শিক্ষার সাথে কর্পোরেট যোগসূত্র না থাকায় দক্ষ জনশক্তি কম

ডেস্ক রিপোর্টার প্রকাশ: ২০১৯-১২-২৩ ০২:৩৩:৩৩, আপডেট: ২০২০-০২-১২ ১১:৫৬:২০

আমাদের দেশের সম্ভাবনা যতটা রয়েছে, ঠিক সমস্যাও কম নয়। বর্তমান সময়ে দেশের অর্থনীতি বড় হলেও তুলনামূলকভাবে তেমন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না। আমাদের কর্মক্ষম তরুণদের সংখ্যা যেমন বেশি, তেমনি অদক্ষ জনশক্তিরও সংখ্যা কম নয়। দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে কর্মক্ষেত্রের যোগসূত্র না থাকাও তার জন্য দায়ী বলে অনেকেই মনে করেন।

কর্পোরেট জগত এবং শিক্ষা ব্যবস্থার নানা সমস্যা ও সম্ভাবনার বিষয় নিয়ে অর্থসংবাদ– এর সাথে খোলামেলা আলোচনা করেছেন রহিম আফরোজ গ্রুপের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (গ্রুপ সিএফও) মোহাম্মদ জাহিদ হোসাইন। তিনি একই সাথে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালইয়ে খন্ডকালীন শিক্ষকতায়ও নিয়োজিত রয়েছেন। এছাড়াও তিনি বাপেক্স বোর্ডের একজন পরিচালক ও কর্পোরেট ট্রেইনার। অর্থসংবাদ পাঠকদের জন্য আলোচনার চুম্বক অংশ তুলে ধরা হলো-

অর্থসংবাদ: নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছেনা, দক্ষ জনশক্তিরও অভাব বলে অনেকেই বলে থাকেন, আপনার মূল্যায়ন কি এ বিষয়ে ?
মোহাম্মদ জাহিদ হোসাইন: বর্তমানে জব ক্রিয়েট করা আমাদের অর্থনীতির জন্য একটা বড় ইশ্যূ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারন অর্থনীতি বড় হচ্ছে, ইন্ডাস্ট্রি বড় হচ্ছে তাই এখানে প্রচুর কর্মক্ষম লোকের প্রয়োজন হচ্ছে। কিন্তু দুঃখজনক ব্যাপার হচ্ছে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে কর্পোরেট জগতের যে ডিমান্ড তার যোগসূত্র নেই। কারন আমরা মনে করি, এসএস.সি এবং এইচ.এস.সি লেভেল জিপিএ-৫ আর পোস্ট গ্রাজুয়েশনের ক্ষেত্রে বিবিএ, এমবিএ তে ভালো রেজাল্ট করলেই হবে। কিন্তু কর্পোরেট লেভেলে কতখানি এর প্রয়োজন আছে সেগুলো নিয়ে আমাদের মাথা ব্যথা নেই। এজন্য দেখা যায়, নিয়োগ করার পরেও তাকে ট্রেনিংয়ের মধ্যে দিয়ে নিয়ে যেতে হয় ফলে তার কাজে দক্ষতা অর্জনে প্রায় দু’বছর সময় লেগে য়ায়। এতে কিন্তু ওই প্রতিষ্ঠানটা যেমন ক্ষতিগ্রস্থ হয়, ঠিক ওই কর্মচারীরও ক্যারিয়ার গ্রোথটা কমে যায়। তখন তার চাকরির প্রতি আগ্রহ কমে যায়। এসময় এক জব থেকে আর এক জবে চলে যাওয়ার চেষ্টা করে। এজন্য আমি মনে করি, প্রত্যেকটা শিক্ষার্থীকে তার ক্যারিয়ার প্লান করা উচিত। ইউনিভার্সিটিগুলোর কারিকুলাম এমনভাবে সেট করতে হবে যেন কর্পোরেট জগতের লোকবলের যে চাহিদা থাকে সেটার সাথে তার একটা যোগসূত্র থাকে।

যেমন- আমি সিআইএমএ বা সিএ- এর কথা যদি বলি, প্রতি বছর তাদের কারিকুলাম পরিবর্তন হচ্ছে বিশ্বের চাহিদা ও সময় উপযোগীভাবে। যেমন- এখন আমাদের কিন্তু কারিকুলামগুলো টেকনোলোজি বেইজড এবং আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্ট এর সাথে কানেক্টড হওয়া উচিৎ। বিশ্বে এখন পরীক্ষা হচ্ছে কম্পিউটারে আর আমাদের হচ্ছে পেন এন্ড পেপারে। যুগ উপযোগী শিক্ষা ব্যবস্থা আমাদের দেশে নেই। সুতরাং এ অবস্থা চলতে থাকলে জব মার্কেট আমাদের তৈরি হবে না। আর যে জব মার্কেট ক্রিয়েট হবে সেখানে ছেলেমেয়েরা আন্ডার এমপ্লোয়েড থেকে যাবে। যে যেই জবের জন্য যোগ্য তাকে সে সেই জব দেওয়া যাবে না।

অর্থসংবাদ: বাস্তবতার সাথে শিক্ষা ব্যবস্থার মিল নেই, এরকম হচ্ছে কেন ?
জাহিদ হোসাইন: আমি বলবো সরকার এটা নিয়ে কোন উদ্যোগ নেয়নি। এটার উদ্যেগে সরকারের নেওয়া লাগবে এবং বিভিন্ন ইনস্টিটিউট যেগুলো আছে, যারা উচ্চ শিক্ষা দিচ্ছে, যেমন- ইউনির্ভাসিটি গুলোকে সত্যিকার অর্থে দেয় জনশক্তি তৈরীর মানসিকতা থাকতে হবে। সে চেষ্টাও তাদের নাই এবং ছাত্ররাও কিন্তু এখন কর্মমুখী পড়াশোনা করছে না। তারাও এখন সার্টিফিকেট নেওয়ার জন্য আসে। তারা শিক্ষাজীবন শেষ করে কিছু একটা শিখবে যেটা দিয়ে তারা তাদের উদ্যোক্তা বা শ্রমজীবী হিসাবে গড়ে তুলবে। আমি মনে করি, তারা যেন কর্মমুখী কিছু শিখে সম্মানজনকভাবে কর্মজীবনে যেতে পারে ওই চেষ্টাটা শিক্ষকদের ও ছাত্রদের মধ্যে ঘাটতি আছে। এরজন্য উভয়ের-ই সমস্যা রয়েছে।

অর্থসংবাদ: আপনি কর্পোরেট জগতের পাশাপাশি শিক্ষক হিসেবে শিক্ষার্থীদের মাঝে কি ঘাটতি দেখেন এবং কর্পোরেট জগতে সেই ব্যপারটা কেমন দেখেন ?
জাহিদ হোসাইন: আমি বিভিন্ন সময় দেখতাম! শিক্ষার্থীরা যা শিখে আসে তা ১০ পারসেন্টও কর্পোরেট-এ আমাদের কাজে লাগেনা। যার কারণে ইউনিভার্সিটিতে স্বল্প পরিসরে হলেও শিক্ষার্থীদের বলি, আসলে তোমাদের কাছ থেকে আমরা কর্পোরেটে কি আশা করি? অথবা তোমরা যদি উদ্যোক্তা হও তখন ব্যবসা পরিচালনার জন্য আসলে কি শেখা উচিৎ? যেমন- পুরো ফিন্যান্সিয়াল স্টেটমেন্ট এটা কতটুকু কর্পোরেট জগতে কাজে লাগবে। ওই উদ্দেশ্যটা সামনে দেখে আমি বিশ্ববিদ্যালয় পড়ানো শুরু করি। পড়ানোর ক্ষেত্রে আমি দেখলাম যে, আসলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে মূলতঃ কয়েকটা উদ্দেশ্য থাকে। যেমন, তারা এনরোল করবে, ক্লাস করবে, কোন রকম একটা পরীক্ষা দিয়ে সার্টিফিকেট নিয়ে বের হয়ে আসবে। এর মাঝখানে শেখার যে একটা প্রক্রিয়া আছে এ প্রক্রিয়াটা সম্পূর্ণরুপে অনুপস্থিত এবং অনেক ইউনিভার্সিটিরও একটা উদ্দেশ্য থাকে যে তাকে একটা সার্টিফিকেট দেওয়া। মূলতঃ শিক্ষার যে অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য সে উদ্দেশ্যটার দিকে সকল পক্ষকে আরো মনযোগী হতে হবে।

অর্থসংবাদ: আপনি কর্পোরেট জগতে কাউকে নিয়োগ দিতে একজন প্রার্থীর কোন দিকটা বেশি মূল্যায়ন করেন?
জাহিদ হোসাইন: মূলতঃ ২টা জিনিসকেই আমি গুরুত্ব দেই। সার্টিফিকেট আর একটা হলো আমরা ইতিবাচক কিছু প্রক্রিয়া দিয়ে বোঝার চেষ্টা করি চ্যালেঞ্জ নেওয়ার মতো তার কতটুকু ইচ্ছা আছে। তার ইতিবাচক মাইন্ডসেটটা কি আছে? একটি আইডিয়া সে কিভাবে প্লান করছে? আগামী ৫ বছর পর তার নিজেকে সে কোথায় দেখতে চায়? আমরা পছন্দ করি এমন একজন প্রার্থিকে যার একটা মানসিকতা থাকবে, সে কোথায় যেতে চায় এরকম তার একটা টার্গেট থাকতে হবে। পাশাপাশি তা অর্জন করার জন্য যেসব চ্যালেঞ্জ নিতে হয় ওই চ্যালেঞ্জগুলো নেওয়ার জন্য তার কিন্তু মানসিক প্রস্ততি থাকতে হবে। প্রত্যেকটা মানুষকে প্রত্যেক মুহূর্তে তার কম্পিটেন্সি প্রমাণ করতে হবে। এগুলো যার মধ্যে থাকে তাদেরকেই সাধারনত নিয়োগের জন্য বাছাই করা হয়।

অর্থসংবাদ: একজন মানুষ সফল হতে হলে কোন দিকে ফোকাস থাকা জরুরি?
জাহিদ হোসাইন: সে কোনটি করতে চায় আর কোনটি করতে ভালোবাসে। কেউ যদি কোন কিছু করতে ভালোবাসে তাহলে সেটাই করা উচিত। অন্যকিছু তার করার দরকার নেই। আর যেটা করবে সেটার দিকে ফোকাস রাখতে হবে। সফল হতে হলে যেই কাজটা করতে ভালোবাসে তাকে সেটাই আন্তরিকতার সাথে করা উচিৎ।

আমরা সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।