সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা লোপাট ডেল্টা লাইফের!

ওয়ালিদ সাকিব প্রকাশ: ২০২১-১২-০৪ ১৬:০১:০৪, আপডেট: ২০২১-১২-১৩ ১১:১২:২৯

শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্সের স্থগিত হওয়া পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ মানিলন্ডারিংসহ অর্থ আত্মসাৎ ও দুর্নীতি, রাজস্ব ফাঁকি বা বকেয়া এবং অব্যবস্থাপনার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটির ৩ হাজার ৬৮৭ কোটি টাকার ক্ষতি করেছে। ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্সে নিযুক্ত অডিট ফার্ম একনবীনের দেওয়া প্রভিশনাল ইন্টেরিম রিপোর্ট পর্যালোচনা করে বিমা খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) এ তথ্য পেয়েছে। বুধবার (০১ ডিসেম্বর) এ সংক্রান্ত একটি চিঠি অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে পাঠিয়েছে আইডিআরএ। একইসঙ্গে আর্থিক ক্ষতির বিষয়ে ৭৪ পৃষ্ঠার ওই রিপোর্টও পাঠানো হয়েছে।

এ বিষয়ে শেয়ারবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) কমিশনার অধ্যাপক ড. শেখ শামসুদ্দিন আহমেদ অর্থসংবাদকে বলেন, ডেল্টা লাইফের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়টি খতিয়ে দেখতে দুইজন কনসালটেন্ট নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তাঁরা কোথায় কি অনিয়ম হয়েছে তা খুঁজে দেখবেন। অনিয়মের যে অভিযোগটি উঠেছে তা সঠিক হলে অবশ্যই অনিয়মকারীদের বিরুদ্ধে কমিশন ব্যবস্থা নিবে।

তিনি আরও বলেন, কমিশন ডকুমেন্ট হাতে পেলে স্থগিত হওয়া পর্ষদকে অফিসিয়ালি ডাকবে। যারা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের টাকা লোপাট করেছে তাদেরকে অবশ্যই অর্থ ফেরৎ দিতে হবে। আর প্রতিষ্ঠানটির নতুন বোর্ডে যারা আসবে তাদেরও বিষয়টি দেখতে হবে। সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অর্থ আত্মসাতের সুযোগ যেন প্রতিষ্ঠানটির স্থগিত পর্ষদ না পায় সেজন্যই তাদের ডাকা হবে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে পাঠানো চিঠিতে যা বলেছে আইডিআরএ

বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের পরিচালক (উপ-সচিব) মো. শাহ আলম স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে বলা হয়, ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্সে নিয়োগকৃত অডিট ফার্ম মেসার্স একনবীন কর্তৃক বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ বরাবর প্রভিশনাল ইন্টেরিম রিপোর্ট প্রেরণ করা হয়েছে। এতে প্রাথমিকভাবে উদঘাটিত ৩ হাজার ৬৮৭ কোটি টাকার অর্থ আত্মসাৎ ও দুর্নীতি, রাজস্ব ফাঁকি/বকেয়া এবং অব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কোম্পানিটির আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।

প্রতিবেদনে মানিলন্ডারিংয়ের মতো অপরাধ সংঘটিত হওয়ার বিষয়েও উল্লেখ করা হয় বলে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগকে জানিয়েছে বিমা খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএ।

এদিকে, গ্রাহকের স্বার্থ ক্ষুণ্ন করার কারণে চলতি বছরের ১১ ফেব্রুয়ারি ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্সের পরিচালনা পর্ষদ চার মাসের জন্য স্থগিত করে বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)। একইসঙ্গে কর্তৃপক্ষের সাবেক সদস্য সুলতান-উল-আবেদীন মোল্লাকে ওই বিমা কোম্পানিতে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এরপর ১০ জুন ডেল্টা লাইফের পরিচালনা পর্ষদ সাসপেন্ডের মেয়াদ বৃদ্ধি করে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত অব্যাহত রাখার আদেশ দেয় আইডিআরএ। নির্ধারিত উদ্দেশ্যগুলো পূরণ না হওয়ায় এ আদেশ জারি করা হয়।সর্বশেষ গত ১৩ অক্টোবর কর্তৃপক্ষের সাবেক সদস্য মো. কুদ্দুস খানকে ডেল্টা লাইফে প্রশাসকের দায়িত্ব দিয়েছে আইডিআরএ।

এর আগে, চলতি বছরের ৭ ফেব্রুয়ারি আইডিআরএ চেয়ারম্যান ড. এম মোশাররফ হোসেনের বিরুদ্ধে ঘুষ দাবি করার অভিযোগ করে সংবাদ সম্মেলন করে ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্সের তৎকালীন পরিচালনা পর্ষদ।

সংবাদ সম্মেলনে ডেল্টা লাইফের নির্বাহী পরিচালক চৌধুরী কামরুল আহসান বলেন, বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের বর্তমান চেয়ারম্যান যিনি এক সময় ডেল্টা লাইফের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ছিলেন। এ জন্য উদ্দেশ্যমূলকভাবে ডেল্টা লাইফের ২০১৯ সালের একচুয়ারিয়াল ভ্যালুয়েশনের বেসিস অনুমোদন দেয়া হয়নি। মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তার নবায়ন অনুমোদন না দিয়ে এবং কোম্পানিকে নানা অজুহাতে অন্যায়ভাবে জরিমানা আরোপের হুমকি দিচ্ছেন আইডিআরএ চেয়ারম্যান। এছাড়া কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ বহিষ্কার করে প্রশাসক নিয়োগেরও হুমকি দিচ্ছেন।

চাঁদা দাবির অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, বিভিন্ন বিষয় সমাধানের জন্য বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানের সঙ্গে আলোচনা করতে গেলে তিনি কোম্পানির কাছে প্রথমে ২ কোটি, পরে ১ কোটি ও সর্বশেষ ৫০ লাখ টাকা উৎকোচ দাবি করেন। এ সংক্রান্ত অডিও ক্লিপ ও ট্রান্সক্রিপটি দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অভিযোগ আকারে দাখিল করা হয়েছে। পরে এ বিষয়ে হাইকোর্ট বিভাগ অধিকতর তদন্ত করার আদেশ দেন। ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্সের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা আদিবা রহমান ওই সংবাদ সম্মেলনে বলেন, আইডিআরএ’র চেয়ারম্যান আমাদের কাছে ঘুষ চেয়েছিলেন। আমরা সেই ঘুষ না দেয়ায় তিনি ক্ষুব্ধ হয়েছেন।

ড. এম মোশাররফ হোসেনের বিরুদ্ধে অভিযোগ করার চার দিনের মাথায় ডেল্টা লাইফ ইনস্যুরেন্স লিমিটেডের তৎকালীন পরিচালনা পর্ষদ স্থগিত করে আইডিআরএ। একই সঙ্গে বিমা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সাবেক সদস্য সুলতান-উল-আবেদীন মোল্লাকে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। পরবর্তীতে ১৩ অক্টোবর কর্তৃপক্ষের সাবেক সদস্য মো. কুদ্দুস খানকে এ দায়িত্ব দেওয়া হয়।

এদিকে, ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্স শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয় ১৯৯৫ সালে। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের দেয়া তথ্য অনুযায়ী চলতি বছরের অক্টোবর পর্যন্ত কোম্পানিটিতে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ৪৪ দশমিক ২৫ শতাংশ শেয়ার রয়েছে। তবে সর্বশেষ দুই অর্থবছরে (২০৯, ২০২০) সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কোন লভ্যাংশ দেয়নি ডেল্টা লাইফ।

১৯৯৫ সালে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হলেও সর্বপ্রথম নগদ লভ্যাংশ দেয় ২০১৫ সালে। ওই বছর বিনিয়োগকারীদের ১৮ শতাংশ লভ্যাংশ দেয় প্রতিষ্ঠানটি। পরবর্তীতে ২০১৬ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত তিন বছর যথাক্রমে ২০, ২৫ ও ২৬ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দেয়।

যেদিন ডেল্টা লাইফের পরিচালনা পর্ষদ স্থগিত করে নতুন প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয় সেদিন (১১ ফেব্রুয়ারি) ডেল্টা লাইফের শেয়ারদর ছিল ৭৩ টাকা ৯০ পয়সায়। আর সর্বশেষ কর্মদিবসে (০২ ডিসেম্বর) ২১৫ টাকা ১০ পয়সায় শেয়ারটি লেনদেন হয়। অর্থাৎ প্রায় ১০ মাসে ডেল্টা লাইফের শেয়ারদর বেড়েছে ১৪১ টাকা ২০ পয়সা।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আমরা সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।