মত দ্বিমত
ভারত–লন্ডন নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব ও জনগণের অনুপস্থিতি
৫ আগস্ট ২০২৪—অনেকেই এই দিনটিকে ভেবেছিলেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক সঙ্কট থেকে উত্তরণের দিন হিসেবে। প্রত্যাশা ছিল, এই দিনে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নিয়ে শাসনতন্ত্রের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনবে। কিন্তু বাস্তবে হলো উল্টো। দেশ স্বাধীন হলো না, বরং রাষ্ট্রকে দুই টুকরো করা হলো। শেখ হাসিনাকে ক্ষমতা থেকে সরানো হলো বটে, কিন্তু তাঁকে ভারত পাঠানো হলো। ফলাফল? একদিকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, অন্যদিকে শেখ হাসিনা—ভারত থেকে এখনো তাঁর দল ও সমর্থকদের নিয়ন্ত্রণ করছেন।
এই সিদ্ধান্ত ছিল ভয়াবহ ভুল। তাঁকে সরানো হলো, কিন্তু সমাধান করা হলো না। দল ও প্রশাসনের অনেকেই এখনো তাঁকেই নেত্রী মনে করছে, তাঁকেই অনুসরণ করছে। ফলে দেশের শাসনতন্ত্র কার্যত বিভক্ত হয়ে গেছে—অর্ধেক চলছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নির্দেশনায়, অর্ধেক চলছে শেখ হাসিনার প্রভাবমুক্ত নয় এমন প্রশাসনের অধীনে। এই দ্বৈত নেতৃত্ব রাষ্ট্রযন্ত্রকে অচল করে দিয়েছে।
আরেকদিকে বিএনপির নেতৃত্ব দিচ্ছেন লন্ডন থেকে তারেক রহমান। ভারত থেকে শেখ হাসিনা, লন্ডন থেকে তারেক রহমান—“ডিজিটাল বাংলাদেশ” যেন দুই প্রবাসী কেন্দ্র থেকে চালিত হচ্ছে। অথচ দেশের ভেতরে কার্যকর নেতৃত্ব নেই। বাইরে থেকে নির্দেশনা আসছে, কিন্তু ভেতরে সমস্যার সমাধান করার মতো উপস্থিত নেতৃত্ব নেই। এই কারণেই বলা যায়—দেশের বারোটা বেজে গেছে।
জনগণ কে?
আমরা সবসময় বলি—জনগণ এটা চায় না, জনগণ এটা মেনে নেবে না। কিন্তু প্রশ্ন হলো—জনগণ কে?
•বিএনপি কি জনগণের দল নয়?
•জামায়াত, আওয়ামী লীগ বা অন্য সব দল কি জনগণের অংশ নয়?
•তাহলে দলগুলো বাদ দিয়ে আর কে আছে, যে বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবে—“আমি জনগণ”?
বাস্তবে সত্যিকারের জনগণের ভূমিকায় যারা আছে, তাদের সংখ্যা খুবই কম। তারা আছে, কিন্তু বিচ্ছিন্ন, সংগঠিত নয়। ফলাফল হলো—জনগণের নাম ব্যবহার করা হচ্ছে, কিন্তু জনগণের জন্য কাজ করা হচ্ছে না। অতীতে হয়নি, ভবিষ্যতেও হবে না—যদি না আমরা ডেসপারেটলি চেষ্টা করি।
দুর্নীতি, অনীতি ও বিভক্ত প্রশাসন
আজ দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল দুর্নীতি, অনীতি, লুটপাট, চাঁদাবাজিতে নিমগ্ন। প্রশাসন বিভক্ত—কেউ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পক্ষে, কেউ শেখ হাসিনার প্রতি অনুগত। এক্ষেত্রে “হাড়ি ভেঙে দই পড়েছে, বিড়ালের হইছে বাহার”—এই প্রবাদটাই সঠিক। সবাই নিজের সুবিধা নেওয়ার প্রতিযোগিতায় নেমেছে, কিন্তু সাধারণ মানুষের ভাগ্যে কিছুই জোটেনি।
ভুলটা কোথায় হলো?
•শেখ হাসিনাকে ক্ষমতা থেকে সরানো হলো, কিন্তু রাজনৈতিকভাবে সমাধান করা হলো না।
•তাঁকে ভারত পাঠানো মানে তাঁর প্রভাবকে সরানো নয়—বরং বাইরে বসে তাঁকে আরও রহস্যময় ও শক্তিশালী করা হলো।
•তারেক রহমানও একইভাবে লন্ডন থেকে দল পরিচালনা করছেন—যা দেশের ভেতরে নেতৃত্বশূন্যতার জন্ম দিয়েছে।
•দুই প্রবাসী নেতা ডিজিটালি দল চালাচ্ছেন, আর দেশে সাধারণ মানুষ পড়েছে নেতৃত্বশূন্য ও বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে।
দেশকে জনগণের করতে কী চেষ্টা দরকার?
১. জনগণের সক্রিয় উপস্থিতি তৈরি করা: দল নয়, নাগরিক প্ল্যাটফর্মকে শক্তিশালী করতে হবে। স্থানীয় পর্যায়ে টাউন-হল, নাগরিক কমিটি, নিরপেক্ষ জনমত সংগ্রহ শুরু করতে হবে।
২. দুর্নীতির বিরুদ্ধে দৃশ্যমান পদক্ষেপ: দুর্নীতি, লুটপাট ও ক্ষমতার অপব্যবহারের ঘটনা নথিভুক্ত ও প্রকাশ করতে হবে। ন্যায়বিচারের জন্য আইনি ও সামাজিক চাপ তৈরি করতে হবে।
৩. ছোট সেবা দিয়ে আস্থা ফেরানো: পানি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য—এই খাতে স্থানীয় উদ্যোগ দেখাতে হবে। এতে জনগণ বুঝবে—কেউ তাদের জন্য কাজ করছে।
৪. স্বচ্ছ নেতৃত্ব ও জবাবদিহি: জনগণের নামে রাজনীতি নয়, জনগণের কাজে রাজনীতি। স্বচ্ছতা ছাড়া আস্থা আসবে না।
৫. বহির্বর্তী প্রভাব থেকে বের হওয়া: ভারত ও লন্ডন থেকে ভার্চুয়াল নেতৃত্বের পরিবর্তে স্থানীয়, জনগণকেন্দ্রিক নেতৃত্ব তৈরি করতে হবে। দেশের ভিতরে সমাধান তৈরি করতে হবে, বাইরে নয়।
আজকের বাংলাদেশে ত্রৈমুখী নেতৃত্ব, বিভক্ত প্রশাসন, দুর্নীতিগ্রস্ত দল এবং “জনগণ” নামের এক অদৃশ্য সত্তা—সব মিলিয়ে রাষ্ট্র অচলাবস্থায়। শেখ হাসিনা ভারতে বসে প্রভাব চালাচ্ছেন, তারেক রহমান লন্ডন থেকে নির্দেশ দিচ্ছেন, আর দেশে আন্দোলন করছে ছোট দলগুলো। ফলে রাষ্ট্রযন্ত্র এক ভয়ঙ্কর অস্থিরতায় আছড়ে পড়েছে। যে দেশে সবাই কোনো না কোনো দলের সমর্থক, যে দেশে কেউ ভুল স্বীকার করে না, অন্যায়ের পর অনুশোচনা নেই, শুধু জনগণের নামে দায় চাপানো হয়—সেই দেশ কিভাবে জনগণের হতে পারে?
পরিবর্তন একদিনে হবে না। তবে ছোট ছোট নাগরিক উদ্যোগ, স্থানীয় স্বচ্ছ নেতৃত্ব, দুর্নীতির বিরুদ্ধে দাঁড়ানো এবং জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া কোনো পথ নেই। যদি আমরা চেষ্টা না করি, তাহলে জনগণ সবসময় কেবল শ্লোগানেই থেকে যাবে—কাজে নয়।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মূল দায়িত্ব ও অঙ্গীকার ছিল নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে রাজনৈতিক সঙ্কট সমাধান করা, শাসনতন্ত্রে জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজন করা। কিন্তু বাস্তবে সেই প্রতিশ্রুতি পূরণ হয়নি। জবাবদিহিতার অভাব, সিদ্ধান্তহীনতা এবং ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। শেখ হাসিনার মনোনীত প্রেসিডেন্ট আজও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শীর্ষ অবস্থানে রয়েছেন—ফলে সরকারের বৈধতা ও নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। এ অবস্থায় সশস্ত্র বাহিনীর দায়িত্ব ছিল রাষ্ট্রকে রক্ষা করা, আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা; কিন্তু তারা যদি সত্যিকারের নিয়ন্ত্রণ ও নিরপেক্ষতা প্রতিষ্ঠা করতে না পারে, তাহলে রাষ্ট্রব্যবস্থা ভেঙে পড়ার ঝুঁকি থেকেই যায়।
এই প্রেক্ষাপটে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। তিনি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান হিসেবে সঙ্কট সমাধানের কার্যকর নেতৃত্ব নিতে পারতেন, কিন্তু তাঁর পদক্ষেপ সীমিত থাকায় প্রত্যাশিত পরিবর্তন ঘটেনি। তাই এখন জরুরি একটি ন্যায্য রূপান্তর—যেখানে রাজনৈতিক দলগুলো টিকে থাকবে, কিন্তু তাদের ভেতরে থাকা দুর্নীতি, লুটপাট, মানবাধিকার লঙ্ঘন বা অন্য অপরাধে দণ্ডিত নেতৃত্বকে কঠোরভাবে বাদ দিতে হবে। দল হচ্ছে জনগণের সংগঠিত অভিব্যক্তি; তাদের সম্পূর্ণ অস্বীকার করা গণতন্ত্রকেই অস্বীকার করা।
অতএব, প্রয়োজন এমন একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, যেখানে থাকবে সৎ ও যোগ্য নেতৃত্ব, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিত্ব, নিরপেক্ষ প্রশাসন, বিশেষজ্ঞ পেশাজীবী এবং তরুণ প্রজন্মের সক্রিয় অংশগ্রহণ। এই সরকারকে কঠোর জবাবদিহিতার আওতায় থাকতে হবে, যেন প্রতিটি সিদ্ধান্ত স্বচ্ছ, যাচাইযোগ্য এবং জনগণের কাছে ব্যাখ্যা-সাপেক্ষ হয়। কেবল এভাবেই দলীয় অস্তিত্ব রক্ষা করে অপরাধী নেতৃত্বকে ছাঁটাই করা সম্ভব, এবং গড়ে তোলা সম্ভব একটি নতুন শাসনব্যবস্থার ভিত্তি—যেখানে জনগণের আস্থা ফিরবে, রাষ্ট্রে স্থিতিশীলতা আসবে এবং ভবিষ্যতের নির্বাচন হবে সত্যিকারের গণতান্ত্রিক। এর পরেই জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণকে তাদের প্রকৃত সিদ্ধান্তের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া ছাড়া দেশের ভবিষ্যৎ নিরাপদ নয়।
রহমান মৃধা, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন। Rahman.Mridha@gmail.com
মত দ্বিমত
নাসিরউদ্দিন পাটোয়ারী: স্পষ্টভাষিতা বিতর্ক এবং নতুন রাজনীতির রূপরেখা
আমি দূর প্রবাসে থাকলেও তাকে আমি চিনি, যদিও কখনও চোখে দেখিনি। জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানে আমার লেখালিখির সক্রিয় অংশগ্রহণের সময় আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত যারা ছিল তাদের মধ্যেই নাসিরউদ্দিন পাটোয়ারী আমার নজর আলাদাভাবে কেড়েছিল। তার অদম্য সাহস, দৃঢ় সংকল্প এবং মানুষের কল্যাণের প্রতি আন্তরিক দৃষ্টিভঙ্গি তখনই স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। সেই দিনের মুহূর্ত থেকে সে আমার চোখে শুধুই একজন রাজনৈতিক নেতা নয়; সে এক অনন্য চরিত্র, যার প্রভাব কেবল আমার ব্যক্তিগত উপলব্ধিতে সীমাবদ্ধ নয়, বরং দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে সময়ের সঙ্গে প্রতিফলিত হয়েছে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে স্পষ্টভাষী নেতা বিরল। নাসিরউদ্দিন পাটোয়ারী সেই অদ্বিতীয় কণ্ঠ, যে সরাসরি দৃঢ় এবং প্রায়শই বিতর্কিত বক্তব্য দেয়। তার ভাষা সমালোচনার জন্ম দেয়, সমর্থনও জন্মায়। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির ঘাটতি ও সম্ভাবনার উভয়ই প্রতিফলন। এই প্রতিবেদনে আমি বিশ্লেষণ করেছি সে কীভাবে রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রভাব ফেলছে, নতুন প্রজন্ম তাকে কীভাবে দেখছে এবং তার নেতৃত্ব কীভাবে নতুন মানদণ্ড স্থাপন করতে পারে।
বাংলাদেশের সমসাময়িক রাজনৈতিক অঙ্গনে নাসিরউদ্দিন পাটোয়ারী একটি আলোচিত নাম। তাকে কেউ দেখে দুর্নীতিবিরোধী আপসহীন কণ্ঠ হিসেবে, কেউ দেখে বিতর্কপ্রবণ রাজনীতিক হিসেবে। কিন্তু তাকে ঘিরে যে আলোচনা, তা কেবল ব্যক্তিকে নিয়ে নয়। এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভাষা, সংস্কৃতি ও কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার গভীর প্রশ্নকে সামনে আনে।
নাসিরউদ্দিন পাটোয়ারীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে অশ্লীলতার অভিযোগ উঠেছে। সমালোচকদের বক্তব্য, তার ভাষা প্রায়ই তীব্র। সমর্থকদের দাবি, সে কেবল অপ্রিয় সত্য উচ্চারণ করে। এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে। কঠোর ভাষা ও অশ্লীলতার কি একই বিষয়? নাকি আমরা এমন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত, যেখানে তোষামোদ স্বাভাবিক এবং সরাসরি সমালোচনা অস্বস্তিকর?
বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় ব্যক্তিকেন্দ্রিক আনুগত্য প্রায়ই নীতিগত বিতর্ককে ছাপিয়ে যায়। ফলে শক্ত সমালোচনা সহজেই ব্যক্তিগত আক্রমণ হিসেবে ব্যাখ্যা পায়। এই প্রেক্ষাপটে পাটোয়ারীর ভাষা বিতর্ক সৃষ্টি করলেও তা রাজনৈতিক সংস্কৃতির অন্তর্নিহিত সংকটকেই উন্মোচন করে।
নতুন প্রজন্মের চাওয়া
নতুন প্রজন্মের এক অংশ তাঁর এই আপসহীনতাকে সততার প্রতীক মনে করলেও, অন্য অংশ তাঁর বক্তব্যের চেয়ে সুস্পষ্ট কর্মপরিকল্পনা ও ফলাফল দেখতে আগ্রহী। আজকের তরুণ সমাজ শুধু স্লোগান চায় না, তারা চায় রাষ্ট্র সংস্কারের বাস্তব রূপরেখা। এই প্রেক্ষাপটে পাটোয়ারীর সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো তাঁর এই সাহসকে কৌশলী নীতিতে রূপান্তর করা।
পাটোয়ারীর স্পষ্টভাষিতা তার শক্তি, আবার ঝুঁকিও
ইতিবাচক দিক হলো, সে আলাদা রাজনৈতিক পরিচিতি গড়ে তুলেছে। দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান তাকে দৃশ্যমান করেছে। তরুণদের একটি অংশ তার মধ্যে প্রতিবাদী নয়, সম্ভাব্য সংস্কারকের প্রতিচ্ছবি দেখে।
নেতিবাচক দিক হলো, যদি ভাষাই আলোচনার কেন্দ্রে থাকে তবে নীতিগত গভীরতা আড়ালে পড়তে পারে। জোটভিত্তিক রাজনীতিতে সমঝোতার প্রয়োজন থাকে। অতিরিক্ত তীব্রতা রাজনৈতিক সমীকরণকে কঠিন করে তুলতে পারে। আইনি ও প্রশাসনিক চাপের ঝুঁকিও থেকে যায়।
কাঠামোগত সংস্কারের প্রয়োজন
১: রাজনৈতিক আচরণবিধির স্পষ্ট সংজ্ঞা প্রয়োজন, যাতে কঠোর সমালোচনা ও ব্যক্তিগত অশালীনতার পার্থক্য নির্ধারিত হয়।
২: প্রমাণভিত্তিক বক্তব্যের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা জরুরি। অভিযোগের সঙ্গে দলিল যুক্ত হলে ভাষা নয়, তথ্য আলোচনার কেন্দ্রে আসে।
৩: স্বাধীন তথ্য যাচাই কাঠামো শক্তিশালী করা দরকার, যাতে গুজব ও বিকৃত বক্তব্য দ্রুত সংশোধিত হয়।
৪: নির্বাচিত প্রতিনিধিদের জন্য রাজনৈতিক যোগাযোগ ও নৈতিক ভাষা ব্যবহারের প্রশিক্ষণ প্রয়োজন।
৫: সমালোচনার পাশাপাশি লিখিত নীতিপত্র ও বাস্তবায়ন রূপরেখা প্রকাশ করতে হবে।
সংসদে নতুন মানদণ্ডের প্রত্যাশা
জাতীয় সংসদে নীতিগত আলোচনার যে ঘাটতি প্রায়ই দেখা যায়, সেখানে নাসিরউদ্দিন পাটোয়ারীর মতো নেতার উপস্থিতি তাৎপর্যপূর্ণ হতে পারে। তবে সংসদীয় রাজনীতিতে কার্যকর হতে হলে তিনটি বিষয় নিশ্চিত করা জরুরি:
- জবাবদিহিমূলক বিতর্কের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা।
- আইন প্রণয়নের পাশাপাশি বাস্তবায়ন কাঠামো নিয়ে সুস্পষ্ট আলোচনা।
- তরুণ প্রজন্মকে দেখানো যে রাজনীতি সৃজনশীল, নীতিনির্ভর এবং মানুষের কল্যাণমুখী হতে পারে।
তার বক্তব্যে যে বার্তাগুলো ধারাবাহিকভাবে উঠে আসে তা হলো তোষামোদ নয়, জবাবদিহি; আইন প্রয়োগই রাষ্ট্রের শক্তি; দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপসহীনতা; নাগরিক সাহসের চর্চা। এই বার্তা যদি কেবল বক্তৃতায় সীমাবদ্ধ না থেকে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোয় রূপ পায়, তবে তা রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তনে ভূমিকা রাখতে পারে।
নাসিরউদ্দিন পাটোয়ারীকে ঘিরে বিতর্ক আসলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিপক্বতার পরীক্ষা। সে একই সঙ্গে আশার প্রতীক, বিতর্কের কেন্দ্র এবং সম্ভাব্য সংস্কারক। তার সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সাহসকে কৌশলে রূপান্তর করা, ভাষাকে নীতিতে রূপান্তর করা এবং আবেগকে প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনে রূপান্তর করা।
আজ বাংলাদেশের রাজনীতি একটি সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। জনগণ ক্লান্ত প্রতিশ্রুতির পুনরাবৃত্তিতে, ক্লান্ত তোষামোদে, ক্লান্ত গুজবনির্ভর চরিত্রহননে। তারা এমন রাজনীতি দেখতে চায় যেখানে যোগ্যতা সম্মান পায়, সৃজনশীলতা মূল্য পায় এবং জবাবদিহি বাধ্যতামূলক হয়।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে আমরা প্রায়ই দেখেছি যোগ্য নেতৃত্বের অভাবে রাজনীতি আমলাতন্ত্রের কাছে হার মেনেছে। যোগ্য, ত্যাগী ও দূরদর্শী নেতৃত্বের অভাব দেশের নীতিনির্ধারণকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। আসন্ন নির্বাচনের পর একটি শক্তিশালী বিরোধী দল এবং একটি ‘ছায়া মন্ত্রিসভা’ গঠন করা গেলে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। নাসিরউদ্দিন পাটোয়ারীর সাম্প্রতিক নির্বাচনী প্রচারণায় যে দায়িত্বশীল রাজনৈতিক চর্চার আভাস মিলেছে, তা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাওয়া এখন সময়ের দাবি।
নাসিরউদ্দিন পাটোয়ারীকে ঘিরে বিতর্ক আসলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিপক্বতারই পরীক্ষা। তিনি কেবল একজন ব্যক্তি নন, বরং এক নতুন রাজনৈতিক মানদণ্ডের সম্ভাবনা। যদি তাঁর স্পষ্টভাষিতা ও সাহসের সাথে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের সংমিশ্রণ ঘটে, তবে তা নতুন প্রজন্মের কাছে এই বার্তাই দেবে যে—রাজনীতি মানে ক্ষমতা নয়, বরং মানুষের কল্যাণে নিবেদিত একটি মহান দায়িত্ব।
লেখক: রহমান মৃধা
গবেষক ও লেখক, প্রাক্তন পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন
মত দ্বিমত
গণতন্ত্র নিষ্ঠুর, কিন্তু অন্ধ নয়
বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষের যেন ১৮ কোটি মতামত, যা গণমাধ্যমে প্রতিনিয়ত উচ্চারিত হচ্ছে। তারপরও বাংলাদেশের নবনির্বাচিত ও মনোনীত প্রার্থীদের মধ্যে বিএনপির গণজোয়ার যেন একটি স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে, জনমতকে চিরদিন উপেক্ষা করা যায় না। এবার আর বলার সুযোগ নেই যে দিনের ভোট রাতে হয়েছে বা জনগণ নিজের ভোট নিজে দিতে পারেনি। অজুহাতের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে বাস্তবতাকে গ্রহণ করার সময় এখন, যার যার মুল্লুক তার শক্তি। তবে এই বাক্যটির আরেকটি গভীর পাঠ আছে। ক্ষমতা কখনো শূন্য থেকে জন্মায় না, এটি শেষ পর্যন্ত সমাজের ভেতর থেকেই উঠে আসে। একটি জাতি শেষ পর্যন্ত তার মনের মতো নেতৃত্বই খুঁজে পায়। যেমন জাতি তেমন নেতা, কারণ আম গাছের তলায় আমই পড়ে। তাই প্রশ্নটা শুধু কে ক্ষমতায় গেল তা নয়, আমরা কেমন সমাজ তৈরি করেছি, কেমন রাজনীতি সহ্য করেছি, আর কেমন নেতৃত্বকে নীরবে অনুমোদন দিয়েছি। নেতৃত্ব আসলে জাতিরই আয়না, সেখানে প্রতিফলিত হয় আমাদের সাহস, আমাদের ভয়, আমাদের নৈতিকতা এবং আমাদের সীমাবদ্ধতা।
প্রকৃতপক্ষে গণতন্ত্রের মতো নিষ্ঠুর আচরণ আর কোনো ব্যবস্থায় নেই। কারণ কি জানেন? ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, মাত্র একটি ভোটের ব্যবধানে কেউ হেরে গেছে, কেউ জিতে গেছে। সেই একটি ভোটই কখনো একটি দেশের ভবিষ্যৎ বদলে দিয়েছে, কখনো একটি প্রজন্মের স্বপ্নকে নতুন দিক দেখিয়েছে। অনেকেই তাই বলেন, এটিই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। কিন্তু এই সৌন্দর্যের ভেতরেই লুকিয়ে আছে কঠোর জবাবদিহি, নির্মম বাস্তবতা এবং জনগণের নীরব অথচ চূড়ান্ত ক্ষমতা।
আজ এই ক্ষণে আমার ছোটবেলার একটি গল্প খুব মনে পড়ছে। গ্রামে বিষাক্ত সর্প দংশনে একজন প্রতিবেশী মৃত্যুবরণ করেছিলেন। চারদিকে কান্নার রোল উঠেছিল। পাড়া প্রতিবেশীরা এসে সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন, নানা জন নানা ভাবে স্মৃতিচারণ করছিলেন। হঠাৎ এক বয়স্ক মহিলা এসে লক্ষ করলেন, সাপে কামড় দিয়েছে চোখের একটু উপরে। গভীর দুঃখ প্রকাশ করে তাকে বলতে শুনেছিলাম, “ইশ, একটুর জন্য চোখটা বেঁচে গেছে।”
সেদিন প্রথম বুঝেছিলাম, মানুষ কখনো কখনো সবচেয়ে বড় ক্ষতির মাঝেও অদ্ভুত এক সান্ত্বনা খোঁজে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমরা কি বারবার একইভাবে নিজেদের সান্ত্বনা দিয়ে যাব, নাকি সত্যের মুখোমুখি দাঁড়াব?
সদ্য বাংলাদেশের নির্বাচন শেষ হয়েছে। বিজয়ের ঘণ্টা বেজেছে, সেই সাথে পরাজয়েরও। তারপরও জল্পনা কল্পনা চলছে, চলবেই। কী করণীয় ছিল, কী করা উচিত ছিল না, এই আলোচনা গণতন্ত্রেরই অংশ। জয় পরাজয় থাকবেই, অতীতেও ছিল, ভবিষ্যতেও থাকবে। কিন্তু যে শিক্ষা সবচেয়ে জরুরি, সেটি হলো অজুহাত নয়, সমাধান খুঁজুন।
রাজনীতি কেন করবেন? উদ্দেশ্য কি? সেবা দেবেন, নাকি সেবা নেবেন? শাসন করবেন, নাকি শোষণ করবেন? স্বৈরাচারী হবেন, নাকি কর্মচারীর মতো জনগণের পাশে দাঁড়াবেন? একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করবেন, নাকি গণতন্ত্রকে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করাবেন? দেশ গড়বেন, নাকি শুধু নিজেকে গড়বেন?
এই প্রশ্নগুলো শুধু রাজনীতিবিদদের জন্য নয়, একটি জাতির আত্মপরিচয়ের প্রশ্ন। কারণ রাজনীতি শেষ পর্যন্ত ক্ষমতার খেলা নয়, এটি আস্থার সম্পর্ক।
এ ধরনের চিন্তা ভাবনাকে ব্রেনস্টর্মিং করতে হবে। একটি টু ডু লিস্ট তৈরি করতে হবে। তারপর নিজেকেই প্রশ্ন করতে হবে, গো অর নট গো। কারণ নেতৃত্ব মানে শুধু সামনে দাঁড়ানো নয়, সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাহস।
ধরুন, আপনি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেন দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়া সম্ভব। কীভাবে সম্ভব, সেটাও আপনি জানেন। কিন্তু আপনার কোনো ক্ষমতা নেই, জনগণ আপনার পাশে নেই, তাহলে? ইতিহাস বলে, পরিবর্তন কখনো ক্ষমতা দিয়ে শুরু হয় না, শুরু হয় বিশ্বাস দিয়ে। তারপর সেই বিশ্বাসই একসময় জনশক্তিতে রূপ নেয়।
আমি আজ একটি ক্ষেত্রেই দেশের অগ্রগতি নিঃসন্দেহে দৃশ্যমান, সেটি দুর্নীতি। কথাটি হতাশার শোনালেও এর ভেতরে লুকিয়ে আছে একটি সতর্কবার্তা। কারণ শক্তি নিজে কখনো ভালো বা মন্দ নয়, আমরা তাকে কোন পথে ব্যবহার করছি সেটিই আসল প্রশ্ন।
আলফ্রেড নোবেল ডিনামাইট আবিষ্কার করেছিলেন ধ্বংসের জন্য নয়। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল সুইডেনের দুর্গম পাহাড় কেটে রাস্তা নির্মাণ করা, নর্ডিক দেশগুলোর যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত করা এবং বহির্বিশ্বের সঙ্গে ব্যবসা বাণিজ্যের নতুন দুয়ার খুলে দেওয়া। সেই স্বপ্ন বাস্তব হয়েছিল, যার সুফল আজও চোখে পড়ে। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় একই ডিনামাইট যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়ে লাখো মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়েছে। যে শক্তি উন্নয়নের প্রতীক ছিল, সেটিই পরিণত হয়েছে ধ্বংসের অস্ত্রে।
প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও আমরা যেন একই দ্বিধাবিভক্ত পথের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। অভূতপূর্ব প্রযুক্তিগত অগ্রগতি সত্ত্বেও আমরা তাকে সুশাসনের হাতিয়ার হিসেবে গড়ে তুলতে পারিনি। অথচ চাইলে শতভাগ প্রযুক্তিনির্ভর প্রশাসন, নগদবিহীন লেনদেন, স্বচ্ছ নির্বাচন ব্যবস্থা এবং দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ আজ আর কল্পনা নয়, বাস্তব সম্ভাবনা। প্রশ্ন একটাই, আমরা কি প্রযুক্তিকে অগ্রগতির সিঁড়ি বানাব, নাকি নিজেদের সীমাবদ্ধতার কারণে তাকে ধ্বংসের আরেকটি উপকরণে পরিণত করব?
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আমরা দেখেছি, কত ভালো মানুষের হাত পা কাটা গেল, কত তরুণ তরুণী জীবন দিল, দুর্নীতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ালো। তাদের আত্মত্যাগ আমাদের একটি কঠিন প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়, আমরা কি সত্যিই ন্যায়বিচার চাই, নাকি শুধু ক্ষণিকের প্রতিশোধ? যারা দুর্নীতি করল বা এত মানুষকে হত্যা করল, সবাই জানে তারা কারা। তারপরও কি সেই দুর্নীতিবাজদের শাস্তি হিসেবে হুট করে হাত পা কাটা যাবে? না। কারণ আইনের ঊর্ধ্বে উঠে বিচার করা মানে আবারও অন্যায়কে জন্ম দেওয়া। এখানেই বিবেকের দ্বন্দ্ব।
এই দ্বন্দ্বের মোকাবিলা করা যেমন কঠিন, তেমনি কঠিন পরাজয়কে মেনে নেওয়া। পরাজয় মানুষকে ভেঙেও দেয়, আবার গড়েও তোলে। আমি বহু বছর ধরে খেলাধুলার জগতের সাথে জড়িত। আমার ছেলে মেয়েরা তাদের শৈশব, কৈশোর এবং যৌবনের একটি বড় সময় পার করছে জয় পরাজয়ের মধ্য দিয়ে। জয়ের উল্লাস যেমন মানুষকে আত্মবিশ্বাসী করে, তেমনি পরাজয়ের গ্লানি মানুষকে গভীরভাবে আত্মসমালোচনা করতে শেখায়। চলার পথে আমরা প্রতিনিয়ত এগিয়ে চলেছি। তারপরও আমরা থেমে নেই। কারণ সেই একই প্রশ্ন আমাদের সামনে থাকে, কী, কেন এবং কীভাবে।
স্বাভাবিকভাবেই জয়ের মধ্যে সময় কাটানোর উপলব্ধি আর পরাজয়ের মধ্যে সময় কাটানোর অনুভূতি এক নয়। তবুও মেনে নেওয়া শিখতে হবে। কারণ যে জাতি হার স্বীকার করতে জানে না, সে কখনো জয়ের মর্যাদাও বুঝতে পারে না।
আমাদের সুইডেনের একজন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী প্রায় বলতেন, “jag låter min fru alltid vinna, på så sätt är det jag som bestämmer att hon vinner।” এর বাংলা অর্থ, “আমি সবসময় আমার স্ত্রীকে জিততে দিই, আর এভাবেই আমিই ঠিক করি যে সে জিতবে।” কথাটি রসিকতা মনে হলেও এর ভেতরে লুকিয়ে আছে এক গভীর সত্য, কখনো কখনো ছেড়ে দেওয়াও প্রজ্ঞার পরিচয়, আর সম্মান দিয়েই টেকসই সম্পর্ক তৈরি হয়।
গণতন্ত্রের মূল মন্ত্র হলো agree to disagree, অর্থাৎ দ্বিমত থাকা সত্ত্বেও সহাবস্থান করা। মতের ভিন্নতা কোনো দুর্বলতা নয়, বরং একটি পরিণত সমাজের শক্তি। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই চর্চাটির ভীষণ অভাব বাংলাদেশে। আমরা ভিন্ন মতকে প্রতিপক্ষ ভাবতে শিখেছি, সহযাত্রী হিসেবে দেখতে শিখিনি।
খুব ইচ্ছে জাগে, যদি আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় ন্যূনতম পরিবর্তন এনে মত ও দ্বিমত পোষণের প্রক্রিয়াটিকে শেখানো যেত। কারণ গণতন্ত্র কেবল ব্যালট বাক্সে জন্মায় না, এটি জন্মায় শ্রেণিকক্ষে, পরিবারে, আলোচনায়, এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধার সংস্কৃতিতে।
শেষ পর্যন্ত একটি সত্য অস্বীকার করার উপায় নেই, গণতন্ত্র কোনো আরামদায়ক যাত্রা নয়। এটি প্রশ্ন করে, চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়, কখনো আঘাত করে, আবার নতুন করে পথও দেখায়। তাই অজুহাত নয়, আত্মসমালোচনা দরকার। প্রতিশোধ নয়, ন্যায়বিচার দরকার। বিভাজন নয়, পরিণত সহাবস্থান দরকার।
কারণ একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় শুধু কে জিতল বা হারল তা দিয়ে নয়, বরং আমরা হার থেকে কী শিখলাম এবং জয়কে কতটা দায়িত্বে রূপান্তর করতে পারলাম তা দিয়ে। গণতন্ত্র নিষ্ঠুর হতে পারে, কিন্তু অন্ধ নয়। অন্ধ হলে আমরা।
রহমান মৃধা, গবেষক ও লেখক, প্রাক্তন পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন
rahman.mridha@gmail.com
মত দ্বিমত
গরীব দেশে অথচ দুর্নীতিবাজ কোটিপতিদের সংখ্যা বেশি, ঘটনা কী
বাংলাদেশ এখন এক অদ্ভুত বৈপরীত্যের দেশ। একদিকে উন্নয়নের পরিসংখ্যান, অবকাঠামোর দৃশ্যমান অগ্রগতি, ডিজিটাল রূপান্তরের প্রচার; অন্যদিকে দ্রুত বাড়ছে অস্বচ্ছ সম্পদের মালিক কোটিপতিদের সংখ্যা। প্রশ্নটি তাই ক্রমেই জোরালো হচ্ছে: একটি দেশ যেখানে এখনও নুন আনতে তেল ফুরোয়, বিপুল দরিদ্র জনগোষ্ঠী জীবনযুদ্ধেই ব্যস্ত, সেখানে এত সম্পদ জমছে দুর্নীতিবাজ রাজনীতিবিদদের হাতে, কীভাবে?
কীভাবে এই সম্পদ তৈরি হচ্ছে
অর্থনীতির স্বাভাবিক নিয়ম হলো উৎপাদন, উদ্ভাবন এবং প্রতিযোগিতার মাধ্যমে সম্পদ সৃষ্টি। কিন্তু যখন সম্পদের বড় অংশ আসে ব্যাংক ঋণ খেলাপি, প্রকল্প ব্যয়ের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি, সরকারি ক্রয়ে অনিয়ম, টেন্ডার কারসাজি এবং রাজনৈতিক প্রভাবের মাধ্যমে, তখন তা আর অর্থনৈতিক সাফল্য নয়; বরং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার লক্ষণ। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, লোকসান শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্র বহন করে, আর মুনাফা ব্যক্তির হাতে যায়। ফলে সম্পদ সৃষ্টি হয়, কিন্তু তা জাতীয় সমৃদ্ধিতে রূপ নেয় না।
কেন এমন হচ্ছে
এর পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হলো দুর্বল জবাবদিহি। যখন আইনের প্রয়োগ নির্বাচিতভাবে হয়, তদন্ত ধীরগতির হয়, আর শাস্তির নজির কম থাকে, তখন দুর্নীতি ঝুঁকিপূর্ণ নয়, বরং লাভজনক হয়ে ওঠে। আরও একটি কারণ হলো ক্ষমতা ও অর্থের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। রাজনৈতিক সুরক্ষা অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি করে, আর অর্থ আবার রাজনৈতিক প্রভাব বাড়ায়। এই চক্র ভাঙা কঠিন হয়ে পড়ে।
জনগণের ভূমিকা কী
দুর্নীতির দায় শুধু ক্ষমতাবানদের নয়; সমাজও অনেক সময় নীরব সমর্থক হয়ে ওঠে। দ্রুত সুবিধা পাওয়ার সংস্কৃতি, “সবাই তো করছে” ধরনের মানসিকতা, এবং শক্তিশালী নাগরিক চাপের অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে। যেখানে ভোটাররা নীতির চেয়ে তাৎক্ষণিক সুবিধাকে অগ্রাধিকার দেয়, সেখানে দীর্ঘমেয়াদি সুশাসনের দাবি দুর্বল হয়ে যায়।
বিশ্ব কীভাবে দেখছে
আন্তর্জাতিক সূচকগুলো প্রায়ই দেখায়, বিনিয়োগকারীরা স্থিতিশীলতা চান, কিন্তু একই সঙ্গে চান স্বচ্ছতা এবং আইনের নিশ্চয়তা। যখন দুর্নীতির ধারণা প্রবল হয়, তখন বিদেশি বিনিয়োগ সতর্ক হয়ে পড়ে, আর দেশের ভাবমূর্তি প্রশ্নের মুখে পড়ে। বাংলাদেশের সম্ভাবনা নিয়ে বিশ্ব আশাবাদী, কিন্তু সেই আশার সঙ্গে একটি সতর্কবার্তাও থাকে: টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয় যদি প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হয়।
ডিজিটাল বাংলাদেশ
কিন্তু অর্থনৈতিক প্রভাব কোথায়, ডিজিটালাইজেশন শুধু সেবা দ্রুত করার জন্য নয়; এটি দুর্নীতি কমানোরও শক্তিশালী হাতিয়ার হতে পারত। ই-গভর্ন্যান্স, স্বচ্ছ ডেটা, অনলাইন টেন্ডার, ট্র্যাকযোগ্য লেনদেন বাস্তবায়িত হলে অনিয়ম কমার কথা। কিন্তু প্রযুক্তি তখনই কার্যকর হয়, যখন সেটি ব্যবহারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকে। অন্যথায় ডিজিটাল কাঠামোও কেবল নতুন আকারে পুরোনো সমস্যাকে বহন করে।
জবাবদিহির অনুপস্থিতি
যে রাষ্ট্রে প্রশ্ন করা কঠিন, তথ্য পাওয়া সীমিত, এবং দায় নির্ধারণ বিরল, সেখানে দুর্নীতি ব্যতিক্রম নয়, বরং কাঠামোগত বাস্তবতা হয়ে দাঁড়ায়। জবাবদিহি শুধু আইনি প্রক্রিয়া নয়; এটি একটি সাংস্কৃতিক চর্চা, যা প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম এবং নাগরিক সমাজ মিলেই তৈরি করে।
দুর্নীতি, সন্ত্রাস এবং চাঁদাবাজি: রন্ধ্রে রন্ধ্রে বিস্তার
যখন অর্থনৈতিক অপরাধ শাস্তিহীন থাকে, তখন তা সামাজিক অপরাধকেও উৎসাহ দেয়। চাঁদাবাজি ব্যবসার খরচ বাড়ায়, সন্ত্রাস বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করে, আর সাধারণ মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো অর্থনীতি।
মূল কাঠামোগত কারণগুলো-
১. রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভেতরেই দুর্নীতির আশ্রয়
Transparency International বলছে, অব্যাহত দুর্নীতি, রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা, দুর্বল আইন প্রয়োগ এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা বাংলাদেশের অবস্থার অবনতির বড় কারণ। ক্ষমতার অপব্যবহারের সুযোগ থাকলে এবং জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠানগুলো রাজনৈতিক হয়ে পড়লে দুর্নীতি “ফ্লরিশ” করবেই। অর্থাৎ সমস্যা ব্যক্তি নয়, সিস্টেম।
২. সম্পদের ভয়াবহ অসম বণ্টন
এক গবেষণায় দেখা গেছে, জাতীয় আয়ের ৪৪% মাত্র ১০% মানুষের হাতে, আর নিচের ৫০% পেয়েছে মাত্র ১৭.১%। এমনকি ১% মানুষই ১৬% আয়ের মালিক। এটি দেখায়, সম্পদ তৈরি হচ্ছে, কিন্তু তা অর্থনীতির ভেতর ছড়িয়ে পড়ছে না।
৩. গ্লোবাল করাপশন ইকোনমি
প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ডলার চুরি হয়, যার বড় অংশ উন্নয়নশীল দেশ থেকে পাচার হয়ে যায়। এই অর্থ যদি চুরি না হতো, তাহলে GDP বাড়ত এবং বৈষম্য কমত। অর্থাৎ দুর্নীতি শুধু নৈতিক সমস্যা নয়, এটি সরাসরি উন্নয়নকে ধ্বংস করে।
৪. অলিগার্কি ও অর্থনীতি লুটের অভিযোগ
এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, প্রায় ২৩৪ বিলিয়ন ডলার সরকারি তহবিল ১৫ বছরে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে, এবং প্রবৃদ্ধির একটি অংশ “কৃত্রিম” ছিল বলে অভিযোগ উঠেছে। আরেক তদন্তে দেখা যায়, এক রাজনীতিকের বিদেশে ৪৮২টি সম্পত্তি ছিল, যা জটিল অর্থপাচারের মাধ্যমে গড়ে ওঠার সন্দেহ। এটি আর বিচ্ছিন্ন দুর্নীতি নয়; এটি সংগঠিত সম্পদ স্থানান্তর।
৫. ব্যাংক ও আর্থিক ব্যবস্থার দখল
কিছু ক্ষেত্রে নিরাপত্তা কাঠামোর সহায়তায় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া এবং বিপুল অর্থ সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে; ফলে খেলাপি ঋণ ৩২% পর্যন্ত পৌঁছেছে। যখন ব্যাংক দুর্বল হয়, তখন পুরো অর্থনীতি ঝুঁকিতে পড়ে।
৬. বৈশ্বিক সূচকে সতর্কবার্তা
২০২৫ সালে বাংলাদেশ ১০০ এর মধ্যে মাত্র ২৪ স্কোর পেয়েছে এবং “serious corruption problem” হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এটি বিনিয়োগ, আস্থা এবং আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে।
গভীরতর বাস্তবতা: কেন দরিদ্র দেশে দ্রুত ধনী তৈরি হয়?
• আইন দুর্বল, ঝুঁকি কম
• ক্ষমতার ঘনত্ব, সুযোগ বেশি
• বৈষম্য বেশি, প্রতিরোধ কম
• রাজনৈতিক সুরক্ষা, শাস্তি কম
এই চারটি একসঙ্গে হলে “দ্রুত সম্পদ” তৈরি হয়, কিন্তু “টেকসই অর্থনীতি” তৈরি হয় না।
কঠিন শেষ স্টেটমেন্ট
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সংকট দারিদ্র্য নয়। সবচেয়ে বড় সংকট হলো অন্যায্য সম্পদ সৃষ্টি স্বাভাবিক হয়ে যাওয়া। যে দেশে ধনী হওয়া যদি উৎপাদনের চেয়ে ক্ষমতার কাছাকাছি থাকার ওপর নির্ভর করে, তাহলে সেখানে উন্নয়ন কাগজে বাড়ে, বাস্তবে নয়। রাষ্ট্র তখন আর সুযোগের ক্ষেত্র থাকে না; হয়ে ওঠে সম্পদ স্থানান্তরের যন্ত্র।
ইতিহাস একটি নির্মম সত্য শেখায়:
অসমতা সহ্য করতে পারে সমাজ, কিন্তু অন্যায্য সম্পদকে দীর্ঘদিন মেনে নেয় না। যেদিন সাধারণ মানুষ বিশ্বাস হারায় যে পরিশ্রম নয়, প্রভাবই সফলতার পথ, সেদিন থেকেই অর্থনৈতিক সংকট নয়, রাষ্ট্রীয় আস্থার পতন শুরু হয়।
লেখক: রহমান মৃধা, গবেষক ও লেখক, প্রাক্তন পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন
rahman.mridha@gmail.com
মত দ্বিমত
জুলাই বিপ্লবের প্রজন্ম: পরিবর্তনের অগ্নিশিখা না নতুন রাষ্ট্রচিন্তার সূচনা?
ছাত্রনেতৃত্বে এক অভ্যুত্থান শুধু সরকার পরিবর্তন করেনি, বরং প্রশ্ন তুলেছে ক্ষমতা, গণতন্ত্র এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রব্যবস্থা নিয়ে।ইতিহাসের কিছু মুহূর্ত থাকে যা কেবল একটি রাজনৈতিক ঘটনা নয়, বরং একটি জাতির মানসিক রূপান্তরের সূচনা। বাংলাদেশের জুলাই বিপ্লব তেমনই একটি মুহূর্ত। ছাত্রদের নেতৃত্বে শুরু হওয়া এই আন্দোলন শেষ পর্যন্ত এমন এক গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়, যার ফলে দীর্ঘদিনের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।
এই আন্দোলনের শুরু ছিল সরকারি চাকরির কোটা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ছাত্রদের প্রতিবাদ থেকে, কিন্তু দ্রুত তা জাতীয় বিদ্রোহে পরিণত হয়। এখানেই নতুন প্রজন্মের চরিত্র স্পষ্ট হয়: তারা কেবল একটি নীতির পরিবর্তন চায়নি, তারা রাষ্ট্রের কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। কিন্তু এই প্রজন্ম কি সত্যিই অতীত থেকে আলাদা?
হ্যাঁ, একটি বড় অর্থে আলাদা। তারা ক্ষমতার উত্তরাধিকারকে স্বাভাবিক ধরে নেয় না। তারা বৈষম্যহীন সমাজের স্বপ্নে সংগঠিত হয়েছে, যেমন ‘বৈষম্যের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীরা’ প্ল্যাটফর্মটি দেখায়, যা আন্দোলনের মাধ্যমে রাজনৈতিক পরিসর গড়ে তুলতে কাজ করেছে। এই তরুণ নেতৃত্বের মধ্যেই উঠে এসেছে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নাম।
নাহিদ ইসলাম, যিনি ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক ছিলেন, এক পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগের এক দফা দাবি ঘোষণা করে বিপ্লবের সবচেয়ে পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন। পরে তিনি অন্তর্বর্তী সরকারেও দায়িত্ব পালন করেন। অন্যদিকে, নাসিরউদ্দিন পাটোয়ারী জাতীয় নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে একটি বৈষম্যহীন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্র গঠনের লক্ষ্যে প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছেন।
ঢাকা-৮ আসনের মতো রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এক মঞ্চে নাসিরউদ্দিন পাটোয়ারীর প্রার্থিতা শুধু একটি নির্বাচন নয়, বরং নতুন ধারার রাজনীতির এক প্রতীকী পরীক্ষা। জাতীয় নাগরিক পার্টি তাঁকে এই আসনে প্রার্থী করেছে, যা তরুণ নেতৃত্বের সামনে আসার একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করে। কিন্তু তাঁর পথ মোটেই মসৃণ নয়। প্রচারণার সময় তাঁকে লক্ষ্য করে ডিম নিক্ষেপ ও হয়রানির ঘটনা ঘটেছে, যা রাজনৈতিক মতভেদের প্রতি অসহিষ্ণুতার প্রশ্ন তুলে দিয়েছে এবং তদন্তের নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
তবু এখানেই এই গল্পের মোড়। প্রতিকূলতার মুখে দাঁড়িয়েও তাঁর অংশগ্রহণ দেখায় যে রাজনীতি কেবল ক্ষমতার প্রতিযোগিতা নয়, বরং ধারণা, সাহস এবং সামাজিক চিন্তারও প্রতিযোগিতা। ঢাকা-৮-এর লড়াই তাই একটি আসনের সীমা ছাড়িয়ে ভিন্ন মতের সহাবস্থান, অংশগ্রহণমূলক রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং নতুন প্রজন্মের আত্মপ্রকাশের প্রতীক হয়ে উঠছে। যখন একটি প্ল্যাটফর্ম সমাজকে শুধু বিনোদনের আলোচনায় আটকে না রেখে চিন্তার পরিসরকে বিস্তৃত করতে চায়। তখন সেই রাজনীতি ধীরে ধীরে বিশ্বদরবারে নিজের ভাষা তৈরি করে। আর সেই ভাষার কেন্দ্রে থাকে একটি বার্তা: ভয় নয়, ভবিষ্যৎই শেষ পর্যন্ত ইতিহাস লিখে। এটি শুধু নেতৃত্ব নয়, একটি দৃষ্টিভঙ্গির ইঙ্গিত। পরিবর্তনের দর্শন: পরিষ্কার না হলেও শক্তিশালী।
সমালোচকেরা বলেন, নতুন প্রজন্মের পরিকল্পনা সবসময় স্পষ্ট নয়। সত্যি বলতে, বিপ্লবের ভাষা প্রায়ই অসম্পূর্ণ হয়। কিন্তু অসম্পূর্ণতা মানেই দুর্বলতা নয়। জুলাই ঘোষণাপত্রে রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক সংস্কার, গণতান্ত্রিক পুনর্গঠন এবং বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
অর্থাৎ, এই আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল একটি বড় প্রশ্ন: রাষ্ট্র কাদের জন্য? ত্যাগের মূল্য এই বিপ্লব ছিল রক্তহীন নয়। সহিংসতার সময় এক হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হন, যা দেশের স্বাধীনতার পর সবচেয়ে প্রাণঘাতী সময়গুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত। এটি মনে করিয়ে দেয়, পরিবর্তন কখনোই বিনামূল্যে আসে না। ভুল, বিভ্রান্তি এবং বাস্তবতা যে কোনো গণআন্দোলনের মতো এখানেও বিতর্ক আছে। কেউ কেউ অভিযোগ তুলেছেন যে বিপ্লবের স্মৃতি রাজনৈতিকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে, যার বিরুদ্ধে নাগরিক নেতারা সতর্ক করেছেন। এই সতর্কবার্তা গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ একটি বিপ্লব তখনই সফল হয়, যখন তা ক্ষমতার নতুন কেন্দ্রে পরিণত না হয়ে প্রতিষ্ঠান তৈরি করে। নতুন পৃথিবীর ইঙ্গিত আজকের বিশ্বে তরুণরা আর কেবল দর্শক নয়। তারা রাষ্ট্রের অংশীদার হতে চায়। বাংলাদেশের ঘটনাপ্রবাহ দেখায়, ঐক্য এমন এক শক্তি যা কেনা যায় না।
এই প্রজন্ম হয়তো সব প্রশ্নের উত্তর জানে না। কিন্তু তারা একটি প্রশ্ন করতে শিখেছে: কেন নয় এবং ইতিহাসে প্রায় সব বড় পরিবর্তন শুরু হয়েছে এই প্রশ্ন থেকেই। সবচেয়ে বড় পরীক্ষা এখন স্বৈরাচারী পরিবার ও সরকারের পতন বিপ্লবের শেষ নয়, বরং শুরু।
নতুন নেতৃত্ব কি প্রতিষ্ঠান গড়তে পারবে? তারা কি ব্যক্তিনির্ভর রাজনীতি ভেঙে নীতিনির্ভর রাষ্ট্র তৈরি করবে? তারা কি আবেগকে নীতিতে রূপ দিতে পারবে? যদি পারে, তবে জুলাই শুধু একটি মাসের নাম থাকবে না। এটি হয়ে উঠবে একটি রাজনৈতিক পুনর্জন্মের প্রতীক।
পরিশেষে একটি আহ্বান বাংলাদেশ আজ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। তরুণরা দেখিয়ে দিয়েছে সাহস কাকে বলে। এখন তাদের প্রমাণ করতে হবে প্রজ্ঞা কাকে বলে। কারণ বিপ্লবের সবচেয়ে কঠিন কাজ হলো ক্ষমতা দখল নয়,ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা। জাগো বাংলাদেশ জাগো কিন্তু এবার শুধু প্রতিবাদে নয়, রাষ্ট্রগঠনে।
রহমান মৃধা, গবেষক ও লেখক, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন
rahman.mridha@gmail.com
মত দ্বিমত
বাংলাদেশ কি তথ্যযুদ্ধের মধ্যে ঢুকে পড়েছে?
সাম্প্রতিক সময়ে গণমাধ্যমের একটি ফেসবুক ভেরিফায়েড পেইজে জামায়াতের আমিরকে ঘিরে একটি মন্তব্য ছড়িয়ে পড়ে, যা দ্রুত ভাইরাল হয়ে সারা দেশে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। প্রযুক্তির এই যুগে, যেখানে নারী বিশ্বনেতৃত্ব দিচ্ছে, আরব সভ্যতায় পরিবর্তন ঘটছে, এবং ইসলামের ইতিহাসেই হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সহধর্মিণী হজরত খাদিজা (রা:) ছিলেন একজন সফল ব্যবসায়ী ও সমাজে সম্মানিত প্রতিনিধি, সেই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে নারীদের কাজ করাকে পতিতাবৃত্তির সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে বলে প্রচারিত হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়।
পরবর্তী তদন্তে উঠে এসেছে, সংশ্লিষ্ট ভেরিফায়েড পেইজটি হ্যাক করা হয়েছিল এবং এই বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো হয়েছিল বিশেষ করে আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে একটি রাজনৈতিক দলকে প্রশ্নবিদ্ধ করার উদ্দেশ্যে। ঘটনাটি শুধু একটি গুজব নয়, এটি দেখিয়ে দেয় কত সহজে একটি সাজানো বার্তা সমাজে ক্ষোভ, বিভাজন এবং রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি করতে পারে। এই ঘটনাই একটি বড় বাস্তবতা সামনে আনে, ডিজিটাল যুগে সত্য প্রকাশ পাওয়ার আগেই মিথ্যা জনমত গড়ে তুলতে পারে। আর যখন একটি ভুয়া বার্তা জাতীয় বিতর্কে পরিণত হয়, তখন সেটি আর কেবল একটি পোস্ট থাকে না সেটি হয়ে ওঠে তথ্যযুদ্ধের অংশ।
বাংলাদেশ এখন শুধু রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেই নেই, দেশটি ধীরে ধীরে একটি গভীর তথ্যসংকটে প্রবেশ করছে। নির্বাচনের আগে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার অভিযোগকে অন্তর্বর্তী সরকার ডিসইনফরমেশন বলে উড়িয়ে দিয়েছে এবং দাবি করেছে, দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে ইচ্ছাকৃতভাবে এসব ছড়ানো হচ্ছে। অন্যদিকে একটি বড় জরিপে দেখা গেছে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে খুব বেশি পরিমাণে ভুয়া খবর তরুণদের মানসিক চাপের প্রধান কারণ হয়ে উঠেছে। এই দুটি ঘটনা একসাথে একটি কঠিন প্রশ্ন তুলে ধরে: কোন তথ্য সত্য, আর কোনটি রাজনৈতিক অস্ত্র?
ভুয়া তথ্যের বিস্ফোরণ, সংখ্যাই বলছে বিপদের কথা। স্বাধীন ফ্যাক্ট-চেকিং সংস্থা রুমর স্ক্যানার-এর প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২৫ সালের প্রথম তিন মাসে বাংলাদেশে ৮৩৭টি ভুয়া বা বিভ্রান্তিকর তথ্য শনাক্ত হয়েছে, যা আগের সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি। ভুল তথ্যের হার আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২৮ শতাংশ বেশি। রাজনৈতিক ঘটনা, জাতীয় ইস্যু এবং ধর্মীয় বিতর্ক এই বৃদ্ধির প্রধান কারণ। ৭৪৮টি ভুয়া তথ্য ফেসবুক থেকে ছড়িয়েছে, অর্থাৎ গড়ে প্রতিদিন আটটিরও বেশি। বিশ্লেষণে আরও দেখা গেছে, মোট বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট ৩০ শতাংশ বেড়েছে এবং দুই-তৃতীয়াংশ ফ্যাক্ট-চেক ছিল রাজনৈতিক। স্বাধীন ফ্যাক্ট-চেকিং সংস্থার প্রতিবেদনে উঠে আসা এই পরিসংখ্যান শুধু তথ্যের পরিমাণই নয়, বরং একটি রাষ্ট্রের তথ্যপরিবেশ কত দ্রুত দূষিত হতে পারে, সেই সতর্কবার্তাও বহন করে।
নির্বাচন সামনে, তাই কি গুজবও অস্ত্র? একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যাচাই করা ভুয়া দাবির প্রায় ৬৩ শতাংশই রাজনৈতিক, এবং এর অর্ধেক ছিল বানানো সমাবেশ, সংঘর্ষ বা নেতাদের ভুয়া বক্তব্য নিয়ে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সবচেয়ে বেশি ভুয়া বয়ানের লক্ষ্য হয়েছেন, যার ৮০ শতাংশ তাকে ইতিবাচকভাবে উপস্থাপন করেছে। অর্থাৎ অপপ্রচার শুধু প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করছে না; অনেক ক্ষেত্রে জনপ্রিয়তা তৈরির হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে। উদ্বেগের বিষয় হলো, বিভ্রান্তিকর তথ্য এখন আর প্রান্তিক কোনো সমস্যা নয়; এটি জনমত নির্মাণের একটি কৌশলগত উপাদানে পরিণত হয়েছে।
রাষ্ট্র, রাজনীতি, বিদেশি প্রভাব, জটিল ত্রিভুজ। ফ্যাক্ট-চেক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে যে নিরাপত্তা বাহিনী সম্পর্কেও ৬০টি ভুল দাবি ছড়ানো হয়েছে এবং ভারতীয় মিডিয়া ও সামাজিক মাধ্যম মিলিয়ে অন্তত ৮৩টি বিভ্রান্তিকর ঘটনার সঙ্গে যুক্ত ছিল। এটি একটি বিপজ্জনক সংকেত, কারণ তথ্যযুদ্ধ যখন সীমান্ত ছাড়িয়ে যায়, তখন তা কূটনৈতিক উত্তেজনায়ও রূপ নিতে পারে।
সমাজ কেন এত সহজে গুজবে বিশ্বাস করছে? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বড় রাজনৈতিক ঘটনা, ধর্মীয় উত্তেজনা এবং অনলাইন মেরুকরণ ভুল তথ্য ছড়ানোর গতি বাড়িয়েছে। অতীতে একটি গুজব ছড়িয়ে পড়েছিল যে পদ্মা সেতুর জন্য মানববলির প্রয়োজন, এবং সেই ভুল তথ্য প্রাণহানির ঘটনাও ঘটিয়েছিল। অর্থাৎ ভুয়া খবর শুধু মতামত বদলায় না, জীবনও কেড়ে নিতে পারে।
সরকার কী করছে, আর কী করা উচিত? তরুণদের অধিকাংশই মনে করে ক্ষতিকর অনলাইন আচরণ ঠেকাতে নিয়ম থাকা জরুরি। কিন্তু এখানে সবচেয়ে বড় দ্বন্দ্ব হলো: অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ দিলে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ঝুঁকিতে পড়ে, আর নিয়ন্ত্রণ না দিলে রাষ্ট্র অস্থিতিশীল হতে পারে। এই ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন সরকারের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। সমস্যাটি শুধু কে মিথ্যা বলছে তা নয়; বড় প্রশ্ন হলো, নাগরিকরা কোন উৎসকে বিশ্বাস করবে। যখন বিশ্বাসের কেন্দ্রগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন গণতন্ত্রের ভিত্তিও অদৃশ্যভাবে ক্ষয় হতে শুরু করে।
প্রতিরক্ষা ও রাষ্ট্রীয় সংস্থার ভূমিকা। ভুল তথ্য যখন সেনাবাহিনী বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে লক্ষ্য করে ছড়ায়, তখন তা শুধু রাজনৈতিক নয়, জাতীয় নিরাপত্তার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। আধুনিক রাষ্ট্রে নিরাপত্তা মানে শুধু সীমান্ত রক্ষা নয়; তথ্যের নিরাপত্তাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সবচেয়ে বড় বিপদ: বিশ্বাসের পতন। একটি রাষ্ট্র তখনই দুর্বল হয় যখন নাগরিকরা আর কোনো উৎসকে বিশ্বাস করতে পারে না। আজ বাংলাদেশের সামনে তিনটি বাস্তব ঝুঁকি দাঁড়িয়ে আছে: সত্যের সংকট, গণতন্ত্রের সংকট, এবং আন্তর্জাতিক মর্যাদার সংকট। ইতিহাস দেখায়, কোনো রাষ্ট্র হঠাৎ ভেঙে পড়ে না; ভাঙন শুরু হয় তখনই, যখন সত্য নিয়ে সামাজিক ঐকমত্য হারিয়ে যায়।
বাংলাদেশ এখনো ভেঙে পড়েনি, কিন্তু সতর্ক না হলে ভাঙনের ভিত্তি তৈরি হবে। রাষ্ট্রকে অবিলম্বে স্বাধীন ও শক্তিশালী ফ্যাক্ট-চেকিং ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, রাজনৈতিক দলগুলোর অপপ্রচারকে আইনের আওতায় আনতে হবে, এবং ডিজিটাল সাক্ষরতা জাতীয় আন্দোলনে পরিণত করতে হবে। কারণ একটি সত্য স্পষ্ট: বন্দুক রাষ্ট্রকে যতটা না দুর্বল করে, মিথ্যা তার চেয়েও দ্রুত রাষ্ট্রকে ভেঙে দেয়।
শেষ কথা। বাংলাদেশ আজ এক মোড়ে দাঁড়িয়ে। এটি কি তথ্যনির্ভর আধুনিক রাষ্ট্র হবে, নাকি গুজবনির্ভর অস্থির সমাজে পরিণত হবে? সিদ্ধান্ত এখনই নিতে হবে। কারণ ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, গণতন্ত্র নির্বাচন হারিয়ে ধ্বংস হয় না; গণতন্ত্র ধ্বংস হয় যখন সত্য হারিয়ে যায়।
রহমান মৃধা, গবেষক ও লেখক, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন
rahman.mridha@gmail.com



