সাগর-পাহাড় ঘেরা পর্যটন নগরী কক্সবাজার এখন নির্বাচনী উত্তাপের কেন্দ্রে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে জেলার ৪টি আসনেই জমে উঠেছে ভোটের কঠিন সমীকরণ। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক মিত্র বিএনপি ও জামায়াত এবার একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মাঠে নামায় পাল্টে গেছে অতীতের সব হিসাব-নিকাশ।
অভিজ্ঞ বনাম নবীন, সংগঠন বনাম জনভিত্তি- শেষ দুই দিনে প্রার্থীদের ব্যস্ততা তাই চূড়ান্ত।
কক্সবাজারের চারটি সংসদীয় আসনে এবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন মোট ১৮ জন প্রার্থী। তাদের মধ্যে ১৭ জন দলীয় মনোনয়নপ্রাপ্ত, একজন স্বতন্ত্র।
২২ জানুয়ারি প্রতীক বরাদ্দের পর থেকেই মাঠে নেমেছেন সবাই। শেষ সময়ে ‘ডোর-টু-ডোর’ প্রচারণা, পথসভা, গণসংযোগ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার- সব মিলিয়ে ভোটার টানার চেষ্টা চলছে জোরেশোরে।
কক্সবাজার–১ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি তারুণ্য:
চকরিয়া–পেকুয়া নিয়ে গঠিত কক্সবাজার-১ আসনটি এবার জাতীয় রাজনীতিতেও আলোচিত। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ প্রার্থী হওয়ায় গুরুত্ব বেড়েছে। তার বিপরীতে রয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর তরুণ প্রার্থী আবদুল্লাহ আল ফারুক।
স্থানীয়দের ভাষ্য, কাগজে তিনজন থাকলেও মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা এই দুজনের মধ্যে। অভিজ্ঞ রাজনীতিকের সাংগঠনিক নেটওয়ার্ক বনাম নবীন প্রার্থীর তৃণমূল সক্রিয়তা- এ লড়াইয়ের ফল ঘিরে কৌতূহল রয়েছে।
কক্সবাজার-২ অর্থনীতির কেন্দ্রে ভোটের লড়াই:
মহেশখালী–কুতুবদিয়া আসনে প্রতিদ্বন্দ্বী পাঁচজন। সাবেক এমপি আলমগীর ফরিদ (ধানের শীষ) এবং জামায়াতের ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদকে ঘিরেই মূল লড়াই।
মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দর, ১২০০ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ও পর্যটন সম্ভাবনা মিলিয়ে এই এলাকা এখন দেশের অন্যতম অর্থনৈতিক কেন্দ্র। উন্নয়ন, কর্মসংস্থান ও স্থানীয় স্বার্থ-এসব প্রশ্নে ভোটারদের মন জয় করার চেষ্টা চলছে।
কক্সবাজার-৩ সদর আসনে তীব্র প্রতিযোগিতা:
সদর, রামু ও ঈদগাঁও নিয়ে কক্সবাজার–৩ আসনে প্রার্থী রয়েছেন ছয়জন। বিএনপির লুৎফুর রহমান কাজল ও জামায়াতের শহীদুল আলম বাহাদুরের মধ্যে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখছেন ভোটাররা।
জেলা সদর হওয়ায় আসনটি প্রতীকীভাবেও গুরুত্বপূর্ণ। বড় সমাবেশ, নারী কর্মীদের অংশগ্রহণ এবং ঘন ঘন গণসংযোগে প্রচারণা পেয়েছে গতি। প্রতিশ্রুতির ঝুলি নিয়েও মাঠে সক্রিয় প্রার্থীরা।
কক্সবাজার-৪ সীমান্ত, রোহিঙ্গা ও ‘লক্ষ্মী আসন’ তত্ত্ব:
উখিয়া–টেকনাফ নিয়ে গঠিত কক্সবাজার–৪ বরাবরই জাতীয় আলোচনায় থাকে। রোহিঙ্গা সংকট, মাদক ও মানবপাচার, সীমান্ত নিরাপত্তা- এসব ইস্যু এই আসনকে আলাদা গুরুত্ব দেয়। রাজনৈতিকভাবে একে ‘লক্ষ্মী আসন’ বলা হয়।
অতীতে এখানে যে দলের প্রার্থী জিতেছেন, সেই দলই সরকার গঠন করেছে- এমন বিশ্বাস স্থানীয়দের মধ্যে প্রচলিত।
এবার বিএনপির প্রার্থী সাবেক চারবারের এমপি শাহজাহান চৌধুরী। তার প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের জেলা আমির নুর আহমদ আনোয়ারী। অন্যদের মধ্যে রয়েছেন ইসলামী আন্দোলন, জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও এলডিপির প্রার্থী। দক্ষিণের এ আসনে শেষ মুহূর্তের প্রচারণা তাই বেশ জমজমাট।
বদলে যাওয়া জোট সমীকরণ:
স্বাধীনতার পর থেকে কক্সবাজারকে ‘বিএনপির ঘাঁটি’ বলা হলেও অতীতের জোট নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত একসঙ্গে লড়েছে। এবার দুই দল আলাদা প্রতীকে মাঠে।
ফলে ভোটের সমীকরণে নতুন হিসাব তৈরি হয়েছে। সাংগঠনিক শক্তি ও ভোট স্থানান্তরের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে রাজনৈতিক মহলে। চূড়ান্ত ফল জানতে অপেক্ষা ১২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত।
জেলা নির্বাচন অফিস সূত্রে জানা গেছে, চার আসনে মোট ভোটার ১৮ লাখ ৪৯ হাজার ৩৫৭ জন। আগের নির্বাচনের তুলনায় বেড়েছে ১ লাখ ৯৮ হাজার ৩৯৭ জন ভোটার। জেলায় ৫৯৮টি ভোটকেন্দ্রের ৩ হাজার ৬৮৯টি কক্ষে ভোটগ্রহণ হবে।
দায়িত্বে থাকবেন ১২ হাজার ২৫১ জন কর্মকর্তা। দুটি ব্যালটে ভোট দেবেন ভোটাররা- একটি সংসদ নির্বাচনে, অন্যটি গণভোটে।
রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক এম এ মান্নান জানিয়েছেন, প্রতিটি কেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা স্থাপন, প্রিসাইডিং কর্মকর্তাদের তদারকি এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের বডি-অন ক্যামেরা ব্যবহারের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে থাকবে বাড়তি নিরাপত্তা। আচরণবিধি তদারকিতে প্রতিটি উপজেলায় দুজন করে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োজিত আছেন।
শেষ মুহূর্তের প্রচারণা, জোটভাঙা প্রতিদ্বন্দ্বিতা আর বদলে যাওয়া রাজনৈতিক বাস্তবতায় কক্সবাজারের চার আসনে এখন কেবল অপেক্ষা- ভোটের রায়ে কোন সমীকরণ টিকে থাকে।