রমজান মুমিনের জীবনে ইবাদতের বসন্তকাল। সিয়াম সাধনার এই মাসে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর রুটিন কেমন ছিল, তা জানার আগ্রহ প্রতিটি মুসলিমের। সাহরি থেকে ইফতার এবং রাতের দীর্ঘ, ইবাদতনবীজির রমজানের প্রতিটি মুহূর্ত ছিল আমাদের জন্য এক জীবন্ত আদর্শ।
নবীজির সাহরি
নবীজি (সা.) সাহরি গ্রহণকে বরকতময় কাজ হিসেবে গণ্য করতেন। বিশেষ করে সাহরিতে তিনি খেজুর পছন্দ করতেন। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে আছে, ‘উত্তম সাহরি খেজুর এবং উত্তম তরকারি সিরকা। মহান আল্লাহ সাহরি গ্রহণকারীদের প্রতি দয়া করুন।’ (কানজুল উম্মাল: ২৩৯৮৩)
রমজানের দিন
সাহরির পর ফজর আদায় করে নবীজি (সা.) সাহাবিদের রমজান ও রোজাসংক্রান্ত মাসয়ালা শিক্ষা দিতেন। তিনি রোজার পবিত্রতা রক্ষায় সতর্ক থাকতেন। হজরত লাকিত বিন সাবিরা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে আছে, নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তোমরা ভালোভাবে নাকে পানি পৌঁছাও, তবে রোজা অবস্থায় নয়। অর্থাৎ রোজা অবস্থায় হালকাভাবে পানি পৌঁছাও, অতিরঞ্জন করো না। (আবু দাউদ ২৩৬৩)
নবীজির ইফতার
ইফতারের সময় হওয়ার সাথে সাথেই নবীজি (সা.) দেরি না করে ইফতার করতেন। আনাস বিন মালেক (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে আছে, তিনি বলেন, নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামাজের আগে কয়েকটি কাঁচা খেজুর খেয়ে ইফতার করতেন। যদি কাঁচা খেজুর না থাকত, তাহলে শুকনো খেজুর দিয়ে। যদি শুকনো খেজুরও না থাকত তাহলে কয়েক ঢোক পানি দিয়ে ইফতার করতেন। (তিরমিজি; রোজা অধ্যায় : ৬৩২)
নবীজির তাহাজ্জুদ
রসুল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সব সময় তাহাজ্জুদের নামাজ আদায় করতেন। রমজানে তাহাজ্জুদের নামাজে আরও বেশি মগ্ন হয়ে যেতেন। রাতের শেষ অংশে তাহাজ্জুদের জন্য তিনি দাঁড়িয়ে যেতেন। আয়েশা (রা.) বলেন, ‘রসুল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমজান মাসে ও অন্য সব মাসের রাতে ১১ রাকাতের অধিক সালাত আদায় করতেন না। প্রথমে চার রাকাত পড়তেন। এ চার রাকাত আদায়ের সৌন্দর্য ও দীর্ঘতা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করো না। এরপর তিন রাকাত আদায় করতেন। তখন আমি বললাম, হে আল্লাহর রসুল, আপনি কি বিতর নামাজ আদায়ের আগে ঘুমিয়ে পড়েন? নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমার চোখ ঘুমায়, আমার অন্তর ঘুমায় না।’ (বুখারি, হাদিস: ৩৫৬৯)
তারাবি নামাজ
মহান আল্লাহ রমজানের দিনের রোজাকে ফরজ করেছেন। আর তার হাবিব সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘কিয়ামে রমজান’-এর ঘোষণার মাধ্যমে তারাবির মতো মূল্যবান এ হাদিয়া দান করেছেন। তারাবিতে কালামুল্লাহ-এর সঙ্গে বান্দার বিশেষ সম্পর্ক স্থাপিত হয় এবং এর মাধ্যমে বান্দার গুনাহ মাফ হয়। নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যে ব্যক্তি ঈমান ও আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস ও সওয়াবের প্রত্যাশা নিয়ে কিয়ামে রমজান আদায় করবে তার বিগত গুনাহগুলো ক্ষমা করে দেয়া হবে। (বুখারি, হাদিস: ২০০৯)
নবীজির দান-সদকা
নবীজি (সা.) স্বভাবজাতভাবেই পরম দানশীল ছিলেন। কিন্তু রমজান এলে তার দানের হাত আরও প্রসারিত হতো। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, রাসুল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানুষের মধ্যে সর্বাধিক দানশীল ব্যক্তি ছিলেন। রমজান মাসে জিবরাইল (আ.)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎকালে কল্যাণবহ মুক্ত বায়ুর চেয়েও বেশি দানশীল হয়ে যেতেন। (বুখারি, হাদিস: ৩২২০)
নবীজির কোরআন তেলাওয়াত
রমজান হলো কোরআন নাজিলের মাস। তাই এ মাসে নবীজির কোরআন প্রীতি বেড়ে যেত বহুগুণ। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, রমজান এলে প্রতি রাতে নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে জিবরাইল (আ.) আগমন করতেন। একে অপরকে কোরআন তেলাওয়াত করে শোনাতেন। (বুখারি, হাদিস: ৩৫৫৪)
নবীজির ইতেকাফ
তাকওয়া অর্জনের চূড়ান্ত ধাপ হিসেবে নবীজি (সা.) রমজানের শেষ দশ দিন মসজিদে ইতেকাফ করতেন। হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে আছে, তিনি বলেন, রমজানের শেষ দশকে নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইতিকাফ করতেন। (বুখারি, হাদিস: ২০৩৩)
নবীজির রমজান মানেই ছিল ত্যাগ, ধৈর্য এবং নিরবচ্ছিন্ন ইবাদত। তাঁর সুন্নত অনুসরণ করে আমরা যদি রমজান কাটাতে পারি, তবেই আমাদের সিয়াম সাধনা সার্থক হবে এবং আমরা লাভ করতে পারব কাঙ্ক্ষিত রহমত ও মাগফিরাত।
এমএন