সরকার ও রাজনীতিকে পৃথকভাবে সমান গুরুত্ব দিয়ে পরিচালনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপি। একদিকে সরকার পরিচালনায় যেমন সাধারণ মানুষের মধ্যে আস্থা সৃষ্টির প্রচেষ্টা থাকবে, তেমনি সারাদেশে দলের সাংগঠনিক কাঠামোকেও মজবুত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে শিগগিরই বিএনপির কেন্দ্রীয় কাউন্সিল করার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন দলের নীতিনির্ধারক নেতারা।
গতকাল শনিবার দীর্ঘ প্রায় তিন মাস পর অনুষ্ঠিত বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির সভায় এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বৈঠক শেষে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাংবাদিকদের বলেন, বৈঠকে দলের সাংগঠনিক বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। দলকে শক্তিশালী করতে দ্রুততম সময়ে কাউন্সিল করার বিষয়টি আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে। পাশাপাশি সরকারের ৪৭ দিনের কর্মসূচি নিয়ে পর্যালোচনা ও মূল্যায়ন করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, যত দ্রুত কাউন্সিলের দিকে যাওয়া যায়, সেই বিষয়ে আমরা চেষ্টা করব। কোরবানির ঈদের আগে সম্ভব নয়। কয়েক মাস সময় লেগে যাবে।
বৈঠক সূত্র জানায়, বৈঠকে সিনিয়র নেতারা বলেন, সরকার গঠনের পর দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম মুখ থুবড়ে পড়েছে। দলের দুটি কার্যালয় এখন অনেকটা নেতাকর্মীশূন্য। দলের প্রতিটি অঙ্গসংগঠনের মেয়াদ শেষ হয়েছে। কোনো কোনোটির মেয়াদ ১০ বছরের বেশি পার করেছে। সারাদেশে প্রায় প্রতিটি জেলা কমিটির মেয়াদ নেই। এ অবস্থায় শুধু সরকারের কার্যক্রম নিয়ে ব্যস্ত থাকলে দলের সাংগঠনিক কাঠামো ভেঙে পড়বে। যা দলের রাজনীতির জন্য কখনোই ভালো হবে না।
এ অবস্থায় সারাদেশে সাংগঠনিক কার্যক্রমকে জোরদার করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বৈঠকে। সেখানে আন্দোলন-সংগ্রামের ভ্যানগার্ড হিসেবে পরিচিত ছাত্রদল, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ছাড়াও অন্যান্য অঙ্গসংগঠনকে ঢেলে সাজানোর সিদ্ধান্ত নেন নেতারা।
সংরক্ষিত আসনে মনোনয়ন
সংরক্ষিত নারী আসনে প্রার্থী মনোনয়ন তথা জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে প্রার্থী মনোনয়নের বিষয়ে দলের অবস্থান ও করণীয় নির্ধারণে নেতারা আলোচনা করেন নেতারা। এবার সংরক্ষিত নারী আসনে মহিলা দলের ত্যাগী নেত্রী ও অপেক্ষাকৃত তরুণদের জায়গা দেওয়ার বিষয়ে একমত হন তারা। তাদের সঙ্গে কয়েকজন প্রবীণ নেত্রীও জায়গা পাবেন। বিএনপি জোটের ভাগে ৩৫টি আসন পড়বে। তবে শতাধিক নারীনেত্রী বিএনপি থেকে মনোনয়নপ্রত্যাশী। এসব আসনে মনোনয়ন পেতে ইতোমধ্যে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনের নেত্রীরা। যাদের বেশির ভাগই জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সাবেক নেত্রী। তাদের আমলনামা আর গ্রহণযোগ্যতার পাশাপাশি বিগত দিনের আন্দোলনে সম্পৃক্ততার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে মনোনয়ন দেওয়ার বিষয়ে নেতারা কথা বলেন। এর বাইরে বিভিন্ন সেক্টরে পারদর্শী, উচ্চ শিক্ষিতদেরও সংরক্ষিত আসনে মনোনয়ন দেওয়ার বিষয়ে নেতারা কথা বলেন।
বৈঠকে মনোনয়ন বাছাই ও চূড়ান্ত করতে একটি টিম গঠনের কথাও বলা হয়েছে। এ ছাড়া বৈঠকে নতুন সরকারের কর্মকাণ্ড পর্যালোচনা করা হয়েছে। মূলত রিভিউ হয়েছে। সরকারের এই অল্প সময়ের কর্মকাণ্ডকে ভালো হিসেবে পর্যালোচনায় উঠে এসেছে।
বিএনপি সরকার গঠনের পর যেসব ইস্যু এসেছে, তা নিয়েও বৈঠকে চুলচেরা বিশ্লেষণ করেন স্থায়ী কমিটির সদস্যরা। জ্বালানি তেল নিয়েও আলোচনা হয়েছে। সংসদ অধিবেশনে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু যে বিবৃতি দিয়েছেন, সে বিষয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়।
বৈঠকে জুলাই সনদ নিয়েও আলোচনা হয়েছে। বৈঠকে বলা হয়, বিএনপির অবস্থা পরিষ্কার, সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ সেটা পরিষ্কার করে দিয়েছেন। তা নিয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। বৈঠকে বলা হয়, আমরা জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করব। কিন্তু কিছু নোট অব ডিসেন্ট ছিল বিএনপির। তার অর্থ এটা না, এই নোট অব ডিসেন্টও বিএনপিকে বাস্তবায়ন করতে হবে।
বৈঠকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ড. আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান (ভার্চুয়ালি), মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমেদ, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, বেগম সেলিমা রহমান (ভার্চুয়ালি) ও ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন উপস্থিত ছিলেন।