‘মনে হচ্ছে যেন, কোনো ফাঁদে আটকা পড়েছি’—ক্রিকেট থেকে বিরতি নিয়ে এভাবেই ভাঙা গলায় আক্ষেপ করেছিলেন আর্যমান বিরলা। একের পর এক চোটে জর্জরিত শরীর, তার সঙ্গে মানসিক অবসাদের লড়াইয়ে ভেঙে পড়েছিলেন তিনি। সবশেষ ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে ‘সাময়িক ছুটি’ নেন তিনি। তবে সেই ছুটি আর শেষ হয়নি।
মাত্র ২২ বছর বয়সেই থেমে যায় তার ক্রিকেট ক্যারিয়ার।
তবে সময়ের স্রোতে নতুন পরিচয়ে ফিরেছেন তিনি। এখন ২৮ বছর বয়সী আর্যমান আইপিএল ফ্র্যাঞ্চাইজি রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরুর কর্ণধার। নামের শেষাংশই বলে দেয় তার পারিবারিক পরিচয়।
ভারতের শিল্প জগতের অন্যতম প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান আদিত্য বিরলা গ্রুপের উত্তরাধিকার তিনি। প্রায় ১৬ হাজার ৬৬০ কোটি ভারতীয় রুপিতে যে চারটি প্রতিষ্ঠানের কনসোর্টিয়াম বেঙ্গালুরু ফ্র্যাঞ্চাইজিটি কিনে নিয়েছে, সেখানে বড় অংশ এই গ্রুপের। নতুন মালিকানায় চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পাচ্ছেন আর্যমান।
১৮৫৭ সালে শিব নারায়ণ বিরলার হাত ধরে শুরু হওয়া এই ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য পরবর্তী সময় ঘনশ্যাম দাস বিরলা ও আদিত্য ভিক্রাম বিরলার হাত ধরে বিশ্বজুড়ে বিস্তৃত হয়। ১৯৯৫ সালে আদিত্য ভিক্রাম বিরলার মৃত্যুর পর থেকে এর নেতৃত্ব দিচ্ছেন আর্যমানের বাবা কুমার মাঙ্গালাম বিরলা। বর্তমানে বিশ্বের ৪২টি দেশে বিস্তৃত এই গ্রুপের ব্যবসা।
এমন প্রভাবশালী পরিবারের সন্তান হয়েও ক্রিকেটেই নিজের পরিচয় গড়তে চেয়েছিলেন আর্যমান। মুম্বাইয়ে সুযোগ সীমিত দেখে ১৭ বছর বয়সে পাড়ি জমান মধ্যপ্রদেশে। পরিবার থেকে দূরে থেকে জুনিয়র সার্কিটে ধাপে ধাপে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। ইংল্যান্ডে গিয়ে পল উইকসের তত্ত্বাবধানে অনুশীলনও করেন।
অবশেষে ২০১৬-১৭ মৌসুমে সিকে নাইডু ট্রফিতে (অনূর্ধ্ব-২৩) নজর কাড়েন তিনি। ৯ ইনিংসে ৩ সেঞ্চুরিতে ৬০২ রান করে আসরের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক হন, গড় ৭৫.২৫। এর আগে অবশ্য তার পারিবারিক পরিচয়ই বেশি আলোচিত হতো। মধ্যপ্রদেশ দলে নিজেকে অনেক সময় ‘আউটসাইডার’ মনে করতেন তিনি। পারফরম্যান্স দিয়েই সম্মান আদায়ের লক্ষ্য ছিল তার।
২০১৭ সালে ওড়িশার বিপক্ষে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে অভিষেকের দিনই ভাঙা আঙুল নিয়ে খেলেন। ব্যথা সহ্য করে প্রায় দুই ঘণ্টা ক্রিজে থেকে রাজাত পাতিদারর সঙ্গে ৭২ রানের উদ্বোধনী জুটি গড়েন। এতে সতীর্থদের কাছেও সম্মান অর্জন করেন তিনি।
পরের মৌসুমে কলকাতার ইডেন গার্ডেনে বাংলার বিপক্ষে দ্বিতীয় ইনিংসে দীর্ঘ ২৭১ মিনিট ব্যাট করে ম্যাচ বাঁচানো সেঞ্চুরি করেন। তখনই নিজের পরিচয়ে পরিচিতি পেতে শুরু করেন।
সেই অভিজ্ঞতা তুলে ধরে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন-
“বিশ্বাস ও সম্মান অর্জনের সেরা উপায় হলো পারফরম্যান্স। যখন আমি রান করা শুরু করলাম, লোকে আমাকে অন্য চোখে দেখতে শুরু করল। মধ্যপ্রদেশে যখন প্রথম আসি, তখন নামের শেষ অংশের কারণেই বেশি পরিচিতি ছিল আমার। শুনতেই থাকতাম ‘বিরলার ছেলে, বিড়লার নাতি…।’ কিন্তু পারফরম্যান্স দিয়েই লোকের ধারণা বদলে দিয়েছি, তারা আমাকে ভিন্নভাবে দেখতে শুরু করেছে।”
“এখনও পর্যন্ত এটাই আমার সবচেয়ে বড় অর্জন। সম্প্রতি একজন এসে আমাকে বললেন, ‘আপনি এত সাদাসিদে, এত সহজ-সরল যে, জানতামই না আপনি বিরলা পরিবারের সন্তান।’ আমার কাছে এটা ছিল পরিবর্তনের একটা ইঙ্গিত।”
২০১৮ সালে আইপিএলের নিলামে ৩০ লাখ রুপিতে তাকে দলে নেয় রাজস্থান রয়্যালস। পরের মৌসুমেও দলে থাকলেও মাঠে নামার সুযোগ পাননি।
এরপরই শুরু হয় দুঃসময়। একের পর এক চোটে ২০১৯ সালের জানুয়ারির পর দীর্ঘ সময় মাঠের বাইরে থাকতে হয় তাকে। মানসিক অবসাদ গ্রাস করে ফেলে। অবশেষে ২২ বছর বয়সে ক্রিকেট থেকে ‘অনির্দিষ্টকালের ছুটি’ নেন।
“মনে হচ্ছে যেন, কোনো ফাঁদে আটকা পড়েছি। এতদিন পর্যন্ত সমস্ত কষ্টের মধ্যে দিয়ে নিজেকে ঠেলে নিয়ে গেছি। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে নিজের মানসিক স্বাস্থ্য ও সুস্থতাকে অন্য সবকিছুর ঊর্ধ্বে রাখা প্রয়োজন। আমাদের প্রত্যেকেরই পথচলা নিজের মতো এবং এই সময়টা নিজেকে আরও ভালোভাবে বুঝতে, নতুন ও বৈচিত্র্যময় দৃষ্টিভঙ্গির জন্য মনকে উন্মুক্ত করতে এবং নতুন উপলব্ধির মধ্যে জীবনের উদ্দেশ্য খুঁজে বের করতে কাজে লাগাতে চাই।”
সেই সিদ্ধান্তই হয়ে ওঠে তার ক্রিকেট জীবনের শেষ অধ্যায়। ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে অন্ধ্র প্রদেশের বিপক্ষে রাঞ্জি ট্রফির ম্যাচই থেকে যায় তার শেষ উপস্থিতি।
সাত বছর পর আবার ক্রিকেটে ফিরছেন তিনি, তবে ভিন্ন ভূমিকায়। প্রায় ৭৮ কোটি মার্কিন ডলার বা ১৬ হাজার ৬৬০ কোটি রুপির চুক্তিতে চার প্রতিষ্ঠানের কনসোর্টিয়াম বেঙ্গালুরু ফ্র্যাঞ্চাইজিটি কিনে নেওয়ার পর চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেবেন আর্যমান।
আইপিএলে দল পেলেও কখনো খেলার সুযোগ না পাওয়া আর্যমানই এখন লিগটির অন্যতম তারকাখচিত দলটির মালিক। তাই দায়িত্ব বদলালেও ক্রিকেট নিয়ে এখন নতুন স্বপ্ন দেখতে আর বাধা নেই তার।