অর্থনীতি
ডিসেম্বরে প্রবাসী আয় আসেনি যে ৭ ব্যাংকে
সদ্য বিদায়ী ডিসেম্বর মাসে মোট ৩২২ কোটি ৬৬ লাখ ৯০ হাজার ডলারের রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন বিভিন্ন দেশে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিরা। তবে এ সময়ে দেশি-বিদেশি ৭ ব্যাংকের মাধ্যমে কোনো রেমিট্যান্স আসেনি। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ডিসেম্বরে ৩২২ কোটি ৬৬ লাখ ৯০ হাজার ডলার এসেছে। এর মধ্যে রাষ্ট্র মালিকানাধীন ব্যাংকের মাধ্যমে এসেছে ৫৭ কোটি ২৩ লাখ ৬০ হাজার ডলার। বিশেষায়িত দুই ব্যাংকের মধ্যে এক ব্যাংকের (কৃষি ব্যাংক) মাধ্যমে এসেছে ৩৫ কোটি ৩৫ লাখ ২০ হাজার ডলার। বেসরকারি ব্যাংকের মাধ্যমে এসেছে ২২৯ কোটি ৩৯ লাখ ৪০ হাজার ডলার এবং বিদেশি ব্যাংকের মাধ্যমে এসেছে ৬৮ লাখ ৯০ হাজার ডলারের রেমিট্যান্স।
তবে আলোচিত সময়ে ৭ ব্যাংকের মাধ্যমে কোনো রেমিট্যান্স আসেনি। এসব ব্যাংকের মধ্যে রয়েছে রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক (রাকাব)। বেসরকারি ব্যাংকের মধ্যে রয়েছে আইসিবি ইসলামী ব্যাংক ও পদ্মা ব্যাংক। বিদেশি ব্যাংকের মধ্যে রয়েছে ব্যাংক আল-ফালাহ, হাবিব ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান এবং স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে মাসভিত্তিক রেমিট্যান্স এসেছে—জুলাইয়ে ২৪৭ কোটি ৭৮ লাখ ডলার, আগস্টে ২৪২ কোটি ১৯ লাখ ডলার, সেপ্টেম্বরে ২৬৮ কোটি ৫৮ লাখ ডলার, অক্টোবরে ২৫৬ কোটি ৩৫ লাখ ডলার, নভেম্বরে ২৮৮ কোটি ৯৫ লাখ ডলার এবং ডিসেম্বরে ৩২২ কোটি ৬৬ লাখ ডলার।
প্রসঙ্গত, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের মার্চ মাসে সর্বোচ্চ ৩২৯ কোটি ডলারের রেমিট্যান্স এসেছিল, যা ছিল ওই অর্থবছরের রেকর্ড। পুরো অর্থবছরে মোট রেমিট্যান্সের পরিমাণ দাঁড়ায় ৩০ দশমিক ৩৩ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ২৬ দশমিক ৮ শতাংশ বেশি।
অর্থনীতি
মার্কিন বাণিজ্যিক চুক্তি জ্বালানি আমদানিতে বড় বাধা: দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য
অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক চুক্তি জ্বালানি আমদানির ক্ষেত্রে হরমুজ প্রণালির চেয়েও বড় প্রতিবন্ধক বলে মন্তব্য করেছেন অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।
শনিবার রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন। এ সময় তিনি জ্বালানি খাতে দীর্ঘদিনের নীতিগত দুর্বলতার সমালোচনা করে বলেন, দেশে নতুন জ্বালানি অনুসন্ধান হয়নি, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্সকে যথাযথভাবে শক্তিশালী করা হয়নি। ফলে আমদানি নির্ভরতা বেড়েছে, যদিও বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেও তা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় গ্রীন এনার্জির দিকে ধীরে ধীরে এগোনোর পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, এর প্রতিফলন আগামী জাতীয় বাজেটে থাকতে হবে। একই সঙ্গে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে কার্যকর পরিকল্পনার ওপর জোর দেন তিনি।
ড. ভট্টাচার্য আরও বলেন, বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা এখন অর্থনীতির পাশাপাশি জ্বালানি খাতেও বড় প্রভাব ফেলছে। প্রয়োজনীয় সংস্কার না হওয়ায় আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ভবিষ্যতে ঋণ সহায়তা নাও দিতে পারে। বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের অতিরিক্ত ২ থেকে ৩ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন হতে পারে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
কর ব্যবস্থার বিষয়ে তিনি বলেন, করের হার কমিয়ে করদাতার সংখ্যা বাড়াতে হবে এবং করের বিপরীতে নাগরিক সেবা নিশ্চিত করতে হবে। সরকারের ঘোষিত অঙ্গীকার বাস্তবায়নের ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
এ ছাড়া জ্বালানি খাতে গঠিত কেবিনেট সাব-কমিটির কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। বলেন, এসব কমিটির কার্যক্রম ও উদ্যোগ জনসমক্ষে তুলে ধরা প্রয়োজন।
আগামী বাজেটে জ্বালানি খাতে অগ্রাধিকার দিয়ে কাঠামোগত পরিবর্তনের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, বাপেক্সকে আরও সক্রিয় করতে হবে এবং সমুদ্র এলাকায় জ্বালানি অনুসন্ধান শুরু করা জরুরি। পাশাপাশি জ্বালানি ভর্তুকি পুনর্বিবেচনা ও সাশ্রয়ী দামে আমদানির দিকেও গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
অর্থনীতি
আজকের স্বর্ণ ও রুপার বাজারদর
সবশেষ সমন্বয়ে দেশের বাজারে বাড়ানো হয়েছে স্বর্ণ ও রুপার দাম। বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বাজুস) সর্বশেষ সমন্বয়ের পর শনিবার (১৮ এপ্রিল) নতুন দামে বিক্রি হচ্ছে এই দুই মূল্যবান ধাতু।
সবশেষ বুধবার (১৫ এপ্রিল) সকালে দেওয়া এক বিজ্ঞপ্তিতে স্বর্ণ ও রুপার দাম বাড়িয়েছিল বাজুস। সেদিন ভরিতে মূল্যবান এই ধাতু দুটির দাম যথাক্রমে ২ হাজার ২১৬ ও ৩৫০ টাকা বাড়ানো হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, স্থানীয় বাজারে তেজাবি স্বর্ণ ও রুপার (পিওর গোল্ড ও সিলভার) মূল্য বেড়েছে। ফলে সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় স্বর্ণ ও রুপার নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে। বুধবার সকাল ১০টা থেকেই নতুন দাম কার্যকর হয়েছে।
বাজুসের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, দেশের বাজারে প্রতি ভরি (১১.৬৬৪ গ্রাম) ২২ ক্যারেটের স্বর্ণের দাম পড়ছে ২ লাখ ৫০ হাজার ১৯৩ টাকা। এছাড়া ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি ২ লাখ ৩৮ হাজার ৮২০ টাকা, ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরি ২ লাখ ৪ হাজার ৭০৩ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি স্বর্ণ ১ লাখ ৬৬ হাজার ৭৩৭ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
এর আগে, সবশেষ গত ৯ এপ্রিল সকালে দেশের বাজারে স্বর্ণের দাম সমন্বয় করেছিল বাজুস। তখন ভরিতে ৪ হাজার ৪৩২ টাকা কমিয়ে ২২ ক্যারেটের এক ভরি স্বর্ণের দাম ২ লাখ ৪৭ হাজার ৯৭৭ টাকা নির্ধারণ করেছিল সংগঠনটি।
এছাড়া ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি ২ লাখ ৩৬ হাজার ৭২১ টাকা, ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরি ২ লাখ ২ হাজার ৮৯৫ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম ১ লাখ ৬৫ হাজার ২৭৯ টাকা নির্ধারণ করা হয়, যা কার্যকর হয়েছিল সেদিন সকাল ১০টা থেকেই।
অর্থনীতি
ইইউ-যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ডেনিম রপ্তানিতে শীর্ষে বাংলাদেশ
জিনস রপ্তানি শুরুর চার দশক পর বর্তমানে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ডেনিম পোশাক রপ্তানিতে শীর্ষস্থান বাংলাদেশের দখলে। কয়েক বছর আগেই বাংলাদেশ এই সাফল্যের মুকুট অর্জন করেছে। প্রতি বছরই ডেনিম পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী হচ্ছে।
সর্বশেষ তথ্যে দেখা গেছে, গত বছর এই দুই বৃহৎ বাজারে বাংলাদেশ প্রায় ২৬০ কোটি মার্কিন ডলারের ডেনিম পোশাক রপ্তানি করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২৫ শতাংশ বেশি।
ইউএস ডিপার্টমেন্ট অব কমার্সের আওতাধীন অফিস অব টেক্সটাইল অ্যান্ড অ্যাপারেল (অটেক্সা) ও ইউরোস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের ডেনিম রপ্তানি দাঁড়িয়েছে ৯৬ কোটি ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ৩৪ শতাংশ বেশি। দেশটিতে ডেনিম রপ্তানিতে প্রায় ২৬ শতাংশ বাজার হিস্যা নিয়ে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। একই সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে রপ্তানি হয়েছে ১৬৪ কোটি ডলার, যেখানে প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ২১ শতাংশ। ইইউ বাজারেও বাংলাদেশ শীর্ষ রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে অবস্থান ধরে রেখেছে।
বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশকে অনুসরণ করছে মেক্সিকো, ভিয়েতনাম, পাকিস্তান, তুরস্ক ও কম্বোডিয়ার মতো দেশগুলো। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে মেক্সিকো দ্বিতীয় অবস্থানে থেকে ৬৪ কোটি ডলারের ডেনিম রপ্তানি করেছে। অন্যদিকে ভিয়েতনাম ও পাকিস্তান উভয়ই প্রায় ৫০ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। ইইউ বাজারে বাংলাদেশের পরেই রয়েছে পাকিস্তান, যারা ১০৩ কোটি ডলারের ডেনিম রপ্তানি করেছে। এছাড়া তুরস্ক, তিউনিসিয়া ও চীনও এই বাজারে উল্লেখযোগ্য অবস্থানে রয়েছে।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে ডেনিম শিল্পের বিকাশে গত দেড় দশকে ব্যাপক বিনিয়োগ হয়েছে। একসময় যেখানে দেশে ডেনিম কাপড় উৎপাদনকারী মিলের সংখ্যা ছিল ১০-১২টি, বর্তমানে তা বেড়ে প্রায় ৫০টির কাছাকাছি পৌঁছেছে। এখন দেশীয় মিলগুলোই মোট চাহিদার প্রায় ৬০ শতাংশ ডেনিম কাপড় সরবরাহ করছে, যা আগে আমদানিনির্ভর ছিল।
এছাড়া উৎপাদন ব্যয় তুলনামূলক কম হওয়াও বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়িয়েছে। গ্যাস ও পানির মতো গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল সাশ্রয়ী মূল্যে পাওয়া যায়। পাশাপাশি বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে চীন থেকে ক্রয়াদেশ সরেও বাংলাদেশে আসছে, যা রপ্তানি বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
ঢাকায় নিয়মিত আন্তর্জাতিক ডেনিম প্রদর্শনী আয়োজনের মাধ্যমেও বিদেশি ক্রেতাদের সঙ্গে স্থানীয় উদ্যোক্তাদের যোগাযোগ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে দেশের ডেনিম শিল্প আন্তর্জাতিক বাজারে আরও পরিচিতি পেয়েছে। উদ্যোক্তাদের মতে, আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ওয়াশিং প্ল্যান্ট ও উৎপাদন সুবিধা বাড়ায় পণ্যের মানও উন্নত হয়েছে।
অর্থনীতি
আইএমএফের ঋণের কিস্তিতে আবারও ছাড়ের আশা অর্থমন্ত্রীর
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণের পরবর্তী কিস্তি ছাড়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
তিনি জানিয়েছেন, কিছু শর্ত পূরণে বাংলাদেশ পিছিয়ে থাকলেও আগামী ১৫ দিনের মধ্যেই সেগুলো সমাধান করা সম্ভব হবে।
শুক্রবার (১৭ এপ্রিল) যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসিতে আইএমএফ সদর দপ্তরে অর্থমন্ত্রীর নেতৃত্বে বাংলাদেশ মিশনের সঙ্গে সংস্থাটির দুটি দলের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের তিনি এ তথ্য জানান।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ব্যাংক খাতের সংস্কার, নতুন ব্যাংক রেগুলেশন আইন এবং রাজস্ব আদায়ের ধীরগতির কারণে ঋণের কিস্তি স্থগিত করা হয়েছে এমন তথ্য সঠিক নয়।
জানা গেছে, আইএমএফের প্রতিশ্রুত ৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের ঋণ কর্মসূচির আওতায় এখনও ১ দশমিক ৮৬ বিলিয়ন ডলার বাকি রয়েছে। এর মধ্যে চলতি অর্থবছরের জুনের মধ্যে ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার ছাড় পাওয়ার আশা করছে সরকার।
তবে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, আইএমএফের শর্ত বাস্তবায়নে ধীরগতির কারণে ঋণ ছাড়ে জটিলতা তৈরি হতে পারে।
উল্লেখ্য, ২০২৩ সালে আইএমএফের সঙ্গে ৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের ঋণচুক্তি করে বাংলাদেশ। একই বছরের ২ ফেব্রুয়ারি প্রথম কিস্তির ৪৭ কোটি ৬৩ লাখ ডলার, ডিসেম্বরে দ্বিতীয় কিস্তির ৬৮ কোটি ১০ লাখ ডলার এবং ২০২৪ সালের জুনে তৃতীয় কিস্তির ১১৫ কোটি ডলার ছাড় করা হয়।
পরবর্তীতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ঋণের মেয়াদ ৬ মাস বাড়ানো হয় এবং অতিরিক্ত ৮০০ মিলিয়ন ডলার যুক্ত হওয়ায় মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার। ২০২৫ সালের ২৬ জুন চতুর্থ ও পঞ্চম কিস্তির ১৩৪ কোটি ডলার পায় বাংলাদেশ।
গত ডিসেম্বরেও একটি কিস্তি ছাড়ের কথা থাকলেও নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে আলোচনা ছাড়াই অর্থ ছাড়ে আপত্তি জানিয়ে তা স্থগিত রাখে আইএমএফ।
ফলে ডিসেম্বরের বকেয়া কিস্তি এবং আগামী জুনের কিস্তি মিলিয়ে ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার পাওয়ার বিষয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
অর্থনীতি
সংস্কারে ব্যর্থতা: ঋণের পরবর্তী কিস্তি স্থগিত করেছে আইএমএফ
রাজস্ব ও ব্যাংকিং খাতে সংস্কার বাস্তবায়নে ব্যর্থতার কারণ দেখিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে বিদ্যমান ঋণ কর্মসূচির পরবর্তী কিস্তি স্থগিত করেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। জুনের মধ্যে এই কিস্তি ছাড় করার কথা থাকলেও সংস্থাটি এখন অতিরিক্ত শর্তসহ একটি নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা শুরু করার প্রস্তাব দিয়েছে।
ওয়াশিংটন ডিসিতে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বসন্তকালীন বৈঠকে অংশ নেওয়া বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের এক সদস্য এ তথ্য জানিয়েছেন। প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
ওই কর্মকর্তা বলেন, গত দু’দিনের বৈঠকে এমন কথা জানিয়েছে সংস্থাটি। এ অবস্থায় চলমান ৫.৫ বিলিয়ন ডলারের ঋণ কর্মসূচির আওতায় চলতি অর্থবছরের জুনের মধ্যে ১.৩ বিলিয়ন ডলার পাওয়ার যে আশা করছে বাংলাদেশ, তা জুনের মধ্যে ছাড় করা হবে না বলে বাংলাদেশকে নিশ্চিত করেছে সংস্থাটি।
বর্তমান কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশ এখনো মোট ১.৮৬ বিলিয়ন ডলার পাবে, যার মেয়াদ আগামী জানুয়ারিতে শেষ হবে।
”আইএমএফ আমাদের বলেছে, ঋণ চুক্তির আওতায় রাজস্বখাত সংস্কার, ব্যাংকখাত সংস্কার, বিদ্যুৎ ও জ্বালানিতে ভর্তুকি প্রত্যাহার, বাজারভিত্তিক বিনিময় হার নিশ্চিত করাসহ যেসব শর্ত ছিল, বাংলাদেশ সেগুলো বাস্তবায়ন করেনি। এ অবস্থায়, চলমান ঋণচুক্তির বাস্তবায়ন পরিস্থিতি রিভিউ (পর্যালোচনা) না করে ঋণের কিস্তি ছাড় করার ব্যাপারে তারা আগ্রহী নয়। আর রিভিউ করার ক্ষেত্রেও সংস্থাটি অনেক সময়ক্ষেপণ করবে বলে আলোচনায় স্পষ্ট হয়েছে” –বলেন ওই কর্মকর্তা।
তিনি আরও বলেন, “বাংলাদেশ যদি সব শর্ত পূরণের প্রতিশ্রুতি দিয়ে বর্তমান কর্মসূচি চালিয়ে যেতে চায়, তবুও কোনো অর্থ ছাড় সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিলম্বিত হতে পারে। আইএমএফ বর্তমান ব্যবস্থার পরিবর্তে সংশোধিত শর্তে নতুন ঋণ দিতে বেশি আগ্রহী বলে মনে হয়েছে।”
এছাড়া সম্প্রতি সংসদে পাস হওয়া ব্যাংক রেজ্যুলেশন বিলে সরকার ১৮ক ধারা যুক্ত করে রেজ্যুলেশনের জন্য তালিকাভুক্ত করা ব্যাংকগুলো পুরনো মালিকদের ফিরে আসার সুযোগ দেওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আইএমএফ।
সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকের আমানতকারীদের ক্ষতিপূরণ দিতে বাজেটের অর্থ ব্যবহারের সরকারি পরিকল্পনারও সমালোচনা করেছে সংস্থাটি। তাদের মতে, আমানতকারীদের পাওনা মেটাতে বাজেট থেকে অর্থ খরচ না করে—ডিপোজিট ইন্স্যুরেন্স স্কিম বা অন্য কোনো ব্যবস্থার মাধ্যমে দেওয়া উচিত।
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়ে গেছে। এই প্রেক্ষাপটে, জ্বালানি আমদানির উচ্চ ব্যয় মেটাতে বাংলাদেশ আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক এবং অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীদের কাছে অতিরিক্ত অর্থ সহায়তা চেয়েছে।
তবে বর্তমান কর্মসূচি নিয়ে আইএমএফের কঠোর অবস্থানের কারণে ওয়াশিংটনে অবস্থানরত বাংলাদেশ প্রতিনিধি দল তুলনামূলক সহজ শর্তে অতিরিক্ত অর্থায়নের সম্ভাবনা নিয়ে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গেও আলোচনা করছে।
গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত গত শেখ হাসিনা সরকারের সময় ২০২৩ সালে আইএমএফ এর সঙ্গে ৪.৭ বিলিয়ন ডলারের ঋণচুক্তি সই করে বাংলাদেশ। অন্তবর্তীকালীন সরকারের সময় ঋণের পরিমাণ আরও ৮০০ মিলিয়ন ডলার বাড়ানো হয়। ফলে ঋণ কর্মসূচির মোট আকার দাঁড়ায় ৫.৫ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্য থেকে বাংলাদেশকে মোট ৩.৬৪ বিলিয়ন ডলার ঋণের অর্থ ছাড় করেছে আইএমএফ।
গত ডিসেম্বরে আরেকটি কিস্তি পাওয়ার কথা থাকলেও—নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে আলোচনা না করে ঋণের অর্থ ছাড় করার ব্যাপারে আপত্তি জানিয়ে তা আটকে রাখে সংস্থাটি। ডিসেম্বরের বকেয়া কিস্তির সঙ্গে আগামী জুনের একটি কিস্তি মিলিয়ে জুন মাসেই ১.৩ বিলিয়ন ডলার পাওয়ার আশা করেছিল বাংলাদেশ।
তবে গত মাসে বাংলাদেশ সফরে এসে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদের সঙ্গে বৈঠক করে আইএমএফ-এর উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধিদল জুনে কিস্তি ছাড়ের বিষয়ে কোনো নিশ্চয়তা দেয়নি।
গতকাল ওয়াশিংটনে এক সংবাদ সম্মেলনে আইএমএফের এশিয়া ও প্যাসিফিক বিভাগের পরিচালক কৃষ্ণ শ্রীনিবাসন বলেন, তিনি সাম্প্রতিক বৈঠকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও অর্থমন্ত্রী আমির খসরুর সঙ্গে বড় ধরনের সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা করেছেন।
তিনি বলেন, “দেশটি যে চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে তা নিয়ে আমাদের মধ্যে ভালো আলোচনা হয়েছে। আমরা উল্লেখ করেছি, শক্তিশালী সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে নতুন সরকার ক্ষমতায় থাকায় এখনই উচ্চাকাঙ্ক্ষী সংস্কারের পদক্ষেপ গ্রহণের উপযুক্ত সময়। তারা আমাদের কথা শুনেছেন, এখন আমরা দেখব তারা কীভাবে সাড়া দেন।”
শ্রীনিবাসন বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের রাজস্ব আদায় পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে এবং দেশটির অর্থনৈতিক চাহিদা পূরণে যেটুকু প্রয়োজন তার চেয়েও অনেক নিচের স্তরে রয়েছে।
তিনি বলেন, “রাজস্ব আহরণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের পারফরম্যান্স ভালো নয়। এটি কম এবং গত তিন বছরে আরও কমেছে। রাজস্ব খাত, আর্থিক খাতের পুনর্বাসন এবং বিনিময় হার সংস্কারসহ আর্থিক ক্ষেত্রে বড় ধরনের সংস্কার প্রয়োজন।”
তিনি আরও জানান, আইএমএফ সমর্থিত ঋণ কর্মসূচির তিনটি মূল ভিত্তিতেই এখনো উল্লেখযোগ্য কাজ বাকি রয়েছে।
শ্রীনিবাসন বলেন, আইএমএফ-এর টিম বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে এবং পরবর্তীতে এ বিষয়ে হালনাগাদ তথ্য জানানো হবে।
অর্থনীতিবিদরা বলেন, ঋণ কর্মসূচি অনুমোদনের সময় আইএমএফ বাংলাদেশকে কর অব্যাহতি সুবিধা কমানোসহ বিস্তৃত সংস্কারের মাধ্যমে জিডিপির অনুপাতে রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর শর্ত দিয়েছিল। কিন্তু বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাতই উল্টো কমেছে।
তারা আরও বলেন, ব্যাংকিংখাতে কাগজে-কলমে কিছু উদ্যোগ নেওয়া হলেও কাঙ্ক্ষিত সংস্কার হয়নি। এমনকী মুদ্রার বিনিময় হার বাজারভিত্তিক করার কথা বলা হলেও—বর্তমানে বাংলাদেশে বাজারভিত্তিক বিনিময় হার কার্যকর নয় বলে মনে করে আইএমএফ।
ঋণচুক্তি করার সময় ২০২৬ সালের মধ্যে গ্যাস ও বিদ্যুৎখাতে ভর্তুকি পুরোপুরি প্রত্যাহার করার অঙ্গীকার করেছিল বাংলাদেশ। এ শর্ত বাস্তবায়নে আওয়ামী লীগ সরকার কয়েকদফা গ্যাস বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর পর, প্রতি তিন মাস অন্তর অন্তর দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। তবে অন্তবর্তীকালীন সরকারের ১৮ মাসের মেয়াদে গ্যাস বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়নি।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন টিবিএসকে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আইএমএফের শর্ত বাস্তবায়নের উদ্যোগ পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়ে।
তিনি বলেন, “ব্যাংক খাতে কিছু সংস্কার উদ্যোগ নেওয়া হলেও বাস্তবায়নের দায়িত্ব নির্বাচিত সরকারের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়। রাজস্ব খাতে কোনো সংস্কার হয়নি এবং পর্যায়ক্রমে ভর্তুকি কমানোরও কোনো প্রচেষ্টা ছিল না। এ কারণেই আইএমএফ বর্তমান ঋণ কর্মসূচিতে অসন্তুষ্ট এবং এখন এটি থেকে পিছিয়ে যাচ্ছে।”
ড. ফাহমিদার মতে, আইএমএফ কর্মসূচির শেষ কিস্তিগুলো পর্যালোচনার আগে সরকারের সামনে দুটি পথ খোলা রয়েছে। “হয় সরকার আইএমএফের সব শর্ত মেনে কর্মসূচি চালিয়ে যাবে, অথবা শর্ত প্রত্যাখ্যান করে চুক্তি থেকে সরে আসবে।”
তিনি আরও বলেন, জ্বালানি আমদানির বাড়তি ব্যয় মেটানো এবং নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের জন্য সরকারের জরুরি অর্থ প্রয়োজন, তবে জানুয়ারির মধ্যে সব শর্ত পূরণ করা কঠিন হবে।
তার মতে, সরকার চাইলে প্রধান শর্তগুলো বাস্তবায়ন শুরু করে ভবিষ্যতে সংস্কার চালিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতে বাকি অর্থ ছাড়ের জন্য আলোচনা করতে পারে।
অর্থ বিভাগের সাবেক সিনিয়র সচিব মাহবুব আহমেদ বলেন, আইএমএফ কর্মসূচির পুরো অর্থ তুলতে ব্যর্থ হলে বাংলাদেশের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
তবে তিনি বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ও জ্বালানি পরিস্থিতিতে আইএমএফের সব শর্ত পূরণ করা সরকারের জন্য কঠিন হবে।
মাহবুবের মতে, অতীতে আন্তর্জাতিক ঋণদাতাদের সঙ্গে করা একাধিক চুক্তির চূড়ান্ত কিস্তিগুলোও বাংলাদেশ পায়নি, কারণ প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ করা সম্ভব হয়নি। তিনি উল্লেখ করেন, অতীতে আইএমএফের মাত্র একটি কর্মসূচির পুরো অর্থ বাংলাদেশ তুলতে পেরেছিল—২০১২ সালে স্বাক্ষরিত ১ বিলিয়ন ডলারের একটি চুক্তির।



