Connect with us

মত দ্বিমত

ভেনেজুয়েলা শুধু একটি সংকট নয়, নতুন বৈশ্বিক ব্যবস্থায় একটি কৌশলগত চাবিকাঠি

Published

on

পিই রেশিও

ভেনেজুয়েলা বসবাসের জন্য একটি অসাধারণ দেশ। দেশটির সৌন্দর্য সেখানে পা রাখা প্রত্যেক মানুষকে আকর্ষণ করে। সুউচ্চ আন্দিজ পর্বতমালা, ঝকঝকে ক্যারিবীয় সাগর, বিস্তীর্ণ রেইনফরেস্ট এবং শক্তিশালী জলপ্রপাত ভেনেজুয়েলাকে এক অনন্য ভূখণ্ডে পরিণত করেছে। প্রাকৃতিক সম্পদের দিক থেকে এটি বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ দেশ, যার সম্ভাবনার সঙ্গে খুব কম দেশই তুলনীয়। তেল, খনিজ সম্পদ এবং এমন একটি জলবায়ু যা সারা বিশ্বের মানুষকে টানে, সব মিলিয়ে ভেনেজুয়েলা বৈশ্বিকভাবে একটি আকর্ষণীয় অবস্থানে রয়েছে।

গত এক দশকে ভেনেজুয়েলা গভীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে গেছে। দুর্নীতি, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং বিশৃঙ্খলা সাধারণ মানুষের জীবনে চরম দুর্ভোগ ডেকে এনেছে। একই সঙ্গে এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়েছে বৈশ্বিক শক্তিগুলো। যুক্তরাষ্ট্র তার নিষেধাজ্ঞা, রাজনৈতিক চাপ এবং আঞ্চলিক প্রভাব খাটিয়ে এমনভাবে আচরণ করেছে যেন ভেনেজুয়েলা কার্যত আগেই দখল হয়ে গেছে। এই বাস্তবতায় অনেকের চোখে ভেনেজুয়েলা যে একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র, সেই সত্যটি ঝাপসা হয়ে গেছে।

AdLink দ্বারা বিজ্ঞাপন ×

কিন্তু ভেনেজুয়েলার গুরুত্ব বুঝতে হলে আমাদের প্রচলিত সংকটকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির বাইরে যেতে হবে। দেশটিকে ঘিরে আন্তর্জাতিক আগ্রহ বহুমাত্রিক ও জটিল। চীন ভেনেজুয়েলাকে শক্তি, বিনিয়োগ এবং অবকাঠামো সহযোগিতার একটি কৌশলগত অংশীদার হিসেবে দেখে। চীন বিপুল অঙ্কের ঋণ দিয়েছে এবং তেল আমদানি করছে। জার্মানি এবং ইউরোপের অন্যান্য দেশও স্থিতিশীল জ্বালানি সরবরাহ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার সুযোগ খুঁজছে, বিশেষ করে এমন সময়ে যখন জ্বালানি নিরাপত্তা ইউরোপীয় ইউনিয়নের জন্য একটি কেন্দ্রীয় ইস্যু। এই অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের ভেনেজুয়েলা নীতির সঙ্গে স্পষ্টভাবে বিপরীত।

AdLink দ্বারা বিজ্ঞাপন ×

বর্তমান ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি

আজ ভেনেজুয়েলা একটি ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েনের কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে। বহু বছরের ওঠানামার পর তেলের দাম আবার স্থিতিশীল হতে শুরু করেছে, যা দেশটির জন্য নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি করছে। স্থিতিশীল মূল্য এবং উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে ভেনেজুয়েলা তার অর্থনীতি শক্তিশালী করতে পারে এবং বাইরের শক্তির চাপ মোকাবিলায় বেশি সক্ষম হতে পারে। তবে একই সঙ্গে রাজনৈতিক শাসনব্যবস্থা এখনও নাজুক এবং দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে নতুন করে গড়ে তুলতে হবে।

স্বল্পমেয়াদে ভেনেজুয়েলা যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করবে বলেই মনে হয়। ইউক্রেন যুদ্ধের মতো আন্তর্জাতিক সংঘাতগুলো বৈশ্বিক শক্তির আচরণকে গভীরভাবে প্রভাবিত করছে। যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার জ্বালানি খাতকে সীমিত করতে এবং রুশ তেলের ওপর নির্ভরতা কমাতে মনোযোগ দিয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে ভেনেজুয়েলার বিশাল তেল উৎপাদন ক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। যদি ভেনেজুয়েলা তার তেল অবকাঠামো আধুনিকীকরণ করে উৎপাদন বাড়াতে সক্ষম হয়, তাহলে তা নতুন জোট এবং ক্ষমতার ভারসাম্যে পরিবর্তন আনতে পারে। এতে রাশিয়াও তার জ্বালানি রপ্তানি নতুনভাবে পুনর্বিন্যাস করার সুযোগ পেতে পারে, যখন পশ্চিমা বিশ্ব রুশ অর্থনীতিকে একঘরে করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

প্রবণতা, ছোট রাষ্ট্রগুলো বড় শক্তির চাপে

আজ আমরা একটি বৈশ্বিক প্রবণতা দেখছি যেখানে ছোট রাষ্ট্রগুলো বড় শক্তির স্বার্থের সংঘাতে জড়িয়ে পড়ছে। যুক্তরাষ্ট্র, চীন, জার্মানি এবং ভারত প্রত্যেকে নিজেদের কৌশলগত লক্ষ্য থেকে কাজ করছে। যুক্তরাষ্ট্র পশ্চিম গোলার্ধে নিজের প্রভাব ধরে রাখতে চায়। চীন আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা ও এশিয়ায় বিনিয়োগের মাধ্যমে উপস্থিতি বাড়াচ্ছে। জার্মানি ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন স্থিতিশীল জ্বালানি এবং শিল্প পুনরুদ্ধারের পথ খুঁজছে। ভারত ভারত মহাসাগর ও আফ্রিকায় তার প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে। এই বাস্তবতায় ভেনেজুয়েলার সার্বভৌমত্ব প্রতিনিয়ত বাইরের চাপের মুখে পড়ছে।

ছোট রাষ্ট্রগুলোর জন্য হুমকি শুধু সামরিক নয়। অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং কূটনৈতিক চাপও সমানভাবে কার্যকর। অনেক সময় নিষেধাজ্ঞা অস্ত্রের চেয়েও বেশি ক্ষতিকর হয়ে ওঠে। আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোও রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নীতিনির্ধারণে প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ভেনেজুয়েলা এই ঝড়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু দেশটিকে কেবল একটি ক্ষতবিক্ষত রাষ্ট্র হিসেবে দেখলে চলবে না। এটিকে নতুন বৈশ্বিক ভারসাম্যের একটি সম্ভাবনাময় কৌশলগত কেন্দ্র হিসেবেও দেখতে হবে।

উন্নয়নের কৌশল হিসেবে আকর্ষণ

আকর্ষণীয় হওয়া ভালো। আকর্ষণ মানে শুধু সৌন্দর্য নয়, বরং গুরুত্ব। ধারাবাহিক উন্নয়নের জন্য ভেনেজুয়েলাকে তার আকর্ষণ ধরে রাখতে হবে। এর অর্থ কার্যকর প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, দেশের ভেতরে ও বাইরে আস্থা সৃষ্টি করা এবং এমন সম্পর্ক তৈরি করা যা রাষ্ট্রের আত্মনিয়ন্ত্রণকে শক্তিশালী করে। এমন এক বিশ্বে যেখানে বড় শক্তিগুলো অংশীদারিত্ব, জ্বালানি ও কৌশলগত অবস্থান খুঁজছে, সেখানে আকর্ষণ একটি বড় প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা।

ভেনেজুয়েলা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে অন্যরা তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায় বলে নয়, বরং তারা তার সঙ্গে সহযোগিতা করতে চায় বলে। আসল চ্যালেঞ্জ হলো এই আকর্ষণকে প্রকৃত স্বাধীনতায় রূপান্তর করা। এই বিতর্ক ভেনেজুয়েলা এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গন উভয় জায়গাতেই গুরুত্বের সঙ্গে হওয়া প্রয়োজন।

এখন যদি আমরা বাংলাদেশকে ঘিরে ভাবি, প্রশ্নটি অস্বস্তিকর হলেও অপরিহার্য। শেখ হাসিনা যখন টানা সতেরো বছর প্রকৃত গণতান্ত্রিক জবাবদিহি ছাড়া ক্ষমতায় থাকতে পেরেছেন, তখন কি বাংলাদেশ সত্যিই একটি আকর্ষণীয় দেশ ছিল। রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে আকর্ষণ মানে শুধু বাহ্যিক স্থিতিশীলতা, প্রবৃদ্ধির সংখ্যা বা কাগুজে উন্নয়ন নয়। আন্তর্জাতিক মহল আগ্রহ দেখায় তখনই, যখন একটি দেশের ভূকৌশলগত অবস্থান, প্রাকৃতিক সম্পদ এবং মানুষের সৃজনশীলতা, শ্রম ও জ্ঞানকে মূল্যবান মনে করা হয়। তখন ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, দুর্বল বিচারব্যবস্থা এবং গণতান্ত্রিক ঘাটতি অনেক সময়ই উপেক্ষিত থাকে, যতক্ষণ পর্যন্ত অর্থনৈতিক ও কৌশলগত প্রবাহ ঠিক থাকে।

এটি আন্তর্জাতিক রাজনীতির একটি বিপজ্জনক কিন্তু পুনরাবৃত্ত সত্য। একটি দেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে সেখানে মানুষ কেমন জীবন যাপন করছে তার জন্য নয়, বরং দেশটি কী সরবরাহ করতে পারে তার জন্য। বাংলাদেশ এই বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছিল। সস্তা শ্রম, এশিয়ায় কৌশলগত অবস্থান এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের একটি গ্রহণযোগ্য বয়ান দেশটিকে ব্যবহারযোগ্য করে তুলেছিল। তাই ক্ষমতা কীভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছিল, সে বিষয়ে আন্তর্জাতিক মহলের আগ্রহ সীমিতই ছিল।

কিন্তু প্রকৃত শিক্ষা বাংলাদেশেই শেষ নয়। মর্যাদাহীন আকর্ষণ টেকসই নয়। যে দেশ কেবল তার সম্পদের জন্য আকর্ষণীয়, সে দেশ শেষ পর্যন্ত একটি বিষয়ে পরিণত হয়, একটি সত্তায় নয়। টেকসই আকর্ষণ গড়ে ওঠে তখনই, যখন প্রাকৃতিক সম্পদের সঙ্গে মানুষের মর্যাদা, সৃজনশীল স্বাধীনতা, জ্ঞান ও অধিকার যুক্ত হয়। তখনই একটি দেশ অন্যদের কাছে শুধু গুরুত্বপূর্ণ নয়, নিজের নাগরিকদের জন্যও বাসযোগ্য হয়ে ওঠে।

সেখানেই ভবিষ্যতের রাষ্ট্রগুলোর ভাগ্য নির্ধারিত হয়। কতদিন একজন নেতা ক্ষমতায় থাকলেন তা দিয়ে নয়, বরং রাষ্ট্র তার মূল্যকে কতটা স্বাধীনতায়, তার সম্ভাবনাকে কতটা ন্যায়বিচারে এবং তার আকর্ষণকে কতটা সম্মিলিত জীবন প্রকল্পে রূপ দিতে পারল, সেটিই শেষ পর্যন্ত ইতিহাসে গুরুত্ব পায়।

বাংলায় একটি প্রচলিত কথা আছে “তেলো মাথায় তেল দেওয়া।” এই প্রবাদটি আজকের বৈশ্বিক রাজনীতির জন্য আশ্চর্য রকমের যথাযথ। আজ বিশ্বের প্রায় সব কন্টিনেন্টেই অস্থিরতা, সংঘাত ও সংকট চলছে। যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, শাসন সংকট এবং মানবিক বিপর্যয় নতুন কিছু নয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো বিশ্বের ধনী ও ক্ষমতাধর দেশগুলোর দৃষ্টি কি সব সমস্যার দিকেই সমানভাবে পড়ে? বাস্তবতা হলো না। তাদের নজর তখনই পড়ে, যখন তারা দেখে এই সংকটে আমার লাভ কী।

বাংলাদেশ একটি দরিদ্র দেশ হতে পারে, কিন্তু একেবারেই গুরুত্বহীন নয়। আমাদের ভৌগোলিক অবস্থান আমাদের একটি বড় শক্তি। দক্ষিণ ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থিত বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, সামুদ্রিক যোগাযোগ এবং আঞ্চলিক রাজনীতিতে একটি কৌশলগত সুবিধা বহন করে। এই বাস্তবতা আমাদের জন্য সুযোগও, আবার ঝুঁকিও। তাই বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো সব সময় নিজের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া, দেশের স্বার্থে। কোনো ব্যক্তির ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার স্বার্থে নয়, শেখ হাসিনার মতো দীর্ঘস্থায়ী শাসন নিশ্চিত করার জন্য নয়।

রাজনীতিবিদদের জন্য এখানে বড় একটি শিক্ষার জায়গা আছে। ভেনেজুয়েলার শক্তিশালী নেতৃত্ব কীভাবে আন্তর্জাতিক চাপে একঘরে হয়ে পড়লো, কীভাবে যুক্তরাষ্ট্র ধীরে ধীরে দেশটির রাজনৈতিক পরিসরকে নিয়ন্ত্রণের দিকে নিয়ে গেল, সেগুলো গভীরভাবে বোঝা প্রয়োজন। একইভাবে প্রশ্ন উঠতেই পারে, কেন শেখ হাসিনাকে ভারত আশ্রয় দিল। এর উত্তর আবেগে নয়, কৌশলে। ভারত এটি করেছে বাংলাদেশের গণতন্ত্র বা মানুষের অধিকারের জন্য নয়, করেছে নিজের জাতীয় স্বার্থের জন্য। ঠিক যেমন যুক্তরাষ্ট্র তার চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও বৈশ্বিক অবস্থান রক্ষায় ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রে করছে।

এই বাস্তবতা নির্মম হলেও অস্বীকার করার উপায় নেই। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বন্ধুত্ব স্থায়ী নয়, স্বার্থই স্থায়ী। যে রাষ্ট্র নিজের স্বার্থ বোঝে না, অন্যের স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে নিজেকে দুর্বল করে ফেলে, শেষ পর্যন্ত সে নিজেই উপেক্ষিত হয়। বাংলাদেশকে সেই ভুল থেকে শিক্ষা নিতে হবে। আমাদের রাজনীতি যদি শিক্ষনীয় হতে চায়, তবে তাকে ব্যক্তিকেন্দ্রিক ক্ষমতা নয়, রাষ্ট্রকেন্দ্রিক কৌশল শিখতে হবে। তবেই আমরা তেলো মাথায় তেল দেওয়া নয়, বরং নিজের মাথা রক্ষা করার রাজনীতি গড়ে তুলতে পারব।

রহমান মৃধা, গবেষক ও লেখক, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন
rahman.mridha@gmail.com

শেয়ার করুন:-

মত দ্বিমত

নাসিরউদ্দিন পাটোয়ারী: স্পষ্টভাষিতা বিতর্ক এবং নতুন রাজনীতির রূপরেখা

Published

on

পিই রেশিও

আমি দূর প্রবাসে থাকলেও তাকে আমি চিনি, যদিও কখনও চোখে দেখিনি। জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানে আমার লেখালিখির সক্রিয় অংশগ্রহণের সময় আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত যারা ছিল তাদের মধ্যেই নাসিরউদ্দিন পাটোয়ারী আমার নজর আলাদাভাবে কেড়েছিল। তার অদম্য সাহস, দৃঢ় সংকল্প এবং মানুষের কল্যাণের প্রতি আন্তরিক দৃষ্টিভঙ্গি তখনই স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। সেই দিনের মুহূর্ত থেকে সে আমার চোখে শুধুই একজন রাজনৈতিক নেতা নয়; সে এক অনন্য চরিত্র, যার প্রভাব কেবল আমার ব্যক্তিগত উপলব্ধিতে সীমাবদ্ধ নয়, বরং দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে সময়ের সঙ্গে প্রতিফলিত হয়েছে।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে স্পষ্টভাষী নেতা বিরল। নাসিরউদ্দিন পাটোয়ারী সেই অদ্বিতীয় কণ্ঠ, যে সরাসরি দৃঢ় এবং প্রায়শই বিতর্কিত বক্তব্য দেয়। তার ভাষা সমালোচনার জন্ম দেয়, সমর্থনও জন্মায়। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির ঘাটতি ও সম্ভাবনার উভয়ই প্রতিফলন। এই প্রতিবেদনে আমি বিশ্লেষণ করেছি সে কীভাবে রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রভাব ফেলছে, নতুন প্রজন্ম তাকে কীভাবে দেখছে এবং তার নেতৃত্ব কীভাবে নতুন মানদণ্ড স্থাপন করতে পারে।

AdLink দ্বারা বিজ্ঞাপন ×

বাংলাদেশের সমসাময়িক রাজনৈতিক অঙ্গনে নাসিরউদ্দিন পাটোয়ারী একটি আলোচিত নাম। তাকে কেউ দেখে দুর্নীতিবিরোধী আপসহীন কণ্ঠ হিসেবে, কেউ দেখে বিতর্কপ্রবণ রাজনীতিক হিসেবে। কিন্তু তাকে ঘিরে যে আলোচনা, তা কেবল ব্যক্তিকে নিয়ে নয়। এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভাষা, সংস্কৃতি ও কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার গভীর প্রশ্নকে সামনে আনে।

AdLink দ্বারা বিজ্ঞাপন ×

নাসিরউদ্দিন পাটোয়ারীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে অশ্লীলতার অভিযোগ উঠেছে। সমালোচকদের বক্তব্য, তার ভাষা প্রায়ই তীব্র। সমর্থকদের দাবি, সে কেবল অপ্রিয় সত্য উচ্চারণ করে। এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে। কঠোর ভাষা ও অশ্লীলতার কি একই বিষয়? নাকি আমরা এমন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত, যেখানে তোষামোদ স্বাভাবিক এবং সরাসরি সমালোচনা অস্বস্তিকর?

বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় ব্যক্তিকেন্দ্রিক আনুগত্য প্রায়ই নীতিগত বিতর্ককে ছাপিয়ে যায়। ফলে শক্ত সমালোচনা সহজেই ব্যক্তিগত আক্রমণ হিসেবে ব্যাখ্যা পায়। এই প্রেক্ষাপটে পাটোয়ারীর ভাষা বিতর্ক সৃষ্টি করলেও তা রাজনৈতিক সংস্কৃতির অন্তর্নিহিত সংকটকেই উন্মোচন করে।

নতুন প্রজন্মের চাওয়া
নতুন প্রজন্মের এক অংশ তাঁর এই আপসহীনতাকে সততার প্রতীক মনে করলেও, অন্য অংশ তাঁর বক্তব্যের চেয়ে সুস্পষ্ট কর্মপরিকল্পনা ও ফলাফল দেখতে আগ্রহী। আজকের তরুণ সমাজ শুধু স্লোগান চায় না, তারা চায় রাষ্ট্র সংস্কারের বাস্তব রূপরেখা। এই প্রেক্ষাপটে পাটোয়ারীর সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো তাঁর এই সাহসকে কৌশলী নীতিতে রূপান্তর করা।

পাটোয়ারীর স্পষ্টভাষিতা তার শক্তি, আবার ঝুঁকিও
ইতিবাচক দিক হলো, সে আলাদা রাজনৈতিক পরিচিতি গড়ে তুলেছে। দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান তাকে দৃশ্যমান করেছে। তরুণদের একটি অংশ তার মধ্যে প্রতিবাদী নয়, সম্ভাব্য সংস্কারকের প্রতিচ্ছবি দেখে।

নেতিবাচক দিক হলো, যদি ভাষাই আলোচনার কেন্দ্রে থাকে তবে নীতিগত গভীরতা আড়ালে পড়তে পারে। জোটভিত্তিক রাজনীতিতে সমঝোতার প্রয়োজন থাকে। অতিরিক্ত তীব্রতা রাজনৈতিক সমীকরণকে কঠিন করে তুলতে পারে। আইনি ও প্রশাসনিক চাপের ঝুঁকিও থেকে যায়।

কাঠামোগত সংস্কারের প্রয়োজন
১: রাজনৈতিক আচরণবিধির স্পষ্ট সংজ্ঞা প্রয়োজন, যাতে কঠোর সমালোচনা ও ব্যক্তিগত অশালীনতার পার্থক্য নির্ধারিত হয়।
২: প্রমাণভিত্তিক বক্তব্যের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা জরুরি। অভিযোগের সঙ্গে দলিল যুক্ত হলে ভাষা নয়, তথ্য আলোচনার কেন্দ্রে আসে।
৩: স্বাধীন তথ্য যাচাই কাঠামো শক্তিশালী করা দরকার, যাতে গুজব ও বিকৃত বক্তব্য দ্রুত সংশোধিত হয়।
৪: নির্বাচিত প্রতিনিধিদের জন্য রাজনৈতিক যোগাযোগ ও নৈতিক ভাষা ব্যবহারের প্রশিক্ষণ প্রয়োজন।
৫: সমালোচনার পাশাপাশি লিখিত নীতিপত্র ও বাস্তবায়ন রূপরেখা প্রকাশ করতে হবে।

সংসদে নতুন মানদণ্ডের প্রত্যাশা

জাতীয় সংসদে নীতিগত আলোচনার যে ঘাটতি প্রায়ই দেখা যায়, সেখানে নাসিরউদ্দিন পাটোয়ারীর মতো নেতার উপস্থিতি তাৎপর্যপূর্ণ হতে পারে। তবে সংসদীয় রাজনীতিতে কার্যকর হতে হলে তিনটি বিষয় নিশ্চিত করা জরুরি:

  • জবাবদিহিমূলক বিতর্কের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা।
  • আইন প্রণয়নের পাশাপাশি বাস্তবায়ন কাঠামো নিয়ে সুস্পষ্ট আলোচনা।
  • তরুণ প্রজন্মকে দেখানো যে রাজনীতি সৃজনশীল, নীতিনির্ভর এবং মানুষের কল্যাণমুখী হতে পারে।

তার বক্তব্যে যে বার্তাগুলো ধারাবাহিকভাবে উঠে আসে তা হলো তোষামোদ নয়, জবাবদিহি; আইন প্রয়োগই রাষ্ট্রের শক্তি; দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপসহীনতা; নাগরিক সাহসের চর্চা। এই বার্তা যদি কেবল বক্তৃতায় সীমাবদ্ধ না থেকে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোয় রূপ পায়, তবে তা রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তনে ভূমিকা রাখতে পারে।

নাসিরউদ্দিন পাটোয়ারীকে ঘিরে বিতর্ক আসলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিপক্বতার পরীক্ষা। সে একই সঙ্গে আশার প্রতীক, বিতর্কের কেন্দ্র এবং সম্ভাব্য সংস্কারক। তার সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সাহসকে কৌশলে রূপান্তর করা, ভাষাকে নীতিতে রূপান্তর করা এবং আবেগকে প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনে রূপান্তর করা।

আজ বাংলাদেশের রাজনীতি একটি সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। জনগণ ক্লান্ত প্রতিশ্রুতির পুনরাবৃত্তিতে, ক্লান্ত তোষামোদে, ক্লান্ত গুজবনির্ভর চরিত্রহননে। তারা এমন রাজনীতি দেখতে চায় যেখানে যোগ্যতা সম্মান পায়, সৃজনশীলতা মূল্য পায় এবং জবাবদিহি বাধ্যতামূলক হয়।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে আমরা প্রায়ই দেখেছি যোগ্য নেতৃত্বের অভাবে রাজনীতি আমলাতন্ত্রের কাছে হার মেনেছে। যোগ্য, ত্যাগী ও দূরদর্শী নেতৃত্বের অভাব দেশের নীতিনির্ধারণকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। আসন্ন নির্বাচনের পর একটি শক্তিশালী বিরোধী দল এবং একটি ‘ছায়া মন্ত্রিসভা’ গঠন করা গেলে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। নাসিরউদ্দিন পাটোয়ারীর সাম্প্রতিক নির্বাচনী প্রচারণায় যে দায়িত্বশীল রাজনৈতিক চর্চার আভাস মিলেছে, তা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাওয়া এখন সময়ের দাবি।

নাসিরউদ্দিন পাটোয়ারীকে ঘিরে বিতর্ক আসলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিপক্বতারই পরীক্ষা। তিনি কেবল একজন ব্যক্তি নন, বরং এক নতুন রাজনৈতিক মানদণ্ডের সম্ভাবনা। যদি তাঁর স্পষ্টভাষিতা ও সাহসের সাথে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের সংমিশ্রণ ঘটে, তবে তা নতুন প্রজন্মের কাছে এই বার্তাই দেবে যে—রাজনীতি মানে ক্ষমতা নয়, বরং মানুষের কল্যাণে নিবেদিত একটি মহান দায়িত্ব।

লেখক: রহমান মৃধা
গবেষক ও লেখক, প্রাক্তন পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন

শেয়ার করুন:-
পুরো সংবাদটি পড়ুন

মত দ্বিমত

গণতন্ত্র নিষ্ঠুর, কিন্তু অন্ধ নয়

Published

on

পিই রেশিও

বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষের যেন ১৮ কোটি মতামত, যা গণমাধ্যমে প্রতিনিয়ত উচ্চারিত হচ্ছে। তারপরও বাংলাদেশের নবনির্বাচিত ও মনোনীত প্রার্থীদের মধ্যে বিএনপির গণজোয়ার যেন একটি স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে, জনমতকে চিরদিন উপেক্ষা করা যায় না। এবার আর বলার সুযোগ নেই যে দিনের ভোট রাতে হয়েছে বা জনগণ নিজের ভোট নিজে দিতে পারেনি। অজুহাতের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে বাস্তবতাকে গ্রহণ করার সময় এখন, যার যার মুল্লুক তার শক্তি। তবে এই বাক্যটির আরেকটি গভীর পাঠ আছে। ক্ষমতা কখনো শূন্য থেকে জন্মায় না, এটি শেষ পর্যন্ত সমাজের ভেতর থেকেই উঠে আসে। একটি জাতি শেষ পর্যন্ত তার মনের মতো নেতৃত্বই খুঁজে পায়। যেমন জাতি তেমন নেতা, কারণ আম গাছের তলায় আমই পড়ে। তাই প্রশ্নটা শুধু কে ক্ষমতায় গেল তা নয়, আমরা কেমন সমাজ তৈরি করেছি, কেমন রাজনীতি সহ্য করেছি, আর কেমন নেতৃত্বকে নীরবে অনুমোদন দিয়েছি। নেতৃত্ব আসলে জাতিরই আয়না, সেখানে প্রতিফলিত হয় আমাদের সাহস, আমাদের ভয়, আমাদের নৈতিকতা এবং আমাদের সীমাবদ্ধতা।

প্রকৃতপক্ষে গণতন্ত্রের মতো নিষ্ঠুর আচরণ আর কোনো ব্যবস্থায় নেই। কারণ কি জানেন? ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, মাত্র একটি ভোটের ব্যবধানে কেউ হেরে গেছে, কেউ জিতে গেছে। সেই একটি ভোটই কখনো একটি দেশের ভবিষ্যৎ বদলে দিয়েছে, কখনো একটি প্রজন্মের স্বপ্নকে নতুন দিক দেখিয়েছে। অনেকেই তাই বলেন, এটিই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। কিন্তু এই সৌন্দর্যের ভেতরেই লুকিয়ে আছে কঠোর জবাবদিহি, নির্মম বাস্তবতা এবং জনগণের নীরব অথচ চূড়ান্ত ক্ষমতা।

AdLink দ্বারা বিজ্ঞাপন ×

আজ এই ক্ষণে আমার ছোটবেলার একটি গল্প খুব মনে পড়ছে। গ্রামে বিষাক্ত সর্প দংশনে একজন প্রতিবেশী মৃত্যুবরণ করেছিলেন। চারদিকে কান্নার রোল উঠেছিল। পাড়া প্রতিবেশীরা এসে সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন, নানা জন নানা ভাবে স্মৃতিচারণ করছিলেন। হঠাৎ এক বয়স্ক মহিলা এসে লক্ষ করলেন, সাপে কামড় দিয়েছে চোখের একটু উপরে। গভীর দুঃখ প্রকাশ করে তাকে বলতে শুনেছিলাম, “ইশ, একটুর জন্য চোখটা বেঁচে গেছে।”

AdLink দ্বারা বিজ্ঞাপন ×

সেদিন প্রথম বুঝেছিলাম, মানুষ কখনো কখনো সবচেয়ে বড় ক্ষতির মাঝেও অদ্ভুত এক সান্ত্বনা খোঁজে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমরা কি বারবার একইভাবে নিজেদের সান্ত্বনা দিয়ে যাব, নাকি সত্যের মুখোমুখি দাঁড়াব?

সদ্য বাংলাদেশের নির্বাচন শেষ হয়েছে। বিজয়ের ঘণ্টা বেজেছে, সেই সাথে পরাজয়েরও। তারপরও জল্পনা কল্পনা চলছে, চলবেই। কী করণীয় ছিল, কী করা উচিত ছিল না, এই আলোচনা গণতন্ত্রেরই অংশ। জয় পরাজয় থাকবেই, অতীতেও ছিল, ভবিষ্যতেও থাকবে। কিন্তু যে শিক্ষা সবচেয়ে জরুরি, সেটি হলো অজুহাত নয়, সমাধান খুঁজুন।

রাজনীতি কেন করবেন? উদ্দেশ্য কি? সেবা দেবেন, নাকি সেবা নেবেন? শাসন করবেন, নাকি শোষণ করবেন? স্বৈরাচারী হবেন, নাকি কর্মচারীর মতো জনগণের পাশে দাঁড়াবেন? একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করবেন, নাকি গণতন্ত্রকে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করাবেন? দেশ গড়বেন, নাকি শুধু নিজেকে গড়বেন?

এই প্রশ্নগুলো শুধু রাজনীতিবিদদের জন্য নয়, একটি জাতির আত্মপরিচয়ের প্রশ্ন। কারণ রাজনীতি শেষ পর্যন্ত ক্ষমতার খেলা নয়, এটি আস্থার সম্পর্ক।

এ ধরনের চিন্তা ভাবনাকে ব্রেনস্টর্মিং করতে হবে। একটি টু ডু লিস্ট তৈরি করতে হবে। তারপর নিজেকেই প্রশ্ন করতে হবে, গো অর নট গো। কারণ নেতৃত্ব মানে শুধু সামনে দাঁড়ানো নয়, সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাহস।

ধরুন, আপনি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেন দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়া সম্ভব। কীভাবে সম্ভব, সেটাও আপনি জানেন। কিন্তু আপনার কোনো ক্ষমতা নেই, জনগণ আপনার পাশে নেই, তাহলে? ইতিহাস বলে, পরিবর্তন কখনো ক্ষমতা দিয়ে শুরু হয় না, শুরু হয় বিশ্বাস দিয়ে। তারপর সেই বিশ্বাসই একসময় জনশক্তিতে রূপ নেয়।

আমি আজ একটি ক্ষেত্রেই দেশের অগ্রগতি নিঃসন্দেহে দৃশ্যমান, সেটি দুর্নীতি। কথাটি হতাশার শোনালেও এর ভেতরে লুকিয়ে আছে একটি সতর্কবার্তা। কারণ শক্তি নিজে কখনো ভালো বা মন্দ নয়, আমরা তাকে কোন পথে ব্যবহার করছি সেটিই আসল প্রশ্ন।

আলফ্রেড নোবেল ডিনামাইট আবিষ্কার করেছিলেন ধ্বংসের জন্য নয়। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল সুইডেনের দুর্গম পাহাড় কেটে রাস্তা নির্মাণ করা, নর্ডিক দেশগুলোর যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত করা এবং বহির্বিশ্বের সঙ্গে ব্যবসা বাণিজ্যের নতুন দুয়ার খুলে দেওয়া। সেই স্বপ্ন বাস্তব হয়েছিল, যার সুফল আজও চোখে পড়ে। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় একই ডিনামাইট যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়ে লাখো মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়েছে। যে শক্তি উন্নয়নের প্রতীক ছিল, সেটিই পরিণত হয়েছে ধ্বংসের অস্ত্রে।

প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও আমরা যেন একই দ্বিধাবিভক্ত পথের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। অভূতপূর্ব প্রযুক্তিগত অগ্রগতি সত্ত্বেও আমরা তাকে সুশাসনের হাতিয়ার হিসেবে গড়ে তুলতে পারিনি। অথচ চাইলে শতভাগ প্রযুক্তিনির্ভর প্রশাসন, নগদবিহীন লেনদেন, স্বচ্ছ নির্বাচন ব্যবস্থা এবং দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ আজ আর কল্পনা নয়, বাস্তব সম্ভাবনা। প্রশ্ন একটাই, আমরা কি প্রযুক্তিকে অগ্রগতির সিঁড়ি বানাব, নাকি নিজেদের সীমাবদ্ধতার কারণে তাকে ধ্বংসের আরেকটি উপকরণে পরিণত করব?

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আমরা দেখেছি, কত ভালো মানুষের হাত পা কাটা গেল, কত তরুণ তরুণী জীবন দিল, দুর্নীতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ালো। তাদের আত্মত্যাগ আমাদের একটি কঠিন প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়, আমরা কি সত্যিই ন্যায়বিচার চাই, নাকি শুধু ক্ষণিকের প্রতিশোধ? যারা দুর্নীতি করল বা এত মানুষকে হত্যা করল, সবাই জানে তারা কারা। তারপরও কি সেই দুর্নীতিবাজদের শাস্তি হিসেবে হুট করে হাত পা কাটা যাবে? না। কারণ আইনের ঊর্ধ্বে উঠে বিচার করা মানে আবারও অন্যায়কে জন্ম দেওয়া। এখানেই বিবেকের দ্বন্দ্ব।

এই দ্বন্দ্বের মোকাবিলা করা যেমন কঠিন, তেমনি কঠিন পরাজয়কে মেনে নেওয়া। পরাজয় মানুষকে ভেঙেও দেয়, আবার গড়েও তোলে। আমি বহু বছর ধরে খেলাধুলার জগতের সাথে জড়িত। আমার ছেলে মেয়েরা তাদের শৈশব, কৈশোর এবং যৌবনের একটি বড় সময় পার করছে জয় পরাজয়ের মধ্য দিয়ে। জয়ের উল্লাস যেমন মানুষকে আত্মবিশ্বাসী করে, তেমনি পরাজয়ের গ্লানি মানুষকে গভীরভাবে আত্মসমালোচনা করতে শেখায়। চলার পথে আমরা প্রতিনিয়ত এগিয়ে চলেছি। তারপরও আমরা থেমে নেই। কারণ সেই একই প্রশ্ন আমাদের সামনে থাকে, কী, কেন এবং কীভাবে।

স্বাভাবিকভাবেই জয়ের মধ্যে সময় কাটানোর উপলব্ধি আর পরাজয়ের মধ্যে সময় কাটানোর অনুভূতি এক নয়। তবুও মেনে নেওয়া শিখতে হবে। কারণ যে জাতি হার স্বীকার করতে জানে না, সে কখনো জয়ের মর্যাদাও বুঝতে পারে না।

আমাদের সুইডেনের একজন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী প্রায় বলতেন, “jag låter min fru alltid vinna, på så sätt är det jag som bestämmer att hon vinner।” এর বাংলা অর্থ, “আমি সবসময় আমার স্ত্রীকে জিততে দিই, আর এভাবেই আমিই ঠিক করি যে সে জিতবে।” কথাটি রসিকতা মনে হলেও এর ভেতরে লুকিয়ে আছে এক গভীর সত্য, কখনো কখনো ছেড়ে দেওয়াও প্রজ্ঞার পরিচয়, আর সম্মান দিয়েই টেকসই সম্পর্ক তৈরি হয়।

গণতন্ত্রের মূল মন্ত্র হলো agree to disagree, অর্থাৎ দ্বিমত থাকা সত্ত্বেও সহাবস্থান করা। মতের ভিন্নতা কোনো দুর্বলতা নয়, বরং একটি পরিণত সমাজের শক্তি। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই চর্চাটির ভীষণ অভাব বাংলাদেশে। আমরা ভিন্ন মতকে প্রতিপক্ষ ভাবতে শিখেছি, সহযাত্রী হিসেবে দেখতে শিখিনি।

খুব ইচ্ছে জাগে, যদি আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় ন্যূনতম পরিবর্তন এনে মত ও দ্বিমত পোষণের প্রক্রিয়াটিকে শেখানো যেত। কারণ গণতন্ত্র কেবল ব্যালট বাক্সে জন্মায় না, এটি জন্মায় শ্রেণিকক্ষে, পরিবারে, আলোচনায়, এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধার সংস্কৃতিতে।

শেষ পর্যন্ত একটি সত্য অস্বীকার করার উপায় নেই, গণতন্ত্র কোনো আরামদায়ক যাত্রা নয়। এটি প্রশ্ন করে, চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়, কখনো আঘাত করে, আবার নতুন করে পথও দেখায়। তাই অজুহাত নয়, আত্মসমালোচনা দরকার। প্রতিশোধ নয়, ন্যায়বিচার দরকার। বিভাজন নয়, পরিণত সহাবস্থান দরকার।

কারণ একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় শুধু কে জিতল বা হারল তা দিয়ে নয়, বরং আমরা হার থেকে কী শিখলাম এবং জয়কে কতটা দায়িত্বে রূপান্তর করতে পারলাম তা দিয়ে। গণতন্ত্র নিষ্ঠুর হতে পারে, কিন্তু অন্ধ নয়। অন্ধ হলে আমরা।

রহমান মৃধা, গবেষক ও লেখক, প্রাক্তন পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন
rahman.mridha@gmail.com

শেয়ার করুন:-
পুরো সংবাদটি পড়ুন

মত দ্বিমত

গরীব দেশে অথচ দুর্নীতিবাজ কোটিপতিদের সংখ্যা বেশি, ঘটনা কী

Published

on

পিই রেশিও

বাংলাদেশ এখন এক অদ্ভুত বৈপরীত্যের দেশ। একদিকে উন্নয়নের পরিসংখ্যান, অবকাঠামোর দৃশ্যমান অগ্রগতি, ডিজিটাল রূপান্তরের প্রচার; অন্যদিকে দ্রুত বাড়ছে অস্বচ্ছ সম্পদের মালিক কোটিপতিদের সংখ্যা। প্রশ্নটি তাই ক্রমেই জোরালো হচ্ছে: একটি দেশ যেখানে এখনও নুন আনতে তেল ফুরোয়, বিপুল দরিদ্র জনগোষ্ঠী জীবনযুদ্ধেই ব্যস্ত, সেখানে এত সম্পদ জমছে দুর্নীতিবাজ রাজনীতিবিদদের হাতে, কীভাবে?

কীভাবে এই সম্পদ তৈরি হচ্ছে

AdLink দ্বারা বিজ্ঞাপন ×

অর্থনীতির স্বাভাবিক নিয়ম হলো উৎপাদন, উদ্ভাবন এবং প্রতিযোগিতার মাধ্যমে সম্পদ সৃষ্টি। কিন্তু যখন সম্পদের বড় অংশ আসে ব্যাংক ঋণ খেলাপি, প্রকল্প ব্যয়ের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি, সরকারি ক্রয়ে অনিয়ম, টেন্ডার কারসাজি এবং রাজনৈতিক প্রভাবের মাধ্যমে, তখন তা আর অর্থনৈতিক সাফল্য নয়; বরং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার লক্ষণ। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, লোকসান শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্র বহন করে, আর মুনাফা ব্যক্তির হাতে যায়। ফলে সম্পদ সৃষ্টি হয়, কিন্তু তা জাতীয় সমৃদ্ধিতে রূপ নেয় না।

AdLink দ্বারা বিজ্ঞাপন ×

কেন এমন হচ্ছে

এর পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হলো দুর্বল জবাবদিহি। যখন আইনের প্রয়োগ নির্বাচিতভাবে হয়, তদন্ত ধীরগতির হয়, আর শাস্তির নজির কম থাকে, তখন দুর্নীতি ঝুঁকিপূর্ণ নয়, বরং লাভজনক হয়ে ওঠে। আরও একটি কারণ হলো ক্ষমতা ও অর্থের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। রাজনৈতিক সুরক্ষা অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি করে, আর অর্থ আবার রাজনৈতিক প্রভাব বাড়ায়। এই চক্র ভাঙা কঠিন হয়ে পড়ে।

জনগণের ভূমিকা কী

দুর্নীতির দায় শুধু ক্ষমতাবানদের নয়; সমাজও অনেক সময় নীরব সমর্থক হয়ে ওঠে। দ্রুত সুবিধা পাওয়ার সংস্কৃতি, “সবাই তো করছে” ধরনের মানসিকতা, এবং শক্তিশালী নাগরিক চাপের অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে। যেখানে ভোটাররা নীতির চেয়ে তাৎক্ষণিক সুবিধাকে অগ্রাধিকার দেয়, সেখানে দীর্ঘমেয়াদি সুশাসনের দাবি দুর্বল হয়ে যায়।

বিশ্ব কীভাবে দেখছে

আন্তর্জাতিক সূচকগুলো প্রায়ই দেখায়, বিনিয়োগকারীরা স্থিতিশীলতা চান, কিন্তু একই সঙ্গে চান স্বচ্ছতা এবং আইনের নিশ্চয়তা। যখন দুর্নীতির ধারণা প্রবল হয়, তখন বিদেশি বিনিয়োগ সতর্ক হয়ে পড়ে, আর দেশের ভাবমূর্তি প্রশ্নের মুখে পড়ে। বাংলাদেশের সম্ভাবনা নিয়ে বিশ্ব আশাবাদী, কিন্তু সেই আশার সঙ্গে একটি সতর্কবার্তাও থাকে: টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয় যদি প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হয়।

ডিজিটাল বাংলাদেশ

কিন্তু অর্থনৈতিক প্রভাব কোথায়, ডিজিটালাইজেশন শুধু সেবা দ্রুত করার জন্য নয়; এটি দুর্নীতি কমানোরও শক্তিশালী হাতিয়ার হতে পারত। ই-গভর্ন্যান্স, স্বচ্ছ ডেটা, অনলাইন টেন্ডার, ট্র্যাকযোগ্য লেনদেন বাস্তবায়িত হলে অনিয়ম কমার কথা। কিন্তু প্রযুক্তি তখনই কার্যকর হয়, যখন সেটি ব্যবহারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকে। অন্যথায় ডিজিটাল কাঠামোও কেবল নতুন আকারে পুরোনো সমস্যাকে বহন করে।

জবাবদিহির অনুপস্থিতি

যে রাষ্ট্রে প্রশ্ন করা কঠিন, তথ্য পাওয়া সীমিত, এবং দায় নির্ধারণ বিরল, সেখানে দুর্নীতি ব্যতিক্রম নয়, বরং কাঠামোগত বাস্তবতা হয়ে দাঁড়ায়। জবাবদিহি শুধু আইনি প্রক্রিয়া নয়; এটি একটি সাংস্কৃতিক চর্চা, যা প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম এবং নাগরিক সমাজ মিলেই তৈরি করে।

দুর্নীতি, সন্ত্রাস এবং চাঁদাবাজি: রন্ধ্রে রন্ধ্রে বিস্তার

যখন অর্থনৈতিক অপরাধ শাস্তিহীন থাকে, তখন তা সামাজিক অপরাধকেও উৎসাহ দেয়। চাঁদাবাজি ব্যবসার খরচ বাড়ায়, সন্ত্রাস বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করে, আর সাধারণ মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো অর্থনীতি।

মূল কাঠামোগত কারণগুলো-

১. রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভেতরেই দুর্নীতির আশ্রয়
Transparency International বলছে, অব্যাহত দুর্নীতি, রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা, দুর্বল আইন প্রয়োগ এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা বাংলাদেশের অবস্থার অবনতির বড় কারণ। ক্ষমতার অপব্যবহারের সুযোগ থাকলে এবং জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠানগুলো রাজনৈতিক হয়ে পড়লে দুর্নীতি “ফ্লরিশ” করবেই। অর্থাৎ সমস্যা ব্যক্তি নয়, সিস্টেম।

২. সম্পদের ভয়াবহ অসম বণ্টন
এক গবেষণায় দেখা গেছে, জাতীয় আয়ের ৪৪% মাত্র ১০% মানুষের হাতে, আর নিচের ৫০% পেয়েছে মাত্র ১৭.১%। এমনকি ১% মানুষই ১৬% আয়ের মালিক। এটি দেখায়, সম্পদ তৈরি হচ্ছে, কিন্তু তা অর্থনীতির ভেতর ছড়িয়ে পড়ছে না।

৩. গ্লোবাল করাপশন ইকোনমি
প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ডলার চুরি হয়, যার বড় অংশ উন্নয়নশীল দেশ থেকে পাচার হয়ে যায়। এই অর্থ যদি চুরি না হতো, তাহলে GDP বাড়ত এবং বৈষম্য কমত। অর্থাৎ দুর্নীতি শুধু নৈতিক সমস্যা নয়, এটি সরাসরি উন্নয়নকে ধ্বংস করে।

৪. অলিগার্কি ও অর্থনীতি লুটের অভিযোগ
এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, প্রায় ২৩৪ বিলিয়ন ডলার সরকারি তহবিল ১৫ বছরে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে, এবং প্রবৃদ্ধির একটি অংশ “কৃত্রিম” ছিল বলে অভিযোগ উঠেছে। আরেক তদন্তে দেখা যায়, এক রাজনীতিকের বিদেশে ৪৮২টি সম্পত্তি ছিল, যা জটিল অর্থপাচারের মাধ্যমে গড়ে ওঠার সন্দেহ। এটি আর বিচ্ছিন্ন দুর্নীতি নয়; এটি সংগঠিত সম্পদ স্থানান্তর।

৫. ব্যাংক ও আর্থিক ব্যবস্থার দখল
কিছু ক্ষেত্রে নিরাপত্তা কাঠামোর সহায়তায় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া এবং বিপুল অর্থ সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে; ফলে খেলাপি ঋণ ৩২% পর্যন্ত পৌঁছেছে। যখন ব্যাংক দুর্বল হয়, তখন পুরো অর্থনীতি ঝুঁকিতে পড়ে।

৬. বৈশ্বিক সূচকে সতর্কবার্তা
২০২৫ সালে বাংলাদেশ ১০০ এর মধ্যে মাত্র ২৪ স্কোর পেয়েছে এবং “serious corruption problem” হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এটি বিনিয়োগ, আস্থা এবং আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে।

গভীরতর বাস্তবতা: কেন দরিদ্র দেশে দ্রুত ধনী তৈরি হয়?
• আইন দুর্বল, ঝুঁকি কম
• ক্ষমতার ঘনত্ব, সুযোগ বেশি
• বৈষম্য বেশি, প্রতিরোধ কম
• রাজনৈতিক সুরক্ষা, শাস্তি কম

এই চারটি একসঙ্গে হলে “দ্রুত সম্পদ” তৈরি হয়, কিন্তু “টেকসই অর্থনীতি” তৈরি হয় না।

কঠিন শেষ স্টেটমেন্ট
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সংকট দারিদ্র্য নয়। সবচেয়ে বড় সংকট হলো অন্যায্য সম্পদ সৃষ্টি স্বাভাবিক হয়ে যাওয়া। যে দেশে ধনী হওয়া যদি উৎপাদনের চেয়ে ক্ষমতার কাছাকাছি থাকার ওপর নির্ভর করে, তাহলে সেখানে উন্নয়ন কাগজে বাড়ে, বাস্তবে নয়। রাষ্ট্র তখন আর সুযোগের ক্ষেত্র থাকে না; হয়ে ওঠে সম্পদ স্থানান্তরের যন্ত্র।

ইতিহাস একটি নির্মম সত্য শেখায়:
অসমতা সহ্য করতে পারে সমাজ, কিন্তু অন্যায্য সম্পদকে দীর্ঘদিন মেনে নেয় না। যেদিন সাধারণ মানুষ বিশ্বাস হারায় যে পরিশ্রম নয়, প্রভাবই সফলতার পথ, সেদিন থেকেই অর্থনৈতিক সংকট নয়, রাষ্ট্রীয় আস্থার পতন শুরু হয়।

লেখক: রহমান মৃধা, গবেষক ও লেখক, প্রাক্তন পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন
rahman.mridha@gmail.com

শেয়ার করুন:-
পুরো সংবাদটি পড়ুন

মত দ্বিমত

জুলাই বিপ্লবের প্রজন্ম: পরিবর্তনের অগ্নিশিখা না নতুন রাষ্ট্রচিন্তার সূচনা?

Published

on

পিই রেশিও

ছাত্রনেতৃত্বে এক অভ্যুত্থান শুধু সরকার পরিবর্তন করেনি, বরং প্রশ্ন তুলেছে ক্ষমতা, গণতন্ত্র এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রব্যবস্থা নিয়ে।ইতিহাসের কিছু মুহূর্ত থাকে যা কেবল একটি রাজনৈতিক ঘটনা নয়, বরং একটি জাতির মানসিক রূপান্তরের সূচনা। বাংলাদেশের জুলাই বিপ্লব তেমনই একটি মুহূর্ত। ছাত্রদের নেতৃত্বে শুরু হওয়া এই আন্দোলন শেষ পর্যন্ত এমন এক গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়, যার ফলে দীর্ঘদিনের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।

এই আন্দোলনের শুরু ছিল সরকারি চাকরির কোটা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ছাত্রদের প্রতিবাদ থেকে, কিন্তু দ্রুত তা জাতীয় বিদ্রোহে পরিণত হয়। এখানেই নতুন প্রজন্মের চরিত্র স্পষ্ট হয়: তারা কেবল একটি নীতির পরিবর্তন চায়নি, তারা রাষ্ট্রের কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। কিন্তু এই প্রজন্ম কি সত্যিই অতীত থেকে আলাদা?

AdLink দ্বারা বিজ্ঞাপন ×

হ্যাঁ, একটি বড় অর্থে আলাদা। তারা ক্ষমতার উত্তরাধিকারকে স্বাভাবিক ধরে নেয় না। তারা বৈষম্যহীন সমাজের স্বপ্নে সংগঠিত হয়েছে, যেমন ‘বৈষম্যের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীরা’ প্ল্যাটফর্মটি দেখায়, যা আন্দোলনের মাধ্যমে রাজনৈতিক পরিসর গড়ে তুলতে কাজ করেছে। এই তরুণ নেতৃত্বের মধ্যেই উঠে এসেছে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নাম।

AdLink দ্বারা বিজ্ঞাপন ×

নাহিদ ইসলাম, যিনি ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক ছিলেন, এক পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগের এক দফা দাবি ঘোষণা করে বিপ্লবের সবচেয়ে পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন। পরে তিনি অন্তর্বর্তী সরকারেও দায়িত্ব পালন করেন। অন্যদিকে, নাসিরউদ্দিন পাটোয়ারী জাতীয় নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে একটি বৈষম্যহীন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্র গঠনের লক্ষ্যে প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছেন।

ঢাকা-৮ আসনের মতো রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এক মঞ্চে নাসিরউদ্দিন পাটোয়ারীর প্রার্থিতা শুধু একটি নির্বাচন নয়, বরং নতুন ধারার রাজনীতির এক প্রতীকী পরীক্ষা। জাতীয় নাগরিক পার্টি তাঁকে এই আসনে প্রার্থী করেছে, যা তরুণ নেতৃত্বের সামনে আসার একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করে। কিন্তু তাঁর পথ মোটেই মসৃণ নয়। প্রচারণার সময় তাঁকে লক্ষ্য করে ডিম নিক্ষেপ ও হয়রানির ঘটনা ঘটেছে, যা রাজনৈতিক মতভেদের প্রতি অসহিষ্ণুতার প্রশ্ন তুলে দিয়েছে এবং তদন্তের নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।

তবু এখানেই এই গল্পের মোড়। প্রতিকূলতার মুখে দাঁড়িয়েও তাঁর অংশগ্রহণ দেখায় যে রাজনীতি কেবল ক্ষমতার প্রতিযোগিতা নয়, বরং ধারণা, সাহস এবং সামাজিক চিন্তারও প্রতিযোগিতা। ঢাকা-৮-এর লড়াই তাই একটি আসনের সীমা ছাড়িয়ে ভিন্ন মতের সহাবস্থান, অংশগ্রহণমূলক রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং নতুন প্রজন্মের আত্মপ্রকাশের প্রতীক হয়ে উঠছে। যখন একটি প্ল্যাটফর্ম সমাজকে শুধু বিনোদনের আলোচনায় আটকে না রেখে চিন্তার পরিসরকে বিস্তৃত করতে চায়। তখন সেই রাজনীতি ধীরে ধীরে বিশ্বদরবারে নিজের ভাষা তৈরি করে। আর সেই ভাষার কেন্দ্রে থাকে একটি বার্তা: ভয় নয়, ভবিষ্যৎই শেষ পর্যন্ত ইতিহাস লিখে। এটি শুধু নেতৃত্ব নয়, একটি দৃষ্টিভঙ্গির ইঙ্গিত। পরিবর্তনের দর্শন: পরিষ্কার না হলেও শক্তিশালী।

সমালোচকেরা বলেন, নতুন প্রজন্মের পরিকল্পনা সবসময় স্পষ্ট নয়। সত্যি বলতে, বিপ্লবের ভাষা প্রায়ই অসম্পূর্ণ হয়। কিন্তু অসম্পূর্ণতা মানেই দুর্বলতা নয়। জুলাই ঘোষণাপত্রে রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক সংস্কার, গণতান্ত্রিক পুনর্গঠন এবং বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।

অর্থাৎ, এই আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল একটি বড় প্রশ্ন: রাষ্ট্র কাদের জন্য? ত্যাগের মূল্য এই বিপ্লব ছিল রক্তহীন নয়। সহিংসতার সময় এক হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হন, যা দেশের স্বাধীনতার পর সবচেয়ে প্রাণঘাতী সময়গুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত। এটি মনে করিয়ে দেয়, পরিবর্তন কখনোই বিনামূল্যে আসে না। ভুল, বিভ্রান্তি এবং বাস্তবতা যে কোনো গণআন্দোলনের মতো এখানেও বিতর্ক আছে। কেউ কেউ অভিযোগ তুলেছেন যে বিপ্লবের স্মৃতি রাজনৈতিকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে, যার বিরুদ্ধে নাগরিক নেতারা সতর্ক করেছেন। এই সতর্কবার্তা গুরুত্বপূর্ণ।

কারণ একটি বিপ্লব তখনই সফল হয়, যখন তা ক্ষমতার নতুন কেন্দ্রে পরিণত না হয়ে প্রতিষ্ঠান তৈরি করে। নতুন পৃথিবীর ইঙ্গিত আজকের বিশ্বে তরুণরা আর কেবল দর্শক নয়। তারা রাষ্ট্রের অংশীদার হতে চায়। বাংলাদেশের ঘটনাপ্রবাহ দেখায়, ঐক্য এমন এক শক্তি যা কেনা যায় না।

এই প্রজন্ম হয়তো সব প্রশ্নের উত্তর জানে না। কিন্তু তারা একটি প্রশ্ন করতে শিখেছে: কেন নয় এবং ইতিহাসে প্রায় সব বড় পরিবর্তন শুরু হয়েছে এই প্রশ্ন থেকেই। সবচেয়ে বড় পরীক্ষা এখন স্বৈরাচারী পরিবার ও সরকারের পতন বিপ্লবের শেষ নয়, বরং শুরু।

নতুন নেতৃত্ব কি প্রতিষ্ঠান গড়তে পারবে? তারা কি ব্যক্তিনির্ভর রাজনীতি ভেঙে নীতিনির্ভর রাষ্ট্র তৈরি করবে? তারা কি আবেগকে নীতিতে রূপ দিতে পারবে? যদি পারে, তবে জুলাই শুধু একটি মাসের নাম থাকবে না। এটি হয়ে উঠবে একটি রাজনৈতিক পুনর্জন্মের প্রতীক।

পরিশেষে একটি আহ্বান বাংলাদেশ আজ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। তরুণরা দেখিয়ে দিয়েছে সাহস কাকে বলে। এখন তাদের প্রমাণ করতে হবে প্রজ্ঞা কাকে বলে। কারণ বিপ্লবের সবচেয়ে কঠিন কাজ হলো ক্ষমতা দখল নয়,ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা। জাগো বাংলাদেশ জাগো কিন্তু এবার শুধু প্রতিবাদে নয়, রাষ্ট্রগঠনে।

রহমান মৃধা, গবেষক ও লেখক, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন
rahman.mridha@gmail.com

শেয়ার করুন:-
পুরো সংবাদটি পড়ুন

মত দ্বিমত

বাংলাদেশ কি তথ্যযুদ্ধের মধ্যে ঢুকে পড়েছে?

Published

on

পিই রেশিও

সাম্প্রতিক সময়ে গণমাধ্যমের একটি ফেসবুক ভেরিফায়েড পেইজে জামায়াতের আমিরকে ঘিরে একটি মন্তব্য ছড়িয়ে পড়ে, যা দ্রুত ভাইরাল হয়ে সারা দেশে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। প্রযুক্তির এই যুগে, যেখানে নারী বিশ্বনেতৃত্ব দিচ্ছে, আরব সভ্যতায় পরিবর্তন ঘটছে, এবং ইসলামের ইতিহাসেই হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সহধর্মিণী হজরত খাদিজা (রা:) ছিলেন একজন সফল ব্যবসায়ী ও সমাজে সম্মানিত প্রতিনিধি, সেই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে নারীদের কাজ করাকে পতিতাবৃত্তির সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে বলে প্রচারিত হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়।

পরবর্তী তদন্তে উঠে এসেছে, সংশ্লিষ্ট ভেরিফায়েড পেইজটি হ্যাক করা হয়েছিল এবং এই বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো হয়েছিল বিশেষ করে আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে একটি রাজনৈতিক দলকে প্রশ্নবিদ্ধ করার উদ্দেশ্যে। ঘটনাটি শুধু একটি গুজব নয়, এটি দেখিয়ে দেয় কত সহজে একটি সাজানো বার্তা সমাজে ক্ষোভ, বিভাজন এবং রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি করতে পারে। এই ঘটনাই একটি বড় বাস্তবতা সামনে আনে, ডিজিটাল যুগে সত্য প্রকাশ পাওয়ার আগেই মিথ্যা জনমত গড়ে তুলতে পারে। আর যখন একটি ভুয়া বার্তা জাতীয় বিতর্কে পরিণত হয়, তখন সেটি আর কেবল একটি পোস্ট থাকে না সেটি হয়ে ওঠে তথ্যযুদ্ধের অংশ।

AdLink দ্বারা বিজ্ঞাপন ×

বাংলাদেশ এখন শুধু রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেই নেই, দেশটি ধীরে ধীরে একটি গভীর তথ্যসংকটে প্রবেশ করছে। নির্বাচনের আগে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার অভিযোগকে অন্তর্বর্তী সরকার ডিসইনফরমেশন বলে উড়িয়ে দিয়েছে এবং দাবি করেছে, দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে ইচ্ছাকৃতভাবে এসব ছড়ানো হচ্ছে। অন্যদিকে একটি বড় জরিপে দেখা গেছে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে খুব বেশি পরিমাণে ভুয়া খবর তরুণদের মানসিক চাপের প্রধান কারণ হয়ে উঠেছে। এই দুটি ঘটনা একসাথে একটি কঠিন প্রশ্ন তুলে ধরে: কোন তথ্য সত্য, আর কোনটি রাজনৈতিক অস্ত্র?

AdLink দ্বারা বিজ্ঞাপন ×

ভুয়া তথ্যের বিস্ফোরণ, সংখ্যাই বলছে বিপদের কথা। স্বাধীন ফ্যাক্ট-চেকিং সংস্থা রুমর স্ক্যানার-এর প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২৫ সালের প্রথম তিন মাসে বাংলাদেশে ৮৩৭টি ভুয়া বা বিভ্রান্তিকর তথ্য শনাক্ত হয়েছে, যা আগের সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি। ভুল তথ্যের হার আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২৮ শতাংশ বেশি। রাজনৈতিক ঘটনা, জাতীয় ইস্যু এবং ধর্মীয় বিতর্ক এই বৃদ্ধির প্রধান কারণ। ৭৪৮টি ভুয়া তথ্য ফেসবুক থেকে ছড়িয়েছে, অর্থাৎ গড়ে প্রতিদিন আটটিরও বেশি। বিশ্লেষণে আরও দেখা গেছে, মোট বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট ৩০ শতাংশ বেড়েছে এবং দুই-তৃতীয়াংশ ফ্যাক্ট-চেক ছিল রাজনৈতিক। স্বাধীন ফ্যাক্ট-চেকিং সংস্থার প্রতিবেদনে উঠে আসা এই পরিসংখ্যান শুধু তথ্যের পরিমাণই নয়, বরং একটি রাষ্ট্রের তথ্যপরিবেশ কত দ্রুত দূষিত হতে পারে, সেই সতর্কবার্তাও বহন করে।

নির্বাচন সামনে, তাই কি গুজবও অস্ত্র? একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যাচাই করা ভুয়া দাবির প্রায় ৬৩ শতাংশই রাজনৈতিক, এবং এর অর্ধেক ছিল বানানো সমাবেশ, সংঘর্ষ বা নেতাদের ভুয়া বক্তব্য নিয়ে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সবচেয়ে বেশি ভুয়া বয়ানের লক্ষ্য হয়েছেন, যার ৮০ শতাংশ তাকে ইতিবাচকভাবে উপস্থাপন করেছে। অর্থাৎ অপপ্রচার শুধু প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করছে না; অনেক ক্ষেত্রে জনপ্রিয়তা তৈরির হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে। উদ্বেগের বিষয় হলো, বিভ্রান্তিকর তথ্য এখন আর প্রান্তিক কোনো সমস্যা নয়; এটি জনমত নির্মাণের একটি কৌশলগত উপাদানে পরিণত হয়েছে।

রাষ্ট্র, রাজনীতি, বিদেশি প্রভাব, জটিল ত্রিভুজ। ফ্যাক্ট-চেক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে যে নিরাপত্তা বাহিনী সম্পর্কেও ৬০টি ভুল দাবি ছড়ানো হয়েছে এবং ভারতীয় মিডিয়া ও সামাজিক মাধ্যম মিলিয়ে অন্তত ৮৩টি বিভ্রান্তিকর ঘটনার সঙ্গে যুক্ত ছিল। এটি একটি বিপজ্জনক সংকেত, কারণ তথ্যযুদ্ধ যখন সীমান্ত ছাড়িয়ে যায়, তখন তা কূটনৈতিক উত্তেজনায়ও রূপ নিতে পারে।

সমাজ কেন এত সহজে গুজবে বিশ্বাস করছে? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বড় রাজনৈতিক ঘটনা, ধর্মীয় উত্তেজনা এবং অনলাইন মেরুকরণ ভুল তথ্য ছড়ানোর গতি বাড়িয়েছে। অতীতে একটি গুজব ছড়িয়ে পড়েছিল যে পদ্মা সেতুর জন্য মানববলির প্রয়োজন, এবং সেই ভুল তথ্য প্রাণহানির ঘটনাও ঘটিয়েছিল। অর্থাৎ ভুয়া খবর শুধু মতামত বদলায় না, জীবনও কেড়ে নিতে পারে।

সরকার কী করছে, আর কী করা উচিত? তরুণদের অধিকাংশই মনে করে ক্ষতিকর অনলাইন আচরণ ঠেকাতে নিয়ম থাকা জরুরি। কিন্তু এখানে সবচেয়ে বড় দ্বন্দ্ব হলো: অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ দিলে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ঝুঁকিতে পড়ে, আর নিয়ন্ত্রণ না দিলে রাষ্ট্র অস্থিতিশীল হতে পারে। এই ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন সরকারের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। সমস্যাটি শুধু কে মিথ্যা বলছে তা নয়; বড় প্রশ্ন হলো, নাগরিকরা কোন উৎসকে বিশ্বাস করবে। যখন বিশ্বাসের কেন্দ্রগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন গণতন্ত্রের ভিত্তিও অদৃশ্যভাবে ক্ষয় হতে শুরু করে।

প্রতিরক্ষা ও রাষ্ট্রীয় সংস্থার ভূমিকা। ভুল তথ্য যখন সেনাবাহিনী বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে লক্ষ্য করে ছড়ায়, তখন তা শুধু রাজনৈতিক নয়, জাতীয় নিরাপত্তার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। আধুনিক রাষ্ট্রে নিরাপত্তা মানে শুধু সীমান্ত রক্ষা নয়; তথ্যের নিরাপত্তাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

সবচেয়ে বড় বিপদ: বিশ্বাসের পতন। একটি রাষ্ট্র তখনই দুর্বল হয় যখন নাগরিকরা আর কোনো উৎসকে বিশ্বাস করতে পারে না। আজ বাংলাদেশের সামনে তিনটি বাস্তব ঝুঁকি দাঁড়িয়ে আছে: সত্যের সংকট, গণতন্ত্রের সংকট, এবং আন্তর্জাতিক মর্যাদার সংকট। ইতিহাস দেখায়, কোনো রাষ্ট্র হঠাৎ ভেঙে পড়ে না; ভাঙন শুরু হয় তখনই, যখন সত্য নিয়ে সামাজিক ঐকমত্য হারিয়ে যায়।

বাংলাদেশ এখনো ভেঙে পড়েনি, কিন্তু সতর্ক না হলে ভাঙনের ভিত্তি তৈরি হবে। রাষ্ট্রকে অবিলম্বে স্বাধীন ও শক্তিশালী ফ্যাক্ট-চেকিং ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, রাজনৈতিক দলগুলোর অপপ্রচারকে আইনের আওতায় আনতে হবে, এবং ডিজিটাল সাক্ষরতা জাতীয় আন্দোলনে পরিণত করতে হবে। কারণ একটি সত্য স্পষ্ট: বন্দুক রাষ্ট্রকে যতটা না দুর্বল করে, মিথ্যা তার চেয়েও দ্রুত রাষ্ট্রকে ভেঙে দেয়।

শেষ কথা। বাংলাদেশ আজ এক মোড়ে দাঁড়িয়ে। এটি কি তথ্যনির্ভর আধুনিক রাষ্ট্র হবে, নাকি গুজবনির্ভর অস্থির সমাজে পরিণত হবে? সিদ্ধান্ত এখনই নিতে হবে। কারণ ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, গণতন্ত্র নির্বাচন হারিয়ে ধ্বংস হয় না; গণতন্ত্র ধ্বংস হয় যখন সত্য হারিয়ে যায়।

রহমান মৃধা, গবেষক ও লেখক, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন
rahman.mridha@gmail.com

শেয়ার করুন:-
পুরো সংবাদটি পড়ুন

মাহে রমজান

১৪৪৭ হিজরী

রোজার নিয়ত (সেহরী)
নাওয়াইতু আন আছুমা গাদাম মিন শাহরি রমাদানাল মুবারাক...
(হে আল্লাহ! আমি আগামীকাল পবিত্র রমজানের রোজা রাখার নিয়ত করলাম...)
ইফতারের দোয়া
আল্লাহুম্মা লাকা ছুমতু ওয়া আলা রিযক্বিকা আফতারতু।
(হে আল্লাহ! আমি তোমার জন্যই রোজা রেখেছি এবং তোমার দেওয়া রিযিক দিয়ে ইফতার করলাম।)
অপেক্ষা করুন...
00:00:00
পরবর্তী: --:--
সেহরী শেষ --:--
ইফতার --:--

পুঁজিবাজারের সর্বশেষ

পিই রেশিও পিই রেশিও
পুঁজিবাজার38 minutes ago

ডিএসইতে পিই রেশিও বেড়েছে দশমিক ২০ শতাংশ

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) বিদায়ী সপ্তাহে সার্বিক মূল্য আয় অনুপাত (পিই রেশিও) দশমিক ২০ শতাংশ বেড়েছে। ডিএসই সূত্রে এ তথ্য...

পিই রেশিও পিই রেশিও
পুঁজিবাজার45 minutes ago

সাপ্তাহিক দর পতনের শীর্ষে এপিএসসিএল বন্ড

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) সাপ্তাহিক শেয়ার দর পতনের শীর্ষে উঠে এসেছে এপিএসসিএল বন্ড। ডিএসই সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। ...

পিই রেশিও পিই রেশিও
পুঁজিবাজার55 minutes ago

সাপ্তাহিক দর বৃদ্ধির শীর্ষে ন্যাশনাল ব্যাংক

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) সাপ্তাহিক শেয়ার দর বৃদ্ধির শীর্ষে উঠে এসেছে ন্যাশনাল ব্যাংক পিএলসি । ডিএসই সূত্রে এ তথ্য জানা...

পিই রেশিও পিই রেশিও
পুঁজিবাজার1 hour ago

সাপ্তাহিক লেনদেনের শীর্ষে স্কয়ার ফার্মা

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) সাপ্তাহিক লেনদেনের শীর্ষে উঠে এসেছে স্কয়ার ফার্মা পিএলসি। ডিএসই সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।  AdLink...

পিই রেশিও পিই রেশিও
পুঁজিবাজার4 hours ago

মুনাফা বেড়েছে রবি আজিয়াটার

তালিকাভুক্ত বহুজাতিক কোম্পানি রবি আজিয়াটা পিএলসির সর্বশেষ ৩১ ডিসেম্বর সমাপ্ত ২০২৫ হিসাব বছরে মুনাফা বেড়েছে ৩৩ দশমিক ৫৮ শতাংশ। আলোচ্য...

পিই রেশিও পিই রেশিও
পুঁজিবাজার22 hours ago

ডিএসইর বাজার মূলধন বাড়লো ১ হাজার ৬০ কোটি টাকা

দেশের শেয়ারবাজারে সূচকের উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে চলতি সপ্তাহে লেনদেন হয়েছে । এতে সপ্তাহ ব্যবধানে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের...

পিই রেশিও পিই রেশিও
পুঁজিবাজার2 days ago

ব্লক মার্কেটে ১৯ কোটি টাকার লেনদেন

সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসে প্রধান ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) ব্লক মার্কেটে মোট ২৪টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার লেনদেন হয়েছে। এদিন ব্লক মার্কেটে ১৯...

সোশ্যাল মিডিয়া

তারিখ অনুযায়ী সংবাদ

রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি
১০১১১৩
১৫১৬১৯২০২১
২২২৩২৪২৫২৬২৭
পিই রেশিও
আবহাওয়া21 minutes ago

তাপমাত্রা নিয়ে ৫ দিনের পূর্বাভাসে যা জানাল অধিদপ্তর

পিই রেশিও
রাজনীতি31 minutes ago

চাঁদাবাজি ইস্যুতে সড়কমন্ত্রীর বক্তব্যের নিন্দা জামায়াতের

পিই রেশিও
পুঁজিবাজার38 minutes ago

ডিএসইতে পিই রেশিও বেড়েছে দশমিক ২০ শতাংশ

পিই রেশিও
পুঁজিবাজার45 minutes ago

সাপ্তাহিক দর পতনের শীর্ষে এপিএসসিএল বন্ড

পিই রেশিও
পুঁজিবাজার55 minutes ago

সাপ্তাহিক দর বৃদ্ধির শীর্ষে ন্যাশনাল ব্যাংক

পিই রেশিও
পুঁজিবাজার1 hour ago

সাপ্তাহিক লেনদেনের শীর্ষে স্কয়ার ফার্মা

পিই রেশিও
অর্থনীতি1 hour ago

কর্মসংস্থান তৈরি হবে এমন প্রকল্পে বিনিয়োগ করা হবে: অর্থমন্ত্রী

পিই রেশিও
জাতীয়1 hour ago

প্রথমবারের মতো তেজগাঁও কার্যালয়ে অফিস করছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

পিই রেশিও
জাতীয়2 hours ago

স্পিকারের নাম প্রায় চূড়ান্ত, ২৬ তারিখের মধ্যেই ঘোষণা

পিই রেশিও
জাতীয়3 hours ago

ইতিহাসে প্রথমবারের মতো শহীদ মিনারে শহীদদের মাগফিরাত কামনায় দোয়া প্রধানমন্ত্রীর

পিই রেশিও
আবহাওয়া21 minutes ago

তাপমাত্রা নিয়ে ৫ দিনের পূর্বাভাসে যা জানাল অধিদপ্তর

পিই রেশিও
রাজনীতি31 minutes ago

চাঁদাবাজি ইস্যুতে সড়কমন্ত্রীর বক্তব্যের নিন্দা জামায়াতের

পিই রেশিও
পুঁজিবাজার38 minutes ago

ডিএসইতে পিই রেশিও বেড়েছে দশমিক ২০ শতাংশ

পিই রেশিও
পুঁজিবাজার45 minutes ago

সাপ্তাহিক দর পতনের শীর্ষে এপিএসসিএল বন্ড

পিই রেশিও
পুঁজিবাজার55 minutes ago

সাপ্তাহিক দর বৃদ্ধির শীর্ষে ন্যাশনাল ব্যাংক

পিই রেশিও
পুঁজিবাজার1 hour ago

সাপ্তাহিক লেনদেনের শীর্ষে স্কয়ার ফার্মা

পিই রেশিও
অর্থনীতি1 hour ago

কর্মসংস্থান তৈরি হবে এমন প্রকল্পে বিনিয়োগ করা হবে: অর্থমন্ত্রী

পিই রেশিও
জাতীয়1 hour ago

প্রথমবারের মতো তেজগাঁও কার্যালয়ে অফিস করছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

পিই রেশিও
জাতীয়2 hours ago

স্পিকারের নাম প্রায় চূড়ান্ত, ২৬ তারিখের মধ্যেই ঘোষণা

পিই রেশিও
জাতীয়3 hours ago

ইতিহাসে প্রথমবারের মতো শহীদ মিনারে শহীদদের মাগফিরাত কামনায় দোয়া প্রধানমন্ত্রীর

পিই রেশিও
আবহাওয়া21 minutes ago

তাপমাত্রা নিয়ে ৫ দিনের পূর্বাভাসে যা জানাল অধিদপ্তর

পিই রেশিও
রাজনীতি31 minutes ago

চাঁদাবাজি ইস্যুতে সড়কমন্ত্রীর বক্তব্যের নিন্দা জামায়াতের

পিই রেশিও
পুঁজিবাজার38 minutes ago

ডিএসইতে পিই রেশিও বেড়েছে দশমিক ২০ শতাংশ

পিই রেশিও
পুঁজিবাজার45 minutes ago

সাপ্তাহিক দর পতনের শীর্ষে এপিএসসিএল বন্ড

পিই রেশিও
পুঁজিবাজার55 minutes ago

সাপ্তাহিক দর বৃদ্ধির শীর্ষে ন্যাশনাল ব্যাংক

পিই রেশিও
পুঁজিবাজার1 hour ago

সাপ্তাহিক লেনদেনের শীর্ষে স্কয়ার ফার্মা

পিই রেশিও
অর্থনীতি1 hour ago

কর্মসংস্থান তৈরি হবে এমন প্রকল্পে বিনিয়োগ করা হবে: অর্থমন্ত্রী

পিই রেশিও
জাতীয়1 hour ago

প্রথমবারের মতো তেজগাঁও কার্যালয়ে অফিস করছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

পিই রেশিও
জাতীয়2 hours ago

স্পিকারের নাম প্রায় চূড়ান্ত, ২৬ তারিখের মধ্যেই ঘোষণা

পিই রেশিও
জাতীয়3 hours ago

ইতিহাসে প্রথমবারের মতো শহীদ মিনারে শহীদদের মাগফিরাত কামনায় দোয়া প্রধানমন্ত্রীর