মত দ্বিমত
গণতন্ত্রের সঠিক পথে: সংসদ নয়, স্থানীয় সরকার হোক উন্নয়নের প্রধান বাহক

বাংলাদেশের গণতন্ত্র আজ কঠিন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে আমরা সংবিধানে গণতন্ত্রের প্রতিশ্রুতি নিয়ে এগোই, অন্যদিকে বাস্তবে রাজনৈতিক দখলদারিত্ব, পরিবারতন্ত্র, দলীয় চাঁদাবাজি এবং একদলীয় কর্তৃত্ববাদী শাসনের বাস্তবতা আমাদের পথরোধ করে। নির্বাচন এখন আর গণরায় নয়—এটি হয়ে উঠেছে ক্ষমতা পাকাপোক্ত করার এক নিষ্ঠুর কৌশল। এই সংকট নিরসনে নির্বাচন পদ্ধতির কাঠামোগত পরিবর্তন এখন সময়ের দাবি।
বিশ্বের বহু গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ব্যবহৃত প্রপোরশনাল রিপ্রেজেন্টেশন (PR) বা অনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ভিত্তিক পদ্ধতি বাংলাদেশের জন্য এখন একটি সময়োপযোগী ও বাস্তবসম্মত বিকল্প। সুইডেনে আমার চার দশকের নাগরিক, গবেষক ও ভোটার অভিজ্ঞতায় আমি দেখেছি—কীভাবে PR ভিত্তিক সংসদীয় গণতন্ত্র একটি সমাজকে ন্যায়, শান্তি ও প্রগতির পথে নিয়ে যেতে পারে।
সুইডেনে কোনো একক দল সংসদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় না, ফলে সরকার গঠনে জোট বাধ্যতামূলক। এতে গড়ে ওঠে রাজনৈতিক সহনশীলতা, আলোচনাভিত্তিক সংস্কৃতি ও পারস্পরিক দায়িত্ববোধ। প্রার্থী মনোনয়নে দলের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র ও জনমত প্রাধান্য পায়, ফলে পরিবারতন্ত্র ও আর্থিক দখলদারিত্ব দুর্বল হয়। শিক্ষক, নারী, অভিবাসী, শ্রমজীবী—সকলেই যোগ্যতার ভিত্তিতে সংসদে আসার সুযোগ পান। ঘুষের কোনো দরকার নেই; টিকিট কিনে মনোনয়ন নেওয়ার ব্যবস্থা নেই—যোগ্যতা ও জনসম্পৃক্ততাই এখানে আসল মূলধন।
এখানে সংসদ সদস্যদের কাজ সীমিত—তাঁরা কেবল নীতিনির্ধারণ ও আইন প্রণয়নের দায়িত্ব পালন করেন। বরাদ্দ, চাকরি বা ব্যক্তিগত সুপারিশে হস্তক্ষেপের এখতিয়ার তাঁদের নেই। এর ফলেই গড়ে উঠেছে জনগণের উপর আস্থা এবং নির্বাচনে ৮০-৯০ শতাংশ ভোটার অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়।
বাংলাদেশের বাস্তবতা একেবারে উল্টো। এমপি পদটি হয়ে উঠেছে যেন একটি ‘বিনিয়োগের প্রজেক্ট’—যেখানে মনোনয়ন পেতে লাগে কোটি টাকার ঘুষ, যার উৎস দুর্নীতির অর্থও হতে পারে। এই অর্থ খরচ করে নির্বাচিত হওয়ার পর, এমপি-রা পরিণত হন স্থানীয় দানবে—তাঁরা বাজার কমিটি নিয়ন্ত্রণ করেন, সরকারি চাকরির সুপারিশ দেন, বরাদ্দ ভাগ করেন, এমনকি রাস্তার ইটের কন্ট্রাক্টেও হস্তক্ষেপ করেন। তাঁদের মূল উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়ায় বিনিয়োগ তোলা—জনগণের ভাগ্যের পরিবর্তন নয়।
ভোটের মূল্যও এখানে নষ্ট। নির্বাচনের আগেই টাকা দিয়ে ভোট কেনা হয়, রাতের আঁধারে প্রশাসনের সহায়তায় ভোট সম্পন্ন হয়, এবং ভোটার জানেন—তাঁর ভোটের কোনো দাম নেই। ফলে গণতন্ত্রের প্রতি বিশ্বাস হারিয়ে ফেলে জনগণ। এ এক পরস্পরবিনাশী চক্র—জনগণের আশা মর্যাদাহীন হয়ে পড়ে, আর রাজনীতির মঞ্চ হয়ে ওঠে লুটপাটের কেন্দ্র।
এই চক্র ভাঙতে হলে দরকার দুটি কাঠামোগত রূপান্তর—একসাথে ও সমান্তরালভাবে।
প্রথমত, PR পদ্ধতিতে নির্বাচন চালু করতে হবে। এতে দলীয় তালিকায় স্থান পাবে যোগ্য, জনসম্পৃক্ত প্রার্থীরা—not আর্থিকভাবে প্রভাবশালীরা। মনোনয়ন বাণিজ্য লোপ পাবে, কারণ মনোনয়ন নির্ধারিত হবে অভ্যন্তরীণ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায়। নির্বাচিত এমপি-রা কেবল আইন প্রণয়নের দায়িত্বে থাকবেন—তাঁরা আর তদবির, বরাদ্দ বণ্টন বা চাকরির সুপারিশে জড়াবেন না।
দ্বিতীয়ত, উন্নয়নের দায়িত্ব দিতে হবে স্থানীয় সরকারকে। বরাদ্দ, প্রকল্প বাস্তবায়ন ও নাগরিক সেবা পরিচালিত হবে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে। স্থানীয় উন্নয়ন হবে জনগণের বাস্তব চাহিদা অনুযায়ী—not কোনো এমপি’র ইচ্ছেমাফিক নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতে। প্রশাসন হবে সহযোগী—কিন্তু নিয়ন্ত্রক নয়। এই দুই কাঠামো—PR ভিত্তিক সংসদ নির্বাচন এবং ক্ষমতাবান স্থানীয় সরকার—একসাথে চালু হলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও প্রশাসনিক কাঠামোতে এক নতুন যুগের সূচনা হবে। প্রশাসন হবে সহযোগী—কিন্তু নিয়ন্ত্রক নয়। এবং শুধু এতটুকু যোগ করা জরুরি যে, প্রথমে স্থানীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়া উচিত—অথবা সম্ভব হলে, সুইডেনের মতো একই দিনে স্থানীয় ও জাতীয় নির্বাচন একসাথে করা উত্তম হবে। এতে সময়, খরচ এবং প্রশাসনিক জটিলতা কমবে, পাশাপাশি জনগণের অংশগ্রহণও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাবে। এতে করে জনগণ একসাথে দেশের ও নিজেদের এলাকার ভবিষ্যৎ নির্ধারণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে।
উন্নয়ন মানে কেবল রাস্তা-ঘাট নয়; উন্নয়ন মানে মানুষের জীবনে ন্যায়, সেবা, এবং সুযোগের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা। কিন্তু যে সংসদ সদস্য কোটি টাকা খরচ করে নির্বাচিত হন, তিনি জনগণের উন্নয়নের জন্য কাজ করবেন কেন?—তাঁর প্রথম লক্ষ্য থাকে বিনিয়োগ ফেরত আনা। এই মানসিকতা বদলাতে পারে PR পদ্ধতি—যেখানে নেতৃত্ব মানে জনসম্পৃক্ততা, আর ক্ষমতা মানে দায়িত্ব।
এবার প্রশ্ন, PR পদ্ধতি আসলে কী?
প্রপোরশনাল রিপ্রেজেন্টেশন (PR) বা অনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব হলো একটি গণতান্ত্রিক নির্বাচনী ব্যবস্থা, যেখানে রাজনৈতিক দলগুলো ভোটের শতকরা অনুপাতে সংসদে আসন পায়। কোনো দল যদি পায় ৩০% ভোট, তবে সে পায় ৩০% আসনও। এতে প্রতিটি ভোটের মূল্য থাকে, ভোট হারায় না।
বর্তমানের First-Past-The-Post (FPTP) পদ্ধতিতে শুধু সর্বোচ্চ ভোটপ্রাপ্ত প্রার্থী জয়ী হন, বাকি সব ভোট ‘অদৃশ্য’ হয়ে যায়। এতে রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বহীনতা, আস্থা সংকট এবং বিভাজনমূলক রাজনীতির বিস্তার ঘটে।
PR পদ্ধতির বৈশিষ্ট্য:
ন্যায়বিচার ও সমঅধিকার নিশ্চিত হয়।
সংলাপ ও সহনশীলতা গড়ে ওঠে।
মনোনয়নে স্বচ্ছতা আসে।
ভোটার আস্থা ও অংশগ্রহণ বাড়ে।
নেতৃত্বে বৈচিত্র্য সৃষ্টি হয়।
বাংলাদেশের বৈচিত্র্যময় বাস্তবতায় PR চালু করা আবশ্যক। কারণ FPTP পদ্ধতিতে—
বিরোধী কণ্ঠ দমন হয়,
ক্ষমতা পরিবার ও গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত হয়,
ভোটার আস্থা ক্ষয়ে যায়,
সংসদ হয়ে ওঠে গোষ্ঠীস্বার্থের প্ল্যাটফর্ম।
সুইডেনে PR পদ্ধতির সফল বাস্তবায়ন দেখেছি নিজ চোখে। একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকায় বাধ্যতামূলক সংলাপ হয়। সংসদে আসে শিক্ষক, অভিবাসী, বাসচালকসহ সকল শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব। ভোটার অংশগ্রহণ থাকে ৮৫-৯০%। রাজনৈতিক পরিবেশ ভদ্র, যুক্তিনির্ভর এবং সহানুভূতিশীল।
তবে PR কোনো যাদুর কাঠি নয়। এটি কেবল একটি দরজা, যার ভেতর দিয়ে যেতে হলে প্রয়োজন:
রাজনৈতিক সদিচ্ছা,
জবাবদিহিতাপূর্ণ প্রশাসন,
স্বাধীন ও সাহসী মিডিয়া,
সচেতন নাগরিক সমাজ,
এবং জাতিগত আত্মসমালোচনার সক্ষমতা।
PR শুধুই যান্ত্রিক সংস্কার নয়; এটি একটি সাংস্কৃতিক বিপ্লব। ১৯৪৫ সালে হিরোশিমা ধ্বংস হওয়ার পর জাপান বলেছিল: ‘We shall not repeat the evil.’
আজ আমরা কি দাঁড়িয়ে বলতে পারি: ‘আমরা আর নিজেদের সন্তানদের হাতেই জাতিকে ধ্বংস হতে দেব না’?
আমরা কি গড়তে পারি এমন একটি বাংলাদেশ— যেখানে ৩০ লক্ষ শহীদের আত্মা নিশ্চিন্তে বলতে পারে:
‘আমাদের রক্ত বৃথা যায়নি’?
যেখানে জুলাই মাস ফিরে আসবে স্বাধীনতার রোদের মতো— ভয়, গুম, দমন আর রক্ত নয়, বরং গণমানুষের গর্ব, মুক্তচিন্তা ও ভালোবাসার প্রতীক হয়ে। যেখানে জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর হবে রক্তের নয়—মুক্তির জয়গান।
প্রপোরশনাল রিপ্রেজেন্টেশন (PR) কেবল একটি ভোট গণনার পদ্ধতি নয়— এটি একটি পরিবর্তনের ঘোষণা, একটি নতুন মানসিকতার অভ্যুত্থান, একটি সাহসিকতার প্রতীক এবং এক মানবিক চেতনার পুনর্জন্ম।
যদি আমরা সত্যিকার অর্থে গণতন্ত্র চাই— যেখানে ক্ষমতা মানে দায়িত্ব, আর নেতৃত্ব মানে জনগণের সেবা, তাহলে PR পদ্ধতিই হবে আমাদের ভবিষ্যতের ভিত্তি।
এই মুহূর্তে প্রশ্ন একটাই— আপনি কি প্রস্তুত নিজের ঐতিহাসিক ভূমিকা পালনের জন্য?
রহমান মৃধা, গবেষক, লেখক ও সাবেক পরিচালক, ফাইজার সুইডেন। Rahman.Mridha@gmail.com

মত দ্বিমত
নির্বাচনের প্রাক্কালে নুরুল হকের ওপর হামলা: রাজনৈতিক অস্থিরতার নতুন সংকেত

সারাদেশে যখন নানা অপ্রীতিকর ঘটনার পর প্রশাসন নীরব ভূমিকা পালন করছে, তখন হঠাৎ করে নুরুল হক নুরের ওপর হামলার ঘটনা দেশজুড়ে নতুন করে আলোড়ন তুলেছে। প্রত্যক্ষ ভিডিওচিত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় দেখা গেছে, হামলায় সেনা এবং পুলিশের সদস্যরাও সরাসরি অংশ নিয়েছে। নুর বর্তমানে ঢাকা মেডিকেল কলেজের আইসিইউতে মুমূর্ষু অবস্থায় চিকিৎসাধীন। এ ঘটনা শুধু একটি রাজনৈতিক হামলা নয়, বরং আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে একটি বড় ধরনের রাজনৈতিক সংকেত বহন করছে।
সরকার সদ্য ঘোষণা করেছে যে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে। এই সময়সীমা নিয়ে আগে থেকেই নানা রাজনৈতিক বিতর্ক ছিল। সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান এর আগে নির্বাচন দ্রুত আয়োজনের পক্ষে মত দিয়েছেন। অপরদিকে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস সময় নিয়ে সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন আয়োজনের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। এই দ্বন্দ্বপূর্ণ প্রেক্ষাপটেই নুরের ওপর হামলার ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলেছে।
হামলার ঘটনার পর জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় দফতর থেকে পাঠানো বিবৃতিতে জাতীয় পার্টির সন্ত্রাসীদের দায়ী করা হয়েছে এবং এটিকে আওয়ামী ফ্যাসিবাদের দোসরদের কাজ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। জামায়াত গভীর উদ্বেগ ও তীব্র নিন্দা জানিয়ে আহতদের প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করেছে এবং দোষীদের গ্রেফতার ও শাস্তির দাবি জানিয়েছে। অন্যদিকে গণঅধিকার পরিষদের নেতাকর্মীরা বলছেন, এটি একটি পরিকল্পিত আক্রমণ যা তরুণ প্রজন্মের রাজনীতিকে স্তব্ধ করার চেষ্টা।
গণঅধিকার পরিষদের উচ্চতর পরিষদ সদস্য ও গণমাধ্যম সমন্বয়ক আবু হানিফ সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস নুরুল হক নুরের শারীরিক অবস্থার খোঁজ নিয়েছেন এবং তদন্ত করে হামলায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।
এছাড়া, অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান নুরের ওপর হামলাকে গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে উল্লেখ করেছেন এবং জাতীয় পার্টির বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছেন। উচ্চতর পরিষদ সদস্য ও গণমাধ্যম সমন্বয়কের মন্তব্যে জানা গেছে- “হামলার পরপরই প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস নুরুল হক নুরের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন। তিনি নুরকে আশ্বাস দেন যে, ঘটনাটি তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচারিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” ড. ইউনূসের এই ফোনালাপকে অনেকেই ইতিবাচক ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন। বিশেষ করে রাজনৈতিক সহিংসতার পরিবেশে এটি একটি আস্থা ফেরানোর প্রতীকী বার্তা। তবে পর্যবেক্ষকদের মতে, এই আশ্বাস কার্যকর প্রমাণিত হবে কি না তা নির্ভর করবে সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর। অতীতে বহুবার আশ্বাস দেওয়া হলেও বিচার হয়নি—তাই এবার সত্যিকার অর্থে সেনা ও পুলিশের সদস্যরা যদি দায়ী প্রমাণিত হন এবং তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়, তবে এটি নতুন সরকারের বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়াবে। অন্যথায় এটি উল্টো ড. ইউনূসের নিরপেক্ষতা নিয়েই প্রশ্ন তুলবে।
এই ঘটনার সঙ্গে আরও একটি তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, সেনাপ্রধানের সদ্যসমাপ্ত চীন সফরের পরপরই এই অপ্রত্যাশিত হামলা সংঘটিত হলো। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই প্রেক্ষাপট ঘটনার পেছনে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক বার্তাও বহন করতে পারে। ফলে দেশীয় রাজনীতি যেমন অস্থিরতার মধ্যে পড়েছে, তেমনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও এ ঘটনা নজর কাড়বে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হচ্ছে, নির্বাচনের আগে দেশে স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ নিশ্চিত করা যাবে কি না। নুরের ওপর হামলার মতো ঘটনা যদি অব্যাহত থাকে, তবে তা নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা ও অংশগ্রহণকে গুরুতরভাবে প্রভাবিত করবে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমঝোতা এবং সহিংসতা নিয়ন্ত্রণের জন্য সরকারের আন্তরিকতা এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষার মুখে।
রহমান মৃধা
গবেষক ও লেখক
(সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন)
Rahman.Mridha@gmail.com
মত দ্বিমত
প্রকৌশল খাতে বৈষম্য কাটাতে হবে লাইসেন্স ও জবাবদিহির মাধ্যমে

বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের এক সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে। শিল্পায়ন, অবকাঠামো নির্মাণ ও প্রযুক্তি খাতে প্রকৌশলীরা মেরুদণ্ডস্বরূপ। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে প্রকৌশলীদের দুই শাখা—স্নাতক প্রকৌশলী এবং প্রকৌশলে ডিপ্লোমাধারীদের মধ্যে টানাপোড়েন আমাদের উন্নয়নযাত্রাকে অকারণে জটিল করে তুলেছে।
শাহবাগে স্নাতক প্রকৌশলীদের তিন দফা দাবির আন্দোলন, পুলিশের হামলা এবং পাল্টা আন্দোলনে ডিপ্লোমাধারীদের অংশগ্রহণ—সব মিলিয়ে প্রকৌশল খাত এখন এক অস্থির বাস্তবতার মুখোমুখি। তবে এ সংকট কেবল বাংলাদেশি বাস্তবতায় সীমাবদ্ধ নয়। বিশ্বজুড়ে প্রকৌশল পেশাকে কীভাবে নিয়ন্ত্রণ ও মানসম্মত করা হয়, তা থেকে শিক্ষা নিয়ে আমরা সমাধানের পথ খুঁজতে পারি। ইউরোপ ও আমেরিকায় ‘ইঞ্জিনিয়ার’ শব্দটি কেবল ডিগ্রি অর্জনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।
যুক্তরাষ্ট্রে Professional Engineer (PE) লাইসেন্স ছাড়া কেউ সরকারি প্রকল্পে সই করতে বা ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে পরিচয় দিতে পারেন না। জার্মানিতে ‘Ingenieur’ উপাধি আইন দ্বারা সংরক্ষিত। শুধু ডিগ্রি থাকলেই চলবে না, প্রফেশনাল রেজিস্ট্রেশন বাধ্যতামূলক। যুক্তরাজ্যে Chartered Engineer (CEng) হতে হলে বহু বছরের অভিজ্ঞতা, দক্ষতা যাচাই এবং নৈতিকতার শর্ত পূরণ করতে হয়। অর্থাৎ, উন্নত বিশ্বে প্রকৌশলীরা শিক্ষা, অভিজ্ঞতা, নৈতিকতা এবং লাইসেন্স-এই চার ধাপ পেরিয়েই প্রকৌশলী পরিচয় পান। বাংলাদেশে এখনো এ ধরনের কাঠামো না থাকায় দ্বন্দ্ব ও দুর্নীতির সুযোগ তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশে স্নাতক প্রকৌশলীরা বলছেন, ডিপ্লোমাধারীরা কোটার মাধ্যমে তাদের পদ দখল করছে। এতে মেধাবী স্নাতকরা কর্মক্ষেত্রে বঞ্চিত হচ্ছেন। অন্যদিকে ডিপ্লোমাধারীরা মনে করেন, তারাও প্রকৌশলী পরিচয়ের অধিকারী এবং তাদের জন্য বাড়তি পদায়ন দরকার। ফলে উভয়পক্ষেই তীব্র রেষারেষি তৈরি হয়েছে, অথচ বাস্তবে দুই দলের কাজই পরিপূরক।
প্রশ্ন হচ্ছে-এই বিভাজন কাটিয়ে কীভাবে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা যায়? বাংলাদেশে দুর্নীতিগ্রস্ত প্রকৌশলীর সংখ্যা কম নয়। কেউ কোটি টাকার বালিশ সরবরাহে অনিয়ম করেন, কেউ সেতু নির্মাণে খরচ ফুলিয়ে দেন। ডিগ্রিধারী হওয়া সত্ত্বেও তারা দেশের ক্ষতির কারণ হন। অন্যদিকে ইতিহাস বলে, অনেক মহৎ স্থাপনা—যেমন তাজমহল—গড়ে উঠেছিল এমন মানুষের হাতে, যাদের আধুনিক অর্থে ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি ছিল না। তারা মেধা, সৃজনশীলতা ও নিষ্ঠার মাধ্যমে ইতিহাস সৃষ্টি করেছিলেন।
অতএব প্রশ্নটা ডিগ্রির নয়; প্রশ্নটা হচ্ছে নৈতিকতা, দায়বদ্ধতা ও দেশপ্রেমের। একজন মাঝারি মানের কিন্তু সৎ প্রকৌশলী দেশের জন্য অনেক বেশি মঙ্গলজনক, একজন উচ্চ ডিগ্রিধারী দুর্নীতিবাজ প্রকৌশলীর চেয়ে। প্রতিবছর হাজার হাজার বাংলাদেশি প্রকৌশলী ইউরোপ-আমেরিকায় পাড়ি দিচ্ছেন। বিদেশে কঠোর নিয়ম ও জবাবদিহির মধ্যেও তারা সফল হচ্ছেন, অথচ দেশে থাকলে দুর্নীতির জালে জড়িয়ে পড়তে হয় বা হতাশায় পেশা ছাড়তে হয়। এর ফলে বাংলাদেশে দক্ষ জনশক্তির সংকট তৈরি হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতি ও উন্নয়নের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে। এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য প্রথমত প্রকৌশলীদের জন্য লাইসেন্স ও নৈতিকতা কোড চালু করতে হবে। প্রকৌশলী হতে হলে শুধু ডিগ্রি নয়, পরীক্ষিত দক্ষতা ও নৈতিক মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হতে হবে। লাইসেন্স ছাড়া কেউ ‘প্রকৌশলী’ পরিচয় ব্যবহার করতে পারবে না।
দ্বিতীয়ত স্নাতক প্রকৌশলী ও ডিপ্লোমাধারীদের জন্য আলাদা কিন্তু মর্যাদাপূর্ণ ক্যারিয়ার পথ তৈরি করতে হবে। এতে রেষারেষি কমবে, কাজের দক্ষতা বাড়বে। তৃতীয়ত প্রশাসনিক ক্যাডার দিয়ে প্রকৌশল সংস্থা চালালে পেশাগত সমস্যা সমাধান হয় না, তাই প্রকৌশলীদের নেতৃত্বে আলাদা ক্যাডার গড়ে তুলতে হবে। চতুর্থত ডিপ্লোমাধারীদের জন্য উচ্চশিক্ষার সেতুবন্ধন তৈরি করতে হবে-কারিগরি বোর্ডের আওতায় সমমান সনদ ও ক্রেডিট ট্রান্সফারের সুযোগ দিলে দক্ষ ডিপ্লোমাধারীরা চাইলে দ্রুত স্নাতক হতে পারবেন।
অবশেষে সবার জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করতে হবে এবং দুর্নীতির দায়ে প্রকৌশলীদের লাইসেন্স বাতিলের ব্যবস্থা রাখতে হবে। বাংলাদেশে আজ প্রকৌশল খাত এক সড়কবাঁকে দাঁড়িয়ে। দ্বন্দ্ব, কোটা, দুর্নীতি আর মেধাপাচারের এই সংকট কাটাতে হলে আমাদের বুঝতে হবে-শুধু ডিগ্রি বা পদবী নয়, প্রকৌশলীর প্রকৃত পরিচয় হলো মেধা, সততা, দায়িত্বশীলতা ও দেশপ্রেম। যেদিন বাংলাদেশ প্রকৌশল পেশাকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে দাঁড় করাতে পারবে, সেদিনই আমাদের উন্নয়ন টেকসই হবে।
রহমান মৃধা
গবেষক ও লেখক
(সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন)
Rahman.Mridha@gmail.com
মত দ্বিমত
বাংলাদেশের নির্বাচন: এক অদৃশ্য গণতন্ত্রের গল্প

যেকোনো সময় নির্বাচনের দিন ঘোষণা হতে পারে, কিন্তু নির্বাচন বাস্তবে অনুষ্ঠিত হবে না। রাজধানীর রাস্তায় দিনভর মানুষ, যানবাহন আর সন্ত্রাসের আতঙ্ক যেন এক অদৃশ্য যুদ্ধের ময়দান তৈরি করেছে। যে দেশের রাষ্ট্রনীতি ভেজাল, দুর্নীতি ও স্বার্থপরতার মিশ্রণে ভরা, সেখানে প্রকৃত গণতন্ত্রের জন্ম অসম্ভব। রাজনৈতিক দলগুলো চাঁদাবাজি, ধান্দাবাজি এবং একে অপরকে নিপীড়নের ওপর দাঁড়িয়ে দৌড়ায়—এমন দেশে নির্বাচন সুষ্ঠু হবে বলে ধারণা রাখা অমূলক। দূরপরবাসী হলেও আমি নিয়মিত দেশের পরিস্থিতি খুঁটিয়ে যাচাই করছি, সংবাদ খুঁটিয়ে দেখছি, তাই বলতে বাধ্য হচ্ছি—এবারের নির্বাচন সঠিক সময়ে হচ্ছে না।
বর্তমান পরিস্থিতি স্পষ্ট করে দেখাচ্ছে, ড. ইউনূসকে দিয়ে হয়ত হুকুম চালানো হচ্ছে, পুলিশ বাহিনীকে দিয়ে দমন করা হচ্ছে এবং রাস্তায় চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সুযোগ সৃষ্টি করা হচ্ছে। স্কুলফেরত যুবক থেকে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা বেকার—সবাই যেন সেই অন্ধকারের নৃশংস খেলার অংশ। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অরাজকতা ও অস্থিরতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, আর নির্বাচনের পথ ক্রমশ বাধাগ্রস্ত হয়ে উঠছে।
ড. ইউনূস আশা করেছিলেন, নতুন প্রজন্ম শেখ হাসিনার সরকারের পতন ঘটিয়ে দেশের নেতৃত্ব নতুনভাবে গ্রহণ করতে পারবে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন—রাস্তায় নামা অধিকাংশ মানুষ ছিল টোকাই, যুবলীগ, যুবদল, শিবিরসহ দিনমজুরি; এরা জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলে, গুলির আঘাতের ভয় উপেক্ষা করে লড়েছে। স্বৈরাচার সরকারের পতনের পর দেশের নেতৃত্ব এলিট সম্প্রদায়ের হাতে চলে গেছে—এভাবেই মূল সিদ্ধান্তগ্রহণ চলছে। নতুন দল গঠনের স্বপ্নের কর্মীরা এখন সীমিত সংখ্যক, তাদের শক্তি ও প্রভাব আগের মতো নেই। অন্যদিকে, তারেক জিয়ার যুবদলের সদস্যসংখ্যা দ্বিগুণ, কারণ এখানে যুবলীগও যোগ দিয়েছে। বিদেশে বসে গডফাদার হিসেবে তারেক জিয়া চাঁদাবাজি চালাচ্ছেন, কোনো প্রতিকূলতা ছাড়াই, আর দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে তার প্রভাব অদৃশ্যভাবে বিরাজ করছে।
তারেক জিয়ার বিরুদ্ধে গ্রেনেড হামলার মামলা ছিল মূল অভিযোগ। যদি এটি সত্য হয়, তাহলে আরও স্পষ্ট—তিনি সন্ত্রাসীর সঙ্গে সম্পৃক্ততা বজায় রেখে বিদেশে অবস্থান করার সময়ও সেই প্রভাব ধরে রেখেছেন এবং প্রবাস থেকে দেশের রাজনৈতিক লড়াই নিয়ন্ত্রণ করছেন। ড. ইউনূস লন্ডনে তার সঙ্গে দেখা করেছেন এবং রাজনৈতিক কৌশল ও পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করেছেন। দেশে ফিরে, ড. ইউনূস একটি চাঞ্চল্যকর রাজনৈতিক রোডম্যাপ উপস্থাপন করেছেন। যদিও নির্বাচনের রোডম্যাপ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অরাজকতা সৃষ্টি হয়েছিল, নির্বাচনের সময় নির্ধারিত হওয়ার পরও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে মতপার্থক্য ও দ্বন্দ্ব দেখা দিয়েছে। সম্ভবত এটাই মূল উদ্দেশ্য—দেশে আপাতত নির্বাচন হওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার আভাস যখন ঘনীভূত হয়, তখন সবার দৃষ্টি চলে যায় সশস্ত্র বাহিনীর দিকে। তাদের মূল দায়িত্ব হলো দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা, আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং সন্ত্রাস দমন করা। কিন্তু বাস্তবতার চাপ ও রাজনৈতিক খেলার মধ্যে তাদের ভূমিকা হয়ে ওঠে অপেক্ষমাণ, আর নির্বাচনী প্রক্রিয়ার ওপর তাদের প্রভাবও অনিশ্চিত। তারা কি কেবল সীমান্ত রক্ষা করবে, নাকি দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতায় সক্রিয় হস্তক্ষেপ করবে—এই প্রশ্ন এখনও উন্মুক্ত, প্রতিটি মুহূর্তে পরিস্থিতি বদলে যেতে পারে।
অনেকে মনে করেন, ড. ইউনূস ইচ্ছাকৃতভাবে সময় নষ্ট করছেন। তিনি পুরনো জেনারেলদের অবসরের অপেক্ষা করছেন, যাতে নতুন নেতৃত্বের সঙ্গে সমন্বয় সহজ হয়। পাশাপাশি, তারেক জিয়ার গ্রেনেড হামলার মামলার গোপন তথ্য এবং রাজনৈতিক দরকষাকষির দিকে নজর রাখছেন। এভাবে, শর্তের ভিত্তিতে, তারেক জিয়ার রাজনৈতিক দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে সম্ভবত তাকে নিরাপদভাবে দেশে ফেরার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে।
এদিকে, দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতার সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছে যুবসমাজ। বেকারত্ব, শিক্ষার অভাব ও সামাজিক সুযোগের ঘাটতি অনেক যুবককে চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস এবং অপরাধের পথে ঠেলে দিচ্ছে। বিশেষ করে যুবলীগ, যুবদলসহ যারা দিনমুজুরি করে বা রাস্তায় ঘুরে সহিংস রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত, তারা শুধু রাজনৈতিকই নয়, সামাজিকভাবেও বিপর্যয় সৃষ্টি করছে। একদিকে স্কুলফেরত ছাত্র, অন্যদিকে রাস্তায় অস্ত্র হাতে—এই চরম দৃশ্য প্রতিদিন শহরকে আতঙ্কিত করছে, আর সাধারণ মানুষ যেন নিরস্ত্র অবস্থায় এই অরাজকতার সাক্ষী হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
নিষিদ্ধ বা হিংসাত্মক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, অপকর্মকে রাজনৈতিকভাবে উৎসাহিত করা, এবং যুবসমাজকে কেবল অপরাধী হিসেবে আখ্যায়িত করা—এই সমস্ত প্রথা অবশ্যই বর্জনীয়। এগুলো রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য ক্ষতিকর এবং গণতান্ত্রিক সংস্কারের পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়।
অন্যদিকে করণীয়গুলো স্পষ্ট। প্রথমে শিক্ষার ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি করতে হবে, যাতে যুবসমাজ জীবিকার সন্ধানে অপরাধে না জড়িয়ে পড়ে। নৈতিক ও নাগরিক শিক্ষা দিতে হবে, শৃঙ্খলা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও সামাজিক দায়বোধের সঙ্গে পরিচিত করতে হবে। রাজনৈতিক দলের স্বচ্ছতা ও নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা জরুরি—যুবরাজনীতিতে চাঁদাবাজি ও সহিংসতা সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ হতে হবে। সামাজিক পুনর্বাসন ও মেন্টরশিপের মাধ্যমে অপরাধে জড়িত যুবকদের পুনর্গঠন করা এবং তাদের ইতিবাচক দিকনির্দেশনা দেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি মানসিক ও সামাজিক সহায়তা প্রদান করতে হবে, যাতে যুবকরা মানসিক চাপ ও বিভ্রান্তি থেকে বের হয়ে সচেতন ও সৎ পথে চলতে পারে।
সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সশস্ত্র বাহিনী অপেক্ষমাণ, ড. ইউনূস সময়ক্ষেপণ করছেন, তারেক জিয়া আড়ালে গডফাদার হিসেবে সক্রিয়, যুবসমাজ বেকারত্ব ও অরাজকতায় আক্রান্ত, আর সাধারণ জনগণ অস্থিরতার বন্দি। বাংলাদেশের গণতন্ত্র এখনও ‘অদৃশ্য চুক্তি’ ও ‘গোপন আলোচনার’ ওপর নির্ভরশীল। রাষ্ট্র ভেজালে ভরা থাকলে নির্বাচন থেকে সংসদ পর্যন্ত খাঁটি গণতন্ত্রের জন্ম নেওয়া সম্ভব নয়।
ভবিষ্যতে গণতন্ত্রের পুনরুদ্ধার সম্ভব, তবে এর জন্য প্রয়োজন সশস্ত্র বাহিনীর নিরপেক্ষ ভূমিকা, নতুন নেতৃত্বের উত্থান যেখানে শিক্ষিত, নীতিনিষ্ঠ ও স্বার্থবিহীন প্রজন্ম দেশের নেতৃত্ব গ্রহণ করবে, আন্তর্জাতিক নজরদারি ও চাপের মাধ্যমে নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, রাজনৈতিক সংস্কারের উদ্যোগ গ্রহণ করে দলগুলোকে পুনর্গঠন ও স্বচ্ছতা ও দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করা এবং যুবসমাজকে পুনঃনির্দেশনা, শিক্ষা, কর্মসংস্থান, নৈতিক শিক্ষা ও সামাজিক সুযোগের মাধ্যমে অপরাধ ও সহিংসতা থেকে দূরে রাখা। এই শর্তগুলো পূরণ হলে তবেই বাংলাদেশে খাঁটি গণতান্ত্রিক নির্বাচন ও স্থিতিশীল সমাজ প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে; নাহলে নির্বাচন ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়া কেবল প্রতারণা ও অরাজকতার খেলা হয়ে থাকবে।
রহমান মৃধা, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন। Rahman.Mridha@gmail.com
মত দ্বিমত
চাঁদাবাজির লাইসেন্স: বাংলাদেশের রাজনীতির কালো খোলস

চাঁদাবাজি বাদ দিয়ে কাজ করুন, দেখবেন সংস্কার এমনিতেই হয়ে গেছে।
কেউ রাজনীতি করবে না বাংলাদেশে, যেদিন দেখবেন দুর্নীতি আর চাঁদাবাজি বন্ধ হয়ে গেছে। কিন্তু এই বন্ধ করার জন্য যে সংস্কার প্রয়োজন, সেটি হলো রাজনীতি অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করা—মানে লাইসেন্স বাতিল করা। লাইসেন্সটা কী জানেন? রাজনীতি। সব চাঁদাবাজিই কোনো না কোনো রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় জন্ম নেয়। তার মানে কি বুঝাতে পারলাম?
স্বপ্ন দেখছেন এবং আপনাকে স্বপ্ন দেখানো হচ্ছে—একজন দেশের বড় নেতা হবেন প্রধানমন্ত্রী। অথচ তিনি জীবনে কোনো কাজ করেননি! মানুষ হিসেবে তো আমাদের জন্ম হয়েছে কাজ করার জন্য। এখন যদি কাজ বলতে কেবল চাঁদাবাজির সংগঠন চালানো বোঝায়, তবে বন্ধ করে দেওয়া হোক সকল সৃজনশীল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, শিল্প প্রতিষ্ঠান এমনকি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাসহ দেশের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশ এগুলোর কিছুই ডিজার্ভ করে না।
আশ্চর্য লাগে, এআই প্রযুক্তির যুগেও বাংলাদেশে দিনদুপুরে চাঁদাবাজি হয়, আর প্রতিটি রাজনৈতিক লাইসেন্সধারী সংগঠন বিদ্যমান আইন অনুযায়ী চলতে থাকে—এর চেয়ে লজ্জার আর কী হতে পারে! এখন সবাই উঠে পড়ে লেগেছে পুরো দেশটিই যেন চাঁদাবাজদের নেত্রাধীন হয়ে যায়। আর সেই গুরুত্বপূর্ণ কাজটি সম্পন্ন করার দায়িত্ব যাকে দেওয়া হয়েছে, তিনি আর কেউ নন—তিনি হচ্ছেন নোবেল বিজয়ী প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস। ভাবতেই গা শিউরে ওঠে!
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—কোথায় থামবে এই দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির মহোৎসব? মানুষ কি সত্যিই রাজনীতি ছাড়া চলতে পারবে না? উত্তর হচ্ছে, পারবেই। শর্ত হচ্ছে, রাজনৈতিক লাইসেন্স বাতিল করে দেশের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে জনগণের সেবার জন্য খাঁটি পেশাগত নীতির ভিত্তিতে পুনর্গঠন করতে হবে। তখনই বোঝা যাবে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কীভাবে আলোকিত মানুষ গড়তে পারে, শিল্প প্রতিষ্ঠান কীভাবে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারে, এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কীভাবে সত্যিকারের ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে পারে।
আমরা ভুলে গেছি—রাষ্ট্র হলো মানুষের জন্য, মানুষের শ্রম ও মেধার বিকাশের জন্য। অথচ এখানে রাষ্ট্র যেন কেবল একদল লুটেরার সম্পত্তি। প্রতিটি রাস্তায়, প্রতিটি বাজারে, প্রতিটি প্রশাসনিক দপ্তরে দেখা যায় চাঁদাবাজির অশুভ ছায়া। যে ছায়ার কারণে এক কৃষক তার ফসলের দাম পায় না, এক শিক্ষক তার প্রাপ্য সম্মান পায় না, এক যুবক তার স্বপ্ন পূরণের সুযোগ পায় না।
তাহলে পথ কী? পথ একটাই—রাজনীতির নামে চাঁদাবাজির বাজার বন্ধ করতে হবে। রাষ্ট্রকে এমন এক নতুন সামাজিক চুক্তির পথে হাঁটতে হবে যেখানে নাগরিকের কাজই হবে রাজনীতি, কিন্তু সেটা হবে কর্ম ও সৃজনশীলতার রাজনীতি। যেখানে ভোট মানে দলবাজি নয়, বরং কাজের হিসাব। যেখানে নেতা মানে ক্ষমতার আসনে বসা ব্যক্তি নয়, বরং সেবার মানদণ্ডে দাঁড়ানো একজন প্রকৃত মানুষ।
যদি এই সংস্কার না হয়, তবে বাংলাদেশ কখনোই দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির কালো খোলস ভেদ করতে পারবে না। আমরা কেবল এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মের হাতে হস্তান্তর করব হতাশা, ব্যর্থতা আর অচল রাজনীতির অভিশাপ।
কিন্তু যদি হই আমরা দৃঢ়, যদি সত্যিই চাই পরিবর্তন—তাহলে নতুন প্রজন্মকেই নেতৃত্ব নিতে হবে। রাজনীতির লাইসেন্স বাতিল করে নাগরিক সমাজকে করতে হবে জবাবদিহির আসল শক্তি। তখনই চাঁদাবাজি থামবে, দুর্নীতি ভাঙবে, এবং বাংলাদেশ তার প্রকৃত সম্ভাবনায় উন্মোচিত হবে।
অন্যথায়, একদিন মানুষ বলবে— “বাংলাদেশ ছিল এক সম্ভাবনার দেশ, কিন্তু তার সম্ভাবনা শেষ করে দিয়েছে রাজনীতির নামে চাঁদাবাজির লাইসেন্স।”
রহমান মৃধা, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন। Rahman.Mridha@gmail.com
মত দ্বিমত
সামান্য কিছু বালু আমেরিকা থেকে আনতে দিলো না, অথচ…

সামারে সুইডেনে পাকিস্তানি আম পাওয়া যায়, খেতেও বেশ ভালো। ছোটবেলায় বাংলাদেশে গ্রামেই বেশি সময় কেটেছে। আম, জাম, লিচু, কাঠাল, খেজুরের রস—এসব ছিলো সেই বেহেস্তের খাবারের মতো, যাকে বলে অমৃত। তো বহু বছর দেশের বাইরে থাকতে থাকতে দই-এর সাধ ঘোলে মেটাতে হয় মাঝেমধ্যে। যার ফলে সামারে আমদুধ দিয়ে মুড়ি খাওয়ার সাধ জাগে। আম যেমনই হোক, তা মেলে, তবে সেই মুড়ি কোথায়? শেষে স্টকহোমের একটি বাংলাদেশি দোকান থেকে মুড়ি কিনলাম। ওমা! মুড়ি তেলে ভেজেছে, কেমন একটা বিশ্রী গন্ধ! মেজাজটাই খারাপ হয়ে গেল। দোকানে গিয়ে বিষয়টি বলতেই ভদ্রলোক বললেন, “বাংলাদেশ থেকে এগুলোই আসে।” আমি শুধু বললাম—ঘটনা কী? শাকসবজি, মাছ-ফলে ফরমালিন, মুড়িতে তেলের গন্ধ, মসলায় ইটের গুঁড়া—এসব সাত সমুদ্র তের নদী পার হয়ে কীভাবে এলো? ভদ্রলোক হেসে বললেন, “যেভাবে আমরা এসেছি ভাই।” আমার আর বলার কিছু ছিল না।
পরে বেশ কয়েক বছর কেটে গেছে। সম্ভবত ১৯৯৬ সালের দিকে ছুটিতে গিয়েছিলাম ক্যালিফোর্নিয়ার লস এঞ্জেলসে। সাগরের বালু এত পরিষ্কার এবং সাদা দেখে মনে পড়ে গেলো ছোটবেলার কথা। মাকে দেখেছি পরিষ্কার বালু গরম করে চাল দিয়ে মুড়ি ভাজতে। ভাবলাম, কিছু বালু সুইডেনে নিয়ে যাবো। যে ভাবনা, সেই কাজ। ব্যাগ ভরে কয়েক কেজি বালু নিয়ে লস এঞ্জেলস বিমানবন্দরে হাজির। চলছে চেকিং—নানা ধরনের প্রশ্ন: ব্যাগে কী আছে, কে প্যাক করেছে, অস্ত্রপাতি আছে কি না ইত্যাদি। ব্যাগের ওজন একটু বেশি হয়ে গেছে। কিছু ওজন কমাতে হবে অথবা অতিরিক্ত চার্জ দিতে হবে।
আমি ডেস্কে জিঙ্গেস করলাম, “কত?”
উত্তরে বলল, “২০০ ডলার।”
ভাবলাম, তাহলে কিছু বালু রেখে যাই। একটু সাইডে গিয়ে বালু ঢালছি আরেকটি পলিথিনের ব্যাগে। হঠাৎ পুলিশ এসে হাজির। তারা জিজ্ঞেস করল, “এটা কী? কোথা থেকে এলো?” আমি সব বললাম। পুলিশ তো হতবাক! বলল, “জীবনে অনেক কিছু চোরাচালান হতে দেখেছি, কিন্তু বালু চোরাচালান এই প্রথম। তবে কী নিয়মকানুন আছে, সেটা জানা নেই। তোমাকে অপেক্ষা করতে হবে, তদন্ত করতে হবে।”
আমি বললাম, “আরে ভাই, এটা খাঁটি বালি, কোনো ভেজাল নেই। আমি নিজে হাতে সাগর থেকে তুলেছি।”
পুলিশ বলল, “তবুও পরীক্ষা করতে হবে। অন্য কিছু এর সঙ্গে জড়িত আছে কিনা তা জানতে হবে। রাষ্ট্রের প্রাকৃতিক সম্পদ পাচার—এটা তদন্তের বিষয়।”
আমি তো হঠাৎ অবাক! ঘাম ছুটে গেল শরীরে। এ যেন মহাবিপদ! এদিকে প্লেন ছেড়ে দেবে, ফ্লাইট মিস হবে, সাথে বালু চোরের খেতাব, জেল-জরিমানা—আর কত কী! আমি আছি আমার রাজ্যে—কে কী বলবে, কী হবে না হবে এসব নিয়ে। এরমধ্যে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ এল। হঠাৎ কোনো যান্ত্রিক সমস্যার কারণে প্লেন এক ঘণ্টা দেরিতে ছাড়বে—এটাও কেউ এসে জানিয়ে গেল। একটু স্বস্তি পেলাম, কিন্তু আমার কী হবে সেটা নিয়ে ভাবছি।
কর্তৃপক্ষের সাথে বেশ কিছুক্ষণ কথা হলো। আমার পরিচয়সহ সব ঘটনা জানার পর বিষয়টি বুঝতে পেরে আমাকে ছেড়ে দিলো, তবে বালু রেখে দিল। শুধু বললো, রাষ্ট্রের সম্পদ এভাবে নেওয়া উচিত নয়। যদিও বালুর বিষয়ে প্লেনে ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য নির্দিষ্ট কোনো নির্দেশনা নেই, তবুও নিতে পারবে না। আমি মনে মনে ভাবলাম—তুই তোর বালু নে, আমার আর মুড়ি ভাজার শখ নেই। বালু রেখে চলে এলাম।
ঘটনাটি পরে সুইডেনে এসে আলোচনা করেছি, কিন্তু বিষয়টি নিয়ে আর ভাবিনি। যদিও সেদিন লস এঞ্জেলস বিমানবন্দরে আমার বারোটা বাজতে গিয়েছিল, ভাগ্যিস মানসিক চাপ, শ্বাসকষ্ট আর ঘাম ছাড়া অন্য কোনো বিপদ হয়নি। তবে আমদুধ দিয়ে মুড়ি খাওয়ার শখ সেদিন লস এঞ্জেলসের বিমানবন্দরে রেখে এসেছি।
ভেজাল খাবার এড়াতে এবং দেশি খাবারের টান মেটাতে আমি এখানে নিজের মতো কৃষিপণ্য উৎপাদন করি। তবে আম আর ধান এখনও উৎপাদন সম্ভব হয়নি। সময়-সুযোগ হলে চেষ্টা করবো, ইনশাআল্লাহ। আজ হঠাৎ বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সম্পদ—পাথর উত্তোলন আর সেগুলো রাতারাতি শেষ হয়ে যাওয়ার খবর পড়ে সেই দিনের ঘটনার কথা মনে পড়ে গেল। মনে হলো, বেচারা দেশবাসীর হয়তো ঘর-দুয়ার সাজানোর শখ হয়েছিল পাথর দিয়ে—যেমনটি আমার হয়েছিল বালু দিয়ে মুড়ি ভাজার। প্রকৃতির সম্পদ লুট করে যেমন দেশ ফাঁকা হয়, তেমনি ভেজাল খাবারে মানুষের মনও শূন্য হয়ে যায়।
রহমান মৃধা
গবেষক ও লেখক
সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন
Rahman.Mridha@gmail.com