গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরের বিরুদ্ধে ‘স্বৈরাচারী’ আচরণের অভিযোগ তুলে আন্দোলনে নেমেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। তিন কর্মকর্তার শোকজ ও বদলি প্রত্যাহার করা না হলে আগামীকাল বৃহস্পতিবার থেকে ‘কলম বিরতি’ পালনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
আজ বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) সকাল ১১টায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান ভবনের নিচে ‘বাংলাদেশ ব্যাংক অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিল’-এর ব্যানারে প্রতিবাদ সভা আয়োজন করা হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তিন কর্মকর্তার শোকজ নোটিশ ও বদলি প্রত্যাহারসহ বিভিন্ন দাবি না মানা হলে বৃহস্পতিবার থেকে গভর্নরের পদত্যাগের দাবিতে কলম বিরতিতে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরের ‘স্বৈরাচারী’ আচরণের প্রতিবাদে আজ বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) আয়োজিত এক সভা থেকে এ ঘোষণা দেওয়া হয়।
সকাল ১১টায় ৩০ তলা ব্যাংক ভবনের নিচতলায় বাংলাদেশ ব্যাংক অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিলের ব্যানারে এ প্রতিবাদ সভার আয়োজন করা হয়। সভায় কাউন্সিলের সভাপতি একেএম মাসুম বিল্লাহ কর্মসূচির ঘোষণা দেন।
মাসুম বিল্লাহ বলেন, ‘গভর্নর বিভিন্ন স্বৈরাচারী পদক্ষেপ নিয়েছেন। আমরা এর তীব্র নিন্দা জানাই। গতকাল আমাদের তিনজনকে শোকজ নোটিশ পাঠানোর আগেই বদলি করা হয়েছে। বিষয়টি সমাধানের জন্য আমরা তাঁর কাছে গিয়েছিলাম, কিন্তু তিনি দেখা করেননি। তাই আমরা আজকের মধ্যে শোকজ নোটিশ ও বদলি প্রত্যাহারসহ অন্যান্য দাবিসমূহ বাস্তবায়নের দাবি জানাচ্ছি। তা না হলে আগামীকাল থেকে প্রতীকী কলম বিরতিতে যাব। আর রোববার সর্বস্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।’
প্রতিবাদ সভায় বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালক ও সহকারী মুখপাত্র শাহরিয়ার সিদ্দিকী বলেন, ‘আমরা চেয়েছিলাম বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন, কিন্তু পেয়েছি স্বৈরশাসন। এই স্বৈরশাসনে আমরা থাকতে চাই না। ন্যায্য দাবিসহ বারবার গভর্নরের কাছে গিয়েছিলাম, কিন্তু তিনি তা আমলে নেননি। বরং দমন ও নিপীড়নের আশ্রয় নিয়েছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়ে ভরে দেওয়া হয়েছে। গভর্নরের অনেক উপদেষ্টা ও পরামর্শক প্রয়োজন, কিন্তু এখনও অর্থনীতির জন্য কার্যকর কোনো নীতি আমরা দেখি না। উনি ক্রমাগত কর্মকর্তাদের মান নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন, যা মনোবল ভেঙে দিচ্ছে। এছাড়া ব্যাংক খাত নিয়ে যে মন্তব্য করছেন, তা ব্যাংকিং সেক্টরের নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক গভর্নরের ইচ্ছামতো চলবে না। সবকিছুর জন্য তাকে জবাবদিহি করতে হবে।’
এ সময় তিনি শোকজ ও বদলি প্রত্যাহারের দাবি জানান, তা না হলে সবাইকে শোকজ ও বদলির দাবি জানান।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও ডেপুটি হেড অব বিএফআইইউ মফিজুর রহমান খান চৌধুরী বলেন, ‘বিগত সাত-আট মাস ধরে ন্যায্য দাবি উত্থাপন করেছি গভর্নরের কাছে। কিন্তু তা মানা হয়নি। তাই আজ এই প্রতিবাদ সভা আয়োজন করতে হয়েছে। আমরা আশা করি, তিনি আমাদের ন্যায্য দাবিসমূহ মেনে নেবেন। কোনো অন্যায় দাবি করা হয়নি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মর্যাদা রক্ষায় যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’
উল্লেখ্য, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরকে ‘স্বৈরাচার’ আখ্যা দিয়ে সংবাদ সম্মেলন করায় তিন কর্মকর্তাকে ঢাকার বাইরে বদলি করা হয়। শোকজ নোটিশ দেওয়ার পরদিনই মঙ্গলবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগ থেকে এক আদেশে তাদের এই বদলি করা হয়।
বদলিকৃত কর্মকর্তারা হলেন— বাংলাদেশ ব্যাংকের নীল দলের সাধারণ সম্পাদক ও এসএমই অ্যান্ড স্পেশাল প্রোগ্রামস বিভাগের পরিচালক নওশাদ মোস্তফা, নীল দল থেকে নির্বাচিত বাংলাদেশ ব্যাংক অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিলের সভাপতি একেএম মাসুম বিল্লাহ এবং একই সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা শ্রাবণ।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত ১৬ ফেব্রুয়ারি এই তিন কর্মকর্তার নেতৃত্বে এক আকস্মিক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয় বাংলাদেশ ব্যাংক অফিসার্স কাউন্সিলের পক্ষে সর্বদলীয় কমিটির ব্যানারে। সেখানে তারা বর্তমান গভর্নরের বিভিন্ন নীতি ও সিদ্ধান্তের কড়া সমালোচনা করেন। বিশেষ করে দুর্বল ব্যাংকের সঙ্গে এক্সিম ব্যাংক ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংককে একীভূত করার উদ্যোগ এবং ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়ার প্রক্রিয়াসহ বিভিন্ন ইস্যুতে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তারা। ওই সংবাদ সম্মেলনেই তারা গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরকে ‘স্বৈরাচার’ বলে অভিহিত করেন।
এই ঘটনার প্রেক্ষিতে তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা হিসেবে প্রথমে শোকজ এবং পরবর্তীতে ঢাকার বাইরে বদলি করা হলো।
এমএন