ক্যাটাগরি: আন্তর্জাতিক

হরমুজ প্রণালীতে মার্কিন নৌবাহিনী ও ইরানের মধ্যে তীব্র সংঘাত

মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীতে মার্কিন নৌবাহিনীর তিনটি ডেস্ট্রয়ার লক্ষ্য করে ইরানীয় বাহিনী ব্যাপক হামলা চালিয়েছে। এই ঘটনার পর যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সামরিক স্থাপনাগুলোতে পাল্টা বিমান হামলা চালিয়েছে বলে জানিয়েছে মার্কিন সামরিক কমান্ড। এই ঘটনাটি গত কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতিকে চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।

মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ইউএসএস ট্রক্সটন, ইউএসএস ম্যাসন এবং ইউএসএস রাফায়েল পেরাল্টা নামের তিনটি গাইডেড-মিসাইল ডেস্ট্রয়ার যখন হরমুজ প্রণালী হয়ে ওমান উপসাগরের দিকে যাচ্ছিল, তখন ইরানীয় বাহিনী সেগুলোর ওপর ‘বিনা উস্কানিতে’ আক্রমণ চালায়।

ইরানি বাহিনী এই আক্রমণে একসাথে একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন এবং ছোট দ্রুতগামী নৌযান ব্যবহার করেছে। মার্কিন কর্মকর্তারা এই আক্রমণকে অত্যন্ত সুসংগঠিত এবং তীব্র বলে বর্ণনা করেছেন। তবে সেন্টকম নিশ্চিত করেছে যে, মার্কিন জাহাজগুলোর কোনো ক্ষতি হয়নি এবং তারা সফলভাবে সব আক্রমণ প্রতিহত করেছে।

জবাবে আত্মরক্ষামূলক পদক্ষেপ হিসেবে মার্কিন বাহিনী ইরানের ভূখণ্ডে অবস্থিত সেইসব স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে, যেখান থেকে আক্রমণগুলো পরিচালনা করা হচ্ছিল। এর মধ্যে রয়েছে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন উৎক্ষেপণ কেন্দ্র এবং কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল সেন্টার।

ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম এবং আধা-সরকারি ফারস (Fars) নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালীতে ইরানীয় সশস্ত্র বাহিনী এবং ‘শত্রু’ পক্ষের মধ্যে তীব্র গোলাগুলি হয়েছে। ইরানের দাবি অনুযায়ী, মার্কিন নৌবাহিনী একটি ইরানি তেলবাহী ট্যাংকার লক্ষ্য করে হামলা চালানোর পর ইরান পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেখায়।

ইরানি গণমাধ্যমগুলো আরও জানিয়েছে, বন্দর আব্বাস, কেশম দ্বীপ এবং এমনকি রাজধানী তেহরানের কাছেও ভয়াবহ বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। কেশম দ্বীপের বাহমান পিয়ারের বাণিজ্যিক অংশে বড় ধরনের বিস্ফোরণ ও ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। ইরান এই হামলার জন্য সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করেছে এবং একে তাদের সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত হিসেবে দেখছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই ঘটনার ওপর সরাসরি মন্তব্য করেছেন। তিনি দাবি করেছেন, মার্কিন বাহিনীর পাল্টা হামলায় ইরানের জাহাজ এবং সামরিক অবকাঠামোর “বিরাট ক্ষতি’ (Great damage) হয়েছে।

ট্রাম্প তার পোস্টে ইরানকে অবিলম্বে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত নতুন চুক্তিতে আসার আহ্বান জানান। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন যে, ইরান যদি শীঘ্রই শান্তি আলোচনায় ফিরে না আসে, তবে আরও ভয়াবহ পরিণতির মুখোমুখি হতে হবে। ট্রাম্প এই পাল্টা আক্রমণকে অত্যন্ত সফল বলে উল্লেখ করেছেন এবং আমেরিকান বাহিনীর সাহসিকতার প্রশংসা করেছেন।

এই উত্তেজনার ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দামে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের একটি বড় অংশ হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়। এই পথে সংঘাতের ফলে সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

গত ৮ এপ্রিল থেকে দুই দেশের মধ্যে একটি অঘোষিত ও ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি চলে আসছিল। কিন্তু রোববারের এই সংঘর্ষের পর সেই শান্তি প্রক্রিয়া এখন অনিশ্চিত। সেন্টকম জানিয়েছে যে, তারা উত্তেজনা বাড়াতে চায় না, তবে আমেরিকান বাহিনীকে রক্ষায় তারা যেকোনো পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত।

অন্যদিকে, পাকিস্তান এই সংকটে মধ্যস্থতা করার চেষ্টা করলেও এখন পর্যন্ত কোনো ফলপ্রসূ সমাধান আসেনি। ইরানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারা পাকিস্তানের মাধ্যমে পাওয়া যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবগুলো পর্যালোচনা করছে, কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।

হরমুজ প্রণালীতে এই সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যে বড় ধরনের যুদ্ধের আশঙ্কাকে আবারও উসকে দিয়েছে। একদিকে ট্রাম্প প্রশাসনের ‘সর্বোচ্চ চাপ’ প্রয়োগের নীতি, অন্যদিকে ইরানের সামরিক পাল্টা জবাব, এই দ্বৈরথে বিশ্ববাসী এখন গভীর উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে। কূটনৈতিক সমাধান না মিললে হরমুজ প্রণালী অদূর ভবিষ্যতে একটি স্থায়ী রণক্ষেত্রে পরিণত হতে পারে।

তথ্যসূত্র: বিবিসি

শেয়ার করুন:-
শেয়ার