যারা ভুলে হোক বা যে কোনো কারণে হোক দেশের টাকা বাইরে নিয়ে গেছেন তারা চাইলে জরিমানা ছাড়াই নিয়মিত কর দিয়ে সে টাকা দেশে ফেরত আনতে পারবেন বলে জানিয়েছেন এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান।
তিনি বলেন, অনেকে বলছেন আমরা দেশের টাকা বিদেশে নিয়ে গেছি এ টাকাটা কিভাবে আনবো? আমরা বলেছি আমাদের রাস্তা খুবই ওপেন, একেবারে ওপেন। যে কেউ চাইলে আমাদের বিদ্যমান আইন অনুযায়ী তিনি সে টাকা নিয়ে আসতে পারেন। ব্যক্তি করদাতার ক্ষেত্রে যে ঘটনাটা ঘটে, তিনি রিটার্ন সাবমিট করেছেন কিন্তু বিদেশে নিয়ে যাওয়া অর্থ রিটার্নে দেখাননি। তিনি আইন অনুযায়ী ১৮০ দিনের মধ্যে রিভাইজড রিটার্ন দাখিল করতে পারেন। ওনি রিভাইজড রিটার্ন জমা দিয়ে কর দিয়ে দিক। ওনাকে মোস্ট ওয়েলকাম ওনি বাংলাদেশের টাকা বাংলাদেশে নিয়ে আসুক। ওনাকে কোনো জরিমানা করা হবে না।
আজ বুধবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে অবস্থিত রাজস্ব ভবনে বিভিন্ন ব্যবসায়ি ও উদ্যোক্তা সংগঠনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত প্রাক-বাজেট আলোচনায় সভাপতির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। আলোচনায় অংশ নিয়ে রিয়েল এস্টেট এন্ড হাউজিং এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) পক্ষ থেকে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সুবিধা চাওয়া হয়। এ জন্য তারা আয়কর অধ্যাদেশ-১৯৮৪ এর ১৯ বিধিধারার পুনঃপ্রবর্তনের দাবি জানান।
জবাবে এনিবআর চেয়ারম্যান বলেন, আমরা দীর্ঘদিন ধরে যারা ট্যাক্স ফাঁকি দিয়েছে তাদেরকে উৎসাহিত করে অ্যামনেস্টি (সাধারণ ক্ষমা) দিয়ে এসেছি। আমরা সে সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসতে চাই। এখন অন্ততপক্ষে নিয়মিত হারে কর দিতে হবে। সারাজীবন ফাঁকি দিয়েছেন আবার টেক্স সিস্টেমকে ডিসটরশন (বিকৃতি) করেছেন এখন আবার কম টেক্স দিবেন, এ কালচারটা আমরা চিরতরে বন্ধ করতে চাই। আমরা ৫৫ বছর ধেরে এ কালচারে ছিলাম, এখন আর থাকবো না। গতবছর কালোটাকা সাদা করার যতগুলো উপায় ছিল আমরা বন্ধ করে দিয়েছি, বিশেষ করে কম টেক্স দিয়ে যে সুবিধাগুলো ছিল।
তিনি আরও বলেন, এখন বিদেশ থেকে টাকা পাঠানো খুবই সহজ। ব্যাংকের মাধ্যমে, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সিস্টেম, পেপলসহ আরও কিছু সিস্টেমেও টাকা পাঠানো যায়। শুধু তাই নয়, বৈধ চ্যানেলে অর্থ পাঠানো হলে সরকার প্রণোদনা দিচ্ছে। ফ্ল্যাটের নিবন্ধনের ক্ষেত্রে আয়কর ও ভ্যাট মিলিয়ে পাঁচ খাত থেকে রাজস্ব আদায় করা হয়। এসব খাতে বিদ্যমান কর-কাঠামো কমিয়ে আনার প্রস্তাব করে রিহ্যাব।
এর প্রেক্ষিতে এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, ফ্ল্যাট বা জমি রেজিস্ট্রেশনে প্রকৃত মূল্য দেখানো হয় না। এ কারণে এখন ক্রেতা-বিক্রেতা সকলেই বিপদে আছে। বিক্রেতা বিপদে পড়ছেন কারণ তিনি সেটা রিটার্নে দেখাতে পারছেন না। ক্রেতা বিপদে পড়ছেন কারণ আইনে বলা হয়েছে প্রকৃত ক্রয় মূল্যে সেটা দেখাতে হবে। ব্যাকিং চ্যানেলে কিংবা বড় বড় যেসব ডিল হয় সেগুলোতে আমাদের গোয়েন্দা অফিসাররা নড়াচড়া করছেন। ফলে দেখা যায়, করদাতা ফ্ল্যাট কিনেছেন ২০ কোটি টাকায় কিন্তু দেখিয়েছেন ২ কোটি টাকা। এখন ওনাকে ১৮ কোটি টাকার উপর টেক্স দিতে হচ্ছে এবং লোকজন দিচ্ছেও। ফ্ল্যাট বা জমি নিবন্ধনের ক্ষেত্রে গেইনটেক্স বিক্রেতার দেওয়ার কথা থাকলেও এটা ক্রেতারা দিয়ে আসছেন। আইনে যা বলা হয়েছে তার একদম উল্টো। এভাবে চলতে পারে না। একটা শৃঙ্খলার মধ্যে আসতে হবে। আপনারা (রিহ্যাব) যেটা রেজিস্ট্রেশন ব্যয় বলছেন আসলে সেটা রেজিস্ট্রেশন ব্যয় নয়। আমরা এনবিআর রাজী, রেজিস্ট্রেশনের সময় কোনো টেক্স নিব না। রিটার্নের সময় আমরা তা নিয়ে নেব। যদি পাঁচ বছরের মধ্যে কেনা-বেচা হয় তাহলে নিয়মিত হারে কর দিতে হবে, আর যদি পাঁচ বছরের বেশি সময় হয় তাহলে ১৫ শতাংশ কর দিতে হবে। গেইনটেক্স বিক্রেতাকে দিতে হবে, ক্রেতাকে নয়-এ বিষয়ে আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য রিহ্যাবকে পরামর্শ দেন এনবিআর চেয়ারম্যান।
আজকের বাজেট আলোচনায় বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প সমিতি (বিএপিআই), বাংলাদেশ সিরমিক ম্যানুফ্যাকচারর্স এসোসিয়েশন (বিসিএমইএ), বাংলাদেশ ফিসিসড লেদার, লেদারগুডস অন্ড ফুটওয়্যার এক্সপোটার্স এসোসিয়েশন, বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ ফুডস্টাফ ইমপোর্টাস অ্যান্ড সাপ্লা্ইয়ার্স এসোসিয়েশনসহ আরও বেশ কয়েকটি এসোসিয়েশন অংশ নেয়।
এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, কর অব্যাহতি কমিয়ে রাজস্ব আয় বাড়ানো আমাদের লক্ষ্য। আমাদের রাজস্বের প্রয়োজন। আমাদের সামস্টিক অর্থনীতি যদি আমরা স্থিতিশীল করতে চাই তাহলে আমাদের রাজস্ব বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। আমাদের জিডিপির তুলনায় রাজস্বের হার খুবই কম। আমাদের সরকার, গণতান্ত্রিক সরকার যেসব জনকল্যানমূলক কর্মসূচি নিয়েছে সেগুলো বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে এবং এগুলো ধীরে ধীরে আরও বাড়বে। পাশাপাশি সরকারের পরিচালন ব্যয়, উন্নয়ন কর্মসূচি রয়েছে সেখানে অর্থায়ন করতে হবে।