৃদ্ধি করছে। উন্নয়ন প্রকল্পের বড় বাজেট থাকলেও প্রান্তিক জনগণের জীবনমান অপরিবর্তিত। দুর্নীতি, ভোট চুরি, প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার, হত্যা এবং অপরাধ, এসব পরিস্থিতি সমাজে আতঙ্ক ও অসন্তোষ তৈরি করছে। উদাহরণস্বরূপ, একটি উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে সরকারিভাবে বরাদ্দকৃত ওষুধ প্রান্তিক মানুষের কাছে পৌঁছায় না। স্থানীয় প্রশাসন রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে সমস্যার সমাধান করে না।
এই সংকটময় পরিস্থিতিতে মানবিক, সাংস্কৃতিক ও সাহিত্যিক সংস্থা নাগরিকদের জন্য দিকনির্দেশক। এটি কোনো রাজনৈতিক দল নয়। এটি মানুষের নৈতিক চেতনা, বিবেক এবং সাংস্কৃতিক কণ্ঠ। সাহিত্য ও সংস্কৃতি রাষ্ট্রকে টেকসই রাখে। উদাহরণস্বরূপ, নাগরিক শিক্ষা আন্দোলন, কবিতা উৎসব, সাংস্কৃতিক কর্মশালা, এগুলো মানুষকে সচেতন করে এবং নৈতিকতার দিকনির্দেশনা দেয়। যখন রাষ্ট্র কথা বলে কিন্তু কাজ নয়, তখন এই কণ্ঠই সত্যের প্রতিফলন। নাটক, সাহিত্য বা স্থানীয় কবিতা পাঠের মাধ্যমে মানুষ নিজের অভিজ্ঞতা ও নৈতিক প্রশ্ন সামনে আনতে শেখে।
এক রাতেই পরিবর্তন সম্ভব নয়। সুইডেন বা ভ্রুনাইয়ের মতো দেশ অর্জন করতে হলে সময়, ধৈর্য এবং ধারাবাহিক সংস্কার দরকার। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রশাসন, বিচার ব্যবস্থা এবং সামাজিক নৈতিকতার পরিকাঠামো পরিবর্তন অপরিহার্য। প্রশাসনকে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও জবাবদিহিমূলক করতে আইন ও নীতির সংস্কার প্রয়োজন। নাগরিককেও আপোষহীন নৈতিকতা এবং মানবিক চেতনার সঙ্গে অংশগ্রহণ করতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, স্থানীয় নির্বাচনের পরও নাগরিকদের সভা, গণমাধ্যম নজরদারি এবং প্রতিবাদ সক্রিয় রাখতে হবে।
২০২৬ সালের নির্বাচন বাংলাদেশের জন্য শেষ সুযোগ, রাষ্ট্রকে নৈতিকভাবে পুনর্গঠন করার, নাগরিককে মালিক বানানোর, উন্নয়নকে মানবিকভাবে বাস্তবায়নের।
নাগরিকের জন্য পাঁচটি দিক নির্দেশনা
১. ভয় নয়, বিবেক দিয়ে ভোট দিন। শুধু পারিবারিক বা রাজনৈতিক চাপের জন্য নয়, নিজের বিশ্লেষণ, অভিজ্ঞতা এবং তথ্য অনুযায়ী ভোট দিন।
২. ব্যক্তি নয়, নীতি দেখুন। নেতা বা দলের প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তব অর্জন বিচার করুন।
৩. মিথ্যাকে স্বাভাবিক ভাববেন না। রাষ্ট্রের ভাষা মিথ্যায় ভরা হলে সমাজের নৈতিকতা ক্ষয় হয়। সংবাদপত্র, সামাজিক মাধ্যম ও স্থানীয় সভার মাধ্যমে তথ্য যাচাই করুন।
৪. ঘৃণার রাজনীতি প্রত্যাখ্যান করুন। ভিন্নমতকে শত্রু ভাবা গণতন্ত্রকে ধ্বংস করে। সংলাপ, যৌক্তিক বিতর্ক এবং শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ নিশ্চিত করুন।
৫. ভোটের পরও দায়িত্ব নিন। প্রশ্ন করা, দাবি তোলা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাই রাষ্ট্রকে নৈতিক রাখে। স্থানীয় সভা, সামাজিক উদ্যোগ ও গণমাধ্যমের অংশীদারিত্ব বৃদ্ধি করুন।
স্মরণ করুন, রাষ্ট্র বন্দুক বা ক্ষমতা দিয়ে টিকে থাকে না। রাষ্ট্র টিকে থাকে মানুষের বিশ্বাস, নৈতিকতা ও মানবিকতার কারণে।
সুইডেন দেখায়, নৈতিক প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রকে বিশ্বাসযোগ্য করে।
ভ্রুনাই দেখায়, দায়িত্ববোধ রাষ্ট্রকে স্থিতিশীল রাখে।
বাংলাদেশ শেখায়, নৈতিকতা হারালে উন্নয়ন অর্থহীন।
নাগরিকের দায়িত্ব হলো মানুষ হয়ে কথা বলা। আমাদের সাহিত্য, সংস্কৃতি এবং মানবিক চেতনা রাষ্ট্রকে শক্তিশালী রাখে। রাজনীতি কেবল ক্ষমতার লড়াই নয়, এটি নৈতিকতা ও মানবতার পরীক্ষা। বাংলাদেশ যদি এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়, রাষ্ট্র স্থিতিশীল, মানবিক এবং বিশ্বাসযোগ্য হবে।
২০২৬ সালের নির্বাচন রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্কের এক যুগোপযোগী পরীক্ষা। এটি কোনো দলের নয়, এটি প্রতিটি নাগরিকের। এখনই সময় মানুষ হয়ে কথা বলার, নৈতিক ও মানবিক চেতনার প্রতি দায়িত্ব স্মরণ করার।
রহমান মৃধা, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন। rahman.mridha@gmail.com



