মত দ্বিমত
নিউইয়র্ক নির্বাচনের বিতর্ক জোহরান মামদানির বিজয় ও বৈচিত্র্যময় নেতৃত্ব
নিউইয়র্ক সিটিতে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত মেয়র নির্বাচনে জোহরান মামদানির বিজয় ঘটে। তিনি ডেমোক্র্যাটিক সোশ্যালিস্ট হিসেবে পরিচিত এবং সমাজতান্ত্রিক নীতির প্রতি দৃঢ় অঙ্গীকার প্রকাশ করেন। তাঁর বিজয়ী ভাষণে মানবতার নতুন দিনের সূচনা, শ্রমজীবী মানুষের ক্ষমতায়ন, নির্বাচনী প্রক্রিয়ার সমালোচনা এবং আন্তর্জাতিক সংহতি ও ন্যায়বিচারের প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত হয়েছে।
এই নির্বাচনের পর আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। বিশেষ করে এলন মাস্কের সমালোচনা এবং কিছু আন্তর্জাতিক সংস্থার উদ্বেগ এই ঘটনাকে বহুমাত্রিক বিতর্কে পরিণত করেছে। এলন মাস্ক মামদানিকে সমর্থন করেননি এবং কঠোর সমালোচনা করেছেন। তিনি মামদানিকে মনোমুগ্ধকর প্রতারক বা আকর্ষণীয় ধোঁকাবাজ (charismatic swindler) হিসেবে অভিহিত করেছেন এবং সতর্ক করেছেন যে তাঁর নীতিগুলি বাস্তবায়িত হলে শহরের সব শ্রেণির মানুষের জন্য বিপর্যয় সৃষ্টি হতে পারে। মাস্ক মামদানির নাম ভুল বানান করে মুমদুমি বা যাই হোক উল্লেখ করেছেন, যা অনেকের মতে বর্ণবাদী মন্তব্য হিসেবে গণ্য হয়েছে।
তিনি ভোটারদের সাবধান করেছেন যে কনজারভেটিভ প্রার্থী কুর্টিস স্লিওয়ারকে ভোট দিলে তা মামদানির পক্ষে যাবে। মাস্কের মতে মামদানির নীতি কলোনিয়ালিজম এবং নতুন সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গির অভাবের কারণে আমেরিকান সংস্কৃতিকে সঠিকভাবে ধারণ করতে পারবে না। তিনি আরও বলেছেন যে এই ধরনের সমাজতান্ত্রিক নীতি বাস্তবায়িত হলে শহরের অর্থনীতি এবং জীবনযাত্রার মানে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। মাস্কের এই মন্তব্য রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত এবং তিনি ভয় পেয়েছেন যে সমাজতান্ত্রিক নীতি বাস্তবায়িত হলে ব্যবসায়িক পরিবেশ ও অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। একই সঙ্গে তাঁর মন্তব্যে বর্ণবাদ ও সাংস্কৃতিক সংবেদনশীলতার বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
মামদানির প্রতিক্রিয়া স্পষ্ট এবং দৃঢ় ছিল। তিনি ট্রাম্পের হুমকিকে অবৈধ এবং অসাংবিধানিক বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেছেন আমরা নিউইয়র্কবাসী এবং আমাদের অধিকার আমাদেরই থাকবে। তিনি উল্লেখ করেছেন যারা নিউইয়র্কের সংস্কৃতি এবং জনগণের স্বার্থকে অবমূল্যায়ন করে তাদের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে। মামদানির বক্তব্যে তার সাংস্কৃতিক পরিচয় এবং রাজনৈতিক দৃঢ়তার প্রতিফলন দেখা গেছে এবং আন্তর্জাতিক সমালোচনার মাঝেও তিনি নীতির প্রতি অটল থাকার সংকল্প প্রকাশ করেছেন। তাঁর কিছু মন্তব্য যেমন গ্লোবালাইজ দ্য ইন্তিফাদা আন্তর্জাতিকভাবে সমালোচিত হয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও ব্যক্তিত্ব এটিকে অ্যান্টি-সেমিটিক হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। মামদানি এই মন্তব্যকে ব্যাখ্যা করেছেন প্যালেস্টাইনের মানবাধিকার রক্ষার প্রতীকী আহ্বান হিসেবে।
এই নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে দেখা যায় বড় শহরগুলোর রাজনৈতিক নেতৃত্বের বৈচিত্র্য ক্রমবর্ধমান। উদাহরণস্বরূপ লন্ডনের মেয়র একজন পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত মুসলিম এবং নিউইয়র্ক সিটির মেয়র আফ্রিকা-ইন্ডিয়ান বংশোদ্ভূত মুসলিম। এই পরিবর্তন প্রমাণ করে যে বহু-সাংস্কৃতিক এবং বহু-ধর্মীয় সমাজে নেতৃত্বের ক্ষেত্রে বৈচিত্র্য ক্রমবর্ধমান। তবে একই সঙ্গে কিছু অংশের মধ্যে ভীতিশঙ্কা এবং বিদ্বেষের বৃদ্ধি লক্ষ্য করা যায়। দীর্ঘ ইতিহাস ধরে মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতি বিশ্বব্যাপী বিদ্বেষ বা ইসলামোফোবিয়া বিদ্যমান। নতুন মুসলিম নেতা নির্বাচিত হওয়ায় কিছু অংশের মধ্যে ভয় এবং অনিরাপত্তা বোধ জন্মায়। সামাজিক মাধ্যম এবং রাজনৈতিক বিবৃতির মাধ্যমে এই বিদ্বেষ ক্রমবর্ধমান এবং কখনও কখনও নির্বাচন এবং নীতিনির্ধারণেও প্রভাব ফেলে।
নতুন নেতৃত্বের নীতিগুলো কখনও কখনও ব্যবসায়িক এবং ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর স্বার্থের সঙ্গে সংঘর্ষে আসে। এলন মাস্কের সমালোচনা জোহরান মামদানির সমাজতান্ত্রিক নীতির বিরুদ্ধে একটি উদাহরণ। এটি দেখায় কিভাবে অর্থনৈতিক স্বার্থ, রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং সাংস্কৃতিক ভীতি একত্রিত হয়ে বিতর্কের জন্ম দেয়। তবে বৈচিত্র্যকে শক্তি হিসেবে গ্রহণ করা গেলে রাজনৈতিক নেতৃত্বে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের অভিজ্ঞতা এবং প্রয়োজন অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব। এটি সমাজকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং ন্যায়সঙ্গত করে। ধর্মীয় এবং সাংস্কৃতিক সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা নতুন বিশ্বের পরিকল্পনার মূল ভিত্তি হতে হবে। বিদ্বেষ প্রতিরোধে শিক্ষা, সচেতনতা এবং সমন্বিত নীতি অপরিহার্য। বৈচিত্র্যময় নেতৃত্বের সমর্থন এবং সমালোচনা উভয় ক্ষেত্রেই নিরপেক্ষ এবং ন্যায়সঙ্গত সংলাপ প্রয়োজন। সামাজিক ভীতিকে রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তরিত হওয়া থেকে প্রতিরোধ করা গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশে বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্র রাজনীতিতে নতুন ঢেউ দেখা গেছে। ছাত্র শিবিরের বিজয় কেবল এক বিশ্ববিদ্যালয়ের সীমাবদ্ধ ঘটনা নয়, এটি দেশের রাজনৈতিক এবং সামাজিক মনোভাবের প্রতিফলন। এই নতুন প্রজন্মের নেতৃত্ব এবং তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ দেশের রাজনীতিতে জামায়াত ইসলামের প্রভাবকে দৃঢ় করেছে। এমনকি পাশের দেশগুলোতেও এ প্রভাব অনায়াসে লক্ষ্য করা যায়। প্রশ্ন ওঠে, এই নতুন প্রজন্মের উত্থান কি সত্যিই গোটা বিশ্বকে চমকে দিতে পারবে, নাকি প্রকৃত অর্থে ইসলাম, যেহু শান্তির ধর্ম কুরআনের আলোকে, বিশ্বকে শান্তির পথে অগ্রসর করতে সহায়তা করছে, সেটিই আমাদের বিশ্বাসের মূল কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত।
জোহরান মামদানির বিজয়ী ভাষণ, এলন মাস্কের সমালোচনা এবং আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া মিলিত হয়ে একটি জটিল রাজনৈতিক এবং সামাজিক বিতর্ক তৈরি করেছে। সংকট হিসেবে দেখা যায় ভীতিশঙ্কা, বিদ্বেষ এবং সাংস্কৃতিক অজ্ঞতা। সম্ভাবনা হিসেবে দেখা যায় নতুন বিশ্ব গঠন, সকলের সুরক্ষা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক নেতৃত্ব। সঠিক নীতি এবং দিকনির্দেশনা গ্রহণের মাধ্যমে বৈচিত্র্যকে শক্তি হিসেবে ব্যবহার করে একটি সাম্য, ন্যায় এবং শান্তির ভিত্তিতে বিশ্ব গঠন সম্ভব। বৈচিত্র্যকে ভয় নয় শক্তি হিসেবে গ্রহণ করলে সমাজের অন্তর্ভুক্তি, ন্যায় এবং শান্তি নিশ্চিত করা সম্ভব।
লেখক রহমান মৃধা
গবেষক ও লেখক, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন
rahman.mridha@gmail.com
মত দ্বিমত
জুলাই বিপ্লবের প্রজন্ম: পরিবর্তনের অগ্নিশিখা না নতুন রাষ্ট্রচিন্তার সূচনা?
ছাত্রনেতৃত্বে এক অভ্যুত্থান শুধু সরকার পরিবর্তন করেনি, বরং প্রশ্ন তুলেছে ক্ষমতা, গণতন্ত্র এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রব্যবস্থা নিয়ে।ইতিহাসের কিছু মুহূর্ত থাকে যা কেবল একটি রাজনৈতিক ঘটনা নয়, বরং একটি জাতির মানসিক রূপান্তরের সূচনা। বাংলাদেশের জুলাই বিপ্লব তেমনই একটি মুহূর্ত। ছাত্রদের নেতৃত্বে শুরু হওয়া এই আন্দোলন শেষ পর্যন্ত এমন এক গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়, যার ফলে দীর্ঘদিনের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।
এই আন্দোলনের শুরু ছিল সরকারি চাকরির কোটা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ছাত্রদের প্রতিবাদ থেকে, কিন্তু দ্রুত তা জাতীয় বিদ্রোহে পরিণত হয়। এখানেই নতুন প্রজন্মের চরিত্র স্পষ্ট হয়: তারা কেবল একটি নীতির পরিবর্তন চায়নি, তারা রাষ্ট্রের কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। কিন্তু এই প্রজন্ম কি সত্যিই অতীত থেকে আলাদা?
হ্যাঁ, একটি বড় অর্থে আলাদা। তারা ক্ষমতার উত্তরাধিকারকে স্বাভাবিক ধরে নেয় না। তারা বৈষম্যহীন সমাজের স্বপ্নে সংগঠিত হয়েছে, যেমন ‘বৈষম্যের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীরা’ প্ল্যাটফর্মটি দেখায়, যা আন্দোলনের মাধ্যমে রাজনৈতিক পরিসর গড়ে তুলতে কাজ করেছে। এই তরুণ নেতৃত্বের মধ্যেই উঠে এসেছে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নাম।
নাহিদ ইসলাম, যিনি ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক ছিলেন, এক পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগের এক দফা দাবি ঘোষণা করে বিপ্লবের সবচেয়ে পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন। পরে তিনি অন্তর্বর্তী সরকারেও দায়িত্ব পালন করেন। অন্যদিকে, নাসিরউদ্দিন পাটোয়ারী জাতীয় নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে একটি বৈষম্যহীন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্র গঠনের লক্ষ্যে প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছেন।
ঢাকা-৮ আসনের মতো রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এক মঞ্চে নাসিরউদ্দিন পাটোয়ারীর প্রার্থিতা শুধু একটি নির্বাচন নয়, বরং নতুন ধারার রাজনীতির এক প্রতীকী পরীক্ষা। জাতীয় নাগরিক পার্টি তাঁকে এই আসনে প্রার্থী করেছে, যা তরুণ নেতৃত্বের সামনে আসার একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করে। কিন্তু তাঁর পথ মোটেই মসৃণ নয়। প্রচারণার সময় তাঁকে লক্ষ্য করে ডিম নিক্ষেপ ও হয়রানির ঘটনা ঘটেছে, যা রাজনৈতিক মতভেদের প্রতি অসহিষ্ণুতার প্রশ্ন তুলে দিয়েছে এবং তদন্তের নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
তবু এখানেই এই গল্পের মোড়। প্রতিকূলতার মুখে দাঁড়িয়েও তাঁর অংশগ্রহণ দেখায় যে রাজনীতি কেবল ক্ষমতার প্রতিযোগিতা নয়, বরং ধারণা, সাহস এবং সামাজিক চিন্তারও প্রতিযোগিতা। ঢাকা-৮-এর লড়াই তাই একটি আসনের সীমা ছাড়িয়ে ভিন্ন মতের সহাবস্থান, অংশগ্রহণমূলক রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং নতুন প্রজন্মের আত্মপ্রকাশের প্রতীক হয়ে উঠছে। যখন একটি প্ল্যাটফর্ম সমাজকে শুধু বিনোদনের আলোচনায় আটকে না রেখে চিন্তার পরিসরকে বিস্তৃত করতে চায়। তখন সেই রাজনীতি ধীরে ধীরে বিশ্বদরবারে নিজের ভাষা তৈরি করে। আর সেই ভাষার কেন্দ্রে থাকে একটি বার্তা: ভয় নয়, ভবিষ্যৎই শেষ পর্যন্ত ইতিহাস লিখে। এটি শুধু নেতৃত্ব নয়, একটি দৃষ্টিভঙ্গির ইঙ্গিত। পরিবর্তনের দর্শন: পরিষ্কার না হলেও শক্তিশালী।
সমালোচকেরা বলেন, নতুন প্রজন্মের পরিকল্পনা সবসময় স্পষ্ট নয়। সত্যি বলতে, বিপ্লবের ভাষা প্রায়ই অসম্পূর্ণ হয়। কিন্তু অসম্পূর্ণতা মানেই দুর্বলতা নয়। জুলাই ঘোষণাপত্রে রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক সংস্কার, গণতান্ত্রিক পুনর্গঠন এবং বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
অর্থাৎ, এই আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল একটি বড় প্রশ্ন: রাষ্ট্র কাদের জন্য? ত্যাগের মূল্য এই বিপ্লব ছিল রক্তহীন নয়। সহিংসতার সময় এক হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হন, যা দেশের স্বাধীনতার পর সবচেয়ে প্রাণঘাতী সময়গুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত। এটি মনে করিয়ে দেয়, পরিবর্তন কখনোই বিনামূল্যে আসে না। ভুল, বিভ্রান্তি এবং বাস্তবতা যে কোনো গণআন্দোলনের মতো এখানেও বিতর্ক আছে। কেউ কেউ অভিযোগ তুলেছেন যে বিপ্লবের স্মৃতি রাজনৈতিকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে, যার বিরুদ্ধে নাগরিক নেতারা সতর্ক করেছেন। এই সতর্কবার্তা গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ একটি বিপ্লব তখনই সফল হয়, যখন তা ক্ষমতার নতুন কেন্দ্রে পরিণত না হয়ে প্রতিষ্ঠান তৈরি করে। নতুন পৃথিবীর ইঙ্গিত আজকের বিশ্বে তরুণরা আর কেবল দর্শক নয়। তারা রাষ্ট্রের অংশীদার হতে চায়। বাংলাদেশের ঘটনাপ্রবাহ দেখায়, ঐক্য এমন এক শক্তি যা কেনা যায় না।
এই প্রজন্ম হয়তো সব প্রশ্নের উত্তর জানে না। কিন্তু তারা একটি প্রশ্ন করতে শিখেছে: কেন নয় এবং ইতিহাসে প্রায় সব বড় পরিবর্তন শুরু হয়েছে এই প্রশ্ন থেকেই। সবচেয়ে বড় পরীক্ষা এখন স্বৈরাচারী পরিবার ও সরকারের পতন বিপ্লবের শেষ নয়, বরং শুরু।
নতুন নেতৃত্ব কি প্রতিষ্ঠান গড়তে পারবে? তারা কি ব্যক্তিনির্ভর রাজনীতি ভেঙে নীতিনির্ভর রাষ্ট্র তৈরি করবে? তারা কি আবেগকে নীতিতে রূপ দিতে পারবে? যদি পারে, তবে জুলাই শুধু একটি মাসের নাম থাকবে না। এটি হয়ে উঠবে একটি রাজনৈতিক পুনর্জন্মের প্রতীক।
পরিশেষে একটি আহ্বান বাংলাদেশ আজ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। তরুণরা দেখিয়ে দিয়েছে সাহস কাকে বলে। এখন তাদের প্রমাণ করতে হবে প্রজ্ঞা কাকে বলে। কারণ বিপ্লবের সবচেয়ে কঠিন কাজ হলো ক্ষমতা দখল নয়,ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা। জাগো বাংলাদেশ জাগো কিন্তু এবার শুধু প্রতিবাদে নয়, রাষ্ট্রগঠনে।
রহমান মৃধা, গবেষক ও লেখক, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন
rahman.mridha@gmail.com
মত দ্বিমত
বাংলাদেশ কি তথ্যযুদ্ধের মধ্যে ঢুকে পড়েছে?
সাম্প্রতিক সময়ে গণমাধ্যমের একটি ফেসবুক ভেরিফায়েড পেইজে জামায়াতের আমিরকে ঘিরে একটি মন্তব্য ছড়িয়ে পড়ে, যা দ্রুত ভাইরাল হয়ে সারা দেশে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। প্রযুক্তির এই যুগে, যেখানে নারী বিশ্বনেতৃত্ব দিচ্ছে, আরব সভ্যতায় পরিবর্তন ঘটছে, এবং ইসলামের ইতিহাসেই হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সহধর্মিণী হজরত খাদিজা (রা:) ছিলেন একজন সফল ব্যবসায়ী ও সমাজে সম্মানিত প্রতিনিধি, সেই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে নারীদের কাজ করাকে পতিতাবৃত্তির সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে বলে প্রচারিত হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়।
পরবর্তী তদন্তে উঠে এসেছে, সংশ্লিষ্ট ভেরিফায়েড পেইজটি হ্যাক করা হয়েছিল এবং এই বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো হয়েছিল বিশেষ করে আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে একটি রাজনৈতিক দলকে প্রশ্নবিদ্ধ করার উদ্দেশ্যে। ঘটনাটি শুধু একটি গুজব নয়, এটি দেখিয়ে দেয় কত সহজে একটি সাজানো বার্তা সমাজে ক্ষোভ, বিভাজন এবং রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি করতে পারে। এই ঘটনাই একটি বড় বাস্তবতা সামনে আনে, ডিজিটাল যুগে সত্য প্রকাশ পাওয়ার আগেই মিথ্যা জনমত গড়ে তুলতে পারে। আর যখন একটি ভুয়া বার্তা জাতীয় বিতর্কে পরিণত হয়, তখন সেটি আর কেবল একটি পোস্ট থাকে না সেটি হয়ে ওঠে তথ্যযুদ্ধের অংশ।
বাংলাদেশ এখন শুধু রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেই নেই, দেশটি ধীরে ধীরে একটি গভীর তথ্যসংকটে প্রবেশ করছে। নির্বাচনের আগে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার অভিযোগকে অন্তর্বর্তী সরকার ডিসইনফরমেশন বলে উড়িয়ে দিয়েছে এবং দাবি করেছে, দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে ইচ্ছাকৃতভাবে এসব ছড়ানো হচ্ছে। অন্যদিকে একটি বড় জরিপে দেখা গেছে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে খুব বেশি পরিমাণে ভুয়া খবর তরুণদের মানসিক চাপের প্রধান কারণ হয়ে উঠেছে। এই দুটি ঘটনা একসাথে একটি কঠিন প্রশ্ন তুলে ধরে: কোন তথ্য সত্য, আর কোনটি রাজনৈতিক অস্ত্র?
ভুয়া তথ্যের বিস্ফোরণ, সংখ্যাই বলছে বিপদের কথা। স্বাধীন ফ্যাক্ট-চেকিং সংস্থা রুমর স্ক্যানার-এর প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২৫ সালের প্রথম তিন মাসে বাংলাদেশে ৮৩৭টি ভুয়া বা বিভ্রান্তিকর তথ্য শনাক্ত হয়েছে, যা আগের সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি। ভুল তথ্যের হার আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২৮ শতাংশ বেশি। রাজনৈতিক ঘটনা, জাতীয় ইস্যু এবং ধর্মীয় বিতর্ক এই বৃদ্ধির প্রধান কারণ। ৭৪৮টি ভুয়া তথ্য ফেসবুক থেকে ছড়িয়েছে, অর্থাৎ গড়ে প্রতিদিন আটটিরও বেশি। বিশ্লেষণে আরও দেখা গেছে, মোট বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট ৩০ শতাংশ বেড়েছে এবং দুই-তৃতীয়াংশ ফ্যাক্ট-চেক ছিল রাজনৈতিক। স্বাধীন ফ্যাক্ট-চেকিং সংস্থার প্রতিবেদনে উঠে আসা এই পরিসংখ্যান শুধু তথ্যের পরিমাণই নয়, বরং একটি রাষ্ট্রের তথ্যপরিবেশ কত দ্রুত দূষিত হতে পারে, সেই সতর্কবার্তাও বহন করে।
নির্বাচন সামনে, তাই কি গুজবও অস্ত্র? একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যাচাই করা ভুয়া দাবির প্রায় ৬৩ শতাংশই রাজনৈতিক, এবং এর অর্ধেক ছিল বানানো সমাবেশ, সংঘর্ষ বা নেতাদের ভুয়া বক্তব্য নিয়ে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সবচেয়ে বেশি ভুয়া বয়ানের লক্ষ্য হয়েছেন, যার ৮০ শতাংশ তাকে ইতিবাচকভাবে উপস্থাপন করেছে। অর্থাৎ অপপ্রচার শুধু প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করছে না; অনেক ক্ষেত্রে জনপ্রিয়তা তৈরির হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে। উদ্বেগের বিষয় হলো, বিভ্রান্তিকর তথ্য এখন আর প্রান্তিক কোনো সমস্যা নয়; এটি জনমত নির্মাণের একটি কৌশলগত উপাদানে পরিণত হয়েছে।
রাষ্ট্র, রাজনীতি, বিদেশি প্রভাব, জটিল ত্রিভুজ। ফ্যাক্ট-চেক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে যে নিরাপত্তা বাহিনী সম্পর্কেও ৬০টি ভুল দাবি ছড়ানো হয়েছে এবং ভারতীয় মিডিয়া ও সামাজিক মাধ্যম মিলিয়ে অন্তত ৮৩টি বিভ্রান্তিকর ঘটনার সঙ্গে যুক্ত ছিল। এটি একটি বিপজ্জনক সংকেত, কারণ তথ্যযুদ্ধ যখন সীমান্ত ছাড়িয়ে যায়, তখন তা কূটনৈতিক উত্তেজনায়ও রূপ নিতে পারে।
সমাজ কেন এত সহজে গুজবে বিশ্বাস করছে? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বড় রাজনৈতিক ঘটনা, ধর্মীয় উত্তেজনা এবং অনলাইন মেরুকরণ ভুল তথ্য ছড়ানোর গতি বাড়িয়েছে। অতীতে একটি গুজব ছড়িয়ে পড়েছিল যে পদ্মা সেতুর জন্য মানববলির প্রয়োজন, এবং সেই ভুল তথ্য প্রাণহানির ঘটনাও ঘটিয়েছিল। অর্থাৎ ভুয়া খবর শুধু মতামত বদলায় না, জীবনও কেড়ে নিতে পারে।
সরকার কী করছে, আর কী করা উচিত? তরুণদের অধিকাংশই মনে করে ক্ষতিকর অনলাইন আচরণ ঠেকাতে নিয়ম থাকা জরুরি। কিন্তু এখানে সবচেয়ে বড় দ্বন্দ্ব হলো: অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ দিলে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ঝুঁকিতে পড়ে, আর নিয়ন্ত্রণ না দিলে রাষ্ট্র অস্থিতিশীল হতে পারে। এই ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন সরকারের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। সমস্যাটি শুধু কে মিথ্যা বলছে তা নয়; বড় প্রশ্ন হলো, নাগরিকরা কোন উৎসকে বিশ্বাস করবে। যখন বিশ্বাসের কেন্দ্রগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন গণতন্ত্রের ভিত্তিও অদৃশ্যভাবে ক্ষয় হতে শুরু করে।
প্রতিরক্ষা ও রাষ্ট্রীয় সংস্থার ভূমিকা। ভুল তথ্য যখন সেনাবাহিনী বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে লক্ষ্য করে ছড়ায়, তখন তা শুধু রাজনৈতিক নয়, জাতীয় নিরাপত্তার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। আধুনিক রাষ্ট্রে নিরাপত্তা মানে শুধু সীমান্ত রক্ষা নয়; তথ্যের নিরাপত্তাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সবচেয়ে বড় বিপদ: বিশ্বাসের পতন। একটি রাষ্ট্র তখনই দুর্বল হয় যখন নাগরিকরা আর কোনো উৎসকে বিশ্বাস করতে পারে না। আজ বাংলাদেশের সামনে তিনটি বাস্তব ঝুঁকি দাঁড়িয়ে আছে: সত্যের সংকট, গণতন্ত্রের সংকট, এবং আন্তর্জাতিক মর্যাদার সংকট। ইতিহাস দেখায়, কোনো রাষ্ট্র হঠাৎ ভেঙে পড়ে না; ভাঙন শুরু হয় তখনই, যখন সত্য নিয়ে সামাজিক ঐকমত্য হারিয়ে যায়।
বাংলাদেশ এখনো ভেঙে পড়েনি, কিন্তু সতর্ক না হলে ভাঙনের ভিত্তি তৈরি হবে। রাষ্ট্রকে অবিলম্বে স্বাধীন ও শক্তিশালী ফ্যাক্ট-চেকিং ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, রাজনৈতিক দলগুলোর অপপ্রচারকে আইনের আওতায় আনতে হবে, এবং ডিজিটাল সাক্ষরতা জাতীয় আন্দোলনে পরিণত করতে হবে। কারণ একটি সত্য স্পষ্ট: বন্দুক রাষ্ট্রকে যতটা না দুর্বল করে, মিথ্যা তার চেয়েও দ্রুত রাষ্ট্রকে ভেঙে দেয়।
শেষ কথা। বাংলাদেশ আজ এক মোড়ে দাঁড়িয়ে। এটি কি তথ্যনির্ভর আধুনিক রাষ্ট্র হবে, নাকি গুজবনির্ভর অস্থির সমাজে পরিণত হবে? সিদ্ধান্ত এখনই নিতে হবে। কারণ ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, গণতন্ত্র নির্বাচন হারিয়ে ধ্বংস হয় না; গণতন্ত্র ধ্বংস হয় যখন সত্য হারিয়ে যায়।
রহমান মৃধা, গবেষক ও লেখক, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন
rahman.mridha@gmail.com
মত দ্বিমত
দাভোস আমাকে আরেকবার মনে করিয়ে দিল, নিজের পায়ে দাঁড়ানোর বিকল্প নেই
প্রশ্ন একটাই। বাংলাদেশ কি দাভোসের বার্তা শুনেছে? বাংলাদেশ মানে কেবল ভৌগোলিক সীমারেখা নয়। বাংলাদেশ মানে সিদ্ধান্তের সার্বভৌম অধিকার। বাংলাদেশের সব সিদ্ধান্ত বাংলাদেশই নেবে। এই রাষ্ট্রের জন্ম কোনো করুণা থেকে নয়, জন্ম হয়েছে এ দেশের মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য। বাংলাদেশ আমার, আপনার, আমাদের সবার।
ভয়, শাস্তি কিংবা শক্তি ইউরোপকে দাবিয়ে রাখতে পারেনি। ইতিহাস তা স্পষ্ট করে দিয়েছে। তাহলে প্রশ্ন ওঠে, বাংলাদেশকে দাবিয়ে রাখার সাহস আসে কোথা থেকে? এই সাহস কি আকাশ থেকে নামে, নাকি আমাদের ভেতর থেকেই কেউ বা কোনো গোষ্ঠী সেই সুযোগ করে দেয়? যদি ভেতরের দুর্বলতা না থাকে, বাইরের শক্তি কখনোই সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে পারে না।
গণভোটের পরই স্পষ্ট হবে, কত বিপুল সংখ্যক না ভোট বাংলাদেশের মানুষের প্রকৃত অবস্থান তুলে ধরছে। যারা সত্যিকারের দেশপ্রেমিক, তারা তখনই বুঝবে রাষ্ট্র আসলে কোথায় দাঁড়িয়ে আছে।
যদি কোনো প্রতিবেশী আমাদের শত্রু হতে চায়, সেটি আমাদের সংকট নয়। বরং সেটিই সিদ্ধান্ত নেওয়ার উপযুক্ত সময়। আমরা কি অসুস্থ প্রতিবেশীর সঙ্গে একই শর্তে সম্পর্ক বজায় রাখব, নাকি নিজেদের স্বার্থ, মর্যাদা ও ভবিষ্যৎকে অগ্রাধিকার দেব?
‘উই ক্যান অনলি উন্ডারস্ট্যান্ড টি ফিলিং অফ ডিভোশন ইফ টি নাইবোর্স শেয়ার আওয়ার প্যাশন’
দাভোসে একটি বিষয় বারবার ফিরে এসেছে। সভাকক্ষ, প্যানেল আলোচনা, করিডোরের আলাপ সবখানেই একই প্রশ্ন। আমরা কতদিন আমেরিকা, রাশিয়া কিংবা যুদ্ধের পেছনে সময় ব্যয় করব? কতদিন অন্যের সংঘাত, অন্যের ক্ষমতার দ্বন্দ্ব আমাদের চিন্তার কেন্দ্রে থাকবে? দাভোস বলছে, এখন সময় নিজেদের দিকে তাকানোর।
কীভাবে আমরা নিজেদের ভাগ্য বদলাতে পারি, সেটিই ছিল আলোচনার মূল সুর। কীভাবে একটি জাতি নিজের শক্তি নিজেই গড়ে তোলে। শিক্ষা, দক্ষতা, প্রযুক্তি, নৈতিকতা এবং প্রতিষ্ঠানকে শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করিয়ে। শক্তি মানে কেবল সামরিক শক্তি নয়। শক্তি মানে আত্মবিশ্বাসী রাষ্ট্র। শক্তি মানে এমন সমাজ, যেখানে সিদ্ধান্ত আসে জনগণ থেকে, ভয় থেকে নয়।
দাভোস মনে করিয়ে দিয়েছে, শ্রেষ্ঠ জাতি কেউ জন্মগতভাবে হয় না। শ্রেষ্ঠ জাতি গড়ে ওঠে সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতায়। ভুল স্বীকার করার সাহসে। নিজেদের দুর্বলতা ঢাকার চেষ্টা না করে, সেগুলো কাটিয়ে ওঠার দৃঢ়তায়।
বাংলাদেশের সামনে প্রশ্ন তাই বাইরের শক্তিকে নিয়ে নয়। প্রশ্ন আমাদের নিজেদের নিয়ে। আমরা কি আমাদের মানুষের ওপর আস্থা রাখব? আমরা কি সিদ্ধান্ত নেবো নিজেদের বাস্তবতা, সক্ষমতা ও ভবিষ্যৎকে সামনে রেখে? নাকি সারাক্ষণ অন্যের যুদ্ধ, অন্যের হুমকি আর অন্যের অনুমতির অপেক্ষায় থাকব?
দাভোস একটি বার্তাই দিয়েছে। কেউ এসে আমাদের ভাগ্য লিখে দেবে না। দাঁড়াতে হবে নিজের পায়ে। শক্ত হতে হবে নিজের ভিত থেকে। রাষ্ট্র গড়তে হবে মানুষের অধিকার, মর্যাদা ও অংশগ্রহণের ওপর। এই পথ সহজ নয়। কিন্তু এটাই একমাত্র পথ। কারণ বাংলাদেশ কোনো দাবার ঘুঁটি নয়। বাংলাদেশ একটি জাতির সিদ্ধান্ত।
রহমান মৃধা, গবেষক ও লেখক, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন
rahman.mridha@gmail.com
মত দ্বিমত
বিশ্বব্যবস্থার রাজনৈতিক অস্থিরতা: নীরব সমাজ, শক্তিধর রাষ্ট্র ও ন্যায়ের রূপান্তর
বর্তমান বিশ্ব এক গভীর রাজনৈতিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই রূপান্তর কোনো একটি দেশের ভেতরে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি একই সঙ্গে ইউরোপ, আমেরিকা, এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার সমাজ ও রাষ্ট্র কাঠামোকে প্রভাবিত করছে। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয় বিশ্ব অস্থির, কিন্তু ভেতরে ভেতরে আরও ভয়াবহ একটি বিষয় ঘটছে। মানুষ ধীরে ধীরে এই অস্থিরতাকে স্বাভাবিক বলে মেনে নিচ্ছে। অন্যায় ক্রমে ন্যায়ে পরিণত হচ্ছে, আর নীরবতা হয়ে উঠছে সামাজিক প্রতিক্রিয়ার প্রধান ভাষা।
ন্যাটো জোট ও পশ্চিমা ঐক্যের ফাটল
দীর্ঘদিন ধরে ন্যাটোকে পশ্চিমা নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক ঐক্যের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই জোটের ভেতরেই মতপার্থক্য, দ্বন্দ্ব ও স্বার্থের সংঘাত প্রকাশ্যে এসেছে। ইউক্রেন যুদ্ধ, প্রতিরক্ষা ব্যয়, অভিবাসন প্রশ্ন এবং যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক নেতৃত্বের ভূমিকা নিয়ে ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে ভিন্নমত ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। অনেক দেশ এখন প্রশ্ন তুলছে, ন্যাটো কি সত্যিই সমান নিরাপত্তা নিশ্চিত করে, নাকি এটি কিছু শক্তিধর রাষ্ট্রের কৌশলগত হাতিয়ার মাত্র।
এই বিভাজন কেবল সামরিক নয়। সাম্প্রতিক গ্রিনল্যান্ড ইস্যু এই ফাটলকে আরও দৃশ্যমান করেছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প ডেনমার্ক ও ইউরোপীয় মিত্রদের আপত্তির জবাবে গ্রিনল্যান্ডের ওপর শুল্ক হুমকি দিয়েছে। এটি ন্যাটো জোটের ভেতরের সম্পর্ককে চাপের মধ্যে ফেলে দিয়েছে—যেখানে মিত্র দেশগুলো নিরাপত্তা চাচ্ছে, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা পদক্ষেপে তাদের কৌশলগত স্বাধীনতা সীমিত হচ্ছে। ফলে দেখা যাচ্ছে, ন্যাটোর ঐক্য এখন শর্তযুক্ত আনুগত্যের ওপর ভিত্তি করে এবং শক্তিধর রাষ্ট্রের স্বার্থ দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে।
জাতিসংঘ: নীতি আছে, কার্যকারিতা নেই
জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে, যাতে ভবিষ্যতে বিশ্ব আর এমন বিপর্যয়ের মুখে না পড়ে। কিন্তু আজ জাতিসংঘ ক্রমেই একটি প্রতীকী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যদের ভেটো ক্ষমতা বাস্তব ন্যায়বিচারকে বারবার আটকে দিচ্ছে।
গাজা, ইউক্রেন, ইয়েমেন, সুদান বা আফ্রিকার বিভিন্ন সংঘাতে জাতিসংঘের সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট। নীতি আছে, প্রস্তাব আছে, কিন্তু কার্যকর প্রয়োগ নেই। এর ফলে সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন জাগছে, আন্তর্জাতিক আইন কার জন্য এবং কাদের বিরুদ্ধে।
গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার রূপান্তর ও সংকট
গণতন্ত্র এখনও শব্দ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, কিন্তু এর চর্চা বদলে গেছে। নির্বাচন হচ্ছে, কিন্তু ভোটারের প্রকৃত ক্ষমতা সংকুচিত। রাজনৈতিক দলগুলো কর্পোরেট অর্থায়নের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। প্রচারণা, মিডিয়া কাভারেজ ও জনমত গঠনে পুঁজির ভূমিকা এতটাই প্রবল যে সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বর প্রায় অদৃশ্য।
অনেক দেশে নির্বাচনী ব্যবস্থাকে আইনগতভাবে ঠিক রাখা হলেও বাস্তবে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হচ্ছে সীমিত কিছু গোষ্ঠীর হাতে। এটি একটি নরম অথচ গভীর কর্তৃত্ববাদ, যেখানে গণতন্ত্রের কাঠামো থাকে, কিন্তু আত্মা থাকে না।
শক্তিধর রাষ্ট্র ও নতুন ক্ষমতার বিন্যাস
বিশ্ব এখন একমুখী নেতৃত্বের যুগে নেই। যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও আঞ্চলিক শক্তিগুলো নিজেদের মতো করে প্রভাব বিস্তার করছে। এই বহুমুখী শক্তি কাঠামো একদিকে ভারসাম্য তৈরি করলেও অন্যদিকে অনিশ্চয়তা বাড়াচ্ছে।
ছোট ও দুর্বল রাষ্ট্রগুলো এই প্রতিযোগিতার মাঝে পড়ে যাচ্ছে। তাদের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা সীমিত হচ্ছে ঋণ, বাণিজ্য, সামরিক চুক্তি ও কূটনৈতিক চাপের মাধ্যমে।
পুঁজিবাদ ও রাজনীতির মেলবন্ধন
বর্তমান পুঁজিবাদ আর শুধু অর্থনীতির বিষয় নয়। এটি সরাসরি রাজনীতির নিয়ন্ত্রক শক্তি। বড় কর্পোরেশনগুলো নীতি নির্ধারণে প্রভাব ফেলছে, কর ব্যবস্থাকে নিজেদের পক্ষে ঘুরিয়ে নিচ্ছে এবং শ্রম, পরিবেশ ও সামাজিক ন্যায়ের প্রশ্নকে গৌণ করে তুলছে।
এর ফল সবচেয়ে বেশি পড়ছে গরিব ও মধ্যবিত্ত মানুষের ওপর। সামাজিক নিরাপত্তা সংকুচিত হচ্ছে, শ্রমের মূল্য কমছে, আর জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ছে।
ইনফ্লেশন ও দৈনন্দিন জীবনের রাজনীতি
ইনফ্লেশন শুধু একটি অর্থনৈতিক শব্দ নয়। এটি মানুষের জীবনের প্রতিটি স্তরে রাজনীতির উপস্থিতি। খাদ্য, বাসস্থান, স্বাস্থ্য ও জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি মানুষকে টিকে থাকার সংগ্রামে আটকে দিচ্ছে। যখন মানুষ প্রতিদিনের বেঁচে থাকার লড়াইয়ে ব্যস্ত থাকে, তখন রাষ্ট্র ও ক্ষমতার জবাবদিহি প্রশ্ন করার শক্তি হারিয়ে ফেলে।
ফ্যাসিস্ট প্রবণতা ও ভয়ের রাজনীতি
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ফ্যাসিস্ট প্রবণতা নতুন রূপে ফিরে আসছে। এটি এখন আর শুধু সামরিক বুটের শব্দ নয়, বরং আইন, ভাষা ও সংস্কৃতির মাধ্যমে ধীরে ধীরে বিস্তার লাভ করছে। ভয়ের রাজনীতি ব্যবহার করে নাগরিক স্বাধীনতা সীমিত করা হচ্ছে।
মহামারী, দুর্নীতি ও নৈতিক অবক্ষয়
মহামারী দেখিয়ে দিয়েছে সংকটের সময় রাষ্ট্র কতটা মানবিক হতে পারে বা পারে না। একই সঙ্গে দুর্নীতি ও বৈষম্যের কাঠামো আরও উন্মোচিত হয়েছে।
তাহলে সমাজ কেন মেনে নিচ্ছে
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, এতকিছুর পরেও সমাজ কেন প্রতিরোধ গড়ে তুলছে না। এর কারণ ক্লান্তি, ভয়, বিভ্রান্তি এবং বিকল্প কল্পনার অভাব। মানুষ ধীরে ধীরে শিখে নিচ্ছে যে ক্ষমতার সিদ্ধান্ত প্রশ্ন করার জায়গা সংকুচিত, আর ব্যক্তিগত টিকে থাকাই প্রধান লক্ষ্য। এই নীরবতা কার্যত শক্তিধর রাষ্ট্র ও কর্পোরেট ক্ষমতার পক্ষে কাজ করে। অন্যায় এখানে হঠাৎ করে ন্যায় হয়ে যায় না, বরং দীর্ঘ সময় ধরে প্রশ্নহীন থাকতে থাকতে ন্যায় বলে মেনে নেওয়া হয়।
গ্রিনল্যান্ড সংকট ও ট্রাম্পের শুল্ক হুমকি
গ্রিনল্যান্ড ইস্যু দেখিয়েছে কিভাবে শক্তিধর রাষ্ট্রের একতরফা পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক জোট ও মিত্র সম্পর্ককে চাপের মধ্যে ফেলে। ডোনাল্ড ট্রাম্প ডেনমার্ক ও ইউরোপীয় মিত্রদের আপত্তির জবাবে গ্রিনল্যান্ডের ওপর শুল্ক হুমকি দিয়েছেন।
• এটি ন্যাটো জোটের ভেতরের ফাটল আরও স্পষ্ট করেছে, যেখানে মিত্র দেশগুলো নিরাপত্তা চাচ্ছে, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা পদক্ষেপে তাদের কৌশলগত স্বাধীনতা সীমিত হচ্ছে।
• শুল্কের প্রভাব শুধুমাত্র রাষ্ট্রের ওপর সীমিত নয়; এটি বাজারে, মূল্যস্ফীতি ও ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতায় প্রভাব ফেলছে। ফলে সাধারণ মানুষ এই রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ বহন করছে, আর রাজনৈতিক প্রতিরোধের শক্তি ক্ষয় পাচ্ছে।
গ্রিনল্যান্ড ইস্যু ও শুল্ক হুমকি আমাদের একটি কঠিন বার্তা দেয়। ভবিষ্যৎ বিশ্ব রাজনীতি হবে আরও ক্ষমতানির্ভর, যেখানে আন্তর্জাতিক আইন ও নৈতিকতার ভাষা থাকবে, কিন্তু প্রয়োগ হবে শক্তির ভাষায়। ছোট ও মাঝারি রাষ্ট্রগুলোর জন্য এটি একটি সতর্ক সংকেত, আর সাধারণ মানুষের জন্য এটি একটি নীরব বিপদ।
প্রশ্ন একটাই থেকে যায়, আমরা কি এই নতুন স্বাভাবিকতাকে মেনে নেব, নাকি একে প্রশ্ন করার নতুন রাজনৈতিক কল্পনা তৈরি করব।
রহমান মৃধা, গবেষক ও লেখক, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন
rahman.mridha@gmail.com
মত দ্বিমত
এআই বিভ্রান্তি বাংলাদেশের দুর্নীতিকে আরও শক্তিশালী করে
বাংলাদেশে দুর্নীতি কোনো বিচ্ছিন্ন ব্যতিক্রম নয়। এটি বহু মানুষের কাছে একটি পরিচিত বাস্তবতা, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে একটি স্বাভাবিক ব্যবস্থা। ঘুষ, প্রভাব, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং তথ্য গোপন করা বহুদিন ধরেই প্রাত্যহিক অভিজ্ঞতার অংশ। কিন্তু সাম্প্রতিক বৈশ্বিক পরিবর্তন এই সমস্যাকে আরও গভীর করছে।
একদিকে যুক্তরাষ্ট্রসহ শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর শুল্কনীতি ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ, অন্যদিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে তথ্য ও ছবির ব্যাপক বিকৃতি। এই দুটি শক্তি একত্রে বাংলাদেশের মতো দুর্বল গণতান্ত্রিক ও উচ্চ দুর্নীতিগ্রস্ত রাষ্ট্রে একটি বিপজ্জনক বাস্তবতা তৈরি করছে।
বিশ্ব অর্থনীতির টানাপোড়েন সরাসরি বাংলাদেশের ওপর প্রভাব ফেলে। রপ্তানি খাত, ডলার সংকট, মূল্যস্ফীতি এবং কর্মসংস্থানের চাপ সাধারণ মানুষের জীবনকে কঠিন করে তুলছে। এই চাপের মুখে রাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা বাড়ে। কিন্তু যখন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোই দুর্নীতিগ্রস্ত হয়, তখন এই চাপ সাধারণ মানুষকে আরও অসহায় করে তোলে।
এই অবস্থায় দুর্নীতি কেবল অর্থনৈতিক সমস্যা থাকে না। এটি ক্ষমতার ভাষা হয়ে ওঠে। মানুষ বুঝে যায় যে নিয়ম মেনে কিছু পাওয়া কঠিন, কিন্তু প্রভাব থাকলে সব সম্ভব। ফলে দুর্নীতি মোকাবিলার নৈতিক শক্তিটাই দুর্বল হয়ে পড়ে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেকটি নতুন বাস্তবতা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দ্বারা তৈরি ছবি, ভিডিও ও তথ্য। বাংলাদেশের মতো দেশে যেখানে স্বাধীন ও শক্তিশালী তথ্য যাচাই ব্যবস্থা দুর্বল, সেখানে এআই দ্বারা তৈরি বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট সহজেই সত্য হিসেবে ছড়িয়ে পড়ে।
রাজনৈতিক বক্তব্য, সামাজিক অস্থিরতা, আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র কিংবা অর্থনৈতিক সংকট, সব কিছুর ক্ষেত্রেই এখন এমন ছবি ও ভিডিও দেখা যায় যেগুলো মানুষের আবেগকে উসকে দেয়, কিন্তু সত্য যাচাই করার সুযোগ বা সক্ষমতা খুব কম মানুষের থাকে।
এখানেই দুর্নীতি ও এআই একে অপরকে শক্তিশালী করে। দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা থাকে না। স্বচ্ছতা না থাকলে সত্য যাচাই করা কঠিন হয়। আর যখন সত্য অস্পষ্ট থাকে, তখন এআই দ্বারা তৈরি মিথ্যা সহজেই জায়গা করে নেয়।
এই পরিস্থিতিতে দুর্নীতিবাজদের জন্য এআই একটি কার্যকর ঢাল। বিভ্রান্তি যত বাড়ে, জবাবদিহি তত কমে। মানুষ যখন নিশ্চিত হতে পারে না কোনটি সত্য আর কোনটি সাজানো, তখন রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতাও ধোঁয়াশার আড়ালে হারিয়ে যায়।
প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কীভাবে এই বাস্তবতাকে মোকাবিলা করবে।
প্রথমত, দুর্নীতিকে কেবল নৈতিক ব্যর্থতা হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি একটি কাঠামোগত সমস্যা। যতদিন রাজনৈতিক ক্ষমতা, অর্থনীতি ও প্রশাসন জবাবদিহির বাইরে থাকবে, ততদিন দুর্নীতি স্বাভাবিক আচরণ হিসেবেই চলতে থাকবে।
দ্বিতীয়ত, এআই ও তথ্য প্রযুক্তিকে আলাদা কোনো বিলাসী বিষয় হিসেবে দেখা যাবে না। এটি এখন জাতীয় নিরাপত্তা ও গণতান্ত্রিক টিকে থাকার প্রশ্ন। রাষ্ট্রকে বাধ্যতামূলকভাবে স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশ, ডিজিটাল ট্রেসেবিলিটি এবং ভুয়া কনটেন্ট শনাক্ত করার সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে।
তৃতীয়ত, সাধারণ মানুষের তথ্য বোঝার ক্ষমতা বাড়ানো ছাড়া কোনো সমাধান টেকসই হবে না। মানুষ যদি না বোঝে কীভাবে ছবি বানানো হয়, কীভাবে ভিডিও বিকৃত করা হয়, তাহলে তারা সব সময় শক্তিশালীদের তৈরি বাস্তবতার শিকার হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রাজনৈতিক সদিচ্ছা। দুর্নীতিকে যদি সত্যিই মোকাবিলা করতে হয়, তাহলে ক্ষমতাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড়ানোর সাহস দেখাতে হবে। এআই বা বৈশ্বিক অর্থনীতিকে অজুহাত বানিয়ে রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা ঢেকে রাখলে সংকট আরও গভীর হবে।
বাংলাদেশ আজ এমন এক মোড়ে দাঁড়িয়ে যেখানে অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও তথ্য একসঙ্গে মানুষের জীবন নির্ধারণ করছে। এই বাস্তবতায় দুর্নীতিকে স্বাভাবিক ধরে নেওয়া মানে ভবিষ্যৎকে পরিকল্পিতভাবে দুর্বল করে দেওয়া।
প্রশ্ন এখন একটাই। বাংলাদেশ কি এই নতুন বাস্তবতাকে চিনে ব্যবস্থা নেবে, নাকি বিভ্রান্তি, দুর্নীতি ও বৈষম্যের মধ্যেই এগিয়ে যেতে থাকবে।
আসন্ন নির্বাচন ও নতুন ঝুঁকির বাস্তবতা
এই প্রেক্ষাপটে আসন্ন নির্বাচন বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দ্বারা তৈরি ছবি, ভিডিও ও তথ্য নির্বাচনী পরিবেশকে সহজেই প্রভাবিত করতে পারে। সহিংসতা, জনসমর্থন কিংবা রাষ্ট্রীয় অবস্থান সংক্রান্ত ভুয়া কনটেন্ট ভোটারদের আবেগকে উসকে দিতে পারে, যার সত্যতা যাচাই করার সক্ষমতা অনেকের নেই।
যখন নির্বাচনী প্রক্রিয়ার ওপর আগে থেকেই আস্থার সংকট থাকে, তখন এই ধরনের বিভ্রান্তি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা দুর্বল থাকায় প্রকৃত অনিয়ম এবং কৃত্রিমভাবে তৈরি বিভ্রান্তির মধ্যে পার্থক্য করা কঠিন হয়ে পড়ে। এর ফল হিসেবে ভোটার আস্থা ক্ষয় হয় এবং গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ কমে যায়।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় কয়েকটি বিষয় জরুরি হয়ে উঠেছে। প্রথমত, নির্বাচনী সময় তথ্য ও ভিজ্যুয়াল কনটেন্ট যাচাইয়ের জন্য স্বাধীন ও কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলা। দ্বিতীয়ত, রাষ্ট্রীয় ও নির্বাচন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের তথ্য প্রকাশে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। তৃতীয়ত, সাধারণ মানুষের মধ্যে এআই ও ডিজিটাল কনটেন্ট সম্পর্কে ন্যূনতম সচেতনতা তৈরি করা, যাতে তারা বিভ্রান্তিকে প্রশ্ন করতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো রাজনৈতিক সদিচ্ছা। যদি নির্বাচনকে সত্যিকার অর্থে বিশ্বাসযোগ্য করতে হয়, তাহলে প্রযুক্তি বা বৈশ্বিক পরিস্থিতিকে অজুহাত না বানিয়ে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। নইলে এআই দ্বারা তৈরি বিভ্রান্তি এবং পুরনো দুর্নীতির সংস্কৃতি একসঙ্গে নির্বাচনকে অর্থহীন করে তুলবে।
রহমান মৃধা, গবেষক ও লেখক, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন
rahman.mridha@gmail.com



