ইরানে মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলার এক মাস পার হলেও বিশ্ব জ্বালানি তেলের বাজারে অস্থিরতা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। অপরিশোধিত জ্বালানি তেল, পরিশোধিত জ্বালানি পণ্য এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) বৈশ্বিক সরবরাহ এখন এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমানে বিশ্ব বাজারে প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ ব্যারেল জ্বালানি তেলের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে এ বিশাল ঘাটতি কেবল মজুদ রাখা জ্বালানি তেল দিয়ে মেটানো সম্ভব নয় বলেও মনে করছেন তারা। খবর রয়টার্স।
বিশ্বের বর্তমান এ জ্বালানি সংকটের মূলে রয়েছে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি। সংকীর্ণ জলপথটি বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ‘তেলের রুট’ হিসেবে পরিচিত। স্বাভাবিক সময়ে বিশ্বের মোট অপরিশোধিত জ্বালানি তেল, পরিশোধিত পণ্য ও এলএনজির প্রায় ২০ শতাংশ এই পথ দিয়েই পরিবহন করা হয়। কিন্তু সংঘাত শুরুর পর থেকে প্রণালিটি দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। মার্চে হাতেগোনা কয়েকটি জাহাজ এ পথ অতিক্রম করতে পেরেছে। ফলে জ্বালানি বাজার এখন মারাত্মক ঝুঁকির মুখে রয়েছে।
যদিও ওয়াশিংটন ও ইসরায়েল দাবি করছে, তারা ইরানের সামরিক সক্ষমতা ও নেতৃত্বকে দুর্বল করে দিতে সক্ষম হয়েছে, কিন্তু বিশ্ব অর্থনীতির জন্য এই দাবি খুব একটা স্বস্তি বয়ে আনছে না। বাস্তব চিত্র হলো, ট্যাংকারগুলো এখনো হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিরাপদে চলাচল করতে পারছে না। অন্যদিকে, ইরানও উপসাগরীয় অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামোতে আঘাত হানার সক্ষমতা প্রদর্শন করেছে। এই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে তেহরান বিশ্ব অর্থনীতিকে এক প্রকার জিম্মি করে রেখেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, ‘সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি’ বা ‘ওর্স্ট-কেস সিনারিও’ তখনই তৈরি হবে যদি ইরান ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে সৌদি আরব বা আরব আমিরাতের তেল শোধনাগার, পাইপলাইন ও রফতানি টার্মিনালগুলোতে ব্যাপক হামলা চালায়। গুঞ্জন রয়েছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের খার্গ দ্বীপের তেল টার্মিনাল বা হরমুজ প্রণালির ছোট দ্বীপগুলো দখল করতে স্থল সেনা পাঠানোর পরিকল্পনা করছেন। যদি এমন কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়, তবে সেটি ইরানকে বড় ধরনের ধ্বংসাত্মক হামলার দিকে উসকে দিতে পারে। আর এমনটি হলে বিশ্ব অর্থনীতি এক নজিরবিহীন জ্বালানি বিপর্যয়ের সম্মুখীন হবে।
এ সংকটের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে এশিয়ায়। কারণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে আসা প্রায় ৮০ শতাংশ জ্বালানি এশিয়ার দেশগুলোতে যায়। ফলে এই অঞ্চলে পরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে। সিঙ্গাপুরে জেট ফুয়েলের দাম গত ফেব্রুয়ারির তুলনায় দ্বিগুণ হয়ে ২২৩ ডলারে দাঁড়িয়েছে। ডিজেল তৈরির মূল উপাদান গ্যাসঅয়েলের দামও দ্বিগুণ হয়েছে এবং পেট্রলের দাম বেড়েছে প্রায় ৬৫ শতাংশ।
অস্ট্রেলিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশগুলো এখন জরুরি ভিত্তিতে জ্বালানি আমদানির জন্য মরিয়া হয়ে চেষ্টা করছে। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত বিকল্প পথে জ্বালানি তেল রফতানি বাড়ানোর চেষ্টা করলেও তা চাহিদার তুলনায় খুবই সামান্য।
উদ্বেগের বিষয়, এ সংঘাত লোহিত সাগরের বাব আল-মানদেব প্রণালিতেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা যদি পথ বন্ধ করে দেয়, তবে সৌদি আরবের জ্বালানি তেল রফতানি আরো কঠিন হয়ে পড়বে। সেক্ষেত্রে জাহাজগুলোকে সুয়েজ খাল হয়ে অনেক দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে, যা পরিবহন খরচ ও সময় দুটিই বাড়িয়ে দেবে।
এদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম হু হু করে বাড়ছে। গতকাল এশিয়ায় লেনদেনের শুরুতে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের বাজার আদর্শ ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ২ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়ে প্রতি ব্যারেল ১১৫ ডলার ৫৫ সেন্টে পৌঁছেছে। হামলা শুরুর আগের সময়ের তুলনায় এটি প্রায় ৬০ শতাংশ বেশি। বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে জ্বালানি তেলের দাম কোথায় গিয়ে ঠেকবে তা বলা মুশকিল। বিশ্বজুড়ে জ্বালানি স্বল্পতা এবং উচ্চমূল্যের এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বহুগুণ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।