বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী নিয়ে প্রশ্ন তোলা মানেই রাষ্ট্রবিরোধিতা নয়। বরং এটি একটি রাষ্ট্রকে আরও দায়িত্বশীল, জবাবদিহিমূলক এবং কার্যকর করার প্রয়োজনীয় আলোচনা। কারণ একটি দরিদ্র, ঘনবসতিপূর্ণ, উন্নয়নশীল দেশের জন্য প্রতিটি টাকার ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ।
প্রশ্ন হলো, এই বিপুল বিনিয়োগ কি শুধু প্রতিরক্ষার জন্য, নাকি এটি জাতীয় উন্নয়নেরও অংশ? আর যদি হয়, তাহলে তার বাস্তব ফলাফল কী?
বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর মূল দায়িত্ব হচ্ছে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা, সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, বহিরাগত সামরিক হুমকি মোকাবিলা করা এবং জাতীয় নিরাপত্তা বজায় রাখা। যুদ্ধক্ষেত্রে প্রতিরক্ষা, সমুদ্রসীমা রক্ষা, আকাশসীমা নিরাপদ রাখা, সন্ত্রাসবাদ দমন, দুর্যোগ মোকাবিলা, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে অংশগ্রহণ, এমনকি অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতেও তারা ভূমিকা পালন করে।
কিন্তু এখানেই একটি গভীর প্রশ্ন উঠে আসে। স্বাধীনতার পর পাঁচ দশকের বেশি সময় পেরিয়েও বাংলাদেশ কি এমন কোনো বাস্তব সামরিক সক্ষমতা অর্জন করতে পেরেছে, যা দেশের সাধারণ মানুষকে নিরাপদ ও আত্মবিশ্বাসী করে? নাকি পুরো ব্যবস্থাটি ধীরে ধীরে এমন এক ব্যয়বহুল কাঠামোতে পরিণত হয়েছে, যেখানে সাধারণ মানুষের করের টাকা মূলত রক্ষণাবেক্ষণেই শেষ হয়ে যাচ্ছে?
বর্তমান বিশ্বে যুদ্ধের ধরন পাল্টে গেছে। এখন যুদ্ধ মানে শুধু ট্যাংক বা যুদ্ধবিমান নয়। এখন সাইবার যুদ্ধ, ড্রোন প্রযুক্তি, স্যাটেলাইট নজরদারি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, তথ্যযুদ্ধ, ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার, অর্থনৈতিক অবরোধ এবং মিডিয়া ন্যারেটিভও যুদ্ধের অংশ। ইউক্রেন যুদ্ধ দেখিয়েছে, ছোট ড্রোনও কোটি ডলারের ট্যাংক ধ্বংস করতে পারে। গাজা যুদ্ধ দেখিয়েছে, প্রযুক্তি ও গোয়েন্দা সক্ষমতা ছাড়া শুধু অস্ত্র দিয়ে যুদ্ধ জেতা যায় না।
প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কি সেই বাস্তবতার জন্য প্রস্তুত?
বাংলাদেশের সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনী নিয়মিত প্রশিক্ষণ পায়। দেশীয় প্রশিক্ষণের পাশাপাশি বিভিন্ন দেশে যৌথ মহড়া ও প্রশিক্ষণেও অংশ নেয়। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ বিশ্বে পরিচিত। বহু বছর ধরে বাংলাদেশ শান্তিরক্ষী পাঠানো দেশের মধ্যে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে। এতে আন্তর্জাতিক মর্যাদা যেমন এসেছে, তেমনি বৈদেশিক মুদ্রাও এসেছে।
কিন্তু আরেকটি বাস্তবতা হলো, শান্তিরক্ষা মিশনের অভিজ্ঞতা আর আধুনিক পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের অভিজ্ঞতা এক নয়। শান্তিরক্ষা বাহিনী সাধারণত সংঘাত নিয়ন্ত্রণ, নিরাপত্তা সহায়তা ও মানবিক সহায়তা দেয়। কিন্তু আধুনিক রাষ্ট্রযুদ্ধে প্রয়োজন প্রযুক্তিগত আধিপত্য, তথ্যযুদ্ধ, সাইবার প্রতিরক্ষা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র ব্যবস্থার সক্ষমতা।
বাংলাদেশ প্রতিবছর প্রতিরক্ষা খাতে বিপুল অর্থ ব্যয় করে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের জন্য প্রায় ৪০ হাজার ৬৯৮ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। এই অর্থের বড় অংশ যায় বেতন, ভাতা, রক্ষণাবেক্ষণ, অবকাঠামো এবং পরিচালন ব্যয়ে। বিশ্বের সামরিক ব্যয়ের তথ্য অনুযায়ী, আধুনিক প্রতিরক্ষা খাতে শুধু অস্ত্র নয়, গবেষণা, প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ ও কৌশলগত সক্ষমতার জন্যও বিশাল বিনিয়োগ প্রয়োজন।
এখন প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের মতো একটি দেশে যেখানে এখনও স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, গবেষণা, পুষ্টি, কৃষি ও কর্মসংস্থানে বিশাল ঘাটতি রয়েছে, সেখানে এত বড় প্রতিরক্ষা ব্যয়ের যৌক্তিকতা কী?
একদিকে, একটি রাষ্ট্রের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে নিরাপত্তা অপরিহার্য। ভৌগোলিক অবস্থান, বঙ্গোপসাগর, আঞ্চলিক শক্তির প্রতিযোগিতা, সীমান্ত সংকট, জলবায়ু দুর্যোগ, সন্ত্রাসবাদ ও ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় প্রতিরক্ষা বাহিনীকে দুর্বল রাখা যায় না।
অন্যদিকে, যদি প্রতিরক্ষা খাতে বিনিয়োগ দেশের প্রযুক্তিগত, শিল্প বা বৈজ্ঞানিক উন্নয়নে রূপান্তরিত না হয়, তাহলে সেটি দীর্ঘমেয়াদে শুধু ব্যয় হিসেবেই থেকে যায়।
বিশ্বের অনেক দেশ প্রতিরক্ষা খাতকে শিল্প উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করেছে। যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল, দক্ষিণ কোরিয়া, তুরস্ক কিংবা চীন সামরিক প্রযুক্তিকে পরে বেসামরিক খাতে ব্যবহার করেছে। ইন্টারনেট, জিপিএস, ড্রোন, স্যাটেলাইট প্রযুক্তি, এমনকি বহু চিকিৎসা প্রযুক্তির উৎস সামরিক গবেষণা।
বাংলাদেশ কি সেই পথে হাঁটতে পেরেছে?
বাংলাদেশ কিছু অস্ত্র, গোলাবারুদ, জাহাজ ও সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদন করতে পারলেও এখনও বড় পরিসরে সামরিক প্রযুক্তি, গবেষণা, সাইবার প্রতিরক্ষা বা উন্নত অস্ত্র শিল্পে স্বনির্ভর হতে পারেনি। ফলে বিপুল অর্থ বিদেশে চলে যায় আমদানিনির্ভর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কারণে। অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, দীর্ঘমেয়াদে স্থানীয় গবেষণা, প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, প্রতিরক্ষা শিল্প ও বেসরকারি উদ্ভাবনকে যুক্ত না করলে এই ব্যয় টেকসই হবে না।
আরেকটি স্পর্শকাতর প্রশ্ন হলো, সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা যে সুযোগ সুবিধা পান, তা কি সাধারণ সিভিল প্রশাসনের তুলনায় বেশি?
বাস্তবতা হলো, সামরিক বাহিনীর সদস্যরা আবাসন, চিকিৎসা, রেশন, নিরাপত্তা, অবসর সুবিধা, পেনশন, ক্যান্টনমেন্ট সুবিধা এবং বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা তুলনামূলকভাবে বেশি পেয়ে থাকেন। কারণ রাষ্ট্র তাদেরকে “উচ্চ ঝুঁকির পেশা” হিসেবে বিবেচনা করে। যুদ্ধ, সীমান্ত দায়িত্ব, দুর্যোগ, সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান কিংবা প্রাণহানির ঝুঁকি এই কাঠামোর যুক্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
যে দেশে একজন কৃষক, শ্রমিক, শিক্ষক বা চিকিৎসকও অনিশ্চয়তার মধ্যে জীবন কাটায়, সেখানে রাষ্ট্র কেন একটি নির্দিষ্ট সেক্টরকে তুলনামূলকভাবে বেশি নিরাপত্তা ও সুবিধা দেয়? এই প্রশ্ন অযৌক্তিক নয়। কারণ রাষ্ট্রের অর্থ জনগণের অর্থ। ফলে জনগণের জবাবদিহিতা দাবি করার অধিকার আছে।
তবে একটি বিপজ্জনক দিকও আছে। যদি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা কাঠামো দুর্বল হয়ে যায়, তাহলে উন্নয়ন, গণতন্ত্র, অর্থনীতি বা সামাজিক স্থিতিশীলতা কোনোটাই টিকবে না। ইতিহাস দেখায়, দুর্বল রাষ্ট্রে বিদেশি প্রভাব, গৃহসংঘাত, সন্ত্রাসবাদ ও রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা দ্রুত বৃদ্ধি পায়।
অর্থাৎ মূল প্রশ্ন “সেনাবাহিনী দরকার কি না” নয়। মূল প্রশ্ন হলো, কেমন সেনাবাহিনী দরকার?
একটি দরিদ্র দেশের জন্য বিলাসী, আমলাতান্ত্রিক, অদক্ষ, অস্বচ্ছ ও প্রযুক্তিগতভাবে পিছিয়ে থাকা বাহিনী দীর্ঘমেয়াদে বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু একটি দক্ষ, প্রযুক্তিনির্ভর, গবেষণামুখী, জাতীয় শিল্প ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় যুক্ত বাহিনী রাষ্ট্রের শক্তি হয়ে উঠতে পারে।
বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ তিনটি:
প্রশ্ন এখন শুধু ব্যয়ের নয়, সেই ব্যয়ের ফলাফল কী জাতিকে শক্তিশালী করছে, নাকি কেবল একটি ব্যয়বহুল কাঠামোকে টিকিয়ে রাখছে। যদি প্রতিরক্ষা খাত কেবল ব্যয় বাড়ায় কিন্তু জাতিকে দক্ষতা, প্রযুক্তি, নিরাপত্তা ও আত্মবিশ্বাস না দেয়, তাহলে মানুষ একসময় এটিকে বোঝা হিসেবেই দেখবে।
কিন্তু যদি সেই বিনিয়োগ থেকে প্রযুক্তি, শিল্প, শৃঙ্খলা, দুর্যোগ মোকাবিলা, আন্তর্জাতিক মর্যাদা, গবেষণা এবং জাতীয় আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়, তাহলে সেটি শুধু প্রতিরক্ষা ব্যয় নয়, জাতীয় বিনিয়োগে পরিণত হবে।
রাষ্ট্রের শক্তি তখনই অর্থবহ হয়, যখন সীমান্তের নিরাপত্তার পাশাপাশি মানুষের জীবনও নিরাপদ হয়। একটি শিশু যদি চিকিৎসাহীনতায় মারা যায়, একজন কৃষক যদি ঋণের চাপে ভেঙে পড়ে, একজন তরুণ যদি ভবিষ্যৎহীনতায় দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়, তাহলে শুধু অস্ত্রের আধুনিকীকরণ একটি জাতিকে শক্তিশালী করে না। একটি সত্যিকারের শক্তিশালী রাষ্ট্র সেই রাষ্ট্র, যেখানে নিরাপত্তা, শিক্ষা, প্রযুক্তি এবং মানবিক মর্যাদা একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং পরিপূরক।
বাংলাদেশ আজ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে দারিদ্র্য, বেকারত্ব, দুর্নীতি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সংকট। অন্যদিকে নিরাপত্তা, ভূরাজনীতি ও আঞ্চলিক প্রতিযোগিতা। এখন সিদ্ধান্ত জাতির।
আমরা কি শুধু অস্ত্র কিনে নিরাপত্তার ভান করব, নাকি এমন একটি রাষ্ট্র গড়ব যেখানে প্রতিরক্ষা, শিক্ষা, গবেষণা, প্রযুক্তি ও মানবিক উন্নয়ন একসঙ্গে এগিয়ে যাবে?
কারণ শেষ পর্যন্ত একটি দেশের সবচেয়ে বড় শক্তি শুধু তার সেনাবাহিনী নয়, তার সচেতন জনগণ, জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র এবং দেশপ্রেমে বিশ্বাসী নাগরিক।
রহমান মৃধা, গবেষক ও লেখক, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন