আন্তর্জাতিক
ডলারের বিকল্প গড়ে তুলতে হরমুজ ঘিরে চীন-ইরানের মহাপরিকল্পনা
ইরানের বিপক্ষে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ গত এক মাসেরও বেশি সময় ধরে বৈশ্বিক অর্থনীতিকে ব্যাপকভাবে অস্থির করে তুলেছে। এমন সময়ে এসে আজ বুধবার (৮ এপ্রিল) দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। এই পরিস্থিতির মধ্যেই আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার একটি পুরোনো বিতর্ককে সামনে এনে নতুন করে আলোচনা শুরু করেছে ইরান ও চীন।
ইরান ও চীনের অভিযোগ, বিশ্ব অর্থনীতিতে মার্কিন ডলারের আধিপত্য বা ‘ডলার হেজেমনি’ শেষ হওয়া উচিত।
এ ছাড়া মার্কিনিদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ রয়েছে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ডলারের প্রাধান্য ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্র তার প্রতিপক্ষ ও প্রতিদ্বন্দ্বীদের ওপর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ করে আসছে।
২০২৩ সালে জেপি মর্গান চেজের একটি অনুমান অনুযায়ী, বৈশ্বিক তেল বাজারের প্রায় ৮০ শতাংশ লেনদেন এখনো ডলারে নিষ্পত্তি হয়, যা এই মুদ্রার বৈশ্বিক আধিপত্যকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।
হরমুজ প্রণালি ও ‘ইউয়ান’ ব্যবহারের উদ্যোগ
বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ হলো হরমুজ প্রণালি, যেখান দিয়ে উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবাহিত হয়। এই প্রণালি নিয়ন্ত্রণের অবস্থান কাজে লাগিয়ে চীনা মুদ্রা ইউয়ানকে বিকল্প হিসেবে সামনে আনতে চাইছে ইরান ও চীন।
বিভিন্ন প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ইরান এখন কার্যত একটি ‘টোল বুথ’ ব্যবস্থা চালু করেছে, যেখানে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে ইউয়ানে ট্রানজিট ফি পরিশোধ করতে হচ্ছে। যদিও কতগুলো জাহাজ ইতিমধ্যে এই অর্থ পরিশোধ করেছে তা স্পষ্ট নয়, তবে অন্তত দুটি জাহাজ ২৫ মার্চ পর্যন্ত ইউয়ানে অর্থ পরিশোধ করেছে বলে জানিয়েছে লয়েডস লিস্ট।
চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ও সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে এই তথ্যের ইঙ্গিতপূর্ণ স্বীকৃতি দিয়েছে।
এদিকে ইরানের জিম্বাবুয়ের দূতাবাস এক পোস্টে জানিয়েছে, বৈশ্বিক তেল বাজারে ‘পেট্রোইউয়ান’ যুক্ত করার সময় এসেছে।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে হওয়া একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তির অংশ হিসেবে বুধবার থেকে পরবর্তী দুই সপ্তাহ হরমুজ প্রণালিতে নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করার কথা বলেছে তেহরান। তবে এ বিষয়ে চীন বা ইরান কোনো পক্ষই আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করেনি।
হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদ ও সাবেক আইএমএফ প্রধান অর্থনীতিবিদ কেনেথ রোগফ বলেন, ‘একদিকে ইরান যুক্তরাষ্ট্রকে রাজনৈতিকভাবে চ্যালেঞ্জ জানাতে ইউয়ান ব্যবহারের বিষয়টি সামনে আনছে, অন্যদিকে এটি নিষেধাজ্ঞা এড়ানো এবং চীনের সঙ্গে সম্পর্ক আরো গভীর করার কৌশল।’
‘বহু মেরুকেন্দ্রিক’ আর্থিক ব্যবস্থার ধারণা
ইরান ও চীনের মতে, ইউয়ানের ব্যবহার উভয় দেশের জন্যই লাভজনক। এতে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা-নির্ভর আর্থিক ব্যবস্থাকে পাশ কাটানো সহজ হয় এবং দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের খরচও কমে।
২০২১ সালে স্বাক্ষরিত ২৫ বছরের কৌশলগত অংশীদারি চুক্তির পর থেকে দুই দেশের বাণিজ্য দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে।
যুক্তরাজ্যের কিল বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ বোলেন্ট গোকেই বলেন, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করার গুরুত্ব বোঝে এবং ইউয়ানের ব্যবহার সেই কৌশলের অংশ।
তিনি আরো বলেন, চীনের লক্ষ্য হলো একটি ‘মাল্টিপোলার বা বহুমেরুকেন্দ্রিক আর্থিক বিশ্ব’ গঠন করা, যেখানে ডলারের একক আধিপত্যের পরিবর্তে বিভিন্ন দেশের মুদ্রা প্রভাব বিস্তার করবে।
বর্তমানে ইরানের রপ্তানি হওয়া তেলের ৮০ শতাংশেরও বেশি কিনে নেয় চীন। ইউয়ানের মাধ্যমে অনেক সময় ছাড় দেওয়া মূল্যে তা কিনে নেয় দেশটি। বিনিময়ে ইরান চীন থেকে যন্ত্রপাতি, ইলেকট্রনিক্স ও শিল্পপণ্য আমদানি করে।
ডলারের আধিপত্য কতটা শক্তিশালী
বিশ্লেষকদের মতে, ইউয়ানের ব্যবহার বাড়লেও বৈশ্বিক মুদ্রা হিসেবে ডলারের বিকল্প হওয়া এখনো অনেক দূরের বিষয়।
চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিং ২০২৪ সালে এক বক্তব্যে ইউয়ানকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সাধারণ মুদ্রা ও ভবিষ্যতের বৈশ্বিক রিজার্ভ মুদ্রা হিসেবে দেখতে চান বলে আশা প্রকাশ করেন।
তবে বাস্তবতা হলো, চীনের কঠোর পুঁজি নিয়ন্ত্রণের কারণে ইউয়ান এখনো সম্পূর্ণভাবে বিনিময়যোগ্য নয়। ফলে বৈশ্বিক পর্যায়ে এর গ্রহণযোগ্যতা সীমিত।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল আইএমএফ-এর তথ্য অনুযায়ী, গত বছর বৈশ্বিক রিজার্ভের ৫৭ শতাংশ ছিল ডলারে, ২০ শতাংশ ইউরোতে এবং মাত্র ২ শতাংশ ইউয়ানে। এছাড়া ২০২৪ সালে আন্ত সীমান্ত বাণিজ্যের মাত্র ৩.৭ শতাংশ ইউয়ানে নিষ্পত্তি হয়েছে, যা ২০১২ সালের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি (১ শতাংশেরও কম) হলেও এখনো সীমিত।
ন্যাটিক্সিসের এশিয়া-প্যাসিফিক প্রধান অর্থনীতিবিদ অ্যালিসিয়া গার্সিয়া হিরেরো বলেন, ইউয়ানের ব্যবহার বৃদ্ধি ডলারের আধিপত্যকে কিছুটা চাপ দিলেও এটি ‘ডি-ডলারাইজেশন’ ঘটানোর মতো নয়।
ধীরে ধীরে পরিবর্তনের ইঙ্গিত
ব্রাসেলসভিত্তিক ইউরোপিয়ান সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিটিক্যাল ইকোনমির পরিচালক হসুক লি মাকিয়ামা মনে করেন, ইরান-চীন বাণিজ্য ডলারের বিকল্প গড়ে তুলতে পারে না, তবে এটি নির্দিষ্ট খাতে প্রভাব ফেলতে পারে।
অন্যদিকে ডিফারেন্স গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা ড্যান স্টেইনকব বলেন, ডলারের আধিপত্য দ্রুত শেষ না হলেও ইউয়ানের ব্যবহার ধীরে ধীরে সেই আধিপত্যকে ‘ক্ষয়’ করতে পারে।
অর্থনীতিবিদ কেনেথ রগোফ আরো বলেন, ভবিষ্যতে পরিস্থিতি নির্ভর করবে এই সংঘাতের ফলাফলের ওপর। যদি ইরান ও চীন কৌশলগতভাবে সফল হয়, তবে অনেক দেশ নিজেদেরকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা থেকে রক্ষা করতে ডলার নির্ভরতা কমাবে।
বিশ্লেষকদের মতে সার্বিক চিত্র
তবে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, এটি তাৎক্ষণিক কোনো পরিবর্তন নয় বরং দীর্ঘমেয়াদে ধীরে ধীরে ডলারের প্রভাব কমার একটি প্রক্রিয়া।
চীনের সঙ্গে ইরানের এই আর্থিক সমন্বয়কে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে একটি ‘সামান্য কিন্তু ধারাবাহিক চাপ’ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা, যা ডলারের একক আধিপত্যকে সম্পূর্ণ ভাঙার চেয়ে ধীরে ধীরে বিকল্প ব্যবস্থার গ্রহণযোগ্যতা বাড়াচ্ছে।
বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থায় ডলারের এই অবস্থান পরিবর্তন আদৌ কতটা সম্ভব হবে, তা নির্ভর করছে আগামী বছরগুলোর ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি ও শক্তির ভারসাম্যের ওপর।
আন্তর্জাতিক
অবরোধ-যুদ্ধের প্রভাবে তেলের দাম ১২০ ডলার ছাড়াল, বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দার শঙ্কা
বিশ্ব অর্থনীতিতে এক বিশাল প্রকম্পন সৃষ্টি করে অপরিশোধিত তেলের দাম গত চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছেছে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ এবং ইরানের ওপর মার্কিন প্রশাসনের ‘দীর্ঘমেয়াদি’ অবরোধ আরোপের অনড় অবস্থানের খবরে বিশ্ববাজারে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১২০ ডলারের মাইলফলক স্পর্শ করেছে।
বুধবার লেনদেনের একপর্যায়ে এটি ১২২ ডলারে উঠে গিয়েছিল, যা ২০২২ সালের পর বিশ্ব দেখেনি। বৃহস্পতিবার সকালেও এই দাম ১২০ ডলারের ওপরে স্থিতিশীল রয়েছে, যা বিশ্বজুড়ে নতুন করে মূল্যস্ফীতির আতঙ্ক ছড়িয়ে দিচ্ছে।
গত মঙ্গলবার হোয়াইট হাউসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে জ্বালানি খাতের দানব প্রতিষ্ঠান শেভরনের প্রধান নির্বাহী মাইক ওয়ার্থসহ শীর্ষ কর্মকর্তাদের একটি রুদ্ধদ্বার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। আনুষ্ঠানিকভাবে এই বৈঠকের উদ্দেশ্য মার্কিন ভোক্তাদের ওপর যুদ্ধের প্রভাব কমানো বলা হলেও, বাজারের বিশ্লেষকরা একে অন্য চোখে দেখছেন।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বৈঠকের পর একটি বার্তা স্পষ্ট হয়েছে, ওয়াশিংটন হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার চেয়ে ইরানের বন্দরগুলোতে চলমান অবরোধকে আরও দীর্ঘায়িত করার দিকেই বেশি মনোযোগ দিচ্ছে।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের তথ্যমতে, ট্রাম্প সরাসরি নির্দেশ দিয়েছেন যেন ইরানের তেল রপ্তানি এবং বন্দর কেন্দ্রিক কার্যক্রম পুরোপুরি অচল করে রাখা হয়। এর জবাবে তেহরানও তাদের ‘পাল্টা কামড়’ দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে, যার ফলে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল এখন এক অনিশ্চিত ভাগ্যের মুখে।
বিশ্বের মোট তেল ও তরল প্রাকৃতিক গ্যাস (LNG) সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ বা এক-পঞ্চমাংশ যে জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়, সেই হরমুজ প্রণালি এখন কার্যত একটি রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া সংঘাতের পর ইরান এই প্রণালিতে কড়াকড়ি আরোপ করে। তেহরানের সাফ কথা, তাদের জলসীমার কাছে কোনো জাহাজ এলে তা হামলার শিকার হতে পারে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী ঘোষণা দিয়েছে যে ইরানের দিকে যাওয়া বা সেখান থেকে আসা যেকোনো জাহাজ তারা রুখে দেবে। যদিও বিবিসি ভেরিফাইয়ের তথ্যমতে, অন্তত চারটি ইরানি জাহাজ মার্কিন কঠোর নজরদারি এড়িয়ে বেরিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে, তবে সামগ্রিক সরবরাহ ব্যবস্থা এখন ভেঙে পড়ার উপক্রম। ১৭ এপ্রিল ইসরায়েল-লেবানন যুদ্ধবিরতির সময় তেলের দাম সাময়িকভাবে ব্যারেলপ্রতি ৯০ ডলারে নামলেও, গত ১২ দিনের মার্কিন কঠোরতায় তা আবার আকাশচুম্বী হয়েছে।
অর্থনৈতিক চাপের মুখে ইরানের জনজীবন এখন বিপর্যস্ত। দেশটির পরিসংখ্যান কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, বার্ষিক মূল্যস্ফীতি এখন ৫৩.৭ শতাংশে পৌঁছেছে, যা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। ইরানি মুদ্রা রিয়ালের মান ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে।
যুদ্ধ এবং অবরোধের প্রত্যক্ষ প্রভাবে প্রায় ২০ লাখ মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। তেল রপ্তানি প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে আসায় রাষ্ট্রীয় কোষাগার রিক্ত হচ্ছে। যদিও তেহরান দাবি করছে তারা বিকল্প পথে বাণিজ্য চালিয়ে যাবে, তবে বিশ্ববাজারের অস্থিরতা সেই দাবিকে ফিকে করে দিচ্ছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প তার সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ ইরানকে ‘বুদ্ধিমান সিদ্ধান্ত’ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তার কৌশলী অবস্থান হলো, সরাসরি বোমা হামলা না চালিয়ে অবরোধের মাধ্যমে ইরানের অর্থনীতিকে শ্বাসরোধ করা, যাতে তারা দ্রুত সমঝোতার টেবিলে বসতে বাধ্য হয়।
বিশ্বব্যাংক এক ভয়াবহ পূর্বাভাসে জানিয়েছে, মে মাসে যদি এই সংঘাতের কোনো সমাধানও আসে, তবুও ২০২৬ সালে জ্বালানির দাম অন্তত ২৪ শতাংশ বাড়তে পারে। ইউক্রেন যুদ্ধের পর এটিই হবে জ্বালানি বাজারের বৃহত্তম ধাক্কা।
এর নেতিবাচক প্রভাব ইতিমধ্যে বিশ্ব শেয়ারবাজারে পড়তে শুরু করেছে।
যুক্তরাজ্যের এফটিএসই ১০০ সূচক: ১.২ শতাংশ পতন।
ফ্রান্সের এসএসি সূচক: ০.৩৯ শতাংশ হ্রাস।
জার্মানির ডিএএক্স সূচক: ০.২৭ শতাংশ কমেছে।
ইউরোপীয় শেয়ারবাজারে এই রক্তক্ষরণ প্রমাণ করে যে, বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘমেয়াদি একটি অর্থনৈতিক মন্দার আশঙ্কা করছেন। এক্সটিবির গবেষণা পরিচালক ক্যাথলিন ব্রুকসের মতে, বাজার এখন এই সত্যটি মেনে নিয়েছে যে ইরানের ওপর অবরোধ স্বল্পমেয়াদি কোনো বিষয় নয়।
তেলের দাম ১২০ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়া কেবল একটি সংখ্যা নয়, এটি উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এক অশনিসংকেত। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার অর্থ হলো পরিবহন খরচ বৃদ্ধি, যা সরাসরি খাদ্যদ্রব্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেবে।
যুক্তরাষ্ট্র যখন নিজের মজুত বাড়াতে ব্যস্ত এবং ইরান যখন তার অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে হরমুজকে জিম্মি করছে, তখন মাঝপথে পিষ্ট হচ্ছে সাধারণ মানুষ। মে মাসের সময়সীমা যত ঘনিয়ে আসছে, বিশ্ব তাকিয়ে আছে হোয়াইট হাউস আর তেহরানের পরবর্তী চালের দিকে। কূটনৈতিক কোনো অলৌকিক সমাধান ছাড়া এই ১২০ ডলারের বোঝা থেকে বিশ্বের মুক্তি মিলবে বলে মনে হচ্ছে না।
তথ্যসূত্র: বিবিসি
আন্তর্জাতিক
ওপেক ও ওপেক প্লাস ছাড়ল আরব আমিরাত, টালমাটাল বিশ্ব তেলের বাজার
বিশ্ব জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের আলোড়ন সৃষ্টি করে তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর জোট ওপেক ও ওপেক প্লাস থেকে নিজেদের সদস্যপদ প্রত্যাহারের করে নিয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। দেশটি জানিয়েছে, সিদ্ধান্তটি ১ মে ২০২৬ থেকে কার্যকর হবে।
মঙ্গলবার দেশটির পক্ষ থেকে এই ঐতিহাসিক ও প্রভাবশালী সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। আমিরাতের এই পদক্ষেপ জোটের অলিখিত প্রধান সৌদি আরবের জন্য একটি বড় ধরনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সংবাদমাধ্যম আলজাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, এমন এক সময়ে আমিরাত এই সিদ্ধান্ত নিল যখন ইরান সংকটের কারণে বিশ্ব তেলের বাজার এবং অর্থনীতি চরম অস্থিতিশীলতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ভূ-রাজনীতিতে নানা মতভেদ থাকলেও এতকাল ওপেকের সদস্য দেশগুলো তেলের বাজার নিয়ন্ত্রণে ঐক্য বজায় রেখে আসছিল। আমিরাতের এই বিদায়ে জোটটি দুর্বল হয়ে পড়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
আমিরাতের এই সিদ্ধান্তকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি বড় বিজয় হিসেবে দেখা হচ্ছে। ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ করে আসছেন যে, ওপেকভুক্ত দেশগুলো কৃত্রিমভাবে তেলের দাম বাড়িয়ে বিশ্ব অর্থনীতিতে সংকট তৈরি করছে। তিনি বারবার দাবি করে আসছিলেন যে, যুক্তরাষ্ট্র যখন উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর নিরাপত্তার জন্য লড়ছে, তখন তারা উচ্চমূল্যে তেল বিক্রি করে সুবিধা নিচ্ছে।
জোট ত্যাগের পেছনে আরব দেশগুলোর মধ্যেকার অভ্যন্তরীণ ফাটল বড় ভূমিকা পালন করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আমিরাতের অভিযোগ, ইরান সংকটের সময় তাদের ওপর হামলা হলেও প্রতিবেশী আরব দেশগুলো আশানুরূপ সহায়তা করেনি।
সোমবার এক সম্মেলনে আমিরাতের প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা আনোয়ার গারগাস আরব ও উপসাগরীয় দেশগুলোর প্রকাশ্য সমালোচনা করে বলেন, রাজনৈতিক ও সামরিকভাবে আরব দেশগুলোর বর্তমান অবস্থান ইতিহাসের সবচেয়ে নিম্নস্তরে রয়েছে। গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিল বা জিসিসি ভুক্ত দেশগুলোর এমন দুর্বল ও নিস্পৃহ আচরণে আমিরাত চরমভাবে হতাশ।
তেল উৎপাদন ও সরবরাহ নিয়ে ওপেক প্লাসের কঠোর নীতি থেকে বেরিয়ে আমিরাত এখন স্বাধীনভাবে তেল উত্তোলনের সুযোগ পাবে। তবে এই সিদ্ধান্ত মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্য এবং বৈশ্বিক তেলের রাজনীতির সমীকরণ পুরোপুরি বদলে দিতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
আন্তর্জাতিক
ফের বেড়েছে জ্বালানি তেলের দাম
বিশ্ববাজারে আবারও বেড়েছে জ্বালানি তেলের দাম। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনা অচলাবস্থায় থাকায় এই ঊর্ধ্বগতি দেখা যাচ্ছে। সংঘাত নিরসনে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা স্থবির হয়ে পড়ায় অপরিশোধিত তেলের বাজারে দাম বাড়ার ধারা অব্যাহত রয়েছে।
মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) গ্রিনিচ মান সময় ১২টা ৫১ মিনিটে অর্থাৎ বাংলাদেশ সময় ৬টা ৫১ মিনিটে জুন মাসে সরবরাহযোগ্য ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচারের দাম ৪৫ সেন্ট (০.৪ শতাংশ) বেড়ে প্রতি ব্যারেল ১০৮.৬৮ ডলারে পৌঁছেছে। এর আগে এর দাম ২.৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছিল, যা টানা সপ্তম দিনের মতো ঊর্ধ্বগতির রেকর্ড।
অন্যদিকে, জুন ডেলিভারির জন্য মার্কিন ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) ক্রুডের দাম ৫৮ সেন্ট (০.৬ শতাংশ) বেড়ে প্রতি ব্যারেল ৯৬.৯৬ ডলারে দাঁড়িয়েছে। এর আগের ট্রেডিং সেশনে এটি ২.১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছিল।
এদিকে হোয়াইট হাউস স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে ইরানের সঙ্গে চলমান কূটনৈতিক আলোচনা তারা গণমাধ্যমের মাধ্যমে চালিয়ে যেতে আগ্রহী নয়।
সিবিএস নিউজকে দেওয়া এক বিবৃতিতে হোয়াইট হাউসের সহকারী প্রেস সেক্রেটারি অলিভিয়া ওয়েলস বলেন, এগুলো অত্যন্ত স্পর্শকাতর কূটনৈতিক বিষয়, তাই যুক্তরাষ্ট্র সংবাদমাধ্যমের মধ্য দিয়ে কোনো দরকষাকষি করবে না।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবস্থান অত্যন্ত পরিষ্কার—যুক্তরাষ্ট্র এই আলোচনার নাটাই নিজের হাতে রেখেছে। আমেরিকান জনগণের স্বার্থকে সবার আগে রেখে এবং ইরান যাতে কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে, তা নিশ্চিত করেই কেবল কোনো চুক্তিতে পৌঁছাবে ওয়াশিংটন। সূত্র: আল জাজিরা।
আন্তর্জাতিক
ইন্দোনেশিয়ায় দুই ট্রেনের সংঘর্ষে নিহত ৪
ইন্দোনেশিয়ার রাজধানী জাকার্তার উপকণ্ঠে দুটি ট্রেনের মুখোমুখি সংঘর্ষে অন্তত চারজন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও কয়েক ডজন যাত্রী, যাদের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
সোমবার (২৭ এপ্রিল) স্থানীয় সময় সকালে জাকার্তার নিকটবর্তী বেকাসি তিমুর স্টেশন এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিবিসি-সহ বিভিন্ন সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
প্রাথমিক তদন্তে জানা যায়, একটি কমিউটার ট্রেন আগে থেকেই লাইনে দাঁড়িয়ে ছিল। এ সময় একই লাইনে প্রবেশ করা একটি দূরপাল্লার ট্রেন পেছন থেকে এসে সেটিকে সজোরে ধাক্কা দেয়। এতে দুটি ট্রেনই মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
দুর্ঘটনার পরপরই উদ্ধারকর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে আটকে পড়া যাত্রীদের বের করে আনতে তৎপরতা শুরু করেন। আহতদের দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে পাঠানো হয়। তবে শুরুতে হতাহতের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা নিশ্চিত করতে পারেনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
পরে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন রেল পরিচালনাকারী সংস্থা কেএআই-এর মুখপাত্র অ্যান পুরবা জানান, এখন পর্যন্ত চারজনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে এবং আহত অন্তত ৩৮ জনকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
এদিকে ইন্দোনেশিয়ার প্রতিনিধি পরিষদ-এর ডেপুটি স্পিকার সুফমি দাসকো আহমাদ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে জানিয়েছেন, হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। তিনি দুর্ঘটনার কারণ দ্রুত তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
ঘটনাটি রাজধানী জাকার্তা থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে ঘটেছে বলে জানা গেছে। দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ নির্ধারণে তদন্ত চলছে।
আন্তর্জাতিক
যুদ্ধবিরতির মধ্যেই ইসরায়েলি হামলায় লেবাননে নিহত ১৪
লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, রোববার দখলদার ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় দুই শিশু ও দুই নারীসহ মোট ১৪ জন নিহত এবং ৩৭ জন আহত হয়েছেন। দক্ষিণ লেবাননের বিভিন্ন এলাকায় এই হামলা চালানো হয় বলে জানা গেছে।
এর আগে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) এক মুখপাত্র দক্ষিণ লেবাননের একাধিক গ্রামের বাসিন্দাদের দ্রুত এলাকা ছেড়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, সেখানে অবস্থান করলে প্রাণহানির ঝুঁকি রয়েছে। এ তথ্য বিবিসি জানিয়েছে।
পরে আইডিএফ দাবি করে, তারা দক্ষিণ লেবাননে হিজবুল্লাহর যোদ্ধা ও বিভিন্ন স্থাপনাকে লক্ষ্য করে কামান ও বিমান হামলা চালিয়েছে। একই সঙ্গে তারা জানায়, হিজবুল্লাহর ড্রোন হামলায় ১৯ বছর বয়সী এক ইসরায়েলি সৈন্য নিহত হয়েছেন এবং আরও ছয়জন আহত হয়েছেন।
আইডিএফ আরও দাবি করে, হিজবুল্লাহ ইসরায়েলের দিকে তিনটি ড্রোন পাঠিয়েছিল, যেগুলো সীমান্ত অতিক্রম করার আগেই ইসরায়েলি বিমানবাহিনী প্রতিহত করে।
গত ১৬ এপ্রিল ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়, যা পরে আরও তিন সপ্তাহের জন্য বাড়ানো হয়। চুক্তি অনুযায়ী, ইসরায়েল আত্মরক্ষার প্রয়োজনে যেকোনো সময় ব্যবস্থা নেওয়ার অধিকার সংরক্ষণ করে।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেন, লেবাননে ইসরায়েলি সেনারা সক্রিয়ভাবে অভিযান চালাচ্ছে এবং শক্তি প্রয়োগ করছে। তাঁর দাবি, হিজবুল্লাহর কর্মকাণ্ড যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করছে।
তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও লেবাননের সঙ্গে হওয়া নিয়ম অনুযায়ী তারা কাজ করছে, যার মধ্যে রয়েছে তাৎক্ষণিক হুমকি প্রতিহত করা এবং উদীয়মান হুমকি নিষ্ক্রিয় করা।
যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকেই ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহ একে অপরের বিরুদ্ধে হামলা ও চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ করে আসছে। এর আগে শনিবার নেতানিয়াহু হিজবুল্লাহর লক্ষ্যবস্তুতে বড় ধরনের হামলার নির্দেশ দেন, যার পর দক্ষিণ লেবাননে হামলায় অন্তত ছয়জন নিহত হন।




