ধর্ম ও জীবন
রমজানে উমরার ফজিলত ও উপকারিতা
রমজান মাস আল্লাহর পক্ষ থেকে মুমিনদের জন্য রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের এক মহামূল্যবান সময়। এই মাসে প্রতিটি নেক আমলের সওয়াব বহুগুণে বৃদ্ধি করা হয়। বিশেষ করে নফল ইবাদতও ফরজের সমান মর্যাদা লাভ করে এবং আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের সুযোগ বহুগুণে বেড়ে যায়। এ মাসে ইবাদতের ফজিলত সম্পর্কে সাহাবায়ে কেরাম অত্যন্ত সচেতন ছিলেন এবং বিভিন্ন কারণে কোনো ইবাদত থেকে বঞ্চিত হলে তার বিকল্প সওয়াবের পথ সম্পর্কেও তারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে জানতে চাইতেন।
রমজানে উমরার বিশেষ মর্যাদা সম্পর্কেও এমনই একটি হৃদয়গ্রাহী হাদিস বর্ণিত হয়েছে।
عَنْ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ لَمَّا رَجَعَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم مِنْ حَجَّتِهِ قَالَ لأُمِّ سِنَانٍ الأَنْصَارِيَّةِ مَا مَنَعَكِ مِنْ الْحَجِّ قَالَتْ أَبُو فُلاَنٍ تَعْنِي زَوْجَهَا كَانَ لَهُ نَاضِحَانِ حَجَّ عَلَى أَحَدِهِمَا وَالآخَرُ يَسْقِي أَرْضًا لَنَا قَالَ فَإِنَّ عُمْرَةً فِي رَمَضَانَ تَقْضِي حَجَّةً أَوْ حَجَّةً مَعِي
ইবনে ‘আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হজ হতে ফিরে এসে উম্মে সিনান (রা.) নাম্নী এক আনসারী মহিলাকে বললেন, হাজ্জ আদায় করাতে তোমাকে কিসে বাধা দিল? তিনি বললেন, অমুকের আববা অর্থাৎ তাঁর স্বামী, কারণ পানি টানার জন্য আমাদের মাত্র দু’টি উট আছে। একটিতে সাওয়ার হয়ে তিনি হজ আদায় করতে গিয়েছেন।
আর অন্যটি আমাদের জমিতে পানি সিঞ্চনের কাজ করছে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, রমজান মাসে একটি ‘উমরাহ আদায় করা একটি ফরজ হজ আদায় করার সমান অথবা বলেছেনঃ আমার সাথে একটি হজ আদায় করার সমান। (বুখারি, হাদিস : ১৮৬৩)
এই হাদিসে রমজান মাসে উমরা আদায়ের অসাধারণ মর্যাদা তুলে ধরা হয়েছে। আলেমগণ ব্যাখ্যা করেছেন, এখানে সওয়াবের দিক থেকে সমতার কথা বলা হয়েছে, ফরজ হওয়ার দিক থেকে নয়।
অর্থাৎ রমজানের উমরা ফরজ হজের দায়িত্ব আদায় করে দেয় না; তবে সওয়াবের দিক থেকে এর মর্যাদা অত্যন্ত উচ্চ।
রমজানে উমরার ফজিলতের একটি কারণ হলো, এ মাস নিজেই বরকতপূর্ণ সময়। সময়ের মর্যাদা যখন বেশি হয়, তখন সেই সময়ে সম্পাদিত ইবাদতের মূল্যও বেড়ে যায়। যেমন কদরের রাত হাজার মাসের চেয়েও উত্তম, তেমনি রমজানে করা ইবাদতও বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। আর উমরা যেহেতু নিজেই একটি বড় ইবাদত, তাই তা রমজানে আদায় করলে তার সওয়াব বিশেষভাবে বৃদ্ধি পায়।
এছাড়া রমজানে উমরা আদায় মানুষকে আত্মশুদ্ধি ও তাকওয়ার পথে আরও দৃঢ় করে। রোজা, তারাবি, কোরআন তিলাওয়াত এবং মক্কা-মদিনার পবিত্র পরিবেশ—সব মিলিয়ে একজন মুসলমানের অন্তর নরম হয়, গুনাহ থেকে দূরে থাকার প্রবণতা বৃদ্ধি পায় এবং আল্লাহর সাথে সম্পর্ক গভীর হয়।
রমজানে উমরা করার আরেকটি বড় উপকারিতা হলো, এটি অতীতের গুনাহ মাফের একটি শক্তিশালী মাধ্যম। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অন্য হাদিসে বলেছেন, এক উমরা থেকে আরেক উমরা পর্যন্ত সময়ের গুনাহের জন্য কাফফারা হয়। তাই রমজানের মতো বরকতময় মাসে উমরা আদায় মুমিনের জন্য আত্মিক পরিশুদ্ধির এক অনন্য সুযোগ।
সবশেষে বলা যায়, যে ব্যক্তি কোনো কারণে হজে অংশ নিতে না পারেন, তার জন্য রমজানে উমরা একটি বড় সান্ত্বনা ও মহান আমলের সুযোগ। এটি মুমিনের ঈমানকে শক্তিশালী করে, আল্লাহর ভালোবাসা অর্জনের পথ খুলে দেয় এবং আখিরাতের জন্য বিপুল সওয়াবের ভান্ডার সঞ্চয়ের মাধ্যম হয়ে ওঠে। তাই সামর্থ্য থাকলে রমজানে উমরা আদায়ের চেষ্টা করা একজন মুমিনের জন্য অত্যন্ত কল্যাণকর।
এমএন
জাতীয়
হজ যাত্রীদের টিকেটের দাম কমলো ১২ হাজার টাকা
হজযাত্রীদের জন্য টিকিটের খরচ কমিয়েছে সরকার। এবার হজ ফ্লাইটের টিকিটপ্রতি ১২ হাজার টাকা কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত।
রোববার (১২ এপ্রিল) গণমাধ্যমে পাঠানো এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। এতে বলা হয়, এবার কোনো চার্টার্ড ফ্লাইট পরিচালনা ছাড়াই ৭৮ হাজারের বেশি হজযাত্রীকে পরিবহন করা হচ্ছে। আর হজযাত্রায় টিকিটপ্রতি ১২ হাজার টাকা খরচ কমানো হয়েছে।
অন্যদিকে দুপুরে সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত হজ ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত জাতীয় কমিটির সভা শেষে ধর্মমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ জানান, ২০২৬ সালের হজ ফ্লাইট শুক্রবার (১৮ এপ্রিল) রাতে থেকে শুরু হচ্ছে। এর উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ধর্মমন্ত্রী বলেন, আগামী দু-এক দিনের মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী হাজি ক্যাম্প পরিদর্শনে যেতে পারেন।
ধর্মমন্ত্রী বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মধ্যেও হজ ফ্লাইটের শিডিউলে বড় ধরনের কোনো বিপর্যয় হবে না বলে আশা করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যাতে হজযাত্রীরা নির্বিঘ্নে সৌদি আরবে পৌঁছাতে পারেন।
মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, এ বছর বাংলাদেশ থেকে মোট ৭৮ হাজার ৫শ’ জন হজযাত্রী পবিত্র হজ পালনের উদ্দেশে সৌদি আরবে যাবেন। এর মধ্যে সরকারি ব্যবস্থাপনায় ৪ হাজার ২৬০ জন এবং বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় ৭২ হাজার ৩৪৪ জন হজযাত্রী নিবন্ধন সম্পন্ন করেছেন।
ধর্ম ও জীবন
বৈধ হলেও যে ৩ কাজ ইসলামে নিন্দনীয়
ইসলামের প্রতিটি নির্দেশনা দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণেই হয়ে থাকে। কিছু কাজ অবস্থা বিবেচনায় বৈধ হলেও যথাসম্ভব দূরে থাকতে উৎসাহিত করেছেন নবীজি (স.)। মূলত উম্মতের সুন্দর জীবন ও শঙ্কামুক্ত পরকালের জন্যই নবীজির এমন নির্দেশনা। নিচে তেমনই তিনটি নিন্দনীয় বৈধ কাজের পরিচয় তুলে ধরা হলো।
১. ভিক্ষাবৃত্তি
ইসলামে ভিক্ষাবৃত্তিকে জায়েজ রাখা হয়েছে নিঃস্ব, গরিব, মিসকিন, ঋণগ্রস্ত ও অসহায়দের কল্যাণার্থে। কিন্তু একে প্রবলভাবে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। রাসুল (স.) বলেছেন, ‘কষ্ট করে পিঠে বোঝা বহন করে জীবনযাপন করা ভিক্ষাবৃত্তি থেকে উত্তম ও শ্রেষ্ঠতর।’ (বুখারি: ১৪৭১) অন্য হাদিসে আছে, ‘নিশ্চয়ই ওপরের হাত নিচের হাত থেকে উত্তম।’ (বুখারি: ১৪২৭)
সম্পদ বৃদ্ধির লক্ষ্যে যারা ভিক্ষাবৃত্তি করে তাদের পরকালে কঠিন শাস্তির হুঁশিয়ারি রয়েছে। রাসুল (স.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি নিজের সম্পদ বাড়ানোর জন্য মানুষের কাছে সম্পদ ভিক্ষা করে বেড়ায় বস্তুত সে আগুনের ফুলকি ভিক্ষা করছে। কাজেই এখন তার ভেবে দেখা উচিত— সে বেশি নেবে না কম নেবে!’ (মুসলিম: ২২৮৯)। আরেক সহিহ বর্ণনায় এসেছে ‘যে ব্যক্তি সবসময় মানুষের কাছে চেয়ে থাকে, সে কেয়ামতের দিন এমনভাবে উপস্থিত হবে যে, তার চেহারায় কোনো গোশত থাকবে না।’ (বুখারি: ১৪৭৪)
ইসলাম কর্মহীন ও বেকারত্ব সমর্থন করে না বলেই প্রিয়নবী (স.) সাহায্যপ্রার্থীকে ‘বনে গিয়ে কাঠ কেটে’ সাবলম্বিতা অর্জনের পথ দেখিয়েছিলেন। (বুখারি: ২০৭৫)
২. ঋণগ্রহণ
প্রিয়নবী (স.) ‘ঋণ, রোগ, শত্রু’ এ তিন জিনিসকে ক্ষুদ্র ও সামান্য বিবেচনা করতে নিষেধ করেছেন। তাই বাধ্য হলেও ঋণগ্রহণে সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি। পাওনাদারের পাওনা হাককুল ইবাদ তথা বান্দার অধিকার। ইসলামে ঋণগ্রস্তকে অর্থসংশ্লিষ্ট ইবাদত (হজ, জাকাত, কোরবানি, ফিতরা) স্থগিত রেখে আগে ঋণ পরিশোধের তাগিদ দেওয়া হয়েছে। পাওনাদারের পাওনা পরিশোধ না করলে মহান আল্লাহও ঋণগ্রহীতাকে ক্ষমা করবেন না। জান্নাত পিয়াসী মুমিনদের এ ব্যাপারে সদা সতর্ক থাকা জরুরি। সাওবান (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (স.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তির মৃত্যু হবে অহংকার, খেয়ানত এবং ঋণ থেকে মুক্ত হয়ে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।’ (তিরমিজি: ১৫৭২; ইবনে মাজাহ: ২৪১২)
অর্থাৎ ঋণগ্রস্ত হয়ে মারা গেলে সে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না। তাছাড়া রাসুলুল্লাহ (স.) মৃত ব্যক্তির সম্পদ তার উত্তরাধিকারীদের মধ্যে বণ্টনের আগে মৃতের ঋণ পরিশোধ করার ব্যাপারে জোর তাগিদ দিয়েছেন। (মুসনাদ আহমদ: ১৭২২৭) অন্য হাদিস থেকে জানা যায়, আল্লাহর পথে শহিদ হওয়া ব্যক্তিও তার ঋণের কারণে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবেন না। (মুসনাদ আহমদ: ২২৪৯৩)
৩. বিবাহবিচ্ছেদ
ইসলামি শরিয়তে অতি প্রয়োজনে তালাকের অবকাশ থাকলেও বিষয়টি অপছন্দনীয়। দুটি মন ও পরিবারের মেলবন্ধনে সংসার সুখের স্বর্গ এবং তা বজায় রাখা ইবাদততুল্য। কিন্তু তা একেবারেই অসম্ভব হলে বিবাহবিচ্ছেদ একটি উপায় মাত্র। পবিত্র কোরআনে এ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা দেওয়ার জন্য ‘তালাক’ নামক একটি সুরা আছে। এছাড়া সুরা বাকারা, নিসা, নূর, মুজাদালা প্রভৃতি সুরায় বিবাহবিচ্ছেদসংক্রান্ত বিভিন্ন পারিভাষিক বিশ্লেষণ আছে।
পারিবারিক বৈরীতা প্রকট হলেও প্রথমে শান্তি ফিরিয়ে আনার নির্দেশনা দিয়ে মহান আল্লাহ বলেন, আর যদি তোমরা তাদের উভয়ের মধ্যে বিচ্ছেদের আশঙ্কা করো তাহলে স্বামীর পরিবার থেকে একজন বিচারক এবং স্ত্রীর পরিবার থেকে একজন বিচারক পাঠাও। যদি তারা মীমাংসা চায় তাহলে আল্লাহ উভয়ের মধ্যে মিল করে দেবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বজ্ঞানী, সম্যক অবগত। (সুরা নিসা: ৩৫)
আল্লাহ তাআলা পুরুষদের নির্দেশ দিয়েছেন ‘তাদের সঙ্গে সৎভাবে জীবনযাপন করবে।’ (সুরা নিসা: ১৯) হাদিসে আছে, ‘তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই সর্বোত্তম, যে তার স্ত্রীর কাছে সর্বোত্তম।’ (মেশকাত, পৃষ্ঠা- ২৮১)। আলী (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুল (স.) বলেন, ‘তোমরা বিয়ে করো, কিন্তু তালাক দিয়ো না। কেননা একটি তালাক সম্পন্ন হলে আল্লাহর আরশ কেঁপে ওঠে।’ (আহকামুল কোরআন, ৩৯ খ-, পৃষ্ঠা- ১৩৩)
নবীজি যেসব কাজে নিরুৎসাহিত করেছেন, সেসব কাজ থেকে আল্লাহ আমাদের দূরে থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন।
ধর্ম ও জীবন
কাজা নামাজের বিধান, নিয়ম ও আদায়ের সঠিক পদ্ধতি
মানুষের জীবনে সময়ের গুরুত্ব অপরিসীম। বিশেষ করে ইবাদতের ক্ষেত্রে সময়ানুবর্তিতা ইসলামের অন্যতম প্রধান শর্ত। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন, নিশ্চয়ই নামাজ মুমিনদের ওপর নির্দিষ্ট সময়ে ফরজ করা হয়েছে। (সূরা নিসা: ১০৩)।
কিন্তু মানুষ হিসেবে শয়তানের কুমন্ত্রণা, অলসতা কিংবা বিশেষ কোনো ওজরের কারণে অনেক সময় নির্দিষ্ট ওয়াক্তে নামাজ পড়া সম্ভব হয় না। এই ছুটে যাওয়া নামাজকেই ইসলামি পরিভাষায় ‘কাজা নামাজ’ বলা হয়।
নিচে কাজা নামাজের বিধান, এটি পড়ার নিয়ম এবং এ সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো।
কাজা নামাজ কী এবং কেন?
কোনো ফরজ বা ওয়াজিব নামাজ তার নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আদায় না করলে তাকে কাজা বলা হয়। ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী, ইচ্ছাকৃতভাবে নামাজ কাজা করা কবিরা গুনাহ। তবে যদি কেউ ভুলে যায় কিংবা ঘুমের কারণে সময় অতিবাহিত হয়ে যায়, তবে মনে হওয়ার সাথে সাথেই তা আদায় করে নেওয়া ওয়াজিব।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি নামাজ পড়তে ভুলে যায় অথবা নামাজের সময় ঘুমিয়ে থাকে, তবে তার কাফফারা হলো যখনই মনে পড়বে তখনই নামাজ পড়ে নেওয়া।(সহিহ বুখারি)।
কাজা নামাজ পড়ার ক্ষেত্রে কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম ও ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হয়। নিচে এর প্রধান দিকগুলো আলোচনা করা হলো:
১. তারতিব বা ধারাবাহিকতা রক্ষা
যাঁদের জীবনে অল্প কিছু নামাজ (ছয় ওয়াক্তের কম) কাজা হয়েছে, তাঁদের বলা হয় ‘সাহেবে তারতিব’। তাঁদের জন্য কাজা নামাজ পড়ার ক্ষেত্রে ধারাবাহিকতা রক্ষা করা আবশ্যক। অর্থাৎ, ফজরের কাজা আগে, তারপর জোহরের কাজা এভাবে ক্রমানুসারে পড়তে হবে। তবে যদি কাজা নামাজের সংখ্যা ছয় ওয়াক্ত বা তার বেশি হয়ে যায়, তবে ধারাবাহিকতা রক্ষা করা জরুরি নয়; যেকোনো সময় যেকোনো ওয়াক্তের কাজা পড়া যাবে।
২. কোন কোন নামাজের কাজা পড়তে হয়?
কেবল ফরজ নামাজ এবং বিতর নামাজের কাজা আদায় করা আবশ্যক। সুন্নত বা নফল নামাজ কাজা হয়ে গেলে তা পুনরায় পড়ার প্রয়োজন নেই (তবে ফজরের সুন্নতের ক্ষেত্রে কিছু বিশেষ বিধান রয়েছে)। অর্থাৎ, দৈনিক পাঁচ ওয়াক্তের ফরজ এবং এশার পরের বিতর এই মোট ৬টি নামাজের কাজা করতে হয়।
৩. কাজা নামাজের নিয়ত
কাজা নামাজের জন্য মনে মনে নির্দিষ্ট ওয়াক্তের নিয়ত করতে হবে। যেমন: আমি আমার জিন্দেগির সর্বপ্রথম বা সর্বশেষ ছুটে যাওয়া ফজরের ফরজ নামাজের কাজা আদায় করছি। এভাবে প্রতি ওয়াক্তের জন্য আলাদা নিয়ত করতে হবে।
যাঁদের জীবনে অনেক বছরের নামাজ কাজা হয়েছে, তাঁদের জন্য ‘উমরি কাজা’র বিধান রয়েছে। প্রতিদিনের ফরজ নামাজের সাথে সাথে তাঁরা হিসাব করে পুরনো কাজাগুলো আদায় করবেন।
কখন কাজা নামাজ পড়া নিষেধ?
কাজা নামাজ যেকোনো সময় পড়া যায়, তবে তিনটি নিষিদ্ধ সময়ে কাজা নামাজ পড়া জায়েজ নেই:
১. সূর্য উদয়ের সময়।
২. ঠিক মধ্য দুপুরে (সূর্য যখন মাথার ওপরে থাকে)।
৩. সূর্য অস্ত যাওয়ার সময় (তবে ওই দিনের আসর বাকি থাকলে তা পড়া যায়)।
এই তিনটি সময় বাদে দিন বা রাতের যেকোনো অংশে কাজা নামাজ আদায় করা যায়। এমনকি মাকরুহ সময়েও (যেমন আসরের পর বা ফজরের পর) কাজা নামাজ পড়া জায়েজ।
যদি কেউ সফরে থাকা অবস্থায় নামাজ কাজা করে, তবে বাড়িতে ফিরে তাকে ‘কসর’ বা সংক্ষিপ্ত নামাজই কাজা করতে হবে (চার রাকাতের জায়গায় দুই রাকাত)। আবার যদি বাড়িতে থাকা অবস্থায় নামাজ কাজা হয় এবং তা সফরে থাকা অবস্থায় আদায় করতে চায়, তবে তাকে পূর্ণ চার রাকাতই কাজা করতে হবে। অর্থাৎ, নামাজ যে অবস্থায় কাজা হয়েছে, ঠিক সেই নিয়মেই তা আদায় করতে হবে।
নামাজ হলো আল্লাহর হুকুম। সময়ের নামাজ সময়ে আদায় করা যেমন ফরজ, তেমনি তা ছুটে গেলে পুনরায় আদায় করাও আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি সুযোগ। কাজা নামাজ আদায়ের মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর কাছে নিজের ভুল স্বীকার করে এবং তাঁর আনুগত্যের প্রমাণ দেয়।
কেবল কাজা নামাজ পড়লেই গুনাহ মাফ হয় না, বরং ইচ্ছাকৃত নামাজ ছাড়ার জন্য আল্লাহর কাছে আন্তরিকভাবে তওবা ও ইস্তিগফার করতে হবে। কাজা নামাজ পড়ার অর্থ হলো সেই ওয়াজিব জিম্মাদারি থেকে মুক্ত হওয়া।
দীর্ঘদিনের কাজা নামাজগুলো যখন একজন মুমিন ধীরে ধীরে শেষ করতে থাকেন, তখন তাঁর মনে এক ধরণের আত্মিক প্রশান্তি অনুভূত হয়। এটি আল্লাহর নৈকট্য লাভের পথে বড় বাধা দূর করে।
পরিবারের কোনো সদস্য নামাজে অলসতা করলে তাকে কাজা নামাজের গুরুত্ব বোঝানো উচিত। বিশেষ করে সন্তানদের ছোটবেলা থেকেই নামাজের সময়ানুবর্তিতা শেখাতে হবে। যদি কারো কাজা নামাজ বাকি থাকে, তবে তা আদায়ের জন্য তাকে উৎসাহিত করা এবং নামাজের উপযোগী পরিবেশ তৈরি করে দেওয়া সমাজের দায়িত্ব।
নামাজ ত্যাগ করা একজন মুমিনের জন্য অপমানের বিষয়। তবে শয়তানের ধোঁকায় পড়ে বা অনিচ্ছাকৃতভাবে নামাজ কাজা হয়ে গেলে নিরাশ হওয়া যাবে না। আল্লাহর রহমতের দরজা সব সময় খোলা। আজই হিসাব করে দেখুন আপনার জীবনে কত ওয়াক্ত নামাজ বাকি আছে এবং একটি নির্দিষ্ট পরিকল্পনা করে তা আদায় শুরু করুন।
কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম নামাজের হিসাব নেওয়া হবে। তাই দুনিয়ার এই ব্যস্ততার মাঝেই আমাদের বিগত দিনের ভুলগুলো শুধরে নেওয়া এবং জিন্দেগির সব কাজা নামাজ আদায় করে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা জরুরি। আল্লাহ আমাদের সবাইকে সময়ের নামাজ সময়ে পড়ার এবং বিগত দিনের কাজাগুলো দ্রুত আদায়ের তৌফিক দান করুন। আমিন।
ধর্ম ও জীবন
তীব্র প্রয়োজনের মুহূর্তে রাসুল (সা.) যে আমল করতে বলেছেন
মানুষের জীবনে অনেক সময় কোনো কিছুর তীব্র প্রয়োজন বা বড় ধরনের সমস্যা দেখা দেয়। স্বাভাবিকভাবে তা পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। এমন কঠিন সময়ে রাসুল (সা.) দুই রাকত নামাজ পড়ে একটি দোয়া পড়তে বলছেন।
لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ الْحَلِيمُ الْكَرِيمُ سُبْحَانَ اللَّهِ رَبِّ الْعَرْشِ الْعَظِيمِ الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ مُوجِبَاتِ رَحْمَتِكَ وَعَزَائِمَ مَغْفِرَتِكَ وَالْغَنِيمَةَ مِنْ كُلِّ بِرٍّ وَالسَّلاَمَةَ مِنْ كُلِّ إِثْمٍ أَسْأَلُكَ لاَ تَدَعَ لِي ذَنْبًا إِلاَّ غَفَرْتَهُ وَلاَ هَمًّا إِلاَّ فَرَّجْتَهُ وَلاَ حَاجَةً هِيَ لَكَ رِضًا إِلاَّ قَضَيْتَهَا لِي يا أرحمَ الراحمِين
উচ্চারণ : লা ইলাহা ইল্লাল্লাহুল হালিমুল কারিম। সুবহানাল্লাহি রাব্বিল আরশিল আজিম। আলহামদুলিল্লাহি রাব্বিল আলামিন। আসয়ালুকা মুজিবাতি রাহমাতিক ওয়া আজায়িমা মাগফিরাতিকা ওয়াল গানিমাতা মিন কুল্লি বিররিন ওয়াস-সালামাতা মিন কুল্লি ইসমিন। আসয়ালুকা লা তাদা লি জামবান ইল্লা গাফারতাহু ওয়ালা হাম্মান ইল্লা ফাররাজতাহু ওয়া লা হাজাতান হিয়া লাকা রিদান ইল্লা কাদাইতাহা লি ইয়া আরহামার রাহিমিন।
অর্থ : ‘আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই, তিনি অত্যন্ত ধৈর্যশীল ও দয়ালু। সব পবিত্রতা আরশের মালিক মহান আল্লাহর জন্য এবং সব প্রশংসা জগত্গুলোর প্রতিপালক আল্লাহর জন্য। আমি আপনার কাছে অনুগ্রহ লাভের উপায়গুলো, ক্ষমা লাভের দৃঢ় অঙ্গীকার, প্রত্যেক ভালো কাজের প্রাচুর্য এবং মন্দ কাজ থেকে আশ্রয় কামনা করছি। আপনি আমার কোনো পাপ ক্ষমা না করে রাখবেন না, কোনো দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি না দিয়ে রাখবেন না, আপনার সন্তুষ্টিদায়ক কোনো প্রয়োজন ও চাহিদা পূরণ না করে রাখবেন না। হে পরম দয়ালু মহান আল্লাহ।’
আবদুল্লাহ বিন আবি আওফা (রা.) বর্ণনা করেছেন, একদিন রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাদেরকে বললেন, ‘যদি তোমাদের কারো আল্লাহর কাছে বা কোনো আদম সন্তানের কাছে কোনো কিছুর প্রয়োজন হয়, সে যেন ভালোকরে অজু করে এবং দুই রাকাত নামাজ আদায় করে। অতঃপর আল্লাহর প্রশংসা ও তাঁর রাসুলের প্রতি দরুদ পাঠ করে এই দোয়া পড়ে। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ৪৭৯)
ধর্ম ও জীবন
সন্তানকে হাম থেকে বাঁচাতে যে দোয়া পড়বেন
সন্তান আল্লাহর এক মহামূল্যবান আমানত। তাদের সুস্থতা ও নিরাপত্তা রক্ষা করা প্রতিটি অভিভাবকের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। বর্তমান সময়ে হামসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগ শিশুদের জন্য বড় একটি ঝুঁকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই শারীরিক চিকিৎসার পাশাপাশি আল্লাহর কাছে দোয়া ও আশ্রয় প্রার্থনা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
নবী করিম (সা.) আমাদের এমন কিছু দোয়া শিখিয়েছেন, যা পাঠ করলে আল্লাহর হেফাজত লাভ করা যায়।
দোয়াটি হলো: بِسْمِ اللَّهِ الَّذِي لَا يَضُرُّ مَعَ اسْمِهِ شَيْءٌ فِي الْأَرْضِ وَلَا فِي السَّمَاءِ وَهُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ
উচ্চারণ:
বিসমিল্লাহিললাজি লা ইয়াদুররু মাআসমিহি শাইউন ফিল আরদি ওয়ালা ফিস সামা-ই ওয়া হুয়াস সামি‘উল আলিম।
অর্থ:
আল্লাহর নামে (শুরু করছি), যাঁর নামের সঙ্গে পৃথিবীতে বা আসমানে কোনো কিছুই ক্ষতি করতে পারে না। আর তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞানী।”
ফজিলত:
উসমান ইবনে আফ্ফান (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসুল (সা.) বলেছেন, যে ব্যাক্তি সকাল-সন্ধায় এই দোয়া তিনবার পাঠ করবে ঐ দিন আল্লাহ তাআলা তাকে সমস্ত বিপদ-আপদ ও বিভিন্ন সংক্রমন জনিত ছোঁয়াছে রোগ থেকে হেফাজত করবেন। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৫০৮৮)
যেভাবে পড়বেন:
প্রতিদিন সকাল (ফজরের নামাজের পর) এবং বিকাল (আসর বা মাগরিবের নামাজের পর) প্রতিবার ৩ বার করে পড়ে দোয়াটি পড়ার পর আপনার সন্তানের মাথা, বুক বা সম্পূর্ণ শরীরে দিকে ফুঁ দিন। তবে মনে রাখতে হবে, দোয়া শুধু মুখের উচ্চারণ নয়—বরং আন্তরিক বিশ্বাস ও আল্লাহর প্রতি নির্ভরতার প্রকাশ। দোয়ার পাশাপাশি সন্তানের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, পুষ্টিকর খাবার ও স্বাস্থ্যবিধিও মেনে চলা জরুরী।



