ক্যাটাগরি: অর্থনীতি

অনিয়মের অভিযোগে ইসলামী ব্যাংকের পরিচালককে অপসারণ, পর্ষদে নতুন মুখ

দেশের শরীয়াহ ভিত্তিক বৃহত্তম ব্যাংক ‘ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি’-এর পরিচালনা পর্ষদে বড় ধরনের সংস্কার এনেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। নানা বিতর্ক ও অনিয়মের অভিযোগ ওঠার পর ব্যাংকটির পরিচালক মো. আবদুল জলিলকে পদ থেকে সরিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

সোমবার (১৬ মার্চ) এক জরুরি আদেশের মাধ্যমে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়। একইসঙ্গে শূন্য হওয়া ওই পদে অভিজ্ঞ চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট (সিএ) এস এম আবদুল হামিদকে নতুন স্বতন্ত্র পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এই পদক্ষেপকে ব্যাংক খাতের সুশাসন ফেরানোর লড়াইয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশ ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, আবদুল জলিলের বিরুদ্ধে বেশ কিছু গুরুতর অভিযোগ জমা হয়েছিল। দীর্ঘ তদন্তের পর কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাঁর অপসারণের সিদ্ধান্ত নেয়। মূলত যে তিনটি কারণে তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে:

আবদুল জলিল একসময় ইসলামী ব্যাংকের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ছিলেন। পর্ষদ সদস্য হওয়ার পর তিনি তাঁর পুরোনো সম্পর্কের জের ধরে ব্যাংকের একজন নির্দিষ্ট গ্রাহককে বিশেষ আর্থিক সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ ওঠে। প্রাথমিক তদন্তে এর সত্যতা পাওয়ার পর শুরুতে তাঁকে নির্বাহী কমিটির চেয়ারম্যান পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তবে এবার তাঁকে পরিচালক পদ থেকেও স্থায়ীভাবে অব্যাহতি দেওয়া হলো।

অভিযোগ রয়েছে, আবদুল জলিল ব্যাংকের বিভিন্ন গ্রাহকের কাছ থেকে রাজনৈতিক অনুষ্ঠানের নাম করে অর্থ সংগ্রহ করতেন। তাঁর বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট একটি রাজনৈতিক আদর্শ (জামায়াতপন্থী) লালন এবং সেই প্রভাব খাটিয়ে ব্যাংকের প্রশাসনিক কাজে হস্তক্ষেপ করার অভিযোগও জোরালো ছিল।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক কর্মকর্তা এবং আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের ডিএমডি হিসেবে দায়িত্ব পালন করা এই ব্যাংকারের বিরুদ্ধে নীতিগত বিচ্যুতি ও সতর্কবার্তা অমান্য করার বিষয়টিও আমলে নিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা।

২০১৭ সাল থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত ইসলামী ব্যাংক ছিল এস আলম গ্রুপের একক নিয়ন্ত্রণে। এই দীর্ঘ সাত বছরে ব্যাংকটি থেকে নামে-বোনামে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া নিয়মবহির্ভূতভাবে প্রায় ১০ হাজার কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়ায় ব্যাংকটি বর্তমানে এক ভয়াবহ তারল্য ও প্রশাসনিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

২০২৪ সালে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর এই লুটপাট বন্ধে প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে ব্যাংকটির পর্ষদ পুনর্গঠন করা হয়। সে সময়ই আবদুল জলিলকে পর্ষদে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। কিন্তু নতুন পর্ষদে আসার পরও তিনি পুরোনো ধারার অনিয়মে জড়িয়ে পড়ায় ক্ষুব্ধ হয় বাংলাদেশ ব্যাংক।

গতকাল সোমবার সকালেও পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের সঙ্গে ইসলামী ব্যাংকের পর্ষদ সদস্যদের একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকে আবদুল জলিল সশরীরে উপস্থিত ছিলেন এবং ব্যাংকের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করেন। তবে বৈঠক শেষ হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বিকেলে তাঁর অপসারণের চিঠি ইস্যু করা হয়।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান সাংবাদিকদের কাছে এই অপসারণের খবরটি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, ব্যাংকের বৃহত্তর স্বার্থে এবং সুশাসন নিশ্চিতেই এই পরিবর্তন আনা হয়েছে।

আবদুল জলিলের স্থলাভিষিক্ত হওয়া এস এম আবদুল হামিদ একজন অভিজ্ঞ ব্যাংকার ও পেশাদার হিসাববিদ। দায়িত্ব পাওয়ার পর তিনি গণমাধ্যমকে জানান, তিনি ইতিমধ্যেই নিয়োগপত্র হাতে পেয়েছেন এবং পবিত্র ঈদুল ফিতরের ছুটির পরপরই আনুষ্ঠানিকভাবে কাজ শুরু করবেন।

নিজের আগামীর পরিকল্পনা সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘ইসলামী ব্যাংকে বর্তমানে যে ধরনের বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা ও আর্থিক ঝুঁকি রয়েছে, তা কাটিয়ে ওঠা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। আমি আমার পেশাদার অভিজ্ঞতা দিয়ে ব্যাংকটিকে সঠিক পথে ফেরাতে কাজ করব।’

ব্যাংকিং খাত বিশেষজ্ঞ ও অর্থনীতিবিদদের মতে, কেবল একজন পরিচালক পরিবর্তন করলেই ইসলামী ব্যাংকের বিশাল সমস্যা মিটবে না। তবে যারা লুটপাটের পর নতুন করে অনিয়মের সুযোগ খুঁজছেন, তাদের জন্য এটি একটি কড়া বার্তা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এই কঠোর অবস্থান ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, ২০২৬ সালে এসে ব্যাংক খাতে আর কোনো রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বা ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধি বরদাস্ত করা হবে না। গ্রাহকদের আস্থা ফেরাতে হলে পর্ষদে আরও স্বচ্ছতা এবং দক্ষ জনবল নিয়োগ দেওয়া এখন সময়ের দাবি।

শেয়ার করুন:-
শেয়ার