ক্যাটাগরি: মত দ্বিমত

ধর্ম, ভূরাজনীতি এবং মানবজাতির অস্তিত্ব

মধ্যপ্রাচ্য যখন ইরানের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এবং জনঅসন্তোষের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, ঠিক সেই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ঘিরে এক নতুন ধর্মীয় বয়ান তৈরি হচ্ছে। প্রশ্ন উঠছে, এই দুই প্রান্তের অস্থিরতার মধ্যে কি কোনো অদৃশ্য কৌশলগত সংযোগ আছে?

ইরানের ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে অর্থনৈতিক চাপ, সামাজিক নিয়ন্ত্রণ এবং রাজনৈতিক অসন্তোষ জমে আছে। অন্যদিকে ইসরায়েল তার নিরাপত্তা কৌশলকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারে রেখেছে। এমন বাস্তবতায় একটি প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবে উঠে আসে: আঞ্চলিক শক্তিগুলো কি অভ্যন্তরীণ সংকটকে বহির্মুখী সংঘাতে রূপান্তরিত করার চেষ্টা করছে?

ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর হত্যাচেষ্টা এবং তার পরবর্তী সময়ে তাকে “ঐশ্বরিকভাবে রক্ষিত নেতা” হিসেবে উপস্থাপন করার রাজনৈতিক প্রচার কি কেবল অভ্যন্তরীণ মার্কিন রাজনীতির অংশ, নাকি এটি বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক কৌশলের উপাদান?

ইসরায়েল কি তার নিরাপত্তা নীতিকে শক্তিশালী করতে মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতির নির্দিষ্ট ধারাকে প্রভাবিত করছে?

ইরানের অভ্যন্তরীণ ক্ষোভ কি আঞ্চলিক উত্তেজনাকে আরও উসকে দিচ্ছে?

নাকি আমরা কেবল সমান্তরাল সংকটকে একটি বৃহৎ কাহিনিতে জোড়া লাগানোর চেষ্টা করছি?

এই প্রশ্নগুলোই আমাদের বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতা বোঝার সূচনা বিন্দু।

বর্তমান বিশ্ব এমন এক পর্যায়ে দাঁড়িয়ে আছে যেখানে ধর্মীয় ভাষা, রাজনৈতিক কৌশল এবং ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এক জটিল বিন্যাস তৈরি করেছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ, মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা এবং “শেষ সময়ের যুদ্ধ” ধরনের ভাষার পুনরুত্থান আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। এই প্রতিবেদনটি ঘটনাগুলো ধারাবাহিকভাবে বিশ্লেষণ করছে।

১. ট্রাম্পকে ঘিরে “ঐশ্বরিক রক্ষা” ধারণা: ২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারের সময় ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর হত্যাচেষ্টা এবং তার বেঁচে যাওয়া মার্কিন রাজনীতিতে গভীর প্রতীকী প্রভাব ফেলে। তার কিছু সমর্থকের মধ্যে ধারণা জোরদার হয় যে তিনি ঈশ্বরের দ্বারা রক্ষিত অথবা ঈশ্বরের পরিকল্পনার অংশ।

এই বিশ্বাসের পেছনে কয়েকটি ধর্মীয় ব্যাখ্যা কাজ করে। মার্কিন ইভানজেলিক্যাল খ্রিস্টানদের একটি অংশ মনে করে ঈশ্বর ইতিহাসে রাজনৈতিক নেতাদের ব্যবহার করেন। বাইবেলের পুরনো নিয়মে এমন উদাহরণ রয়েছে যেখানে নৈতিকভাবে নিখুঁত নন এমন রাজাকেও ঐশ্বরিক পরিকল্পনায় ব্যবহৃত হতে দেখা যায়। ফলে ট্রাম্পকে কেউ কেউ নৈতিক আদর্শ নয়, বরং ঐশ্বরিকভাবে ব্যবহৃত নেতা হিসেবে উপস্থাপন করেন।

তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এটি সব রিপাবলিকান বা সব খ্রিস্টানের বিশ্বাস নয়। রিপাবলিকান পার্টির কোনো আনুষ্ঠানিক ধর্মীয় মতবাদ নেই। এটি একটি গোষ্ঠীগত ধর্মীয় ব্যাখ্যা, রাজনৈতিক বাস্তবতার আনুষ্ঠানিক কাঠামো নয়।

২. ইরানকে “অশুভ শক্তি” হিসেবে চিত্রায়ন: যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরে উত্তেজনাপূর্ণ। পারমাণবিক কর্মসূচি, আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার এবং ইসরায়েল প্রশ্ন এই উত্তেজনার কেন্দ্রে রয়েছে। মার্কিন রক্ষণশীল রাজনীতির একটি অংশ ইরানকে কৌশলগত প্রতিপক্ষ হিসেবে তুলে ধরে।

কিছু ইভানজেলিক্যাল গোষ্ঠী বাইবেলের ভবিষ্যদ্বাণীকে আধুনিক ভূরাজনীতির সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করে। তাদের মতে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত “শেষ সময়ের” পূর্বাভাস হতে পারে, ইসরায়েল রক্ষা করা ঈশ্বরের পরিকল্পনার অংশ, এবং ইরান সম্ভাব্য প্রতিপক্ষ শক্তি। তবে এটি মূলধারার খ্রিস্টীয় মতবাদ নয়, বরং নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ধর্মীয় ব্যাখ্যা।

৩. ইহুদি ধর্মে “শেষ সংঘাত” ধারণা: ইহুদি ধর্মে মেসিয়ানিক যুগের ধারণা রয়েছে, যেখানে ভবিষ্যতে শান্তি ও ন্যায় প্রতিষ্ঠিত হবে। কিছু ঐতিহ্যিক গ্রন্থে “গগ ও মাগগ” নামে একটি চূড়ান্ত সংঘাতের উল্লেখ আছে। কিন্তু এখানে একটি মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। ইহুদিরা যিশুকে মেসিয়া হিসেবে মানে না এবং যিশুর পুনরাগমনে বিশ্বাস করে না। তাদের মতে ভবিষ্যৎ মেসিয়া এখনো আগমন করেননি। ফলে “শেষ যুদ্ধের পর যিশু ফিরে আসবেন” এই ধারণা ইহুদি বিশ্বাস নয়, বরং খ্রিস্টীয় ধর্মতত্ত্বের অংশ।

৪. খ্রিস্টধর্মে পুনরাগমন ও চূড়ান্ত বিচার: খ্রিস্টধর্মে বিশেষ করে উপেনবারেলসেবোকেনে একটি চূড়ান্ত আধ্যাত্মিক সংগ্রামের বর্ণনা রয়েছে। সেখানে যিশুর পুনরাগমন, ভালো ও মন্দের চূড়ান্ত বিচার এবং নতুন আকাশ ও নতুন পৃথিবীর ধারণা উল্লেখ আছে। এই পাঠে মুসলমানদের কোনো উল্লেখ নেই, কারণ ইসলাম খ্রিস্টধর্মের কয়েক শতাব্দী পরে আবির্ভূত হয়েছে। এখানে সংঘাতটি ধর্মতাত্ত্বিক অর্থে ঈশ্বর ও অশুভ শক্তির মধ্যে, আধুনিক কোনো জাতি বা জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে নয়। অধিকাংশ খ্রিস্টান এই বর্ণনাকে প্রতীকী বা আধ্যাত্মিক সংগ্রাম হিসেবে দেখেন।

৫. “মুসলমানদের বিরুদ্ধে শেষ যুদ্ধ” ধারণার বিশ্লেষণ: মুসলমানদের বিরুদ্ধে অ্যাপোক্যালিপ্টিক যুদ্ধ সাধারণত এমন একটি ধর্মীয় রঙযুক্ত ধারণাকে বোঝায় যেখানে পৃথিবীর শেষ সময়ে ভালো ও মন্দের মধ্যে একটি চূড়ান্ত যুদ্ধ হবে, এবং সেখানে মুসলমানদেরকে প্রতিপক্ষ হিসেবে কল্পনা করা হয়। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই ধারণা মূলধারার কোনো ধর্মীয় শিক্ষার প্রতিনিধিত্ব করে না। এটি নির্দিষ্ট কিছু উগ্র বা চরমপন্থী ব্যাখ্যার ফল। তাই বিষয়টি বোঝার জন্য আমাদের প্রথমেই দুটি জিনিস আলাদা করতে হবে। ধর্মতাত্ত্বিক বিশ্বাস এবং রাজনৈতিক বা উগ্র ব্যাখ্যা।

ইসলাম ধর্মে শেষ সময়ের ধারণা, ইসলামে “আখেরাত” ও “কিয়ামত” সংক্রান্ত একটি পূর্ণাঙ্গ তত্ত্ব আছে, যাকে এস্ক্যাটোলজি বলা হয়। কিছু হাদিসে বড় ফিতনা, আল মাহদীর আবির্ভাব এবং ঈসা আলাইহিস সালামের পুনরাগমনের কথা উল্লেখ আছে। কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়:

  • এসব বর্ণনার ব্যাখ্যা বিভিন্ন আলেম বিভিন্নভাবে করেছেন।
  • অধিকাংশ মুসলমান এগুলোকে প্রতীকী বা আল্লাহর জ্ঞানের অন্তর্গত বিষয় হিসেবে দেখেন।
  • ইসলামের মূলধারার শিক্ষা দৈনন্দিন জীবনে ন্যায়, দায়িত্ব, শান্তি ও সহাবস্থানের উপর জোর দেয়।

অর্থাৎ ইসলাম কোনো জাতি বা নির্দিষ্ট ধর্মের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক আহ্বান দেয় না। কিছু উগ্র গোষ্ঠী এসব বর্ণনাকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক সহিংসতাকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করেছে, কিন্তু তা মূলধারার ইসলাম নয়।

খ্রিস্টধর্মে শেষ সময়ের ধারণা, খ্রিস্টধর্মেও শেষ সময় বা পৃথিবীর অন্তিম অধ্যায় নিয়ে বর্ণনা আছে। বিশেষ করে নতুন নিয়মের উপেনবারেলসেবোকেনে ভালো ও মন্দের এক চূড়ান্ত সংঘাতের কথা বলা হয়েছে, যাকে অনেক সময় হারমাগেডন বলা হয়।

  • সেখানে মুসলমানদের কোনো উল্লেখ নেই, কারণ ইসলাম খ্রিস্টধর্মের কয়েক শতাব্দী পরে আবির্ভূত হয়েছে।
  • যুদ্ধটি ধর্মতাত্ত্বিক অর্থে ঈশ্বর ও অশুভ শক্তির মধ্যে, আধুনিক কোনো নির্দিষ্ট জাতি বা জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে নয়।
  • অধিকাংশ খ্রিস্টান এই বর্ণনাকে প্রতীকী বা আধ্যাত্মিক সংগ্রাম হিসেবে ব্যাখ্যা করেন।

কিছু চরমপন্থী গোষ্ঠী এসব পাঠকে আক্ষরিক অর্থে নিয়ে বর্তমান ভূরাজনীতির সাথে যুক্ত করার চেষ্টা করে। পার্থক্য মূলত তিনটি ক্ষেত্রে:

  • ইতিহাসের শেষ অধ্যায় কিভাবে বর্ণনা করা হয়েছে
  • কোন কোন ধর্মীয় চরিত্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন
  • পাঠগুলোকে আক্ষরিক না প্রতীকীভাবে ব্যাখ্যা করা হয়

দুই ধর্মের দৈনন্দিন জীবনের মূল বার্তা হলো নৈতিকতা, দায়িত্ব, শান্তি এবং ঈশ্বরের সাথে সম্পর্ক। মুসলমানদের বিরুদ্ধে অ্যাপোক্যালিপ্টিক যুদ্ধ ধরনের ভাষা সাধারণত রাজনৈতিক প্রচারণা, চরমপন্থী মতাদর্শ, সভ্যতার সংঘাত তত্ত্ব এবং ধর্মীয় পাঠের অপব্যবহারের প্রেক্ষাপটে ব্যবহৃত হয়। এটি মূলধারার খ্রিস্টান বা মুসলমানদের বিশ্বাসকে প্রতিনিধিত্ব করে না।

৬. ইসরায়েল প্রশ্ন ও নিরাপত্তা রাজনীতি: ইসরায়েল বর্তমানে নিরাপত্তাকে রাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রে রেখেছে। হামাস, হিজবুল্লাহ ও ইরানপন্থী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান তাদের কৌশলগত নীতির অংশ। প্রতিরোধ ক্ষমতা বজায় রাখা, শত্রুকে নিরস্ত করা এবং প্রযুক্তিগত সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখা তাদের অগ্রাধিকার। তবে আন্তর্জাতিক মহলে সামরিক পদক্ষেপের মানবিক মূল্য, দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সমাধানের অভাব এবং ফিলিস্তিন প্রশ্নের অনিরসন নিয়ে তীব্র বিতর্ক রয়েছে। নিরাপত্তা ও মানবিকতার দ্বৈত বাস্তবতা এখানেই স্পষ্ট।

৭. ট্রাম্প প্রশাসন বিশ্ব রাজনীতিতে কয়েকটি শিক্ষা দিয়েছে:

  • জাতীয়তাবাদ বহুপাক্ষিকতার ওপর প্রাধান্য পেতে পারে।
  • ব্যক্তিকেন্দ্রিক কূটনীতি প্রথাগত কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে।
  • ধর্মীয় ভোটব্যাংক নীতিনির্ধারণে প্রভাব ফেলতে পারে।
  • অভ্যন্তরীণ মেরুকরণ আন্তর্জাতিক অবস্থানকেও প্রভাবিত করতে পারে।

৮. ভবিষ্যৎ প্রবণতা: বিশ্ব এখন মূলত কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতার যুগে প্রবেশ করেছে। যুক্তরাষ্ট্র, চীন এবং রাশিয়ার মধ্যে প্রতিযোগিতা বাড়ছে। মধ্যপ্রাচ্যে প্রক্সি সংঘাত অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। প্রযুক্তি, সাইবার যুদ্ধ এবং অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা সামরিক সংঘাতের বিকল্প হাতিয়ার হয়ে উঠছে।

বিশ্ব কি ধর্মীয় শেষ যুদ্ধের দিকে এগোচ্ছে? বাস্তব বিশ্লেষণ বলছে, না। ধর্মীয় ভাষা ব্যবহৃত হচ্ছে, কিন্তু সিদ্ধান্তগুলো মূলত নিরাপত্তা, ক্ষমতার ভারসাম্য এবং অর্থনৈতিক কৌশলের ভিত্তিতে নেওয়া হচ্ছে। ধর্মতত্ত্ব, পরিচয় রাজনীতি এবং ক্ষমতার ভাষার এই মিশ্র বাস্তবতা বোঝা আজ অত্যন্ত জরুরি। আবেগ নয়, বিশ্লেষণই হতে পারে দায়িত্বশীল গণমাধ্যমের পথ।

রহমান মৃধা, গবেষক ও লেখক, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন

শেয়ার করুন:-
শেয়ার