বাংলাদেশের রাষ্ট্র কাঠামো এবং শিক্ষা ব্যবস্থার সংকটকে আলাদা করে দেখা একটি ভুল। বাংলাদেশের সংবিধান যেভাবে বাস্তব অর্থে জনগণের মৌলিক অধিকারকে কার্যকর করার ভিত্তিতে গড়ে ওঠেনি, ঠিক একইভাবে দেশের শিক্ষাব্যবস্থাও মানুষের বাস্তব প্রয়োজন, সক্ষমতা এবং সামাজিক বাস্তবতার ওপর দাঁড়িয়ে নির্মিত হয়নি। এই দুই ক্ষেত্রেই একটি মৌলিক সমস্যা স্পষ্ট, কাঠামো আছে, কিন্তু তার ভেতরে বাস্তবতার কোনো ভিত্তি নেই।
বাংলাদেশে শিক্ষা কখনোই শিক্ষার্থীর স্বপ্ন, সক্ষমতা বা সমাজের প্রয়োজনকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠেনি। বরং বরাবরই প্রভাবশালী ব্যক্তি, নীতিনির্ধারক বা ক্ষমতাসীনদের ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি এবং স্বপ্নকে শিক্ষার্থীদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। ফলে একটি কৃত্রিম কাঠামো তৈরি হয়েছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা শিখছে, কিন্তু সেই শিক্ষা বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করার মতো দক্ষতা, মানসিকতা বা অবকাঠামো তৈরি হচ্ছে না।
এই ব্যর্থতার সবচেয়ে স্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যায় নীতিনির্ধারণের ভাষায়। একজন নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষামন্ত্রী যখন শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতা, শিক্ষার মান, শিক্ষক প্রশিক্ষণ বা গবেষণার ঘাটতি নিয়ে কথা না বলে নিজের ব্যক্তিগত “স্বপ্ন” তুলে ধরেন, তখন সেটি কেবল একটি বক্তব্য নয়, বরং পুরো ব্যবস্থার দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন। এখানে নীতি নেই, আছে ব্যক্তিকেন্দ্রিক আকাঙ্ক্ষা। এখানে পরিকল্পনা নেই, আছে ঘোষণামূলক উচ্চারণ।
এই প্রবণতা বিচ্ছিন্ন নয়। রাষ্ট্রের পরিকাঠামো থেকে শুরু করে শিক্ষা, প্রশাসন, এমনকি আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়াতেও একই ধারা দেখা যায়। বাস্তবতা, গবেষণা বা জনগণের প্রয়োজনের ভিত্তিতে কিছু গড়ে তোলার বদলে, অনুকরণ, নকল এবং ক্ষমতাবানদের ইচ্ছাকে প্রাধান্য দিয়ে কাঠামো বসানো হয়েছে। ফলে যা দাঁড়িয়েছে তা হলো একটি “দেখতে সিস্টেম”, কিন্তু কার্যকর কোনো সিস্টেম নয়।
সংসদীয় কাঠামোর দিকেও তাকালে একই চিত্র স্পষ্ট। বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ এর সদস্যদের মূল দায়িত্ব আইন প্রণয়ন, নীতির পর্যালোচনা এবং রাষ্ট্রের ভিত্তি শক্তিশালী করা। কিন্তু বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রেই এই জায়গাটি পরিণত হয়েছে আনুগত্য প্রদর্শনের মঞ্চে, যেখানে যুক্তির বদলে টেবিল চাপড়ানো, জবাবদিহিতার বদলে স্বজনপ্রীতি সমর্থন করা হয়। এই বাস্তবতায় একটি শক্তিশালী শিক্ষা কাঠামো গড়ে ওঠার প্রত্যাশা করা অবাস্তব।
ফলে আমরা যে অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছি তা হলো একটি গভীর বৈপরীত্য। কাগজে সংবিধান আছে, শিক্ষাব্যবস্থা আছে, প্রতিষ্ঠান আছে, কিন্তু সেগুলো কার্যকর করার মতো মানসিকতা, দক্ষতা এবং জবাবদিহিতা নেই। এই অবস্থায় শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন কোনো কারিগরি সংস্কারের মাধ্যমে সম্ভব নয়, কারণ সমস্যাটি কারিকুলাম বা পরীক্ষা পদ্ধতিতে সীমাবদ্ধ নয়, এটি একটি দৃষ্টিভঙ্গির সংকট।
যতদিন পর্যন্ত রাষ্ট্র, নীতিনির্ধারক এবং রাজনৈতিক নেতৃত্ব জনগণের প্রয়োজনকে কেন্দ্র করে চিন্তা করা শুরু না করবে, ততদিন পর্যন্ত শিক্ষা ব্যবস্থাও ব্যক্তিকেন্দ্রিক স্বপ্ন আর অনুকরণের মধ্যে আটকে থাকবে। আর সেই অবস্থায় কোনো সংস্কারই টেকসই হবে না।
এই দৃষ্টিভঙ্গিগত সংকটের বাস্তব প্রতিফলন দেখা যায় শিক্ষা ব্যবস্থার বর্তমান কাঠামোর ভেতরে।
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে যদি বাস্তবতার আলোকে বিশ্লেষণ করা হয়, তাহলে প্রথমেই যে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে তা হলো, এটি একটি “সংযুক্ত ব্যবস্থা” নয়, বরং বিচ্ছিন্ন কিছু স্তরের সমষ্টি। প্রাথমিক, মাধ্যমিক এবং উচ্চশিক্ষা একে অপরের সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে যুক্ত থাকার কথা, কিন্তু বাস্তবে প্রতিটি স্তর আলাদা একটি কাঠামোর মতো কাজ করে, যেখানে লক্ষ্য, পদ্ধতি এবং ফলাফলের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে।
এই ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা কারিকুলাম এবং বাস্তবতার মধ্যে গভীর বিচ্ছিন্নতা। শিক্ষার্থীরা যে জ্ঞান অর্জন করছে, তার বড় অংশই পরীক্ষাকেন্দ্রিক এবং তাত্ত্বিক। কিন্তু সেই জ্ঞান বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করার সুযোগ, অনুশীলন বা কাঠামো নেই। ফলে শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য, অর্থাৎ সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা তৈরি করা, সেটি পূরণ হয় না। শিক্ষার্থীরা শিখছে, কিন্তু তারা “কীভাবে ব্যবহার করবে” সেই দক্ষতা তৈরি হচ্ছে না।
মূল্যায়ন পদ্ধতি এই সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলেছে। বর্তমান পরীক্ষানির্ভর কাঠামোতে মুখস্থ করা তথ্যই মূল মাপকাঠি। বিশ্লেষণধর্মী চিন্তা, সৃজনশীলতা বা বাস্তব সমস্যার সমাধান করার ক্ষমতা এখানে প্রায় অনুপস্থিত। ফলে একটি বিপরীতমুখী বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, যেখানে ভালো ফলাফল মানেই ভালো দক্ষতা নয়। একজন শিক্ষার্থী উচ্চ নম্বর পেতে পারে, কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার বা সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে দুর্বল থাকতে পারে।
শিক্ষক প্রস্তুতি এবং গবেষণার ক্ষেত্রেও একই ধরনের সীমাবদ্ধতা দেখা যায়। শিক্ষকতা একটি জ্ঞাননির্ভর এবং দক্ষতাভিত্তিক পেশা হওয়া সত্ত্বেও, অনেক ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ, গবেষণা পরিবেশ এবং প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার অভাব রয়েছে। এর ফলে শিক্ষা একটি গতিশীল প্রক্রিয়া হিসেবে বিকশিত না হয়ে, স্থির এবং পুনরাবৃত্তিমূলক হয়ে পড়ে।
নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রেও একটি মৌলিক সমস্যা কাজ করছে, যা প্রথম অংশে উল্লিখিত দৃষ্টিভঙ্গির সংকটের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। শিক্ষা নীতি দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা, তথ্য এবং বাস্তব প্রয়োজনের ভিত্তিতে তৈরি হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে এটি ব্যক্তিকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি, রাজনৈতিক অগ্রাধিকার এবং স্বল্পমেয়াদি সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। ফলে নীতির ধারাবাহিকতা থাকে না, এবং প্রতিটি পরিবর্তন নতুন একটি অনিশ্চয়তা তৈরি করে।
এই পুরো ব্যবস্থার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, শিক্ষা এবং কর্মসংস্থানের মধ্যে দুর্বল সংযোগ। শিক্ষার্থীরা দীর্ঘ সময় ধরে একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে পড়াশোনা করলেও, সেই জ্ঞান সরাসরি কর্মক্ষেত্রে প্রয়োগ করার সুযোগ বা কাঠামো পায় না। এর ফলে শিক্ষিত বেকারত্ব, দক্ষতার অপব্যবহার এবং হতাশা বৃদ্ধি পায়।
সবশেষে, একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা একটি কাঠামো তৈরি করতে পেরেছে, কিন্তু সেই কাঠামো কার্যকর করার জন্য প্রয়োজনীয় মানসিকতা, দক্ষতা এবং সমন্বয় তৈরি করতে পারেনি। ফলে শিক্ষা একটি রূপ আছে, কিন্তু কার্যকারিতা সীমিত। আর এই সীমাবদ্ধতাই পরবর্তী ধাপে, বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এর মতো প্রতিষ্ঠানের ফলাফলে সরাসরি প্রতিফলিত হয়।
এই কাঠামোগত বাস্তবতা সবচেয়ে স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে উচ্চশিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণে।
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সংকট বোঝার জন্য প্রথমে একটি মৌলিক প্রশ্ন পরিষ্কার করা প্রয়োজন, এই ব্যবস্থা কি দেশের মানুষের বাস্তব প্রয়োজন, অর্থনৈতিক কাঠামো এবং সামাজিক প্রেক্ষাপটকে ভিত্তি করে তৈরি? বাস্তবতা হলো, না। এই ব্যবস্থার ভেতরে একটি কাঠামো আছে, কিন্তু সেই কাঠামোর সঙ্গে বাস্তবতার সংযোগ দুর্বল। ফলে শিক্ষা একটি কার্যকর সক্ষমতা তৈরি করার প্রক্রিয়া না হয়ে, অনেক ক্ষেত্রে একটি আনুষ্ঠানিক সার্টিফিকেট অর্জনের পথে সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে।
এই ব্যবস্থার প্রধান বৈশিষ্ট্য তিনটি স্তরে ধরা যায়।
প্রথমত, কারিকুলাম এবং বাস্তবতার বিচ্ছিন্নতা। শিক্ষার্থীরা যা শিখছে, তার বড় অংশই সরাসরি কর্মক্ষেত্র, গবেষণা বা উদ্ভাবনের সঙ্গে সংযুক্ত নয়।
দ্বিতীয়ত, মূল্যায়ন পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা। মুখস্থনির্ভর পরীক্ষা বিশ্লেষণ, সৃজনশীলতা এবং সমস্যা সমাধানের দক্ষতা যাচাই করতে পারে না।
তৃতীয়ত, নীতিনির্ধারণে ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা। শিক্ষা একটি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় কৌশল হওয়া উচিত, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে এটি ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি এবং ঘোষণাভিত্তিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।
এই প্রেক্ষাপটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কে একটি উদাহরণ হিসেবে দেখলে চিত্রটি আরও স্পষ্ট হয়। দেশের সবচেয়ে পুরোনো এবং মর্যাদাপূর্ণ এই প্রতিষ্ঠানটি তাত্ত্বিকভাবে জ্ঞান উৎপাদন, নেতৃত্ব তৈরি এবং গবেষণার কেন্দ্র হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে এটি এমন একটি ব্যবস্থার ভেতরে কাজ করে, যেখানে কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা তার সক্ষমতাকে বাধাগ্রস্ত করে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রতিবছর যে “ফিনিশড প্রোডাক্ট” বের হয়, অর্থাৎ গ্র্যাজুয়েট শিক্ষার্থীরা, তাদের অবদান চারটি স্তরে দেখা যায়।
ব্যক্তি পর্যায়ে তারা ডিগ্রি, পরিচয় এবং কিছু পরিমাণ জ্ঞান অর্জন করে, যা তাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করে। কিন্তু এখানে একটি মৌলিক পার্থক্য তৈরি হয়, জ্ঞান কি দক্ষতায় রূপান্তরিত হচ্ছে, নাকি শুধুই সার্টিফিকেট হিসেবে থেকে যাচ্ছে।
পরিবারের ক্ষেত্রে এই গ্র্যাজুয়েটরা প্রায়ই আর্থিক এবং সামাজিক পরিবর্তনের চালিকাশক্তি হয়। অনেক পরিবারে প্রথম উচ্চশিক্ষিত সদস্য হিসেবে তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু এই অবদান প্রধানত অর্থনৈতিক, জ্ঞানভিত্তিক বা মূল্যবোধভিত্তিক পরিবর্তন তুলনামূলকভাবে সীমিত থাকে।
সমাজের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা দেখা যায়। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর কাছ থেকে যে সমালোচনামূলক চিন্তা, ন্যায়বোধ এবং নেতৃত্ব প্রত্যাশিত, তা সবসময় প্রতিফলিত হয় না। অনেক ক্ষেত্রে তারা বিদ্যমান কাঠামোর সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেয়, পরিবর্তনের চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারে না।
রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে এই সীমাবদ্ধতা আরও স্পষ্ট। একজন গ্র্যাজুয়েট নীতিনির্ধারক, গবেষক বা উদ্যোক্তা হওয়ার সম্ভাবনা রাখে, কিন্তু বাস্তবতায় দক্ষতার অপব্যবহার, সীমিত সুযোগ এবং অনেক ক্ষেত্রে মেধা পাচারের কারণে এই সম্ভাবনা পূর্ণতা পায় না।
এই পুরো বিশ্লেষণ থেকে একটি সরল কিন্তু কঠিন সত্য সামনে আসে। সমস্যা কেবল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এর না, বরং পুরো শিক্ষা ইকোসিস্টেমের। একটি দুর্বল কাঠামোর ভেতরে থেকে কোনো প্রতিষ্ঠান একা বিশ্বমানের ফলাফল তৈরি করতে পারে না।
ফলে “ফিনিশড প্রোডাক্ট” এর গুণগত মান নির্ভর করছে না শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের উপর, বরং পুরো ব্যবস্থার উপর। যদি সেই ব্যবস্থা বাস্তবতা, দক্ষতা এবং জবাবদিহিতার উপর ভিত্তি করে পুনর্গঠন না করা হয়, তাহলে একই ধরণের গ্র্যাজুয়েট তৈরি হতে থাকবে, যারা ব্যক্তি এবং পরিবার পর্যায়ে সফল হতে পারে, কিন্তু সমাজ এবং রাষ্ট্রের কাঠামোগত পরিবর্তনে সীমিত ভূমিকা রাখবে। এই চিত্রের ভেতর থেকেই মূল সমস্যার গভীর নির্যাস স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
আগের আলোচনাগুলো একত্রে বিবেচনা করলে একটি বিষয় পরিষ্কার হয়ে ওঠে, বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সংকট কোনো একক ত্রুটি বা খাতভিত্তিক ব্যর্থতা নয়। এটি একটি সমন্বিত কাঠামোগত ব্যর্থতা, যার শিকড় রাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গি, নীতিনির্ধারণ এবং বাস্তবায়ন ব্যবস্থার গভীরে প্রোথিত।
প্রথমত, দৃষ্টিভঙ্গির সংকট
শিক্ষাকে কখনোই একটি কৌশলগত জাতীয় বিনিয়োগ হিসেবে দেখা হয়নি। বরং এটি দীর্ঘদিন ধরে সার্টিফিকেট অর্জনের একটি প্রক্রিয়ায় সীমাবদ্ধ থেকেছে। ফলে শিক্ষা ব্যবস্থার উদ্দেশ্য, পদ্ধতি এবং ফলাফলের মধ্যে একটি মৌলিক অসামঞ্জস্য তৈরি হয়েছে। এই সংকটটি সরাসরি প্রতিফলিত হয় বাংলাদেশের সংবিধান এর সেই বাস্তবতার সঙ্গে, যেখানে অধিকার স্বীকৃত, কিন্তু কার্যকর করার কাঠামো দুর্বল।
দ্বিতীয়ত, জবাবদিহিতার অনুপস্থিতি
নীতি প্রণয়ন থেকে শুরু করে বাস্তবায়ন পর্যন্ত কোথাও একটি কার্যকর জবাবদিহিতা কাঠামো গড়ে ওঠেনি। সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, কিন্তু তার ফলাফল মূল্যায়ন করা হয় না। ব্যর্থতার কোনো সুস্পষ্ট দায় নির্ধারণ হয় না। ফলে একই ধরনের সীমাবদ্ধতা বারবার পুনরাবৃত্তি হয়, এবং কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শেখার প্রক্রিয়া তৈরি হয় না।
তৃতীয়ত, কপি-পেস্ট উন্নয়ন মডেল
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় একটি প্রবণতা স্পষ্ট, তা হলো বাইরের কাঠামো অনুকরণ করা, কিন্তু সেই কাঠামো কার্যকর করার জন্য প্রয়োজনীয় প্রেক্ষাপট তৈরি না করা। উন্নত দেশের কারিকুলাম, মূল্যায়ন বা নীতির কিছু অংশ গ্রহণ করা হলেও, সেগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ অবকাঠামো, শিক্ষক প্রস্তুতি বা গবেষণা পরিবেশ তৈরি করা হয়নি। ফলে কাঠামোটি বাহ্যিকভাবে আধুনিক দেখালেও, বাস্তবে তা কার্যকর হয় না।
চতুর্থত, নীতিনির্ধারণে ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা
শিক্ষা নীতি একটি ধারাবাহিক এবং প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে এটি অনেক সময় ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর দৃষ্টিভঙ্গির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এর ফলে নীতির ধারাবাহিকতা নষ্ট হয়, এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার বদলে স্বল্পমেয়াদি সিদ্ধান্ত প্রাধান্য পায়।
এই চারটি সমস্যাকে একত্রে দেখলে একটি স্পষ্ট চিত্র তৈরি হয়। বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার ব্যর্থতা কোনো সম্পদের ঘাটতি বা একক ব্যবস্থাপনার ত্রুটির কারণে নয়, বরং এটি একটি গভীর কাঠামোগত এবং দৃষ্টিভঙ্গিগত সংকট। যতক্ষণ পর্যন্ত এই মূল সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সমাধান করা না হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত কোনো আংশিক সংস্কার বাস্তব পরিবর্তন আনতে পারবে না।
এই অবস্থান থেকেই পরবর্তী প্রশ্নটি আসে, করণীয় কী? এই নির্যাসের ভিত্তিতেই এখন করণীয় নির্ধারণ করা জরুরি হয়ে দাঁড়ায়।
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার বর্তমান সংকট কোনো একক সংস্কার বা প্রশাসনিক পরিবর্তনের মাধ্যমে সমাধানযোগ্য নয়। কারণ সমস্যাটি কাঠামোর ভেতরে সীমাবদ্ধ নয়, এটি দৃষ্টিভঙ্গি, নীতি এবং বাস্তবায়নের সমন্বিত ব্যর্থতার ফল। তাই করণীয় নির্ধারণ করতে হলে প্রথমে সমস্যার প্রকৃতি অনুযায়ী স্তরভিত্তিক সমাধান ভাবতে হবে।
শিক্ষার উদ্দেশ্য পুনঃসংজ্ঞায়ন
শিক্ষাকে কেবল চাকরি পাওয়ার মাধ্যম হিসেবে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বের হয়ে আসতে হবে। শিক্ষা কী তৈরি করবে, এটি রাষ্ট্রীয়ভাবে পরিষ্কার করতে হবে। একজন শিক্ষার্থী শুধু তথ্যভিত্তিক জ্ঞান নয়, বরং সমস্যা বিশ্লেষণ, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং বাস্তব পরিস্থিতি মোকাবেলার সক্ষমতা অর্জন করবে, এই লক্ষ্যকে কেন্দ্র করে পুরো ব্যবস্থাকে পুনর্গঠন করতে হবে।
কারিকুলাম এবং বাস্তবতার সংযোগ
কারিকুলামকে শ্রমবাজার, গবেষণা ক্ষেত্র এবং স্থানীয় সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করতে হবে। তত্ত্বের পাশাপাশি প্রয়োগভিত্তিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করতে হবে। শিক্ষা যেন শুধু শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং বাস্তব সমস্যার সঙ্গে সংযুক্ত থাকে, সেই কাঠামো তৈরি করতে হবে।
মূল্যায়ন ব্যবস্থার মৌলিক পরিবর্তন
মুখস্থনির্ভর পরীক্ষার সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসতে হবে। মূল্যায়নের কেন্দ্রবিন্দু হতে হবে বিশ্লেষণ, সৃজনশীলতা এবং বাস্তব সমস্যা সমাধান। একজন শিক্ষার্থী কীভাবে চিন্তা করে এবং কীভাবে সমস্যার সমাধান করে, সেটাই মূল মানদণ্ড হওয়া উচিত।
শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং গবেষণা পরিবেশ শক্তিশালী করা
শিক্ষককে শুধু পাঠদানকারী হিসেবে নয়, জ্ঞান উৎপাদনের অংশ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। নিয়মিত প্রশিক্ষণ, গবেষণার সুযোগ এবং প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা ছাড়া শিক্ষার মান উন্নয়ন সম্ভব নয়। শিক্ষক উন্নয়ন ছাড়া শিক্ষা উন্নয়ন কল্পনাও করা যায় না।
প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা
নীতি প্রণয়ন থেকে বাস্তবায়ন পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে ফলাফলভিত্তিক জবাবদিহিতা থাকতে হবে। কোন নীতি কী ফল দিচ্ছে, তা নিয়মিত মূল্যায়ন করতে হবে। ব্যর্থতার দায় নির্ধারণ না করলে একই ভুল পুনরাবৃত্তি হতে থাকবে।
বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থার পুনর্গঠন
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সহ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাব থেকে বাস্তবিক অর্থে স্বাধীন এবং গবেষণাভিত্তিক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়কে শুধু ডিগ্রি প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান না রেখে জ্ঞান উৎপাদন ও উদ্ভাবনের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
এই করণীয়গুলো কোনো বিচ্ছিন্ন সংস্কার নয়, বরং একটি সমন্বিত রূপান্তরের অংশ। যতদিন পর্যন্ত শিক্ষা ব্যবস্থাকে একটি জাতীয় সক্ষমতা গঠনের কৌশল হিসেবে দেখা না হবে, ততদিন পর্যন্ত কোনো পরিবর্তনই টেকসই হবে না।
রহমান মৃধা, গবেষক ও লেখক, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন।