ক্যাটাগরি: জাতীয়

রাশিয়ার জ্বালানি কিনতে বাংলাদেশকে ৬০ দিনের ছাড় দিল যুক্তরাষ্ট্র

রাশিয়ার পরিশোধিত পেট্রোলিয়াম পণ্য বা তেল কিনতে বাংলাদেশকে ৬০ দিনের অনুমতি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর ১১ এপ্রিল আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে এই সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছে। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা গেছ।

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের কয়েকজন কর্মকর্তার জানান, ১১ এপ্রিল থেকে কার্যকর হওয়া এই ছাড়ের মেয়াদ আগামী ৯ জুন পর্যন্ত বহাল থাকবে।

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর গত ১১ এপ্রিল আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে এই সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছে বলে টিবিএসকে নিশ্চিত করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

এর আগে গত ১২ মার্চ মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ রুশ অপরিশোধিত তেল ও পেট্রোলিয়াম পণ্য-সংক্রান্ত লেনদেনে ৩০ দিনের ছাড় দিয়েছিল, যার মেয়াদ শেষ হয়েছে ১১ এপ্রিল।

তবে সেই লাইসেন্সটি শুধু ১২ মার্চ বা তার আগে জাহাজে তোলা পণ্যবাহী কার্গোর জন্য প্রযোজ্য ছিল। মূলত ট্রানজিটে থাকা বা পথে থাকা চালানগুলো খালাস করতেই সেই সুযোগ দেওয়া হয়েছিল।

বাংলাদেশের পক্ষ থেকে যুক্তি দেওয়া হয়েছিল, আগের নিষেধাজ্ঞার ছাড়টি দেশের জন্য তেমন কোনো সুফল বয়ে আনেনি। কারণ সেই সময় সমুদ্রপথে রাশিয়ার কোনো তেলবাহী জাহাজ বাংলাদেশের পথে ছিল না।

নতুন আমদানির সুযোগ

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এই ৬০ দিনের ছাড় বাংলাদেশকে কিছুটা স্বস্তি দেবে। কারণ প্রথাগত জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় যখন অস্থিরতা বিরাজ করছে, তখন এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে রাশিয়া থেকে পরিশোধিত জ্বালানি—বিশেষ করে ডিজেল—সংগ্রহ করা যাবে।

জ্বালানি বিভাগের একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘রাশিয়া থেকে তেল আমদানির ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র আমাদের দুই মাসের ছাড় দিয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিষয়টি নিশ্চিত করেছে, তবে আমরা এখনও অফিশিয়াল ডকুমেন্ট হাতে পাইনি।’

বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের ক্রমবর্ধমান দাম ও জোগানের সীমাবদ্ধতার কারণে সরবরাহের উৎসে বৈচিত্র্য আনতে চাইছে বাংলাদেশ। এর অংশ হিসেবেই রুশ উৎস থেকে অন্তত ১০ লাখ টন ডিজেল আমদানির সুবিধার্থে এই ছাড়ের আবেদন করা হয়েছিল।

জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, একটি যুক্তরাষ্ট্র-ভিত্তিক কোম্পানির মাধ্যমে রুশ জ্বালানি সরবরাহের একটি চলমান চুক্তির অধীনে প্রথম ধাপে ১ লাখ টন ডিজেল আমদানির প্রস্তুতি নিচ্ছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি)।

মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনায়, বিশেষ করে ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ মূলত আমদানিকৃত পরিশোধিত পেট্রোলিয়াম পণ্যের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। কিন্তু দামের অস্থিরতা ও সরবরাহ সংকটের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের প্রথাগত সরবরাহকারীদের থেকে প্রয়োজনীয় পরিমাণ জ্বালানি পেতে হিমশিম খাচ্ছে দেশ।

কূটনৈতিক তৎপরতা

৩০ মার্চ মার্কিন সরকারকে পাঠানো এক চিঠিতে জ্বালানি বিভাগ আনুষ্ঠানিকভাবে সীমিত সময়ের জন্য এই নিষেধাজ্ঞায় ছাড় চেয়েছিল। ওই চিঠিতে বিশ্ববাজারে ‘জ্বালানি তেলের ব্যাপক মূল্যবৃদ্ধি’ এবং ‘মধ্যপ্রাচ্যের প্রথাগত উৎসগুলো থেকে জ্বালানি সংগ্রহের চ্যালেঞ্জগুলো’ উল্লেখ করা হয়।

চিঠিতে আরও বলা হয়, জ্বালানি সম্পদের সহজলভ্যতা এবং দ্রুত সরবরাহের সক্ষমতার কারণে রাশিয়া এখন একটি নির্ভরযোগ্য বিকল্প সরবরাহকারী হিসেবে সামনে এসেছে।

বাংলাদেশ ও মার্কিন কর্মকর্তাদের মধ্যে কয়েক দফা উচ্চপর্যায়ের আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে এই ছাড়ের আবেদনটি করা হয়েছিল। গত ১৮ মার্চ একটি ভার্চুয়াল বৈঠকের পর ২০ মার্চ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে এ বিষয়ে চিঠি দেয় বিপিসি।

ওই বৈঠকে মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ, মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর, ওয়াশিংটনে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস, ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন দূতাবাস ও জ্বালানি বিভাগের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

জ্বালানি বিভাগ তাদের চিঠিতে রুশ উৎস থেকে অন্তত ১০ লাখ টন ডিজেল আমদানির সুবিধার্থে সর্বনিম্ন দুই মাসের জন্য এই ছাড়ের একটি প্রস্তাবনা তুলে ধরে। এতে আরও বলা হয়, আমদানির পুরো প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছ রাখতে এবং আন্তর্জাতিক নিয়মকানুন মেনে সম্পন্ন করতে বিপিসি একটি মার্কিন কোম্পানির সাথে কাজ করছে।

জ্বালানি বিভাগের চিঠিতে বলা হয়, এই উদ্যোগটিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জ্বালানি সহযোগিতার সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) চূড়ান্ত করার ক্ষেত্রে একটি সেতুবন্ধন হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর মাধ্যমে শেষপর্যন্ত বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় মার্কিন কোম্পানিগুলোর অংশগ্রহণ ও ভূমিকা আরও বাড়বে।

এদিকে বাংলাদেশে নিযুক্ত রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত আলেকজান্ডার খোজিন গতকাল ঢাকায় জাতীয় সংসদ ভবনে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর সঙ্গে তার কার্যালয়ে সাক্ষাৎ করেন।

আগের লাইসেন্সের সীমাবদ্ধতা

কর্মকর্তারা জানান, এর আগে জেনারেল লাইসেন্স ১৩৪-সহ যেসব মার্কিন বিধান ছিল, তা বাংলাদেশের প্রয়োজন মেটানোর জন্য যথেষ্ট ছিল না। কারণ ১২ মার্চ যখন ওই অনুমোদন দেওয়া হয়, তখন রাশিয়ার কোনো কার্গো বাংলাদেশের অভিমুখে ছিল না।

সেই লাইসেন্সটি কেবল ১২ মার্চ বা তার আগে জাহাজে তোলা হয়েছে, এমন রুশ তেল ও পেট্রোলিয়াম পণ্য বিক্রি, সরবরাহ বা খালাস করার অনুমতি দিয়েছিল। ফলে এর মাধ্যমে নতুন করে জ্বালানি সংগ্রহের কোনো সুযোগ ছিল না।

তবে ওই লাইসেন্সের আওতায় নিষেধাজ্ঞার তালিকায় থাকা ট্যাঙ্কারগুলোর জন্য নিরাপদ ডকিং, ক্রুদের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, জরুরি মেরামত, বাঙ্কারিং, বিমা ও জাহাজের অন্যান্য প্রয়োজনীয় সেবা প্রদানের অনুমতি ছিল।

বর্তমানে নতুন করে দেওয়া এই ছাড় আগের সেই সীমাবদ্ধতাগুলো দূর করেছে। এর ফলে নির্ধারিত সময়ের জন্য বাংলাদেশ এখন রাশিয়ার জ্বালানি আমদানি করতে নতুন চুক্তি করার সুযোগ পাবে।

নিষেধাজ্ঞা ও জ্বালানি নিরাপত্তার ভারসাম্য

ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে রাশিয়ার ওপর আরোপিত মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে রুশ জ্বালানি রপ্তানি-সংশ্লিষ্ট অধিকাংশ লেনদেন এখনো কঠোর বিধিনিষেধের আওতায় রয়েছে।

তবে সহযোগী দেশগুলোর জ্বালানি নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনা করে নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে এই ধরনের বিশেষ ছাড় দেওয়া হচ্ছে।

বাংলাদেশের জন্য এই ছাড় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্বল্পমেয়াদি সমাধান। এটি দেশের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে এবং জ্বালানি খাতের ওপর তৈরি হওয়া বাড়তি চাপ কমাতে সহায়ক হবে।

জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই ছাড়ের মেয়াদ থাকাকালীন আমদানির পরিকল্পনাগুলো সঠিক সময়ে বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত জরুরি। এটি করতে পারলে দেশের বাজারে জ্বালানির সম্ভাব্য ঘাটতি মেটানো এবং অস্থিরতা রোধ করা যাবে।

ছাড় পাওয়ার পর বিপিসি এখন দ্রুততম সময়ে রুশ ডিজেল আমদানির জন্য ক্রয়প্রক্রিয়া ও লজিস্টিক-সংক্রান্ত যাবতীয় বিষয় চূড়ান্ত করার কাজ শুরু করবে।

কর্মকর্তারা বলছেন, জুনের শুরুতে এই ছাড়ের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, তা তৎকালীন বাজার পরিস্থিতি ও কূটনৈতিক অগ্রগতির ওপর ভিত্তি করে নির্ধারণ করা হবে।

তারা বলেন, আপাতত এই সিদ্ধান্তটি বিশ্বজুড়ে চলমান জ্বালানি অনিশ্চয়তার মধ্যেও বাংলাদেশের সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রাখার একটি সীমিত কিন্তু অত্যন্ত প্রয়োজনীয় সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে।

শেয়ার করুন:-
শেয়ার