আমাদের স্বাধীনতা এসেছে একটি রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে। সেই মুক্তিযুদ্ধের আগে বহু বছরের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস রয়েছে, যার রাজনৈতিক নেতৃত্ব দিয়েছেন অনেকেই। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন মওলানা ভাসানী, শেরে বাংলা ফজলুল হক এবং শেখ মুজিবুর রহমান। আর সেই সঙ্গে ছিলাম আমি, ছিলাম আমরা, যারা শৈশব, কৈশোর, যৌবন এবং জীবন দিয়ে মানুষের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতীক হয়ে উঠেছিলাম।
কিন্তু বারবার আমাদের সামনে একটি প্রশ্ন ফিরে আসে।
২৫শে মার্চ রাতে শেখ মুজিবুর রহমান গ্রেফতার হন। কিন্তু গ্রেফতারের পূর্বে তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা পত্রে সাক্ষর করেননি এবং তাজউদ্দীন আহমদের নিয়ে যাওয়া টেপ রেকর্ডারে ঘোষণা দিতে রাজি হননি। এর ফলে সাময়িকভাবে একটি রাজনৈতিক শূন্যতা সৃষ্টি হয় এবং পুরো জাতি দিশেহারা হয়ে পড়ে।
এমতাবস্থায় মেজর জিয়াউর রহমান নিজ উদ্যোগে নিজের নামে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন এবং পরবর্তীতে তা সংশোধন করে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে ঘোষণা করেন। তাঁর কণ্ঠে সেই ঘোষণা অসংখ্য মানুষকে অনুপ্রাণিত করে। কারণ আমরা যখন যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলাম, তখন জানতাম না পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বা পুলিশ আমাদের সঙ্গে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে লড়াই করবে কিনা।
বাস্তবে দেখা গেছে, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের অনেক সরকারি কর্মচারী দেশের পক্ষে দাঁড়িয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। আমার বাবা তাঁদের মধ্যেই একজন। জনগণের পাশাপাশি জিয়াউর রহমান এবং এম এ হান্নানসহ আরও কয়েকজন সৈনিক ও কর্মকর্তা স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। তবে জিয়াউর রহমানের ঘোষণা বেশি মানুষের কাছে পৌঁছায় এবং তিনি সামরিক কর্মকর্তা হওয়ায় সেটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে, বিশেষ করে বাঙালি সেনা, ই পি আর এবং পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের জন্য।
এরই ধারাবাহিকতায় তাজউদ্দীন আহমদ এবং সৈয়দ নজরুল ইসলামের নেতৃত্বে ১০ই এপ্রিল ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের প্রথম সরকার গঠন হয় এবং ১৭ই এপ্রিল শপথ গ্রহণ করে। এই শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয় মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায় (বর্তমান মুজিবনগর), যা তৎকালীন কুষ্টিয়া জেলার অন্তর্গত এবং ভারত সীমান্তসংলগ্ন একটি এলাকা।
জাতির দুর্ভাগ্যের সময়ে রাজনৈতিক নেতাদের দেশের ভেতরে খুব বেশি দেখা যায়নি। তাঁরা ভারতের মাটিতে বসে নেতৃত্ব দিয়েছেন, বলা হয়, কিন্তু আমরা গ্রামবাংলার মানুষ সেই নেতৃত্ব কতটা অনুভব করেছি, তা মনে পড়ে না। কারণ তখন আমরা আবেগের বশবর্তী হয়ে, বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম। তখন কারো ভাষণের অপেক্ষায় ছিলাম, তা মনে পড়ে না। আমরা শুধু জানতাম, পেছনে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী, আর সামনে মৃত্যু অথবা স্বাধীনতা।
তবুও সত্য এটাই, তৎকালীন সেই সরকারের রাজনৈতিক নেতৃত্বেই সামরিক যুদ্ধ, কূটনীতি ও প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে। এবং দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে আমরা ১৬ই ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা অর্জন করি।
কথিত রয়েছে, তাজউদ্দীন আহমদের বর্ণনা অনুযায়ী শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি। আবার এর বিপরীতে স্বীকৃত ইতিহাসে বলা হয়, তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন, কিন্তু তা বেতারে প্রচার করা সম্ভব হয়নি। যাই হোক, জিয়াউর রহমান শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। এটি সত্য, আমিও সেই ঘোষণা শুনেছি। দেশব্যাপী তা ছড়িয়ে পড়লে সেনাবাহিনীসহ অনেকেই আত্মবিশ্বাস ও অনুপ্রেরণা পায়।
কিন্তু আমার প্রশ্ন অন্য জায়গায়। শুধু কি শেখ মুজিবুর রহমান এবং জিয়াউর রহমানই তখন বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করেছিলেন? আমরা সবাই কি তবে রাজাকার ছিলাম? আমার পরিবারের বাবা, চাচা, মামারা সহ কোটি কোটি মানুষ কি কিছুই করেনি?
আমি খোলামেলা ভাবে একটি অপ্রিয় সত্য বলতে চাই, যা লক্ষ কোটি মানুষের মনের কথা। আশা করি, এই কথাগুলোর মাধ্যমে পুরনো বিতর্ক থামবে এবং জাতি কিছুটা হলেও শান্ত হবে।
স্বাধীনতার স্বীকৃতি কোনো ব্যক্তি বা পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে, তা সবার মাঝে ছড়িয়ে দিন। দেখবেন, দেশটি সত্যিকারের স্বাধীন হয়ে উঠবে। মনে রাখবেন, এই দেশ স্বাধীন হয়েছিল তৎকালীন সাত কোটি মানুষের সম্মিলিত অংশগ্রহণে, লক্ষ মানুষের জীবনের বিনিময়ে, কারও একক নেতৃত্বে বা ভাষণের কারণে নয়।
যেমনটি আমরা দেখেছি জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানে, যেখানে পুরো দেশের মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং আত্মত্যাগই ছিল মূল শক্তি।
আমি যেদিন আসিছিলাম ভবে, লিখে রাখেনি কেউ দিন, কাল, বছর কত হবে। মনে নেই সবকিছু মোর, তবে শুনেছি বড় কাকাকে বলতে, মোদের রাজা আইউব খান, তিনি গমের রুটি খান। শুনেছি রেডিওতে মুনায়েম খানকে বলতে, বাঙালি জাতি যেন পোলাওয়ের পরিবর্তে ভাত খায় একবার। দেখেছি শেখ মুজিবকে সাইকেলে করে ফরিদপুর থেকে নহাটায় আসতে। দেখেছি জাসদের নেতা, নড়াইল ভিক্টোরিয়া কলেজের ভিপি, আমার মামা জহির সর্দারকে লঞ্চে সুতো দিয়ে বেঁধে রাখতে, ভাড়া এক পয়সা বেশি বাড়াবার কারণে। দেখেছি ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের নহাটা বাজারে মিছিল করতে।
বয়স তখন হয়তো খুব বেশি না। তবে ১৯৬৮-৬৯ সালের সময়ে মিছিল, মিটিং এবং হরতালে স্লোগানের শরিক হয়ে রাস্তায় নেমে আন্দোলন করেছি, আগামীকাল, আগামীকাল, হরতাল, হরতাল। বয়স তখনও বেশি না, তবে কলা গাছ দিয়ে ভেলা বানিয়ে সেই ভেলায় করে বিলে গিয়েছি, বিলের মাছ ধরেছি পলো দিয়ে। স্কুল পালিয়ে নিজেদের এবং প্রতিবেশীদের গাছের ডাব, কাঁঠাল, আম, লিচু, জাম, খেজুরের রস চুরি করে খেয়েছি। ধরা খেয়েছি মায়ের হাতে, মারও খেয়েছি। এ সময় আমি রীতিমতো পাকাচোর।
বয়স তখনও কম, তবে যুদ্ধের সময় মনিকাকার এলএমজি দিয়ে ব্রাশ ফায়ার করেছি। হঠাৎ হয়ে যাই শিশু মুক্তিযোদ্ধা। দুষ্টুমি করার সময় শেষ না হতেই হাতে অস্ত্র, ঘাড়ে একটি পরিবারের দায়িত্ব। যেখানে বড়রা যুদ্ধের রণক্ষেত্রে পাকবাহিনীর সঙ্গে লড়াই করছে, একটি স্বাধীন বাংলাদেশ পাওয়ার আশায়। হ্যাঁ, আমি তখন দায়িত্বশীল নাগরিক, খুদে মুক্তিযোদ্ধা এবং শরণার্থী, নিজের দেশেই।
হতে পারি আজ অনেকের কাছে বুড়োদাদা। তাহলে বুড়োদাদাকে যুদ্ধের কথা, দেশ স্বাধীনতার কথা, স্বাধীনতার ঘোষকের কথা বিভ্রান্ত করে বলার চেষ্টা করা কি উচিত? এই বাঙালি জাতি পথভ্রষ্ট হয়ে সেটাই করে আসছে দীর্ঘ পঞ্চান্ন বছর ধরে।
আমি এখন ভয় পাচ্ছি। কী জানি, আবার নতুন স্লোগানের বন্যা বইবে, সংসদে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন হবে কি হবে না তা নিয়েই চলবে অন্তহীন বিতর্ক। তারপর দিন যাবে, মাস যাবে, বছর পার হয়ে যাবে, কিন্তু সমস্যার কোনো সমাধান হবে না। যেমনটি আজও ফয়সালা হয়নি, কে ছিল স্বাধীনতার ঘোষক। এটা কি আদৌ গুরুত্বপূর্ণ ছিল তখন, যখন পুরো জাতি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাজপথে নেমেছিল শুধু একটি স্বাধীন বাংলাদেশ পাওয়ার জন্য?
আজ যদি পুরো জাতির স্বীকৃতি ও সম্পৃক্ততা থাকত দেশের স্বাধীনতার সঙ্গে, তাহলে আমরা সত্যিকার অর্থেই একটি স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করতে পারতাম, কিন্তু তা আজও সম্ভব হয়নি।
বলুন, কেন বাংলাদেশ স্বাধীন করেছিলাম? কী জন্য এত রক্ত, এত ত্যাগ? আমরা আসলে কী পেয়েছি, আর কেন পাইনি? আজও যদি সেই প্রশ্নের সৎ উত্তর না দিই, তাহলে স্বাধীনতা শুধু একটি শব্দ হয়েই থাকবে, বাস্তবতা হয়ে উঠবে না। এখন প্রশ্ন একটাই, আমরা কি সত্যিই স্বাধীন, নাকি এখনো নিজেদের প্রতারণা করে যাচ্ছি?
রহমান মৃধা, গবেষক ও লেখক, প্রাক্তন পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন