আন্তর্জাতিক
ভেনেজুয়েলার তেল বেচার অর্থ কাতারের ব্যাংকে
ভেনেজুয়েলার তেল বেচা শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এটা পুরোনো খবর। এই খবরের পরবর্তী অধ্যায় হচ্ছে, এই তেল বিক্রির অর্থ কাতারের ব্যাংকে গচ্ছিত রাখা হচ্ছে।
সিএনএনের সংবাদে বলা হচ্ছে, হতে পারে, এই অর্থ দ্রুত ও ঝামেলাহীনভাবে ভেনেজুয়েলায় নিয়ে যাওয়ার জন্য তা কাতারের ব্যাংকে রাখা হচ্ছে। একই সঙ্গে আবার প্রশ্ন ওঠে, এভাবে কাতারের ব্যাংকে টাকা রাখা কতটা নৈতিক।
ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে তুলে আনার কারণ যে দেশটির তেলসম্পদের অধিকার নেওয়া, তা নিয়ে রাখঢাক নেই যুক্তরাষ্ট্রের। একাধিকবার ট্রাম্প বলেছেন, ভেনেজুয়েলার তেল যুক্তরাষ্ট্রের অধীন থাকবে। ইতিমধ্যে ৫০ কোটি ডলারের তেল যুক্তরাষ্ট্র বিক্রিও করেছে। সেই তেল বিক্রির অর্থ কাতারের ব্যাংকে গচ্ছিত রাখা হয়েছে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, এটা তো কেবল শুরু, ভেনেজুয়েলার তেল বিক্রি করে আরও অনেক অর্থ আসবে। ভবিষ্যতে এই প্রক্রিয়া চলতে থাকবে। যদিও তেল কোম্পানিগুলো যুক্তরাষ্ট্রের কাছে নিরাপত্তা চাইছে। তা না পেলে তারা ভেনেজুয়েলায় বিনিয়োগ বাড়াতে আগ্রহী নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক এক প্রশাসনিক কর্মকর্তা সিএনএন–এ বলেন, এই অর্থ যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংকে রাখা হয়নি বা সরাসরি ভেনেজুয়েলাতেও পাঠানো হয়নি; বরং সেগুলো কাতারে পাঠানো হয়েছে।
বুধবার সন্ধ্যায় যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট নিউজম্যাক্সকে বলেন, তেল বিক্রির নগদ অর্থ গত বৃহস্পতিবার থেকেই ভেনেজুয়েলায় পাঠানো শুরু হবে। ভেনেজুয়েলার আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে পরিচিত দুই সূত্রের ভাষ্য, দেশটির ব্যাংকগুলো ইতিমধ্যে নগদ অর্থের বিজ্ঞাপন দিতে শুরু করেছে। এই ঘটনা থেকে বোঝা যায়, তেল বিক্রির আয় দেশে পৌঁছেছে।
ভেনেজুয়েলা দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বের বিভিন্ন পশ্চিমা সরকারের নিষেধাজ্ঞার মুখে আছে। ফলে দেশটি কার্যত বৈশ্বিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে ছিটকে পড়েছে। গত কয়েক দশকে দেশটির বিভিন্ন সরকার বিদেশি তেল কোম্পানি জব্দ করেছে—যার ক্ষতিপূরণ দাবি করে আসছে বিদেশি জ্বালানি কোম্পানিগুলো।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভিযোগ, ভেনেজুয়েলা যুক্তরাষ্ট্রের তেলসম্পদ ‘চুরি’ করছে। একই সঙ্গে তিনি বলেছেন, তেল বিক্রির অর্থ যেন সরাসরি ভেনেজুয়েলার উপকারে আসে। তিনি যেটা নিশ্চিত করতে চাইছেন, সেটি হলো ভেনেজুয়েলার তেল আয়ের ওপর যাদের দাবি আছে, তারা যেন এই অর্থের নাগাল না পায়।
এই লক্ষ্যে ট্রাম্প শুক্রবার নির্বাহী আদেশ জারি করেছেন। আদেশে বলা হয়, ওই অর্থের ওপর কোনো ধরনের লিয়েন বা অন্য কোনো আইনি দাবি আরোপের চেষ্টা করা হলে তা অবরুদ্ধ থাকবে। আদেশে আরও সতর্ক করে বলা হয়, যদি এসব অর্থ আইনি জটিলতা থেকে মুক্ত না থাকে, তাহলে তা ভেনেজুয়েলায় অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার প্রচেষ্টায় গুরুতর বাধা সৃষ্টি করবে।
এই পরিপ্রেক্ষিতে তেল বিক্রির অর্থ পশ্চিমা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও পাওনাদারদের নাগালের বাইরে রাখতেই কাতারের ব্যাংক হিসাবে রাখা হচ্ছে।
ভেনেজুয়েলার পাওনাদারেরা এই অর্থপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি করতে পারে, তা যেমন দেশটির জন্য সমস্যাজনক হবে, তেমনি ট্রাম্প প্রশাসনের জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ভেনেজুয়েলা ও পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক এক বিশেষজ্ঞ সিএনএনকে বলেন, এটা প্রকৃতই বড় সমস্যা; ভেনেজুয়েলার কাছে সবারই টাকা পাওনা।
সেই বিশেষজ্ঞ বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনেজুয়েলা সরকারের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাতার দীর্ঘদিন ধরেই ভূমিকা পালন করে আসছে। নিকোলা মাদুরোকে তুলে নেওয়ার পর কাতারের ভূমিকা আরও বেড়েছে। বাস্তবতা হলো কাতার তারও অনেক আগে থেকে দুই দেশের মধ্যকার যোগাযোগে বিশেষ ভূমিকা পালন করে আসছে।
অন্যান্য বিশেষজ্ঞ সিএনএনকে বলেন, বাইডেন প্রশাসনের সময়ও কাতারের ব্যাংকগুলো একই ধরনের মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেছে। সে সময় ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা কিছুটা শিথিল করা হলে তেল বিক্রির কিছু অর্থ ইরানে পাঠাতে দেওয়া হয়।
লাতিন আমেরিকার পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ইকোঅ্যানালিটিকার প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক আলেহান্দ্রো গ্রিসান্তির মতে, কাতারের যে ব্যাংকগুলোতে এই অর্থ রাখা হয়েছে, ভেনেজুয়েলার ব্যাংকগুলোর কাছে সেই অর্থ নিলামের মাধ্যমে ছাড়তে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে খাদ্য, ওষুধ ও ছোট ব্যবসাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
গ্রিসান্তি আরও বলেন, এই অর্থ ভেনেজুয়েলার কেন্দ্রীয় ব্যাংক সংগ্রহ করবে এবং যুক্তরাষ্ট্র যে শর্ত নির্ধারণ করে দেবে, সে অনুযায়ী বণ্টন করা হবে। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট নিউজম্যাক্সকে বলেন, এই অর্থ ভেনেজুয়েলা সরকারের দৈনন্দিন কার্যক্রম, নিরাপত্তা ও খাদ্য সরবরাহে ব্যয় করা হবে।
ভেনেজুয়েলায় পাঠানোর আগে কাতারের ব্যাংকে কেন অর্থ রাখা হচ্ছে—এই বিষয়ে হোয়াইট হাউস সরাসরি মন্তব্য করতে চায়নি।
মার্কিন এক প্রশাসনিক কর্মকর্তা সিএনএনকে বলেন, ‘মনে করিয়ে দেওয়া দরকার, ভেনেজুয়েলা অনেক বছর ধরে আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে কার্যত বিচ্ছিন্ন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নির্দেশে প্রশাসন দ্রুত কাজ করছে। সেই সঙ্গে আমরা বিদ্যমান আইনি কাঠামো ও সীমাবদ্ধতা পর্যালোচনা করে দেখছি।’
স্বচ্ছতা নিয়ে উদ্বেগ
সেই বিশেষজ্ঞের মতে, ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশের ফলে পাওনাদারদের পক্ষে ভেনেজুয়েলায় প্রয়োজনীয় অর্থপ্রবাহে বাধা দেওয়া সম্ভব ছিল না। বিষয়টি হলো অর্থ কাতারে রাখা হলে তা শুধু যুক্তরাষ্ট্রের আইনি চ্যালেঞ্জের আওতার আরও বাইরে চলে যায় না; বরং অর্থ চলাচল নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের স্বচ্ছতাও কমে যায়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘যদি সুস্পষ্ট পরিকল্পনা সম্পর্কে প্রকাশ্যে জানা না যায়, যেখানে বলা থাকবে, এই অর্থের তহবিল কীভাবে পরিচালিত হবে, কারা নিয়ন্ত্রণে থাকবে, কী ধরনের দুর্নীতিবিরোধী ও অর্থ পাচার রোধের ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তাহলে পুরো ব্যবস্থা কার্যত “গোপন তহবিলের” মতো হয়ে যাচ্ছে। এটা খুবই উদ্বেগজনক।’
বিশেষজ্ঞের মত, এই অর্থ নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের অসৎ উদ্দেশ্য থাকতে পারে, এমন ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। তবে বাস্তব উদ্বেগ আছে। সেটি হলো ভেনেজুয়েলার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে এই অর্থ ব্যবহার করে সরকারের দুর্নীতিগ্রস্ত অংশ, আধা সামরিক গোষ্ঠী ও মাদক কার্টেলকে তোষণ করে যেতে পারেন।
এদিকে ট্রাম্প প্রশাসনের কিছু সমালোচক প্রশ্ন তুলছেন—এই অর্থ কাতারে পাঠানোর পেছনে ট্রাম্পের প্রকৃত উদ্দেশ্য কী।
ম্যাসাচুসেটসের ডেমোক্রেটিক পার্টির সিনেটর এলিজাবেথ ওয়ারেন, ‘মার্কিন সামরিক বাহিনীর জব্দ করা সম্পদ বিক্রি করে প্রেসিডেন্ট নিজের নিয়ন্ত্রণে অফশোর হিসাব খুলবেন, এর আইনি ভিত্তি নেই। এ ধরনের সিদ্ধান্ত দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতিকদের আকৃষ্ট করার মতো।’
কেন ভেনেজুয়েলার তেল
একক দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল উৎপাদক—এই ক্ষেত্রে অন্য সবার চেয়ে তারা অনেকটাই এগিয়ে। যুক্তরাষ্ট্র যে তেল উৎপাদন করে, তা মূলত হালকা ও অপরিশোধিত ধরনের; কিন্তু তাদের বেশির ভাগ তেল পরিশোধনাগারের যে সক্ষমতা, তাতে তাদের ভারী ও অপরিশোধিত তেল প্রয়োজন।
অন্য কথায়, নিজের দেশের চাহিদা মেটাতে যুক্তরাষ্ট্রকে এই থিকথিকে ও ভারী অপরিশোধিত তেলের ওপর নির্ভর করতে হবে। খবর স্কাই নিউজ
এটিই হচ্ছে বাস্তবতা। এ থেকে বেরিয়ে আসতে হলে মার্কিন পরিশোধনাগারগুলোকে নতুন করে ঢেলে সাজাতে হবে। সে জন্য প্রয়োজন হবে হাজার হাজার কোটি ডলার। এ কারণে নিকট–ভবিষ্যতে কেউই তা করতে বিশেষ আগ্রহী নয়।
কাগজে-কলমে যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের ভূখণ্ড থেকে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি অপরিশোধিত তেল উত্তোলন করে ঠিক; কিন্তু ভারী তেলের চাহিদা মেটাতে দেশটিকে এখনো পুরোপুরি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপর নির্ভর করতে হয়।
যুক্তরাষ্ট্রে হালকা অপরিশোধিত তেল উৎপাদিত হয়, তার সিংহভাগ বিদেশে রপ্তানি করা হয়। অথচ টেক্সাস ও লুইজিয়ানার পরিশোধনাগারগুলো চালু রাখতে তাদের প্রতিদিন ছয় হাজার ব্যারেলের বেশি ভারী তেল আমদানি করতে হয়।
এ বাস্তবতা মাথায় রাখলেই সমীকরণ মেলানো সম্ভব। এ সমীকরণ অনিবার্যভাবে ভেনেজুয়েলার দিকেই নিয়ে যায়। কেননা, কানাডা ও রাশিয়ার পাশাপাশি বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ভারী তেলের মজুত ভেনেজুয়েলায়।
আন্তর্জাতিক
সর্বকালের রেকর্ড ছাড়িয়েছে তেল পরিবহন খরচ
মধ্যপ্রাচ্য থেকে চীনে তেল পরিবহনের জন্য একটি সুপারট্যাঙ্কার ভাড়ার খরচ সর্বকালের রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে।
লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জ গ্রুপের তথ্য অনুযায়ী, এই খরচ বর্তমানে ৪ লাখ ডলার ছাড়িয়েছে।
গত সপ্তাহে যখন যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে আক্রমণের হুমকি দিয়েছিল, সেই সময়ের তুলনায় এই ভাড়া বর্তমানে প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে।
ইরান বর্তমানে হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করছে। দেশের দক্ষিণে অবস্থিত এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জলপথটি দিয়ে বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়।
রেকর্ড পরিমাণ এই ভাড়া মূলত সবচেয়ে বড় তেলবাহী জাহাজগুলোর (সুপারট্যাঙ্কার) জন্য প্রযোজ্য, যা একবারে প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল বহন করতে পারে।
গত সপ্তাহে ইরানের ওপর ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর থেকে জ্বালানি খাতের যে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ঘটছে, এই জাহাজ ভাড়া বৃদ্ধি তারই একটি বড় প্রতিফলন।
সূত্র: দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল
এমএন
আন্তর্জাতিক
খামেনির অনুপস্থিতিতে ক্ষমতার কেন্দ্রে আবির্ভূত কে এই লারিজানি?
ইরানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে একসময় অযোগ্য ঘোষিত নেতা আলি লারিজানিই এখন দেশে নেতৃত্বে শূন্যতার সংকটময় সময়ে নিজেকে ক্ষমতার নিয়ন্ত্রক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
ইরানে শনিবার ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলায় সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যুতে একটি যুগের অবসান ঘটেছে।
চারিদিকে যখন শোকের মাতম আর বিশৃঙ্খলা ঘনিয়ে উঠছে, ঠিক তখনই তেহরানের ক্ষমতার অলিন্দ থেকে নাটকীয়ভাবে দৃশ্যপটে আবির্ভূত হয়েছেন প্রবীণ এক ঝানু রাজনীতিবিদ আলি লারিজানি।
রোববার তিনি জানিয়েছেন, দেশে একটি ‘অস্থায়ী পরিচালনা পরিষদ’ গঠন করা হবে। এই ঘোষণা দিয়ে তিনি যেন বিশ্বকে জানিয়ে দিয়েছেন, সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি না থাকলেও ইরানের রাজনৈতিক কাঠামো স্থিতিশীল আছে।
গত বছরেই ইরানের নিরাপত্তা কাঠামোর অন্যতম শক্তিশালী ব্যক্তি হিসেবে নতুন করে লারিজানির আবির্ভাব ঘটেছে। ইরানের পারমাণবিক আলোচনা থেকে শুরু করে আঞ্চলিক সম্পর্ক এবং দেশের অভ্যন্তরীন বিক্ষোভ দমনে লারিজানি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন।
ইরানে গতবছর বিক্ষোভ চলতে থাকার সেই সংকটের মধ্যে দেশের হাল ধরতে তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিজের অন্যতম বিশ্বস্ত ও অনুগত এক নেতার ওপরই আস্থা রেখেছিলেন। আর তিনিই হলেন ইরানের শীর্ষ জাতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তা আলি লারিজানি।
৬৭ বছর বয়সী লারিজানি ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডসের (আইআরজিসি) সাবেক কমান্ডার এবং সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের প্রধান। মূলত তখন থেকেই আড়ালে থেকে ইরান চালাচ্ছিলেন তিনি। গত কয়েক মাসে লারিজানির ক্ষমতা ও দায়িত্বের পরিধি কেবলই বেড়েছে।
খামেনির ঘনিষ্ঠ সহযোগী:
আলি লারিজানি ইরানের অন্যতম প্রভাবশালী ধর্মীয় পরিবার থেকে এসেছেন। গত আগস্টে তিনি সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের (এসএনএসসি) সেক্রেটারি নিযুক্ত হন।
লারিজানিকে আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও অত্যন্ত বিশ্বস্ত কৌশলবিদ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
গত মাসেই তিনি ওমানে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পরোক্ষ পারমাণবিক আলোচনার প্রেক্ষাপট তৈরি করেছিলেন বলে জানিয়েছে রয়টার্স।
রাশিয়ার সঙ্গে নিরাপত্তা সম্পর্ক জোরদার করতেও তিনি সম্প্রতি বেশ কয়েকবার মস্কো সফর করেছেন, যা আরও উচ্চ পর্যায়ের কূটনীতিরই লক্ষণ।
তবে লারিজানির ভাবমূর্তি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে বিতর্ক রয়েছে। গত জানুয়ারিতে ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে কঠোর ভূমিকা রাখার অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রণালয় তার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল।
ওয়াশিংটনের অভিযোগ, লারিজানিই প্রথম বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতা শুরুর ডাক দিয়েছিলেন।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, ওই দমনে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছে। লারিজানি অবশ্য বিক্ষোভকারীদের ‘শহরকেন্দ্রিক আধা-সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠী’ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন।
লারিজানির ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকার পরও তিনি দীর্ঘ সময় ধরে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির সুরক্ষা এবং পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে দরকষাকষিতে নেতৃত্ব দিয়েছেন।
তিনি একবার ইউরোপীয় দেশগুলোর দেওয়া প্রস্তাবকে ‘চকলেটের বিনিময়ে মুক্তা দেওয়া’র সঙ্গে তুলনা করেছিলেন।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে তিনি সুর কিছুটা নরম করে বলেছিলেন, আমেরিকার উদ্বেগের জায়গা যদি এটি হয় যে, ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির দিকে আগানো উচিত না, তবে সেই সমস্যার সমাধান সম্ভব। বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে।
শনিবার ইরানে হামলার পর রোববার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে লারিজনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ইরানকে ধ্বংসের চেষ্টার অভিযোগ আনেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, কোনও ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী’ এই পরিস্থিতির সুযোগ নিতে চাইলে কঠোর জবাব দেওয়া হবে।
এক নজরে আলি লারিজানি:
লারিজানির জন্ম ১৯৫৮ সালে ইরাকের নাজাফে। তিনি একজন দর্শনের পিএইচডি ডিগ্রিধারী। ২০০৫-২০০৭ সালের প্রধান পারমাণবিক আলোচক এবং ২০০৮-২০২০ সাল পর্যন্ত পার্লামেন্ট স্পিকার ছিলেন।
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে এবং চীনের সঙ্গে ২৫ বছরের কৌশলগত চুক্তিতেও তার বড় ভূমিকা ছিল।
২০০৫ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে লড়ে তিনি পরাজিত হয়েছিলেন এবং ২০২১ ও ২০২৪ সালে লারিজানি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে লারিজানি অংশ নিতে চাইলেও তাকে অযোগ্য ঘোষণা করেছিল ইরানের গার্ডিয়ান কাউন্সিল।
সেই প্রত্যাখ্যাত নেতাই উঠে এসেছেন ইরানের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে। ইরানে নেতৃত্বে শূন্যতা তৈরির এই সংকটময় মুহূর্তে লারিজানি নিজেকে ক্ষমতার নিয়ন্ত্রক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
এমএন
আন্তর্জাতিক
ইরান নিয়ে ফক্স নিউজে নেতানিয়াহুর সাক্ষাৎকার, কী বললেন
সোমবার ফক্স নিউজকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহ জোর দিয়ে বলেছেন, ইরানে মার্কিন-ইসরাইলি যৌথ সামরিক অভিযান ‘অন্তহীন যুদ্ধ’ নয়। একইসঙ্গে বিমান হামলার নেতৃত্ব দেয়ায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের ভূমিকার প্রশংসা করেন ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী।
নেতানিয়াহু ইরানে হামলা চালানোর বিষয়টি নিয়ে বলেন, এটি একটি দ্রুত এবং সিদ্ধান্তমূলক পদক্ষেপ হবে।
ফক্স নিউজকে নেতানিয়াহু বলেন, ‘আমি শুনেছি মানুষ বলছে যে, এখানে একটা অন্তহীন যুদ্ধ হতে চলেছে। এখানে সীমাহীন যুদ্ধ হচ্ছে না।’
এটি একটি দ্রুত এবং সিদ্ধান্তমূলক পদক্ষেপ হতে চলেছে এবং আমরা প্রথমে এমন পরিস্থিতি তৈরি করব যাতে ইরানি জনগণ তাদের ভাগ্যের নিয়ন্ত্রণ পেতে পারে এবং তাদের নিজস্ব গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকার গঠন করতে পারে।
ফক্স নিউজে প্রচারিত সাক্ষাৎকার জুড়ে, নেতানিয়াহু ইরানে হামলায় ট্রাম্পের ভূমিকার প্রশংসা করেছেন।
তিনি বলেন, ডনাল্ড জে. ট্রাম্পের মতো প্রেসিডেন্ট আর কখনও ছিল না। তার দৃঢ়তা, তার সিদ্ধান্ত গ্রহণযোগ্যতা, তার চিন্তাভাবনার স্পষ্টতা, তিনি যেভাবে সবকিছু করেন, একেবারে মূল বিষয়ের দিকে এগিয়ে যান। আমরা খুবই ভাগ্যবান তাকে মুক্ত বিশ্বের নেতা হিসেবে পেয়ে।
ইরানে হামলা শুরু করার ক্ষেত্রে ট্রাম্পের নেতৃত্বের ভূমিকার উপর জোর দিয়ে নেতানিয়াহু ফ্লোরিডার পাম বিচে ট্রাম্পের মার-এ-লাগোর বাড়িতে তার সাথে দেখা করা এবং ট্রাম্পের কাছ থেকে ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখার গুরুত্বের উপর জোর দেয়ার একটি গল্প বলেছিলেন।
নেতানিয়াহু বলেন, ‘আমরা মার-এ-লাগোতে দেখা করলাম। ডনাল্ড ট্রাম্প আমাকে প্রথম যে কথাটি বলেছিলেন, ‘তুমি জানো, আমাদের ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র পেতে বাধা দিতে হবে। তিনি আমাকে বলেছিলেন, শুরু থেকেই, আমি তাকে বলিনি তিনিই বলেছিলেন, আমাদের নিশ্চিত করতে হবে যে তারা কখনও পারমাণবিক অস্ত্র না পায়। তিনি তাই করেছেন।’
ইরানে এখন বিমান হামলা চালানোর সিদ্ধান্ত সম্পর্কে জানতে চাইলে নেতানিয়াহু যুক্তি দেন যে ইরান তার ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এমনভাবে পুনর্গঠন করছে যে কয়েক মাসের মধ্যেই এটি কার্যকরী হয়ে উঠবে। যদি এখনই কোনো পদক্ষেপ না নেয়া হয়, তাহলে ভবিষ্যতে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া যাবে না বলেন তিনি।
শনিবার ইরানে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল। হামলা চালিয়ে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা খামেনিসহ গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের হত্যা করে। জবাবে পাল্টা আক্রমণ চালায় তেহরান।
সূত্র: পলিটিকো
আন্তর্জাতিক
মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত: সব ধরনের ভিসার মেয়াদ এক মাস বাড়ালো কাতার
ইরান-ইসরাইল সংঘাতের ঘটনায় সব ধরনের ভিসার মেয়াদ এক মাস বাড়িয়েছে কাতার। মঙ্গলবার (৩ মার্চ) এক বিবৃতিতে এ সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছে দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
বিবৃতিতে বলা হয়, মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে বা শিগগিরই মেয়াদ শেষ হতে যাচ্ছে—এমন সব ধরনের এন্ট্রি ভিসার মেয়াদ এক মাসের জন্য বাড়ানো হয়েছে। পরিস্থিতির উন্নয়নের ওপর নির্ভর করে প্রয়োজনে এই সময়সীমা আরও বাড়ানো হতে পারে। এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে গত শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) থেকে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ভিসার মেয়াদ বৃদ্ধির প্রক্রিয়া স্বয়ংক্রিয়ভাবে ইলেকট্রনিক সিস্টেমের মাধ্যমে সম্পন্ন হবে। এর জন্য কোনো ফি দিতে হবে না। এছাড়া সংশ্লিষ্ট দফতরে গিয়ে আবেদন করারও প্রয়োজন নেই।
‘তবে ২৮ ফেব্রুয়ারির আগে যেসব এন্ট্রি ভিসার ক্ষেত্রে নিয়মভঙ্গ হয়েছে, সেসব ভিসাধারীদের প্রথমে নির্ধারিত জরিমানা পরিশোধ করতে হবে। এরপর উল্লিখিত তারিখ থেকে তাদের ক্ষেত্রেও মেয়াদ বৃদ্ধি এবং ফি মওকুফ প্রযোজ্য হবে’,যোগ করা হয় বিবৃতিতে।
মন্ত্রণালয় আরও জানিয়েছে, স্থায়ী এবং ভ্রমণকারীদের আইনগত অবস্থার স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে তারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে।
এমএন
আন্তর্জাতিক
পাকিস্তানে সব ভিসা অ্যাপয়েন্টমেন্ট বাতিল করেছে যুক্তরাষ্ট্র
ইসলামাবাদে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস দেশের ‘বর্তমান নিরাপত্তা পরিস্থিতি’ উল্লেখ করে সব ভিসা অ্যাপয়েন্টমেন্ট বাতিলের ঘোষণা করেছে।
মার্কিন দূতাবাস জানিয়েছে, এই আদেশ ইসলামাবাদে অবস্থিত দূতাবাসের পাশাপাশি লাহোর ও করাচিতে অবস্থিত কনস্যুলেটগুতেও প্রযোজ্য। যা, আগামী শুক্রবার ৬ মার্চ পর্যন্ত কার্যকর থাকবে।
মার্কিন-ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর রোববার (১ মার্চ) করাচিতে কনস্যুলেটে বিক্ষোভকারীদের উপর নিরাপত্তা কর্মীদের গুলি চালানোর ঘটনায় কমপক্ষে ১০ জন নিহত হয়েছেন।
এদিকে, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাতের প্রথম প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। কুয়েতের একটি বেসামরিক বন্দরে অস্থায়ী মার্কিন অপারেশন সেন্টারে সরাসরি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ছয় মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন। সোমবার বিকেলে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এক বিবৃতিতে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।
সূত্র : আল জাজিরা




