মত দ্বিমত
বৈশ্বিক বিনিয়োগ ও বাংলাদেশের পুঁজিবাজার
একটি নতুন সময়ের চিত্র
বিশ্ব এখন এমন এক বিনিয়োগ সময়ের মুখোমুখি যেখানে পুরনো স্থিতিশীলতা আর নেই। গত কয়েক দশকের পরিচিত অর্থনৈতিক গতিশীলতা, বাজারের নিয়ম ও নিশ্চিত বিনিয়োগ প্রবাহ ভেঙে পড়েছে। অর্থনীতি, ভূরাজনীতি এবং প্রযুক্তির পরিবর্তনের জটিলতায় বিশ্বব্যাপী পুঁজির গতিপথ নতুন রূপ নিচ্ছে। এই পরিবর্তনের ঢেউ বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোকে সরাসরি প্রভাবিত করছে।
বৈশ্বিক বিনিয়োগ প্রবণতা
গত কয়েক বছরে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগে ক্রমাগত ধীরগতি দেখা গেছে। United Nations Conference on Trade and Development জানিয়েছে যে ২০২৪ সালে বৈশ্বিক প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে এবং ২০২৫ সাল এখনও অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। এর অর্থ, উন্নয়নশীল দেশগুলো বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি।
এশিয়া অঞ্চলে পুঁজিবাজার কিছু অগ্রগতির ইঙ্গিত দিলেও বাজারের গভীরতা, দায়বদ্ধতা এবং স্বচ্ছতার অভাব এখনো প্রকট। উন্নয়নশীল দেশগুলো এখনও ঝুঁকি এবং মানবসম্পদ সংকটে ভুগছে। ফলে অতিরিক্ত বিনিয়োগের সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও বাজার স্থিতিশীল নয়।
বেসরকারি মৌলধন বা প্রাইভেট ইকুইটি বাজার কিছুটা পুনরুদ্ধার করলেও আগের অবস্থায় ফিরতে পারেনি। বড় লেনদেন ধীর এবং বিনিয়োগকারীরা অত্যন্ত সতর্ক। এর ফলে উদ্ভাবন এবং উদ্যোগে অর্থায়নের গতি কমে যাচ্ছে। ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, সুদের হার বৃদ্ধি, মুদ্রাস্ফীতি চাপ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিবর্তন এবং নিয়ন্ত্রক অনিশ্চয়তা বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি মূল্যায়নে বাধ্য করছে। এসব প্রবণতা মিলিয়ে বিশ্ব এখন নতুন বিনিয়োগ যুগের মুখোমুখি, যেখানে পুরনো নিশ্চয়তা আর নেই এবং বাজারকে নতুন চোখে দেখা ছাড়া বিকল্প নেই।
বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের বর্তমান চিত্র
“একটি দেশের জিডিপির একটি বড় অংশ হচ্ছে দেশের পুঁজিবাজার, কিন্তু বাংলাদেশে সবচেয়ে অবহেলিত পুঁজিবাজার।” বাংলাদেশে পুঁজিবাজার দীর্ঘদিন ধরে নির্ভরযোগ্যতা ও স্বচ্ছতার অভাবে দুর্বল। নীচে মূল বিষয়গুলো বিশ্লেষণ করা হলো। ব্যাংক একীভূতকরণ: নীতি, সংকট ও ঝুঁকি কিছু দুর্বল ব্যাংককে অন্যান্য ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর ফলে দেশের অর্থনীতি ও পুঁজিবাজারের জন্য তিনটি বড় সংকট তৈরি হয়েছে।
১. তালিকাভুক্ত ব্যাংকের শেয়ারের ভবিষ্যত অনিশ্চিত। বিনিয়োগকারীরা জানে না তাদের অর্থের ফলাফল কী হবে।
২. বিনিয়োগকারীর মতামত উপেক্ষিত। আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী শেয়ারহোল্ডারের ভোট, স্বাধীন মূল্যায়ন এবং ন্যায্য বিনিময় অনুপাত নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক। বাংলাদেশে এগুলো কার্যকরভাবে হয় না।
৩. নৈতিক সংকট। যদি অডিট অনুযায়ী ব্যাংক স্থিতিশীল ছিল তাহলে হঠাৎ পতন কেন। আর যদি দুর্বল ছিল তাহলে অডিটে ধরা পড়েনি কেন। এটি বিনিয়োগকারীর আস্থা ভেঙে দেয় এবং বাজারকে ঝুঁকিপূর্ণ করে।
শেয়ারহোল্ডারের অধিকার
শেয়ারহোল্ডারের মৌলিক অধিকারগুলো কার্যকর না হলে বাজার টেকসই হয় না। এই অধিকারগুলো হলো:
১. ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা
২. স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশ করা যেমন নন-পেরফর্মিং লোন, ক্যাপিটাল অ্যাডিকোয়েসি এবং অডিট রিপোর্ট
৩. শেয়ারহোল্ডারের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা
৪. ক্ষতির ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীর ক্ষতিপূরণের অধিকার
বাংলাদেশে এই অধিকারগুলো প্রায়ই উপেক্ষিত। ফলে বিনিয়োগকারীর আস্থা দুর্বল হয়ে গেছে এবং বাজার অনিরাপদ স্থানে আটকে আছে।
পুঁজিবাজার পতনের মূল কারণ
বাংলাদেশে বাজার পতন কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। বরং এটি দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সংকটের ফল।
১. নীতির অস্থিরতা: হঠাৎ নতুন নীতি যেমন সার্কিট ব্রেকার, মার্কেট মেকার নীতি বা মার্জিন লোন নীতি বাজারকে অনিশ্চিত করে।
২. স্বচ্ছতার অভাব: ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং তালিকাভুক্ত কোম্পানির প্রকৃত আর্থিক অবস্থা জনসমক্ষে আসে না।
৩. গোষ্ঠী স্বার্থে বাজার নিয়ন্ত্রণ: দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ রয়েছে, কিন্তু কার্যকর সমাধান নেই।
৪. সাধারণ বিনিয়োগকারীর বিশ্বাসহীনতা: মানুষ বিশ্বাস করে না যে তাদের টাকা নিরাপদ, নীতি ন্যায্য এবং রেগুলেটর নিরপেক্ষ।
নির্দিষ্ট পথ নির্দেশনা: নতুন আলো কীভাবে দেওয়া সম্ভব
বাংলাদেশ চাইলে এই সংকট কাটিয়ে পুঁজিবাজারে নতুন আলো দিতে পারে। এর জন্য ধাপমূলক রোডম্যাপ প্রস্তাব করা হলো।
১. নীতি ধারাবাহিকতা এবং পূর্বঘোষণা
নতুন নীতি হঠাৎ পরিবর্তন না করে স্পষ্টভাবে ঘোষণা করতে হবে। সার্কিট ব্রেকার, মার্কেট মেকার এবং মার্জিন লোন নীতিকে দীর্ঘমেয়াদি ভিত্তিতে স্থির করতে হবে।
২. বিনিয়োগকারীর অধিকার রক্ষা
মার্জার বা অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে শেয়ারহোল্ডারের ভোট বাধ্যতামূলক করতে হবে।
রেগুলেটর ব্যর্থ হলে ক্ষতিপূরণের স্বচ্ছ নীতি থাকা জরুরি।
৩. সুশাসন প্রতিষ্ঠা
কর্পোরেট গভর্ন্যান্স শক্তিশালী করতে হবে।
ইন্সাইডার ট্রেডিং কঠোরভাবে দমন করতে হবে।
কোম্পানির অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ শক্তিশালী করতে হবে।
৪. নিয়ন্ত্রক সংস্থার দক্ষতা ও স্বাধীনতা
BSEC এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকির ক্ষমতা বাড়াতে হবে।
আন্তর্জাতিক মানের অডিট পদ্ধতি নিশ্চিত করতে হবে।
৫. বিনিয়োগকারীর তথ্যপ্রবাহ ও শিক্ষার উন্নয়ন
সহজ ভাষায় তথ্য প্রকাশ, বিনিয়োগ-ঝুঁকি সচেতনতা বৃদ্ধি, মিডিয়া ও রেগুলেটরের যৌথ উদ্যোগে বাজার-সচেতনতা তৈরি।
৬. উদ্ভাবনী খাতে পুঁজিবাজারের সম্পৃক্ততা
প্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, গ্রিন ইনভেস্টমেন্ট ইত্যাদিতে পুঁজিবাজারের শক্তি ব্যবহার।
৭. ধাপভিত্তিক রূপান্তর রোডম্যাপ
প্রথম বছর: নীতি রিভিউ ও আইন সংস্কার।
দ্বিতীয় বছর: তদারকি শক্তিশালী করা ও শেয়ারহোল্ডারের অধিকার নিশ্চিত।
তৃতীয় বছর: উদ্ভাবনী বাজার ব্যবস্থা চালু করা এবং বিনিয়োগকারীর আস্থা ফিরিয়ে আনা।
শেষ আহ্বান
বিশ্বের ধনী দেশ, ক্ষমতাধারী ব্যক্তি এবং কর্পোরেট নেতৃত্বের উদ্দেশ্যে একটি স্পষ্ট বার্তা। বিশ্বের অর্থনীতির সংকটের মূল প্রভাবগুলো হচ্ছে বিশ্বরাজনীতিতে অস্থিতিশীলতা, সামরিক সংঘাত, রোবটিক ও প্রযুক্তিগত দ্বন্দ্ব, কুটনৈতিক কুচক্র এবং যুদ্ধ। এই বাস্তবতায় যদি কাগজে কলমে আমরা গণতন্ত্রে বিশ্বাস করি, তাহলে এলন মাস্কের মতো একজনের ভোটের মতো আমারও একটি ভোট। এখন ভাবুন যদি দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বাড়তে থাকে এবং গুরুত্বপূর্ণ শহরে কোটি কোটি ডলার বিনিয়োগ সত্ত্বেও নেতৃস্থানীয় মানুষকে হারানো সম্ভব হয়নি, তাহলে অর্থ দিয়ে ক্ষমতা ধরে রাখার চেষ্টা কতটা কার্যকর হবে।
এখন বিশ্বের কাছে প্রশ্ন: আমরা চাই অবিচার ও বিশৃঙ্খলা নাকি ন্যায্যতা ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা?
Rahman Mridha, গবেষক এবং লেখক, প্রাক্তন পরিচালক, Pfizer, Sweden
rahman.mridha@gmail.com
মত দ্বিমত
২০২৬ সালের নির্বাচন: বাংলাদেশের নৈতিক পুনর্গঠন ও নাগরিকের চূড়ান্ত দায়িত্ব
বাংলাদেশ এখন এক গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় নির্বাচনের মুখে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু এই নির্বাচন কেবল ক্ষমতার পালাবদলের ঘটনা নয়। এটি রাষ্ট্র, নাগরিক এবং মানবতার পরীক্ষা, যেখানে নাগরিকই চূড়ান্ত নির্দেশক। যে রাষ্ট্র কথার সঙ্গে কাজ মিলিয়ে নাগরিককে সম্মান দেয়, সে রাষ্ট্র টিকে থাকে। যে রাষ্ট্র কথা বলে কিন্তু কাজ নয়, সে সমাজকে বিভ্রান্ত করে। এই পরীক্ষায় তিনটি দেশের পাঠ আমাদের শিক্ষা দেয়, সুইডেন, ভ্রুনাই এবং বাংলাদেশ।
সুইডেনের পাঠ স্পষ্ট। শক্তিশালী রাষ্ট্র মানে নৈতিক ও মানবিক প্রতিষ্ঠান। আইন সবার জন্য সমান, বিচার স্বাধীন, প্রশাসন ব্যক্তি নয়, নীতির অধীনে কাজ করে। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সামাজিক সুরক্ষা, সব নাগরিক অধিকার। কথার সঙ্গে কাজের মিল এত দৃঢ় যে নাগরিক ভয় পায় না, বরং বিশ্বাস পায়। উদাহরণস্বরূপ, সরকারি হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সবার জন্য উন্মুক্ত। দুর্নীতিমূলক ঘটনা ধরা পড়লেই প্রশাসন দ্রুত ব্যবস্থা নেয়। আদালত এবং পুলিশ প্রশাসনের স্বচ্ছ, স্বতন্ত্র ও নিরপেক্ষ ভূমিকা সুইডেনের নাগরিকদের আস্থা তৈরি করে। নাগরিকরা তাদের অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন, যা রাষ্ট্রকে স্থিতিশীল রাখে। গণতন্ত্রের শক্তি ব্যক্তির ওপর নয়, নৈতিক প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক বিশ্বাসের ওপর নির্ভর করে।
ভ্রুনাই দেখায়, গণতন্ত্র সীমিত হলেও নৈতিক দায়িত্ব ও মানবিকতা রাষ্ট্রকে স্থিতিশীল রাখে। সুলতানের শাসনে মৌলিক চাহিদা পূরণ, নিরাপত্তা, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং সংযম বজায় থাকে। মত প্রকাশ সীমিত হলেও নাগরিকের জীবন নিরাপদ থাকে। উদাহরণস্বরূপ, ভ্রুনাইতে সামাজিক নিরাপত্তা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কারণে জনগণ রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা রাখে। এটি শেখায়, স্বাধীনতা না থাকলেও রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা নির্ভর করে দায়িত্ববোধ এবং মানুষের মৌলিক নিরাপত্তার ওপর।
বাংলাদেশ আজ সেই পরীক্ষার মুখে। কথার সঙ্গে কাজের দূরত্ব ক্রমশ বাড়ছে। রাষ্ট্র বলে গণতন্ত্র, আইন ও মানবাধিকার, কিন্তু বাস্তবে আইন প্রয়োগ হয় পরিচয়ভিত্তিক, ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত, ভিন্নমত শাস্তিযোগ্য। নাগরিক প্রায়ই রাষ্ট্রের ভাড়াটে। কথার সঙ্গে কাজের এই অমিল সমাজে বিশ্বাসের সংকট, নৈতিক ও মানবিক অবক্ষয় বৃদ্ধি করছে। উন্নয়ন প্রকল্পের বড় বাজেট থাকলেও প্রান্তিক জনগণের জীবনমান অপরিবর্তিত। দুর্নীতি, ভোট চুরি, প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার, হত্যা এবং অপরাধ, এসব পরিস্থিতি সমাজে আতঙ্ক ও অসন্তোষ তৈরি করছে। উদাহরণস্বরূপ, একটি উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে সরকারিভাবে বরাদ্দকৃত ওষুধ প্রান্তিক মানুষের কাছে পৌঁছায় না। স্থানীয় প্রশাসন রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে সমস্যার সমাধান করে না।
এই সংকটময় পরিস্থিতিতে মানবিক, সাংস্কৃতিক ও সাহিত্যিক সংস্থা নাগরিকদের জন্য দিকনির্দেশক। এটি কোনো রাজনৈতিক দল নয়। এটি মানুষের নৈতিক চেতনা, বিবেক এবং সাংস্কৃতিক কণ্ঠ। সাহিত্য ও সংস্কৃতি রাষ্ট্রকে টেকসই রাখে। উদাহরণস্বরূপ, নাগরিক শিক্ষা আন্দোলন, কবিতা উৎসব, সাংস্কৃতিক কর্মশালা, এগুলো মানুষকে সচেতন করে এবং নৈতিকতার দিকনির্দেশনা দেয়। যখন রাষ্ট্র কথা বলে কিন্তু কাজ নয়, তখন এই কণ্ঠই সত্যের প্রতিফলন। নাটক, সাহিত্য বা স্থানীয় কবিতা পাঠের মাধ্যমে মানুষ নিজের অভিজ্ঞতা ও নৈতিক প্রশ্ন সামনে আনতে শেখে।
এক রাতেই পরিবর্তন সম্ভব নয়। সুইডেন বা ভ্রুনাইয়ের মতো দেশ অর্জন করতে হলে সময়, ধৈর্য এবং ধারাবাহিক সংস্কার দরকার। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রশাসন, বিচার ব্যবস্থা এবং সামাজিক নৈতিকতার পরিকাঠামো পরিবর্তন অপরিহার্য। প্রশাসনকে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও জবাবদিহিমূলক করতে আইন ও নীতির সংস্কার প্রয়োজন। নাগরিককেও আপোষহীন নৈতিকতা এবং মানবিক চেতনার সঙ্গে অংশগ্রহণ করতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, স্থানীয় নির্বাচনের পরও নাগরিকদের সভা, গণমাধ্যম নজরদারি এবং প্রতিবাদ সক্রিয় রাখতে হবে।
২০২৬ সালের নির্বাচন বাংলাদেশের জন্য শেষ সুযোগ, রাষ্ট্রকে নৈতিকভাবে পুনর্গঠন করার, নাগরিককে মালিক বানানোর, উন্নয়নকে মানবিকভাবে বাস্তবায়নের।
নাগরিকের জন্য পাঁচটি দিক নির্দেশনা
১. ভয় নয়, বিবেক দিয়ে ভোট দিন। শুধু পারিবারিক বা রাজনৈতিক চাপের জন্য নয়, নিজের বিশ্লেষণ, অভিজ্ঞতা এবং তথ্য অনুযায়ী ভোট দিন।
২. ব্যক্তি নয়, নীতি দেখুন। নেতা বা দলের প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তব অর্জন বিচার করুন।
৩. মিথ্যাকে স্বাভাবিক ভাববেন না। রাষ্ট্রের ভাষা মিথ্যায় ভরা হলে সমাজের নৈতিকতা ক্ষয় হয়। সংবাদপত্র, সামাজিক মাধ্যম ও স্থানীয় সভার মাধ্যমে তথ্য যাচাই করুন।
৪. ঘৃণার রাজনীতি প্রত্যাখ্যান করুন। ভিন্নমতকে শত্রু ভাবা গণতন্ত্রকে ধ্বংস করে। সংলাপ, যৌক্তিক বিতর্ক এবং শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ নিশ্চিত করুন।
৫. ভোটের পরও দায়িত্ব নিন। প্রশ্ন করা, দাবি তোলা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাই রাষ্ট্রকে নৈতিক রাখে। স্থানীয় সভা, সামাজিক উদ্যোগ ও গণমাধ্যমের অংশীদারিত্ব বৃদ্ধি করুন।
স্মরণ করুন, রাষ্ট্র বন্দুক বা ক্ষমতা দিয়ে টিকে থাকে না। রাষ্ট্র টিকে থাকে মানুষের বিশ্বাস, নৈতিকতা ও মানবিকতার কারণে।
সুইডেন দেখায়, নৈতিক প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রকে বিশ্বাসযোগ্য করে।
ভ্রুনাই দেখায়, দায়িত্ববোধ রাষ্ট্রকে স্থিতিশীল রাখে।
বাংলাদেশ শেখায়, নৈতিকতা হারালে উন্নয়ন অর্থহীন।
নাগরিকের দায়িত্ব হলো মানুষ হয়ে কথা বলা। আমাদের সাহিত্য, সংস্কৃতি এবং মানবিক চেতনা রাষ্ট্রকে শক্তিশালী রাখে। রাজনীতি কেবল ক্ষমতার লড়াই নয়, এটি নৈতিকতা ও মানবতার পরীক্ষা। বাংলাদেশ যদি এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়, রাষ্ট্র স্থিতিশীল, মানবিক এবং বিশ্বাসযোগ্য হবে।
২০২৬ সালের নির্বাচন রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্কের এক যুগোপযোগী পরীক্ষা। এটি কোনো দলের নয়, এটি প্রতিটি নাগরিকের। এখনই সময় মানুষ হয়ে কথা বলার, নৈতিক ও মানবিক চেতনার প্রতি দায়িত্ব স্মরণ করার।
রহমান মৃধা, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন। rahman.mridha@gmail.com
মত দ্বিমত
বিদায় শুধু একটি মুহূর্ত নয়, একটি চূড়ান্ত মূল্যায়ন
বিদায় শুধু একটি মুহূর্ত নয়, একটি চূড়ান্ত মূল্যায়ন। মানুষ কীভাবে ক্ষমতায় এসেছে, কীভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করেছে এবং শেষ পর্যন্ত কীভাবে সরে গেছে তারই নীরব রায় হলো বিদায়। ইতিহাসে বহু নেতা এসেছেন। কিন্তু খুব অল্প সংখ্যক বিদায় মানব কল্যাণের শিক্ষা রেখে গেছে।
রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিদায় তাই ব্যক্তিগত ঘটনা নয়। এটি জাতির আত্মপরিচয়ের প্রতিফলন। এই আয়নায় দেখা যায় ক্ষমতার চরিত্র, নেতৃত্বের নৈতিকতা এবং জনগণের সঙ্গে শাসকের সম্পর্ক।
ওসমান হাদির বিদায় আমাদের শেখায় ত্যাগের নীরব শক্তি। তিনি দেশ গঠনে কোনো দৃশ্যমান অবকাঠামোগত অবদান রাখেননি। তাঁর নামে কোনো সেতু নেই, কোনো মেট্রোরেল নেই, কোনো বড় প্রকল্প নেই। তবু তিনি জাতির মনে জায়গা করে নিয়েছেন অনুপ্রেরণার বাণী প্রচারের মাধ্যমে। সাহসের ভাষা, ভয়ের বিরুদ্ধে অবস্থান এবং অন্যায়ের সামনে নত না হওয়ার মানসিকতা তাঁকে মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছে। তাঁর বিদায় প্রমাণ করে নেতৃত্ব কেবল ক্ষমতার আসনে বসে তৈরি হয় না। অনেক সময় নেতৃত্ব জন্ম নেয় মানুষের হৃদয়ে।
এর বিপরীতে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশ পেয়েছে পদ্মাসেতু, মেট্রোরেলসহ বড় বড় অবকাঠামোগত অর্জন। এসব অস্বীকার করার সুযোগ নেই। খালেদা জিয়ার সময়ে দেখা গেছে বিনামূল্যে প্রাথমিক শিক্ষা এবং সামাজিক নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। কিন্তু প্রশ্ন ওঠে দীর্ঘ ষোল বছর খালেদা জিয়া দেশ গঠনে কী করলেন। এর উত্তর এককথায় দেওয়া যায় না। কারণ সেই সুযোগ রাষ্ট্রই তাঁকে দেয়নি। হিংসাত্মক রাজনীতি, প্রতিহিংসা এবং ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার কৌশল তাঁকে রাষ্ট্র পরিচালনার বাস্তব ক্ষেত্র থেকে বঞ্চিত করেছে।
এর ফলাফল ছিল গভীর এবং দীর্ঘস্থায়ী। দেশ দিনে দিনে আলো থেকে সরে গেছে। মানুষ গর্জন করতে শিখেছে, ঘৃণা করতে শিখেছে। ভিন্নমতকে চেপে রাখা হয়েছে। স্বাধীন কণ্ঠগুলোকে নিঃশব্দ করার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু ইতিহাস বলে চেপে রাখা কণ্ঠ কখনো নিশ্চিহ্ন হয় না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেগুলোই শক্তিশালী হয়ে ওঠে। সেই অন্ধকার বাস্তবতা থেকেই জন্ম নিয়েছে ওসমান হাদির মতো অনুপ্রেরণার প্রতীক এবং খালেদা জিয়ার মতো বঞ্চিত নেতৃত্বের প্রতি সহমর্মিতাময় বিদায়।
শেখ হাসিনার বিদায় ছিল সবচেয়ে কঠিন শিক্ষা বহনকারী মুহূর্ত। ক্ষমতা যখন জনগণের সম্মতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, তখন বিদায় আসে হঠাৎ। প্রস্তুতি ছাড়া। দেশের বাইরে চলে যাওয়ার দৃশ্যটি কোনো ব্যক্তিকে নয়, একটি শাসনব্যবস্থাকে মূল্যায়ন করে। এটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় ভয় দিয়ে শাসন করা যায়। কিন্তু সম্মান দিয়ে বিদায় কেনা যায় না।
এই তিনটি বিদায় একত্রে একটি স্পষ্ট পাঠ দেয়। রাষ্ট্র কেবল ইট পাথর দিয়ে গড়া হয় না। রাষ্ট্র গড়ে ওঠে মানুষের কণ্ঠস্বর, মর্যাদা এবং ন্যায়বিচারের ওপর। সেখানে ব্যর্থ হলে অবকাঠামো টিকে থাকে, কিন্তু নেতৃত্ব বিদায়ের মুহূর্তে প্রশ্নের মুখে পড়ে।
মানব কল্যাণের দৃষ্টিতে এখানেই মূল শিক্ষা। ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী। বিদায় অনিবার্য। মানুষ শেষ পর্যন্ত মনে রাখে কে কীভাবে বিদায় নিয়েছে, কে কতদিন ক্ষমতায় ছিল তা নয়। একজন রাষ্ট্রনায়কের প্রকৃত পরীক্ষা শাসনে নয়, বিদায়ে।
বিদায় তাই শেষ কথা নয়। বিদায় হলো ইতিহাসের কাছে নেতৃত্বের চূড়ান্ত জবাব।
রহমান মৃধা, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন। rahman.mridha@gmail.com
মত দ্বিমত
আমাদেরও একজন রানী এলিজাবেথ ছিলেন
হ্যাঁ বলছি বেগম খালেদা জিয়ার কথা। তিনি যতটুকু কথা বলার দরকার ততটুকুই বলতেন, যতটুকু করার দরকার ততটুকুই করতেন এবং সেটা নিয়ে কখনো কোনো দ্বিমত পোষণ করতে দেখিনি কাউকে। তিনি গত ১৫ মাসে অনেকের চোখে জাতির এক মাতৃসম প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন।
গণঅভ্যুত্থানের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন বিপ্লবী নেতা কর্মীদের মধ্যে আমি একটি বিষয় লক্ষ্য করেছি। তা ছিল গত বছরের সশস্ত্র বাহিনী দিবস পালনের সময়। ড. মুহাম্মদ ইউনূস থেকে শুরু করে বহু বিশিষ্ট ব্যক্তির চোখে মুখে এক ধরনের আবেগের ঢেউ কাজ করছিল। তাদের মনের ভাষা যেন ছিল জন্ম আমার ধন্য হলো মাগো, তোমাকে এই সমাবেশে আনতে পেরে, তোমাকে দেখাতে তোমার সন্তানেরা পেরেছে তোমার জন্মভূমিকে তোমার কাছে ফিরিয়ে নিতে।
দীর্ঘ ১৬ বছর গৃহবন্দিনী থাকা তিনবারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর জীবনের এই সময়টি ছিল বাংলার মানুষের কাছ থেকে পাওয়া এক বিশেষ সম্মানের সময়। সম্ভবত সেই স্মৃতিই তাঁকে এবারের সশস্ত্র বাহিনী দিবসেও উপস্থিত থাকতে অনুপ্রাণিত করেছিল, শারীরিকভাবে নানা ধরনের জটিলতা থাকা সত্ত্বেও। বিনিময়ে তিনি নিজ কানে মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বক্তব্যে শুনতে পান যে প্রয়াত প্রেসিডেন্ট জেনারেল জিয়াই ছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক।
একজন সহধর্মিণীর জন্য তাঁর স্বামীর এমন গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহাসিক ভূমিকার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি, তা আবার লাখো মানুষের উপস্থিতিতে, নিঃসন্দেহে এক অনন্য দৃষ্টান্ত। দীর্ঘ ১৬ বছরের বেশি সময় নির্বাসিত একমাত্র সন্তানের দেশে প্রত্যাবর্তন এবং সেই সন্তানের উপস্থিতিতেই তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন, ঠিক একই দিনে যেদিন তাঁর সহধর্মী প্রেসিডেন্ট জিয়া পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছিলেন।
দীর্ঘ ৫৫ বছরে বাংলাদেশের ভূখণ্ডে অনেক রাজনৈতিক নেতার বিদায় হয়েছে। আমার কাছে নিঃসন্দেহে শহীদ ওসমান হাদি, প্রেসিডেন্ট জিয়া এবং গণতন্ত্রের পক্ষে আপোষহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। আনন্দের সঙ্গে স্মরণ করছি, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের জাতীয় জাগরণের চেতনায় বেগম খালেদা জিয়া একজন রানী এলিজাবেথের মতো স্থির, নীরব এবং মর্যাদাসম্পন্ন প্রতীকে পরিণত হয়েছিলেন।
রহমান মৃধা, গবেষক-লেখক এবং সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন।
rahman.mridha@gmail.com
মত দ্বিমত
শুধু বেসরকারি ব্যাংকাররাই বঞ্চিত হবেন কেন?
চলতি বছরের গত ৯ ডিসেম্বর ব্যাংক কোম্পানীর কর্মকর্তা কর্মচারীগণের উৎসাহ বোনাস প্রদান প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিআরপিডি একটি সার্কুলার জারি করেছে। সেখানে বলা হয়েছে “ব্যাংকিং খাতের বর্তমান পরিস্থিতি এবং আর্থিক সক্ষমতা পর্যালোচনায় অ্যাক্রুড বা আনরিয়ালাইজড আয়ের ভিত্তিতে প্রণোদনা প্রদান করা ব্যাংকের আর্থিক সুশাসন এবং সুদক্ষ ব্যাংকিং ব্যবস্থাপনার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এক্ষণে তফসিলী ব্যাংকসমূহকে তাদের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনুকূলে উৎসাহ প্রদানের পূর্বে নিম্নোক্ত সকল বিষয়ে নিশ্চিত করার জন্য নির্দেশনা প্রদান করা হলো।
কোনো আর্থিক বছরে শুধুমাত্র প্রকৃত আয়-ব্যয়ের ভিত্তিতে নির্ণীত মুনাফা অর্জিত হলে উৎসাহ বোনাস দেয়া যাবে পুঞ্জিভূত মুনাফা হতে উৎসাহ প্রদান করা যাবে না। রেগুলেটরি মূলধন সংরক্ষণে কোন ঘাটতি বা কোনরূপ সঞ্চিতি ঘাটতি থাকতে পারবে না এবং এ ক্ষেত্রে কোনরূপ বিলম্ব করার সুবিধা প্রদান প্রদত্ত হলে তা মুনাফা নির্ণয়ের ক্ষেত্রে বিবেচনায় নেয়া যাবেনা। বিভিন্ন সূচকে উন্নতির শ্রেণিকৃত পাবলিক অবলোপনকৃত ঋণ আদায়ে পর্যাপ্ত অগ্রগতি এই বোনাস প্রদানের ক্ষেত্রে বিবেচনায় নিতে হবে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংক ও তফশিলী বিশেষায়িত ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহের কর্মরত কর্মচারীদের উৎসাহ প্রদান নির্দেশিকা ২০২৫ অনুসরণীয় হবে। ব্যাংক কোম্পানি আইন ১৯৯১ এর ৪৫ ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে এ নির্দেশনা জারি করা হলো।”
ব্যাংক মুনাফা না করলেও সরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মন্ত্রণালয়ের অনুমিতি নিয়ে প্রণোদনা বোনাস গ্রহণ করতে পারবেন কিন্তু বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সেটা পারবেন না এটা কি একটা বৈষম্যমূলক সিদ্ধান্ত নয়? যেসকল বেসরকারি ব্যাংকে পর্যাপ্ত তারল্য রয়েছে এবং বছরের আয়-ব্যয় হিসাবে মুনাফা করতে সক্ষম হয়েছে কিন্তু অতীতের মন্দ ঋণের কারণে প্রভিশন ঘাটতিতে রয়েছে সেসব ব্যাংকের কর্মীরা প্রণোদনা বোনাস পেলে তাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কি ক্ষতি হবে?
সরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারিরা এমন বিশেষ কী সৎকাজ করেছেন এবং বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তারা কী এমন তিরস্কারযোগ্য কাজ করলেন সেটা কোন প্যারামিটারে যাচাই করা হলো বাংলাদেশ ব্যাংক সেটার কোন ব্যাখা দেয় নাই। সরকারি ব্যাংকগুলোতে বিনিয়োগ প্রদান করা বা রিকভারির কাজে কর্মকর্তা কর্মচারিদের যে তৎপরতা রয়েছে তার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি কাজ করেন বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারিরা। সম্প্রতি পত্রপত্রিকার খবরে বলা হয়েছে সরকারি ব্যাংকগুলোতে খেলাপী ঋণের অবস্থা ভয়াবহ। সেখানে রয়েছে বিপুল পরিমাণে প্রভিশন ঘাটতি। শুধুমাত্র জনতা ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতির পরিমাণ ৪৮ হাজার ৩১ কোটি টাকা। একই ভাবে সোনালী, অগ্রণী, রূপালী, কৃষি এবং রাকাবেরও।
যেসব ব্যাংক বড় ধরণের প্রভিশন ঘাটতিতে পড়েছে তাদের এ সমস্যার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক সমানভাবে দায়ী। খেলাপী গ্রাহকদের সুবিধা প্রদানের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিভিন্ন ভাবে সহায়তা করেছে। এখন তাদের সমস্যা থেকে উত্তরণের সহজ ব্যবস্থা না করে ব্যাংকারদের উপর আরো নিপীড়ণমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। ব্যাংকগুলো থেকে বড় বড় লুটেরা ব্যবসায়ী যেসব টাকা লুট করেছে সেগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাহায্য নিয়েই করেছে। এসব অপরাধে ব্যাংকাররা শাস্তি ভোগ করছেন কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের কোন কর্মকর্তাকে এখনো পর্যন্ত শাস্তির আওতায় আনা হয়নি। বাংলাদেশ ব্যাংকের যারা এসব অপকর্মে জড়িত ছিলেন তাদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার ব্যবস্থা করা না হলে আগামীতে এ ধরণের অপরাধ আরো মহামারি আকার ধারণ করবে।
একাত্তর টেলিভিশনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে “সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালি, কৃষি ও রাকাব- এই ছয় রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের মোট মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪১ হাজার কোটি টাকারও বেশি। ২০১৯ সালে যেখানে ঘাটতি ছিল মাত্র ৩১ হাজার কোটি টাকা। সবচেয়ে বেশি চাপে রয়েছে জনতা ব্যাংক, যাদের মূলধন ঘাটতি একাই ৬৫ হাজার কোটি টাকার ওপরে। এই বিপুল অঙ্কের বড়ো অংশই আটকে আছে বেক্সিমকো, এস আলম, অ্যাননটেক্সসহ শীর্ষ ২০ খেলাপির কাছে।” খবরে আরো বলা হয়েছে, ছয় ব্যাংক মিলিয়ে ৩২ হাজার ২৩৯ কোটি টাকার প্রভিশন ঘাটতি ডেফারেল সুবিধা নিয়ে সাময়িকভাবে আড়াল করা হয়েছে।”
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খানের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে “রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো থেকে বিপুল অর্থ বের করে নিয়েছে অল্প কিছু ব্যবসায়ী। ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে এসব ব্যাংকগুলোর কর্মকর্তারা তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে পারেনি। এর জন্য সংকটে পড়েছে প্রতিষ্ঠানগুলো। ইতোপূর্বেও এসব ব্যাংকে মূলধন যোগান দিয়েছিল সরকার। কিন্তু ব্যাংকগুলোর সম্মিলিত যে নেতিবাচক ধারা তৈরি হয়েছে এই মুহূর্তে সরকারের মূলধন প্রদান করার সক্ষমতা নেই। এছাড়া এসব ব্যাংকে নতুন করে মূলধন দেয়ার নীতি থেকেও বেরিয়ে এসেছে সরকার। তাই ব্যাংক কর্মকর্তারাই এই সংকট থেকে বেরিয়ে আসার কর্মপরিকল্পনা ঠিক করতে হবে। তিনি বলেন, ঋণ বিতরণের পর যত ভালো গ্রাহকই হোক ঐ ঋণ তদারকি করা ব্যাংকের অন্যতম প্রধান কাজ। কিন্তু ব্যাংকগুলো সে কাজ যথাযথভাবে পালন করেনি।
জুন পর্যন্ত ছয় ব্যাংকের মোট খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৬১ হাজার কোটি টাকা, যা দেশের মোট খেলাপির প্রায় এক-চতুর্থাংশ। শীর্ষে রয়েছে জনতা ব্যাংক, যেখানে প্রতি ১০০ টাকার ঋণের ৭১ টাকা ঝুঁকিপূর্ণ। ছয় ব্যাংকের গড় খেলাপি হার প্রায় ৪৯ শতাংশ। অর্থাৎ সরকারি ব্যাংকের খেলাপীর হার বেসরকারি ব্যাংকগুলোর তুলনায় সবসময় বেশি।
প্রভিশন ঘাটতির সংকট নিয়ে সরকারি ব্যাংকগুলো মুনাফা না করে লস করলেও কর্মকর্তাদের জন্য প্রণোদনা বোনাস প্রদান করা হবে আর বেসরকারি ব্যাংকগুলো মুনাফা করেও কর্মকর্তারা বোনাস পাবেন না। এ কেমন নীতি! ব্যাংকগুলোর যদি পর্যাপ্ত তারল্য থাকে তাহলে বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিৎ হবে এ ধরণের নিষেধজ্ঞা তুলে দিয়ে বোনাস প্রদানের বিষয়টি ব্যাংক কর্তৃপক্ষের উপর ছেড়ে দেয়া। সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকারদের মধ্যে বৈষম্যমূলক নীতি পরিহার করাই হবে সুবিচার।
তাছাড়া ব্যাংকগুলোর এই বিপুল খেলাপীর জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের দায় কোন অংশে কম নয়। ব্যাংকগুলোর রেগুলেটর হিসেবে এস আলম, বেক্সিমকো এবং অ্যাননটেক্সের মত বড় বড় খেলাপীরা যেন বেশি বেশি টাকা পাচার এবং অবৈধ বিনিয়োগ সুবিধা নিতে পারে সেজন্য সিঙ্গেল পার্টি এক্সপোজার লিমিট পরিবর্তন সহ নানাবিধ অবৈধ সুযোগ তৈরি করে দিতে বার বার নতুন নতুন আইন তৈরি করেছে এবং সার্কুলার দিয়ে ব্যাংকগুলোকে বাধ্য করেছে সেগুলো বাস্তবায়নের জন্য। বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের বেসরকারি ব্যাংকারদের উপর ছড়ি ঘুরানোর কোন সীমা পরিসীমা নাই। দেশের ব্যাংকখাতের এতবড় ঋণ খেলাপী ও প্রভিশন ঘাটতির সমান দায় নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা প্রতি বছর ৫ থেকে ৮টি বোনাস ভোগ করেন কোন নৈতিক শক্তির বলে? বেসরকারি ব্যাংকারদের সুযোগ সুবিধা বন্ধ করার আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের সুযোগ সুবিধা বন্ধ করতে হবে। অভিভাবক হিসেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বোনাস সবার শেষে নেয়া উচিত।
সুসাশন প্রতিষ্ঠার জন্যই বাংলাদেশ ব্যাংক সার্কুলার দিয়ে থাকে। কিন্তু এই বিভাজনমূলক সার্কুলারের ফলে সরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তারা আগামীতেও খেলাপী ঋণের বিষয়ে উদাসীন থাকবে। বাড়তে থাকবে খেলাপী ঋণ। ব্যংকারদের থাকবেনা কোন মাথা ব্যাথা। ক্ষতিগ্রস্ত হবে ব্যাংক খাতের সুসাশন। ক্ষতিগ্রস্ত হবে দেশ। বেসরকারি ব্যাংকগুলোতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়া অমূলক নয়। তাই এই সার্কুলার বাতিল করে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর প্রণোদনামূলক বোনাস ব্যাংকগুলোর উপর ছেড়ে দেয়াই উত্তম। আর একই সমস্যার দুই ধরণের সমাধান দিয়ে জটিলতা বৃদ্ধি না করে বেসরকারি ব্যাংকারদেরও বিশেষ উপায়ে প্রণোদনা বোনাসের আওতায় আনা হোক।
লেখক: জাওয়াদ কারীম, গবেষক
ইমেইল: karimjawad1979@gmail.com
এমকে
মত দ্বিমত
সিরাজুদ্দৌলার মৃত্যুতে বাংলা হারিয়েছিলাম, হাদির মৃত্যুর মধ্য দিয়ে ফিরে পেতে চাই বাংলাদেশ
আমি হয় জনতার অধিকার প্রতিষ্ঠা করব, নয় শহীদ হব। এটাই কি একজন নেতার পরিচয়? নবাব সিরাজুদ্দৌলার মৃত্যুর পর অসম্পূর্ণ বাংলা কি সত্যিই এমন একজন নেতার সন্ধান করছে? যদি করে থাকে, তাহলে আমরা হাদিকে পেয়েও কেন তাকে ধরে রাখতে পারলাম না? হাদি কি ভুল জগতে এসেছিল, নাকি অন্ধদের জগতে আয়না নিয়ে এসেছিল? আজ বাংলার আংশিক ভূখণ্ড বাংলাদেশ কি তার জবাব দিতে পারবে?
বাংলাদেশ কি মনে করছে হাদি হেরেছে? বাংলাদেশ কি একটুও হারেনি? আঠারো কোটি মানুষের দেশে প্রতিদিন কত মানুষের জীবন শেষ হয়। পরিবার ভেঙে পড়ে, কান্নায় চোখ ভিজে যায়। কিন্তু এবার একজন হাদির মৃত্যুতে খোদার আরশ কেঁদেছে। কারণ এ মৃত্যু সাধারণ নয়। এটি ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে আজীবন মানুষের হৃদয়ে গেঁথে থাকবে।
হাদি আজ সিঙ্গাপুরের হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছেন। পুরো বাংলাদেশসহ বিশ্বজুড়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। আমি নিজেও সেই সকাল থেকে নীরবতা পালন করছি। কিছুক্ষণ আগে হঠাৎ হৃদয়ের গভীরে এক তীব্র উপলব্ধি নেমে এলো। ঠিক তখনই লিখতে বসেছি, হাদির স্মরণে।
নবাব সিরাজুদ্দৌলার মৃত্যুর পর বাংলার ইতিহাসে এক গভীর অন্ধকার নেমে আসে। তাঁর পতনের সঙ্গে সঙ্গেই বাংলার রাজনৈতিক আত্মমর্যাদা ভেঙে পড়ে এবং স্বাধীন শাসনের শেষ স্তম্ভটি ধসে যায়। এই মৃত্যু ছিল কেবল একজন শাসকের অবসান নয়, বরং তৎকালীন বাংলার সার্বভৌমত্ব হারানোর সূচনাক্ষণ। এখানে বাংলা বলতে বোঝানো হয় সেই সময়ের সুবা বাংলা, যার অন্তর্ভুক্ত ছিল বর্তমান বাংলাদেশ, পশ্চিমবঙ্গ, বিহার এবং উড়িষ্যার বিস্তৃত অঞ্চল। ক্ষমতার শূন্যতায় বিশ্বাসঘাতকতা ও লোভের দরজা খুলে যায়, আর সেই ফাঁক দিয়েই ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ধীরে ধীরে এই সমগ্র ভূঅঞ্চলের কর্তৃত্ব দখল করে নেয়। ফলশ্রুতিতে বাংলা হাতছাড়া হয়ে পড়ে এবং দীর্ঘদিনের জন্য ব্রিটিশ শাসনের অধীন এক পরাধীন ভূখণ্ডে পরিণত হয়।
আমি সাত সাগর দেখেছি, আমি সাত আশ্চর্য দেখেছি, আমি একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ দেখেছি। আমি শেখ পরিবারের পতন দেখেছি। আমি ওলফ পালমের মৃত্যু দেখেছি। আমি ২০১৯ সালের করোনা মহামারিতে লাখো মানুষের মৃত্যু দেখেছি। আমি ২০২৪ সালের গণহত্যার করুণ পরিণতি দেখেছি। আমি হাদিকে শহীদ হতে দেখলাম। কিন্তু আমি বাংলাদেশকে সত্যিকার অর্থে স্বাধীন হতে দেখিনি।
কারণ জানেন, আমরা পথভ্রষ্ট একটি জাতি। দুর্নীতি আর অকৃতজ্ঞতায় ডুবে থাকা এই সমাজ কি সত্যিই স্বাধীনতার সাধ গ্রহণ করার যোগ্য? এই প্রশ্ন আজও আমার বিবেককে জাগিয়ে রাখে। সেই জাগরণের মধ্যেই জন্ম নেয় আরেকটি প্রশ্ন। নবাব সিরাজুদ্দৌলার মৃত্যুর পর বাংলার সেই দেশের ভবিষ্যৎ কি হবে?
আমার মনে আজ আরেকটি প্রশ্ন জাগে। সেই ১৯৪৭ সালে বাংলার একটি ভূখণ্ড, পূর্ব পাকিস্তান, কি ভারতের দয়ায় ১৯৭১ সালে স্বাধীন হয়েছিল? সেইজন্যই কি আজও আমরা প্রকৃত স্বাধীনতার মর্যাদা পাইনি? কারণ বাংলাদেশ কেবল একটি মানচিত্র নয়। বাংলাদেশ একটি বিস্তৃত মানবভূমি, যেখানে ভুপেন হাজারিকার কণ্ঠে ধ্বনিত হয় মানুষের অভিন্ন আত্মার গান।
একই আশা, একই ভালোবাসা
কান্না হাসির একই ভাষা
দুঃখ সুখের বুকের মাঝে একই যন্ত্রণা
ও আমার দুই চোখে দুই জলের ধারা
মেঘনা, যমুনা
গঙ্গা আমার মা, পদ্মা আমার মা…
এই গান শুধু সুর নয়। এটি আমাদের অস্তিত্বের আর্তনাদ। আমাদের মনে করিয়ে দেয় আমরা সবাই একই যন্ত্রণার সন্তান। অথচ সেই সত্যকে ভুলে গিয়ে আমরা যখন বিভক্ত হই, তখনই হাদির মতো মানুষ একা হয়ে আলো জ্বালাতে আসে।
হাদি হারেনি। হেরেছি আমরা। হাদির মৃত্যু কোনো পরাজয় নয়। এটি আমাদের বিবেকের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। ইতিহাস একদিন প্রশ্ন করবে, আমরা কি এমন একজন মানুষকে চিনতে পারিনি, না কি চিনেও বাঁচাতে চাইনি।
হাদি আজ নেই, কিন্তু তার স্মৃতি আমাদের সামনে আয়নার মতো ধরে রেখেছে। সেই আয়নায় যদি আমরা নিজেদের বিকৃত মুখ দেখি, দায় নয় আয়নার, দায় আমাদের। হাদির স্মৃতির সামনে দাঁড়িয়ে আজ সবচেয়ে বড় প্রশ্ন একটাই। আমরা কি সত্যিকারের স্বাধীন হতে চাই, নাকি শহীদের রক্ত দেখেও চুপ করে থাকার অভ্যাসটাই আমাদের নিয়তি হয়ে গেছে? ইতিহাস আমাদের শেখায়, একটি মৃত্যুর পরই কখনো কখনো একটি জাতি তার ভবিষ্যৎ হারিয়ে ফেলে। নবাব সিরাজুদ্দৌলার মৃত্যুর পর আমরা বাংলা হারিয়েছিলাম। সেই হারানোর ক্ষত আজও শুকায়নি।
হাদির মৃত্যুর পর আর হারাতে চাই না। আর কোনো ভূমি নয়, আর কোনো আত্মা নয়, আর কোনো নেমকহারামি নয়, আর কোনো প্রাণ হানি নয়। এই মৃত্যুর মধ্য দিয়েই আমি বাংলাদেশকে ফিরে পেতে চাই।
রহমান মৃধা, গবেষক এবং লেখক, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন rahman.mridha@gmail.com




