ক্যাটাগরি: মত দ্বিমত

আরেকটি গণঅভ্যুত্থানের প্রয়োজনীয়তা: ব্যক্তিজীবন, ইতিহাস ও রাষ্ট্রচিন্তার আলোকে

একটি গণঅভ্যুত্থানের পর হঠাৎ যদি আরেকটির ডাক পড়ে, তবে জনগণ কি সেটাকে সাড়া দেবে?

এই প্রশ্নের জবাব দেওয়ার আগে, আসুন আমি আমার ব্যক্তিগত কিছু অভিজ্ঞতা শেয়ার করি। যদিও সরাসরি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা দিয়ে কী গণঅভ্যুত্থানের তুলনা ঠিক হবে? হবে, অবশ্যই হবে। তবে প্রথমে জীবনের সহজ সহজ অভিজ্ঞতার কথা বলি।

উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের পর কিন্তু একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ হয় এবং পরে আমরা পরাধীনতার বেড়াজাল ভেঙে স্বাধীন হয়েছিলাম। তবে সেই স্বাধীনতা ঠিকমতো ধরে রাখতে পারিনি। কারণ কী জানেন? আমিও জানি না। তবে আমার কিছু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা আছে, সেগুলো শেয়ার করি।

আমি আগে আমার লেখায় বলেছি, আমি ৭১-এর যুদ্ধের রণক্ষেত্রের খুদে মুক্তিযোদ্ধা। বড় দায়িত্ব এবং কর্তব্য পালন করেছি। না কোনো পদবির কারণে, না নেহায়েত মায়ার কারণে, বরং অনুপ্রেরণার কারণে। আমার ছোটবেলার গ্রাম নহাটা এখনও নহাটাই আছে; নেই শুধু আমি এবং আমার শেষের মধুর স্মৃতিগুলো। তবে সেগুলো মনের মাঝে লুকিয়ে আছে। মাঝে মাঝে মনে পড়ে, তখন স্মৃতিচারণ করি। আজ সেই স্মৃতিচারণের কিছু অংশ শেয়ার করছি, শেয়ার ভ্যালুর কনসেপ্ট থেকে।

আমার পরিবার এবং আত্মীয়-স্বজনের অনেকেই তখন নামকরা রাজনীতিবিদ ছিলেন, এমপি, জেলার মেয়র, উপজেলা চেয়ারম্যান, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন, যুদ্ধ করে শহীদ হয়েছেন এবং মুক্তিযুদ্ধের ভাইস চেয়ারম্যান হয়েছেন, বীর প্রতীক হয়েছেন। নড়াইল নানাবাড়ি, মাগুরা দাদাবাড়ি; মাঝখানে বয়ে গেছে প্রাণপ্রিয় নবগঙ্গা নদী। এপাড়ে সবাই দাদা-দাদি, কাকা-চাচি, চাচাতো ভাই-বোন, মাসি-পিসি, খুড়ো-খুড়ি; ওপাড়ে নান-নানি, মামা-মামি, মামাতো ভাই-বোন, মাসি-পিসি, খুড়ো-খুড়ি, বন্ধু-বান্ধব। মতদ্বিমত থাকলেও দেশের স্বার্থে সবাই ছিল একমত, কিন্তু সেটা এখন আর আগের মতো নেই।

আমি যে খুদে মুক্তিযোদ্ধা ছিলাম, তার জন্য কারও কাছ থেকে সনদপত্র নিতে হয়নি বা সংসদ থেকে পাস করানোর জন্য সুপারিশ করার দরকার হয়নি। তারপর সেই ১৯৮৫ সাল থেকে বিদেশে বসবাস। ওসব কাগজপত্র দিয়ে তো বাকিজীবন কাটিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। তাই সেগুলো এখন কথার কথা। তবে আমার জীবনের প্রথম পাসপোর্টটা কিন্তু এখনও যত্ন করে রেখে দিয়েছি।

গত কয়েক বছর আগে সুইডেনে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসে গিয়েছিলাম পাসপোর্ট নিতে। গিয়ে দেখি ছোটবেলার এক বাল্যবন্ধু সেখানে রাষ্ট্রদূত। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, আমার কোনো পুরোনো পাসপোর্ট আছে কিনা। তিনি সেই ১৯৮৫ সালের পাসপোর্ট দেখে সম্ভবত তাঁর সকল সহকর্মীদের দেখিয়েছিলেন এই মর্মে যে কীভাবে এত সুন্দর, পরিপাটি অবস্থায় এত বছর ধরে একটি কাগজের পাসপোর্ট থাকতে পারে! আমার সহধর্মিণী অনেক যত্ন করে আমার শুধু পাসপোর্ট নয়, আমাকেও পরিপাটি অবস্থায় ধরে রেখেছেন, আলহামদুলিল্লাহ।

এখন আসি মূল কথায়। আমি সুইডেন আসার পর প্রেম-প্রীতি করেছি, বেশ করেছি, ভালোই করেছি। এমনকি একজনের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল গভীর ভালোবাসার। কথা সত্য, তারপরও বিরহের চিঠি তিনি লিখে পাঠালেন; সম্পর্ক শেষ হয়ে গেল। পরিবারের মুরুব্বিরা বললেন, আর বিদেশি নয়, খুব হয়েছে, এবার দেশে গিয়ে বিয়ে-শাদি করতে হবে। বিদেশি মেয়েরা টিকবে না। কেউ বলতে শুরু করল, এত বড় একটি ঘটনার পর নতুন করে কোনো কিছু করা যাবে না বা হুট করে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক হবে না, ইত্যাদি ইত্যাদি।

পরিবারের মধ্যে তখন উপদেশ দেওয়ার জন্য লোকের অভাব ছিল না। যেমনটি ছোটবেলায় দেখেছি, পুকুর ভরা মাছ, গোয়াল ভরা গরু, গোলা ভরা ধান; ঠিক তেমনি উপদেশ দেওয়ার জন্য শুভানুধ্যায়ীদের অভাব ছিল না। কিন্তু ঠেলা সামলানোর সময় কেউ কখনো ছিল না। এটা আমাকেই করতে হয়েছে।

যাই হোক, সবাইকে উপেক্ষা করে আমি আবার নতুন প্রেমে পড়েছি এবং বিয়ে করেছি। এখনও সংসার করছি। আমার এই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলতে চাই, উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের পর স্বাধীনতার সংগ্রাম এবং মুক্তি; আমার ভালোবাসার বিচ্ছেদের পর নতুন জীবন শুরু। আমি কি তাহলে বোঝাতে পেরেছি? ব্যক্তিজীবনের এই অভিজ্ঞতাই আমাকে শিখিয়েছে, একটি ব্যর্থতার পর নতুন সূচনা সম্ভব; আর সেই শিক্ষা থেকেই আমি রাষ্ট্র ও সমাজের পরিবর্তনের প্রশ্নটি বিবেচনা করি।

তা যদি পারি, তবে জুলাই সনদ যদি সত্যিই বাস্তবায়িত করতে হয়, তবে আবারও গণঅভ্যুত্থান ঘটাতে হবে এবং এখনই দেরি করা চলবে না। এই “জুলাই সনদ” কেবল একটি দাবি নয়; এটি ন্যায়, গণতন্ত্র, জবাবদিহিতা এবং জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার এক প্রতীকী অঙ্গীকার, যা জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের পথনির্দেশক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এটি মূলত রাষ্ট্র পরিচালনায় স্বচ্ছতা, আইনের শাসন, সুশাসন এবং জনগণের প্রত্যাশার প্রতিফলন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রস্তাবিত একটি নীতিগত কাঠামো।

একজন মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী জানেন? একজন ভালো জীবনসঙ্গী বা সঙ্গিনী পাওয়া। এর থেকে কঠিন এবং একই সঙ্গে সহজ কাজ পৃথিবীতে আর কিছু নেই। সবাই তো সুখী হতে চায়। কেউ সুখী হয়, কেউ হয় না। তাই বলে কি থেমে গেলে চলবে? না। লেগে থাকতে হবে। শুধু নিতে নয়, দিতেও শিখতে হবে।

ইতিহাস, সংগ্রাম এবং ব্যক্তিজীবনের অভিজ্ঞতা আমাদের একটাই শিক্ষা দেয়, ব্যর্থতা শেষ নয়; অধ্যবসায়ই সাফল্যের পথ দেখায়। ব্যক্তি ও জাতির অগ্রগতি নির্ভর করে সাহস, আত্মত্যাগ এবং পুনর্জাগরণের ওপর।

এই প্রসঙ্গে বিশ্বের দিকে তাকালে আমরা একটি তাৎপর্যপূর্ণ উদাহরণ দেখতে পাই, পুয়ের্তো রিকো। ক্যারিবীয় সাগরের বুকে অবস্থিত এই ছোট্ট ভূখণ্ডটির নিজস্ব কোনো স্বাধীন সামরিক শক্তি নেই। তবুও দেশটি স্থিতিশীল, শান্তিপূর্ণ এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের পথে অগ্রসর হচ্ছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, অবকাঠামো এবং নাগরিক অধিকার রক্ষায় তারা ধারাবাহিকভাবে কাজ করে চলেছে। যুদ্ধ বা সামরিক প্রতিযোগিতার পরিবর্তে তারা উন্নয়ন, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং মানবকল্যাণকে অগ্রাধিকার দিয়েছে।

পুয়ের্তো রিকোর রাজনৈতিক অবস্থান অনন্য। এটি যুক্তরাষ্ট্রের একটি স্বশাসিত অঞ্চল, যেখানে জনগণ তাদের সাংস্কৃতিক পরিচয় ও প্রশাসনিক কাঠামো বজায় রেখে বহির্বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক পরিচালনা করে। সামরিক শক্তির অনুপস্থিতি তাদের দুর্বল করেনি; বরং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান এবং কূটনৈতিক বাস্তবতা তাদের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করেছে। এই বাস্তবতা আমাদের একটি মৌলিক প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়, একটি ছোট ভূখণ্ড যদি সংঘাত ছাড়াই সুন্দরভাবে এগিয়ে যেতে পারে, তবে আমরা কেন পারব না?

আমাদের শক্তি কি কেবল অস্ত্রে, নাকি ঐক্যে? একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত ক্ষমতা তার জনগণের সংহতি, আত্মমর্যাদা এবং স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতায় নিহিত। আমরা ইতিহাসের প্রতিটি বাঁকে তা প্রমাণ করেছি। যদিও কেউ কেউ আবেগের বশে বলেন, আমরা চাইলে তিন দিনেই ভারত জয় করতে পারি, কিন্তু বাস্তব শক্তি যুদ্ধের আহ্বানে নয়, বরং আত্মবিশ্বাস, ন্যায় এবং নৈতিক দৃঢ়তায় প্রতিফলিত হয়। প্রশ্ন হলো, আমরা কী চাই, সংঘাত, না মর্যাদাপূর্ণ সহাবস্থান?

তারা কেন আমাদের ওপর কর্তৃত্ব বা নেতৃত্ব দেবে, যদি আমরা তা না চাই? একটি স্বাধীন জাতির সিদ্ধান্ত তার জনগণের হাতেই থাকা উচিত। আমাদের দেশের মানুষের মধ্যে পারিবারিক মতভেদ থাকতে পারে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই মতভেদের সুযোগে প্রতিবেশী কোনো দেশের নাক গলানোর অবকাশ আমরা কেন দেব? একটি আত্মমর্যাদাসম্পন্ন জাতি নিজের সমস্যার সমাধান নিজেই করে, অন্যের ওপর নির্ভর করে নয়।

ইতিহাস আমাদের শিখিয়েছে, ঐক্য শক্তি দেয়, বিভক্তি দুর্বলতা ডেকে আনে। ব্যক্তিজীবনের মতো রাষ্ট্রজীবনেও সত্য একই: সংকট আসে, বিভ্রান্তি আসে, কিন্তু দৃঢ় সংকল্প থাকলে পথ খুঁজে পাওয়া যায়। যেমন ভালোবাসার বিচ্ছেদের পর নতুন জীবন শুরু করা সম্ভব, তেমনি জাতীয় জীবনের সংকটের পরও পুনর্জাগরণ সম্ভব।
সুতরাং, প্রশ্নটি আবারও ফিরে আসে, আমরা কি পারব না? অবশ্যই পারব, যদি আমরা নিজেদের ওপর আস্থা রাখি, ঐক্য বজায় রাখি এবং স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণে অটল থাকি।

আমরা যে পারবো না, এই কথাটি বলা যাবে না; পারতে আমাদের হবেই। তবে হ্যাঁ, সবাইকে আমরা এই মহৎ কাজে পাশে পাবো না। কারণ যারা দেশের বারোটা বাজিয়ে চলেছে, তারা কিন্তু আমাদের নিজেদের লোক, পরিবারের সদস্য। বিশ্বাস না হয়, খোঁজ নিয়ে দেখুন, দয়া করে। এখন উপায় একটাই – ঐক্য, সাহস এবং সত্যের পথে অবিচল অগ্রযাত্রা। এই পথ চলতে চলতে একটি অনুভূতি হৃদয়ে অনুরণিত হয়।

চোখ বুজে হাত বাড়িয়ে দিলে যদি অনুভব করা যায় একে অপরের হৃদস্পন্দন, যদি বোঝা যায় আমরা একই স্বপ্নে বিশ্বাসী, তবে তা কোনো কল্পনা নয়; এটি এক চিরন্তন অঙ্গীকারের শিখা। ঝড়-বৃষ্টির অন্ধকার ভেদ করে যেমন সূর্যের আলো উঁকি দেয়, তেমনি ঐক্যের শক্তি দূর করে জাতির দীর্ঘদিনের বেদনা। নিঃসঙ্গতার অবসান ঘটে, জন্ম নেয় নতুন আশার আলো। এই অনুভূতি হারাতে চাই না, কারণ এটাই আমাদের বিশ্বাস, আমাদের শক্তি, আমাদের ভবিষ্যৎ।

আসুন, আমরা একসঙ্গে হাত রাখি, হৃদয়ের স্পন্দন শুনি এবং একই স্বপ্নে বিশ্বাস করি। কারণ দেশটা কারো একার নয়, এটা আমাদের সবার।

রহমান মৃধা, গবেষক ও লেখক, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন।

শেয়ার করুন:-
শেয়ার