অর্থনীতি
আবারও কমলো সঞ্চয়পত্রের মুনাফা
ছয় মাসের ব্যবধানে আবারও সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার কমিয়েছে সরকার। আগামী ছয় মাসের জন্য জাতীয় সঞ্চয়পত্রের নতুন মুনাফার হার ঘোষণা করেছে অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ (ইআরডি)। বৃহস্পতিবার (১ জানুয়ারি) থেকে এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়েছে।
নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সঞ্চয়পত্রে সর্বোচ্চ মুনাফার হার নির্ধারণ করা হয়েছে ১০ দশমিক ৫৯ শতাংশ এবং সর্বনিম্ন মুনাফার হার ৮ দশমিক ৭৪ শতাংশ। এর আগে গত জুলাই মাসেও সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার কমানো হয়েছিল। নিয়ম অনুযায়ী প্রতি ছয় মাস পরপর সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার পর্যালোচনা করে সরকার।
বিনিয়োগের অঙ্ক অনুযায়ী মুনাফার পার্থক্য
পরিবার সঞ্চয়পত্রে এতদিন সাড়ে ৭ লাখ টাকার কম বিনিয়োগে পাঁচ বছরের মেয়াদ পূর্তিতে মুনাফার হার ছিল ১১ দশমিক ৯৩ শতাংশ, এখন তা কমিয়ে করা হয়েছে ১০ দশমিক ৫৪ শতাংশ। আর সাড়ে ৭ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগে এ মুনাফার হার ছিল ১১ দশমিক ৮০ শতাংশ, সেটা কমিয়ে ১০ দশমিক ৪১ শতাংশ করা হয়েছে।
পেনশনার সঞ্চয়পত্রে সাড়ে ৭ লাখ টাকার কম বিনিয়োগে পঞ্চম বছর শেষে, অর্থাৎ মেয়াদ পূর্তিতে মুনাফা ছিল ১১ দশমিক ৯৮ শতাংশ, এখন তা করা হয়েছে ১০ দশমিক ৫৯ শতাংশ। সাড়ে ৭ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে মুনাফার হার ছিল ১১ দশমিক ৮০ শতাংশ, এখন থেকে তা কমিয়ে ১০ দশমিক ৪১ শতাংশ করা হয়েছে।
পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্রের ক্ষেত্রে সাড়ে ৭ লাখ টাকার কম বিনিয়োগে মেয়াদ পূর্তিতে মুনাফার হার ছিল ১১ দশমিক ৮৩ শতাংশ, এখন তা কমিয়ে ১০ দশমিক ৪৪ শতাংশ করা হয়েছে। সাড়ে ৭ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগে মুনাফার হার ছিল ১১ দশমিক ৮০ শতাংশ, এখন থেকে তা হবে ১০ দশমিক ৪১ শতাংশ।
এছাড়া তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্রে সাড়ে ৭ লাখ টাকার কম বিনিয়োগের ক্ষেত্রে মেয়াদ পূর্তিতে মুনাফার হার ছিল ১১ দশমিক ৮২ শতাংশ, এখন তা কমিয়ে ১০ দশমিক ৪৮ শতাংশ করা হয়েছে। সাড়ে ৭ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে মুনাফার হার ছিল ১১ দশমিক ৭৭ শতাংশ, এখন তা কমিয়ে ১০ দশমিক ৪৩ শতাংশ করা হয়েছে।
১ জুলাই ২০২৫ তারিখের আগে ইস্যু হওয়া সব জাতীয় সঞ্চয় স্কিমে ইস্যুকালীন মেয়াদ পর্যন্ত তখনকার নির্ধারিত মুনাফার হারই কার্যকর থাকবে। তবে পুনর্বিনিয়োগের ক্ষেত্রে পুনর্বিনিয়োগের তারিখে কার্যকর মুনাফার হার প্রযোজ্য হবে। ছয় মাস পর আবারও মুনাফার হার পুনর্নির্ধারণ করা হবে।
এমকে
অর্থনীতি
যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানিতে চীনকে টপকালো বাংলাদেশ
যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি পোশাক বাজারে দীর্ঘদিনের শীর্ষ অবস্থান হারিয়েছে চীন। দেশটিকে পেছনে ফেলে দ্বিতীয় অবস্থানে উঠে এসেছে বাংলাদেশ, আর শীর্ষস্থান দখল করেছে ভিয়েতনাম।
যুক্তরাষ্ট্রের অফিস অব টেক্সটাইল অ্যান্ড অ্যাপারেল (OTEXA) প্রকাশিত সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি ২০২৬ সালের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানিতে শীর্ষে রয়েছে ভিয়েতনাম। দ্বিতীয় অবস্থানে বাংলাদেশ এবং তৃতীয় স্থানে নেমে গেছে চীন।
তথ্য অনুযায়ী, এই দুই মাসে ভিয়েতনাম যুক্তরাষ্ট্রে ২.৭ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ২.৮৮ শতাংশ বেশি। অন্যদিকে, বাংলাদেশ রপ্তানি করেছে ১.৩৭ বিলিয়ন ডলারের পোশাক, যদিও গত বছরের তুলনায় এই রপ্তানি ৮.৫৩ শতাংশ কমেছে।
সবচেয়ে বড় পতন দেখা গেছে চীনের ক্ষেত্রে। জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে দেশটির যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানি কমে দাঁড়িয়েছে ১.১৭ বিলিয়ন ডলারে, যা আগের বছরের তুলনায় ৫৭.৬৫ শতাংশ কম।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের চীনা পণ্যের ওপর পাল্টা শুল্ক আরোপ এবং সরবরাহ শৃঙ্খলে পরিবর্তনের কারণে বৈশ্বিক পোশাক বাজারে এই পরিবর্তন ঘটেছে।
OTEXA-এর তথ্য অনুযায়ী, আলোচ্য সময়ে যুক্তরাষ্ট্র মোট ১১.৫৩ বিলিয়ন ডলারের তৈরি পোশাক আমদানি করেছে, যা গত বছরের তুলনায় ১৩.৪৭ শতাংশ কম। অর্থাৎ সামগ্রিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক আমদানিতে ভাটা দেখা গেছে।
অর্থনীতি
চট্টগ্রাম বন্দরে ভিড়ল ৩৪ হাজার টন ডিজেলবাহী জাহাজ
দেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে সচল রাখতে মালয়েশিয়া থেকে ৩৪ হাজার টন ডিজেল নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছেছে আরো একটি নতুন জাহাজ। রবিবার (৫ এপ্রিল) ভোরে ‘এমটি শান গাং ফা জিয়ান’ নামের জাহাজটি চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙ্গরে ভিড়েছে। যা চলমান জ্বালানি চাহিদা মেটাতে সহায়ক ভূমিকা রাখবে।
বন্দরসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, জাহাজটি মালয়েশিয়া থেকে পরিশোধিত তেল নিয়ে এসেছে। তেল সরবরাহ করেছে ইউনিপ্যাক সিঙ্গাপুর পিটিই লিমিটেড। এর আগে, শুক্রবার ২৭ হাজার টন ডিজেল নিয়ে আরেকটি জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে আসে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) জানিয়েছে, নির্ধারিত নিয়ম মেনে দ্রুত জ্বালানি খালাস ও সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে, যেন বাজারে কোনো ধরনের ঘাটতি না হয়।
এদিকে, সাম্প্রতিক বৈশ্বিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকার বড় পরিসরে আমদানি পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে ১৬ লাখ মেট্রিক টন ডিজেল এবং ১ লাখ টন অকটেন কেনার প্রস্তাব অনুমোদন দিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে দেশে জরুরি জ্বালানি চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে ১০ লাখ টন ডিজেল এবং ১ লাখ টন অকটেন আমদানির নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া দেশটির আরেক কম্পানি ম্যাক্সওয়েল ইন্টারন্যাশনাল এসপিসির কাছ থেকে ১ লাখ টন ডিজেল আমদানির নীতিগত অনুমোদন হয়েছে। আর কাজাখস্তানের কম্পানি কাজাখ গ্যাস প্রসেসিং প্ল্যান্ট থেকে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে ৫ লাখ টন ডিজেল আমদানির নীতিগত অনুমোদন হয়েছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের ওপর হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বাড়ে। এর পর থেকে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হয়। এতে বাংলাদেশসহ আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জ্বালানি সরবরাহে চাপ তৈরি হয়। এ কারণে নির্ধারিত সময়ে কয়েকটি জাহাজ দেশে পৌঁছাতে পারেনি। পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
অর্থনীতি
ব্যাংক লেনদেনের নতুন সময়সীমা নির্ধারণ
দেশের সকল তফসিলি ব্যাংকের জন্য নতুন সময়সূচি ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বিদ্যমান পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকার ঘোষিত অফিস সময়সূচির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
রোববার (০৫ এপ্রিল ২০২৬) থেকে পরবর্তী নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত ব্যাংক কার্যক্রম নতুন সময়সূচি অনুযায়ী পরিচালিত হবে বলে জানানো হয়েছে।
নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, রোববার থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ব্যাংকের অফিস সময় নির্ধারণ করা হয়েছে সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত। আর গ্রাহক লেনদেন চলবে সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৩টা পর্যন্ত।
এদিকে, শুক্রবার ও শনিবার সাপ্তাহিক ছুটি হিসেবে পূর্বের মতোই বহাল থাকবে।
এছাড়া, সমুদ্র/স্থল/বিমান বন্দর এলাকায় (পোর্ট ও কাস্টমস এলাকা) অবস্থিত ব্যাংকের শাখা ও উপশাখাগুলো সপ্তাহে ৭ দিন ২৪ ঘণ্টা চালু রাখার বিষয়ে আগের নির্দেশনাও বহাল থাকবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর সংশ্লিষ্ট ধারার আওতায় এ নির্দেশনা জারি করা হয়েছে।
অর্থনীতি
শীর্ষ ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক
দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
শনিবার (৪ এপ্রিল) বেলা সাড়ে ১১টায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এ বৈঠক শুরু হয়।
বৈঠকে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির উপস্থিত রয়েছেন বলে সরকারি জানা গেছে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বৈঠকে জ্বালানির চলমান সংকট নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হতে পারে।
এ ছাড়া এ বৈঠকের মাধ্যমে দেশে প্রথমবারের মতো ‘বেসরকারি খাত উপদেষ্টা পরিষদ’ আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করবে। নীতিনির্ধারক ও ব্যবসায়ী নেতাদের মধ্যে একটি কাঠামোগত সংলাপের পরিবেশ তৈরির লক্ষ্যে কাজ করবে প্লাটফর্মটি।
প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে গঠিত এই পরিষদে অর্থমন্ত্রী ও বাণিজ্যমন্ত্রীর পাশাপাশি বস্ত্র, ওষুধ, ফুটওয়্যার, অটোমোবাইল ও ভোগ্যপণ্য খাতের ৯ জন উদ্যোক্তা সদস্য হিসেবে থাকছেন। ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদহার, অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা এবং পুঁজিবাজারের অস্থিরতা নিয়েও ব্যবসায়ীরা উদ্বেগ প্রকাশ করতে পারেন।
অর্থনীতি
একবছরে রফতানি কমলো ৭ বিলিয়ন ডলার
বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান দুই উৎস—পণ্য রফতানি ও প্রবাসী আয় (রেমিট্যান্স)। তবে গত একবছরে এই দুই খাতের সম্মিলিত চিত্রে দেখা গেছে ভিন্নধর্মী প্রবণতা। প্রবাসী আয়ে ইতিবাচক ধারা অব্যাহত থাকলেও রফতানি আয়ের বড় পতনের কারণে দেশে আসা মোট বৈদেশিক মুদ্রা কমেছে প্রায় ৪ থেকে ৫ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে শুধু রফতানি আয়ই কমেছে প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলার।
পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৪ সালের মার্চ থেকে ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত ১২ মাসে রফতানি ও রেমিট্যান্স মিলিয়ে দেশে এসেছে প্রায় ৮৫ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা। এর মধ্যে রফতানি থেকে এসেছে প্রায় ৫৫ বিলিয়ন ডলার এবং রেমিট্যান্স এসেছে প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলার।
অপরদিকে ২০২৫ সালের মার্চ থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত সর্বশেষ ১২ মাসে এই দুই খাত মিলিয়ে দেশে এসেছে প্রায় ৮১ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে রফতানি আয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৮ বিলিয়ন ডলার এবং রেমিট্যান্স এসেছে প্রায় ৩৩ বিলিয়ন ডলার।
ফলে এক বছরের ব্যবধানে প্রবাসী আয় প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার বাড়লেও রফতানি আয় কমেছে প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলার। রফতানির এই বড় পতনের কারণেই সামগ্রিক বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহ কমে গেছে।
রেমিট্যান্সে রেকর্ড, তবু ঘাটতি পুষছে না
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ মাসে দেশে এসেছে প্রায় ৩ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স, যা দেশের ইতিহাসে এক মাসে সর্বোচ্চ প্রবাসী আয়। আগের বছরের একই মাসের তুলনায় এই আয় প্রায় ১৪ শতাংশ বেশি।
ব্যাংকিং খাতের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বৈধ পথে অর্থ পাঠাতে প্রবাসীদের আগ্রহ বাড়া, ডলারের বিনিময় হার সমন্বয় এবং ব্যাংকিং চ্যানেলের সুবিধা বাড়ানোর ফলে রেমিট্যান্স প্রবাহে ইতিবাচক ধারা দেখা যাচ্ছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও প্রবাসী আয়ের এই প্রবাহ বৈদেশিক মুদ্রা বাজারে কিছুটা স্বস্তি এনে দিয়েছে। তবে রফতানি আয়ের বড় পতনের কারণে সেই স্বস্তি পুরোপুরি স্থিতিশীলতা আনতে পারছে না।
রফতানিতে টানা পতন
রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চ মাসে দেশের পণ্য রফতানি হয়েছে প্রায় ৩৪৮ কোটি মার্কিন ডলার, যা আগের বছরের একই মাসে ছিল প্রায় ৪২৫ কোটি ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে রফতানি কমেছে প্রায় ১৮ শতাংশ।
এর মাধ্যমে টানা আট মাস ধরে রফতানি আয়ের নিম্নমুখী ধারা অব্যাহত রয়েছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে (জুলাই-মার্চ) মোট রফতানি আয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৫ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৫ শতাংশ কম।
অর্থনীতিবিদদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের রফতানি খাত এত দীর্ঘ সময় ধরে নেতিবাচক ধারায় খুব কমই দেখা গেছে।
প্রধান খাত পোশাকেও ধাক্কা
দেশের মোট রফতানি আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশ আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। কিন্তু এই খাতেও সাম্প্রতিক সময়ে বড় ধরনের চাপ দেখা গেছে।
খাত-সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মার্চ মাসে তৈরি পোশাক রফতানি থেকে আয় হয়েছিল ৩ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। কিন্তু এক বছরের ব্যবধানে সেই আয় কমে ২০২৬ সালের মার্চে দাঁড়িয়েছে ২ দশমিক ৭৮ বিলিয়ন ডলারে।
এই সময়ে পোশাক শিল্পের দুই প্রধান উপখাত—নিটওয়্যার ও ওভেন পোশাক—উভয় ক্ষেত্রেই রফতানি কমেছে। এর মধ্যে নিটওয়্যার রফতানি কমেছে প্রায় ২১ শতাংশ এবং ওভেন পোশাক রফতানি কমেছে প্রায় ১৭ শতাংশ।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, “গত কয়েক মাস ধরেই রফতানি আয়ে নেতিবাচক ধারা চলছে। যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্ক আরোপের পর থেকেই পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে। এর ফলে অনেক ক্রেতা ক্রয়াদেশ কমিয়ে দিয়েছেন।”
এ বিষয়ে বিজিএমইএ’র সাবেক পরিচালক এবং ডেনিম এক্সপার্ট লিমিটেডের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, ‘‘সাম্প্রতিক বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং বাজারের অনিশ্চয়তার কারণে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা নতুন অর্ডার দেওয়ার ক্ষেত্রে অনেক বেশি সতর্ক হয়ে পড়েছেন। এর ফলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রফতানিতেও তার প্রভাব পড়ছে।
খাত-সংশ্লিষ্টদের মতে, বিশ্বের প্রধান বাজারগুলোতে চাহিদা স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত তৈরি পোশাক রফতানিতে দ্রুত ইতিবাচক প্রবণতা ফিরে আসার সম্ভাবনা সীমিত। তবে নতুন বাজার অনুসন্ধান, পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানো এবং উৎপাদন দক্ষতা উন্নত করা গেলে এই চাপ কিছুটা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হতে পারে।’’
বিশ্লেষকদের মতে, বৈশ্বিক অস্থিরতার এই সময়ে রফতানি খাতের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ রফতানি আয়, প্রবাসী আয় এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ—এই তিনটি স্তম্ভের ওপরই দেশের অর্থনৈতিক ভারসাম্য অনেকাংশে নির্ভরশীল।
বৈশ্বিক অস্থিরতা ও প্রতিযোগিতার চাপ
রফতানিকারকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ, ইউরোপের বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতা এবং বৈশ্বিক চাহিদা কমে যাওয়ার কারণে বাংলাদেশের রফতানি খাত চাপে পড়েছে।
বিশেষ করে চীন, ভিয়েতনাম ও ভারতের মতো প্রতিযোগী দেশগুলো কম দামে পণ্য সরবরাহ করে ইউরোপীয় বাজারে বড় অংশের ক্রয়াদেশ নিয়ে নিচ্ছে। ফলে বাংলাদেশের রফতানিকারকরা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছেন।
নীতিগত সহায়তার দাবি
রফতানিকারকরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে শিল্প খাতকে টিকিয়ে রাখতে সরকারের দ্রুত কিছু নীতিগত পদক্ষেপ প্রয়োজন। এর মধ্যে রয়েছে শিল্পে জ্বালানি সরবরাহে অগ্রাধিকার, উৎপাদন ব্যয় কমাতে সহায়তা এবং নতুন বাজার অনুসন্ধানে কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদার করা।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ‘‘উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে রফতানি গন্তব্য দেশগুলোতে ভোক্তা চাহিদা কমে যাচ্ছে। এর ফলে পোশাকসহ বিভিন্ন পণ্যের অর্ডারও কমছে।’’
জ্বালানি সংকটের প্রভাব
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতও রফতানি খাতে নতুন চাপ তৈরি করেছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনার কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।
রফতানিকারকদের মতে, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। একই সঙ্গে জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা থাকায় অনেক শিল্পকারখানায় উৎপাদন কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে।
সামনের চ্যালেঞ্জ
অর্থনীতিবিদদের মতে, রেমিট্যান্স ও রফতানি—এই দুই খাতই বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান ভিত্তি। তবে বর্তমানে এই দুই উৎসের প্রবণতা ভিন্ন দিকে যাচ্ছে।
রেমিট্যান্স বাড়লেও রফতানি আয় কমে যাওয়ায় সামগ্রিক বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহে ভারসাম্যহীনতার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে জ্বালানি, খাদ্য ও কাঁচামাল আমদানির জন্য বড় অঙ্কের ডলার প্রয়োজন হওয়ায় এই পরিস্থিতি অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রফতানি বাজার বৈচিত্র্য করা, উৎপাদন ব্যয় কমানো এবং শিল্প খাতে জ্বালানি সরবরাহ স্থিতিশীল করা এখন অত্যন্ত জরুরি। অন্যথায় রফতানি আয়ের এই নিম্নমুখী ধারা দীর্ঘমেয়াদে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।



