অর্থনীতি
অপচয় ও ঝুঁকির পথে সিটি ব্যাংক, বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ
পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকারী ও আমানতকারীদের স্বার্থ বিবেচনা না করে বাজারমূল্যের চেয়ে দ্বিগুণ বেশি দামে জমি কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সিটি ব্যাংক। এই সিদ্ধান্তে বিপুল অপচয় ও দুর্নীতির গুঞ্জন উঠেছে। ব্যাংকটির গ্রাহকের আমানত থেকে খরচ করার কারণে আমানতের ঝুঁকি বাড়বে। ব্যাংকের পরিচালন ব্যয় বাড়বে। এতে ব্যাংকের মুনাফার অংশ কমে যাবে। এ নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে।
এই সিদ্ধান্তে ব্যাংকটির ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা কাঙ্ক্ষিত লভ্যাংশ পাওয়া থেকে বঞ্চিত হবেন। শুধু তা-ই নয়, অপচয়ের কারণে ব্যাংকটির মুনাফা কমে গিয়ে খরচ বেশি হওয়ার কারণে সরকারকে দেওয়া করের অংশও কমে যাবে। ফলে সরকার কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হবে। এমনই হটকারী সিদ্ধান্ত নিয়ে এগোচ্ছে ব্যাংকটির কর্তৃপক্ষ।
জানা গেছে, সিটি ব্যাংক রাজধানীর গুলশানে ৪০ কাঠা জমির ওপর ২৮ তলা নিজস্ব ভবন তৈরি করার জন্য এরই মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন নিয়েছে। ভবন বানাতে গুলশান অ্যাভিনিউয়ে আগের ২০ কাঠার জমির সঙ্গে পার্শ্ববর্তী আরো ২০ কাঠা জমিও কেনা হচ্ছে। নতুন জমি কেনাসহ আনুষঙ্গিক অন্যান্য ব্যয় মিলিয়ে খরচ হবে ৩৪৫ কোটি টাকা। কিন্তু গুঞ্জন উঠেছে, বাজার মূল্যের চেয়ে অনেক বেশি দামে কেনা হচ্ছে এ জমি।
নতুন করে যে ২০ কাঠা জমি কিনতে যাচ্ছে ব্যাংকটি, তাতে কাঠাপ্রতি খরচ হচ্ছে প্রায় ১৭ থেকে ১৮ কোটি টাকা, যা অনেকটাই অপ্রত্যাশিত। স্থানীয়রা জানায়, এখানে যে জমির কথা বলা হয়েছে, তার দাম এত হওয়ার কথা নয়। জমি ক্রয়-বিক্রয় নিয়ে যাঁরা কাজ করেন, তাঁদের ধারণা এই উচ্চমূল্যে জমি কেনাবেচা হলে পার্শ্ববর্তী জমি ও ভবন মালিকদের ওপর প্রভাব পড়তে পারে। কিন্তু এত দাম দিয়ে সিটি ব্যাংক কেন জমি কিনছে তা নিয়ে এরই মধ্যে সমালোচনা ও বির্তক শুরু হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গুলশান এভিনিউতে প্রতি কাঠা কমার্শিয়াল জমি এখন কম বেশি আট কোটি টাকায় কেনাবেচা হচ্ছে। কিন্তু সিটি ব্যাংক সেখানে জমি কিনছে প্রতি কাঠা ১৭ কোটি ২৫ লাখ টাকায়।
এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী আহসানুল করিম বলেন, ‘যদি বাজারমূল্যের চেয়ে বেশি দরে জমি কেনা হয় তাহলে সেখানে অবৈধ সুবিধা নেওয়ার চেষ্ট হয়েছে কি না সেটা দেখার অবকাশ থাকে। বিক্রেতা সেই টাকা পেয়েছি কি? সেই জমির দাম প্রকৃতপক্ষে কত হওয়া উচিত এবং কোনো দুর্নীতি হয়েছে কি না এসব বিষয়ে তদন্তের অবকাশ থাকে।’
এদিকে আগের ২০ কাঠা ও নতুন কেনা ২০ কাঠা মিলিয়ে মোট ৪০ কাঠা জমির ওপর নিজস্ব ২৮তলা ভবন নির্মাণে খরচ ধরা হয়েছে ৮৫৫ কোটি টাকা। তাতে জমি কেনা ও ভবন নির্মাণে আপাতত খরচ ধরা হয়েছে এক হাজার ২০০ কোটি টাকা। এরই মধ্যে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) ও বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রয়োজনীয় অনুমোদনও পেয়েছে ব্যাংকটি।
সর্বশেষ গত বুধবার সিটি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সভায় ব্যাংকের নিজস্ব ভবন নির্মাণ ও এ জন্য নতুন করে আরো ২০ কাঠা জমি কেনার সিদ্ধান্ত অনুমোদন করা হয়েছে। ব্যাংক সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
১৯৮৩ সালে দেশের তৎকালীন ১২ জন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী মিলে ব্যাংকটি গড়ে তোলেন। ১৯৮৬ সালে ব্যাংকটি শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয়। ব্যাংকটি প্রতিষ্ঠার পর প্রথম নিজস্ব ভবনে প্রধান কার্যালয়ের কার্যক্রম শুরু করে ২০০৯ সালে। গুলশান-২-সংলগ্ন গুলশান এভিনিউয়ে ২০ কাঠার জমির ওপর আটতলা ভবনে ছিল প্রধান কার্যালয়। কিন্তু সেখানে সব জনবলের জায়গা না হওয়ায় পুরনো ভবনটি ভেঙে ২৮তলা ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
সিটি ব্যাংক শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কম্পানি। সেই হিসাবে বিপুল অর্থ ব্যয়ে জমি কেনা ও ভবন নির্মাণের সিদ্ধান্তের বিষয়টি মূল্য সংবেদনশীল। এ তথ্যটির কারণে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ ও পুঁজিবাজারে শেয়ারের দামে প্রভাব পড়তে পারে। যদিও ব্যাংকটি এ তথ্যটি শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদের জানিয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে এ অপচয়ের কারণে ব্যাংকের মুনাফার অংশ কমে গেলে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে কি না।
সূত্র জানায়, গত ৬ জানুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংক সিটি ব্যাংককে ভবন নির্মাণ ও জমি কেনার প্রয়োজনীয় অনুমোদন দিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন পাওয়ার পর গত বুধবার ব্যাংকটির পর্ষদ সভায় এই সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা হয়।
ব্যাংকসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, রাজউক থেকে ২৮তলা সুউচ্চ ভবন নির্মাণের অনুমোদনও এর মধ্যে হয়ে গেছে। এই ২৮তলা ভবনের মধ্যে পাঁচতলা বরাদ্দ থাকবে গাড়ি পার্কিংয়ের জন্য। বাকি ২৩ তলাজুড়ে থাকবে ব্যাংকটির প্রধান কার্যালয়ের কার্যক্রম। সেভাবেই পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়েছে। এখন জমির পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় ভবনের উচ্চতা ও পরিসর বৃদ্ধির আরো সুযোগ তৈরি হয়েছে।
সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাসরুর আরেফিন গণমাধ্যমকে বলেন, পৃথিবীজুড়ে ব্যাংকের ভবন ও কার্যালয় খুবই নান্দনিক ও দৃষ্টিনন্দন হয়ে থাকে। আমরাও দেশের ব্যাংক খাতে সে রকম একটি উদাহরণ তৈরি করতে চাই। এ জন্য আমাদের পরিকল্পনা ও উদ্যোগে সম্মতি দেওয়ার জন্য ব্যাংক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতি কৃতজ্ঞ। খুব দ্রুততম সময়ে আমরা আমাদের নিজস্ব ভবন তৈরি ও সেখানে কার্যক্রম শুরুর চেষ্টা করব।
এমকে
অর্থনীতি
ছেঁড়া-ফাটা নোট নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন সিদ্ধান্ত
দেশজুড়ে ছেঁড়া-ফাটা, ত্রুটিপূর্ণ ও ময়লাযুক্ত নোটের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় এ ধরনের নোট গ্রহণ ও বিনিময়মূল্য প্রদান সব তফসিলি ব্যাংকের জন্য বাধ্যতামূলক করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এ নির্দেশনা অমান্য করলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।
রোববার (১২ এপ্রিল) বাংলাদেশ ব্যাংকের ডিপার্টমেন্ট অব কারেন্সী ম্যানেজমেন্ট (ডিসিএম) থেকে এ সংক্রান্ত নির্দেশনা জারি করা হয়েছে।
এতে বলা হয়েছে, জনসাধারণের স্বাভাবিক ও সুষ্ঠু নগদ লেনদেন নিশ্চিত করতে ব্যাংকের সব শাখায় বিধি অনুযায়ী ছেঁড়া-ফাটা ও ময়লাযুক্ত নোট গ্রহণ এবং তার পরিবর্তে নতুন বা পুনঃপ্রচলনযোগ্য নোট প্রদানের সেবা নিয়মিতভাবে চালু রাখতে হবে। তবে নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও বাজারে এ ধরনের নোটের আধিক্য দেখা যাচ্ছে, যা নগদ লেনদেনে ভোগান্তি সৃষ্টি করছে।
এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় ‘ক্লিন নোট পলিসি’ বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে ব্যাংকগুলোকে আরও সক্রিয় হওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। বিশেষ করে ছোট মূল্যমানের ৫, ১০, ২০ ও ৫০ টাকার নোট নিয়মিতভাবে গ্রহণ করে নির্ধারিত বিশেষ কাউন্টারের মাধ্যমে তা বিনিময়ের ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।
এসব নোটের পরিবর্তে গ্রাহকদের ফ্রেশ বা পুনঃপ্রচলনযোগ্য নোট সরবরাহ করতে হবে। এ ধরনের সেবা প্রদানে কোনো ব্যাংক শাখার অনীহা বা গাফিলতি পরিলক্ষিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।
ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ৪৫ ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে জারি করা এ নির্দেশনা অবিলম্বে কার্যকর হবে। বিষয়টিকে অতীব গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে দেশে কার্যরত সব তফসিলি ব্যাংককে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার কথা জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
অর্থনীতি
কোম্পানির রিটার্ন দাখিলের সময় আরও ১ মাস বৃদ্ধি
আবারও কোম্পানি করদাতাদের কর জমার সময় বাড়িয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। সোমবার (১৩ এপ্রিল) এক আদেশে কোম্পানির ক্ষেত্রে রিটার্ন জমার সময় বাড়িয়ে ১৫ এপ্রিল থেকে বৃদ্ধি করে ১৫ মে পর্যন্ত করা হয়েছে।
এর আগে সময় বৃদ্ধি করে ১৫ ফেব্রুয়ারি, ১৫ মার্চ ও ১৫ মে পর্যন্ত কোম্পানি করদাতারদের রিটার্ন জমার সময় নির্ধারিত করেছিল এনবিআর। এ নিয়ে চতুর্থ দফায় কোম্পানি রিটার্নের সময় বৃদ্ধি করা হলো।
করনীতির দ্বিতীয় সচিব একরামুল হক স্বাক্ষরিত আদেশে বলা হয়, আয়কর আইন, ২০২৩ এর ধারা ৩৩৪ এর দফা (খ) এ প্রদত্ত ক্ষমতাবলে, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, আয়কর আইন, ২০২৩ এ সংজ্ঞায়িত কোম্পানি করদাতাদের ২০২৪-২০২৫ করবর্ষের রিটার্ন দাখিলের সময় এক মাস বৃদ্ধি করা হলো। সম্প্রতি কোম্পানির রিটার্ন জমার সময় বাড়াতে এনবিআরে চিঠি পাঠায় ব্যবসায়ীদের কয়েকটি সংগঠন।
অর্থনীতি
মানি মার্কেটে লেনদেনভিত্তিক রেফারেন্স রেট চালু করলো বাংলাদেশ ব্যাংক
দেশের আর্থিক বাজারের স্বচ্ছতা ও গতিশীলতা নিশ্চিত করতে বড় ধরনের সংস্কারে হাত দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এখন থেকে আর কেবল ব্যাংকগুলোর দেওয়া তথ্যের (ঢাকা ইন্টারনাল রেট) ওপর ভিত্তি করে নয়, বরং প্রকৃত লেনদেনের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হবে মানি মার্কেটের সুদের হার। বৈশ্বিক ‘SOFR’ (Secured Overnight Financing Rate)-এর আদলে বাংলাদেশে প্রবর্তিত হতে যাচ্ছে প্রকৃত লেনদেন ভিত্তিক নতুন রেফারেন্স রেট।
সোমবার (১৩ এপ্রিল) দুপুরে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে ডেট ম্যানেজমেন্ট ডিপার্টমেন্ট আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানানো হয়। আগামী ১৫ এপ্রিল থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইটে এই নতুন রেফারেন্স রেট নিয়মিত প্রকাশ করা হবে।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ২০১০ সাল থেকে বাংলাদেশে ‘ঢাকা ইন্টারব্যাংক অফার রেট’ বা ডিবোর (DIBOR) প্রচলিত ছিল। তবে এটি ছিল ব্যাংকগুলোর দেওয়া ‘অফার রেট’-এর ভিত্তিতে। অর্থাৎ ব্যাংকগুলো যে দরে লেনদেন করতে চায়, তার ওপর ভিত্তি করে এটি নির্ধারিত হতো। কিন্তু অনেক ব্যাংকই নিয়মিত তথ্য দিত না, ফলে বাজারের প্রকৃত চিত্র ফুটে উঠত না।
এসময় বলা হয়, এই সীমাবদ্ধতা দূর করতে বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের অটোমেটেড সিস্টেম ব্যবহার করে সরাসরি লেনদেনের তথ্য নিয়ে নতুন দুটি বেঞ্চমার্ক রেট প্রবর্তন করেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক মূলত দুটি রেট প্রকাশ করবে। প্রথমটি Bangladesh Overnight Financing Rate (BOFR)। এটি একটি রিস্ক-ফ্রি বা সিকিউরড রেট। আন্তঃব্যাংক রেপো লেনদেনের তথ্যের ভিত্তিতে এটি নির্ধারিত হবে। দ্বিতীয়টি Dhaka Overnight Money Market Rate (DOMMR)। এটি হবে আনসিকিউরড বা জামানতবিহীন লেনদেন (কলমানি) ভিত্তিক রেট।
যেভাবে নির্ধারিত হবে সুদের হার
বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেট ম্যানেজমেন্ট ডিপার্টমেন্ট জানায়, এই রেটগুলো কোনো ব্যাংক বা ব্যক্তির ইচ্ছামতো হবে না। এটি হবে Volume-weighted mean বা লেনদেনের পরিমাণভিত্তিক গড়। BOFR এর ক্ষেত্রে ওভারনাইট ও ১ সপ্তাহ মেয়াদি রেট প্রকাশ করা হবে। DOMMR এর ক্ষেত্রে ওভারনাইট, ১ সপ্তাহ, ১ মাস এবং ৩ মাস মেয়াদি রেট পাওয়া যাবে।
অস্বাভাবিক কোনো লেনদেন যাতে রেটকে প্রভাবিত করতে না পারে, সেজন্য পরিসংখ্যানভিত্তিক বিশেষ পদ্ধতি (Outlier Management) ব্যবহার করা হবে। যদি কোনো নির্দিষ্ট দিনে পর্যাপ্ত লেনদেন না থাকে, তবে ‘রোলিং উইন্ডো’ পদ্ধতিতে পূর্ববর্তী কার্যদিবসের তথ্য যোগ করে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক আশা করছে, এই উদ্যোগের ফলে দেশের আর্থিক বাজারে সুদের হারের একটি নির্ভরযোগ্য মানদণ্ড তৈরি হবে। এতে করে বিভিন্ন ঋণচুক্তি, বন্ড ও ফ্লোটিং রেট প্রোডাক্টের মূল্য নির্ধারণ সহজ হবে।
আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন নতুন বিনিয়োগ পণ্য বাজারে আনতে পারবে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়ায় বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশের বাজার সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা পাবেন।
সংবাদ সম্মেলনে আরও জানানো হয়, চলতি মার্চ মাস থেকেই পরীক্ষামূলকভাবে এই রেটগুলো প্রস্তুত করা হচ্ছে। আগামী ১৫ এপ্রিল ২০২৬ থেকে সাধারণ মানুষ ও বিনিয়োগকারীরা প্রতিদিন সকালে বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইটে এই রেফারেন্স রেট দেখতে পাবেন। নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও বার্ষিক পর্যালোচনার মাধ্যমে এই পদ্ধতিকে আরও আধুনিক করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
অর্থনীতি
জিডিপি নিয়ে তথ্য-উপাত্তের কোনো ভুল গালগল্প চলবে না
পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি বলেছেন, মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) সঠিক তথ্য তুলে ধরা হবে। আমাদের সরকারপ্রধান নির্দেশ দিয়েছেন, কোনো তথ্য-উপাত্তের ভুল গালগল্প চলবে না। মানুষের তৈরি করা গালগল্প সরকার উপস্থাপন করবে না। বিকাশমান অর্থনীতির জন্য সঠিক তথ্য খুব গুরুত্বপূর্ণ।
সোমবার (১৩ এপ্রিল) রাজধানীর আগারগাঁওস্থ বিবিএস অডিটোরিয়ামে ত্রৈমাসিক জিডিপি ও জেলা ভিত্তিক জিডিপি উন্নয়ন শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
মো: ফরহাদ সিদ্দিক, মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব), বিবিএসের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি। বক্তব্য রাখেন পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব আলেয়া আক্তার ও ন্যাশনাল অ্যাকাউন্টিং উইংয়ের যুগ্মপরিচালক ও প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম। পাওয়ার পয়েন্ট তুলে ধরেন ন্যাশনাল অ্যাকাউন্টিং উইংয়ের উপ-পরিচালক তোফায়েল আহমদ। মুক্ত আলোচনায় সঞ্চালনায় ছিলেন মুহাম্মদ আতিকুল কবীর।
এ সময় প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি বলেন, আমরা অতীতে সমালোচনা করেছি যে জিডিপির সাথে কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ মেলে না। এই অবস্থায় পড়তে চাই না।
রাজস্ব বৃদ্ধি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নেট বাড়িয়ে, রেট কামিয়ে রাজস্ব বাড়ানো যায়। এটা নিয়ে বিতর্ক চাই না। বর্তমান সরকার নির্দেশ দিয়েছে, অপতথ্য বা ভুল ডাটা প্রকাশ করা যাবে না। আমরা সঠিক তথ্য প্রকাশ করতে চাই।
সঠিক তথ্য-উপাত্তের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করে জোনায়েদ সাকি জানান, দেশের প্রকৃত উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক অবস্থা বোঝার জন্য সঠিক তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা অত্যন্ত জরুরি।
তিনি তথ্যকে শক্তি হিসেবে অভিহিত করে বলেন, সঠিক তথ্যের অভাবে ভুল তথ্য বা অপপ্রচার প্রাধান্য পেতে পারে।
প্রতিটি সরকারি বিভাগের উপাত্ত সংগ্রহের সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজন বলে তিনি মন্তব্য করেন।
কৃষি ও ছদ্মবেকারত্ব সংশ্লিষ্ট তথ্যের বিভ্রান্তি উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী সাকি জানান, পরিসংখ্যানে কৃষি খাতে কর্মসংস্থান বাড়ার কথা বলা হলেও অনেক ক্ষেত্রে এটি ছদ্মবেকারত্ব হতে পারে। সঠিক উপাত্তের মাধ্যমেই কেবল বোঝা সম্ভব যে মানুষ আসলে কত কর্মঘণ্টা কাজ করছে এবং তারা প্রকৃত অর্থে বেকার কি না।
তার মতে, সরকারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং কোন খাতে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে, তা নির্ধারণের জন্য সঠিক উপাত্তের ওপর নির্ভর করা অপরিহার্য। বেশি গণসংলাপ বা জনগণের সাথে আলোচনার আয়োজন করা প্রয়োজন। যাতে সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত হয়। পরিসংখ্যান ব্যুরো এবং পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগকে আরো শক্তিশালী ও পেশাদার করার আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
আলেয়া আক্তার বলেন, আমরা কজন আমাদের জন্মের সঠিক তথ্য দিচ্ছি? আমরাই যেহেতু সঠিক তথ্য দিচ্ছি না, তাই সঠিক ডাটা পাওয়াও কঠিন।
অর্থনীতি
করমুক্ত আয়সীমা ৫ লাখ ও সর্বোচ্চ করহার ২৫% করার প্রস্তাব ঢাকা চেম্বারের
ব্যক্তি শ্রেণির করমুক্ত আয়সীমা ৫ লাখ টাকা এবং সর্বোচ্চ করহার ২৫ শতাংশ নির্ধারণের প্রস্তাব দিয়েছে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই)। পাশাপাশি নন-লিস্টেড কোম্পানির করহার লিস্টেড কোম্পানির সমান ২৫ শতাংশ ও পূর্ণাঙ্গ অটোমেটেড করপোরেট কর রিটার্ন পদ্ধতি চালু করাও প্রস্তাব দিয়েছে সংগঠনটি।
সোমবার (১৩ এপ্রিল) রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে ‘প্রাক-বাজেট আলোচনা ২০২৬-২৭: বেসরকারি খাতের প্রত্যাশা’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় ডিসিসিআই এসব প্রস্তাব দেয়। ডিসিসিআই, চ্যানেল-২৪ ও দৈনিক সমকাল যৌথভাবে এই মতবিনিময় সভার আয়োজন করে।
ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সদস্য মনজুর হোসেন, ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স (আইসিসি) বাংলাদেশের সভাপতি মাহবুবুর রহমান, ডিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি শামস মাহমুদ, ডিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি রিজওয়ান রাহমান, ইনস্টিটিউট অব কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশ (আইসিএমএবি) প্রেসিডেন্ট মো. কাওসার আলম, আইসিএবি প্রেসিডেন্ট এন কে এ মবিন, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) চেয়ারম্যান মমিনুল ইসলাম, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের (ইউসিবি) চেয়ারম্যান শরীফ জহীর প্রমুখ।
ডিসিসিআই’র প্রস্তাবনায় বলা হয়, পিএসআর ভেরিফিকেশন প্রক্রিয়া আরও দ্রুত ও কার্যকর করতে ইটিডিএস প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার বাধ্যতামূলক করে ই-ট্যাক্স এনবিআর পোর্টালের সঙ্গে সমন্বিত করে পিএসআর স্বয়ংক্রিয়করণ। আমদানি পর্যায়ে আগাম কর উৎপাদনকারীদের জন্য পর্যায়েক্রমে বিলুপ্তি ও বাণিজ্যিক আমদানিকারকদের জন্য হ্রাস করা। ভ্যাট সংগ্রহে অনলাইন ম্যানেজম্যান্টের (ওয়েবসাইট) পাশাপাশি মোবাইল অ্যাপ চালু করা। অগ্রিম ভ্যাট ব্যবস্থা সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত করে পণ্য বা সেবার চূড়ান্ত মূল্যের ওপর ভ্যাট নির্ধারণ করা। সিঙ্গেল স্টেপ রিফান্ড ব্যবস্থা চালু করে দ্রুত ভ্যাট রিফান্ড প্রক্রিয়া সহজীকরণ।
ডিসিসিআই বলছে, স্থানীয় বিনিয়োগের প্রবৃদ্ধির জন্য নীতি সুদহার যৌক্তিকীকরণ করা। সরকারি ঋণ গ্রহণে দেশীয় ব্যাংক ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা হ্রাস এবং ব্যয়ের দক্ষতা বৃদ্ধি করা জরুরি। উৎপাদনশীল খাতে লক্ষ্যভিত্তিক পুনঃঅর্থায়ন, ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিম ও ক্রেডিট ইনফরমেশন চালু করা জরুরি।
ফিনান্সিয়াল অ্যান্ড নন ফিনান্সিয়াল সেক্টরে কর্পোরেট গভর্নেন্স, সুপারভিশন এবং মনিটরিং বাড়াতে হবে। দীর্ঘমেয়াদী অর্থায়ন করতে নতুন আইপিও বৃদ্ধি এবং বড় প্রতিষ্ঠান ও এসএমই-এর তালিকাভুক্তি উৎসাহিত করা ও দীর্ঘমেয়াদী বন্ড চালু করা।
শিল্প ও বাণিজ্য সম্পর্কিত ডিসিসিআই’র প্রস্তাবনার মধ্যে রয়েছে চামড়া শিল্প উন্নয়নে কার্যকর সিইটিপি স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় বরাদ্দ ও ব্যক্তি পর্যায় ইফুলুয়েনফ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (ইটিপি) স্থাপনের জন্য সহজ শর্তে ঋণ নিশ্চিত এবং কৃষি পণ্যের প্রসারে পণ্য ভিত্তিক কোল্ড চেইন অবকাঠামো উন্নয়ন করা প্রয়োজন। এলডিসি গ্র্যাডুয়েশনের আগে ফার্মাসিটিক্যাল, আইসিটি, ইলেক্ট্রনিক্স, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্পসহ অন্যান্য সেবাখাতে পেটেন্ট নিশ্চিত করতে এবং আইপিআর এসাইকোড তৈরিতে বিশেষ প্রনোদনা দেওয়া। লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্পে সিএমএসএমইদের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে বিআইটিএসি এর র মেটারিয়াল ব্যাংক এর সরবরাহ সারাদেশে নিশ্চিত করতে বাজেট বরাদ্দ রাখা। সেমিকন্ডাক্টর খাতের গবেষণা ও উন্নয়ন কেন্দ্র স্থাপন, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সি -এ সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বিশেষায়িত পার্কের জন্য বাজেটে আলাদা বরাদ্দ রাখা। উৎপাদনমুখী সিএমএসএমই-গুলোর উচ্চ উৎপাদন খরচ এবং জ্বালানির দামের অস্থিরতা মোকাবিলায় ৫-৬ শতাংশ হারে সুনির্দিষ্ট ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল সহায়তার বাজেটে বরাদ্দ রাখা। ওষুধ শিল্পের বিকাশে মুন্সিগঞ্জের এপিআই পার্কের অবকাঠামো উন্নয়ন, বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সুবিধা নিশ্চিত করা।
ডিসিসিআই বলছে, অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে উচ্চমূল্যের নির্মাণ উপকরণ এবং মেশিনারির ওপর শুল্ক ও ভ্যাট ছাড় নিশ্চিত করা। ইনফ্রাস্ট্রাকচার বন্ড, সুকুক ও অন্যান্য ইনোভেটিভ ফাইন্যান্সিং মডেল চালু করে দীর্ঘমেয়াদী অর্থায়নের সুযোগ বৃদ্ধি করা।
জ্বালানির দাম প্রেডিক্টেবল রাখতে রপ্তানিকারক দেশসমূহের সঙ্গে দীর্ঘ মেয়াদী চুক্তির মাধ্যমে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করে শিল্প ও ভোক্তাদের ওপর চাপ কমানো।
প্রকল্প নির্বাচন ও বাস্তবায়নে মিতব্যয়ী হওয়া এবং প্রকল্পগুলো মনিটরিং ও ইভালুয়েশনে রিয়েল টাইম মনিটরিং সিস্টেম চালু করা।
সেবা খাতের তথ্য সংরক্ষণে হাই সিকিউরিটি ডেটা সেন্টার স্থাপন। নতুন মেগাপ্রকল্প নেওয়ার চেয়ে বিদ্যমান প্রকল্পগুলোর ‘লাস্ট মাইল কানেক্টিভিটি’ (যেমন- হাইওয়ে থেকে কারখানায় যাওয়ার সংযোগ সড়ক নিশ্চিত করা। উৎপাদনশীল খাতের কম্পলাইন্স নিশ্চিত করণ ও প্রতিযোগীতাসক্ষমতা ধরে রাখার জন্য এনভায়রনমেন্টাল, সোস্যাল অ্যান্ড কর্পোরেট গভার্মেন্স (ইএসজি বাস্তবায়নে বাজেট সহায়তা প্রদান করা প্রয়োগ।



