ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা আলি লারিজানিকে হত্যার ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাস। গোষ্ঠীটি লারিজানির হত্যার ঘটনাকে ‘বিশ্বাসঘাতকতাপূর্ণ হামলা’ বলে উল্লেখ করেছে এবং বলেছে, ইসরাইলের এই পদক্ষেপ শুধু ইরান নয়, পুরো অঞ্চলকে লক্ষ্য করে করা একটি ‘অপরাধ’।
হামাস ইরানের জনগণের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছে এবং এই হামলাকে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা আরও বাড়ানোর মতো একটি গুরুতর ঘটনা হিসেবে দেখছে।
চলমান যুদ্ধের মধ্যে গত সোমবার (১৬ মার্চ) রাতে ইসরাইলি হামলায় নিহত হন ইরানের দুই গুরুত্বপূর্ণ নেতা লারিজানি ও সোলেমানি। এরপর গত মঙ্গলবার (১৭ মার্চ) তাদের হত্যার দাবি করে বিবৃতি দেয় ইসরাইলি সেনাবাহিনী। কয়েক ঘণ্টা পরই বিষয়টি নিশ্চিত করে ইরান।
ইরান জানিয়েছে, আজ বুধবারই (১৮ মার্চ) লারিজানি ও সোলেমানির জানাজা ও দাফন সম্পন্ন হবে। ইরানের ক্ষমতার অভ্যন্তরীণ বলয়ের এক প্রভাবশালী মুখ ছিলেন আলি লারিজানি। ষাটোর্ধ্ব এই কর্মকর্তার বিচরণ শুধু নিরাপত্তা প্রধানের ভূমিকাতেই সীমিত ছিল না।
সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়, সম্প্রচার সংস্থাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ছিল তার বিচরণ। সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টা ও নিরাপত্তা নীতির অন্যতম স্থপতির মৃত্যুতে তেহরানের ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে নতুন করে সংকট দেখা দিয়েছে।
দশকের পর দশক ধরে ইরানের অন্যতম প্রধান কৌশলবিদ হিসেবে পরিচিত ছিলেন আলি লারিজানি। ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থেকেও পরিমিত, হিসেবি ও বাস্তববাদী নেতৃত্বের জন্য তিনি আলাদা মর্যাদা অর্জন করেন। ইসরাইলি বিমান হামলায় তার মৃত্যু শুধু একজন রাজনীতিকের নয়, বরং ইরানের নীতিনির্ধারণী মস্তিষ্কের এক বড় ক্ষতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লব-পরবর্তী প্রভাবশালী এক ধর্মীয় পরিবারে বেড়ে ওঠা লারিজানি ইরান-ইরাক যুদ্ধে রেভল্যুশনারি গার্ডসের কমান্ডার হিসেবে কাজ করেন। সেই থেকেই তার উত্থানের শুরু।
পরে রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার সংস্থা, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়, জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ, প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি দক্ষতার ছাপ রাখেন। দীর্ঘ ১২ বছর পার্লামেন্ট স্পিকার হিসেবে তিনি ইরানের নীতিনির্ধারণে কেন্দ্রীয় ভূমিকা রাখেন।
পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে পশ্চিমাদের সঙ্গে আলোচনায় লারিজানি ছিলেন তেহরানের মুখপাত্র। কঠোর অবস্থান ধরে রেখেও তিনি কূটনৈতিক পথ খোলা রাখার পক্ষে ছিলেন।
রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার, ২৫ বছরের চীন-ইরান চুক্তি, এসব ক্ষেত্রেও তার ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তবে যুক্তরাষ্ট্র তাকে সাম্প্রতিক বিক্ষোভ দমনে সহিংস ভূমিকার অভিযোগে নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনে।
ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্রের হামলা শুরুর পর লারিজানি প্রকাশ্যে সতর্ক বার্তা দেন এবং অভ্যন্তরীণ বিরোধিতাকেও কঠোরভাবে দমন করার আহ্বান জানান।
বিশ্লেষকদের মতে, তার গড়ে তোলা পারমাণবিক ও নিরাপত্তা কৌশলই ইরানকে আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সহায়তা করেছে। খামেনির মৃত্যুর পর ক্ষমতার পালাবদলের সময়ে তার অভিজ্ঞ নেতৃত্ব আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। এ অবস্থায়, লারিজানির মৃত্যু সেই ভারসাম্য আরও বদলে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এদিকে লারিজানি হত্যার প্রতিশোধ নেয়ার ঘোষণা দেন ইরানের সেনাপ্রধান আমির হাতামি। এরই মধ্যে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডস (আইআরজিসি) ইসরাইলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা জোরালো করেছে। হামলায় ইসরাইলের তেল আবিবে দুই জনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া আরও অনেকেই আহত হয়েছেন।
ইসরাইলের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় ১৯২ জন ইসরাইলি আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এদের মধ্যে ৪ জনের অবস্থা মাঝারি ধরনের গুরুতর, আর বেশিরভাগই হালকা আহত। এক এক্স বার্তায় মন্ত্রণালয় আরও জানায়, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত মোট ৩ হাজার ৭২৭ জন আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
এমএন