Connect with us

মত দ্বিমত

বিংশ শতাব্দীর কাঠামো না কি একবিংশ শতাব্দীর প্রযুক্তিনির্ভর: কোন পথে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা?

Published

on

মেঘনা

যুদ্ধের চরিত্র বদলে গেছে। একসময় যুদ্ধ মানেই ছিল সীমান্তে সৈন্য সমাবেশ, রাইফেল, কামান, ট্যাংক এবং সম্মুখসমরের সংঘর্ষ। রাষ্ট্রের শক্তি মাপা হতো সৈন্যসংখ্যা দিয়ে। বড় বাহিনী মানেই বড় শক্তি। সেই ধারণা বিংশ শতাব্দীর বাস্তবতায় কার্যকর ছিল।

AdLink দ্বারা বিজ্ঞাপন ×

কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে যুদ্ধের কেন্দ্র সরে গেছে। আজ যুদ্ধ শুধু সীমান্তে নয়, সার্ভার রুমে, স্যাটেলাইট কক্ষপথে, ডেটা সেন্টারে এবং কন্ট্রোল রুমে। ড্রোন আকাশে উড়ছে, সমুদ্রে স্বয়ংক্রিয় নজরদারি ব্যবস্থা কাজ করছে, সাইবার আক্রমণ বিদ্যুৎ গ্রিড অচল করতে পারে, ব্যাংকিং ব্যবস্থা অস্থিতিশীল করতে পারে, এমনকি একটি দেশের প্রশাসনিক কাঠামোকে পক্ষাঘাতগ্রস্ত করে দিতে পারে।

AdLink দ্বারা বিজ্ঞাপন ×

বিশ্বের বড় শক্তিগুলো তাদের প্রতিরক্ষা কৌশলে প্রযুক্তিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। সাইবার স্পেস এখন স্বীকৃত যুদ্ধক্ষেত্র। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডেটা অ্যানালিটিক্স, স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রব্যবস্থা এবং স্যাটেলাইট নজরদারি আধুনিক সামরিক শক্তির মূল উপাদান। সৈন্য আছে, কিন্তু সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণ করছে প্রযুক্তি।

AdLink দ্বারা বিজ্ঞাপন ×

এই বাস্তবতায় প্রশ্ন উঠছে, কেবল শারীরিক প্রশিক্ষণ, কুচকাওয়াজ এবং বৃহৎ জনবল দিয়ে কি আধুনিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব? সাইবার আক্রমণ রুখতে রাইফেল লাগে না। ড্রোন প্রতিরোধে প্যারেড গ্রাউন্ডের অনুশীলন যথেষ্ট নয়। স্যাটেলাইট নজরদারি মোকাবিলায় প্রয়োজন ইলেকট্রনিক দক্ষতা।

জাতীয় নিরাপত্তা এখন সীমান্তের চেয়ে বেশি নির্ভর করছে প্রযুক্তিগত সক্ষমতার ওপর।

এবার বাংলাদেশের দিকে তাকাই। আমাদের প্রতিরক্ষা কাঠামো ঐতিহ্যগতভাবে জনবলনির্ভর। বৃহৎ সৈন্যসংখ্যা, বিস্তৃত প্রশাসনিক পরিকাঠামো এবং স্থায়ী ব্যয়ের কাঠামো রাষ্ট্রীয় বাজেটের বড় অংশ দখল করে আছে। প্রশ্ন হলো, এই বিপুল জনশক্তি কি পর্যাপ্ত প্রযুক্তিগত দক্ষতায় রূপান্তরিত হচ্ছে? নাকি আমরা এখনো সংখ্যাকে শক্তি মনে করে আত্মতুষ্ট?

শুধু বড় বাহিনী থাকলেই শক্তিশালী হওয়া যায় না। দক্ষতায় বড় হওয়াই আজকের শক্তি।

এখানেই একটি বিকল্প চিন্তার দরজা খুলে যায়। যদি সামরিক জনবলের একটি অংশকে পরিকল্পিতভাবে পুনঃপ্রশিক্ষণ দেওয়া হয় সাইবার ডিফেন্স, ডেটা অ্যানালিটিক্স, ড্রোন প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং প্রতিরক্ষা গবেষণায়, তাহলে একই মানবসম্পদ দ্বৈত ভূমিকা পালন করতে পারে। একদিকে জাতীয় নিরাপত্তা, অন্যদিকে প্রযুক্তিভিত্তিক অর্থনীতিতে অবদান।

প্রতিরক্ষা খাতকে কেবল ব্যয়ের খাত হিসেবে দেখা হবে, নাকি মানবসম্পদ উন্নয়নের কৌশলগত প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গড়ে তোলা হবে, সেটিই এখন মূল প্রশ্ন।

বাংলাদেশের সামনে চারটি স্পষ্ট দিকনির্দেশনা থাকতে পারে।

প্রথমত, ডিমান্ড বেজড প্রযুক্তিগত শিক্ষা। বিশ্ববাজারে কোন দক্ষতার চাহিদা বাড়ছে তা বিশ্লেষণ করে প্রশিক্ষণ কাঠামো তৈরি করতে হবে। সাইবার নিরাপত্তা, অটোমেশন, ডেটা ব্যবস্থাপনা এবং উন্নত প্রযুক্তি দক্ষতা ছাড়া ভবিষ্যৎ অর্থনীতিতে টিকে থাকা সম্ভব নয়।

দ্বিতীয়ত, সামরিক পুনর্গঠন। ঐতিহ্যগত জনবল কাঠামোকে ধীরে ধীরে দক্ষতানির্ভর কাঠামোয় রূপান্তর করতে হবে। উচ্চ প্রযুক্তি ইউনিট গঠন এবং গবেষণা ও উন্নয়ন সক্ষমতা বৃদ্ধি অপরিহার্য।

তৃতীয়ত, সমন্বিত সাইবার ও ডিজিটাল প্রতিরক্ষা কমান্ড গঠন, যা বেসামরিক ও সামরিক উভয় অবকাঠামোকে সুরক্ষা দেবে।

চতুর্থত, দ্বৈত ব্যবহারযোগ্য প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ। যে প্রযুক্তি সামরিক ও বেসামরিক উভয় ক্ষেত্রে প্রয়োগযোগ্য, সেখানে বিনিয়োগ করলে প্রতিরক্ষা ব্যয় উৎপাদনশীল বিনিয়োগে রূপান্তরিত হতে পারে।

কিন্তু এই চারটি সিদ্ধান্ত কেবল নীতিগত ঘোষণা হয়ে থাকলে চলবে না। এর পরেই প্রয়োজন একটি কাঠামোগত রূপান্তর পরিকল্পনা। মূল প্রশ্ন হলো, বর্তমানে সমগ্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় যে বিপুল জনশক্তি রয়েছে, তাদের ভবিষ্যৎ ভূমিকা কী হবে?

এই জনশক্তিকে কেবল নিরাপত্তা কাঠামোর স্থায়ী উপাদান হিসেবে না দেখে, জাতীয় উন্নয়নের কৌশলগত সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

রাষ্ট্রকে একটি দীর্ঘমেয়াদি রূপান্তর রোডম্যাপ তৈরি করতে হবে, যেখানে প্রতিরক্ষা খাতে কর্মরত জনবলকে ধাপে ধাপে নতুন প্রযুক্তি দক্ষতা, ডিজিটাল সক্ষমতা এবং সমাজকল্যাণমূলক উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের আওতায় আনা হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, ডেটা ব্যবস্থাপনা, ড্রোন প্রযুক্তি, অবকাঠামো প্রযুক্তি এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এই জনশক্তি দ্বৈত সক্ষমতায় রূপ নিতে পারে।

এখানে আরেকটি কৌশলগত মাত্রা যুক্ত করা জরুরি। বিশ্বের বহু দেশে দক্ষ প্রযুক্তিগত ও শৃঙ্খলাবদ্ধ কর্মশক্তির ঘাটতি রয়েছে। পরিকল্পিত ও মানসম্মত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে প্রতিরক্ষা পটভূমির মানবসম্পদকে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের উপযোগী করে তোলা গেলে তা বৈদেশিক আয়ের একটি নতুন দ্বার খুলতে পারে। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সমন্বিত চুক্তি, দক্ষতা সনদায়ন এবং পুনর্বাসন কাঠামোর মাধ্যমে এই প্রক্রিয়াকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া সম্ভব।

অর্থাৎ প্রতিরক্ষা জনবলকে ধীরে ধীরে এমন এক মানবসম্পদ শক্তিতে রূপান্তর করা, যারা একদিকে জাতীয় নিরাপত্তায় অবদান রাখবে, অন্যদিকে অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতায় যুক্ত হবে, এবং প্রয়োজন হলে আন্তর্জাতিক বাজারেও অংশ নিতে পারবে।

এটি কেবল সামরিক সংস্কার নয়। এটি নতুন মানবিক উন্নয়নের রূপরেখা। একটি কাঠামো ফর বিল্ডিং ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট অব বাংলাদেশ, যেখানে প্রতিরক্ষা ব্যয়কে ব্যয় হিসেবে নয়, মানবসম্পদে বিনিয়োগ হিসেবে পুনঃসংজ্ঞায়িত করা হবে।

রাষ্ট্র যদি চায়, তবে বৃহৎ জনবলকে স্থায়ী ব্যয়ের বোঝা হিসেবে না দেখে উৎপাদনশীল শক্তিতে রূপান্তর করা সম্ভব। এটি হবে কৌশলগত মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা, যেখানে প্রতিরক্ষা খাতের কর্মীরা একই সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষা করবে এবং দেশের প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতিতে অবদান রাখবে।

এটি কোনো আবেগ বা সাধারণ মতামতের প্রশ্ন নয়। এটি রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অবস্থানের প্রশ্ন। এটি আমাদের জাতীয় ভবিষ্যৎ, আমাদের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, এবং আগামী প্রজন্মের প্রতি দায়বদ্ধতার প্রশ্ন।

বাংলাদেশ কি বড় জনবল ধরে রেখে বিংশ শতাব্দীর শক্তির ধারণায় স্থির থাকবে, নাকি সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়ে একবিংশ শতাব্দীর প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিরক্ষা রাষ্ট্র গড়ে তুলবে?

রাষ্ট্রের শক্তি আর কেবল বন্দুকের নলে সীমাবদ্ধ নয়। আজ রাষ্ট্রের শক্তি নিহিত জ্ঞান, প্রযুক্তি এবং দক্ষ মানবসম্পদে। সিদ্ধান্তটি সরল—কিন্তু তার প্রভাব হবে ঐতিহাসিক।

রহমান মৃধা, গবেষক ও লেখক, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন

শেয়ার করুন:-

মত দ্বিমত

রূপপুরের আলো: ১৯৬১ সালের স্বপ্ন থেকে আধুনিক বাংলাদেশের পারমাণবিক বাস্তবতা

Published

on

মেঘনা

আব্দুস সালাম যখন ১৯৭৯ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার অর্জন করেন, তখন বিশ্ব নতুন করে উপলব্ধি করে যে দক্ষিণ এশিয়াও উচ্চতর বৈজ্ঞানিক চিন্তা ও গবেষণার ক্ষেত্রে পিছিয়ে নেই। কিন্তু তারও আগে, ১৯৬০ দশকের শুরুতেই তৎকালীন পাকিস্তান সরকার পারমাণবিক শক্তিকে শান্তিপূর্ণ কাজে ব্যবহারের সম্ভাবনা নিয়ে পরিকল্পনা করেছিল। সেই ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবেই ১৯৬১ সালে পাবনার রূপপুরে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের প্রাথমিক উদ্যোগ নেওয়া হয়। অর্থাৎ এটি হঠাৎ কোনো সিদ্ধান্ত নয়, বরং দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা, গবেষণা এবং রাষ্ট্রীয় ভাবনার একটি বাস্তব প্রতিফলন।

AdLink দ্বারা বিজ্ঞাপন ×

এই প্রসঙ্গে আরেকটি সত্য সামনে আনা জরুরি। আমরা অকৃতজ্ঞ জাতি হিসেবে পরিচিত হতে চাই না। কেউ যদি ভালো কিছু করে, সেটার প্রাপ্য স্বীকৃতি তাকে দিতে হবে, এটাই সভ্যতার নিয়ম। প্রশংসা করার অভ্যাস যেমন গড়ে তুলতে হয়, তেমনি মিথ্যাচার, পরচর্চা এবং ভিত্তিহীন সমালোচনা থেকে বেরিয়ে আসাও জরুরি। একটি দেশের অগ্রগতির জন্য শুধু অবকাঠামো নয়, মানসিকতার পরিবর্তনও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সত্যকে গ্রহণ করা, প্রাপ্যকে স্বীকার করা এবং অন্যায়ের সমালোচনা করা, এই ভারসাম্যই একটি সুস্থ সমাজ গড়ে তোলে। ইসলাম আমাদের এই শিক্ষা দেয়, সত্যকে প্রতিষ্ঠা করতে এবং ন্যায়কে সমর্থন করতে। তাহলে প্রশ্ন থেকেই যায়, আমরা কেন অনেক সময় সেই পথ থেকে সরে যাই?

AdLink দ্বারা বিজ্ঞাপন ×

বাংলাদেশে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ধারণা নতুন নয়। ১৯৬১ সালেই, তখনকার পূর্ব পাকিস্তান সময়, রূপপুর এলাকায় একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের প্রাথমিক উদ্যোগ নেওয়া হয়। জায়গা নির্ধারণও তখনই করা হয়েছিল। কিন্তু রাজনৈতিক পরিবর্তন, ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধ, অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতার অভাবে প্রকল্পটি দীর্ঘ সময় থেমে থাকে।

AdLink দ্বারা বিজ্ঞাপন ×

স্বাধীনতার পরও বিষয়টি পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। বিভিন্ন সময়ে আলোচনা হয়েছে, সম্ভাব্যতা যাচাই হয়েছে, কিন্তু বাস্তবায়নের পথে দৃশ্যমান অগ্রগতি আসে অনেক পরে। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সময়কালে সরকার আবার নতুনভাবে এই প্রকল্পকে গুরুত্ব দেয়। ১৯৯৮ সালে নীতিগতভাবে প্রকল্প বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কিন্তু তখনও অর্থায়ন, প্রযুক্তি এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্বের অভাবে কাজ এগোয়নি।

২০০৯ সালের পর থেকে প্রকল্পটি নতুন গতি পায়। বাংলাদেশ সরকার রাশিয়ার সঙ্গে পারমাণবিক সহযোগিতার বিষয়ে আলোচনা শুরু করে। ২০১০ এবং ২০১১ সালে দুই দেশের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির মাধ্যমে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক সংস্থা রোসাটম প্রকল্পটির প্রধান প্রযুক্তিগত অংশীদার হিসেবে যুক্ত হয়।

এরপর ২০১৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর মূল নির্মাণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির মাধ্যমেই প্রকল্পটি কাগজ থেকে বাস্তবের দিকে এগিয়ে যায়। ২০১৭ সালের ৩০ নভেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে নির্মাণ কাজ শুরু হয়, যখন প্রথম কংক্রিট ঢালার মাধ্যমে রিঅ্যাক্টর ইউনিটের কাজ উদ্বোধন করা হয়। এই ধাপটি আন্তর্জাতিকভাবে একটি বড় মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রকল্পে দুটি ইউনিট রয়েছে, প্রতিটির উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ১২০০ মেগাওয়াট। এখানে ব্যবহৃত হচ্ছে আধুনিক VVER 1200 প্রযুক্তির রিঅ্যাক্টর, যা নিরাপত্তা ব্যবস্থার দিক থেকে অত্যাধুনিক হিসেবে বিবেচিত। একাধিক সুরক্ষা স্তর, স্বয়ংক্রিয় কুলিং সিস্টেম এবং জরুরি পরিস্থিতিতে নিজে নিজে বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো ব্যবস্থা এতে অন্তর্ভুক্ত।

২০২১ এবং ২০২২ সালে রিঅ্যাক্টরের গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি স্থাপন শুরু হয়। ধাপে ধাপে রিঅ্যাক্টর ভেসেল, স্টিম জেনারেটরসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ উপাদান বসানো হয়। এরপর ২০২৩ সালের ৫ অক্টোবর একটি গুরুত্বপূর্ণ আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনী ধাপ সম্পন্ন হয়, যাকে বলা হয় কমিশনিং পর্যায়ের সূচনা। অর্থাৎ প্রকল্পটি চালুর দিকে অগ্রসর হচ্ছে।

চালু হয়েছে কথাটির আসল অর্থ বোঝার জন্য ২০২৬ সালের ঘটনাটি জানা জরুরি। ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে রিঅ্যাক্টরে ইউরেনিয়াম জ্বালানি ঢোকানো বা ফুয়েল লোডিং শুরু হয়। এই ধাপটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এর মাধ্যমেই পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরু করার প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া কাজ করে, যাকে বলা হয় নিউক্লিয়ার ফিশন। ইউরেনিয়ামের পরমাণু ভেঙে বিপুল পরিমাণ তাপ উৎপন্ন হয়। এই তাপ দিয়ে পানি বাষ্পে রূপান্তরিত হয়, বাষ্প টারবাইন ঘোরায়, আর টারবাইন ঘুরে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। অর্থাৎ এখানে কোনো কয়লা বা তেল পোড়ানো হয় না, তাই ধোঁয়া দেখা যায় না।

এখন প্রশ্ন হলো, এটি কি পুরোপুরি চালু হয়ে গেছে?

সোজা উত্তর হলো, না, এখনও পুরোপুরি বাণিজ্যিকভাবে চালু হয়নি। এখন চলছে পরীক্ষামূলক চালনা, নিরাপত্তা যাচাই এবং ধাপে ধাপে ক্ষমতা বাড়ানোর প্রক্রিয়া। সাধারণত এই ধাপ শেষ হতে কিছুটা সময় লাগে। পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২৬ থেকে ২০২৭ সালের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হওয়ার কথা।

এই প্রকল্প শুধু একটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র নয়, এটি বাংলাদেশের জন্য একটি বড় প্রযুক্তিগত ও কৌশলগত পদক্ষেপ। এটি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা বাড়াবে, কার্বন নির্গমন কমাতে সাহায্য করবে এবং উচ্চপ্রযুক্তি খাতে নতুন দক্ষতা তৈরি করবে।

ধোঁয়া না দেখা নিয়ে যে প্রশ্ন ওঠে, সেটাই আসলে এই প্রযুক্তির স্বাভাবিক চিত্র। এখানে আগুন নেই, ধোঁয়া নেই, কিন্তু ভেতরে চলছে অত্যন্ত শক্তিশালী ও নিয়ন্ত্রিত এক প্রক্রিয়া, যা থেকে তৈরি হবে দেশের জন্য বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ।

সবকিছু মিলিয়ে, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র একটি দীর্ঘ প্রতীক্ষার বাস্তব রূপ, যেখানে ১৯৬১ সালের একটি ধারণা আজ আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে বাস্তবতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

সবকিছুর শেষে রূপপুর শুধু একটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র নয়, এটি বাংলাদেশের দীর্ঘ ইতিহাস, প্রতীক্ষা এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতার এক বাস্তব ঘোষণাপত্র, যেখানে ১৯৬১ সালের একটি ধারণা আজ একটি জাতির ভবিষ্যৎ শক্তির ভিত্তি হয়ে উঠছে।

রহমান মৃধা, গবেষক ও লেখক, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন।

শেয়ার করুন:-
পুরো সংবাদটি পড়ুন

মত দ্বিমত

রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব, প্রভাবমুক্ত প্রশাসন এবং জনগণকেন্দ্রিক পুনর্গঠনের আহ্বান

Published

on

মেঘনা

বাংলাদেশকে বাঁচাতে চাইলে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রতিটি স্তরকে সম্পূর্ণভাবে প্রভাবমুক্ত করতে হবে। এর অর্থ হলো, রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক কাঠামো, নিরাপত্তা ব্যবস্থা, কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত এবং নীতিনির্ধারণ কোনো বহিরাগত প্রভাব দ্বারা নির্ধারিত হবে না। বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক রাখবে একটি স্বাভাবিক, সার্বভৌম এবং কূটনৈতিক রাষ্ট্রীয় সম্পর্ক হিসেবে, যেমন বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে রাখে। তবে এই সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি বিষয় স্পষ্ট থাকা জরুরি, রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের প্রভাব বা হস্তক্ষেপ গ্রহণযোগ্য হবে না। এ বিষয়ে রাষ্ট্রকে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করতে হবে।

AdLink দ্বারা বিজ্ঞাপন ×

রাষ্ট্রের সকল গুরুত্বপূর্ণ সেক্টরের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের নিয়োগ, দায়িত্ব বণ্টন এবং পদায়ন কোনোভাবেই বহির্বিশ্বের প্রভাব বা হস্তক্ষেপ দ্বারা নির্ধারিত হতে পারবে না। রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের মৌলিক শর্ত হলো, কে প্রধানমন্ত্রী হবেন, কে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হবেন, কে সেনাবাহিনীর জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন, কে ডিজিএফআই বা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা সংস্থার দায়িত্বে থাকবেন, এবং কে সচিব বা প্রশাসনের শীর্ষ পদে আসীন হবেন, এসব সিদ্ধান্ত একান্তই বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সাংবিধানিক ও রাষ্ট্রীয় প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই নির্ধারিত হবে। প্রয়োজনে রাষ্ট্রীয় স্বার্থ রক্ষার জন্য সশস্ত্র বাহিনী এবং সিভিল সার্ভিসের প্রশাসনিক কাঠামোকে পুনর্গঠন ও সংস্কারের মাধ্যমে আরও শক্তিশালী, পেশাদার এবং সম্পূর্ণ প্রভাবমুক্ত করা যেতে পারে।

AdLink দ্বারা বিজ্ঞাপন ×

আজকের বাস্তবতা অত্যন্ত জটিল। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ে জনমনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। সচিবালয়, গোয়েন্দা কাঠামো এবং সশস্ত্র বাহিনীর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। এই সংকট হঠাৎ করে সৃষ্টি হয়নি, বরং দীর্ঘদিনের অস্বচ্ছতা, রাজনৈতিক প্রভাব এবং জবাবদিহিতার অভাবে এটি গভীর হয়েছে।

AdLink দ্বারা বিজ্ঞাপন ×

যাদের আমরা রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছি, তাদের একটি অংশ জনগণের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। দুর্নীতি এবং ক্ষমতার অপব্যবহার রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে দুর্বল করেছে। এর ফলে সাধারণ মানুষের আস্থা ক্রমাগত ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে। এই আস্থাহীনতাই আজকের সবচেয়ে বড় সংকট।

এই বাস্তবতা থেকে উত্তরণের জন্য আবেগ নয়, প্রয়োজন কাঠামোগত সংস্কার এবং দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় পুনর্গঠন।

বাংলাদেশকে শক্তিশালী করতে হলে যেসব পদক্ষেপ জরুরি,

  • রাষ্ট্রের সব গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানকে সম্পূর্ণভাবে প্রভাবমুক্ত, পেশাদার এবং জবাবদিহিমূলক কাঠামোয় গড়ে তোলা।
  • সশস্ত্র বাহিনী এবং নিরাপত্তা সংস্থাগুলোকে আধুনিক, দক্ষ এবং সম্পূর্ণ জাতীয় স্বার্থকেন্দ্রিক কাঠামোতে পুনর্গঠন করা।
  • দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর এবং বাস্তব জিরো টলারেন্স নীতি কার্যকর করা।
  • পররাষ্ট্রনীতিতে ভারসাম্য রক্ষা করে বহুমুখী সম্পর্ক বজায় রাখা, যাতে কোনো একক দেশের ওপর নির্ভরশীলতা তৈরি না হয়।
  • জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে স্বচ্ছতা, তথ্যপ্রবাহ এবং অংশগ্রহণমূলক শাসনব্যবস্থা নিশ্চিত করা।

বাংলাদেশ কোনো বিচ্ছিন্ন রাষ্ট্র নয়। এটি একটি ভূরাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ দেশ, যেখানে বিভিন্ন শক্তির স্বার্থ এবং উপস্থিতি রয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্রের মৌলিক নীতি হওয়া উচিত একটাই, সিদ্ধান্ত নেবে বাংলাদেশ নিজে, বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থে।

শক্তি কখনো একক নির্ভরতায় নয়, বরং ভারসাম্য এবং আত্মনির্ভরতার মধ্যে নিহিত। তাই কোনো একটি দেশের সঙ্গে সম্পর্ক যেমন থাকবে, তেমনি সেই সম্পর্ক কখনোই রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারবে না।

করণীয়

১. রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা।
২. প্রশাসন, নিরাপত্তা এবং কূটনৈতিক কাঠামোতে মেধাভিত্তিক নিয়োগ নিশ্চিত করা।
৩. দুর্নীতি দমন সংস্থাগুলোকে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দেওয়া।
৪. বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা।
৫. নির্বাচনী ব্যবস্থাকে নিরপেক্ষ ও জনগণের আস্থাভাজন করে পুনর্গঠন করা।
৬. পররাষ্ট্রনীতিতে ভারসাম্য এবং বহুমুখী সম্পর্ক বজায় রাখা।
৭. শিক্ষা, গবেষণা এবং নৈতিক মূল্যবোধে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা।
৮. গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং মতপ্রকাশের নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা।
৯. রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতা এবং জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।
১০. জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে ঐক্যবদ্ধ রাষ্ট্রীয় চেতনা গড়ে তোলা।

বর্জনীয়

১. রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তকে কোনো বহিরাগত প্রভাবের অধীন করা।
২. প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় বা ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহার করা।
৩. দুর্নীতি বা অনিয়মকে কোনোভাবেই প্রশ্রয় দেওয়া।
৪. অস্বচ্ছ এবং গোপন সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া বজায় রাখা।
৫. মতপ্রকাশের স্বাধীনতা দমন করা।
৬. একপাক্ষিক পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করা।
৭. গুজব এবং অপপ্রচারের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া।
৮. রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করে এমন অভ্যন্তরীণ বিভাজন সৃষ্টি করা।
৯. দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থের চেয়ে স্বল্পমেয়াদি রাজনৈতিক লাভকে অগ্রাধিকার দেওয়া।
১০. জনগণের আস্থাকে উপেক্ষা করা।

বাংলাদেশ কি সত্যিকার অর্থে একটি প্রভাবমুক্ত, জবাবদিহিমূলক এবং জনগণকেন্দ্রিক রাষ্ট্র হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে পারবে, নাকি আস্থা সংকট, অস্বচ্ছতা এবং নির্ভরতার পুরোনো চক্রে আটকে থাকবে। এই সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ।

রহমান মৃধা, গবেষক ও লেখক
সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন

শেয়ার করুন:-
পুরো সংবাদটি পড়ুন

মত দ্বিমত

টেকসই খাদ্য নিরাপত্তার জন্য সৌরশক্তির মাধ্যমে গ্রামীণ কৃষক ক্ষমতায়ন

Published

on

মেঘনা

বর্তমান বিশ্ব এক বহুমাত্রিক সংকটের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। জলবায়ু পরিবর্তন, ভূরাজনৈতিক সংঘাত, জ্বালানি অস্থিরতা এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের ভাঙন মানবসভ্যতার ভিত্তিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে। এই সংকটের কেন্দ্রে রয়েছে খাদ্য নিরাপত্তা, যা এখন আর শুধুমাত্র কৃষি উৎপাদনের বিষয় নয়; এটি শক্তি, প্রযুক্তি, পরিবেশ এবং ন্যায়বিচারের সমন্বিত প্রশ্ন।

AdLink দ্বারা বিজ্ঞাপন ×

বাংলাদেশ এই বৈশ্বিক সংকটের একটি অনন্য প্রতিচ্ছবি। এখানে রয়েছে উর্বর মাটি, প্রখর সূর্যালোক, আবার একই সাথে অতিবৃষ্টি, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, লবণাক্ততা এবং বজ্রপাতের মতো চ্যালেঞ্জ। এই ট্রপিকাল বাস্তবতা কৃষিকে যেমন সম্ভাবনাময় করেছে, তেমনি অনিশ্চিতও করে তুলেছে।

AdLink দ্বারা বিজ্ঞাপন ×

এই বাস্তবতার সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য হলো যারা খাদ্য উৎপাদন করেন, সেই গ্রামীণ কৃষকরাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে। ফসিল জ্বালানিনির্ভর সেচ ও উৎপাদন ব্যবস্থার অস্থিরতা তাঁদের ব্যয় বাড়াচ্ছে, উৎপাদন কমাচ্ছে এবং মাটির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে।

AdLink দ্বারা বিজ্ঞাপন ×

যদি এই ধারা অব্যাহত থাকে, তাহলে শুধু কৃষি নয়, আমাদের খাদ্যভিত্তিক নিরাপত্তা এবং পরিবেশগত ভারসাম্য উভয়ই বিপন্ন হয়ে পড়বে। তাই এই প্রস্তাব একটি উন্নয়ন পরিকল্পনা নয়, বরং একটি সমন্বিত রূপান্তরের আহ্বান।

গ্রামীণ কৃষি ও মৎস্যখাতকে ফসিল জ্বালানিনির্ভরতা থেকে মুক্ত করে একটি বিকেন্দ্রীভূত, সৌরশক্তিনির্ভর, পরিবেশ-সহনশীল এবং মাটি-বান্ধব উৎপাদন ব্যবস্থায় রূপান্তর করা, যেখানে শক্তি, পানি এবং মাটির স্বাস্থ্য একত্রে কাজ করে একটি স্থিতিশীল খাদ্যব্যবস্থা গড়ে তোলে।

প্রধান উদ্দেশ্যসমূহ:

  • সৌরচালিত, তথ্যনির্ভর সেচ ব্যবস্থার মাধ্যমে পানি ব্যবহারের দক্ষতা বৃদ্ধি করা।
  • মৎস্যচাষে টেকসই সৌর প্রযুক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করা।
  • কৃষকদের উৎপাদন ব্যয় কমানো এবং আয়ের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা।
  • মাটির উর্বরতা সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধারের সাথে শক্তি ব্যবস্থাকে সংযুক্ত করা।
  • কার্বন নিঃসরণ হ্রাস করে জলবায়ু সহনশীল কৃষি গড়ে তোলা।
  • গ্রামীণ অর্থনীতিকে প্রযুক্তিনির্ভর ও স্থিতিশীল ভিত্তির ওপর দাঁড় করানো।

বাংলাদেশের কৃষি ব্যবস্থায় সৌরশক্তির প্রয়োগ শুধুমাত্র প্রযুক্তি স্থাপন নয়; এটি একটি অভিযোজন প্রক্রিয়া, যেখানে প্রযুক্তিকে দেশের ট্রপিকাল পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে হবে। এই প্রেক্ষাপটে নিম্নলিখিত বিষয়গুলো অপরিহার্য,

  • ঝড় ও ঘূর্ণিঝড় সহনশীল সৌর প্যানেল স্থাপন কাঠামো
  • বজ্রপাত প্রতিরোধ ব্যবস্থা সংযুক্ত করা
  • বন্যাপ্রবণ এলাকায় উঁচু প্ল্যাটফর্মে সৌর স্থাপনা
  • উচ্চ তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা সহনশীল উপকরণ ব্যবহার
  • সৌরশক্তি, ব্যাটারি এবং প্রয়োজনে গ্রিড সমন্বিত হাইব্রিড ব্যবস্থা

এই অভিযোজন নিশ্চিত না হলে প্রযুক্তি টেকসই হবে না, বরং নতুন ঝুঁকি তৈরি করবে। টেকসই কৃষির মূল ভিত্তি হলো মাটির স্বাস্থ্য। তাই শক্তি ব্যবস্থাকে মাটির উর্বরতার সাথে সরাসরি সংযুক্ত করতে হবে।

সৌরচালিত নির্ভুল সেচ ব্যবস্থার মাধ্যমে অতিরিক্ত পানি ব্যবহার কমানো, ফলে মাটির পুষ্টি ক্ষয় রোধ। জৈব সার উৎপাদন ও প্রক্রিয়াকরণে সৌরশক্তির ব্যবহারে ফসল সংরক্ষণের জন্য সৌরচালিত কোল্ড স্টোরেজ, যা উৎপাদনের ওপর অতিরিক্ত চাপ কমায়। পানি, মাটি ও শক্তিকে একত্রে একটি সমন্বিত কৃষি ব্যবস্থায় রূপান্তর।

এই পদ্ধতি মাটিকে শুধু রক্ষা করে না, বরং দীর্ঘমেয়াদে তার উর্বরতা পুনরুদ্ধার করে।

প্রস্তাবিত কার্যক্রম

১. সৌরচালিত স্মার্ট সেচ পাম্প স্থাপন, সেন্সরভিত্তিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে মাটির আর্দ্রতা অনুযায়ী স্বয়ংক্রিয় সেচ নিশ্চিত করা।

২. মৎস্যখাতে সৌর প্রযুক্তির সম্প্রসারণ, এয়ারেশন, পানি সঞ্চালন এবং খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় সৌরশক্তির ব্যবহার।

৩. প্রশিক্ষণ ও সক্ষমতা বৃদ্ধি,  কৃষক ও স্থানীয় প্রযুক্তিবিদদের ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ প্রদান, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে জ্ঞান ছড়িয়ে দেওয়া।

৪. উদ্ভাবনী অর্থায়ন ব্যবস্থা, সহজ শর্তে ঋণ, সমবায় ভিত্তিক বিনিয়োগ এবং ক্ষুদ্র অর্থায়ন মডেল চালু করা, যেখানে Grameen Shakti-এর অভিজ্ঞতা কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা যেতে পারে।

৫. গ্রামীণ এনার্জি হাব গঠন,  স্থানীয় পর্যায়ে সৌরশক্তি উৎপাদন, সংরক্ষণ এবং কৃষিতে ব্যবহার সমন্বিতভাবে পরিচালনা।

প্রত্যাশিত ফলাফল

কৃষি ও মৎস্য উৎপাদনে স্থিতিশীল ও টেকসই বৃদ্ধি। ফসিল জ্বালানির ওপর নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস। কৃষকদের আয়ের পূর্বানুমানযোগ্যতা ও স্থিতিশীলতা বৃদ্ধি। মাটির উর্বরতা সংরক্ষণ ও উন্নতি। পরিবেশ দূষণ ও কার্বন নিঃসরণ হ্রাস।

একটি বাস্তবসম্মত, সম্প্রসারণযোগ্য গ্রামীণ উন্নয়ন মডেল প্রতিষ্ঠা

আমাদের কৃষকরা যুদ্ধ করেন না, কিন্তু প্রতিদিন বেঁচে থাকার সংগ্রাম করেন। তাঁরা অস্ত্র তৈরি করেন না, তাঁরা জীবন তৈরি করেন। অথচ আজ তাঁরা এমন এক সংকটের মুখোমুখি, যা তাঁদের সৃষ্টি নয়।

এই বাস্তবতায় সৌরশক্তি শুধু একটি বিকল্প নয়, এটি একটি কৌশলগত মুক্তির পথ। এটি কৃষকদের ব্যয় কমায়, উৎপাদন স্থিতিশীল করে, মাটিকে রক্ষা করে এবং পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখে।

যদি আমরা এখনো এই রূপান্তর শুরু না করি, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে আমাদের জবাবদিহি এড়ানোর কোনো সুযোগ থাকবে না। এখনই সময় প্রযুক্তিকে বাস্তবতার সাথে মিলিয়ে কৃষকদের পাশে দাঁড়ানোর, এবং একটি টেকসই, ন্যায়ভিত্তিক ও নিরাপদ ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার।

রহমান মৃধা, গবেষক ও লেখক, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন।

শেয়ার করুন:-
পুরো সংবাদটি পড়ুন

মত দ্বিমত

রাষ্ট্র, শিক্ষা এবং দৃষ্টিভঙ্গির সংকট: বাংলাদেশের কাঠামোগত ব্যর্থতা ও করণীয়

Published

on

মেঘনা

বাংলাদেশের রাষ্ট্র কাঠামো এবং শিক্ষা ব্যবস্থার সংকটকে আলাদা করে দেখা একটি ভুল। বাংলাদেশের সংবিধান যেভাবে বাস্তব অর্থে জনগণের মৌলিক অধিকারকে কার্যকর করার ভিত্তিতে গড়ে ওঠেনি, ঠিক একইভাবে দেশের শিক্ষাব্যবস্থাও মানুষের বাস্তব প্রয়োজন, সক্ষমতা এবং সামাজিক বাস্তবতার ওপর দাঁড়িয়ে নির্মিত হয়নি। এই দুই ক্ষেত্রেই একটি মৌলিক সমস্যা স্পষ্ট, কাঠামো আছে, কিন্তু তার ভেতরে বাস্তবতার কোনো ভিত্তি নেই।

AdLink দ্বারা বিজ্ঞাপন ×

বাংলাদেশে শিক্ষা কখনোই শিক্ষার্থীর স্বপ্ন, সক্ষমতা বা সমাজের প্রয়োজনকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠেনি। বরং বরাবরই প্রভাবশালী ব্যক্তি, নীতিনির্ধারক বা ক্ষমতাসীনদের ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি এবং স্বপ্নকে শিক্ষার্থীদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। ফলে একটি কৃত্রিম কাঠামো তৈরি হয়েছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা শিখছে, কিন্তু সেই শিক্ষা বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করার মতো দক্ষতা, মানসিকতা বা অবকাঠামো তৈরি হচ্ছে না।

AdLink দ্বারা বিজ্ঞাপন ×

এই ব্যর্থতার সবচেয়ে স্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যায় নীতিনির্ধারণের ভাষায়। একজন নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষামন্ত্রী যখন শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতা, শিক্ষার মান, শিক্ষক প্রশিক্ষণ বা গবেষণার ঘাটতি নিয়ে কথা না বলে নিজের ব্যক্তিগত “স্বপ্ন” তুলে ধরেন, তখন সেটি কেবল একটি বক্তব্য নয়, বরং পুরো ব্যবস্থার দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন। এখানে নীতি নেই, আছে ব্যক্তিকেন্দ্রিক আকাঙ্ক্ষা। এখানে পরিকল্পনা নেই, আছে ঘোষণামূলক উচ্চারণ।

AdLink দ্বারা বিজ্ঞাপন ×

এই প্রবণতা বিচ্ছিন্ন নয়। রাষ্ট্রের পরিকাঠামো থেকে শুরু করে শিক্ষা, প্রশাসন, এমনকি আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়াতেও একই ধারা দেখা যায়। বাস্তবতা, গবেষণা বা জনগণের প্রয়োজনের ভিত্তিতে কিছু গড়ে তোলার বদলে, অনুকরণ, নকল এবং ক্ষমতাবানদের ইচ্ছাকে প্রাধান্য দিয়ে কাঠামো বসানো হয়েছে। ফলে যা দাঁড়িয়েছে তা হলো একটি “দেখতে সিস্টেম”, কিন্তু কার্যকর কোনো সিস্টেম নয়।

সংসদীয় কাঠামোর দিকেও তাকালে একই চিত্র স্পষ্ট। বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ এর সদস্যদের মূল দায়িত্ব আইন প্রণয়ন, নীতির পর্যালোচনা এবং রাষ্ট্রের ভিত্তি শক্তিশালী করা। কিন্তু বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রেই এই জায়গাটি পরিণত হয়েছে আনুগত্য প্রদর্শনের মঞ্চে, যেখানে যুক্তির বদলে টেবিল চাপড়ানো, জবাবদিহিতার বদলে স্বজনপ্রীতি সমর্থন করা হয়। এই বাস্তবতায় একটি শক্তিশালী শিক্ষা কাঠামো গড়ে ওঠার প্রত্যাশা করা অবাস্তব।

ফলে আমরা যে অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছি তা হলো একটি গভীর বৈপরীত্য। কাগজে সংবিধান আছে, শিক্ষাব্যবস্থা আছে, প্রতিষ্ঠান আছে, কিন্তু সেগুলো কার্যকর করার মতো মানসিকতা, দক্ষতা এবং জবাবদিহিতা নেই। এই অবস্থায় শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন কোনো কারিগরি সংস্কারের মাধ্যমে সম্ভব নয়, কারণ সমস্যাটি কারিকুলাম বা পরীক্ষা পদ্ধতিতে সীমাবদ্ধ নয়, এটি একটি দৃষ্টিভঙ্গির সংকট।

যতদিন পর্যন্ত রাষ্ট্র, নীতিনির্ধারক এবং রাজনৈতিক নেতৃত্ব জনগণের প্রয়োজনকে কেন্দ্র করে চিন্তা করা শুরু না করবে, ততদিন পর্যন্ত শিক্ষা ব্যবস্থাও ব্যক্তিকেন্দ্রিক স্বপ্ন আর অনুকরণের মধ্যে আটকে থাকবে। আর সেই অবস্থায় কোনো সংস্কারই টেকসই হবে না।

এই দৃষ্টিভঙ্গিগত সংকটের বাস্তব প্রতিফলন দেখা যায় শিক্ষা ব্যবস্থার বর্তমান কাঠামোর ভেতরে।

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে যদি বাস্তবতার আলোকে বিশ্লেষণ করা হয়, তাহলে প্রথমেই যে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে তা হলো, এটি একটি “সংযুক্ত ব্যবস্থা” নয়, বরং বিচ্ছিন্ন কিছু স্তরের সমষ্টি। প্রাথমিক, মাধ্যমিক এবং উচ্চশিক্ষা একে অপরের সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে যুক্ত থাকার কথা, কিন্তু বাস্তবে প্রতিটি স্তর আলাদা একটি কাঠামোর মতো কাজ করে, যেখানে লক্ষ্য, পদ্ধতি এবং ফলাফলের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে।

এই ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা কারিকুলাম এবং বাস্তবতার মধ্যে গভীর বিচ্ছিন্নতা। শিক্ষার্থীরা যে জ্ঞান অর্জন করছে, তার বড় অংশই পরীক্ষাকেন্দ্রিক এবং তাত্ত্বিক। কিন্তু সেই জ্ঞান বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করার সুযোগ, অনুশীলন বা কাঠামো নেই। ফলে শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য, অর্থাৎ সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা তৈরি করা, সেটি পূরণ হয় না। শিক্ষার্থীরা শিখছে, কিন্তু তারা “কীভাবে ব্যবহার করবে” সেই দক্ষতা তৈরি হচ্ছে না।

মূল্যায়ন পদ্ধতি এই সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলেছে। বর্তমান পরীক্ষানির্ভর কাঠামোতে মুখস্থ করা তথ্যই মূল মাপকাঠি। বিশ্লেষণধর্মী চিন্তা, সৃজনশীলতা বা বাস্তব সমস্যার সমাধান করার ক্ষমতা এখানে প্রায় অনুপস্থিত। ফলে একটি বিপরীতমুখী বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, যেখানে ভালো ফলাফল মানেই ভালো দক্ষতা নয়। একজন শিক্ষার্থী উচ্চ নম্বর পেতে পারে, কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার বা সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে দুর্বল থাকতে পারে।

শিক্ষক প্রস্তুতি এবং গবেষণার ক্ষেত্রেও একই ধরনের সীমাবদ্ধতা দেখা যায়। শিক্ষকতা একটি জ্ঞাননির্ভর এবং দক্ষতাভিত্তিক পেশা হওয়া সত্ত্বেও, অনেক ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ, গবেষণা পরিবেশ এবং প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার অভাব রয়েছে। এর ফলে শিক্ষা একটি গতিশীল প্রক্রিয়া হিসেবে বিকশিত না হয়ে, স্থির এবং পুনরাবৃত্তিমূলক হয়ে পড়ে।

নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রেও একটি মৌলিক সমস্যা কাজ করছে, যা প্রথম অংশে উল্লিখিত দৃষ্টিভঙ্গির সংকটের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। শিক্ষা নীতি দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা, তথ্য এবং বাস্তব প্রয়োজনের ভিত্তিতে তৈরি হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে এটি ব্যক্তিকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি, রাজনৈতিক অগ্রাধিকার এবং স্বল্পমেয়াদি সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। ফলে নীতির ধারাবাহিকতা থাকে না, এবং প্রতিটি পরিবর্তন নতুন একটি অনিশ্চয়তা তৈরি করে।

এই পুরো ব্যবস্থার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, শিক্ষা এবং কর্মসংস্থানের মধ্যে দুর্বল সংযোগ। শিক্ষার্থীরা দীর্ঘ সময় ধরে একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে পড়াশোনা করলেও, সেই জ্ঞান সরাসরি কর্মক্ষেত্রে প্রয়োগ করার সুযোগ বা কাঠামো পায় না। এর ফলে শিক্ষিত বেকারত্ব, দক্ষতার অপব্যবহার এবং হতাশা বৃদ্ধি পায়।

সবশেষে, একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা একটি কাঠামো তৈরি করতে পেরেছে, কিন্তু সেই কাঠামো কার্যকর করার জন্য প্রয়োজনীয় মানসিকতা, দক্ষতা এবং সমন্বয় তৈরি করতে পারেনি। ফলে শিক্ষা একটি রূপ আছে, কিন্তু কার্যকারিতা সীমিত। আর এই সীমাবদ্ধতাই পরবর্তী ধাপে, বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এর মতো প্রতিষ্ঠানের ফলাফলে সরাসরি প্রতিফলিত হয়।

এই কাঠামোগত বাস্তবতা সবচেয়ে স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে উচ্চশিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণে।

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সংকট বোঝার জন্য প্রথমে একটি মৌলিক প্রশ্ন পরিষ্কার করা প্রয়োজন, এই ব্যবস্থা কি দেশের মানুষের বাস্তব প্রয়োজন, অর্থনৈতিক কাঠামো এবং সামাজিক প্রেক্ষাপটকে ভিত্তি করে তৈরি? বাস্তবতা হলো, না। এই ব্যবস্থার ভেতরে একটি কাঠামো আছে, কিন্তু সেই কাঠামোর সঙ্গে বাস্তবতার সংযোগ দুর্বল। ফলে শিক্ষা একটি কার্যকর সক্ষমতা তৈরি করার প্রক্রিয়া না হয়ে, অনেক ক্ষেত্রে একটি আনুষ্ঠানিক সার্টিফিকেট অর্জনের পথে সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে।

এই ব্যবস্থার প্রধান বৈশিষ্ট্য তিনটি স্তরে ধরা যায়।

প্রথমত, কারিকুলাম এবং বাস্তবতার বিচ্ছিন্নতা। শিক্ষার্থীরা যা শিখছে, তার বড় অংশই সরাসরি কর্মক্ষেত্র, গবেষণা বা উদ্ভাবনের সঙ্গে সংযুক্ত নয়।

দ্বিতীয়ত, মূল্যায়ন পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা। মুখস্থনির্ভর পরীক্ষা বিশ্লেষণ, সৃজনশীলতা এবং সমস্যা সমাধানের দক্ষতা যাচাই করতে পারে না।

তৃতীয়ত, নীতিনির্ধারণে ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা। শিক্ষা একটি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় কৌশল হওয়া উচিত, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে এটি ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি এবং ঘোষণাভিত্তিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।

এই প্রেক্ষাপটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কে একটি উদাহরণ হিসেবে দেখলে চিত্রটি আরও স্পষ্ট হয়। দেশের সবচেয়ে পুরোনো এবং মর্যাদাপূর্ণ এই প্রতিষ্ঠানটি তাত্ত্বিকভাবে জ্ঞান উৎপাদন, নেতৃত্ব তৈরি এবং গবেষণার কেন্দ্র হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে এটি এমন একটি ব্যবস্থার ভেতরে কাজ করে, যেখানে কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা তার সক্ষমতাকে বাধাগ্রস্ত করে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রতিবছর যে “ফিনিশড প্রোডাক্ট” বের হয়, অর্থাৎ গ্র্যাজুয়েট শিক্ষার্থীরা, তাদের অবদান চারটি স্তরে দেখা যায়।

ব্যক্তি পর্যায়ে তারা ডিগ্রি, পরিচয় এবং কিছু পরিমাণ জ্ঞান অর্জন করে, যা তাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করে। কিন্তু এখানে একটি মৌলিক পার্থক্য তৈরি হয়, জ্ঞান কি দক্ষতায় রূপান্তরিত হচ্ছে, নাকি শুধুই সার্টিফিকেট হিসেবে থেকে যাচ্ছে।

পরিবারের ক্ষেত্রে এই গ্র্যাজুয়েটরা প্রায়ই আর্থিক এবং সামাজিক পরিবর্তনের চালিকাশক্তি হয়। অনেক পরিবারে প্রথম উচ্চশিক্ষিত সদস্য হিসেবে তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু এই অবদান প্রধানত অর্থনৈতিক, জ্ঞানভিত্তিক বা মূল্যবোধভিত্তিক পরিবর্তন তুলনামূলকভাবে সীমিত থাকে।

সমাজের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা দেখা যায়। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর কাছ থেকে যে সমালোচনামূলক চিন্তা, ন্যায়বোধ এবং নেতৃত্ব প্রত্যাশিত, তা সবসময় প্রতিফলিত হয় না। অনেক ক্ষেত্রে তারা বিদ্যমান কাঠামোর সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেয়, পরিবর্তনের চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারে না।

রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে এই সীমাবদ্ধতা আরও স্পষ্ট। একজন গ্র্যাজুয়েট নীতিনির্ধারক, গবেষক বা উদ্যোক্তা হওয়ার সম্ভাবনা রাখে, কিন্তু বাস্তবতায় দক্ষতার অপব্যবহার, সীমিত সুযোগ এবং অনেক ক্ষেত্রে মেধা পাচারের কারণে এই সম্ভাবনা পূর্ণতা পায় না।

এই পুরো বিশ্লেষণ থেকে একটি সরল কিন্তু কঠিন সত্য সামনে আসে। সমস্যা কেবল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এর না, বরং পুরো শিক্ষা ইকোসিস্টেমের। একটি দুর্বল কাঠামোর ভেতরে থেকে কোনো প্রতিষ্ঠান একা বিশ্বমানের ফলাফল তৈরি করতে পারে না।

ফলে “ফিনিশড প্রোডাক্ট” এর গুণগত মান নির্ভর করছে না শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের উপর, বরং পুরো ব্যবস্থার উপর। যদি সেই ব্যবস্থা বাস্তবতা, দক্ষতা এবং জবাবদিহিতার উপর ভিত্তি করে পুনর্গঠন না করা হয়, তাহলে একই ধরণের গ্র্যাজুয়েট তৈরি হতে থাকবে, যারা ব্যক্তি এবং পরিবার পর্যায়ে সফল হতে পারে, কিন্তু সমাজ এবং রাষ্ট্রের কাঠামোগত পরিবর্তনে সীমিত ভূমিকা রাখবে। এই চিত্রের ভেতর থেকেই মূল সমস্যার গভীর নির্যাস স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

আগের আলোচনাগুলো একত্রে বিবেচনা করলে একটি বিষয় পরিষ্কার হয়ে ওঠে, বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সংকট কোনো একক ত্রুটি বা খাতভিত্তিক ব্যর্থতা নয়। এটি একটি সমন্বিত কাঠামোগত ব্যর্থতা, যার শিকড় রাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গি, নীতিনির্ধারণ এবং বাস্তবায়ন ব্যবস্থার গভীরে প্রোথিত।

প্রথমত, দৃষ্টিভঙ্গির সংকট

শিক্ষাকে কখনোই একটি কৌশলগত জাতীয় বিনিয়োগ হিসেবে দেখা হয়নি। বরং এটি দীর্ঘদিন ধরে সার্টিফিকেট অর্জনের একটি প্রক্রিয়ায় সীমাবদ্ধ থেকেছে। ফলে শিক্ষা ব্যবস্থার উদ্দেশ্য, পদ্ধতি এবং ফলাফলের মধ্যে একটি মৌলিক অসামঞ্জস্য তৈরি হয়েছে। এই সংকটটি সরাসরি প্রতিফলিত হয় বাংলাদেশের সংবিধান এর সেই বাস্তবতার সঙ্গে, যেখানে অধিকার স্বীকৃত, কিন্তু কার্যকর করার কাঠামো দুর্বল।

দ্বিতীয়ত, জবাবদিহিতার অনুপস্থিতি

নীতি প্রণয়ন থেকে শুরু করে বাস্তবায়ন পর্যন্ত কোথাও একটি কার্যকর জবাবদিহিতা কাঠামো গড়ে ওঠেনি। সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, কিন্তু তার ফলাফল মূল্যায়ন করা হয় না। ব্যর্থতার কোনো সুস্পষ্ট দায় নির্ধারণ হয় না। ফলে একই ধরনের সীমাবদ্ধতা বারবার পুনরাবৃত্তি হয়, এবং কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শেখার প্রক্রিয়া তৈরি হয় না।

তৃতীয়ত, কপি-পেস্ট উন্নয়ন মডেল

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় একটি প্রবণতা স্পষ্ট, তা হলো বাইরের কাঠামো অনুকরণ করা, কিন্তু সেই কাঠামো কার্যকর করার জন্য প্রয়োজনীয় প্রেক্ষাপট তৈরি না করা। উন্নত দেশের কারিকুলাম, মূল্যায়ন বা নীতির কিছু অংশ গ্রহণ করা হলেও, সেগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ অবকাঠামো, শিক্ষক প্রস্তুতি বা গবেষণা পরিবেশ তৈরি করা হয়নি। ফলে কাঠামোটি বাহ্যিকভাবে আধুনিক দেখালেও, বাস্তবে তা কার্যকর হয় না।

চতুর্থত, নীতিনির্ধারণে ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা

শিক্ষা নীতি একটি ধারাবাহিক এবং প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে এটি অনেক সময় ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর দৃষ্টিভঙ্গির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এর ফলে নীতির ধারাবাহিকতা নষ্ট হয়, এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার বদলে স্বল্পমেয়াদি সিদ্ধান্ত প্রাধান্য পায়।

এই চারটি সমস্যাকে একত্রে দেখলে একটি স্পষ্ট চিত্র তৈরি হয়। বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার ব্যর্থতা কোনো সম্পদের ঘাটতি বা একক ব্যবস্থাপনার ত্রুটির কারণে নয়, বরং এটি একটি গভীর কাঠামোগত এবং দৃষ্টিভঙ্গিগত সংকট। যতক্ষণ পর্যন্ত এই মূল সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সমাধান করা না হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত কোনো আংশিক সংস্কার বাস্তব পরিবর্তন আনতে পারবে না।

এই অবস্থান থেকেই পরবর্তী প্রশ্নটি আসে, করণীয় কী? এই নির্যাসের ভিত্তিতেই এখন করণীয় নির্ধারণ করা জরুরি হয়ে দাঁড়ায়।

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার বর্তমান সংকট কোনো একক সংস্কার বা প্রশাসনিক পরিবর্তনের মাধ্যমে সমাধানযোগ্য নয়। কারণ সমস্যাটি কাঠামোর ভেতরে সীমাবদ্ধ নয়, এটি দৃষ্টিভঙ্গি, নীতি এবং বাস্তবায়নের সমন্বিত ব্যর্থতার ফল। তাই করণীয় নির্ধারণ করতে হলে প্রথমে সমস্যার প্রকৃতি অনুযায়ী স্তরভিত্তিক সমাধান ভাবতে হবে।

শিক্ষার উদ্দেশ্য পুনঃসংজ্ঞায়ন

শিক্ষাকে কেবল চাকরি পাওয়ার মাধ্যম হিসেবে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বের হয়ে আসতে হবে। শিক্ষা কী তৈরি করবে, এটি রাষ্ট্রীয়ভাবে পরিষ্কার করতে হবে। একজন শিক্ষার্থী শুধু তথ্যভিত্তিক জ্ঞান নয়, বরং সমস্যা বিশ্লেষণ, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং বাস্তব পরিস্থিতি মোকাবেলার সক্ষমতা অর্জন করবে, এই লক্ষ্যকে কেন্দ্র করে পুরো ব্যবস্থাকে পুনর্গঠন করতে হবে।

কারিকুলাম এবং বাস্তবতার সংযোগ

কারিকুলামকে শ্রমবাজার, গবেষণা ক্ষেত্র এবং স্থানীয় সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করতে হবে। তত্ত্বের পাশাপাশি প্রয়োগভিত্তিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করতে হবে। শিক্ষা যেন শুধু শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং বাস্তব সমস্যার সঙ্গে সংযুক্ত থাকে, সেই কাঠামো তৈরি করতে হবে।

মূল্যায়ন ব্যবস্থার মৌলিক পরিবর্তন

মুখস্থনির্ভর পরীক্ষার সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসতে হবে। মূল্যায়নের কেন্দ্রবিন্দু হতে হবে বিশ্লেষণ, সৃজনশীলতা এবং বাস্তব সমস্যা সমাধান। একজন শিক্ষার্থী কীভাবে চিন্তা করে এবং কীভাবে সমস্যার সমাধান করে, সেটাই মূল মানদণ্ড হওয়া উচিত।

শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং গবেষণা পরিবেশ শক্তিশালী করা

শিক্ষককে শুধু পাঠদানকারী হিসেবে নয়, জ্ঞান উৎপাদনের অংশ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। নিয়মিত প্রশিক্ষণ, গবেষণার সুযোগ এবং প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা ছাড়া শিক্ষার মান উন্নয়ন সম্ভব নয়। শিক্ষক উন্নয়ন ছাড়া শিক্ষা উন্নয়ন কল্পনাও করা যায় না।

প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা

নীতি প্রণয়ন থেকে বাস্তবায়ন পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে ফলাফলভিত্তিক জবাবদিহিতা থাকতে হবে। কোন নীতি কী ফল দিচ্ছে, তা নিয়মিত মূল্যায়ন করতে হবে। ব্যর্থতার দায় নির্ধারণ না করলে একই ভুল পুনরাবৃত্তি হতে থাকবে।

বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থার পুনর্গঠন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সহ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাব থেকে বাস্তবিক অর্থে স্বাধীন এবং গবেষণাভিত্তিক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়কে শুধু ডিগ্রি প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান না রেখে জ্ঞান উৎপাদন ও উদ্ভাবনের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।

এই করণীয়গুলো কোনো বিচ্ছিন্ন সংস্কার নয়, বরং একটি সমন্বিত রূপান্তরের অংশ। যতদিন পর্যন্ত শিক্ষা ব্যবস্থাকে একটি জাতীয় সক্ষমতা গঠনের কৌশল হিসেবে দেখা না হবে, ততদিন পর্যন্ত কোনো পরিবর্তনই টেকসই হবে না।

রহমান মৃধা, গবেষক ও লেখক, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন।

শেয়ার করুন:-
পুরো সংবাদটি পড়ুন

মত দ্বিমত

দেশ গঠনে সাংবাদিকতার ভূমিকা: সত্য, ক্ষমতা এবং আমাদের আত্মবিনাশের গল্প

Published

on

মেঘনা

সংবাদমাধ্যম যখন সত্য প্রকাশের মৌলিক দায়িত্ব থেকে সরে গিয়ে ক্ষমতার প্রচারযন্ত্রে পরিণত হয়, তখন সমাজ কেবল ফ্যাসিবাদের দিকে অগ্রসর হয় না, বরং ধীরে ধীরে এমন এক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যায়, যেখানে মানবিকতা ও নৈতিকতার ভিত্তি ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ে। এই পরিবর্তন তাৎক্ষণিক নয়, এটি একটি ধীর এবং গভীর প্রক্রিয়া, যেখানে সত্যের জায়গা দখল করে প্রভাব, নিয়ন্ত্রণ এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বয়ান।

AdLink দ্বারা বিজ্ঞাপন ×

এই বাস্তবতাকে বোঝার জন্য হায়েনার রূপকটি বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। হায়েনা কেবল একটি শিকারি প্রাণী নয়, বরং এমন এক আচরণগত প্রতীক, যা সুযোগসন্ধানী সহিংসতার স্বরূপ প্রকাশ করে। এটি সবসময় সক্রিয়ভাবে শিকার করে না, কিন্তু সুযোগ পেলেই জীবিত শিকারের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং নির্মমভাবে তাকে ছিন্নভিন্ন করে। একইভাবে ক্ষমতা কেন্দ্রিক সামাজিক কাঠামোর ভেতরে কিছু গোষ্ঠীও সুযোগ পেলেই মানবিকতা ও নৈতিকতার সীমা অতিক্রম করে নিয়ন্ত্রণ ও দমনের পথে অগ্রসর হয়।

AdLink দ্বারা বিজ্ঞাপন ×

এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে, যখন সংবাদমাধ্যম সত্যের পরিবর্তে ক্ষমতার ভাষা হয়ে ওঠে, তখন একটি সমাজে বাস্তবতা কীভাবে সংজ্ঞায়িত হয়?

AdLink দ্বারা বিজ্ঞাপন ×

আরও গভীর প্রশ্ন হলো, যেখানে তথ্যের উৎসই বিকৃত, সেখানে মানুষ কোন ভিত্তিতে সত্য এবং মিথ্যার মধ্যে পার্থক্য নির্ধারণ করে?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর সরল নয়। কারণ এখানে কেবল তথ্যের বিকৃতি ঘটে না, বরং ধীরে ধীরে একটি বিকল্প বাস্তবতা গড়ে ওঠে, যা ক্ষমতা, পুনরাবৃত্তি এবং প্রভাবের মাধ্যমে ক্রমশ স্বাভাবিক সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে শুরু করে।

এর ফলাফল কেবল রাজনৈতিক নয়, বরং গভীরভাবে সামাজিক এবং মনস্তাত্ত্বিক। এই কাঠামোর ভেতরে এমন কিছু শক্তি গড়ে ওঠে, যারা নিজেদের ক্ষমতাবান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে, কিন্তু ধীরে ধীরে মানবিকতা ও নৈতিকতার মূল ভিত্তি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। তারা এক ধরনের নিয়ন্ত্রণনির্ভর বাস্তবতার প্রতিনিধিতে পরিণত হয়, যেখানে সত্য নয়, বরং আধিপত্যই প্রধান মানদণ্ড হয়ে ওঠে। আমাদের সমাজেও আজ সেই প্রবণতা স্পষ্ট। কিছু মানুষ, যারা নিজেদের ক্ষমতাশালী বলে মনে করে, তারা ধীরে ধীরে মানবিকতা হারিয়ে দানবীয় রূপ নিচ্ছে। তারা হয়ে উঠছে গডফাদার, স্বৈরাচার, ফ্যাসিস্ট, অসভ্য ও বিকৃত মানসিকতার এক ধরনের ক্ষমতাকেন্দ্রিক শক্তি, যাদের কাছে সত্যের কোনো মূল্য নেই, নিয়ন্ত্রণই একমাত্র লক্ষ্য।

আমি বিশ্বের নানা দেশের সাংবাদিকদের কাজ দেখেছি, তাদের চর্চা পর্যবেক্ষণ করেছি। সেখানে মতাদর্শের পার্থক্য আছে, কাজের ধরণে ভিন্নতা আছে, কিন্তু একটি মৌলিক জায়গায় স্পষ্ট মিল দেখা যায়, তারা নিজেদের ভূমিকা সম্পর্কে সচেতন। তারা জানে রাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক কী, এবং জনগণের প্রতি তাদের দায় শেষ হয় না, বরং সেখান থেকেই শুরু হয়।

কিন্তু বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে এসে সেই একই সচেতনতা, সেই একই পেশাগত অবস্থান খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এটি কি ব্যক্তিগত সীমাবদ্ধতা, নাকি একটি বৃহত্তর কাঠামোগত বাস্তবতা? এই প্রশ্ন এখনো অমীমাংসিত থেকে যায়।

বিশ্বের উন্নত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোতে সাংবাদিকতা কেবল একটি পেশা নয়, এটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব এবং সামাজিক চুক্তির অংশ। সেখানে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা ক্ষমতার বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলার একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, কোনো ব্যতিক্রমী ঘটনা নয়। The New York Times বা BBC-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলোতে সাংবাদিকতার এই ভূমিকা দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠিত। ইতিহাসে Watergate scandal দেখিয়েছে, কীভাবে একটি শক্তিশালী সংবাদমাধ্যম রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতাকেও জবাবদিহির কাঠামোর মধ্যে আনতে পারে।

এই বাস্তবতার সঙ্গে তুলনা করলে বাংলাদেশের পরিস্থিতি একটি ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে। এখানে সাংবাদিকতার ভূমিকা প্রায়শই প্রশ্ন তোলার জায়গায় না থেকে কাঠামোর সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার একটি প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়। ফলে রাষ্ট্র, ক্ষমতা এবং সংবাদমাধ্যমের মধ্যে যে সমালোচনামূলক দূরত্ব থাকা প্রয়োজন, সেটি ক্রমশ সংকুচিত হয়ে আসে।

এই পার্থক্য কি কেবল দুর্ভাগ্য, নাকি একটি দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক গঠনের ফল, সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

সমস্যাটি কেবল ব্যক্তি সাংবাদিকের নয়, এটি একটি গভীরভাবে প্রোথিত কাঠামোগত বাস্তবতা। সাংবাদিকতা অনেক ক্ষেত্রেই একটি পেশাগত দক্ষতা হিসেবে শেখানো হয়, কিন্তু একটি নৈতিক ও সামাজিক দায়িত্ব হিসেবে গড়ে তোলার প্রক্রিয়া দুর্বল থেকে যায়। ফলে তাত্ত্বিকভাবে নৈতিকতার কথা থাকলেও, বাস্তব প্রয়োগের জায়গায় সেটি ধীরে ধীরে ক্ষয় হতে থাকে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই প্রশ্ন আরও তীব্র হয়ে ওঠে, কেন এই রূপান্তর কার্যকরভাবে ঘটছে না?

এর একটি বড় কারণ হলো শিক্ষা ও পেশাগত বাস্তবতার মধ্যে ব্যবধান। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে সাংবাদিকতা শিক্ষায় নৈতিকতা, গণতান্ত্রিক দায়িত্ব এবং পেশাগত মানদণ্ডের কথা বলা হলেও, বাস্তব কর্মজীবনে প্রবেশের পর সেই কাঠামো খুব কম ক্ষেত্রেই টিকে থাকে। বিশেষ করে প্রাথমিক কর্মপর্ব বা ইন্টার্নশিপ পর্যায়টি অনেক সময় নৈতিকতার চর্চা না হয়ে বেঁচে থাকার প্রশিক্ষণ হিসেবে কাজ করে।

এই পর্যায়ে একজন শিক্ষার্থী বা নবীন সাংবাদিক ধীরে ধীরে বুঝতে শেখে যে বাস্তব কাঠামোর ভেতরে টিকে থাকার শর্ত প্রায়ই নির্ভর করে ক্ষমতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সক্ষমতার ওপর, সত্যের প্রতি অটল থাকার ওপর নয়। এই অভিজ্ঞতা তাকে এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করায়, যেখানে আদর্শগত সাংবাদিকতার চেয়ে প্রাতিষ্ঠানিক চাপ এবং সম্পর্কনির্ভর রাজনীতি অধিক প্রভাবশালী হয়ে ওঠে।

ফলে সময়ের সাথে সাথে একটি বিপরীত শিক্ষা তৈরি হয়, যেখানে বইয়ে শেখা নৈতিকতা এবং কর্মক্ষেত্রের বাস্তবতা একে অপরের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়, এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে বাস্তবতাই জয়ী হয়। এই প্রক্রিয়ায় একজন সম্ভাবনাময় সাংবাদিক ধীরে ধীরে তার আদর্শগত অবস্থান থেকে সরে গিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে বাধ্য হয়।

এটাই সেই বাস্তবতা, যেখানে সাংবাদিকতা তার আদর্শগত সংজ্ঞা থেকে সরে গিয়ে একটি টিকে থাকার দক্ষতায় রূপান্তরিত হয়। এই অবস্থাকে যদি কাঠামোগতভাবে দেখা হয়, তাহলে এটি কেবল ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়, বরং একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্যহীনতার ফল।

শেষ পর্যন্ত সাংবাদিকতা যদি সত্য বলার নৈতিক অবস্থান থেকে সরে গিয়ে কেবল পেশাগত টিকে থাকার কৌশলে পরিণত হয়, তাহলে সমাজের তথ্যভিত্তিক কাঠামোও ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে। তখন প্রশ্নটি অনিবার্য হয়ে ওঠে, আমরা কি সত্য উৎপাদন করছি, নাকি কেবল বাস্তবতার একটি ব্যবস্থাপিত সংস্করণ তৈরি করছি?

এই হারিয়ে যাওয়ার পেছনে সবচেয়ে গভীর কারণ হলো পুরো রাষ্ট্রীয় পরিকাঠামোর কাঠামোগত অবক্ষয়। যখন একটি দেশের রাজনৈতিক, প্রশাসনিক এবং প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো দুর্নীতি, স্বার্থ এবং ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতায় জর্জরিত হয়ে পড়ে, তখন সেখানে নৈতিক সাংবাদিকতার টিকে থাকা প্রায় অসম্ভব হয়ে যায়। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং একটি ধারাবাহিক এবং পরস্পর সংযুক্ত প্রক্রিয়া।

একটি রাষ্ট্রের মেরুদণ্ড হওয়ার কথা তার সংসদ। সেখানে আইন প্রণয়ন, নীতি নির্ধারণ এবং জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটার কথা। কিন্তু বাস্তবতা যখন এই আদর্শ কাঠামো থেকে বিচ্যুত হয়, তখন সেই প্রতিষ্ঠানই তার মূল অর্থ হারাতে শুরু করে।

সংসদে প্রবেশের পথ যদি দুর্নীতি, জালিয়াতি এবং আর্থিক প্রভাবের মাধ্যমে নির্ধারিত হয়, তাহলে সেই প্রতিষ্ঠান থেকে প্রকৃত অর্থে কী প্রত্যাশা করা যায়? এই জায়গায় প্রশ্নটি সরাসরি হয়ে দাঁড়ায়, যে ব্যক্তি বিপুল অর্থ ব্যয় করে সংসদ সদস্য পদ অর্জন করে, সে কি সত্যিই জনসেবা করতে আসে, নাকি একটি বিনিয়োগের রিটার্ন নিশ্চিত করতে আসে?

যখন রাজনীতি ধীরে ধীরে বিনিয়োগ নির্ভর কাঠামোয় রূপ নেয়, তখন নির্বাচন একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া না থেকে একটি ব্যবসায়িক প্রকল্পে পরিণত হয়। সেখানে জনগণ হয়ে ওঠে কেবল একটি মাধ্যম, আর ক্ষমতা রূপ নেয় মুনাফা অর্জনের কাঠামোয়। এর স্বাভাবিক ফলাফল হলো আইন প্রণয়ন জনস্বার্থের পরিবর্তে বিনিয়োগ সুরক্ষার একটি হাতিয়ারে পরিণত হয়।

এই বাস্তবতায় রাষ্ট্রীয় কাঠামোর প্রতিটি স্তর একে একে বিকৃত হয়ে পড়ে। আইন ব্যবহৃত হয় ঢাল হিসেবে, নীতি ব্যবহৃত হয় কেবল সাজসজ্জা হিসেবে, আর জনগণ ব্যবহৃত হয় বৈধতার আবরণ তৈরির উপকরণ হিসেবে।

যারা এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সংসদে প্রবেশ করে, তারা দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি এবং প্রতারণার মতো কাঠামোগত সমস্যার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত হয়ে পড়ে। এবং এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমেই রাষ্ট্রের সামগ্রিক পরিকাঠামো পরিচালিত ও পুনরুৎপাদিত হয়।

এই অবস্থায় সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ তারা যদি এই কাঠামোগত বাস্তবতাকে প্রশ্ন না করে বরং স্বাভাবিক ও গ্রহণযোগ্য হিসেবে উপস্থাপন করে, তাহলে পুরো ব্যবস্থা একটি স্বনিয়ন্ত্রিত দুর্নীতির চক্রে পরিণত হয়।

এখানেই সাংবাদিকতার প্রকৃত পরীক্ষা শুরু হয়, তারা কি এই বিনিয়োগ নির্ভর ক্ষমতা কাঠামোর বিরুদ্ধে দাঁড়াবে, নাকি ধীরে ধীরে তারই অংশে পরিণত হবে?

কারণ যদি সংসদ হয় দুর্নীতির উৎপত্তিস্থল, আর সংবাদমাধ্যম হয় তার সৌন্দর্যবর্ধক ব্যাখ্যাকারী, তাহলে রাষ্ট্রের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলোর পতন কেবল সময়ের অপেক্ষা। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো যদি নিজেরাই নিয়ম ভঙ্গ করে, তাহলে আইনের প্রতি সামাজিক আস্থা ভেঙে পড়ে।

দুর্নীতি দমনের জন্য যে কমিশনগুলো গঠিত হয়, সেই প্রতিষ্ঠানগুলোই যদি দুর্নীতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার অংশ হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে সেটি কেবল প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, বরং একটি কাঠামোগত প্রহসন।

এই বাস্তবতার ব্যাখ্যায় প্রায়ই বাইরের শক্তিকে দায়ী করা হয়। বিশেষ করে ভারতকে ঘিরে নানা ধরনের ষড়যন্ত্র তত্ত্ব প্রচলিত আছে, যেখানে বলা হয় রাজনৈতিক দলগুলোকে ব্যবহার করে একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। কিন্তু এই ব্যাখ্যা একটি সহজ পথ তৈরি করে দেয়, নিজেদের দায় এড়িয়ে যাওয়ার পথ।

বাস্তবতা হলো, একটি দেশের অভ্যন্তরীণ প্রতিষ্ঠানগুলো যখন দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন বাইরের প্রভাব কার্যকর হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। তবে সেই দুর্বল কাঠামোর ভিত্তি প্রথমে তৈরি হয় অভ্যন্তরীণ ব্যর্থতার মধ্য দিয়েই। রাজনৈতিক সংস্কৃতি, প্রশাসনিক কাঠামো, সংসদীয় আচরণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা মিলেই এমন একটি পরিবেশ গড়ে তোলে যেখানে সত্য ধীরে ধীরে প্রান্তিক হয়ে পড়ে। এখানেই সাংবাদিকতার ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

সাংবাদিকদের মৌলিক কাজ হলো বাস্তবতাকে উন্মোচন করা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, সেই বাস্তবতা প্রায়ই ঘষেমেজে, সাজিয়ে এবং পরিশোধিতভাবে উপস্থাপন করা হয়। ফলে সত্যের পরিবর্তে একটি নিয়ন্ত্রিত ও নির্বাচিত বাস্তবতা তৈরি হয়, যা ধীরে ধীরে সমাজে স্বাভাবিক সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে শুরু করে।

এই প্রবণতার মধ্য দিয়েই একটি নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, যেখানে সাংবাদিকতা তার নৈতিক অবস্থান থেকে সরে গিয়ে একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর সঙ্গে অভিযোজিত হয়ে পড়ে, যা বইয়ে লেখা নেই, সিলেবাসে সংজ্ঞায়িত নয়, কিন্তু বাস্তব কর্মক্ষেত্রে দৃশ্যমান।

এই অবস্থার প্রভাব কেবল সংবাদমাধ্যমে সীমাবদ্ধ থাকে না। যখন আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো নিজেরাই নিয়ম ভঙ্গ করে, তখন সমাজে আইনের প্রতি আস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে। একইভাবে দুর্নীতি দমন কমিশনের মতো প্রতিষ্ঠান যদি দুর্নীতি প্রতিরোধের পরিবর্তে সেটিকে কাঠামোগতভাবে সহনীয় করে তোলে, তাহলে সেটি আর নিয়ন্ত্রণের প্রতিষ্ঠান থাকে না, বরং একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার প্রতীকে পরিণত হয়।

এই পরিস্থিতিতে অনেকেই আবার বাইরের শক্তিকে দায়ী করতে চান। বিশেষ করে ভারতকে কেন্দ্র করে নানা ধরনের ব্যাখ্যা সামনে আনা হয়, যেখানে বলা হয় একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। কিন্তু এই ব্যাখ্যাগুলো যতই শক্তিশালী মনে হোক না কেন, এগুলো প্রায়ই একটি সহজ পথ তৈরি করে দেয়, নিজেদের অভ্যন্তরীণ দায় এড়িয়ে যাওয়ার পথ।

বাস্তবতা হলো, একটি দেশের অভ্যন্তরীণ কাঠামো দুর্বল না হলে বাইরের কোনো প্রভাবই দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর হতে পারে না। সেই দুর্বলতার ভিত্তি আমরা নিজেরাই তৈরি করি, রাজনৈতিক সংস্কৃতি, প্রশাসনিক কাঠামো, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা এবং জবাবদিহির অভাবের মাধ্যমে।

এই অবস্থায় রাজনীতি আর আদর্শের জায়গা থাকে না, এটি হয়ে ওঠে বিনিয়োগের ক্ষেত্র। আর এই বিনিয়োগের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্যই গড়ে ওঠে একটি সমন্বিত কাঠামো, সংসদ, প্রশাসন, কমিশন এবং সংবাদমাধ্যম, যেখানে প্রত্যেকে প্রত্যেককে রক্ষা করে, এবং সম্মিলিতভাবে একটি বিকৃত কিন্তু স্থিতিশীল বাস্তবতা বজায় রাখে।

এই বাস্তবতায় সাংবাদিকতার ভূমিকা আর নিরপেক্ষ থাকে না। তারা হয় এই কাঠামোর বিরুদ্ধে দাঁড়াবে, অথবা ধীরে ধীরে তার অংশ হয়ে উঠবে। মাঝামাঝি কোনো অবস্থান এখানে দীর্ঘস্থায়ী হয় না। একটি রাষ্ট্রে যদি সত্যের প্রবাহ বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াও বিকৃত হয়ে পড়ে। মানুষ তখন তথ্যের ভিত্তিতে নয়, বরং প্রভাবিত বয়ানের ভিত্তিতে চিন্তা করে। এর ফলে ভুল সিদ্ধান্তই স্বাভাবিক হয়ে ওঠে, আর সঠিক প্রশ্নগুলো ক্রমশ অদৃশ্য হয়ে যায়।

এই অবস্থায় বাইরের শক্তিকে দায়ী করা সহজ, কিন্তু তা সমস্যার সমাধান নয়। একটি রাষ্ট্র তখনই দুর্বল হয়, যখন তার ভেতরের কাঠামো নিজেই সত্য ধারণ করার সক্ষমতা হারায়। বাইরের প্রভাব সেই দুর্বলতার সুযোগ নেয়, সৃষ্টি করে না। তাই মূল প্রশ্নটি বাইরের নয়, ভেতরের।

আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলো কি এখনো সত্য ধারণ করার মতো শক্তিশালী, নাকি তারা কেবল ক্ষমতার প্রতিধ্বনি হয়ে উঠেছে এবং আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, সাংবাদিকরা কি এখনো জনগণের পক্ষে দাঁড়াতে প্রস্তুত, নাকি তারা ইতিমধ্যেই কাঠামোর অংশ হয়ে গেছে?

কারণ ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, একটি জাতিকে ধ্বংস করার জন্য বাহ্যিক আক্রমণ সবসময় প্রয়োজন হয় না। যখন সত্য বিকৃত হয়, নৈতিকতা আপস করে, এবং প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের উদ্দেশ্য হারিয়ে ফেলে, তখন একটি সমাজ ভেতর থেকেই ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ে। বাংলাদেশ আজ সেই সীমানায় দাঁড়িয়ে আছে।

এখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়, আমরা কি এই কাঠামোগত বিকৃতিকে স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নেব, নাকি এর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে একটি জবাবদিহিমূলক, সত্যভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা পুনর্গঠন করব?

কারণ শেষ পর্যন্ত একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় তার অর্থনীতি বা সামরিক শক্তি দিয়ে নয়, বরং তার সত্য বলার সাহস দিয়ে।

রহমান মৃধা, গবেষক ও লেখক, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন।

শেয়ার করুন:-
পুরো সংবাদটি পড়ুন

পুঁজিবাজারের সর্বশেষ

মেঘনা মেঘনা
পুঁজিবাজার1 hour ago

মেঘনা সিমেন্টের তৃতীয় প্রান্তিক প্রকাশ

পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানি মেঘনা সিমেন্ট মিলস পিএলসি গত ৩১ মার্চ, ২০২৬ তারিখে সমাপ্ত তৃতীয় প্রান্তিকের (জানুয়ারি’২৬-মার্চ’২৬) অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ...

মেঘনা মেঘনা
পুঁজিবাজার1 hour ago

বসুন্ধরা পেপার মিলসের তৃতীয় প্রান্তিক প্রকাশ

পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানি বসুন্ধরা পেপার মিলস পিএলসি গত ৩১ মার্চ, ২০২৬ তারিখে সমাপ্ত তৃতীয় প্রান্তিকের (জানুয়ারি’২৬-মার্চ’২৬) অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ...

মেঘনা মেঘনা
পুঁজিবাজার1 hour ago

সায়হাম কটনের তৃতীয় প্রান্তিক প্রকাশ

পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানি সায়হাম কটন মিলস লিমিটেড গত ৩১ মার্চ, ২০২৬ তারিখে সমাপ্ত তৃতীয় প্রান্তিকের (জানুয়ারি’২৬-মার্চ’২৬) অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ...

মেঘনা মেঘনা
পুঁজিবাজার2 hours ago

ইন্দো-বাংলা ফার্মার তৃতীয় প্রান্তিক প্রকাশ

পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানি ইন্দো-বাংলা ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড গত ৩১ মার্চ, ২০২৬ তারিখে সমাপ্ত তৃতীয় প্রান্তিকের (জানুয়ারি’২৬-মার্চ’২৬) অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।...

মেঘনা মেঘনা
পুঁজিবাজার2 hours ago

ন্যাশনাল ব্যাংকের লভ্যাংশ সংক্রান্ত ঘোষণা

পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানি ন্যাশনাল ব্যাংক লিমিটেড গত ৩১ ডিসেম্বর, ২০২৫ তারিখে সমাপ্ত হিসাববছরের জন্য লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে। কোম্পানিটি আলোচিত বছরের...

মেঘনা মেঘনা
পুঁজিবাজার2 hours ago

ন্যাশনাল ব্যাংকের প্রথম প্রান্তিক প্রকাশ

পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানি ন্যাশনাল ব্যাংক লিমিটেড ৩১ মার্চ, ২০২৬ তারিখে সমাপ্ত প্রথম প্রান্তিকের (জানুয়ারি’২৬-মার্চ’২৬) অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। ...

মেঘনা মেঘনা
পুঁজিবাজার2 hours ago

ফেডারেল ইন্স্যুরেন্সের প্রথম প্রান্তিক প্রকাশ

পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানি ফেডারেল ইন্স্যুরেন্স পিএলসি ৩১ মার্চ, ২০২৬ তারিখে সমাপ্ত প্রথম প্রান্তিকের (জানুয়ারি’২৬-মার্চ’২৬) অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। ...

সোশ্যাল মিডিয়া

তারিখ অনুযায়ী সংবাদ

রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি
 
১০১১১৩১৫১৬
১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭৩০
৩১  
মেঘনা
পুঁজিবাজার1 hour ago

মেঘনা সিমেন্টের তৃতীয় প্রান্তিক প্রকাশ

মেঘনা
পুঁজিবাজার1 hour ago

বসুন্ধরা পেপার মিলসের তৃতীয় প্রান্তিক প্রকাশ

মেঘনা
পুঁজিবাজার1 hour ago

সায়হাম কটনের তৃতীয় প্রান্তিক প্রকাশ

মেঘনা
পুঁজিবাজার2 hours ago

ইন্দো-বাংলা ফার্মার তৃতীয় প্রান্তিক প্রকাশ

মেঘনা
পুঁজিবাজার2 hours ago

ন্যাশনাল ব্যাংকের লভ্যাংশ সংক্রান্ত ঘোষণা

মেঘনা
পুঁজিবাজার2 hours ago

ন্যাশনাল ব্যাংকের প্রথম প্রান্তিক প্রকাশ

মেঘনা
পুঁজিবাজার2 hours ago

ফেডারেল ইন্স্যুরেন্সের প্রথম প্রান্তিক প্রকাশ

মেঘনা
পুঁজিবাজার2 hours ago

ওয়াটা কেমিক্যালের তৃতীয় প্রান্তিক প্রকাশ

মেঘনা
পুঁজিবাজার2 hours ago

এবি ব্যাংকের প্রথম প্রান্তিক প্রকাশ

মেঘনা
পুঁজিবাজার2 hours ago

এনআরবি ব্যাংকের লভ্যাংশ সংক্রান্ত ঘোষণা

মেঘনা
পুঁজিবাজার1 hour ago

মেঘনা সিমেন্টের তৃতীয় প্রান্তিক প্রকাশ

মেঘনা
পুঁজিবাজার1 hour ago

বসুন্ধরা পেপার মিলসের তৃতীয় প্রান্তিক প্রকাশ

মেঘনা
পুঁজিবাজার1 hour ago

সায়হাম কটনের তৃতীয় প্রান্তিক প্রকাশ

মেঘনা
পুঁজিবাজার2 hours ago

ইন্দো-বাংলা ফার্মার তৃতীয় প্রান্তিক প্রকাশ

মেঘনা
পুঁজিবাজার2 hours ago

ন্যাশনাল ব্যাংকের লভ্যাংশ সংক্রান্ত ঘোষণা

মেঘনা
পুঁজিবাজার2 hours ago

ন্যাশনাল ব্যাংকের প্রথম প্রান্তিক প্রকাশ

মেঘনা
পুঁজিবাজার2 hours ago

ফেডারেল ইন্স্যুরেন্সের প্রথম প্রান্তিক প্রকাশ

মেঘনা
পুঁজিবাজার2 hours ago

ওয়াটা কেমিক্যালের তৃতীয় প্রান্তিক প্রকাশ

মেঘনা
পুঁজিবাজার2 hours ago

এবি ব্যাংকের প্রথম প্রান্তিক প্রকাশ

মেঘনা
পুঁজিবাজার2 hours ago

এনআরবি ব্যাংকের লভ্যাংশ সংক্রান্ত ঘোষণা

মেঘনা
পুঁজিবাজার1 hour ago

মেঘনা সিমেন্টের তৃতীয় প্রান্তিক প্রকাশ

মেঘনা
পুঁজিবাজার1 hour ago

বসুন্ধরা পেপার মিলসের তৃতীয় প্রান্তিক প্রকাশ

মেঘনা
পুঁজিবাজার1 hour ago

সায়হাম কটনের তৃতীয় প্রান্তিক প্রকাশ

মেঘনা
পুঁজিবাজার2 hours ago

ইন্দো-বাংলা ফার্মার তৃতীয় প্রান্তিক প্রকাশ

মেঘনা
পুঁজিবাজার2 hours ago

ন্যাশনাল ব্যাংকের লভ্যাংশ সংক্রান্ত ঘোষণা

মেঘনা
পুঁজিবাজার2 hours ago

ন্যাশনাল ব্যাংকের প্রথম প্রান্তিক প্রকাশ

মেঘনা
পুঁজিবাজার2 hours ago

ফেডারেল ইন্স্যুরেন্সের প্রথম প্রান্তিক প্রকাশ

মেঘনা
পুঁজিবাজার2 hours ago

ওয়াটা কেমিক্যালের তৃতীয় প্রান্তিক প্রকাশ

মেঘনা
পুঁজিবাজার2 hours ago

এবি ব্যাংকের প্রথম প্রান্তিক প্রকাশ

মেঘনা
পুঁজিবাজার2 hours ago

এনআরবি ব্যাংকের লভ্যাংশ সংক্রান্ত ঘোষণা