ক্যাটাগরি: মত দ্বিমত

নাহিদ ইসলাম: এক নতুন রাজনৈতিক জাগরণের প্রতীক, নাকি ইতিহাসের পরবর্তী অধ্যায়?

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে কিছু নাম মুহূর্তের ভেতরেই প্রতীকে পরিণত হয়। নাহিদ ইসলাম সেই নামগুলোর একটি। কেউ তাকে দেখছেন বিদ্রোহের কণ্ঠস্বর হিসেবে, কেউ নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক বিবেক হিসেবে, আবার কেউ তাকে এখনো দেখছেন এক অসমাপ্ত সম্ভাবনা হিসেবে। কিন্তু একটি বিষয় অস্বীকার করার উপায় নেই, ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক অভিধানে তার নাম স্থায়ীভাবে লেখা হয়ে গেছে।

তিনি জন্ম নিয়েছিলেন কোনো রাজনৈতিক রাজবংশে নয়, বরং সাধারণ এক সামাজিক বাস্তবতায়। ছাত্রজীবনে সমাজ, বৈষম্য, রাষ্ট্র এবং নাগরিক অধিকারের প্রশ্ন তাকে ভাবিয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সময় থেকেই তার রাজনৈতিক চেতনার প্রকাশ শুরু হয়। পরে কোটা সংস্কার আন্দোলন এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মধ্য দিয়ে তিনি জাতীয় পর্যায়ে পরিচিত হয়ে ওঠেন।

ইতিহাসে অনেক নেতার উত্থান যুদ্ধক্ষেত্রে হয়েছে, অনেকের হয়েছে কারাগারে, আবার অনেকের জন্ম হয়েছে জনগণের ক্রোধের ভেতর দিয়ে। নাহিদ ইসলামের উত্থান ঘটেছে রাজপথে, মিছিলে, অস্থির জনতার ভেতর, ইন্টারনেট বন্ধ হয়ে যাওয়া এক উত্তাল সময়ে, যখন বাংলাদেশের তরুণ সমাজ নতুন ভাষায় রাষ্ট্রকে প্রশ্ন করতে শুরু করেছিল। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমও তাকে নতুন প্রজন্মের গণজাগরণের অন্যতম মুখ হিসেবে তুলে ধরেছে।

কিন্তু জুলাই ২০২৪ কেবল একটি আন্দোলনের নাম নয়। এটি ছিল দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভ, বঞ্চনা, রাজনৈতিক অনাস্থা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে তরুণ সমাজের গভীর উদ্বেগের বহিঃপ্রকাশ। বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মের একটি বড় অংশ মনে করতে শুরু করেছিল যে, প্রচলিত রাজনৈতিক কাঠামো তাদের ভাষা, স্বপ্ন এবং বাস্তবতাকে আর ধারণ করতে পারছে না। সেই শূন্যতার ভেতর থেকেই উঠে আসে কিছু নতুন মুখ, কিছু নতুন প্রতীক। নাহিদ ইসলাম সেই প্রতীকের অন্যতম।

আজ দেশের অসংখ্য তরুণ তার ভেতরে কেবল একজন রাজনৈতিক কর্মীকে দেখছে না, বরং দেখছে নিজেদের প্রজন্মের প্রতিফলন। এমন এক প্রজন্ম, যারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বৈশ্বিক বাস্তবতা এবং নতুন রাজনৈতিক চেতনার মধ্যে বেড়ে উঠেছে। তারা পুরোনো স্লোগানের পুনরাবৃত্তি নয়, বরং জবাবদিহিতা, মর্যাদা, ন্যায়বিচার এবং অংশগ্রহণমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা দেখতে চায়। সেই কারণেই নাইদ ইসলামের প্রতি নতুন প্রজন্মের গ্রহণযোগ্যতা শুধুমাত্র রাজনৈতিক নয়, এটি মনস্তাত্ত্বিক এবং প্রজন্মগতও।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, কে এই নাহিদ ইসলাম? তিনি কি কেবল একজন ছাত্রনেতা?

নাকি এমন এক রাজনৈতিক প্রজন্মের প্রতীক, যারা পুরোনো দলীয় কাঠামোর বাইরে নতুন রাষ্ট্রচিন্তা খুঁজছে?

তার রাজনৈতিক পরিচয় এখন যুক্ত হয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টির সঙ্গে, যে দলটি নিজেদের “নতুন বাংলাদেশ” এবং “দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্র” ধারণার ধারক হিসেবে তুলে ধরছে।

তার ভাষণে বারবার ফিরে আসে গণতন্ত্র, বৈষম্যহীনতা, সংস্কার, নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত এবং জনগণের অধিকার। সমর্থকদের চোখে তিনি এমন একজন, যিনি দীর্ঘদিনের ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির বিপরীতে তরুণদের আশা হয়ে উঠেছেন। সমালোচকদের চোখে তিনি এখনো পরীক্ষাধীন, কারণ আন্দোলনের নায়ক হওয়া এবং রাষ্ট্র পরিচালনার সক্ষমতা এক বিষয় নয়।

তবে সাম্প্রতিক সংসদীয় বক্তব্যে নাহিদ ইসলাম এমন কিছু রাজনৈতিক পরিপক্বতার পরিচয় দিয়েছেন, যা তাকে শুধুমাত্র আন্দোলনের মুখ হিসেবে নয়, বরং একজন দূরদর্শী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবেও নতুনভাবে আলোচনায় নিয়ে এসেছে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় সাধারণত প্রতিটি পক্ষই ইতিহাসের মালিকানা নিজেদের হাতে নিতে চায়। কিন্তু নাইদ ইসলাম সংসদে দাঁড়িয়ে ভিন্ন এক অবস্থান তুলে ধরেন। তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান কোনো একক দল বা গোষ্ঠীর আন্দোলন ছিল না, এটি ছিল সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণে গড়ে ওঠা এক গণঅভ্যুত্থান।

তিনি বলেন, “এই অভ্যুত্থানে সাধারণ জনগণ সামনে ছিল, নেতাকর্মীরা পেছনে ছিল।”

এই একটি বাক্যই তার রাজনৈতিক অবস্থানের গভীরতা প্রকাশ করে। কারণ তিনি আন্দোলনের কৃতিত্ব এককভাবে নিজের বা নিজের রাজনৈতিক বলয়ের দিকে টেনে নেননি। বরং তিনি জনগণকেই ইতিহাসের কেন্দ্রস্থলে বসিয়েছেন। ইতিহাসে যেসব নেতা দীর্ঘস্থায়ী প্রতীক হয়ে উঠেছেন, তাদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল জনগণের শক্তিকে নিজেদের ব্যক্তিগত কৃতিত্বে সীমাবদ্ধ না করা।

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তিনি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ভূমিকাও অস্বীকার করেননি। বরং তিনি সংসদে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, বিএনপিও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অংশ ছিল এবং সে সময় তাদের কিছু কৌশলগত অবস্থান বাস্তব পরিস্থিতির জন্য প্রয়োজনীয় ছিল। বাংলাদেশের বিভক্ত রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এই ধরনের স্বীকৃতি বিরল। কারণ এখানে সাধারণত প্রতিপক্ষকে অস্বীকার করাই রাজনৈতিক শক্তির পরিচয় হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু নাহিদ ইসলাম সেখানে সংঘাতের চেয়ে ইতিহাসের সত্যকে বড় করে দেখানোর চেষ্টা করেছেন।

তিনি আরও বলেন, আন্দোলনের সময় গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তার কাছ থেকে বারবার একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বয়ান আদায় করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু তিনি সেই সরলীকৃত ব্যাখ্যার ভেতরে আন্দোলনকে সীমাবদ্ধ করেননি। বরং তিনি বারবার বলেছেন, এই আন্দোলনে শিশু থেকে বৃদ্ধ পর্যন্ত সাধারণ মানুষ অংশ নিয়েছিল। এই অবস্থান শুধু রাজনৈতিক সাহসের নয়, বরং ইতিহাসের জটিল বাস্তবতাকে স্বীকার করারও পরিচয় বহন করে।

সংসদের সেই মুহূর্তে শুধু বক্তব্য নয়, পরিবেশও ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। ট্রেজারি বেঞ্চের নীরব মনোযোগ, পুরো সংসদের স্থিরতা, এমনকি ডেপুটি স্পিকারের মনোযোগী উপস্থিতিও যেন একটি বিষয়ই মনে করিয়ে দিচ্ছিল, কখনো কখনো কিছু বক্তৃতা দলীয় সীমারেখা অতিক্রম করে সময়ের দলিলে পরিণত হয়।

আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে সেই মুহূর্ত, যখন নাহিদ ইসলাম তারেক রহমান এবং মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বক্তব্য উদ্ধৃত করেন। তিনি দেখাতে চেয়েছেন, একটি জাতীয় গণঅভ্যুত্থানকে কোনো একক রাজনৈতিক শক্তির সম্পত্তি বানানো যায় না। এই অবস্থান তাকে কেবল একজন জনপ্রিয় তরুণ নেতা নয়, বরং জাতীয় রাজনৈতিক স্মৃতির একজন দায়িত্বশীল ভাষ্যকার হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত করে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে তরুণদের ভূমিকা নতুন নয়। ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান কিংবা স্বাধীনতার সংগ্রাম, প্রতিটি বড় পরিবর্তনের কেন্দ্রে ছিল তরুণ সমাজ। কিন্তু বর্তমান প্রজন্মের বাস্তবতা ভিন্ন। তারা একই সঙ্গে বৈশ্বিক এবং স্থানীয়। তারা তথ্যপ্রবাহের যুগে বেড়ে উঠেছে, ফলে তাদের প্রশ্নও আগের চেয়ে অনেক বেশি সরাসরি এবং নির্ভীক। নাইদ ইসলামের জনপ্রিয়তার পেছনে এই পরিবর্তিত সামাজিক বাস্তবতারও বড় ভূমিকা রয়েছে।

বিশ্বের ইতিহাসে নেলসন ম্যান্ডেলা, ভ্যাকলাভ হাভেল, লেখ ওয়ালেসা কিংবা অং সান সুচির মতো ব্যক্তিত্বদের শুরুতেও মানুষ একই প্রশ্ন করেছিল। তারা কি কেবল আন্দোলনের মুখ, নাকি ভবিষ্যতের রাষ্ট্রনায়ক? ইতিহাস পরে তাদের বিচার করেছে। নাহিদ ইসলামের ক্ষেত্রেও সেই বিচার এখনো শেষ হয়নি।

বাংলাদেশের একাংশ তাকে সাহসের প্রতীক মনে করে, কারণ আন্দোলনের সময় নির্যাতন, আটক এবং দমন সত্ত্বেও তিনি প্রকাশ্যে অবস্থান নিয়েছিলেন। আবার আরেক অংশ সতর্কভাবে দেখছে, এই জনপ্রিয়তা আদর্শভিত্তিক রাজনৈতিক রূপ নেয় কিনা, নাকি সময়ের সঙ্গে তা কেবল আবেগে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।

দেশের বাইরে থেকেও তার প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তাকে নতুন প্রজন্মের গণআন্দোলনের মুখ হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ আজকের পৃথিবীতে তরুণ নেতৃত্ব, ডিজিটাল আন্দোলন এবং রাষ্ট্র সংস্কারের প্রশ্ন একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত।

তবে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখনো সামনে দাঁড়িয়ে আছে। তার শুরু আমরা দেখেছি। কিন্তু তার শেষ কোথায়?

তিনি কি কেবল এক গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি হয়ে থাকবেন?

নাকি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সত্যিকারের নতুন অধ্যায়ের নির্মাতা হবেন?

এই উত্তর আজ কারও কাছে নেই। কারণ ইতিহাস কখনো বক্তৃতা দিয়ে শেষ হয় না। ইতিহাস শেষ পর্যন্ত লেখা হয় মানুষের বিশ্বাস, সময়ের পরীক্ষা এবং ক্ষমতার সামনে নৈতিক অবস্থান ধরে রাখার সক্ষমতা দিয়ে।

যেমন সকালের সূর্য একটি দিনের নতুন আশার আলো নিয়ে উদিত হয়, তেমনি পড়ন্ত বিকেলের সূর্যও কখনো কখনো শেষের প্রতীক নয়, বরং আরেক নতুন ভোরের পূর্বাভাস হয়ে ওঠে। ইতিহাসের প্রতিটি সময়ে কিছু মানুষ আসে, যারা কেবল ব্যক্তি হিসেবে নয়, সময়ের প্রতিচ্ছবি হিসেবেও নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করে। নাহিদ ইসলামকে বাংলাদেশ শেষ পর্যন্ত কীভাবে দেখবে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

তিনি কি ক্ষণিকের আবেগ হয়ে মিলিয়ে যাবেন, নাকি একটি নতুন রাজনৈতিক জাগরণের দীর্ঘস্থায়ী প্রতীক হয়ে উঠবেন?

তিনি কি আরেকজন প্রচলিত নেতা হবেন, নাকি এমন এক কণ্ঠস্বর, যে ক্ষমতার চেয়েও বড় করে মানুষের মর্যাদা, স্বাধীন চিন্তা এবং ন্যায়বিচারের প্রশ্নকে সামনে আনবে?

আজকের বাংলাদেশ তাকে দেখছে আশা, কৌতূহল, সংশয় এবং প্রত্যাশার মিশ্র দৃষ্টিতে। কারণ প্রতিটি গণঅভ্যুত্থান একজন মানুষকে সামনে আনে, কিন্তু ইতিহাস কেবল তাকেই মনে রাখে, যে নিজের সময়কে অতিক্রম করে জাতির আত্মার অংশ হয়ে উঠতে পারে।

সময়ই বলে দেবে, নাহিদ ইসলাম কি কেবল জুলাই ২০২৪ এর একটি নাম, নাকি ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের নতুন জাগরণের এক অভূতপূর্ব ভরসার প্রতীক।

রহমান মৃধা, গবেষক ও লেখক, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন

শেয়ার করুন:-
শেয়ার