ক্যাটাগরি: মত দ্বিমত

বিংশ শতাব্দীর কাঠামো না কি একবিংশ শতাব্দীর প্রযুক্তিনির্ভর: কোন পথে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা?

যুদ্ধের চরিত্র বদলে গেছে। একসময় যুদ্ধ মানেই ছিল সীমান্তে সৈন্য সমাবেশ, রাইফেল, কামান, ট্যাংক এবং সম্মুখসমরের সংঘর্ষ। রাষ্ট্রের শক্তি মাপা হতো সৈন্যসংখ্যা দিয়ে। বড় বাহিনী মানেই বড় শক্তি। সেই ধারণা বিংশ শতাব্দীর বাস্তবতায় কার্যকর ছিল।

কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে যুদ্ধের কেন্দ্র সরে গেছে। আজ যুদ্ধ শুধু সীমান্তে নয়, সার্ভার রুমে, স্যাটেলাইট কক্ষপথে, ডেটা সেন্টারে এবং কন্ট্রোল রুমে। ড্রোন আকাশে উড়ছে, সমুদ্রে স্বয়ংক্রিয় নজরদারি ব্যবস্থা কাজ করছে, সাইবার আক্রমণ বিদ্যুৎ গ্রিড অচল করতে পারে, ব্যাংকিং ব্যবস্থা অস্থিতিশীল করতে পারে, এমনকি একটি দেশের প্রশাসনিক কাঠামোকে পক্ষাঘাতগ্রস্ত করে দিতে পারে।

বিশ্বের বড় শক্তিগুলো তাদের প্রতিরক্ষা কৌশলে প্রযুক্তিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। সাইবার স্পেস এখন স্বীকৃত যুদ্ধক্ষেত্র। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডেটা অ্যানালিটিক্স, স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রব্যবস্থা এবং স্যাটেলাইট নজরদারি আধুনিক সামরিক শক্তির মূল উপাদান। সৈন্য আছে, কিন্তু সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণ করছে প্রযুক্তি।

এই বাস্তবতায় প্রশ্ন উঠছে, কেবল শারীরিক প্রশিক্ষণ, কুচকাওয়াজ এবং বৃহৎ জনবল দিয়ে কি আধুনিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব? সাইবার আক্রমণ রুখতে রাইফেল লাগে না। ড্রোন প্রতিরোধে প্যারেড গ্রাউন্ডের অনুশীলন যথেষ্ট নয়। স্যাটেলাইট নজরদারি মোকাবিলায় প্রয়োজন ইলেকট্রনিক দক্ষতা।

জাতীয় নিরাপত্তা এখন সীমান্তের চেয়ে বেশি নির্ভর করছে প্রযুক্তিগত সক্ষমতার ওপর।

এবার বাংলাদেশের দিকে তাকাই। আমাদের প্রতিরক্ষা কাঠামো ঐতিহ্যগতভাবে জনবলনির্ভর। বৃহৎ সৈন্যসংখ্যা, বিস্তৃত প্রশাসনিক পরিকাঠামো এবং স্থায়ী ব্যয়ের কাঠামো রাষ্ট্রীয় বাজেটের বড় অংশ দখল করে আছে। প্রশ্ন হলো, এই বিপুল জনশক্তি কি পর্যাপ্ত প্রযুক্তিগত দক্ষতায় রূপান্তরিত হচ্ছে? নাকি আমরা এখনো সংখ্যাকে শক্তি মনে করে আত্মতুষ্ট?

শুধু বড় বাহিনী থাকলেই শক্তিশালী হওয়া যায় না। দক্ষতায় বড় হওয়াই আজকের শক্তি।

এখানেই একটি বিকল্প চিন্তার দরজা খুলে যায়। যদি সামরিক জনবলের একটি অংশকে পরিকল্পিতভাবে পুনঃপ্রশিক্ষণ দেওয়া হয় সাইবার ডিফেন্স, ডেটা অ্যানালিটিক্স, ড্রোন প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং প্রতিরক্ষা গবেষণায়, তাহলে একই মানবসম্পদ দ্বৈত ভূমিকা পালন করতে পারে। একদিকে জাতীয় নিরাপত্তা, অন্যদিকে প্রযুক্তিভিত্তিক অর্থনীতিতে অবদান।

প্রতিরক্ষা খাতকে কেবল ব্যয়ের খাত হিসেবে দেখা হবে, নাকি মানবসম্পদ উন্নয়নের কৌশলগত প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গড়ে তোলা হবে, সেটিই এখন মূল প্রশ্ন।

বাংলাদেশের সামনে চারটি স্পষ্ট দিকনির্দেশনা থাকতে পারে।

প্রথমত, ডিমান্ড বেজড প্রযুক্তিগত শিক্ষা। বিশ্ববাজারে কোন দক্ষতার চাহিদা বাড়ছে তা বিশ্লেষণ করে প্রশিক্ষণ কাঠামো তৈরি করতে হবে। সাইবার নিরাপত্তা, অটোমেশন, ডেটা ব্যবস্থাপনা এবং উন্নত প্রযুক্তি দক্ষতা ছাড়া ভবিষ্যৎ অর্থনীতিতে টিকে থাকা সম্ভব নয়।

দ্বিতীয়ত, সামরিক পুনর্গঠন। ঐতিহ্যগত জনবল কাঠামোকে ধীরে ধীরে দক্ষতানির্ভর কাঠামোয় রূপান্তর করতে হবে। উচ্চ প্রযুক্তি ইউনিট গঠন এবং গবেষণা ও উন্নয়ন সক্ষমতা বৃদ্ধি অপরিহার্য।

তৃতীয়ত, সমন্বিত সাইবার ও ডিজিটাল প্রতিরক্ষা কমান্ড গঠন, যা বেসামরিক ও সামরিক উভয় অবকাঠামোকে সুরক্ষা দেবে।

চতুর্থত, দ্বৈত ব্যবহারযোগ্য প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ। যে প্রযুক্তি সামরিক ও বেসামরিক উভয় ক্ষেত্রে প্রয়োগযোগ্য, সেখানে বিনিয়োগ করলে প্রতিরক্ষা ব্যয় উৎপাদনশীল বিনিয়োগে রূপান্তরিত হতে পারে।

কিন্তু এই চারটি সিদ্ধান্ত কেবল নীতিগত ঘোষণা হয়ে থাকলে চলবে না। এর পরেই প্রয়োজন একটি কাঠামোগত রূপান্তর পরিকল্পনা। মূল প্রশ্ন হলো, বর্তমানে সমগ্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় যে বিপুল জনশক্তি রয়েছে, তাদের ভবিষ্যৎ ভূমিকা কী হবে?

এই জনশক্তিকে কেবল নিরাপত্তা কাঠামোর স্থায়ী উপাদান হিসেবে না দেখে, জাতীয় উন্নয়নের কৌশলগত সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

রাষ্ট্রকে একটি দীর্ঘমেয়াদি রূপান্তর রোডম্যাপ তৈরি করতে হবে, যেখানে প্রতিরক্ষা খাতে কর্মরত জনবলকে ধাপে ধাপে নতুন প্রযুক্তি দক্ষতা, ডিজিটাল সক্ষমতা এবং সমাজকল্যাণমূলক উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের আওতায় আনা হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, ডেটা ব্যবস্থাপনা, ড্রোন প্রযুক্তি, অবকাঠামো প্রযুক্তি এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এই জনশক্তি দ্বৈত সক্ষমতায় রূপ নিতে পারে।

এখানে আরেকটি কৌশলগত মাত্রা যুক্ত করা জরুরি। বিশ্বের বহু দেশে দক্ষ প্রযুক্তিগত ও শৃঙ্খলাবদ্ধ কর্মশক্তির ঘাটতি রয়েছে। পরিকল্পিত ও মানসম্মত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে প্রতিরক্ষা পটভূমির মানবসম্পদকে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের উপযোগী করে তোলা গেলে তা বৈদেশিক আয়ের একটি নতুন দ্বার খুলতে পারে। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সমন্বিত চুক্তি, দক্ষতা সনদায়ন এবং পুনর্বাসন কাঠামোর মাধ্যমে এই প্রক্রিয়াকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া সম্ভব।

অর্থাৎ প্রতিরক্ষা জনবলকে ধীরে ধীরে এমন এক মানবসম্পদ শক্তিতে রূপান্তর করা, যারা একদিকে জাতীয় নিরাপত্তায় অবদান রাখবে, অন্যদিকে অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতায় যুক্ত হবে, এবং প্রয়োজন হলে আন্তর্জাতিক বাজারেও অংশ নিতে পারবে।

এটি কেবল সামরিক সংস্কার নয়। এটি নতুন মানবিক উন্নয়নের রূপরেখা। একটি কাঠামো ফর বিল্ডিং ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট অব বাংলাদেশ, যেখানে প্রতিরক্ষা ব্যয়কে ব্যয় হিসেবে নয়, মানবসম্পদে বিনিয়োগ হিসেবে পুনঃসংজ্ঞায়িত করা হবে।

রাষ্ট্র যদি চায়, তবে বৃহৎ জনবলকে স্থায়ী ব্যয়ের বোঝা হিসেবে না দেখে উৎপাদনশীল শক্তিতে রূপান্তর করা সম্ভব। এটি হবে কৌশলগত মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা, যেখানে প্রতিরক্ষা খাতের কর্মীরা একই সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষা করবে এবং দেশের প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতিতে অবদান রাখবে।

এটি কোনো আবেগ বা সাধারণ মতামতের প্রশ্ন নয়। এটি রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অবস্থানের প্রশ্ন। এটি আমাদের জাতীয় ভবিষ্যৎ, আমাদের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, এবং আগামী প্রজন্মের প্রতি দায়বদ্ধতার প্রশ্ন।

বাংলাদেশ কি বড় জনবল ধরে রেখে বিংশ শতাব্দীর শক্তির ধারণায় স্থির থাকবে, নাকি সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়ে একবিংশ শতাব্দীর প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিরক্ষা রাষ্ট্র গড়ে তুলবে?

রাষ্ট্রের শক্তি আর কেবল বন্দুকের নলে সীমাবদ্ধ নয়। আজ রাষ্ট্রের শক্তি নিহিত জ্ঞান, প্রযুক্তি এবং দক্ষ মানবসম্পদে। সিদ্ধান্তটি সরল—কিন্তু তার প্রভাব হবে ঐতিহাসিক।

রহমান মৃধা, গবেষক ও লেখক, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন

শেয়ার করুন:-
শেয়ার