চাল নেই, ডাল নেই, মাছ নেই—কিছুই নেই। সব পাকিস্তানিরা লুটে নিয়ে গেছে, রেখে গেছে শুধু চোরদের। ওরা যদি চোরগুলোও নিয়ে যেত! সেই একই মধুর বাঁশি বেজে চলেছে বছরের পর বছর, তবে কিছুটা ভিন্নভাবে। আওয়ামী লীগ সব পাচার করেছে। পরে বিএনপির হাওয়া ভবন সব নিয়ে বেগমপাড়া তৈরি করেছে। তারপর জাতীয় পার্টি দেশটাকে ফাঁকা করেছে, পরে আবার বিএনপি সব শেষ করেছে।
গত ১৬ বছর গণভবনে বসে স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থার মাধ্যমে দেশে গুম, খুন, নির্যাতন ও দুর্নীতি সংঘটিত হয়েছে। নতুন করে আবারও সেই মেহনতি মানুষের এক সাগর রক্তের বিনিময়ে জুলাই সনদ সংগঠিত হয়েছে—ভেবেছিলাম দেশ স্বাধীন হবে। কিন্তু নতুন শকুনের উৎপত্তি; সে যেন মহামারীর মতো উড়ে এসে জুড়ে বসেছে, এমনকি দেশের ক্রিকেট বোর্ডেও। হায় আল্লাহ! এ কী তুমি দেখালে? শিলিগুড়ি থেকে এসেছে ভারতের গোলাম, আর লন্ডন থেকে এসেছে বাবা-মার সুবাদে “আই হ্যাভ এ প্লান”।
তার মুখে বুলি নেই, তবুও বলতে শোনা যায় আগের সেই প্যাঁচাল—একই বাজনা, যা বেজে চলেছে দীর্ঘ ৫৫ বছর আগ থেকেই। “আমরা যখন দায়িত্ব নিই, তখন দেশের অবস্থা ছিল অত্যন্ত ভঙ্গুর। অর্থনৈতিক খাত থেকে শুরু করে যোগাযোগব্যবস্থা—সবকিছুই ছিল বিপর্যস্ত। মনে হয়েছিল যেন একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের দায়িত্ব নিয়েছি।” আর কতকাল শুনবে জাতি এই প্যাঁচাল?
আমাদের দুর্ভাগ্য, ইতিহাস যেন বারবার একই অধ্যায়ে ফিরে আসে। ৭১-এর পরে যাকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল, যিনি সংবিধান রচনায় যুক্ত ছিলেন, তিনি মুক্তিযুদ্ধের বিভীষিকা প্রত্যক্ষ করেননি; তিনি ছিলেন দেশের বাইরে, পাকিস্তানে। কাকতালীয়ভাবে আবারও এমন এক নেতৃত্বের আবির্ভাব, যিনি জনগণের ত্যাগ-তিতিক্ষার বাস্তবতা থেকে দূরে অবস্থান করেছেন। ফলে জাতির মনে প্রশ্ন জাগে—ইতিহাস কি আবার নিজেকে পুনরাবৃত্তি করছে?
এই প্রেক্ষাপটে সংসদীয় গণতন্ত্রে এক বিস্ময়কর দৃশ্যের জন্ম হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমান তর্কে নেই, বিতর্কে নেই, আলোচনায় নেই। সংসদে একের পর এক বিল পাস হয়েছে, অথচ তিনি নিজে কোনো বিল উত্থাপন করেননি। তাঁর পরিবর্তে সব বিল উত্থাপন করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ। নেতৃত্বের এই নীরবতা গণতন্ত্রে এক বিরল দৃষ্টান্ত হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।
তিনি যেন সংসদের ভিড়ে এক স্থির প্রতিচ্ছবি—কথাহীন, অভিব্যক্তিহীন; শান্ত নদীর মতো স্থির, শিমুল তুলোর মতো কোমল। তর্ক-বিতর্কে নেই, আলাপেও নেই; গায়ে কাদা নেই, মুখে বুলি নেই। যেন ক্ষমতার আসনে বসে থাকা এক নীরব প্রতীক।
এই নীরবতার কথা মনে করিয়ে দেয় চার্লি চ্যাপলিনের কথা। তিনি কথা না বলেও তাঁর অভিব্যক্তি, অঙ্গভঙ্গি ও অভিনয়ের মাধ্যমে বিশ্ববাসীকে আনন্দ দিয়েছেন, মানবতার গভীর সত্য তুলে ধরেছেন। তাঁর নীরবতা ছিল শিল্প, ছিল প্রতিবাদের ভাষা, ছিল বিনোদনের অনন্য মাধ্যম।
কিন্তু এখানে পার্থক্য স্পষ্ট। চাপ্লিনের নীরবতা মানুষকে হাসিয়েছে, ভাবিয়েছে এবং অনুপ্রাণিত করেছে। আর এই নীরবতা জাতিকে আনন্দ নয়, বরং অস্বস্তি ও জ্বালাতন উপহার দিচ্ছে। সেখানে ছিল সৃজনশীলতা; এখানে দেখা যাচ্ছে দায়িত্বহীনতার প্রতীকী রূপ।
এ যেন সংসদীয় আসনে বসে থাকা এক পুতুল—নিজস্ব আলোহীন, অন্যের আলোয় আলোকিত। চাঁদের মতো, যার নিজস্ব দীপ্তি নেই; সূর্যের আলোয় জ্বলে ওঠে। তেমনি এই নেতৃত্বও অন্যের সিদ্ধান্তের প্রতিফলন মাত্র।
অতএব প্রশ্ন থেকে যায়—এ কি সত্যিকারের নেতৃত্ব, নাকি কেবল এক নীরব অভিনয়?
-জাগো বাংলাদেশ, জাগো।
রহমান মৃধা, গবেষক ও লেখক, প্রাক্তন পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন