করোনা আতঙ্কে আস্থায় ফেরাতে হবে পুরো জাতিকে 

প্রকাশ: ২০২০-০৩-২১ ০০:২০:৪০

করোনা সতর্কতায় আমরা যে ভুলটি করছি, সেই ভুল ইতালি, ফ্রান্স, স্পেন, ইরান করেছিল। তার মাশুলও দিচ্ছে তারা। আজকে স্পেনিশ সরকার বলছে, খোদ মাদ্রিদেই ৮০% মানুষ করোনা আক্রান্তের শঙ্কায় রয়েছে। কতটা ভয়ঙ্কর! আর চীনের পাশাপাশি যে ক’টি দেশ সময়োপযোগী এবং কার্যকর পদক্ষেপ নিয়েছিল তার মধ্যে ভুটান, সিঙ্গাপুর, হংকং, তাইওয়ান, ভিয়েতনাম, দক্ষিণ কোরিয়া অন্যতম। এসব দেশে ভাইরাস সংক্রমন নিম্নগামী।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম এনডিটিভির একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, করোনা ছড়ায় চার ধাপে। প্রথম ধাপে আক্রান্ত দেশ থেকে আরেকটি দেশে ভাইরাস বহনকারী প্রবেশের মাধ্যমে। দ্বিতীয় ধাপে সংক্রমিত ব্যক্তির মাধ্যমে পরিবার এবং নিকটাত্মীয়দের মধ্যে ভাইরাস সংক্রমণ। তৃতীয় ধাপে প্রথম আক্রান্ত ব্যক্তি এবং অন্যান্য আক্রান্তদের মাধ্যমে লোকালয়ে ছড়িয়ে যাওয়া। যে পর্যায়ে এখন ইতালি ও স্পেন। চতুর্থ ধাপ ভয়াবহ। পুরো দেশই তখন আক্রান্ত হয়ে পড়ে। যেটি হয়েছিল চীনের উহান প্রদেশ। যার ফলে চীন সরকার উহানকে লকডাউনই করেনি, উহানের নাগরিকদের বাসা থেকে যেন নামতে না পারে সে জন্য ভবনগুলোর লিফট পর্যন্ত বন্ধ করে দিয়েছিল। কেউ করোনাভাইরাস বহন করে লুকিয়ে রাখলে মৃত্যুদণ্ডের ঘোষণাও দিয়েছিল সরকার। চীনের সব ধরণের আধুনিক সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তাদের কঠোর পদক্ষেপ নিতে হয়েছিল, এতে সুফলও পেয়েছে তারা। গতকালের খবর হচ্ছে খোদ উহানে একজনও সংক্রমিত হয়নি। খবরটি নিঃসন্দেহে আনন্দের।

কিন্তু বিশ্বব্যাপী আতঙ্ক কাটছে না। দেশে দেশে জরুরি অবস্থা, লকডাউন, কারফিউ জারির মাধ্যমে প্রায় স্থবির, নিস্তব্ধতায় নিমগ্ন গোটা পৃথিবী। অপেক্ষাকৃত দূর্বল অর্থনীতির দেশগুলো রয়েছে ঝুঁকির মুখে। দক্ষিণ এশিয়ার ভারত পাকিস্তান শ্রীলঙ্কা এবং বাংলাদেশে যদি করোনার বিস্তার তৃতীয় ধাপে এসে পড়ে। তাহলে সেটা হবে ভয়াবহ। কতটা প্রস্তুত দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো? ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ভাষণে সেটার কিছুটা আভাস পাওয়া গেছে, তিনি জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া ভাষণে বলেন, “করোনা আতঙ্কের মুখোমুখি হয়েছে ১৩০কোটি ভারতীয়। প্রত্যেক ভারতীয় পূর্বসতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের চেষ্টা করছেন। কিন্তু গত কয়েকদিনে এটা মনে হয়েছে যে, আমরা এই সঙ্কটে আক্রান্ত হয়েছি। মহামারিতে আমরা এখনও নিরাপদ আছি; এমন চিন্তা-ভাবনা করাটা ভুল। আমাদের প্রত্যেক ভারতীয়র সতর্ক হওয়া উচিত।” করোনার বিস্তার ঠেকাতে নরেন্দ্র মোদি ভারতবাসির কাছে অনেকটা মিনতির সুরে বলেছেন, ‘আমি যখনই আপনাদের কাছ থেকে কিছু চেয়েছি, তখন আপনারা কখনই আমাকে হতাশ করেননি। আজ আমি আপনাদের কাছে কিছু চাইতে এসেছি। আমি আপনাদের কাছ থেকে কয়েক সপ্তাহ চাই। আমি আপনাদের সামনের দিনগুলো চাই। বৈশ্বিকভাবে করোনার কোনও নিরাময় নেই। এখন পর্যন্ত কোনও ভ্যাকসিন আবিষ্কার হয়নি। করোনা যেসব দেশে ভয়াবহ প্রভাব ফেলেছে; সেখানে তাৎক্ষণিকভাবে নয়, বরং প্রথম কয়েকদিন পর এর বিস্ফোরণ ঘটেছে।’
ভারতের প্রধানমন্ত্রী বলেন, করোনার ক্রমবর্ধমান চ্যালেঞ্জ সাধারণ কোনও বিষয় নয়। ভারতে এর কোনও প্রভাব পড়বে না; এমন ধারণা ঠিক নয়। দুটি বিষয় অনুস্মরণ করা দরকার: সজাগ এবং সতর্ক।”

করোনার বিস্তার ঠেকাতে ভারত আগামী রবিবার থেকে ‘জনতা কারফিউ’ জারি করেছে। দিল্লীর কেজরিওয়াল সরকার ২০ জনের সমাগমকে নিষিদ্ধ করেছেন। শ্রীলঙ্কায় ১৪ ঘণ্টার কারফিউ চলছে আজ সন্ধ্যা থেকে।

করোনা বিস্তারের দ্বিতীয় ধাপে যে পদক্ষেপ নেয়া দরকার সে পদক্ষেপগুলো নেয়া হচ্ছে না দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর। যার খেসারত কতটা ভয়াবহ হবে, সেটি সামনের দিনগুলোতে বোঝা যাবে।

বর্তমান সময়কে বাংলাদেশে করোনাভাইরাস বিস্তারের দ্বিতীয় ধাপ যদি ধরা হয়, তাহলে নিশ্চিত করেই বলা যায় আমাদের প্রস্তুতিতে অনেক ঘাটতি রয়েছে। সরকার বলছে, প্রস্তুত। কিভাবে প্রস্তুত? কোন কোন পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে, তার কোন রোডম্যাপ দেখা যাচ্ছে না। সরকারের পক্ষে একেকজন একেক পদক্ষেপের কথা বলছেন। আইইডিসিআরের মতে, আজ পর্যন্ত ২০ করোনা আক্রান্ত রোগীর তথ্য দিচ্ছেন তারা। মৃত্যু হয়েছে ১ জনের এবং ২ জন সুস্থ হয়ে ঘরে ফিরে গেছেন। একজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। এসব তথ্যে নাগরিকদের মধ্যে আতঙ্ক কমছে না। তথ্য যদি সঠিক হয় তাহলে সেটা অবশ্যই স্বস্তির। কিন্তু পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে করোনাভাইরাসে আক্রান্তরা বিদেশফেরত অথবা তাদের আত্মীয় স্বজন। তাহলে গত তিন সপ্তাহে কতজন প্রবাসী দেশে এসেছে, তাদের অবস্থান কি? তারা কি করোনাভাইরাস বহন করছিল কিনা? যদি করে থাকে তাহলে তাদের মাধ্যমে আত্মীয়স্বজনরা সংক্রমিত হয়নি? এতদিনে প্রথম আক্রান্ত ব্যক্তি এবং সংক্রমিত আত্মীয়-স্বজনরা ভাইরাসটি লোকালয়ে ছড়িয়ে দেয়নি তো? প্রশ্ন অনেক, উত্তর দেবে কে?

করোনাভাইরাস বিস্তারের দ্বিতীয় ধাপে যদি বাংলাদেশ পৌঁছে যায়, তখন স্বাস্থ্যকর্মীদের সুরক্ষা সরঞ্জামের কি হবে? হাসপাতাল? হাসপাতালে আইসিইউ? জরুরি এ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস? সর্বোপরি এমন পরিস্থিতি সৃষ্টির আগে যদি বিদেশফেরতদের লকডা্উন করার এ্যাকশনে গেলে সে পরিমান জনবল প্রস্তুত আছে কিনা? এমনিতে আতঙ্কে সারাদেশ ঘোষণা ছাড়াই লকডাউনের পথে। এমন পরিস্থিতিতে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ছে হু হু করে। নিত্যপণ্যের দামবৃদ্ধির লাগাম টেনে ধরাও বড় চ্যালেঞ্জ।

করোনাভাইরাস রোধে যা কিছু করার দু’একদিনের মধ্যে করা জরুরি। এ মুহূর্তে পুরো জাতিকে আতঙ্কমুক্ত এবং আস্থায় আনা সবচেয়ে জরুরি। যে কাজটি করতে পারেন একমাত্র প্রধানমন্ত্রী।

শরীফ নিজাম
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, অর্থসংবাদ

আমরা সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।