অন্যান্য
রাষ্ট্রকে পরিবারের মতো গড়ে তোলার স্বপ্ন ও বাস্তবতার দ্বন্দ্ব
শুরুতেই আমাদের স্বীকার করতে হবে যে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাস এক গভীর ট্রাজেডির মতো উন্মোচিত হয়েছে। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ডেথসেন্টেন্স ঘোষণার মতো একটি ভয়াবহ সিদ্ধান্ত দেশে ন্যায়বিচারের ভবিষ্যৎ নিয়ে যে গভীর প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছে তার উত্তর আজও কেউ দিতে পারেনি। সমস্যার শেকড় কোথায় ছিল এবং কোন পর্যায়ে তার সমাধান হওয়া উচিত ছিল সে প্রশ্নেরও কোনো সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা আমরা পাইনি। রাতের অন্ধকারে এখনো ডিবি পুলিশের লোকেরা নিরপরাধ মানুষকে তুলে নিয়ে যাচ্ছে। যাদের ধরার কথা তারা বাইরে দিব্যি দিনের আলোতে সন্ত্রাস করছে, চাঁদাবাজি করছে, দুর্নীতি করছে। আর অন্যদিকে সত্য কথা বলার ন্যূনতম সাহস যারা সঞ্চয় করছে তাদের ধরে ধরে কারাগারে ঢোকানো হচ্ছে। মানুষের কিছুটা কথা বলার সুযোগ এসেছে ঠিকই, কিন্তু দ্বিমত পোষণের পূর্ণ স্বাধীনতা এখনো বাস্তবে রূপ নেয়নি। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখনো রয়ে গেছে, এই স্বাধীনতা বাস্তবায়ন করবে কে এবং কখন। একটি রাষ্ট্র তখনই বদলায় যখন ক্ষমতার কাঠামো বদলায়, আর ক্ষমতার কাঠামো বদলায় তখনই যখন মানুষের ইচ্ছাশক্তি এবং রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারকের সাহস সত্যিকার পরিবর্তনের পথে অগ্রসর হয়।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার আগে ঢাকা বিমানবন্দরে নেমেই ড. মুহাম্মদ ইউনূস বক্তব্য দিয়েছিলেন। তার ঘোষণা, আমাদের স্বপ্নের বাংলাদেশ রাষ্ট্রটি হবে একটি পরিবারের মতো। বাংলাদেশের রাষ্ট্রকাঠামো নিয়ে তার এ পরিবারতত্ত্বটি গুরুত্বপূর্ণ ভাবনার বহিঃপ্রকাশ যা জাতীয় ঐক্য, সংহতি ও সম্প্রীতি আরো বলবৎ করতে মাইক্রোলেভেলে গভীর মনোযোগের দাবি রাখে। এ বক্তব্যের মাধ্যমে রাষ্ট্রের কাঠামো ও ব্যবস্থাপনার প্রতি তার এক মানবিক ও সহযোগিতাপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি উঠে এসেছে। কিন্তু বাংলাদেশে পরিবারকেন্দ্রিক দলীয় রাজনীতি ও বিদ্যমান পরিবারতন্ত্র এবং ক্ষমতার ব্যক্তিকেন্দ্রীকরণের বাস্তবতায় এ তত্ত্ব কতটা কার্যকর হতে পারে, তা এখনও প্রশ্নবিদ্ধ।
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের রাষ্ট্রকে পরিবার হিসেবে দেখার মনোবৃত্তি সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে নতুন কিছু নয়। রাষ্ট্র ও সমাজের সম্পর্ক সবসময়ই সমাজতত্ত্বের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। প্রাচীন নগর রাষ্ট্রকে পরিবারের সঙ্গে তুলনা করার তত্ত্ব বিদ্যমান ছিল, এবং তা নগরায়ণ ও নাগরিক দায়বদ্ধতায় গভীরভাবে প্রোথিত ছিল। প্লেটো ও অ্যারিস্টটল থেকে শুরু করে আধুনিক সমাজতত্ত্ববিদরাও রাষ্ট্র ও পরিবারের মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে নানা ভাবনা প্রকাশ করেছেন। প্লেটো তার ‘রিপাবলিক’ গ্রন্থে রাষ্ট্রকে একটি বৃহত্তর পরিবারের মতো কল্পনা করেছিলেন, যেখানে সব নাগরিকের সমান অধিকার ও দায়িত্ব থাকবে। প্রতীকী অর্থে ড. ইউনূসের তত্ত্বে রাষ্ট্রের লক্ষ্য হবে সবাইকে নিয়ে মিলেমিশে কাজ করা এবং সম্মিলিতভাবে মানুষের কল্যাণ নিশ্চিত করা। একটি আদর্শ পরিবার যেমন সদস্যদের সব প্রয়োজন মেটায় এবং তাদের বিকাশের সুযোগ দেয়, রাষ্ট্রকেও প্রকৃত অর্থে তেমন হতে হবে।
পরিবারের মৌলিক উপাদান হলো ভালোবাসা, সহমর্মিতা এবং একত্রে কাজ করার মনোভাব। বাস্তবে দুনিয়ার কোনো দেশেই সব পরিবারে সব সময় এ নীতিগুলোর প্রতিফলন দেখা যায় না। স্বজনপ্রীতি, পক্ষপাত, বৈষম্য এবং ক্ষমতার অপব্যবহারও দেখা যায়। যখন এসব রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় প্রতিফলিত হয়, তখন তা পরিবারতন্ত্র বা গোষ্ঠীতন্ত্রের ছত্রছায়ায় পরিণত হয়। রাষ্ট্রীয় শক্তি নির্দিষ্ট কিছু পরিবার বা একটি ছোট গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়ে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন ও উপমহাদেশে জমিদার প্রথা ও সামন্ততান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা এই কেন্দ্রীয়করণের বীজ বপন করেছিল। পরবর্তী সময়ে রাজনীতি, অর্থনীতি ও সামাজিক ব্যবস্থায় পরিবারকেন্দ্রিক শাসন ও প্রভাব আরো দৃঢ় হয়ে উঠেছে। ফলে রাষ্ট্রকাঠামোসহ জনজীবনের সর্বস্তরে পরিবারতন্ত্র সুশাসন এবং ন্যায়বিচারের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাষ্ট্রীয় পরিসরে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় পরিবারতন্ত্রের নেতিবাচক প্রভাব অত্যন্ত সুস্পষ্ট। রাজনৈতিক দলগুলোতে নেতৃত্ব প্রায়ই উত্তরাধিকারের মাধ্যমে নির্ধারিত হয়, যা নতুন নেতৃত্বের বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। কিছু পরিবার অর্থনীতিতে আধিপত্য বিস্তার করে, তাদের অনুগতরা সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলে। ফলে সমাজে ধনী ও দরিদ্রের ব্যবধান ক্রমেই বাড়ছে। সামাজিক প্রতিপত্তি ও পারিবারিক সম্পর্ক কখনো কখনো সুযোগ এবং বৈষম্য উভয়ই তৈরি করে।
ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী পিয়েরে বুর্দো যেমন বলেছিলেন, সমাজে কিছু গোষ্ঠী প্রতীকী পুঁজির মাধ্যমে ক্ষমতা ধরে রাখে। বাংলাদেশে রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের পরিবারগুলোও এই প্রতীকী পুঁজির মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছে। মুজিব ও জিয়ার উত্তরাধিকার নতুন নেতৃত্ব বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করেছে। পরিবারতন্ত্রের কারণে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামোয় ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ হয়েছে, যা নাগরিকদের জন্য বৈষম্যমূলক সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পরিবেশ তৈরি করেছে। দলীয় কর্মীরা পারিবারিক আনুগত্য দেখাতে বাধ্য হন, যা গণতান্ত্রিক চর্চাকে ব্যাহত করে। পরিবারতন্ত্র কেবল রাজনীতি নয়, সামাজিক মনস্তত্ত্বের অংশও হয়ে উঠেছে।
যদি আমরা রাষ্ট্রকে পরিবারের মতো পরিচালনা করতে চাই, প্রথমে পরিবারতন্ত্রের সীমাবদ্ধতা ও নেতিবাচক প্রভাব কাটিয়ে উঠতে হবে। রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে ক্ষমতার সমতা নিশ্চিত করতে হবে। বর্তমান বাস্তবতায় রাষ্ট্রকে একটি আদর্শ পরিবার হিসেবে কল্পনা করা হলে দেখা যায় পরিবারের অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলোই প্রধান বাধা। সেসব সমস্যার সমাধান না করে বৃহত্তম পরিবার হিসেবে রাষ্ট্র বিনির্মাণের স্বপ্ন দেখা অকার্যকর।
এই কঠিন বাস্তবতার মধ্যেও আমাদের সামনে একটি পথ খোলা রয়েছে। পরিবারতন্ত্র, পক্ষপাত এবং ক্ষমতার একচেটিয়াভাব রাষ্ট্রকে যে অস্থিতিশীলতা এবং অবিশ্বাসের দিকে ঠেলে দিয়েছে তা কাটিয়ে উঠতে হলে আমাদের প্রথম কাজ হলো শাসনের ভিত্তিকে মানবিকতা, ন্যায়বিচার এবং সমতার ওপর প্রতিষ্ঠা করা। রাষ্ট্র এক পরিবারের মতো হবে এমন ধারণা তখনই বাস্তব রূপ পাবে যখন সেই পরিবারের ভিতর থাকবে কোনো ধরনের শোষণহীন সম্পর্ক। অর্থাৎ ক্ষমতা শুধু কিছু পরিবারের হাতে কেন্দ্রীভূত থাকবে না বরং এমন একটি কাঠামো গড়ে উঠবে যেখানে নেতৃত্ব নির্ভর করবে যোগ্যতা, সততা এবং জনস্বার্থের ওপর।
ভবিষ্যতের পথরেখা এখনই তৈরি করা সম্ভব। রাজনৈতিক দলগুলোর নেতৃত্ব নির্বাচনে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া বাধ্যতামূলক করা, জাতীয় এবং স্থানীয় পর্যায়ে তরুণ নেতৃত্বের জন্য আলাদা প্রশিক্ষণ ও নেতৃত্ব বিকাশ কর্মসূচি চালু করা, প্রশাসনিক ব্যবস্থায় স্বাধীন পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং সরকারি ও সামাজিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে নাগরিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রকে নতুন ভিত্তি দিতে পারে। শিক্ষা ব্যবস্থায় মানবিক মূল্যবোধ, যুক্তিবাদ, গণতান্ত্রিক নৈতিকতা এবং ন্যায়বিচার সম্পর্কিত পাঠ বাধ্যতামূলক করলে এমন একটি প্রজন্ম তৈরি হবে যারা পরিবারতন্ত্রের শৃঙ্খল ভেঙে রাষ্ট্রকে মানবিক ভিত্তিতে দাঁড় করাতে পারবে।
তবুও সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো মানুষের ভেতরে হারিয়ে যাওয়া বিশ্বাসকে পুনরুদ্ধার করা। আমরা যদি এখনই সাহসী সিদ্ধান্ত নিতে পারি তবে আগামী দশ বছরেই বাংলাদেশের পুনর্গঠনের ভিত্তি স্থাপন হবে। এমন একটি রাষ্ট্র তৈরি হবে যেখানে আর কোনো পুলিশি ভয় থাকবে না, কোনো নিরপরাধ মানুষ অন্ধকারে তুলে নেওয়া হবে না, কোনো পরিবার দেশের ভবিষ্যৎকে বন্দী করতে পারবে না। সেই রাষ্ট্রে অধিকার হবে সবার, সুযোগ হবে সবার এবং দায়িত্ব হবে সমষ্টিগত। তখন রাষ্ট্র সত্যিই একটি পরিবারের মতো হয়ে উঠবে, কিন্তু সেই পরিবার হবে আলোকিত, ন্যায়নিষ্ঠ, মানবিক এবং কল্যাণকেন্দ্রিক।
আমরা যদি আজ সেই পথে হাঁটা শুরু করি তাহলে ইতিহাস সাক্ষ্য দেবে যে এই অন্ধকার সময় থেকেই বাংলাদেশের নতুন সূচনা হয়েছিল।
রহমান মৃধা, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন। rahman.mridha@gmail.com
অন্যান্য
নজরুলের সেকাল-হাদির একাল, জাতির পরকাল
ঢাকার কেন্দ্রেই কাজী নজরুল ইসলামের কবর। বিদ্রোহী কবি, যিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে নীরবতাকেও অপরাধ বলে চিহ্নিত করেছিলেন। তাঁর কবরের পাশেই আজ শুয়ে আছেন ওসমান হাদি। ন্যায়ের পক্ষে নির্ভীক এক নাগরিক কণ্ঠ, যিনি জীবন দিয়ে প্রমাণ করেছিলেন যে সত্য বলা এখনো বিপজ্জনক।
এই দুটি কবর পাশাপাশি থাকা কেবল ভৌগোলিক ঘটনা নয়। এটি আমাদের সময়ের এক গভীর নৈতিক প্রতীক। যেন নজরুলের অগ্নিবাণী ইতিহাস পেরিয়ে এসে ওসমান হাদির নীরব সমাধির মাধ্যমে আজও প্রশ্ন ছুঁড়ে দিচ্ছে আমরা কোথায় দাঁড়িয়ে আছি।
নজরুলের কবরের পাশে এক নীরব প্রশ্ন।
আজকের বাংলাদেশ এক গভীর নৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দুর্নীতি আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলোর শিরায় শিরায় ঢুকে পড়েছে। দলীয় রাজনীতি ন্যায়ের বোধকে গ্রাস করেছে। মতভিন্নতা শত্রুতায় রূপ নিয়েছে। অন্যের প্রতি সম্মান যেন ক্রমেই অপ্রয়োজনীয় হয়ে উঠছে। এই অবস্থায় সবচেয়ে ভয়ংকর ক্ষতি অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিকও নয়। সবচেয়ে ভয়ংকর ক্ষতি হলো নৈতিক আত্মসমালোচনার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলা।
এমন সময়ে কুরআনের একটি ছোট কিন্তু গভীর দোয়া আমাদের সামনে আয়নার মতো দাঁড়ায়। রব্বানা’গফির লি ওয়া লিওয়ালিদাইয়া ওয়া লিল মু’মিনীনা ইয়াওমা ইয়াকূমুল হিসাব।
এই দোয়ায় প্রথমেই বলা হয় হে আমাদের পালনকর্তা, আমাকে ক্ষমা করো, আমার পিতামাতাকে ক্ষমা করো, এবং সমস্ত মুমিনদের সেই দিনে ক্ষমা করো যখন হিসাব নেওয়া হবে।
অন্যকে, দোষারোপ করার আগে নিজেকে প্রশ্ন করার এই সাহসটুকুই আজ আমাদের সমাজে সবচেয়ে বেশি অনুপস্থিত। আমরা সবাই যেন অন্যের ভুল গুনতে ব্যস্ত, কিন্তু নিজের দায় স্বীকার করতে অনীহা।
রবীন্দ্রনাথ বহু আগেই সতর্ক করেছিলেন যে নিজের চোখে ধুলো দেয়, সে অন্যের চোখে আলো দেখতে পায় না।
রাষ্ট্র যখন নিজের চোখে ধুলো দেয়, তখন অন্যায় ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে ওঠে।
এরপর আসে বাবা মায়ের কথা। নৈতিক উত্তরাধিকার, কৃতজ্ঞতা এবং মানবিক মূল্যবোধের প্রতীক। বাবা মায়ের প্রতি সম্মান মানে কেবল পারিবারিক কর্তব্য নয়। এর অর্থ শিক্ষক, প্রবীণ, ভিন্নমতাবলম্বী এবং সর্বোপরি মানুষের জীবনের প্রতি সম্মান। আজকের বাংলাদেশে এই সম্মানের ভাঙন স্পষ্ট। আর যেখানে সম্মান থাকে না, সেখানে সহিংসতা ঢুকতে বেশি সময় লাগে না।
নজরুলের সময়েও অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলা নিষেধ ছিল। ব্রিটিশ শাসনের চোখে বিদ্রোহ ছিল অপরাধ। কবিতা ছিল ভয়। কলম ছিল হুমকি। নজরুল জেল খেটেছেন, তাঁর লেখা বন্ধ করা হয়েছে, তাঁর কণ্ঠ রোধ করার চেষ্টা হয়েছে। তবু তিনি চুপ করেননি। কারণ তিনি জানতেন চুপ থাকাই সবচেয়ে বড় অপরাধ।
ওসমান হাদির সময়েও সেই নিষেধাজ্ঞা রয়ে গেছে। শাসনের রং বদলেছে, ভাষা বদলেছে, কিন্তু ভয় দেখানোর চরিত্র বদলায়নি। এখন আর কবিকে জেলে নেওয়া হয় না। এখন সত্য বলা নাগরিককে একা করে দেওয়া হয়। ভয় দেখানো হয়। একসময় তাকে সরিয়ে দেওয়া হয়।
ওসমান হাদির নির্মম হত্যা এই ভাঙনেরই ফল। তিনি কোনো দলের মুখপাত্র ছিলেন না। ছিলেন না ক্ষমতার অংশ। তিনি ছিলেন ন্যায়ের পক্ষে সবার জন্য কথা বলা এক অবিচল কণ্ঠ। তাঁকে হত্যা করা মানে কেবল একজন মানুষকে হত্যা করা নয়। এটি ছিল সত্য বলার সাহসকে হত্যা করা।
আরও বেদনাদায়ক সত্য হলো আজ পর্যন্ত তাঁর হত্যাকারীরা এবং হত্যার নেপথ্যের পরিকল্পনাকারীরা আইনের মুখোমুখি হয়নি। এই বিচারহীনতা কেবল রাষ্ট্রের ব্যর্থতা নয়। এটি আমাদের সমষ্টিগত নীরবতার ফল।
এখানেই নজরুলের সেই অমোঘ উচ্চারণ নতুন করে ধ্বনিত হয়। অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে, তব ঘৃণা যেন তারে তৃণসম দহে।
এই পংক্তির তাৎপর্য আজ আরও গভীর। কারণ ন্যায়ের পক্ষে নিহত ওসমান হাদি চিরনিদ্রায় শায়িত রয়েছেন নজরুলের কবরের পাশেই। যেন বিদ্রোহী কবির উত্তরাধিকার নীরবে এক নাগরিকের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে।
হাদির হত্যা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি দীর্ঘদিন ধরে তৈরি হওয়া এক নীরব নাটকের পরিণতি। যেখানে সত্য বলা ধীরে ধীরে অপরাধে পরিণত হয়। আর অন্যায়ের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়াই নিরাপদ জীবন হিসেবে শেখানো হয়।
আজ সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো হাদি নেই, কিন্তু তাঁর হত্যার বিচার নেই। এই বিচারহীনতাই বলে দেয় অন্যায় থেমে নেই। অন্যায় তার নিজের গতিতে চলছে। অন্যায়ের মৃত্যু নেই। মৃত্যু আছে কেবল প্রতিবাদের।
এই কারণেই নজরুল ঘুমিয়ে আছেন শান্ত হয়ে। তিনি জানতেন তাঁর বিদ্রোহ শেষ কথা নয়। তার পাশে আজ ঘুমিয়ে আছেন হাদি। কবি নন, রাজনীতিক নন, একজন সাধারণ মানুষ, যিনি অন্যায়ের সামনে মাথা নত করেননি।
এই পাশাপাশি শুয়ে থাকা আমাদের জন্য কোনো গৌরব নয়। এটি আমাদের ব্যর্থতার স্মারক। আমরা প্রতিবাদীদের কবর দিতে শিখেছি, কিন্তু তাদের দাবিকে বাঁচিয়ে রাখতে পারিনি।
এই প্রশ্নের উত্তর কেবল স্মরণে থাকলে চলবে না। কারণ স্মরণ জাতিকে বদলায় না, বদলায় দায়িত্ববোধ। জাতির মাইন্ডসেট বদলাতে হলে প্রথমেই ভাঙতে হবে বিচারহীনতার নিশ্চিন্ত সংস্কৃতি। মানুষ তখনই অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, যখন সে জানে অন্যায় করলে রেহাই নেই।
রাষ্ট্রের পরিকাঠামো নতুন করে গড়ার অর্থ নতুন ভবন বা নতুন নাম নয়। এর অর্থ এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে একজন সাধারণ নাগরিকের জীবন রাষ্ট্রের কাছে ক্ষমতাবানের চেয়েও কম মূল্যবান হবে না। যেখানে হত্যা মানে শুধু একটি ফাইল নয়, বরং রাষ্ট্রের জন্য একটি অস্বস্তিকর ব্যর্থতা।
জবাবদিহিতা তখনই বাস্তব হয়, যখন ক্ষমতা জানে প্রশ্ন আসবেই। তদন্ত থামানো যাবে না, বিচার ঝুলিয়ে রাখা যাবে না, আর নীরবতাকে স্বাভাবিক আচরণ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যাবে না। আইন যদি দুর্বল হয়, তবে তা ইচ্ছাকৃত দুর্বলতা। সেই দুর্বলতা দূর না করলে অন্যায় থামে না, শুধু পদ্ধতি বদলায়।
ওসমান হাদির হত্যার বিচার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত আমরা যত কথাই বলি, তা নৈতিক উচ্চারণের বাইরে যায় না। বিচারই হলো সেই জায়গা, যেখানে রাষ্ট্র প্রমাণ করে সে কোন পক্ষে দাঁড়িয়ে আছে। ন্যায়ের পক্ষে, না সুবিধার পক্ষে।
নজরুল অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলেছিলেন, যখন কথা বলা নিষিদ্ধ ছিল। হাদি কথা বলেছিলেন, যখন কথা বলা বিপজ্জনক ছিল। দুজনই প্রমাণ করেছেন সময় বদলায়, কিন্তু অন্যায় বদলায় না যদি তাকে থামানো না হয়।
নজরুল ঘুমিয়ে আছেন শান্ত। তার পাশে হাদিও ঘুমিয়ে আছেন। এখন আর প্রশ্ন নয়, এখন পরীক্ষা। এই জাতি কি শুধু তাদের কবরকে সম্মান করবে। নাকি তাদের অসমাপ্ত দায়িত্বটুকু নিজের কাঁধে নেবে।
রহমান মৃধা, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন। rahman.mridha@gmail.com
অন্যান্য
‘আমার পে’ গেটওয়ে ব্যবহার করে অবৈধ লেনদেন-অর্থপাচার
অবৈধ অনলাইন জুয়ার লেনদেন প্রতিরোধে বাংলাদেশ ব্যাংকের কঠোর নির্দেশনা ও সতর্কতা জারি করার পরেও তা বন্ধ হচ্ছে না। দেশি পেমেন্ট গেটওয়েগুলো ব্যবহার করে অবৈধ পর্ন ও জুয়ার অ্যাপ গুলোতে অর্থ লেনদেন ও বিদেশে অর্থ পাচার হচ্ছে। এরমধ্যে অন্যতম একদিন অনলাইন পেমেন্ট গেটওয়ে ‘আমার পে’। সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানটির গেটওয়ে ব্যবহার করে অবৈধ লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে।
সূত্র জানায়, জুয়া ও বিভিন্ন ডেটিং অ্যাপসের মাধ্যেমে অনলাইনে অবৈধ লেনদেন হয়। এজন্য ব্যবহার করা হয় দেশি গেটওয়ে। সম্প্রতি অনলাইন ডেটিং অ্যাপস ও পর্নোগ্রাফির অবৈধ লেনদেন করা হয় ‘আমার পে’ গেটওয়ের মাধ্যেমে। অবৈধ অনলাইন জুয়া ও পর্নোগ্রাফির লেনদেন প্রতিরোধে বাংলাদেশ ব্যাংকের কঠোর নির্দেশ থাকা শর্তেও এ গেটওয়ে ব্যবহার করে লেনদেন ও পাচার হচ্ছে দেশের অর্থ। তবে পেমেন্ট গেটওয়ে প্রতিষ্ঠানটির দাবি এসব অ্যাপস তাদের মাধ্যমে শুধুই লেনদেন করে এর বেশি কি জানে না।
এবিষয়ে জানতে বুধবার (১৭ ডিসেম্বর) রাতে অর্থসংবাদ থেকে ‘আমার পে’র এমডি এ.এম. ইশতিয়াক সারোয়ারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এবিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
জানা গেছে, ডেটিং অ্যাপসের নামে অবৈধ পর্নোগ্রাফি অনুসন্ধানে নামে একটি মিডিয়া টিম। অনুসন্ধানে উঠে আসে ডেটিং অ্যাপসের নামে পর্নোগ্রাফি ও অবৈধ লেনেদেন। এসব অ্যাপসের লেনদেন হয়ে থাকে দেশি পেমেন্ট গেটওয়ে সফট টেক ইনোভেশন ‘আমার পে’র মাধ্যমে। এ গেটওয়ে ব্যবহার করে অবৈধ কাজের সঙ্গে জড়িত এসব অ্যাপেস সহজেই লেনদেন সম্পন্ন করছে। যা বেআইনি ও অবৈধ।
তবে সফট টেক ইনোভেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) এ.এম. ইশতিয়াক সারোয়ার ডেটিং অ্যাপসের কথা অস্বীকার করেন। তিনি জানান, লেনদেন তাদের প্রতিষ্ঠান থেকে হলেও ডেটিং অ্যাপসের সঙ্গে তাদের প্রতিষ্ঠানের কোনো সম্পর্ক নেই। কোনো মার্চেন্ট এমনটা করতে পারে।
পর্নোগ্রাফি ও জুয়ার মতো অবৈধ কাজের সঙ্গে জড়িত অ্যাপসকে কেনো তার পেমেন্ট গেটওয়ে ব্যবহারের সুযোগ দিয়েছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমার কোনো মার্চেন্ট যদি এমন সার্ভিস দিয়ে থাকে তাহলে সেখানে আমার কিছু করার নেই। আমার কোন মার্চেন্ট এমন কাজে জড়িত সেটা আমি জানি না, এটা দেখে বলতে পারবো।
এবিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বিশেষজ্ঞরা। মতামত তাদের, দেশি এসব পেমেন্ট গেটওয়েগুলোকে জবাবদিহিতার আওতায় এনে এই চক্র শনাক্ত ও অর্থপাচার বন্ধ করা সম্ভব।
এসএম
অন্যান্য
সড়ক ছাড়লেন জুলাই ঐক্যের কর্মীরা
মার্চ টু ইন্ডিয়ান দূতাবাস কর্মসূচির অংশ হিসেবে মধ্যবাড্ডার সড়কে অবস্থান নেওয়া চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের স্পিরিট ধারণ করা ঐক্যবদ্ধ মোর্চা ‘জুলাই ঐক্যে’র নেতাকর্মীরা সংক্ষিপ্ত সমাবেশ শেষে সড়ক ছেড়ে দিলে এলাকায় যান চলাচল স্বাভাবিক হয়ে আসে।
বুধবার (১৭ ডিসেম্বর) বিকাল পৌনে ৫টার দিকে আন্দোলনকারীরা সরে গেলে মধ্যবাড্ডা সড়কে প্রায় এক ঘণ্টা ধরে বন্ধ থাকা যান চলাচল আবার শুরু হয়। এর আগে কর্মসূচির কারণে ওই সড়কে সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
প্রসঙ্গত, বিকাল সাড়ে ৩টার দিকে রামপুরা ব্রিজ এলাকা থেকে ভারতীয় দূতাবাস অভিমুখে যাত্রা শুরু করেন ‘জুলাই ঐক্যে’র নেতাকর্মীরা। তবে পথে হোসেন মার্কেটের বিপরীত পাশে পুলিশি ব্যারিকেডের মুখে পড়লে তারা আর সামনে অগ্রসর হতে পারেননি।
এ সময় কোনও আন্দোলনকারীরা সড়কে বসে পড়েন এবং সেখানেই শান্তিপূর্ণভাবে সংক্ষিপ্ত সমাবেশ করেন। ব্যারিকেডের ওপর দাঁড়িয়ে বক্তব্যে জুলাই ঐক্যের নেতারা সীমান্তে হত্যা বন্ধ, বাংলাদেশবিরোধী ষড়যন্ত্র রোধ এবং ভারত থেকে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের দেশে ফেরানোর দাবি জানান।
অন্যান্য
অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের আশাব্যঞ্জক লক্ষণ দেখা দিয়েছে: জিইডি
২০২৫ অর্থবছরের শেষ ছয় মাসে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে পুনরুদ্ধারের আশাব্যঞ্জক লক্ষণ দেখা গেছে।
পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগে (জিইডি) প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ স্টেট অব দ্য ইকোনমি ২০২৫’ প্রতিবেদনে এ তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে সোমবার (৮ ডিসেম্বর) আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বিভিন্ন পূর্বাভাসে প্রবৃদ্ধি শ্লথ হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করা হলেও বর্তমানে প্রধান সূচকগুলো ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধারের দিকেই ইঙ্গিত করছে।
জিইডির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি আগের বছরের তুলনায় কম থাকবে বলে বড় উন্নয়ন সহযোগীরা ধারণা করছে।
বিশ্বব্যাংক ৩.৩ শতাংশ থেকে ৪.১ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছে, আর এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) পূর্বাভাস দিয়েছে ৩.৯ শতাংশ। তবে ২০২৬ অর্থবছরে অর্থনীতি গতি সঞ্চার করবে এবং প্রবৃদ্ধি ৫.১ শতাংশ থেকে ৫.৩ শতাংশে উন্নীত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রতিবেদনটিতে বাংলাদেশের বহিঃখাতের উল্লেখযোগ্য স্থিতিশীলতার কথা বলা হয়েছে। শক্তিশালী রেমিট্যান্স প্রবাহ, আমদানি স্থিতিশীলতা এবং মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির পুনরুদ্ধার অভ্যন্তরীণ চাহিদা বৃদ্ধির পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
রপ্তানি আয়ও শক্তিশালী রয়েছে, যা তৈরি পোশাক (আরএমজি) খাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধি, নীতি মেনে চলা এবং বাজার বহুমুখীকরণের মাধ্যমে সম্ভব হয়েছে।
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ তিন মাসের বেশি আমদানি ব্যয় মেটাতে সক্ষম অবস্থায় স্থিতিশীল রয়েছে, যা বিচক্ষণ সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার প্রতিফলন।
প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) দুই বিভাগে ভাগ করার সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে এনবিআর কর্মকর্তাদের কর্মবিরতির কারণে জুন মাসে রাজস্ব সংগ্রহ মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয়। পরে কর্মসূচি প্রত্যাহারের ফলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয় এবং রাজস্ব আদায় পুনরায় শুরু হয়।
জিইডি জোর দিয়ে বলেছে, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার এবং আর্থিক খাত স্থিতিশীল করা ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর জন্য অপরিহার্য। যদিও অনেক পূর্বাভাস পুনরুদ্ধারের ইঙ্গিত দিচ্ছে, তবে প্রবৃদ্ধি কতটা কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দারিদ্র্য হ্রাস এবং জীবনমান উন্নয়নে রূপান্তরিত হবে তা কার্যকর নীতি, শক্তিশালী আর্থিক খাতের শাসন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন কৌশলের ওপর নির্ভর করবে।
প্রতিবেদনটিতে দুর্বল বেসরকারি বিনিয়োগ ও শিল্প কার্যক্রমকে প্রবৃদ্ধির বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বিপরীতে, রেমিট্যান্স প্রবাহ, রপ্তানি কার্যকারিতা এবং উৎপাদন খাতের আউটপুট-বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্প-প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকা শক্তি হিসেবে কাজ করছে ও ২০২৬ অর্থবছরেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তবে বাংলাদেশকে সীমিত রিজার্ভ, বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকট, ক্রেতাদের পরিবর্তিত পছন্দ এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য উত্তেজনা ও ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে।
প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়, বাংলাদেশ এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। বৃহৎ ও ক্রমবর্ধমান শ্রমবাজারের চাহিদা মোকাবিলা, উৎপাদনশীলতা বাড়ানো-বিশেষত পোশাক ও এসএমই খাতে রেমিট্যান্স বৃদ্ধি এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে বিনিয়োগকে জাতীয় অগ্রাধিকার দিতে হবে।
উদীয়মান দুর্বলতাগুলো- বিশেষ করে মূল্যস্ফীতি, আর্থিক খাতের অস্থিরতা, দুর্বল বিনিয়োগ পরিবেশ, সুশাসন সংকট এবং বৈদেশিক ঝুঁকি সমাধান করতে ব্যর্থ হলে প্রবৃদ্ধি মন্থর হতে পারে, জীবনমান খারাপ হতে পারে, দারিদ্র্য বাড়তে পারে এবং বৈষম্য দেখা দিতে পারে।
অন্যদিকে, সময়োপযোগী ও সমন্বিত নীতি সংস্কার, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান এবং স্পষ্ট নীতিগত বার্তা প্রদান নিশ্চিত করতে পারলে বাংলাদেশ পুনরায় গতি ফিরে পাবে এবং আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি অর্জনের সুযোগ তৈরি হবে।
জিইডি উপসংহারে বলেছে, কাঠামোগত সংস্কার ও উদ্ভাবন-নির্ভর অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি দ্বারা সমর্থিত একটি সুপরিকল্পিত জাতীয় টেকসই উন্নয়ন কৌশল ভবিষ্যৎ উন্নয়ন পরিকল্পনাকে পরিচালিত করবে, যা স্থিতিস্থাপকতা ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক শক্তি বাড়াবে।
অন্যান্য
বেগম রোকেয়া নারী সমাজকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে নিয়ে এসেছিলেন: প্রধান উপদেষ্টা
প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, নারীমুক্তি ও মানবাধিকার নিয়ে ব্যাপক সামাজিক আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে নারী সমাজকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে নিয়ে এসেছিলেন বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন।
মঙ্গলবার (৯ ডিসেম্বর) বেগম রোকেয়া দিবস উপলক্ষে দেওয়া বাণীতে তিনি বলেন, প্রতি বছরের মতো এবারও ৯ ডিসেম্বর দেশে নারী শিক্ষার অগ্রদূত বেগম রোকেয়া স্মরণে বেগম রোকেয়া দিবস উদযাপিত হচ্ছে জেনে আমি আনন্দিত।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, এই অঞ্চলের নারী সমাজকে যথাযোগ্য মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করার প্রয়াসে বেগম রোকেয়ার অসামান্য অবদান জাতি চিরদিন শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে। আজ বেগম রোকেয়া দিবস উপলক্ষে আমি এই মহীয়সী নারীর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই।
তিনি বলেন, ঊনবিংশ শতাব্দীতে রক্ষণশীল সমাজব্যবস্থায় পিছিয়ে পড়া নারীদের ভাগ্যোন্নয়নের মূল চাবিকাঠি শিক্ষা। এ উপলব্ধি থেকে বেগম রোকেয়া নারীশিক্ষা বিস্তারে বিরাট সাহসী ভূমিকা পালন করেন। বেগম রোকেয়া নারী উন্নয়নের পথে যে যাত্রা শুরু করেছিলেন, তার ধারাবাহিকতায় নারীর ক্ষমতায়নে কাজ করে যাচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকার।
ড. ইউনূস বলেন, নারীর ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় নানান পদক্ষেপ নিয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, গ্রামীণ অসচ্ছল নারীদের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে ভালনারেবল উইমেন বেনিফিট কর্মসূচি, গ্রামীণ এলাকায় দরিদ্র গর্ভবতী মায়েদের এবং শহর এলাকায় স্বল্প আয়ের কর্মজীবী মায়েদের জন্য আর্থিক সহায়তা প্রদান, দেশব্যাপী তৃণমূল পর্যায়ে নারীদের আত্ম-কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম পরিচালনা। এছাড়াও প্রান্তিক নারীদের উদ্যোক্তা তৈরিতে সহায়তা প্রদান করাসহ কর্মজীবী নারীদের নিরাপদ আবাসনের লক্ষ্যে কর্মজীবী মহিলা হোস্টেল পরিচালিত হচ্ছে। নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিকার ও প্রতিরোধে সমন্বিত সেবা জোরদারকরণ এবং কুইক রেসপন্স টিমের কার্যক্রম প্রকল্পের আওতায় টোল ফ্রি (৭/২৪ ঘণ্টা) হট লাইন সেবা ১০৯ চালু রয়েছে।
বেগম রোকেয়ার আদর্শ অনুসরণে নারী অধিকার ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে অবদানের জন্য যারা বেগম রোকেয়া পদক পেয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা তাদের অভিনন্দন জানান। একই সঙ্গে দিবসটি উপলক্ষে আয়োজিত সব কর্মসূচির সার্বিক সাফল্য কামনা করেন।




