আধুনিক বিশ্বে একটি বিষয় স্পষ্ট, কোনো চাকরি আজীবনের নিশ্চয়তা নয়। কর্মদক্ষতা, বাজারের চাহিদা, এবং চুক্তির শর্ত, এই তিনের ওপর নির্ভর করে একজন কর্মীর অবস্থান নির্ধারিত হয়। যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্বে বহুল পরিচিত “নিয়োগ এবং বরখাস্ত” নীতি মূলত এই বাস্তবতার প্রতিফলন। একজন কর্মী যতদিন প্রতিষ্ঠানকে মূল্য দিতে পারে, ততদিনই তার অবস্থান টিকে থাকে।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই বাস্তবতা যদি কর্পোরেট জগতে প্রযোজ্য হয়, তাহলে রাজনীতিতে কেন নয়?
রাজনৈতিক ক্ষমতা: চুক্তি আছে, জবাবদিহিতা নেই
গণতন্ত্রে নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীরা জনগণের কাছে নানা প্রতিশ্রুতি দেয়। এটি মূলত একটি অলিখিত “সামাজিক চুক্তি”- যেখানে জনগণ তাদের ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতা অর্পণ করে, আর নির্বাচিত প্রতিনিধি সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের দায়িত্ব নেয়।
এই চুক্তির মৌলিক ভিত্তি হলো বিশ্বাস এবং জবাবদিহিতা। জনগণ তাদের সার্বভৌম ক্ষমতার একটি অংশ প্রতিনিধির হাতে তুলে দেয় এই প্রত্যাশায় যে সেই ক্ষমতা জনগণের কল্যাণে ব্যবহৃত হবে। কিন্তু যখন সেই বিশ্বাসের প্রতিফলন বাস্তবে দেখা যায় না, তখন এই চুক্তির নৈতিক ভিত্তিই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সংসদের মেয়াদ পাঁচ বছর। এই পাঁচ বছর ধরে একজন নির্বাচিত প্রতিনিধি কার্যত একটি “নিরাপদ চাকরি” ভোগ করেন, তার পারফরম্যান্স যেমনই হোক না কেন। এখানেই মূল সমস্যা:
জনগণের ভোট কি কেবল ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য, নাকি জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার। ফলে গণতন্ত্র একটি “একদিনের নির্বাচন” কেন্দ্রীক ব্যবস্থায় পরিণত হয়, যেখানে বাকি সময়টুকু প্রায় সম্পূর্ণ অনিয়ন্ত্রিত।
কর্পোরেট বনাম রাজনীতি: একটি তুলনামূলক বিশ্লেষণ
রাজনৈতিক ক্ষমতা এবং কর্পোরেট চাকরির মধ্যে মৌলিক পার্থক্য বেশ স্পষ্ট। কর্পোরেট ক্ষেত্রে নিয়োগ মূলত চুক্তিভিত্তিক। একজন কর্মী নিয়মিতভাবে মূল্যায়িত হয়, তার পারফরম্যান্স মাপা হয় এবং যদি সে কাজ করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে চাকরি হারানোর বাস্তব পরিণতি থাকে। ফলোআপ এবং জবাবদিহিতা ধারাবাহিক।
রাজনীতিতে কিন্তু বিষয়টি পুরোপুরি ভিন্ন। নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়োগ ভোটের মাধ্যমে হয়, কিন্তু তাদের পারফরম্যান্স মূল্যায়নের কোনও স্বচ্ছ ও ধারাবাহিক প্রক্রিয়া নেই। ব্যর্থতার ফলও প্রায় নেই, আর জবাবদিহিতা সীমিত। সংসদে উপস্থিতি, আইন প্রণয়নে অবদান, নির্বাচনী এলাকার উন্নয়ন, এসব নিয়ে নিয়মিত কোনো ফলোআপ নেই।
অর্থাৎ, যেখানে কর্পোরেট বিশ্বে কর্মীর দায়িত্ব ও ক্ষমতা স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত, সেখানে রাজনীতিতে সেই স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার কাঠামো অনিয়ন্ত্রিত। ফলে জনগণের ক্ষমতা প্রাপ্ত প্রতিনিধির হাতে অপ্রকাশ্যভাবে চলে যায়, যা গণতন্ত্রের মূল নৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করে।
বাংলাদেশের বাস্তবতা: সমস্যার মূল কোথায়?
প্রতিটি নির্বাচনের আগে কর্মসংস্থান, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, এবং সেবার মান উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। কিন্তু নির্বাচনের পরে এই প্রতিশ্রুতিগুলোর অগ্রগতি নিয়ে কি কোনো বাধ্যতামক, প্রকাশ্য মূল্যায়ন হয়। সংসদে উপস্থিতি, বিতর্কে অংশগ্রহণ, বা নিজ নির্বাচনী এলাকার বাস্তব উন্নয়ন, এসব কি কখনো নিয়মিতভাবে জনগণের সামনে উপস্থাপিত হয়। ফলে রাজনৈতিক নেতৃত্ব প্রায়শই “চুক্তির বাইরে” অবস্থান করে।
আন্তর্জাতিক বাস্তবতা: কোথায় কী হচ্ছে?
রিকল ইলেকশন ব্যবস্থার মাধ্যমে নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ হলে জনগণ সরাসরি নির্বাচিত প্রতিনিধিকে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই অপসারণ করতে পারে। তথ্য অধিকার আইনের মাধ্যমে নাগরিকরা সরকারের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারে এবং প্রশ্ন তুলতে পারে। উন্নত গণতন্ত্রে বিভিন্ন স্বাধীন প্রতিষ্ঠান নিয়মিতভাবে সরকারের কার্যক্রম মূল্যায়ন করে এবং রিপোর্ট প্রকাশ করে।
কী করণীয়: একটি কার্যকর রাজনৈতিক রোডম্যাপ
১. নির্বাচনী ইশতেহারকে আইনি বাধ্যবাধকতার আওতায় আনতে হবে।
২. প্রতিটি জনপ্রতিনিধির জন্য পারফরম্যান্স সূচক নির্ধারণ করতে হবে।
৩. জনগণের হাতে সরাসরি অপসারণের ক্ষমতা দিতে হবে।
৪. স্বাধীন মূল্যায়ন কমিশন গঠন করতে হবে।
৫. ডিজিটাল স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।
গণতন্ত্র কেবল নির্বাচন নয়, এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া, যেখানে জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতা এবং কর্মদক্ষতা সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আজকের বাস্তবতায় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, রাজনীতিকে “দায়বদ্ধ পেশা” হিসেবে পুনঃসংজ্ঞায়িত করা। যেখানে প্রতিশ্রুতি হবে চুক্তি, ক্ষমতা হবে দায়িত্ব, এবং জনগণ হবে চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রক।
এখনই সময় সিদ্ধান্ত নেওয়ার, আপনি কি কেবল ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তর করবেন, নাকি সেই ক্ষমতার জবাবদিহিতারও দাবি করবেন? কোনো জবাবদিহিতা ছাড়া গণতন্ত্র কেবল একটি আনুষ্ঠানিক কাঠামো হয়ে থাকবে। জাগো বাংলাদেশ জাগো।
রহমান মৃধা, গবেষক ও লেখক, প্রাক্তন পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন