মত দ্বিমত
ব্যক্তির আগে দল, দলের আগে দেশ
ব্যক্তির আগে দল, দলের আগে দেশ। যদি এই কথাটি সত্যিই আমাদের মনের কথা হয়, তবে এখনই সময় নিজের দিকে তাকানোর। চাঁদাবাজ, সন্ত্রাসী, দুর্নীতিবাজ, মিথ্যাবাদী এবং অশিক্ষিত ধান্দাবাজদের মনোনয়ন দিয়ে দেশকে আর বিপদের দিকে ঠেলে দেওয়া যাবে না। রাজনীতি আজ ব্যবসা হয়ে গেছে, ক্ষমতা মানে এখন লুটপাটের প্রতিযোগিতা। অথচ দেশের মানুষ আরেকটা সুযোগ চায়— এমন নেতৃত্বের, যারা দেশকে ভালোবাসে, কাজ জানে, মিথ্যা প্রতিশ্রুতি নয়, ফলাফল দিতে পারে।
আজ আমাদের প্রয়োজন দক্ষ, সুশিক্ষিত, প্রভাবশালী এবং আন্তর্জাতিক মানসচেতন কর্মী-নেতা, যারা নিজের কর্মদক্ষতা ও সততা দিয়ে সমাজের উন্নয়ন করবে, নাগরিকদের উপর বোঝা হবে না। দেশ ভালো থাকলে দলও ভালো থাকবে; আর দল ভালো থাকলে ব্যক্তিও সম্মান পাবে— এটাই রাষ্ট্রচিন্তার প্রকৃত পথ। বাংলাদেশের অর্থনীতি আজ পরিসংখ্যানের খেলা। জিডিপি-র হার, রপ্তানির অঙ্ক, রেমিট্যান্স— সবকিছু শুনতে ভালো লাগে, কিন্তু গ্রামে গিয়ে দেখা যায় বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। চাকরি নেই, দ্রব্যমূল্য বেড়েছে, ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ভয়াবহ।
এখন দরকার দক্ষতা-ভিত্তিক অর্থনীতি। যেখানে তরুণরা হবে উৎপাদনের চালিকাশক্তি, যেখানে বিদেশে শ্রম পাঠানোর বদলে দেশেই কাজের সুযোগ সৃষ্টি হবে। সরকারি প্রকল্পে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে, ব্যাংক লুটেরাদের বিচার করতে হবে, এবং উদ্যোক্তাদের প্রকৃত উৎসাহ দিতে হবে— তবেই অর্থনীতি হবে স্থিতিশীল, আত্মনির্ভর ও টেকসই।
শিক্ষা আজ পেশা নয়, প্রতিযোগিতা। স্কুল-কলেজে মুখস্থবিদ্যা, বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনীতিকরণ, শিক্ষকতার পেশায় অবমূল্যায়ন— এভাবে কোনো জাতি আলোকিত হয় না। আজ আমাদের দরকার এমন শিক্ষা যা চিন্তা করতে শেখায়, প্রশ্ন করতে শেখায়, মানুষ হতে শেখায়। প্রত্যেক ছাত্রকে বাস্তবজ্ঞান ও নৈতিকতার শিক্ষা দিতে হবে। শিক্ষককে রাজনীতির চাপ থেকে মুক্ত রাখতে হবে। গবেষণা, উদ্ভাবন ও প্রযুক্তিকে জাতীয় উন্নয়নের মূল কৌশল হিসেবে ধরতে হবে। শিক্ষাকে মানবিক ও মুক্তচিন্তার চর্চার জায়গায় ফিরিয়ে আনা ছাড়া জাতির অগ্রগতি সম্ভব নয়। যে দেশ নিজের সংস্কৃতি হারায়, সে দেশ নিজের আত্মাকে হারায়।
আজকের বাংলাদেশে সংস্কৃতি রাজনীতির যন্ত্র হয়ে গেছে। সংগীত, নাটক, সাহিত্য, চলচ্চিত্র—সবখানেই বিভাজন। এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে এসে রাষ্ট্রকে সংস্কৃতির পুনর্জাগরণের কাজ হাতে নিতে হবে। সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনীতি থেকে মুক্ত করতে হবে, শিল্পীদের মর্যাদা ফিরিয়ে দিতে হবে। কারণ সংস্কৃতি শুধু বিনোদন নয়— এটি জাতির বিবেক, সহনশীলতা ও মানবিকতার মূলভিত্তি। বাংলাদেশে এখন অসুস্থ মানুষ নয়, স্বাস্থ্যব্যবস্থাই অসুস্থ। সরকারি হাসপাতালগুলিতে ওষুধ নেই, বেসরকারি হাসপাতালে খরচ অসহনীয়। মানুষ চিকিৎসা নয়, মর্যাদা হারাচ্ছে।
এখন সময় এসেছে জনসেবা ভিত্তিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ার— যেখানে প্রতিটি ইউনিয়নে থাকবে নার্স-নেতৃত্বাধীন ক্লিনিক, টেলেমেডিসিন, মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা, এবং ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণে সুনির্দিষ্ট নীতি। স্বাস্থ্যসেবা হবে মানবিক—এটাই নাগরিক রাষ্ট্রের পরিচয়। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি এখন তরুণ প্রজন্ম, আবার সবচেয়ে বড় ঝুঁকিও তারা। প্রতিদিন হাজার হাজার শিক্ষিত তরুণ কর্মহীন হয়ে পড়ছে। তারা যদি নিজের প্রতিভা ও শক্তি কাজে লাগাতে না পারে, তবে হতাশা সমাজে বিস্ফোরণ ঘটাবে। এখন সময় দক্ষতা-কেন্দ্রিক কর্মসংস্থানের। প্রতিটি জেলায় টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টার, ভোকেশনাল শিক্ষা, উদ্যোক্তা উন্নয়ন ও স্থানীয় শিল্প পুনরুজ্জীবনের কর্মসূচি নিতে হবে।
দেশে কাজের সুযোগ তৈরি করতে পারলে কেউ আর বিদেশে শ্রম বিক্রি করতে যাবে না— তখন বাংলাদেশ সত্যিকারের শক্তিশালী রাষ্ট্রে পরিণত হবে। দুর্নীতি এখন কেবল অর্থনৈতিক নয়, এটি নৈতিক মহামারী।
দুর্নীতিবাজ রাজনীতিকরা রাষ্ট্রযন্ত্র দখল করে রেখেছে, আর সাধারণ মানুষ প্রতিদিন মর্যাদাহানির শিকার হচ্ছে। এই দুষ্টচক্র ভাঙতে হলে দরকার রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও জনগণের অংশগ্রহণ। মনোনয়ন দেওয়ার আগে শিক্ষা, সততা ও সামাজিক অবদান যাচাই বাধ্যতামূলক করতে হবে। দ্রুত বিচারব্যবস্থা চালু করতে হবে, দুর্নীতির মামলায় দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।
প্রতিটি সরকারি প্রকল্পের অডিট রিপোর্ট জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে। জবাবদিহিতা ছাড়া উন্নয়ন কাগজে সীমাবদ্ধ থাকবে— বাস্তবে নয়। এখন সময় নতুন রাজনৈতিক চিন্তার— যেখানে ক্ষমতার কেন্দ্র মানুষ, দলের নয়; যেখানে নেতৃত্ব মানে সেবা, শাসন নয়। মনোনয়ন দিতে হবে সেইসব মানুষকে যারা রাজনীতি নয়, কর্ম দিয়ে দেশ গড়তে চায়। যাদের হাতে দেশের ভবিষ্যৎ নিরাপদ, যাদের মস্তিষ্কে পরিকল্পনা, আর হৃদয়ে দেশপ্রেম।
অ্যাওনেক্স: ব্ল্যাকবক্স মনিটরিং— দেশ ও নেতৃত্বের জবাবদিহির নতুন দিগন্ত
আজকের বিশ্বে প্রযুক্তি শুধু আমাদের জীবনকেই সহজ করেনি, রাষ্ট্র পরিচালনাকেও দিয়েছে নতুন দৃষ্টিকোণ। রাজনীতিতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি আনতে এখন দরকার এক নতুন ধরনের নজরদারি ব্যবস্থা — যেখানে ক্ষমতা মানে দায়িত্ব, আর নেতৃত্ব মানে নাগরিক আস্থার প্রতিশ্রুতি। এই উদ্দেশ্যেই প্রস্তাব করা হচ্ছে “মেমোরিবল আর্কাইভ ও ডিজিটাল ব্ল্যাকবক্স সিস্টেম”—একটি প্রযুক্তিনির্ভর মনিটরিং ব্যবস্থা, যা প্রতিটি নির্বাচিত প্রতিনিধির কাজ, সিদ্ধান্ত ও জনসম্পৃক্ততা নথিবদ্ধ রাখবে তাদের দায়িত্বকাল জুড়ে। যেমন বিমানের ব্ল্যাকবক্স যাত্রীদের নিরাপত্তার নীরব সাক্ষী, তেমনি রাষ্ট্রের ব্ল্যাকবক্স হবে জনগণের বিশ্বাসের রক্ষক।
১. উদ্দেশ্য ও সারমর্ম
এই ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হলো রাজনীতিকে স্বচ্ছ ও নাগরিকমুখী করা। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি কীভাবে কাজ করছেন, কোথায় ভুল হচ্ছে, কোথায় সাফল্য—সব কিছু নিরপেক্ষভাবে সংরক্ষিত থাকবে এই ব্ল্যাকবক্সে। এটি হবে একধরনের “নৈতিক আয়না”, যাতে জনগণ দেখতে পাবে তাদের প্রতিনিধি সত্যিই জনগণের সেবায় নিয়োজিত কি না।
২. ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন
প্রথম পর্যায়ে কয়েকটি জেলা বেছে নিয়ে পরীক্ষামূলকভাবে শুরু করা হবে। রাজনীতিবিদ, বিশেষজ্ঞ ও সাধারণ নাগরিকদের অংশগ্রহণে এই প্রকল্পের ফলাফল দেখা হবে। এরপর ধীরে ধীরে পুরো দেশজুড়ে বিস্তৃত হবে। এটি কোনো দমননীতি নয়, বরং সহযোগিতার উদ্যোগ—যাতে ভালো রাজনীতিবিদদের মর্যাদা আরও বাড়ে, আর দুর্নীতি বা অপব্যবহার রোধ করা যায় প্রমাণসহ।
৩. প্রযুক্তি সহজভাবে
এই ব্ল্যাকবক্স একধরনের সুরক্ষিত ডিজিটাল লগবুকের মতো। রাজনীতিবিদের কাজের নথি, সরকারি প্রকল্প, অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত, জনসেবা কার্যক্রম ইত্যাদি এখানে সংরক্ষিত থাকবে। সব তথ্য থাকবে নিরাপদ ও পরিবর্তন-অযোগ্য। কেবল অনুমোদিত সংস্থা ও আদালত প্রয়োজনে এসব তথ্য দেখতে পারবে। জনগণের জন্য থাকবে একটি সাধারণ অনলাইন পোর্টাল—যেখানে তারা দেখতে পারবে তাদের এলাকার জনপ্রতিনিধির কার্যক্রমের সারসংক্ষেপ।
৪. তথ্যের নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা
প্রত্যেকটি তথ্যের উৎস, সময় ও প্রেক্ষাপট সংরক্ষিত থাকবে যেন কেউ মিথ্যা তথ্য যোগ বা বাদ দিতে না পারে। তবে ব্যক্তিগত ও পারিবারিক গোপনীয়তা পুরোপুরি সুরক্ষিত থাকবে—এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য কারও ব্যক্তিগত জীবন উন্মোচন করা নয়, বরং দায়িত্বের সীমারেখায় জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
৫. আইন ও নীতি
এই ব্যবস্থাকে সফল করতে হবে আইনি কাঠামো ও নাগরিক অংশগ্রহণের মাধ্যমে। এজন্য একটি স্বাধীন মনিটরিং কমিশন গঠন করা হবে, যেখানে থাকবে নাগরিক প্রতিনিধি, বিচারিক সদস্য ও প্রযুক্তিবিদরা। যদি কোনো রাজনীতিবিদ দুর্নীতি বা অনৈতিক কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকেন, প্রমাণের ভিত্তিতে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিন্তু কোনো রাজনৈতিক প্রতিহিংসা এই ব্যবস্থার অংশ হবে না।
৬. মূল্যায়ন ও প্রভাব
ছয় মাসের পাইলট প্রকল্প শেষে দেখা হবে—দুর্নীতি কতটা কমেছে, কাজের গতি বেড়েছে কিনা, জনগণের আস্থা কেমন। যদি দেখা যায় সরকারি প্রকল্পে অপচয় কমে, সিদ্ধান্ত গ্রহণে গতি আসে এবং নাগরিক সন্তুষ্টি বৃদ্ধি পায়, তবে সেটিই হবে এই উদ্যোগের প্রকৃত সফলতা।
৭. মানবসম্পদ ও বাজেট
এই প্রকল্পে কাজ করবেন দেশীয় তরুণ প্রযুক্তিবিদ, তথ্য বিশ্লেষক, আইনি বিশেষজ্ঞ ও ফিল্ড অফিসাররা। এর ফলে শুধু রাজনীতির নয়, কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়নেও আসবে নতুন দিগন্ত।
৮. ঝুঁকি ও সমাধান
রাজনৈতিক বাধা বা প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ আসতেই পারে। তাই প্রকল্পের পরিচালনায় সব দলের প্রতিনিধিকে অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি, যেন এটি কোনো দলের নয়—পুরো জাতির উদ্যোগ হয়ে ওঠে। নিয়মিত স্বাধীন অডিট হবে, যাতে নাগরিকের আস্থা অটুট থাকে।
৯. সাফল্যের মাপকাঠি
যদি এই ব্যবস্থার মাধ্যমে সরকারি ব্যয়ের অপচয় অন্তত ৩০% কমে, সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময়সীমা কমে এবং নাগরিক আস্থা সূচক বাড়ে—তবে বোঝা যাবে বাংলাদেশ সত্যিই এক নতুন যুগে প্রবেশ করেছে।
১০. শেষ কথা
এই প্রকল্প শুধু প্রযুক্তি নয়—এটি একটি মানসিক বিপ্লব। যেখানে নেতৃত্ব আর ক্ষমতা নয়, দায়িত্ব। যেখানে নাগরিক কণ্ঠস্বরই রাষ্ট্রের শক্তি। একটি স্মার্ট ব্ল্যাকবক্স হয়তো রাজনীতিবিদের ভুল ঠিক করতে পারবে না, কিন্তু এটুকু নিশ্চয়তা দেবে—ভুল আর চিরদিন গোপন থাকবে না।
রহমান মৃধা, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন। Rahman.Mridha@gmail.com
মত দ্বিমত
ভেনেজুয়েলা শুধু একটি সংকট নয়, নতুন বৈশ্বিক ব্যবস্থায় একটি কৌশলগত চাবিকাঠি
ভেনেজুয়েলা বসবাসের জন্য একটি অসাধারণ দেশ। দেশটির সৌন্দর্য সেখানে পা রাখা প্রত্যেক মানুষকে আকর্ষণ করে। সুউচ্চ আন্দিজ পর্বতমালা, ঝকঝকে ক্যারিবীয় সাগর, বিস্তীর্ণ রেইনফরেস্ট এবং শক্তিশালী জলপ্রপাত ভেনেজুয়েলাকে এক অনন্য ভূখণ্ডে পরিণত করেছে। প্রাকৃতিক সম্পদের দিক থেকে এটি বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ দেশ, যার সম্ভাবনার সঙ্গে খুব কম দেশই তুলনীয়। তেল, খনিজ সম্পদ এবং এমন একটি জলবায়ু যা সারা বিশ্বের মানুষকে টানে, সব মিলিয়ে ভেনেজুয়েলা বৈশ্বিকভাবে একটি আকর্ষণীয় অবস্থানে রয়েছে।
গত এক দশকে ভেনেজুয়েলা গভীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে গেছে। দুর্নীতি, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং বিশৃঙ্খলা সাধারণ মানুষের জীবনে চরম দুর্ভোগ ডেকে এনেছে। একই সঙ্গে এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়েছে বৈশ্বিক শক্তিগুলো। যুক্তরাষ্ট্র তার নিষেধাজ্ঞা, রাজনৈতিক চাপ এবং আঞ্চলিক প্রভাব খাটিয়ে এমনভাবে আচরণ করেছে যেন ভেনেজুয়েলা কার্যত আগেই দখল হয়ে গেছে। এই বাস্তবতায় অনেকের চোখে ভেনেজুয়েলা যে একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র, সেই সত্যটি ঝাপসা হয়ে গেছে।
কিন্তু ভেনেজুয়েলার গুরুত্ব বুঝতে হলে আমাদের প্রচলিত সংকটকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির বাইরে যেতে হবে। দেশটিকে ঘিরে আন্তর্জাতিক আগ্রহ বহুমাত্রিক ও জটিল। চীন ভেনেজুয়েলাকে শক্তি, বিনিয়োগ এবং অবকাঠামো সহযোগিতার একটি কৌশলগত অংশীদার হিসেবে দেখে। চীন বিপুল অঙ্কের ঋণ দিয়েছে এবং তেল আমদানি করছে। জার্মানি এবং ইউরোপের অন্যান্য দেশও স্থিতিশীল জ্বালানি সরবরাহ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার সুযোগ খুঁজছে, বিশেষ করে এমন সময়ে যখন জ্বালানি নিরাপত্তা ইউরোপীয় ইউনিয়নের জন্য একটি কেন্দ্রীয় ইস্যু। এই অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের ভেনেজুয়েলা নীতির সঙ্গে স্পষ্টভাবে বিপরীত।
বর্তমান ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি
আজ ভেনেজুয়েলা একটি ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েনের কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে। বহু বছরের ওঠানামার পর তেলের দাম আবার স্থিতিশীল হতে শুরু করেছে, যা দেশটির জন্য নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি করছে। স্থিতিশীল মূল্য এবং উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে ভেনেজুয়েলা তার অর্থনীতি শক্তিশালী করতে পারে এবং বাইরের শক্তির চাপ মোকাবিলায় বেশি সক্ষম হতে পারে। তবে একই সঙ্গে রাজনৈতিক শাসনব্যবস্থা এখনও নাজুক এবং দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে নতুন করে গড়ে তুলতে হবে।
স্বল্পমেয়াদে ভেনেজুয়েলা যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করবে বলেই মনে হয়। ইউক্রেন যুদ্ধের মতো আন্তর্জাতিক সংঘাতগুলো বৈশ্বিক শক্তির আচরণকে গভীরভাবে প্রভাবিত করছে। যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার জ্বালানি খাতকে সীমিত করতে এবং রুশ তেলের ওপর নির্ভরতা কমাতে মনোযোগ দিয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে ভেনেজুয়েলার বিশাল তেল উৎপাদন ক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। যদি ভেনেজুয়েলা তার তেল অবকাঠামো আধুনিকীকরণ করে উৎপাদন বাড়াতে সক্ষম হয়, তাহলে তা নতুন জোট এবং ক্ষমতার ভারসাম্যে পরিবর্তন আনতে পারে। এতে রাশিয়াও তার জ্বালানি রপ্তানি নতুনভাবে পুনর্বিন্যাস করার সুযোগ পেতে পারে, যখন পশ্চিমা বিশ্ব রুশ অর্থনীতিকে একঘরে করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
প্রবণতা, ছোট রাষ্ট্রগুলো বড় শক্তির চাপে
আজ আমরা একটি বৈশ্বিক প্রবণতা দেখছি যেখানে ছোট রাষ্ট্রগুলো বড় শক্তির স্বার্থের সংঘাতে জড়িয়ে পড়ছে। যুক্তরাষ্ট্র, চীন, জার্মানি এবং ভারত প্রত্যেকে নিজেদের কৌশলগত লক্ষ্য থেকে কাজ করছে। যুক্তরাষ্ট্র পশ্চিম গোলার্ধে নিজের প্রভাব ধরে রাখতে চায়। চীন আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা ও এশিয়ায় বিনিয়োগের মাধ্যমে উপস্থিতি বাড়াচ্ছে। জার্মানি ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন স্থিতিশীল জ্বালানি এবং শিল্প পুনরুদ্ধারের পথ খুঁজছে। ভারত ভারত মহাসাগর ও আফ্রিকায় তার প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে। এই বাস্তবতায় ভেনেজুয়েলার সার্বভৌমত্ব প্রতিনিয়ত বাইরের চাপের মুখে পড়ছে।
ছোট রাষ্ট্রগুলোর জন্য হুমকি শুধু সামরিক নয়। অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং কূটনৈতিক চাপও সমানভাবে কার্যকর। অনেক সময় নিষেধাজ্ঞা অস্ত্রের চেয়েও বেশি ক্ষতিকর হয়ে ওঠে। আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোও রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নীতিনির্ধারণে প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ভেনেজুয়েলা এই ঝড়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু দেশটিকে কেবল একটি ক্ষতবিক্ষত রাষ্ট্র হিসেবে দেখলে চলবে না। এটিকে নতুন বৈশ্বিক ভারসাম্যের একটি সম্ভাবনাময় কৌশলগত কেন্দ্র হিসেবেও দেখতে হবে।
উন্নয়নের কৌশল হিসেবে আকর্ষণ
আকর্ষণীয় হওয়া ভালো। আকর্ষণ মানে শুধু সৌন্দর্য নয়, বরং গুরুত্ব। ধারাবাহিক উন্নয়নের জন্য ভেনেজুয়েলাকে তার আকর্ষণ ধরে রাখতে হবে। এর অর্থ কার্যকর প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, দেশের ভেতরে ও বাইরে আস্থা সৃষ্টি করা এবং এমন সম্পর্ক তৈরি করা যা রাষ্ট্রের আত্মনিয়ন্ত্রণকে শক্তিশালী করে। এমন এক বিশ্বে যেখানে বড় শক্তিগুলো অংশীদারিত্ব, জ্বালানি ও কৌশলগত অবস্থান খুঁজছে, সেখানে আকর্ষণ একটি বড় প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা।
ভেনেজুয়েলা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে অন্যরা তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায় বলে নয়, বরং তারা তার সঙ্গে সহযোগিতা করতে চায় বলে। আসল চ্যালেঞ্জ হলো এই আকর্ষণকে প্রকৃত স্বাধীনতায় রূপান্তর করা। এই বিতর্ক ভেনেজুয়েলা এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গন উভয় জায়গাতেই গুরুত্বের সঙ্গে হওয়া প্রয়োজন।
এখন যদি আমরা বাংলাদেশকে ঘিরে ভাবি, প্রশ্নটি অস্বস্তিকর হলেও অপরিহার্য। শেখ হাসিনা যখন টানা সতেরো বছর প্রকৃত গণতান্ত্রিক জবাবদিহি ছাড়া ক্ষমতায় থাকতে পেরেছেন, তখন কি বাংলাদেশ সত্যিই একটি আকর্ষণীয় দেশ ছিল। রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে আকর্ষণ মানে শুধু বাহ্যিক স্থিতিশীলতা, প্রবৃদ্ধির সংখ্যা বা কাগুজে উন্নয়ন নয়। আন্তর্জাতিক মহল আগ্রহ দেখায় তখনই, যখন একটি দেশের ভূকৌশলগত অবস্থান, প্রাকৃতিক সম্পদ এবং মানুষের সৃজনশীলতা, শ্রম ও জ্ঞানকে মূল্যবান মনে করা হয়। তখন ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, দুর্বল বিচারব্যবস্থা এবং গণতান্ত্রিক ঘাটতি অনেক সময়ই উপেক্ষিত থাকে, যতক্ষণ পর্যন্ত অর্থনৈতিক ও কৌশলগত প্রবাহ ঠিক থাকে।
এটি আন্তর্জাতিক রাজনীতির একটি বিপজ্জনক কিন্তু পুনরাবৃত্ত সত্য। একটি দেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে সেখানে মানুষ কেমন জীবন যাপন করছে তার জন্য নয়, বরং দেশটি কী সরবরাহ করতে পারে তার জন্য। বাংলাদেশ এই বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছিল। সস্তা শ্রম, এশিয়ায় কৌশলগত অবস্থান এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের একটি গ্রহণযোগ্য বয়ান দেশটিকে ব্যবহারযোগ্য করে তুলেছিল। তাই ক্ষমতা কীভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছিল, সে বিষয়ে আন্তর্জাতিক মহলের আগ্রহ সীমিতই ছিল।
কিন্তু প্রকৃত শিক্ষা বাংলাদেশেই শেষ নয়। মর্যাদাহীন আকর্ষণ টেকসই নয়। যে দেশ কেবল তার সম্পদের জন্য আকর্ষণীয়, সে দেশ শেষ পর্যন্ত একটি বিষয়ে পরিণত হয়, একটি সত্তায় নয়। টেকসই আকর্ষণ গড়ে ওঠে তখনই, যখন প্রাকৃতিক সম্পদের সঙ্গে মানুষের মর্যাদা, সৃজনশীল স্বাধীনতা, জ্ঞান ও অধিকার যুক্ত হয়। তখনই একটি দেশ অন্যদের কাছে শুধু গুরুত্বপূর্ণ নয়, নিজের নাগরিকদের জন্যও বাসযোগ্য হয়ে ওঠে।
সেখানেই ভবিষ্যতের রাষ্ট্রগুলোর ভাগ্য নির্ধারিত হয়। কতদিন একজন নেতা ক্ষমতায় থাকলেন তা দিয়ে নয়, বরং রাষ্ট্র তার মূল্যকে কতটা স্বাধীনতায়, তার সম্ভাবনাকে কতটা ন্যায়বিচারে এবং তার আকর্ষণকে কতটা সম্মিলিত জীবন প্রকল্পে রূপ দিতে পারল, সেটিই শেষ পর্যন্ত ইতিহাসে গুরুত্ব পায়।
বাংলায় একটি প্রচলিত কথা আছে “তেলো মাথায় তেল দেওয়া।” এই প্রবাদটি আজকের বৈশ্বিক রাজনীতির জন্য আশ্চর্য রকমের যথাযথ। আজ বিশ্বের প্রায় সব কন্টিনেন্টেই অস্থিরতা, সংঘাত ও সংকট চলছে। যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, শাসন সংকট এবং মানবিক বিপর্যয় নতুন কিছু নয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো বিশ্বের ধনী ও ক্ষমতাধর দেশগুলোর দৃষ্টি কি সব সমস্যার দিকেই সমানভাবে পড়ে? বাস্তবতা হলো না। তাদের নজর তখনই পড়ে, যখন তারা দেখে এই সংকটে আমার লাভ কী।
বাংলাদেশ একটি দরিদ্র দেশ হতে পারে, কিন্তু একেবারেই গুরুত্বহীন নয়। আমাদের ভৌগোলিক অবস্থান আমাদের একটি বড় শক্তি। দক্ষিণ ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থিত বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, সামুদ্রিক যোগাযোগ এবং আঞ্চলিক রাজনীতিতে একটি কৌশলগত সুবিধা বহন করে। এই বাস্তবতা আমাদের জন্য সুযোগও, আবার ঝুঁকিও। তাই বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো সব সময় নিজের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া, দেশের স্বার্থে। কোনো ব্যক্তির ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার স্বার্থে নয়, শেখ হাসিনার মতো দীর্ঘস্থায়ী শাসন নিশ্চিত করার জন্য নয়।
রাজনীতিবিদদের জন্য এখানে বড় একটি শিক্ষার জায়গা আছে। ভেনেজুয়েলার শক্তিশালী নেতৃত্ব কীভাবে আন্তর্জাতিক চাপে একঘরে হয়ে পড়লো, কীভাবে যুক্তরাষ্ট্র ধীরে ধীরে দেশটির রাজনৈতিক পরিসরকে নিয়ন্ত্রণের দিকে নিয়ে গেল, সেগুলো গভীরভাবে বোঝা প্রয়োজন। একইভাবে প্রশ্ন উঠতেই পারে, কেন শেখ হাসিনাকে ভারত আশ্রয় দিল। এর উত্তর আবেগে নয়, কৌশলে। ভারত এটি করেছে বাংলাদেশের গণতন্ত্র বা মানুষের অধিকারের জন্য নয়, করেছে নিজের জাতীয় স্বার্থের জন্য। ঠিক যেমন যুক্তরাষ্ট্র তার চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও বৈশ্বিক অবস্থান রক্ষায় ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রে করছে।
এই বাস্তবতা নির্মম হলেও অস্বীকার করার উপায় নেই। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বন্ধুত্ব স্থায়ী নয়, স্বার্থই স্থায়ী। যে রাষ্ট্র নিজের স্বার্থ বোঝে না, অন্যের স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে নিজেকে দুর্বল করে ফেলে, শেষ পর্যন্ত সে নিজেই উপেক্ষিত হয়। বাংলাদেশকে সেই ভুল থেকে শিক্ষা নিতে হবে। আমাদের রাজনীতি যদি শিক্ষনীয় হতে চায়, তবে তাকে ব্যক্তিকেন্দ্রিক ক্ষমতা নয়, রাষ্ট্রকেন্দ্রিক কৌশল শিখতে হবে। তবেই আমরা তেলো মাথায় তেল দেওয়া নয়, বরং নিজের মাথা রক্ষা করার রাজনীতি গড়ে তুলতে পারব।
রহমান মৃধা, গবেষক ও লেখক, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন
rahman.mridha@gmail.com
মত দ্বিমত
হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা থেকে এআই অ্যালগরিদম
আমি গোটা বিশ্বে একটি বিষয় লক্ষ্য করেছি। বন্য হিংস্র প্রাণী, বিষাক্ত কেমিক্যাল কিংবা করোনা ভাইরাসের মতো মারাত্মক ভাইরাস থেকে মানুষকে রক্ষা করতে নানান ধরনের সুরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। কারণ এই ধরনের ভয়ংকর ও ধ্বংসাত্মক পরিস্থিতি থেকে মানুষ স্বাভাবিকভাবেই দূরে থাকে এবং বন্য হিংস্র বা বিষাক্ত প্রাণীসহ অন্যান্য বিপজ্জনক উপাদানের আশপাশে চলাফেরা করতে সতর্কতা অবলম্বন করে।
কিন্তু এই প্রথম দেখলাম, বিএনপি নেতা তারেক রহমানের ঢাকা মহানগরে চলাচল এমন কঠোর সুরক্ষার মধ্য দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে যে তা যেন এক ধরনের প্রদর্শনীতে পরিণত হয়েছে। মানুষ যেন এক অদেখা জীবকে দেখার কৌতূহলে জীবন ঝুঁকিতে ফেলে উঁকি দিয়ে তাকাচ্ছে। একবিংশ শতাব্দীতে বাংলাদেশে এমন চিড়িয়াখানার মতো দৃশ্য দেখতে হবে, তা কখনো ভাবিনি। এটাই কি তাহলে স্বৈরাচারীর পতন ঘটানোর ফলাফল। আর এটাই কি নতুন নেতৃত্বের বাংলাদেশ, যেখানে নেতা হবেন হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা আর জনগণ হবে ইঁদুরের মতো নির্বাক ও অনুসারী প্রাণী। কিন্তু এই দৃশ্য তো এযুগে মেনে নেয়া সম্ভব নয়। কিন্তু কি করা! ভাবতে শুরু করি, আমার ভাবনা থেকে বেরিয়ে আসে যে পরিকল্পনা সেটাই এখন শেয়ার করছি।
এতো দিন মানুষ ভয় পেত বন্য প্রাণী, বিষাক্ত গ্যাস কিংবা অদৃশ্য ভাইরাসকে। ভবিষ্যতে মানুষ ভয় পাবে নিজেরই তৈরি প্রতিচ্ছবিকে। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স যখন কেবল যন্ত্র থাকবে না, বরং মানুষের মতো দেখতে হবে, মানুষের মতো কথা বলবে, অনুভূতির অনুকরণ করবে এবং সিদ্ধান্ত নেবে, তখন ক্ষমতার প্রকৃতি আমূল বদলে যাবে।
আগামীর সবচেয়ে বিপজ্জনক অস্ত্র হবে সেই রোবোটিক মানুষ, যার কোনো অতীত নেই, কোনো পরিবার নেই, কোনো ভয় নেই। তাকে ব্ল্যাকমেইল করা যাবে না, তাকে ভয় দেখানো যাবে না, ধরা পড়লেও কোনো তথ্য বের হবে না। কারণ তার স্মৃতি থাকবে এনক্রিপ্টেড, তার আনুগত্য থাকবে অ্যালগরিদমের প্রতি, আর তার কাজ হবে নিঃশব্দে ইতিহাস বদলে দেওয়া।
আজ যেভাবে ভাড়াটে খুনি নিয়োগ করা হয়, ভবিষ্যতে তা হবে অকার্যকর। মানুষ দুর্বল। মানুষ ভয় পায়। মানুষ ধরা পড়ে। কিন্তু রোবোটিক মানবসদৃশ সত্তা ভুল করে না, অনুতপ্ত হয় না, প্রশ্ন তোলে না। সে কেবল নির্দেশ পালন করে। ঠিক যেমন একটি প্রোগ্রাম করা হয়েছে।
এই প্রযুক্তি প্রথমে নিরাপত্তার নামে আসবে। বলা হবে রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার জন্য, সন্ত্রাস দমনের জন্য, অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সুরক্ষার জন্য। কিন্তু খুব দ্রুতই সুরক্ষা ও হুমকির মাঝের সীমারেখা মুছে যাবে। যে প্রযুক্তি পাহারা দেয়, সেই প্রযুক্তিই একদিন বিচার করবে কে বাঁচবে, কে থাকবে না।
সবচেয়ে ভয়ংকর দিকটি হবে এই যে, হত্যাকারীকে আর আলাদা করে চেনা যাবে না। সে হবে ভিড়েরই একজন। মানুষের মুখ, মানুষের কণ্ঠ, মানুষের চলন। পার্থক্য থাকবে কেবল এক জায়গায় সে মানুষ নয়।
এই ভবিষ্যৎ হঠাৎ আসবে না। ধাপে ধাপে আসবে। প্রথমে সহকারী, পরে রক্ষী, তারপর সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী। আর এক সময় এমন এক বাস্তবতা তৈরি হবে যেখানে ক্ষমতাবানরা বুঝতেই পারবে না তাদের চারপাশে কে মানুষ, আর কে নিখুঁতভাবে মানুষের ছদ্মবেশে থাকা যন্ত্র।
এই ভবিষ্যৎ কোনো সাইন্স ফিকশন নয়। এটি একটি সতর্কতা। প্রশ্ন একটাই থাকবে মানুষ কি প্রযুক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করবে, নাকি প্রযুক্তিই মানুষের ভাগ্য লিখবে।
আর সেই প্রশ্নের উত্তর নির্ধারণ করবে আমরা আজ নৈতিকতা, জবাবদিহি এবং সীমারেখা কোথায় টানি।
এই ভয়াবহ পরিস্থিতির পরে কি মানব জাতির অস্তিত্ব টিকে থাকবে নাকি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যাবে? ঠিক তেমন একটি সন্ধিক্ষণে কী মনে হয়? মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব অতএব নতুন করে বাঁচার জন্য সেটাকে প্রমাণ করতে হবে। দুঃখের বিষয় আমরা কেউ সেই সময়টি উপভোগ করতে পারবো না কারণ আমরা সবাই অমানুষ হয়ে গেছি।
রহমান মৃধা, গবেষক ও লেখক, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন
rahman.mridha@gmail.com
মত দ্বিমত
২০২৬ সালের নির্বাচন: বাংলাদেশের নৈতিক পুনর্গঠন ও নাগরিকের চূড়ান্ত দায়িত্ব
বাংলাদেশ এখন এক গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় নির্বাচনের মুখে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু এই নির্বাচন কেবল ক্ষমতার পালাবদলের ঘটনা নয়। এটি রাষ্ট্র, নাগরিক এবং মানবতার পরীক্ষা, যেখানে নাগরিকই চূড়ান্ত নির্দেশক। যে রাষ্ট্র কথার সঙ্গে কাজ মিলিয়ে নাগরিককে সম্মান দেয়, সে রাষ্ট্র টিকে থাকে। যে রাষ্ট্র কথা বলে কিন্তু কাজ নয়, সে সমাজকে বিভ্রান্ত করে। এই পরীক্ষায় তিনটি দেশের পাঠ আমাদের শিক্ষা দেয়, সুইডেন, ভ্রুনাই এবং বাংলাদেশ।
সুইডেনের পাঠ স্পষ্ট। শক্তিশালী রাষ্ট্র মানে নৈতিক ও মানবিক প্রতিষ্ঠান। আইন সবার জন্য সমান, বিচার স্বাধীন, প্রশাসন ব্যক্তি নয়, নীতির অধীনে কাজ করে। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সামাজিক সুরক্ষা, সব নাগরিক অধিকার। কথার সঙ্গে কাজের মিল এত দৃঢ় যে নাগরিক ভয় পায় না, বরং বিশ্বাস পায়। উদাহরণস্বরূপ, সরকারি হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সবার জন্য উন্মুক্ত। দুর্নীতিমূলক ঘটনা ধরা পড়লেই প্রশাসন দ্রুত ব্যবস্থা নেয়। আদালত এবং পুলিশ প্রশাসনের স্বচ্ছ, স্বতন্ত্র ও নিরপেক্ষ ভূমিকা সুইডেনের নাগরিকদের আস্থা তৈরি করে। নাগরিকরা তাদের অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন, যা রাষ্ট্রকে স্থিতিশীল রাখে। গণতন্ত্রের শক্তি ব্যক্তির ওপর নয়, নৈতিক প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক বিশ্বাসের ওপর নির্ভর করে।
ভ্রুনাই দেখায়, গণতন্ত্র সীমিত হলেও নৈতিক দায়িত্ব ও মানবিকতা রাষ্ট্রকে স্থিতিশীল রাখে। সুলতানের শাসনে মৌলিক চাহিদা পূরণ, নিরাপত্তা, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং সংযম বজায় থাকে। মত প্রকাশ সীমিত হলেও নাগরিকের জীবন নিরাপদ থাকে। উদাহরণস্বরূপ, ভ্রুনাইতে সামাজিক নিরাপত্তা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কারণে জনগণ রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা রাখে। এটি শেখায়, স্বাধীনতা না থাকলেও রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা নির্ভর করে দায়িত্ববোধ এবং মানুষের মৌলিক নিরাপত্তার ওপর।
বাংলাদেশ আজ সেই পরীক্ষার মুখে। কথার সঙ্গে কাজের দূরত্ব ক্রমশ বাড়ছে। রাষ্ট্র বলে গণতন্ত্র, আইন ও মানবাধিকার, কিন্তু বাস্তবে আইন প্রয়োগ হয় পরিচয়ভিত্তিক, ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত, ভিন্নমত শাস্তিযোগ্য। নাগরিক প্রায়ই রাষ্ট্রের ভাড়াটে। কথার সঙ্গে কাজের এই অমিল সমাজে বিশ্বাসের সংকট, নৈতিক ও মানবিক অবক্ষয় বৃদ্ধি করছে। উন্নয়ন প্রকল্পের বড় বাজেট থাকলেও প্রান্তিক জনগণের জীবনমান অপরিবর্তিত। দুর্নীতি, ভোট চুরি, প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার, হত্যা এবং অপরাধ, এসব পরিস্থিতি সমাজে আতঙ্ক ও অসন্তোষ তৈরি করছে। উদাহরণস্বরূপ, একটি উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে সরকারিভাবে বরাদ্দকৃত ওষুধ প্রান্তিক মানুষের কাছে পৌঁছায় না। স্থানীয় প্রশাসন রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে সমস্যার সমাধান করে না।
এই সংকটময় পরিস্থিতিতে মানবিক, সাংস্কৃতিক ও সাহিত্যিক সংস্থা নাগরিকদের জন্য দিকনির্দেশক। এটি কোনো রাজনৈতিক দল নয়। এটি মানুষের নৈতিক চেতনা, বিবেক এবং সাংস্কৃতিক কণ্ঠ। সাহিত্য ও সংস্কৃতি রাষ্ট্রকে টেকসই রাখে। উদাহরণস্বরূপ, নাগরিক শিক্ষা আন্দোলন, কবিতা উৎসব, সাংস্কৃতিক কর্মশালা, এগুলো মানুষকে সচেতন করে এবং নৈতিকতার দিকনির্দেশনা দেয়। যখন রাষ্ট্র কথা বলে কিন্তু কাজ নয়, তখন এই কণ্ঠই সত্যের প্রতিফলন। নাটক, সাহিত্য বা স্থানীয় কবিতা পাঠের মাধ্যমে মানুষ নিজের অভিজ্ঞতা ও নৈতিক প্রশ্ন সামনে আনতে শেখে।
এক রাতেই পরিবর্তন সম্ভব নয়। সুইডেন বা ভ্রুনাইয়ের মতো দেশ অর্জন করতে হলে সময়, ধৈর্য এবং ধারাবাহিক সংস্কার দরকার। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রশাসন, বিচার ব্যবস্থা এবং সামাজিক নৈতিকতার পরিকাঠামো পরিবর্তন অপরিহার্য। প্রশাসনকে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও জবাবদিহিমূলক করতে আইন ও নীতির সংস্কার প্রয়োজন। নাগরিককেও আপোষহীন নৈতিকতা এবং মানবিক চেতনার সঙ্গে অংশগ্রহণ করতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, স্থানীয় নির্বাচনের পরও নাগরিকদের সভা, গণমাধ্যম নজরদারি এবং প্রতিবাদ সক্রিয় রাখতে হবে।
২০২৬ সালের নির্বাচন বাংলাদেশের জন্য শেষ সুযোগ, রাষ্ট্রকে নৈতিকভাবে পুনর্গঠন করার, নাগরিককে মালিক বানানোর, উন্নয়নকে মানবিকভাবে বাস্তবায়নের।
নাগরিকের জন্য পাঁচটি দিক নির্দেশনা
১. ভয় নয়, বিবেক দিয়ে ভোট দিন। শুধু পারিবারিক বা রাজনৈতিক চাপের জন্য নয়, নিজের বিশ্লেষণ, অভিজ্ঞতা এবং তথ্য অনুযায়ী ভোট দিন।
২. ব্যক্তি নয়, নীতি দেখুন। নেতা বা দলের প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তব অর্জন বিচার করুন।
৩. মিথ্যাকে স্বাভাবিক ভাববেন না। রাষ্ট্রের ভাষা মিথ্যায় ভরা হলে সমাজের নৈতিকতা ক্ষয় হয়। সংবাদপত্র, সামাজিক মাধ্যম ও স্থানীয় সভার মাধ্যমে তথ্য যাচাই করুন।
৪. ঘৃণার রাজনীতি প্রত্যাখ্যান করুন। ভিন্নমতকে শত্রু ভাবা গণতন্ত্রকে ধ্বংস করে। সংলাপ, যৌক্তিক বিতর্ক এবং শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ নিশ্চিত করুন।
৫. ভোটের পরও দায়িত্ব নিন। প্রশ্ন করা, দাবি তোলা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাই রাষ্ট্রকে নৈতিক রাখে। স্থানীয় সভা, সামাজিক উদ্যোগ ও গণমাধ্যমের অংশীদারিত্ব বৃদ্ধি করুন।
স্মরণ করুন, রাষ্ট্র বন্দুক বা ক্ষমতা দিয়ে টিকে থাকে না। রাষ্ট্র টিকে থাকে মানুষের বিশ্বাস, নৈতিকতা ও মানবিকতার কারণে।
সুইডেন দেখায়, নৈতিক প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রকে বিশ্বাসযোগ্য করে।
ভ্রুনাই দেখায়, দায়িত্ববোধ রাষ্ট্রকে স্থিতিশীল রাখে।
বাংলাদেশ শেখায়, নৈতিকতা হারালে উন্নয়ন অর্থহীন।
নাগরিকের দায়িত্ব হলো মানুষ হয়ে কথা বলা। আমাদের সাহিত্য, সংস্কৃতি এবং মানবিক চেতনা রাষ্ট্রকে শক্তিশালী রাখে। রাজনীতি কেবল ক্ষমতার লড়াই নয়, এটি নৈতিকতা ও মানবতার পরীক্ষা। বাংলাদেশ যদি এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়, রাষ্ট্র স্থিতিশীল, মানবিক এবং বিশ্বাসযোগ্য হবে।
২০২৬ সালের নির্বাচন রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্কের এক যুগোপযোগী পরীক্ষা। এটি কোনো দলের নয়, এটি প্রতিটি নাগরিকের। এখনই সময় মানুষ হয়ে কথা বলার, নৈতিক ও মানবিক চেতনার প্রতি দায়িত্ব স্মরণ করার।
রহমান মৃধা, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন। rahman.mridha@gmail.com
মত দ্বিমত
বিদায় শুধু একটি মুহূর্ত নয়, একটি চূড়ান্ত মূল্যায়ন
বিদায় শুধু একটি মুহূর্ত নয়, একটি চূড়ান্ত মূল্যায়ন। মানুষ কীভাবে ক্ষমতায় এসেছে, কীভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করেছে এবং শেষ পর্যন্ত কীভাবে সরে গেছে তারই নীরব রায় হলো বিদায়। ইতিহাসে বহু নেতা এসেছেন। কিন্তু খুব অল্প সংখ্যক বিদায় মানব কল্যাণের শিক্ষা রেখে গেছে।
রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিদায় তাই ব্যক্তিগত ঘটনা নয়। এটি জাতির আত্মপরিচয়ের প্রতিফলন। এই আয়নায় দেখা যায় ক্ষমতার চরিত্র, নেতৃত্বের নৈতিকতা এবং জনগণের সঙ্গে শাসকের সম্পর্ক।
ওসমান হাদির বিদায় আমাদের শেখায় ত্যাগের নীরব শক্তি। তিনি দেশ গঠনে কোনো দৃশ্যমান অবকাঠামোগত অবদান রাখেননি। তাঁর নামে কোনো সেতু নেই, কোনো মেট্রোরেল নেই, কোনো বড় প্রকল্প নেই। তবু তিনি জাতির মনে জায়গা করে নিয়েছেন অনুপ্রেরণার বাণী প্রচারের মাধ্যমে। সাহসের ভাষা, ভয়ের বিরুদ্ধে অবস্থান এবং অন্যায়ের সামনে নত না হওয়ার মানসিকতা তাঁকে মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছে। তাঁর বিদায় প্রমাণ করে নেতৃত্ব কেবল ক্ষমতার আসনে বসে তৈরি হয় না। অনেক সময় নেতৃত্ব জন্ম নেয় মানুষের হৃদয়ে।
এর বিপরীতে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশ পেয়েছে পদ্মাসেতু, মেট্রোরেলসহ বড় বড় অবকাঠামোগত অর্জন। এসব অস্বীকার করার সুযোগ নেই। খালেদা জিয়ার সময়ে দেখা গেছে বিনামূল্যে প্রাথমিক শিক্ষা এবং সামাজিক নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। কিন্তু প্রশ্ন ওঠে দীর্ঘ ষোল বছর খালেদা জিয়া দেশ গঠনে কী করলেন। এর উত্তর এককথায় দেওয়া যায় না। কারণ সেই সুযোগ রাষ্ট্রই তাঁকে দেয়নি। হিংসাত্মক রাজনীতি, প্রতিহিংসা এবং ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার কৌশল তাঁকে রাষ্ট্র পরিচালনার বাস্তব ক্ষেত্র থেকে বঞ্চিত করেছে।
এর ফলাফল ছিল গভীর এবং দীর্ঘস্থায়ী। দেশ দিনে দিনে আলো থেকে সরে গেছে। মানুষ গর্জন করতে শিখেছে, ঘৃণা করতে শিখেছে। ভিন্নমতকে চেপে রাখা হয়েছে। স্বাধীন কণ্ঠগুলোকে নিঃশব্দ করার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু ইতিহাস বলে চেপে রাখা কণ্ঠ কখনো নিশ্চিহ্ন হয় না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেগুলোই শক্তিশালী হয়ে ওঠে। সেই অন্ধকার বাস্তবতা থেকেই জন্ম নিয়েছে ওসমান হাদির মতো অনুপ্রেরণার প্রতীক এবং খালেদা জিয়ার মতো বঞ্চিত নেতৃত্বের প্রতি সহমর্মিতাময় বিদায়।
শেখ হাসিনার বিদায় ছিল সবচেয়ে কঠিন শিক্ষা বহনকারী মুহূর্ত। ক্ষমতা যখন জনগণের সম্মতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, তখন বিদায় আসে হঠাৎ। প্রস্তুতি ছাড়া। দেশের বাইরে চলে যাওয়ার দৃশ্যটি কোনো ব্যক্তিকে নয়, একটি শাসনব্যবস্থাকে মূল্যায়ন করে। এটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় ভয় দিয়ে শাসন করা যায়। কিন্তু সম্মান দিয়ে বিদায় কেনা যায় না।
এই তিনটি বিদায় একত্রে একটি স্পষ্ট পাঠ দেয়। রাষ্ট্র কেবল ইট পাথর দিয়ে গড়া হয় না। রাষ্ট্র গড়ে ওঠে মানুষের কণ্ঠস্বর, মর্যাদা এবং ন্যায়বিচারের ওপর। সেখানে ব্যর্থ হলে অবকাঠামো টিকে থাকে, কিন্তু নেতৃত্ব বিদায়ের মুহূর্তে প্রশ্নের মুখে পড়ে।
মানব কল্যাণের দৃষ্টিতে এখানেই মূল শিক্ষা। ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী। বিদায় অনিবার্য। মানুষ শেষ পর্যন্ত মনে রাখে কে কীভাবে বিদায় নিয়েছে, কে কতদিন ক্ষমতায় ছিল তা নয়। একজন রাষ্ট্রনায়কের প্রকৃত পরীক্ষা শাসনে নয়, বিদায়ে।
বিদায় তাই শেষ কথা নয়। বিদায় হলো ইতিহাসের কাছে নেতৃত্বের চূড়ান্ত জবাব।
রহমান মৃধা, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন। rahman.mridha@gmail.com
মত দ্বিমত
আমাদেরও একজন রানী এলিজাবেথ ছিলেন
হ্যাঁ বলছি বেগম খালেদা জিয়ার কথা। তিনি যতটুকু কথা বলার দরকার ততটুকুই বলতেন, যতটুকু করার দরকার ততটুকুই করতেন এবং সেটা নিয়ে কখনো কোনো দ্বিমত পোষণ করতে দেখিনি কাউকে। তিনি গত ১৫ মাসে অনেকের চোখে জাতির এক মাতৃসম প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন।
গণঅভ্যুত্থানের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন বিপ্লবী নেতা কর্মীদের মধ্যে আমি একটি বিষয় লক্ষ্য করেছি। তা ছিল গত বছরের সশস্ত্র বাহিনী দিবস পালনের সময়। ড. মুহাম্মদ ইউনূস থেকে শুরু করে বহু বিশিষ্ট ব্যক্তির চোখে মুখে এক ধরনের আবেগের ঢেউ কাজ করছিল। তাদের মনের ভাষা যেন ছিল জন্ম আমার ধন্য হলো মাগো, তোমাকে এই সমাবেশে আনতে পেরে, তোমাকে দেখাতে তোমার সন্তানেরা পেরেছে তোমার জন্মভূমিকে তোমার কাছে ফিরিয়ে নিতে।
দীর্ঘ ১৬ বছর গৃহবন্দিনী থাকা তিনবারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর জীবনের এই সময়টি ছিল বাংলার মানুষের কাছ থেকে পাওয়া এক বিশেষ সম্মানের সময়। সম্ভবত সেই স্মৃতিই তাঁকে এবারের সশস্ত্র বাহিনী দিবসেও উপস্থিত থাকতে অনুপ্রাণিত করেছিল, শারীরিকভাবে নানা ধরনের জটিলতা থাকা সত্ত্বেও। বিনিময়ে তিনি নিজ কানে মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বক্তব্যে শুনতে পান যে প্রয়াত প্রেসিডেন্ট জেনারেল জিয়াই ছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক।
একজন সহধর্মিণীর জন্য তাঁর স্বামীর এমন গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহাসিক ভূমিকার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি, তা আবার লাখো মানুষের উপস্থিতিতে, নিঃসন্দেহে এক অনন্য দৃষ্টান্ত। দীর্ঘ ১৬ বছরের বেশি সময় নির্বাসিত একমাত্র সন্তানের দেশে প্রত্যাবর্তন এবং সেই সন্তানের উপস্থিতিতেই তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন, ঠিক একই দিনে যেদিন তাঁর সহধর্মী প্রেসিডেন্ট জিয়া পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছিলেন।
দীর্ঘ ৫৫ বছরে বাংলাদেশের ভূখণ্ডে অনেক রাজনৈতিক নেতার বিদায় হয়েছে। আমার কাছে নিঃসন্দেহে শহীদ ওসমান হাদি, প্রেসিডেন্ট জিয়া এবং গণতন্ত্রের পক্ষে আপোষহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। আনন্দের সঙ্গে স্মরণ করছি, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের জাতীয় জাগরণের চেতনায় বেগম খালেদা জিয়া একজন রানী এলিজাবেথের মতো স্থির, নীরব এবং মর্যাদাসম্পন্ন প্রতীকে পরিণত হয়েছিলেন।
রহমান মৃধা, গবেষক-লেখক এবং সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন।
rahman.mridha@gmail.com




