ইউরোপীয় পার্লামেন্টে অভিবাসননীতিতে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাইরে ‘রিটার্ন হাব’ বা অভিবাসী আটক কেন্দ্র স্থাপনের প্রস্তাব সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে পাস হয়েছে। বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত ভোটে প্রস্তাবটির পক্ষে ৩৮৯ জন আইনপ্রণেতা সমর্থন দেন, বিপক্ষে ভোট পড়ে ২০৬টি এবং ৩২ জন ভোটদানে বিরত থাকেন। এই সিদ্ধান্তকে ইউরোপের অভিবাসনব্যবস্থায় একটি কঠোর ও বিতর্কিত মোড় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
প্রস্তাবটি পাসের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সমীকরণেও বড় পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে।
ডানপন্থী দলগুলো এবার চরম ডানপন্থীদের সঙ্গে সমন্বয় করে অবস্থান নেয়, যা অতীতে খুব একটা দেখা যায়নি। অন্যদিকে বামপন্থী ও কেন্দ্রপন্থী শক্তিগুলো এর বিরোধিতা করে। নতুন ব্যবস্থায় ইইউ সদস্য রাষ্ট্রগুলো এখন এককভাবে কিংবা ছোট জোট গঠন করে তৃতীয় দেশের সঙ্গে চুক্তি করতে পারবে, যার মাধ্যমে অনিয়মিত অভিবাসীদের নিজ দেশে ফেরত না পাঠিয়ে ইইউর বাইরের নির্ধারিত কেন্দ্রে পাঠানো হবে। ইতিমধ্যে জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, অস্ট্রিয়া, ডেনমার্ক ও গ্রিস আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের সঙ্গে এ ধরনের কেন্দ্র স্থাপনের বিষয়ে আলোচনা শুরু করেছে।
ইউরোপের চরম ডানপন্থী দলগুলো এ সিদ্ধান্তকে তাদের দীর্ঘদিনের দাবির প্রতিফলন হিসেবে দেখছে। তারা যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভিবাসননীতির প্রশংসা করে একই ধরনের কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়ে আসছে। বেলজিয়ামের ভ্লামস বেলাং এবং জার্মানির এএফডি দল ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের আদলে অভিবাসী শনাক্ত ও বহিষ্কারের জন্য বিশেষ বাহিনী গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে।
তবে মানবাধিকার সংস্থাগুলো এই উদ্যোগকে গভীর উদ্বেগের চোখে দেখছে।
ইন্টারন্যাশনাল রেসকিউ কমিটির ইইউ অ্যাডভোকেসি পরিচালক মার্টা ওয়েলান্ডার বলেন, এই ভোট ‘শরণার্থী অধিকারের জন্য ঐতিহাসিক পশ্চাদপসরণ’। তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘এটি একটি নতুন শাস্তিমূলক ইইউ আশ্রয় ও অভিবাসনব্যবস্থার পথ প্রশস্ত করবে, যা নিরাপত্তা খোঁজা মানুষদের নিরুৎসাহিত, আটক এবং বহিষ্কার করার জন্য তৈরি করা হয়েছে। ইইউর এমন একটি ব্যবস্থা থাকা উচিত, যা জীবন রক্ষা করে, যা বেঁচে থাকাকে অপরাধী করে না।’
এ ছাড়া উদ্বেগ জানিয়েছে প্ল্যাটফরম ফর ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন অন আনডকুমেন্টেড মাইগ্র্যান্টস (পিকাম)। সংস্থাটির অ্যাডভোকেসি কর্মকর্তা সিলভিয়া কার্তা বলেন, ‘এই ভোট একটি বিপজ্জনক মোড় নেওয়ার ইঙ্গিত দেয়, কারণ কেন্দ্র ডানপন্থী শক্তিগুলো চরম ডানপন্থীদের সঙ্গে জোট বেঁধে একটি দমনমূলক এজেন্ডা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছ।
এই বিষাক্ত জোট গণ-আটক, পরিবারের থেকে বিচ্ছেদ এবং বহিষ্কারের পথ প্রশস্ত করছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের আইসিইকে করতে দেখেছি এবং অসংখ্য জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে।’
অন্যদিকে সমর্থকরা বলছেন, ‘এই নীতি অনিয়মিত অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা রাখবে। ফরাসি কেন্দ্র-ডানপন্থী এমইপি ফ্রাঁসোয়া-জাভিয়ের বেলামি বলেন, ‘এই সংস্কারের মাধ্যমে যে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছে, তা সরলভাবে এই নীতিকে নিশ্চিত করবে, যদি আপনি অনিয়মিতভাবে ইউরোপে আসেন, তবে নিশ্চিত যে আপনি এখানে থাকতে পারবেন না।’
কেন্দ্র-বামপন্থী এসঅ্যান্ডডি গ্রুপের ইতালীয় এমইপি সেসিলিয়া স্ত্রাদা এ প্রস্তাবের বিরোধিতা করে বলেন, ‘এই ভয়াবহ আইনগুলো আমাদের সমাজকে দুর্বল করবে, ভয় বাড়িয়ে তুলবে এবং নিরপরাধ মানুষদের কারাগার ও বহিষ্কারের ভয়ে লুকিয়ে থাকতে বাধ্য করবে।’
ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জা মেলোনি এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, ‘এটি ইউরোপকে একটি ‘বিশ্বাসযোগ্য অভিবাসন নীতি’র দিকে এগিয়ে নেবে। রিটার্ন হাবগুলো অনিয়মিত অভিবাসীদের জন্য প্রত্যাবাসনের দেশ শনাক্ত করার সম্ভাবনা বৃদ্ধি করে, যার মধ্যে শুধু তাদের নিজ দেশ নয়, তৃতীয় দেশও অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এটি প্রত্যাবাসনকে আরো কার্যকর করা, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ জোরদার করা এবং ইউরোপকে একটি বেশি বিশ্বাসযোগ্য অভিবাসননীতি প্রদানের দিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।’
সমালোচকদের মতে, ইইউর বাইরে এসব কেন্দ্র স্থাপন করলে মানবাধিকার সুরক্ষা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়বে। ফ্রান্স, স্পেনসহ কয়েকটি দেশও এই মডেলের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। অনেকের মতে, এসব কেন্দ্র বাস্তবে ‘আইনি কৃষ্ণগহ্বর’-এ পরিণত হতে পারে।
উল্লেখ্য, নতুন আইনের আওতায় যারা দেশ ছাড়তে অস্বীকৃতি জানাবে, তাদের জন্য কঠোর শাস্তির ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। এর মধ্যে আটক এবং ভবিষ্যতে ইইউতে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।