আব্দুস সালাম যখন ১৯৭৯ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার অর্জন করেন, তখন বিশ্ব নতুন করে উপলব্ধি করে যে দক্ষিণ এশিয়াও উচ্চতর বৈজ্ঞানিক চিন্তা ও গবেষণার ক্ষেত্রে পিছিয়ে নেই। কিন্তু তারও আগে, ১৯৬০ দশকের শুরুতেই তৎকালীন পাকিস্তান সরকার পারমাণবিক শক্তিকে শান্তিপূর্ণ কাজে ব্যবহারের সম্ভাবনা নিয়ে পরিকল্পনা করেছিল। সেই ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবেই ১৯৬১ সালে পাবনার রূপপুরে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের প্রাথমিক উদ্যোগ নেওয়া হয়। অর্থাৎ এটি হঠাৎ কোনো সিদ্ধান্ত নয়, বরং দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা, গবেষণা এবং রাষ্ট্রীয় ভাবনার একটি বাস্তব প্রতিফলন।
এই প্রসঙ্গে আরেকটি সত্য সামনে আনা জরুরি। আমরা অকৃতজ্ঞ জাতি হিসেবে পরিচিত হতে চাই না। কেউ যদি ভালো কিছু করে, সেটার প্রাপ্য স্বীকৃতি তাকে দিতে হবে, এটাই সভ্যতার নিয়ম। প্রশংসা করার অভ্যাস যেমন গড়ে তুলতে হয়, তেমনি মিথ্যাচার, পরচর্চা এবং ভিত্তিহীন সমালোচনা থেকে বেরিয়ে আসাও জরুরি। একটি দেশের অগ্রগতির জন্য শুধু অবকাঠামো নয়, মানসিকতার পরিবর্তনও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সত্যকে গ্রহণ করা, প্রাপ্যকে স্বীকার করা এবং অন্যায়ের সমালোচনা করা, এই ভারসাম্যই একটি সুস্থ সমাজ গড়ে তোলে। ইসলাম আমাদের এই শিক্ষা দেয়, সত্যকে প্রতিষ্ঠা করতে এবং ন্যায়কে সমর্থন করতে। তাহলে প্রশ্ন থেকেই যায়, আমরা কেন অনেক সময় সেই পথ থেকে সরে যাই?
বাংলাদেশে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ধারণা নতুন নয়। ১৯৬১ সালেই, তখনকার পূর্ব পাকিস্তান সময়, রূপপুর এলাকায় একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের প্রাথমিক উদ্যোগ নেওয়া হয়। জায়গা নির্ধারণও তখনই করা হয়েছিল। কিন্তু রাজনৈতিক পরিবর্তন, ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধ, অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতার অভাবে প্রকল্পটি দীর্ঘ সময় থেমে থাকে।
স্বাধীনতার পরও বিষয়টি পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। বিভিন্ন সময়ে আলোচনা হয়েছে, সম্ভাব্যতা যাচাই হয়েছে, কিন্তু বাস্তবায়নের পথে দৃশ্যমান অগ্রগতি আসে অনেক পরে। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সময়কালে সরকার আবার নতুনভাবে এই প্রকল্পকে গুরুত্ব দেয়। ১৯৯৮ সালে নীতিগতভাবে প্রকল্প বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কিন্তু তখনও অর্থায়ন, প্রযুক্তি এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্বের অভাবে কাজ এগোয়নি।
২০০৯ সালের পর থেকে প্রকল্পটি নতুন গতি পায়। বাংলাদেশ সরকার রাশিয়ার সঙ্গে পারমাণবিক সহযোগিতার বিষয়ে আলোচনা শুরু করে। ২০১০ এবং ২০১১ সালে দুই দেশের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির মাধ্যমে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক সংস্থা রোসাটম প্রকল্পটির প্রধান প্রযুক্তিগত অংশীদার হিসেবে যুক্ত হয়।
এরপর ২০১৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর মূল নির্মাণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির মাধ্যমেই প্রকল্পটি কাগজ থেকে বাস্তবের দিকে এগিয়ে যায়। ২০১৭ সালের ৩০ নভেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে নির্মাণ কাজ শুরু হয়, যখন প্রথম কংক্রিট ঢালার মাধ্যমে রিঅ্যাক্টর ইউনিটের কাজ উদ্বোধন করা হয়। এই ধাপটি আন্তর্জাতিকভাবে একটি বড় মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রকল্পে দুটি ইউনিট রয়েছে, প্রতিটির উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ১২০০ মেগাওয়াট। এখানে ব্যবহৃত হচ্ছে আধুনিক VVER 1200 প্রযুক্তির রিঅ্যাক্টর, যা নিরাপত্তা ব্যবস্থার দিক থেকে অত্যাধুনিক হিসেবে বিবেচিত। একাধিক সুরক্ষা স্তর, স্বয়ংক্রিয় কুলিং সিস্টেম এবং জরুরি পরিস্থিতিতে নিজে নিজে বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো ব্যবস্থা এতে অন্তর্ভুক্ত।
২০২১ এবং ২০২২ সালে রিঅ্যাক্টরের গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি স্থাপন শুরু হয়। ধাপে ধাপে রিঅ্যাক্টর ভেসেল, স্টিম জেনারেটরসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ উপাদান বসানো হয়। এরপর ২০২৩ সালের ৫ অক্টোবর একটি গুরুত্বপূর্ণ আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনী ধাপ সম্পন্ন হয়, যাকে বলা হয় কমিশনিং পর্যায়ের সূচনা। অর্থাৎ প্রকল্পটি চালুর দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
চালু হয়েছে কথাটির আসল অর্থ বোঝার জন্য ২০২৬ সালের ঘটনাটি জানা জরুরি। ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে রিঅ্যাক্টরে ইউরেনিয়াম জ্বালানি ঢোকানো বা ফুয়েল লোডিং শুরু হয়। এই ধাপটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এর মাধ্যমেই পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরু করার প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া কাজ করে, যাকে বলা হয় নিউক্লিয়ার ফিশন। ইউরেনিয়ামের পরমাণু ভেঙে বিপুল পরিমাণ তাপ উৎপন্ন হয়। এই তাপ দিয়ে পানি বাষ্পে রূপান্তরিত হয়, বাষ্প টারবাইন ঘোরায়, আর টারবাইন ঘুরে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। অর্থাৎ এখানে কোনো কয়লা বা তেল পোড়ানো হয় না, তাই ধোঁয়া দেখা যায় না।
এখন প্রশ্ন হলো, এটি কি পুরোপুরি চালু হয়ে গেছে?
সোজা উত্তর হলো, না, এখনও পুরোপুরি বাণিজ্যিকভাবে চালু হয়নি। এখন চলছে পরীক্ষামূলক চালনা, নিরাপত্তা যাচাই এবং ধাপে ধাপে ক্ষমতা বাড়ানোর প্রক্রিয়া। সাধারণত এই ধাপ শেষ হতে কিছুটা সময় লাগে। পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২৬ থেকে ২০২৭ সালের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হওয়ার কথা।
এই প্রকল্প শুধু একটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র নয়, এটি বাংলাদেশের জন্য একটি বড় প্রযুক্তিগত ও কৌশলগত পদক্ষেপ। এটি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা বাড়াবে, কার্বন নির্গমন কমাতে সাহায্য করবে এবং উচ্চপ্রযুক্তি খাতে নতুন দক্ষতা তৈরি করবে।
ধোঁয়া না দেখা নিয়ে যে প্রশ্ন ওঠে, সেটাই আসলে এই প্রযুক্তির স্বাভাবিক চিত্র। এখানে আগুন নেই, ধোঁয়া নেই, কিন্তু ভেতরে চলছে অত্যন্ত শক্তিশালী ও নিয়ন্ত্রিত এক প্রক্রিয়া, যা থেকে তৈরি হবে দেশের জন্য বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ।
সবকিছু মিলিয়ে, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র একটি দীর্ঘ প্রতীক্ষার বাস্তব রূপ, যেখানে ১৯৬১ সালের একটি ধারণা আজ আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে বাস্তবতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
সবকিছুর শেষে রূপপুর শুধু একটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র নয়, এটি বাংলাদেশের দীর্ঘ ইতিহাস, প্রতীক্ষা এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতার এক বাস্তব ঘোষণাপত্র, যেখানে ১৯৬১ সালের একটি ধারণা আজ একটি জাতির ভবিষ্যৎ শক্তির ভিত্তি হয়ে উঠছে।
রহমান মৃধা, গবেষক ও লেখক, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন।