আওয়ামী লীগ সরকার আমলের বিগত ১৬ বছরের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির এক ভয়াবহ চিত্র জাতীয় সংসদে তুলে ধরেছেন অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি অভিযোগ করেন, গত দেড় দশকে ফ্যাসিবাদী সরকারের সীমাহীন দুর্নীতি, লাগামহীন লুটপাট এবং ভ্রান্ত নীতির কারণে দেশের অর্থনীতি আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে।
সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক খাতগুলোকে অকার্যকর করে দেওয়ার পাশাপাশি অর্থনীতির প্রতিটি শক্তিশালী সূচককে ধূলিস্যাৎ করা হয়েছে বলেও জানান মন্ত্রী।
স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের ১৩তম দিনে শুক্রবার (১০ এপ্রিল) ৩০০ বিধিতে এক বিবৃতিতে এসব কথা বলেন অর্থমন্ত্রী।
বিবৃতিতে মন্ত্রী উল্লেখ করেন, ২০০১-২০০৬ মেয়াদে বিএনপি সরকারের দূরদর্শী ও জনকল্যাণমুখী অর্থনৈতিক দর্শনের ফলে অর্থনীতির মূল সূচকগুলো ইতিবাচক ধারায় ছিল এবং প্রবৃদ্ধির গতি ত্বরান্বিত হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসা আওয়ামী লীগ সরকার সেই অর্জনগুলোকে নষ্ট করে দিয়েছে।
তিনি জানান, ২০০৫-০৬ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৬.৭৮ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতি ছিল ৭.১৭ শতাংশের মতো নিয়ন্ত্রিত পর্যায়ে। অথচ ২০২৩-২৪ অর্থবছর শেষে দুর্বৃত্তায়নের কারণে সেই প্রবৃদ্ধির হার কমে ৪.২২ শতাংশে নেমে এসেছে এবং মূল্যস্ফীতি অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছে ৯.৭৩ শতাংশ হয়েছে। একইভাবে শিল্প ও কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধিও উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে।
শ্রমবাজারের কাঠামোগত দুর্বলতা ও কর্মসংস্থান নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, বিগত এক দশকে শিল্প ও সেবা খাতে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি না হওয়ায় তরুণ সমাজ বাধ্য হয়ে কৃষিতে নিয়োজিত হচ্ছে। এতে কৃষি খাতে ছদ্ম-বেকারত্ব বাড়ছে এবং জাতীয় উৎপাদনশীলতা ব্যাহত হচ্ছে। তিনি একে ‘কর্মসৃজনবিহীন প্রবৃদ্ধি’ বা জব-লেস গ্রোথ হিসেবে অভিহিত করেন।
এছাড়া বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও টাকার মান নিয়ে অর্থমন্ত্রী জানান, গত ১৫ বছরে টাকার মান প্রায় অর্ধেক হয়ে গেছে। ২০০৫-০৬ সালে প্রতি ডলারের বিনিময় হার ছিল যেখানে ৬৭.২ টাকা, তা বর্তমানে ১২১ টাকায় দাঁড়িয়েছে। এই ব্যাপক অবচিতির ফলে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পেয়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কয়েকগুণ বেড়ে গেছে।
রাজস্ব ব্যবস্থাপনা ও বাজেট ঘাটতি প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী জানান, বিগত সরকারের আমলে কর-জিডিপি অনুপাত না বাড়লেও ব্যয়ের পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। অতিমূল্যায়িত প্রকল্প এবং সঠিক সম্ভাব্যতা যাচাই ছাড়াই নেওয়া ‘জম্বি’ প্রকল্পগুলোর কারণে বাজেট ঘাটতি এখন জিডিপির ৪.০৫ শতাংশে পৌঁছেছে। ঋণের ওপর নির্ভরতা বেড়ে যাওয়ায় বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের গতি মন্থর হয়ে পড়েছে এবং ব্যাংকিং খাতে তীব্র তারল্য সংকট সৃষ্টি হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী বর্তমান সরকারের ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বর্তমান সরকারের মূল লক্ষ্য হলো ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তর করা। এই লক্ষ্য অর্জনে অর্থনৈতিক গণতন্ত্রায়ন ও বিনিয়ন্ত্রণের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
সরকার একটি নতুন ‘সামাজিক চুক্তি’র মাধ্যমে রাজস্ব আহরণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে চায়, যেখানে করদাতার অর্থের বিনিময়ে সুশাসন ও উন্নত জীবনের নিশ্চয়তা থাকবে। ২০৩৪ সালের মধ্যে রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত ১৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
একইসঙ্গে জনগুরুত্বহীন ও অপ্রয়োজনীয় প্রকল্পগুলো বাতিল করে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।
ঋণ ব্যবস্থাপনায় চরম বিশৃঙ্খলার তথ্য তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, ২০০৫-০৬ সালে সুদ পরিশোধে ব্যয় ছিল মাত্র ৮৫ বিলিয়ন টাকা, যা ২০২৩-২৪ সালে ১৩ গুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়ে ১১৪৭ বিলিয়ন টাকায় পৌঁছেছে। অভ্যন্তরীণ ঋণের ওপর অধিক নির্ভরতা বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তা বিশেষ করে এসএমই খাতের জন্য ঋণ প্রাপ্তি কঠিন করে তুলেছে, যাকে ‘ক্রাউডিং আউট’ বলা হয়।
২০০৫-০৬ সালে রপ্তানি ও আমদানির প্রবৃদ্ধি ইতিবাচক থাকলেও ২০২৩-২৪ সালে তা নেতিবাচক ছিল। অর্থনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন, হুন্ডি এবং অর্থ পাচারের কারণে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ২০ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। তবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে বলে জানান অর্থমন্ত্রী।