সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদ ইরানকে সতর্ক করেছে। তিনি তার দেশ এবং প্রতিবেশী উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর তাদের হামলা সহ্য করবেন না বলে জানিয়েছেন। তিনি তেহরানকে অবিলম্বে তাদের কৌশল ফের বিবেচনা করার আহ্বান জানিয়েছেন।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বৃহস্পতিবার ভোরে এক সংবাদ সম্মেলনে ইরানকে সতর্ক করে বলেন, সৌদি আরব এবং অন্যান্য উপসাগরীয় দেশগুলোর উল্লেখযোগ্য সক্ষমতা ও সামর্থ্য রয়েছে। তারা ইচ্ছা করলে তা কাজে লাগাতে পারে।
সম্মেলনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আঞ্চলিক প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর হামলার জন্য ইরান তাদের কৌশল আগে থেকেই সতর্কভাবে পরিকল্পনা করেছিল, যদিও তেহরানের কূটনীতিকরা তা অস্বীকার করে আসছেন।
প্রিন্স ফয়সাল বলেন, কিছু লক্ষ্যবস্তুতে আঘাতের নিখুঁততা দেখে বোঝা যায়, এটি আগে থেকেই ভালোভাবে পরিকল্পনা করা ছিল এবং এতে শুধু প্রতিবেশী দেশ নয়, সৌদি আরবও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
তিনি আরো বলেন, ‘সৌদি আরব কিভাবে আত্মরক্ষা করবে, তা আমি এখন বলতে চাই না। কারণ ইরানকে আগাম বার্তা দেওয়া ঠিক হবে না। কিন্তু আমি মনে করি, ইরানিদের এটা বোঝা জরুরি যে সৌদি আরব এবং আক্রান্ত দেশগুলোর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সক্ষমতা ও সামর্থ্য রয়েছে। তারা চাইলে কাজে তা লাগাতে পারে।’
তিনি আরো বলেন, ‘যে ধৈর্য প্রদর্শন করা হচ্ছে তা অসীম নয়। ইরানিদের হাতে এক দিন, দুই দিন, নাকি এক সপ্তাহ সময় আছে? আমি সেই ইঙ্গিত দিতে যাচ্ছি না। আমি আশা করব, তারা আজকের বৈঠকের বার্তাটি বুঝবে এবং দ্রুত নিজেদের অবস্থান পুনর্বিবেচনা করে প্রতিবেশীদের ওপর হামলা বন্ধ করবে। কিন্তু তাদের সেই ইচ্ছা আছে কি না, সে বিষয়ে আমি সন্দিহান।’
সৌদি রাজধানীতে দিনের শুরুতে আরব ও ইসলামী দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের এক বৈঠকের পর যুবরাজ ফয়সাল এই সতর্কবার্তা দেন। এই বৈঠকে অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান যুদ্ধ নিয়ে আলোচনা হয়।
এদিকে বুধবার উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি কেন্দ্রগুলোতে ইরান হামলা চালায়। এর মধ্যে কাতারের রাস লাফান গ্যাস স্থাপনাও রয়েছে। সেখানে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের হাবশান গ্যাস স্থাপনাও রয়েছে।
কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রাস লাফান শিল্প শহরকে লক্ষ্য করে চালানো ইরানি হামলার তীব্র নিন্দা ও ধিক্কার জানিয়েছে। কাতারের রাজধানী দোহা থেকে ৮০ কিলোমিটার (৫০ মাইল) উত্তর-পূর্বে অবস্থিত এই শিল্প শহরটি বিশ্বের বৃহত্তম তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) উৎপাদন কেন্দ্র। বিশ্বের মোট এলএনজি সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ উৎপাদন করে এটি।
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) এর আগে সতর্ক করেছিল, ইরানের সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্রে ইসরায়েলি হামলার প্রতিশোধ হিসেবে কাতার, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের তেল ও গ্যাস স্থাপনাগুলোতে হামলা চালানো হবে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, দেশটির বিশাল অফশোর সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্রের সঙ্গে যুক্ত স্থাপনাগুলো হামলার শিকার হয়েছে। এই গ্যাসক্ষেত্রটি দক্ষিণ ইরানের বুশেহর প্রদেশের উপকূলে অবস্থিত।
সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ও বুধবার জানিয়েছে, তাদের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রিয়াদকে লক্ষ্য করে ছোড়া চারটি ইরানি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং দেশটির পূর্বাঞ্চলের দিকে ছোড়া দুটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে। দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ১৩টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ২৭টি ড্রোন মোকাবেলা করেছে।
সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী সংবাদ সম্মেলনে আরো বলেন, যদিও যুদ্ধ একদিন শেষ হবে তবে, ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক পুনরুদ্ধার করতে আরো অনেক বেশি সময় লাগবে। কারণ তেহরানের প্রতিবেশী দেশগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করার কৌশলের কারণে বিশ্বাস সম্পূর্ণরূপে ভেঙে গেছে।
তিনি বলেন, ‘এটি কোনো হঠাৎ পরিস্থিতির প্রতিক্রিয়া নয়। ইরান আগে থেকেই তাদের যুদ্ধ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে প্রতিবেশী দেশগুলোকে লক্ষ্য করছে, যাতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ওপর চাপ তৈরি করা যায়।’ তিনি আরো বলেন, ‘এই যুদ্ধ শেষ হলেও বিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে অনেক সময় লাগবে। আর যদি ইরান এখনই এসব বন্ধ না করে, তাহলে সেই বিশ্বাস আবার গড়ে তোলা প্রায় অসম্ভব হয়ে যাবে।’
সূত্র : আলজাজিরা।