আন্তর্জাতিক
গাজায় সেনা পাঠাচ্ছে মুসলিম ৩ দেশ
প্রায় দুই বছর ধরে ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজায় চলা ইসরায়েলি আগ্রাসনে অবশেষে লাগাম টানতে সক্ষম হয়েছে বিশ্ব। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাবিত যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে ইসরায়েল ও হামাস। ভূখণ্ডটিতে শান্তি আনার লক্ষ্যে জামিনদার (গ্যারান্টি) হিসেবে ইতোমধ্যে একটি ঘোষণাপত্রেও স্বাক্ষর করেছে যুক্তরাষ্ট্র, মিসর, কাতার ও তুরস্ক।
গাজা উপত্যকায় এখন স্থিতিশীলতা রক্ষায় গঠিতব্য আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বাহিনীতে কোন দেশগুলো অংশ নেবে, তা নিয়ে চলছে আলোচনা। এরই মধ্যে সামনে এসেছে তিনটি মুসলিম দেশের নাম। দেশগুলো হলো— পাকিস্তান, আজারবাইজান ও ইন্দোনেশিয়া।
বৃহস্পতিবার (১৬ অক্টোরব) দ্য পলিটিকোর এক প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে এ তথ্য।
প্রতিবেদনে এক সক্রিয় ও সাবেক মার্কিন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তার বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, এই তিন দেশই এখন পর্যন্ত শীর্ষ প্রার্থী হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যদিও এখনও আনুষ্ঠানিক সম্মতি মিলেনি।
পলিটিকোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইন্দোনেশিয়া এ পর্যন্ত একমাত্র দেশ হিসেবে প্রকাশ্যে নিজেদের সেনা প্রেরণের প্রস্তাব জানিয়েছে। তারা বলেছে, জাতিসংঘের অনুমোদনে শান্তিরক্ষী মিশনের আওতায় তারা প্রয়োজন হলে ২০ হাজার সেনা পাঠাতে প্রস্তুত। তবে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যে পরিকল্পনা উপস্থাপনা করেছেন, তাতে জাতিসংঘের কোনো সরাসরি ম্যান্ডেটের উল্লেখ নেই।
প্রতিবেদনে আরও জানানো হয়, কাতার, মিসর ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) সেনাও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমন্বয়ে ইসরায়েলে একটি সামরিক ঘাঁটিতে অবস্থান করে যুদ্ধবিরতি পর্যবেক্ষণে ভূমিকা নিতে পারে।
তথ্যসূত্র না জানিয়েই পলিটিকো উল্লেখ করেছে, এসব বাহিনীর মূল কাজ হবে গাজায় সংঘাত রোধ, ত্রাণবাহনের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিতকরণ এবং পর্যবেক্ষণ—যদিও চূড়ান্ত ম্যান্ডেট নির্ধারণ বাকি।
যুক্তরাষ্ট্র তৎকালীন পরিকল্পনায় হামাসকে নিরস্ত্রীকরণ ভবিষ্যৎ ধাপ হিসাবে দেখানো হয়েছে। এ প্রসঙ্গে ট্রাম্প বলেছিলেন, হামাসকে নিরস্ত্র করা হবে—ইচ্ছাকৃত বা বাধ্যতামূলকভাবে। পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তা বিষয়ক বিশ্লেষকরা বলছেন, এখন সুচারুভাবে ম্যান্ডেট নির্ধারণ, অংশগ্রহণকারী দেশ নির্বাচন ও দ্রুত প্রস্তুতি দেখানোই নীতি বাস্তবায়নের জন্য জরুরি।
সাবেক বাইডেন প্রশাসনের কর্মকর্তা ড্যানিয়েল শাপিরো পলিটিকোকে বলেছেন, ‘গতি দেখানো এবং অংশগ্রহণকারী দেশ ও ম্যান্ডেট চূড়ান্ত করা রাস্তাকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলবে।’
উল্লেখ্য, গাজার দুই বছরের সংঘাতের পর সম্প্রতি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে। যুদ্ধবিরতি স্থিতিশীল রাখার জন্য বহুপাক্ষিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করছেন বিশ্বনেতারা। আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও বাস্তবতায় কোন দেশ কী ভূমিকা নেবে, তাদের ম্যান্ডেট কেমন হবে—এই প্রশ্নগুলো নিয়ে এখন চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষা চলছে।
আন্তর্জাতিক
ইয়েমেনের নতুন প্রধানমন্ত্রী হলেন শায়া মোহসেন জিনদানি
ইয়েমেনের রাজনীতিতে বড় ধরনের পটপরিবর্তনের মধ্য দিয়ে দেশটির নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন শায়া মোহসেন জিনদানি। তিনি বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী সালেম বিন ব্রেইকের স্থলাভিষিক্ত হলেন। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের আগে শায়া মোহসেন জিনদানি ইয়েমেনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করছিলেন।
বৃহস্পতিবার (১৫ জানুয়ারি) সৌদি সমর্থিত প্রেসিডেন্সিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিলের (পিএলসি) কাছে সালেম বিন ব্রেইক তাঁর পদত্যাগপত্র জমা দিলে কাউন্সিল তা গ্রহণ করে। এর মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জিনদানির নাম ঘোষণা করা হয়। ইয়েমেনের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ‘সাবা’ এক প্রতিবেদনে এই খবর নিশ্চিত করেছে।
ইয়েমেনে গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়ার দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় পর এই পরিবর্তন এলো। উল্লেখ্য যে, ২০১৪ সালে ইরান সমর্থিত হুথি বিদ্রোহী গোষ্ঠী রাজধানী সানা দখল করলে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আব্দ রাব্বু মনসুর আল হাদী দেশ ছেড়ে সৌদিতে আশ্রয় নেন।
হুথিদের দমন এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে পুনরায় ক্ষমতায় ফেরাতে ২০১৫ সাল থেকে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইয়েমেনি সেনাবাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত প্রতিরক্ষা জোট হুথিদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালিয়ে আসছে। প্রায় ১১ বছর ধরে চলা এই দীর্ঘ সংঘাতের ফলে বর্তমানে ইয়েমেনের উত্তরাঞ্চল হুথিদের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও দক্ষিণাঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করছে সৌদি সমর্থিত প্রেসিডেন্সিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিল।
সম্প্রতি দক্ষিণ ইয়েমেনের পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ মোড় আসার পরই প্রধানমন্ত্রী পদে এই রদবদল করা হলো। দীর্ঘ দিন ধরে সংযুক্ত আরব আমিরাত সমর্থিত বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী ‘সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিল’ (এসটিসি) এই অঞ্চলে নিজেদের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছিল। তবে সম্প্রতি সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের নতুন সামরিক কৌশলের মুখে এসটিসি’র তৎপরতা কার্যত স্তিমিত হয়ে পড়ে এবং দলটির প্রধান এইদারুস আল জুবাইদি সংযুক্ত আরব আমিরাতে আশ্রয় নেন। দক্ষিণাঞ্চলের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্থিতিশীল হওয়ার এই সন্ধিক্ষণেই শায়া মোহসেন জিনদানিকে নতুন মন্ত্রিসভা গঠনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, জিনদানির এই নিয়োগ মূলত রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও শক্তিশালী করা এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংস্কারকে গতিশীল করার অংশ। ইয়েমেন বর্তমানে ভয়াবহ মানবিক ও অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যা কাটিয়ে ওঠা নতুন প্রধানমন্ত্রীর জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হবে।
সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে অনুষ্ঠিত পিএলসি’র উচ্চপর্যায়ের এক বৈঠকে জিনদানিকে সাংবিধানিক বিধি মোতাবেক দ্রুত নতুন সরকার গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই নতুন নেতৃত্বের মাধ্যমে ইয়েমেনে একটি স্থায়ী যুদ্ধবিরতি এবং শান্তি আলোচনার দিকে এগিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখছে।
এমকে
আন্তর্জাতিক
৮০০ বিক্ষোভকারীর ফাঁসি স্থগিত করল ইরান
ইরানে সরকারবিরোধী আন্দোলনে অংশ নিয়ে গ্রেপ্তার হওয়া ৮০০ বিক্ষোভকারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর স্থগিত করেছে দেশটির সরকার। শুক্রবার (১৬ জানুয়ারি) হোয়াইট হাউসে আয়োজিত এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লিভিট এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
তিনি জানান, বুধবার এই ৮০০ জনের ফাঁসি কার্যকর হওয়ার কথা থাকলেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় অঞ্চলের মিত্র দেশগুলোর প্রবল চাপের মুখে ইরান পিছু হঠতে বাধ্য হয়েছে। গত ২০ দিন ধরে চলা তীব্র গণবিক্ষোভের মুখে তেহরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থা যে নজিরবিহীন সংকটের মুখে পড়েছে, এই সিদ্ধান্ত তারই প্রতিফলন বলে মনে করা হচ্ছে।
ইরানের ইতিহাসে ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর ৪৭ বছরের শাসনামলে এবারের মতো এত বড় ও ব্যাপক গণআন্দোলন আগে কখনো দেখা যায়নি। মূলত দেশটির ভঙ্গুর অর্থনীতি এবং মুদ্রার চরম অবমূল্যায়নই এই বিক্ষোভের প্রধান কারণ।
বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে ইরানি রিয়ালের মান ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে; যেখানে এক ডলারের বিপরীতে পাওয়া যাচ্ছে ৯ লাখ ৯৪ হাজার ৫৫ রিয়াল। এই ভয়াবহ অর্থনৈতিক পতনের ফলে ইরানে খাদ্য, বস্ত্র ও চিকিৎসার মতো মৌলিক চাহিদাগুলো মেটানো সাধারণ মানুষের পক্ষে অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা জনগণকে রাজপথে নামতে বাধ্য করেছে।
বিক্ষোভের সূত্রপাত হয়েছিল গত ২৮ ডিসেম্বর রাজধানী তেহরানের ব্যবসায়ীদের ডাকা ধর্মঘট থেকে। জীবনযাত্রার আকাশচুম্বী ব্যয়ের প্রতিবাদে শুরু হওয়া সেই ধর্মঘট মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে দাবানলের মতো ইরানের ৩১টি প্রদেশের প্রায় প্রতিটি শহর ও গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ইরান সরকার ইন্টারনেট ও মোবাইল নেটওয়ার্ক পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছে এবং পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর পাশাপাশি সেনাবাহিনী মোতায়েন করেছে। সশস্ত্র সংঘাত ও দমনে এ পর্যন্ত ১২ হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন এবং হাজার হাজার বিক্ষোভকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।
বিক্ষোভ শুরু হওয়ার পর থেকেই প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে সামরিক অভিযান চালানোর একাধিক হুমকি দিয়েছিলেন। তবে আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ৮০০ বিক্ষোভকারীর ফাঁসি স্থগিতের মাধ্যমে ইরান কিছুটা নমনীয় হওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে, যা সরাসরি মার্কিন হামলার আশঙ্কাকে আপাতত কমিয়ে আনতে পারে।
যদিও ইরানের অভ্যন্তরীণ অবস্থা এখনো অত্যন্ত অস্থিতিশীল এবং বিক্ষোভকারীরা পুরো দেশকে অচল করে রেখেছেন, তবুও এই বিপুল সংখ্যক মানুষের জীবন রক্ষা পাওয়াকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের একটি কূটনৈতিক বিজয় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এমকে
আন্তর্জাতিক
ইরান থেকে নাগরিকদের ফিরিয়ে আনবে ভারত
ইরান থেকে নিজ নাগরিকদের ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছে ভারত। বৃহস্পতিবার (১৫ জানুয়ারি) দেশটি তাদের নাগরিকদের উদ্দেশ্যে জরুরি বার্তা দিয়েছে দ্রুত সময়ে ইরান ছাড়তে বলেছে। মূলত ইরানের নিরাপত্তা পরিস্থিতি খারাপ হয়ে যাওয়ায় এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে নয়াদিল্লি।
কাল শুক্রবার তেহরান থেকে বিশেষ ফ্লাইট পরিচালনা করবে দেশটি। প্রথম দফায় ফিরিয়ে আনা হবে শিক্ষার্থীদের।
সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি জানিয়েছে, গুলিস্তান বিশ্ববিদ্যালয় এবং শহীদ বেহেস্তি মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষার্থীকে প্রথম দফায় ফিরিয়ে আনা হবে। তারা কালই ভারতে অবতরণ করবেন।
কোন কোন নাগরিককে ফিরিয়ে আনা হবে তাদের একটি চূড়ান্ত তালিকা কালকের মধ্যে প্রকাশ করবে ভারত সরকার।
গতকাল বুধবার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গে ফোনে কথা বলেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। ওই সময় তারা ইরান ও ইরানের পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেন।
আলাদাভাবে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জসওয়াল এক সতর্কবার্তায় ভারতীয়দের ইরান ভ্রমণ থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান। ধারণা করা হয় ইরানে প্রায় ১০ হাজার ভারতীয় রয়েছেন।
জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে গত ২৮ ডিসেম্বর থেকে ইরানে বিক্ষোভ শুরু হয়। যা গত বৃহস্পতিবার সহিংস রূপ ধারণ করে। এরপর শুক্রবারও সহিংসতা অব্যাহত ছিল। এই বিক্ষোভ দমনে ওই দুইদিন ব্যাপক কঠোর অবস্থানে যায় দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী।
ওই সময় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প হুমকি দিয়ে আসছিলেন যদি ইরান বিক্ষোভকারীদের হত্যা করা শুরু করে তাহলে তারা সামরিকভাবে হস্তক্ষেপ করবেন। দিন যত যাচ্ছিল তার হুমকি তত বাড়ছিল। এতে করে হামলার শঙ্কাও তীব্র হয়েছিল। কিন্তু এখন শোনা যাচ্ছে ট্রাম্প এ পরিকল্পনা থেকে সরে এসেছেন। তবে তার হুমকির কারণে অনেক দেশ নাগরিকদের ইরান ছাড়তে বলেছিল।
বৃহস্পতিবার সকালে ট্রাম্প সাংবাদিকদের জানান তিনি জানতে পেরেছেন ইরান বিক্ষোভকারীদের হত্যা করা বন্ধ করেছে। এছাড়া তাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরও স্থগিত করেছে। তার এ বক্তব্য থেকে বোঝা যাচ্ছিল তিনি তার আগের অবস্থান থেকে সরে এসেছেন।
আন্তর্জাতিক
তেহরানে দূতাবাস বন্ধ করল যুক্তরাজ্য
সম্প্রতিক সময়ে ইরানে সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের ব্যাপক সংঘাতের জেরে দেশটিতে অবস্থিত নিজেদের দূতাবাস সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে যুক্তরাজ্য। একই সঙ্গে নাগরিকদের ইরানে ভ্রমণের ব্যাপারে সতর্কতাও জারি করেছে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
বুধবার যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগের কারণে ইরানে যুক্তরাজ্যের দূতাবাসের সব কর্মকর্তা ও কর্মীকে সাময়িকভাবে প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে। পরিস্থিতির উন্নতি ঘটলে ফের স্বাভাবিকভাবে দূতাবাস চলবে। তার আগ পর্যন্ত দূর থেকে দূতাবাস পরিচালনা করা হবে।
নাগরিকদের ভ্রমণ সতর্কবার্তা দিয়ে বলা হয়েছে, “নিরাপত্তাজনিত কারণে ব্রিটিশ নাগরিকদের আপাতত ইরানে ভ্রমণ না করার আহ্বান জানাচ্ছে সরকার; যেসব নাগরিক বর্তমানে ইরানে অবস্থান করছেন— তাদের উদ্দেশে বলা হচ্ছে— আপনারা যে যেখানেই আছেন, নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে সর্বদা সজাগ থাকবেন এবং ঝুঁকি এড়িয়ে চলবেন।”
উল্লেখ্য, গত দু’সপ্তাহ ধরে ব্যাপক আকারে সরকারবিরোধী আন্দোলন চলছে ইরানে। দিন যতো গড়াচ্ছে, আন্দোলনের মাত্রাও ততো তীব্র হচ্ছে।
এ আন্দোলন-বিক্ষোভ উস্কে ওঠার প্রাথমিক কারণ দেশটির ভঙ্গুর অর্থনীতি । বছরে পর বছর ধরে অবমূল্যায়নের জেরে ইরানের মুদ্রা ইরানি রিয়েল বিশ্বের সবচেয়ে দুর্বল মুদ্রার স্বীকৃতি পেয়েছে। বর্তমানে ডলারের বিপরীতে ইরানি রিয়েলের মান ৯ লাখ ৯৪ হাজার ৫৫। অর্থাৎ ইরানে এখন এক ডলারের বিপরীতে পাওয়া যাচ্ছে ৯ লাখ ৯৪ হাজার ৫৫ ইরানি রিয়েল।
জাতীয় মুদ্রার এই দুরাবস্থার ফলে দীর্ঘদিন ধরে ভয়াবহ মূল্যস্ফীতি চলছে ইরানে। খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসার মতো মৌলিক চাহিদাগুলো মেটাতে রীতিমতো হিমসিম খাচ্ছেন ইরানের সাধারণ জনগণ।
এই পরিস্থিতিতে গত গত ২৮ ডিসেম্বর মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধির প্রতিবাদে ধর্মঘটের ডাক দেন রাজধানী তেহরানের বিভিন্ন বাজারের পাইকারি ও খুচারা ব্যবসায়ীরা। সেই ধর্মঘট থেকেই বিক্ষোভের সূত্রপাত।
এরপর মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে ইরানের ৩১টি প্রদেশের প্রায় সবগুলো শহর-গ্রামে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে বিক্ষোভ এবং দিনকে দিন বিক্ষোভের তীব্রতা বাড়তে থাকে। বর্তমানে পুরো দেশকে কার্যত অচল করে দিয়েছেন বিক্ষোভকারীরা।
বিক্ষোভ দমনে ইতোমধ্যে ইন্টারনেট-মোবাইল নেটওয়ার্ক বন্ধ করেছে ইরান, সেই সঙ্গে দেশজুড়ে মোতায়েনপুলিশ-নিরাপত্তা বাহিনীর পাশাপাশি মোতায়েন করেছে সেনাবাহিনী। জনগণ ও সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে সংখাতে ইতোমধ্যে ১২ হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। সেই সঙ্গে গ্রেপ্তার হয়েছেন আরও হাজার হাজার বিক্ষোভকারী।
এমকে
আন্তর্জাতিক
ইরানে হত্যাকাণ্ড বন্ধ হয়েছে, দাবি ট্রাম্পের
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, তিনি আশ্বস্ত হয়েছেন যে, ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীদের হত্যা বন্ধ হয়েছে। একই সঙ্গে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি জানিয়েছেন, তেহরানের পক্ষ থেকে কারও মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ‘কোনো পরিকল্পনা নেই’।
স্থানীয় সময় বুধবার (১৪ জানুয়ারি) সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে ট্রাম্প বলেন, তাকে জানানো হয়েছে যে বিক্ষোভকারীদের হত্যাকাণ্ড বন্ধ হয়েছে এবং পরিকল্পিত ফাঁসিও স্থগিত করা হয়েছে। ইরানে হামলার হুমকি দেওয়ার পর তার এই বক্তব্য সংকট নিয়ে তুলনামূলক নরম অবস্থানের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে।
কাতারের একটি মার্কিন ঘাঁটি থেকে কিছু সেনা প্রত্যাহার শুরুর কয়েক ঘণ্টা পর ট্রাম্প জানান, তিনি ‘অন্য পক্ষের খুব গুরুত্বপূর্ণ সূত্রের’ সঙ্গে কথা বলেছেন এবং পরিস্থিতি কীভাবে এগোয় তা তিনি দেখবেন। তবে সম্ভাব্য মার্কিন সামরিক পদক্ষেপের বিষয়টি পুরোপুরি নাকচও করেননি তিনি।
ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা দেখব প্রক্রিয়াটা কীভাবে এগোয়’ । তিনি আরও জানান, ইরানের পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্র একটি ‘খুব ভালো বিবৃতি’ পেয়েছে।
পরে ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেন, বিক্ষোভকারীদের ফাঁসি দেওয়ার কোনো পরিকল্পনাই নেই। তিনি বলেন, ‘ফাঁসির প্রশ্নই ওঠে না’।
ওয়াশিংটন থেকে আল জাজিরার প্রতিবেদক মাইক হান্না জানান, ট্রাম্পের বক্তব্যে ইরানের প্রতি তার অবস্থান কিছুটা নরম হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। তার ভাষায়, ট্রাম্প এখনো বিভিন্ন বিকল্প নিয়ে ভাবছেন, তবে তাৎক্ষণিক সামরিক পদক্ষেপ থেকে সরে আসার ইঙ্গিত মিলছে।
সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির সিনিয়র গবেষক সিনা তুসসি আল জাজিরাকে বলেন, ট্রাম্পের এই বক্তব্য হয়তো সামরিক হস্তক্ষেপ এড়ানোর একটি ‘সম্মান রক্ষার পথ’। তবে একেবারে সংঘাতের সম্ভাবনা শেষ হয়ে গেছে—এমনও বলা যাচ্ছে না।
তুসসি আরও বলেন, ‘ট্রাম্প বড় ও দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে অনাগ্রহী। ইরানের ক্ষেত্রে সেই ঝুঁকি ছিল। আজকের মন্তব্যে মনে হচ্ছে, তিনি পরিস্থিতি থেকে সম্মানজনকভাবে সরে আসার পথ খুঁজছেন।’
স্টিমসন সেন্টারের বিশ্লেষক বারবারা স্লাভিন বলেন, ইরান নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে ট্রাম্প সম্ভবত দ্বিধায় আছেন। তিনি হয়তো ‘আরেকটি দ্রুত জয়’ চান, কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে জড়াতে চান না। তার ধারণা, ট্রাম্প সীমিত আকারে হামলা চালাতে পারেন, যাতে তিনি ইরানের জনগণকে ‘সহায়তা করার’ প্রতিশ্রুতি পূরণের দাবি করতে পারেন, কিন্তু বড় ধরনের যুদ্ধ এড়ানো যায়।
এর আগে বুধবার যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র কাতারের একটি বিমানঘাঁটি থেকে কিছু কর্মী সরিয়ে নেয়, কারণ এক ইরানি কর্মকর্তা হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন—যুক্তরাষ্ট্র হামলা করলে তেহরান প্রতিবেশী দেশগুলোতে থাকা মার্কিন ঘাঁটিতে আঘাত হানবে।
ইরান জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র হস্তক্ষেপ করলে তারা পাল্টা জবাব দিতে প্রস্তুত। ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)-এর প্রধান মোহাম্মদ পাকপুর বলেছেন, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের ‘ভুল হিসাবের’ জবাবে ইরান ‘নির্ণায়কভাবে’ প্রতিক্রিয়া জানাতে প্রস্তুত।
রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত এক বিবৃতিতে পাকপুর বলেন, আইআরজিসি এখন ‘সর্বোচ্চ প্রস্তুত অবস্থায়’ রয়েছে। তিনি ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে ‘ইরানের যুবকদের হত্যাকারী’ বলেও আখ্যা দেন।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি ফক্স নিউজকে বলেন, তিন দিনব্যাপী ‘সন্ত্রাসী তৎপরতার’ পর এখন পরিস্থিতি শান্ত এবং সরকার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আছে।
ডিসেম্বরে স্থানীয় মুদ্রার দরপতন ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে দোকানিরা রাস্তায় নামলে আন্দোলনের সূচনা হয়, যা পরে দেশজুড়ে সরকারবিরোধী বিক্ষোভে রূপ নেয়।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম স্বীকার করেছে, সহিংসতায় বহু মানুষ নিহত হয়েছে। সরকারপক্ষ বলছে, ‘সশস্ত্র ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠী’ এর জন্য দায়ী।
রাষ্ট্রীয় হিসাবে, দুই সপ্তাহের অস্থিরতায় ১০০–এর বেশি নিরাপত্তাকর্মী নিহত হয়েছেন। তবে বিরোধীদের দাবি, নিহতের সংখ্যা আরও বেশি এবং তাতে হাজারো বিক্ষোভকারী রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্টস নিউজ এজেন্সি বলেছে, তারা দুই হাজার ৪০০–এর বেশি বিক্ষোভকারীর মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করেছে। তবে আল জাজিরা স্বাধীনভাবে এসব সংখ্যা যাচাই করতে পারেনি।
এদিকে ইরানে প্রায় সম্পূর্ণ টেলিযোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। নেটব্লকস জানিয়েছে, এই ব্ল্যাকআউট ১৪৪ ঘণ্টা ছাড়িয়েছে।
মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল জানিয়েছে, তারা এমন প্রমাণ পেয়েছে যা ইঙ্গিত করে—গত এক সপ্তাহে ইরানে ‘অভূতপূর্ব মাত্রায় বেআইনি হত্যাকাণ্ড’ ঘটেছে, যেখানে বেশিরভাগই ছিল শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারী ও সাধারণ মানুষ। সংস্থাটি বলেছে, নিরাপত্তা বাহিনী মাথা ও চোখ লক্ষ্য করে গুলি চালিয়েছে—এমন ভিডিও প্রমাণও তারা পর্যালোচনা করেছে।
এমকে



